সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
সত্য ঘটনা অবলম্বনে লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

রবিবার, ২৪ জুলাই, ২০২২

লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স✍️ ডা: অরুণিমা দাস

লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

আজ গাইনি ওটিতে বারোঘণ্টা ডিউটি । সকাল সকাল ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করে হাজির হলাম ডিউটি রুমে। সাড়ে আটটা হবে হয়তো, ভাবলাম একটু রেস্ট নিয়ে নেই কখন ডাক আসবে কেস উঠছে বলে! ঘণ্টা খানেক শুয়েছি গাইনির আর এম ও স্যার এসে হাজির হলেন। বললেন একটা ঘাটা কেস উঠবে রে! বললাম হ্যা বলুন স্যার কি কেস? বললেন অ্যাবর্শন করাতে গিয়ে পেশেন্টের জরায়ু ফুটো হয়ে গেছে। সেখান দিয়ে ইন্টেস্টাইনাল পার্ট ঢুকে গিয়ে পেটে ইনফেকশন ছড়িয়ে গেছে। হাই ফিভার পেশেন্টের আর সেপসিস ডেভেলপ করেছে। বললাম ঠিক আছে, পেশেন্ট রেডী করুন,আমি হাই ডেফিনেশন এ গিয়ে পেশেন্ট দেখে নিচ্ছি আগে। এইচ ডি ইউ তে গেলাম, দেখি পেশেন্ট মাঝ বয়সী মহিলা, আগে দুটো সিজার হয়েছে। বললাম কেমন আছো এখন? বললে পেটে খুব ব্যথা। ইন্টার্ন কে বললাম জেলকো করেছিস? দু হাতে চ্যানেল করে রাখিস! বললো দিদি চ্যানেল করা যাচ্ছে না! রেগে বললাম আগে বলিসনি কেন? এখন পেশেন্ট কে ওটি তে তোলার আগে বলছিস? সিরিয়াস কবে হবি? প্রি লোড করার দরকার ছিল। চুপ করে রইলো। বললাম ওটি তে তোল, সেন্ট্রাল লাইন করবো। তারপর কেস আন্ডার করবো। পেশেন্ট টেবিলে উঠলো। সেন্ট্রাল লাইন করলাম সাবক্লাভিয়ান ভেইন এ। সেই লাইন পেটেন্ট হতে ড্রাগ আর ফ্লুইড দিয়ে পেশেন্ট আন্ডার করলাম। কেস শুরু হলো। ইনট্রা অপারেটিভ পিরিয়ডে পেশেন্ট ভালোই ছিল। ঠিক মতো করে এক্সটিউবেট করে পেশেন্ট রিভার্স করছি এমন সময় পাশের টেবিলে জুনিয়র স্পাইনাল দিয়ে পোস্ট সিজার পেশেন্ট কে আন্ডার করছিল। বললাম দেখে দিস ড্রাগ। পাশের টেবিলে পেশেন্ট আন্ডার হয়ে শুয়ে পড়েছে তখন, আমার টেবিলে পেশেন্ট রিভার্স হয়ে গেছে। হঠাৎ চোখ গেলো পাশের টেবিলের মনিটরে, রোগীর স্যাচুরেশন ৮৯%। জুনিয়রকে বললাম প্রোব লাগা ঠিক করে, প্রোব লাগানোর পরও স্যাচুরেশন বাড়লো না, বরং আরও কমতে লাগলো। আমার টেবিল ছেড়ে ছুটলাম আমি পাশের টেবিলে। গিয়ে পেশেন্টের মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্ক সরিয়ে বেইন সার্কিট ধরে ব্যাগ মাস্ক কন্টিনিউ করা শুরু করলাম, তখন স্যাচুরেশন জিরো। পেশেন্টের তখন কোনো রেসপন্স নেই। পালস পাচ্ছি না, সি পি আর দিতে বললাম। ইন্টার্ন সি পি আর দেওয়া শুরু করলো। আর দেখি আমার জুনিয়র খেয়াল করেনি জেলকো এক্সট্রা হয়েছে। ফ্লুইড ঠিক মত না পাওয়ায় পেশেন্টের হাইপো টেনশন হয়েছে প্লাস টেবিলের মাথার দিক এতটা নীচু করেছে যে হাই স্পাইনাল হয়ে রেসপিরেটরি মাসল এফেক্ট হয়ে অ্যাপনিক হয়ে গেছে পেশেন্ট। কন্টিনিউয়াস সি পি আর এবং ব্যাগ মাস্ক করে পেশেন্টের স্যাচুরেশন ১০০ তে ওঠালাম। অ্যাট্রোপিন আর অ্যাড্রেনালিন দিলাম এক অ্যাম্পুল করে। হার্ট রেট বেশ খানিক বেড়েছিল। পেশেন্ট একটু স্টেবল হতেই গাইনি পি জি টি কে বললাম সিজার শুরু করো,নয়তো বাচ্চা খারাপ হবে। সিজার শুরু হলো,ঈশ্বরের কৃপায় বাচ্চা সুস্থ ভাবে পৃথিবীর আলো দেখলো। ততক্ষনে পেশেন্ট ও চোখ মেলে তাকিয়েছে, নাম জিজ্ঞেস করলাম! হেসে বললো বীথি। বললাম কেমন আছো? বললো ভালো আছি। গলার স্বর স্বাভাবিক হয়েছে দেখলাম। বললাম বাচ্চা ভালো আছে, তুমি চিন্তা করো না। জুনিয়রের দিকে তাকিয়ে বললাম সিরিয়াস হও। জেলকা এক্সট্রা এটা মেজর মিসটেক। সিনিয়র হও, বুঝবে কত চাপ! চুপ করে রইলো ও। পরে অবশ্য ওকে ভালো করে বুঝিয়েছিলাম কি ভুল থেকে কি কি ক্ষতি হতে পারে পেশেন্টের! বললো খেয়াল রাখবো। এরপর আর কি! ডিউটি থেকে ফেরার সময়ে এইচ ডি ইউ তে গিয়ে পেশেন্ট দুটোকে দেখে এলাম। দিব্যি আছে দেখলাম। মনে মনে ঈশ্বর কে ধন্যবাদ দিলাম। কোথা দিয়ে বারো ঘণ্টা কেটে গেছে খেয়ালই নেই। হোস্টেলের পথে পা বাড়ালাম, গিয়ে ঘুম দিতে হবে ভালো করে। 
                      I treat,he cures!
                  Thanks to almighty🙏

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

মঙ্গলবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

অনুগল্প


 বৃষ্টি নামার আগে
✍️ডা: অরুণিমা দাস 

বাইরে প্যাচপ্যাচে গরম,জৈষ্ঠ্য মাস চলছে তখন।  বেসরকারি হাসপাতালের লেবার রুমে রাউন্ড দিচ্ছেন নামকরা গাইনি ডক্টর রায়। বিকেলের দিকে আকাশের অবস্থা ভালো নয় দেখে এক প্রসূতি মা কে তার পরিবারের লোকেরা ভর্তি করিয়ে দিলেন ডক্টর রায়ের আন্ডারে। চেক করে ডাক্তার বাবু বললেন এখন তো বাচ্চা হবার সম্ভাবনা দেখছি না, আজ রাতে বা কাল সকালের দিকে হতে পারে। ওনার স্বামী বললেন বাড়িতে দেখার কেউ নেই সেরকম, এখানেই থাকুন উনি। আর প্রথম সন্তান তো, আমিও একটু ভয়ে আছি। ওকে উনি তাহলে আমার অবজারভেশনে থাকুন,বললেন ডা. রায়। সিস্টারকে নির্দেশ দিলেন কিছু ইনজেকশন আর স্যালাইন চালিয়ে দিতে,আর বলে গেলেন আজ রাতেই হয়তো ওনার প্রসব বেদনা উঠবে।আপনি কিন্তু কল করবেন আমায়। সিস্টার বললেন আচ্ছা স্যার। এরপর ওনার স্বামীকে বাড়ি যেতে বলে আশ্বস্ত করলেন ডা রায়। তারপর রাউন্ড দেওয়া শেষ করে ডা রায়ও বেরিয়ে গেলেন।
রাত তখন প্রায় দুটো, আকাশ কালো করে বিশাল মেঘের আনাগোনা চলছে, সাথে বিদ্যুতের ঝলকানি। সেই প্রসূতির তখন অল্প অল্প বেদনা উঠেছে, সিস্টার ফোন করলেন ডা রায় কে। লেবার রুমে নিয়ে যাওয়া হলো প্রসূতি মাকে।বাইরে তখন কালো অন্ধকার,আর টুপটাপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। মেঘের গর্জন তখন তুঙ্গে,লেবার রুমে সেই মহিলা তখন যন্ত্রণায় কাহিল আর মনে মনে ঈশ্বর কে ডাকছেন আর বলছেন, এত আকাশ কালো করা মেঘ আর ঝড় বৃষ্টি কেনো?? তাহলে কি আমার অনাগত সন্তানের জীবনেও এরকম অন্ধকার নেমে আসবে নাকি কোনোদিন?? কমিয়ে দাও এই ঝড় বৃষ্টি।এর মধ্যেই ডা: রায় এসে পৌঁছলেন হসপিটালে। 
সোজা চলে গেলেন লেবার রুমে, পরীক্ষা করে বললেন মা আপনার বাচ্চা হওয়ার দ্বার খুলে গেছে, আর দু তিন ঘন্টার মধ্যে আশা করি আপনার সন্তান ভূমিষ্ঠ হবে। মায়ের চোখের কোনে জল চিক চিক করছে, হয়তো কষ্টের হয়তো বা আনন্দের। সারারাত ঝড় বৃষ্টির তাণ্ডব চলতে লাগলো। ভোর ছটার দিকে সেই প্রসূতির যন্ত্রণা নিবারণ হলো, জন্ম নিল তার প্রথম কন্যা সন্তান। আর বাচ্চা ভূমিষ্ঠ হওয়ার পর সেই মা দেখলো বাইরে পরিষ্কার আকাশ, সূর্য উঠেছে,পাখিরা ডাকছে। ডা. রায় এসে বললেন ম্যাডাম আপনার মেয়ে হয়েছে। সিস্টার এসে বললো আপনার স্বামীকেও দেখিয়েছি মেয়ের মুখ। মা তখন আলতো হেসে বললেন আচ্ছা। ডা: রায় জিজ্ঞেস করলেন মেয়ের নাম কিছু ঠিক করে রেখেছেন নাকি?? মেয়ের মা বললেন সারারাত আকাশ কালো করা মেঘ আর ঝড়বৃষ্টির পর যখন প্রথম সূর্যকে দেখলাম, তখনি আমার সন্তান পৃথিবীর আলো দেখলো। তাই আমি ওর নাম রাখবো এমন কিছু, যার মানে হয় ভোরের উদিত সূর্যের লাল আভা। ডা রায় হেসে বললেন বেশ জবরদস্ত নাম ভেবেছেন তাহলে। মেয়ের মা বললেন হ্যাঁ ডাক্তারবাবু, নাম ক্রমশ প্রকাশ্য। ডা: রায় হেসে বললেন ভাগ্যিস আপনার স্বামী একদম ঠিক সময়ে আপনাকে এখানে অ্যাডমিট করিয়ে দিয়ে গেছিলেন, নাহলে রাতে যা ঝড় বৃষ্টি হচ্ছিলো, তখন যন্ত্রণা উঠলেও আপনাকে ভর্তি করতে নিয়ে আসাটা খুব চাপের হতো। মেয়ের মা বললেন ঈশ্বর মঙ্গলময়, উনি যা করেন সর্বদা সবার ভালোর জন্যই করেন। দিন সাতেক পর ছুটি হয়ে যায় মা আর মেয়ের এবং সেই দম্পতি হাসি মুখে কন্যা সন্তান কে নিয়ে বাড়ি ফেরেন। 

সত্য ঘটনা অবলম্বনে। 🌞🌞🌞

শনিবার, ২৯ জানুয়ারি, ২০২২

মন ছুঁয়ে যাওয়া কিছু গল্প

 ব্রিচ ডেলিভারি
✍️ডা: অরুণিমা দাস


আজ থেকে বছর তিনেক আগেকার ঘটনা, তখন গাইনি তে হাউস স্টাফ শিপ করছি। লেবার রুম সরগরম থাকে সবসময়,তারপর টার্শিয়ারি সেন্টার বলে মেদিনীপুর মেডিক্যাল কলেজে নরমাল ডেলিভারির কেস অবদি রেফার হয়ে আসতো। একদিন ডিউটি করছি, হঠাৎ এক আশা কর্মী রুদ্ধশ্বাসে দৌড়তে দৌড়তে হাজির আমার কাছে। এসে কোনো রকমে একটু স্থির হয়ে বললো ম্যাডাম একজন প্রসূতি মাকে নিয়ে এসেছি, বাচ্চা উল্টো হয়ে আছে। হেলথ সেন্টারের লোকেরা বুঝতে পারেনি, তাই রেফার ও করেনি। আজ সকালে ইউ এস জি করার পর বোঝা গেলো বাচ্চা উল্টো আছে আর সকাল থেকে বাচ্চা নড়ছেনা বেশি। খুব ভয়ে আছে বাড়ীর লোকেরা। শুনে বুঝলাম ব্রিচ বেবী আছে। একটুও দেরী না করে বললাম নিয়ে এসো প্রসূতি কে। 
নিয়ে এসে ভর্তি করা হলো প্রসূতি মা কে। তারপর পরীক্ষা করে দেখা গেলো সত্যই বাচ্চার পা নিচের দিকে আছে। জন্মদ্বার খুলে গেছে, আর বাচ্চা কিছুটা নেমেও এসেছে। সেই মুহূর্তে সিজার করা অসম্ভব ব্যাপার। সিনিয়র কে ফোন করায় বললো ফাইনাল ইয়ারে ব্রিচ ডেলিভারি পড়েছিলে তো? আমি বললাম হ্যাঁ, কিন্তু সেটা তো থিওরী, আর আজ তো প্রাকটিক্যাল। সিনিয়র বললো আমার আসতে এক দেড় ঘণ্টা লাগবে। তুই ব্রিচ ডেলিভারি কর। আমার তো ভয় লাগছে ভালোই, প্রকাশ তো করা যাবে না পেশেন্ট পার্টির কাছে। 
প্রসূতি কে স্যালাইন আর প্রয়োজনীয় ওষুধ দিয়ে ফিল্ডে নেমে পড়লাম। সাথে সহকারী হিসেবে সিস্টার দিদিকে রাখলাম। একে একটা নতুন কাজ তার ওপর মাথার ওপরে কেউ নেই। প্রসূতি মা কে বললাম যখন বলবো নিচের দিকে চাপ দিতে,দেবে তখন। সে তো তখন যন্ত্রণায় কাহিল আর প্রচন্ড ঘামছে। আমিও ঘামছি,কিন্তু সেটা ভয়ে। যাইহোক পরের একঘন্টার চেষ্টায় সফল হয়ে ব্রিচ ডেলিভারি করলাম আর মেয়ে হয়েছিল,যায় ওজন ২.১ কেজি ছিল। আর মেয়ের মা আমার হাত ধরে বলেছিল আমাকে যন্ত্রণা থেকে মুক্তি দিলেন, অনেক ধন্যবাদ আপনাকে দিদিমণি। আগে যেখানে ছিলাম,সেখানে কেউ দেখছিল না আমায়। আমি যন্ত্রণায় ছটফট করছিলাম। একটা সময় মনে হয়েছিল আর বোধহয় পারবোনা জীবিত বাচ্চা জন্ম দিতে। কিন্তু ভগবান আছেন দিদিমনি। উনার ইচ্ছায় আর আপনাদের চেষ্টায় আমার মেয়ে পৃথিবীর আলো দেখতে পেলো। আপনাদের সবার ভালো হোক। আমি তখন কপাল বেয়ে নেমে আসা ঘাম মুছতে মুছতে বললাম তোমাকেও অনেক শুভেচ্ছা, তোমার জন্য আমি আনকোরা একটা প্রসিডিওর করে ফেললাম তাও সিনিয়র ছাড়া। 
ভালো থেকো, মেয়েকে ভালো করে মানুষ করো। আর গম্ভীর গলায় বললাম মেয়েকে পড়াশোনা করিয়ো অনেকদূর, তোমার মত কম বয়সে বিয়ে দিয়ে দিও না। সলজ্জ হেসে মেয়ের মা বললো হ্যাঁ দিদিমণি, মেয়েকে মানুষের মতো মানুষ করার চেষ্টা করবো। পরে ওর বাড়ির লোক আমাদের সবাই কে মিষ্টি আর সিঙ্গারা খাইয়েছিল। বেশ ভালো লেগেছিলো আমাদের সকলের, আর সিনিয়র ও সেই খাবারে ভাগ বসিয়েছিল যদিও সে সশরীরে উপস্থিত ছিলো না ডেলিভারির সময়ে,কিন্তু মানসিক কাঠিন্য বজায় রাখতে যথাযথ সাহায্য করেছিল।

সত্য ঘটনা অবলম্বনে😊

বিষয় - চিত্রালোচনা


 নাম -আনন্দাশ্রু
✍️ডা: অরুণিমা দাস

 
হোয়াট ইস দিজ?রিমো কে বললো মা!! এই রেজাল্টের ছিরি তোমার?? কোনো সাবজেক্টে সিক্সটি পার্সেন্ট অবদি পাওনি। ক্লাস ফোরে এরকম রেজাল্ট নিয়ে কোন স্কুল তোমায় ক্লাস ফাইভে চান্স দেবে শুনি?? কিছু হবে না তোমার দ্বারা। না ম্যাথস ভালো পারো, না তো হিস্ট্রি, জিওগ্রাফি। তোমার ফিউচার যে কতটা নড়বড়ে সেটা এখন থেকেই বুঝতে পারছি আমি। মাথা নীচু করে কথা গুলো শুনছিল রিমো। পড়াশুনো পারুক না পারুক, একটাই ভালোগুন ওর, কোনোদিন বড়োদের মুখের ওপর কথা বলেনি।।
      এত বকাবকি শুনে পাশের ঘর থেকে ঠাকুমা এসে বললো আহ বৌমা,এটা তো ওর হাসি খেলার বয়েস, সব সময় পড়াশুনো, রেজাল্ট নিয়ে ওকে বকাবকি করো না। বাধ্য মেয়ে ও,একদিন নিশ্চই ভালো রেজাল্ট করবে। রিমোর মা বলেন আপনার আদর পেয়েই মাথায় উঠছে ও। ঠাকুমা বললেন সে যাই বলো তুমি, ছোটবেলার এই রেজাল্ট নিয়ে ওর ভবিষ্যত নিয়ে তুমি মন্তব্য করতে পারো না এভাবে। 
রিমো নিজের ঘরে গিয়ে বই খাতা গুলো খুলে বসে। 
রেজাল্ট খুবই খারাপ হয়েছে, মন টা তারও বেশ খারাপ। যাইহোক এই রেজাল্ট নিয়েই যে স্কুলের প্রাইমারী তে পড়েছে, ওই স্কুলের ই হায়ার সেকেন্ডারি তে ভর্তি হলো কোনো রকমে। 
     হেড মিস্ট্রেস ডেকে বললেন এরকম পুওর পারফরম্যান্স হলে কিন্তু তোমায় প্রত্যেক ক্লাসে এক বছর করে থাকতে হবে। রিমো তখনও চুপ, বড়োদের মুখের ওপর কথা বলতে নেই, ঠাকুমা এই শিক্ষাই দিয়েছেন তাকে। বাড়িতে বাবা মা ব্যস্ততার জন্য বেশি সময় দিতে পারেন না। পড়াশোনার বাইরে ঠাকুমা আর ভাইয়ের সাথেই সময় কাটে ওর।  ক্লাস ফাইভের অ্যানুয়াল পরীক্ষায় মোটামুটি পাস করলো, ফোরের চেয়ে একটু ভালো রেজাল্ট হলো। ক্লাস সিক্সের হাফ ইয়ারলি এক্সামে আবার শেষের দিকে রাঙ্ক। বাড়ীতে যথারীতি আবার একপ্রস্থ বকুনি। বাবা মা হাল ছেড়েই দিয়েছিলেন। শুধু ঠাকুমা আর রিমো হাল টা ছাড়েনি বোধহয়।
ক্লাস সেভেনে যখন উঠলো, একটু একটু বুঝতে শিখল রিমো। বুঝে পড়তে হবে, শুধু মুখস্থ করলে হবে না। একটু একটু করে পড়া গুলো আয়ত্ত করতে শুরু করলো। নিজেই পড়ে, কোন টিচার নেই। স্কুলের পড়াগুলো মন দিয়ে শুনতে লাগলো, বোঝার চেষ্টা করতে লাগলো। বুঝতে না পারলে ক্লাসের শেষে টিচারকে জিজ্ঞাসা করতো। এভাবে চলতে চলতে ক্লাস সেভেন থেকে এইট, এইট থেকে নাইনে উঠলো রিমো। একটু বেটার রেজাল্ট হলো অ্যানুয়াল পরীক্ষায়।
             ক্লাস নাইন, বাড়িতে বললো সবাই যে নাইনের রেজাল্ট ভালো না হলে ক্লাস টেনের টেস্ট এক্সামে বসতে দেবে না। নাইন দুজন শিক্ষক রাখা হলো। চারপাশের বন্ধুদের দেখে রিমো বুঝতে পেরেছে ততদিনে যে পড়াশোনা টা আয়ত্তে আনা খুব কঠিন নয়। স্কুলে ও বাড়িতে শিক্ষকদের সাহায্যে বেশ ভালো উন্নতি হতে লাগলো পড়াশোনায়। হাল কিন্তু ছেড়ে দেয়নি কখনো সে। ক্লাস টেন পাস হয়ে গেলো ৮৭ শতাংশ মার্কস নিয়ে।
               ক্লাস ইলেভেনে উঠলো, সায়েন্স নিয়ে ভর্তি হলো। মা তো কোনোদিন ভাবেননি যে তার মেয়ে সায়েন্স নিয়ে পড়তে পারবে। যাইহোক পড়াশোনা চলতে লাগলো। সাথে আবার জয়েন্ট এন্ট্রান্স এক্সামের প্রস্তুতি। ক্লাস টুয়েলভ এও উঠে গেলো রিমো। না এবারে আর টেনে টুনে নয়, সেকেন্ড র‍্যাঙ্ক করে। মায়ের চোখের কোনায় জল দেখেছিল সেদিন,আনন্দের না অনুতাপের সেটা বোঝেনি রিমো। তারপর এলো সেই দিন যেদিন বহুদিনের অক্লান্ত পরিশ্রমের ফসল হিসেবে আর বহু প্রতীক্ষিত জয়েন্ট এন্ট্রান্স এক্সামের ফল ঘোষণা হলো। রেজাল্ট দেখতে মা নিজে গেছে ক্যাফে তে। রোল নম্বরটা পুট করলো ক্যাফের লোকটি। র‍্যাঙ্ক শো করলো মেডিক্যাল -৩৪৫ ইঞ্জিনিয়ারিং - ৬৪৮।সেদিন আর মায়ের চোখের জল বাঁধ মানেনি, শুষ্ক মরুভূমিতে বৃষ্টির ধারার মত বেয়ে পড়েছিল। ঠাকুমা সেদিন খুব খুশি ছিলেন, মা কে বলেছিলেন তোমাদের মত পড়াশুনো জানিনা বাবা, কিন্তু এটুকু বুঝি যে বাচ্চাকে নিজের মতো করে বড়ো হতে দেওয়া উচিত, সময়ের সাথে সাথে সব ঠিক গুছিয়ে নেবে সে। মা সেদিন চুপ করে শুনেছিল। তারপর থেকে মা কোনোদিন পড়াশুনো নিয়ে রিমোকে বকাবকি আর করেননি, হয়তো আর বকার প্রয়োজন পড়েনি। সেদিনের ঘটনা মনে পড়লে আজও রিমোর চোখ ভিজে ওঠে। সম্ভবত সেটা আনন্দেরই অশ্রু।

সত্য ঘটনা অবলম্বনে।
--- ©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...