ক্যান্টিনের অন্দরে
✍️ ডা: অরুণিমা দাস
কলেজে ভর্তি হবার পর নতুন নতুন বন্ধুদের সাথে গল্প আড্ডা মারার জন্য একদম উপযোগী জায়গা ছিলো ক্যান্টিন। কলেজে উঠে একটু বড়ো বড়ো ভাব এসেছে তখন। ছেলেদের জন্য লুকিয়ে তামাক সেবন করার উত্তম জায়গা ছিলো ক্যান্টিন। অনেক টুকরো টুকরো ঘটনা মনে আসছে। একদিন আমাদের এক বন্ধু শ্রেয়ান সিগারেটটা ধরিয়ে টান দেবে এমন সময় মাথায় এক গাট্টা আর কানমলা খেলো। এসবের চোটে বিষম খেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে দাদা দাড়িয়ে আছে। আমরা উল্টো দিক থেকে ওর দাদা কে আসতে দেখেছিলাম কিন্তু দাদা আমাদের হাত দেখিয়ে চুপ থাকতে বলেছিল। সেদিনের পর থেকে শ্রেয়ান ক্যান্টিনকে সেফ মনে করতো না, কলেজের বাথরুমটা ওর জন্য সেফ ছিলো।
আর আহমেদ কলেজের ক্যান্টিনে আমরা বন্ধুরা মিলে খেতে গেছি, ছটা মতন ফিশ ফ্রাই অর্ডার করেছি আর সাথে চা। আমি চা খাই না বলে বন্ধুরা পেছনে লাগছে কমপ্ল্যান খাবি বোর্নভিটা খাবি এসব বলছে। আমি নিরুত্তর হয়ে ফিশ ফ্রাই খাচ্ছি। সকলের খাওয়া হলে বিল এলো। বিল দেখে একটু অবাক লাগলো, বেশ কম। বিল মিটিয়ে সবাই মেনু দেখি ফিশ ফ্রাই এর জায়গায় ফিশ ফিঙ্গারের দাম ধরেছে। আমরা তাড়াতাড়ি করে ব্যাগ পত্র গুটিয়ে পালাচ্ছি, ওরা বোধয় বুঝতে পেরেছিল। অনেকবার ডেকেছিল কিন্তু আমরা তখন হাওয়া। পরে যদিও ওই ক্যান্টিনের সকলকে কফি আর রোল খাইয়েছিলাম আমরা সবাই। তবে আমার জন্য চায়ে পে চর্চা টা কফি পে চর্চা তে বদলে গেছিলো।
এরপর এম বি বি এস পড়তে ঢুকে মেডিক্যাল কলেজের ক্যান্টিনে প্রচুর গল্প জমে আছে পাঁচ বছরের। একদিন বন্ধুরা সকলে মিলে খেতে বসেছি চিকেনে দেখি বেশ কয়েকটা আরশোলা। আমরা চেঁচামেচি শুরু করেছি ক্যান্টিনের দাদা শান্ত স্বরে বললো আরে চাইনিজ ফুড তো মাঞ্চুরিয়ান, দু একটা আরশোলা থাকলে কি ক্ষতি? আমরা রেগে গিয়ে বেশ ঝাড়লাম দাদাকে। পরে অবশ্য ভালো চিকেন পাকোড়া খাইয়েছিল আমাদের ক্যান্টিনের দাদা। বেশ ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছিলো পাঁচ বছরে। তবে দাদা বলতো তোরা সব মা বাবার স্বপ্ন, পড়াশোনা ভালো করে করিস। কলেজে উঠেছিস বলে নিজেদের বখিয়ে দিসনা। দাদার কথা গুলো তখন বুঝতে না পারলেও এখন উপলব্ধি করতে পারি একটু একটু।
তারপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনে পড়তে ঢুকে প্রথম ছমাস কোভিডের জন্য ক্যান্টিনে সেরকম যাওয়া হতো না। আর আন্ডার গ্র্যাজুয়েট জীবনের থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট জীবন টা অন্য রকম ছিলো। এখানে সবাই কলিগ বন্ধু কেউ নয় বুঝলাম। তাও ডিউটির চাপে যখন ফাঁকা পেতাম কাকিমার ক্যান্টিনে চলে যেতাম আড্ডা দিতে। কাকিমা খুব আন্তরিক ভাবে আমাদের আপ্যায়ন করতেন। আড্ডা দিতে বসে কার ওটি তে কোন কেস ঘেটেছে আর কিভাবে ম্যানেজ করেছে সেসব গল্প হতো। স্যার ম্যাডামদের নতুন নতুন নাম দেওয়া হতো, সেসব নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলত কার জন্য কোন নামটা মানাবে। এই ভাবেই তিনটে বছর কেটে গেলো। তবে ওটিতে ব্যস্ত থাকলে কাকিমাকে একটা ফোন করে দিলেই খাবার এসে যেতো।
আর এখন সময়ের অভাবে খুব একটা ক্যান্টিনে যাওয়া হয়ে ওঠেনা। ক্যান্টিনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পুরনো কথাগুলো মনে পড়লে বেশ আনন্দে ভরে ওঠে মনটা।
©️রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস