মঙ্গলবার, ১২ জানুয়ারি, ২০২১

সাথী হারা।( কলমে-- পারমিতা মন্ডল।)

অণু গল্প ----সাথী হারা।

কলমে-- পারমিতা মন্ডল।

দীঘার সমুদ্রে একা একা হেঁটে চলেছে সৈকত । এই বালুকাবেলায় , রামধনু রং আকাশের দিকে তাকিয়ে মনটা বড়ই উদাস হয়ে যায় । কি চেয়েছিল সে , আর কি পেল ? সবাই জানলো সে একটা ঠগ, একটি মেয়েকে ঠকিয়েছে । তার সর্বস্ব নিয়ে তাকে ফিরিয়ে দিয়েছে। ঘৃণায় পুরো পৃথিবী তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে । কিন্তু সত্যি কি সে অপরাধী ? এই ছাড়া তার আর কি করার ছিল ?  ভাবতে ভাবতে একটা বেদীর উপর বসে পড়ে সৈকত ।  বুকের মধ্যে যেন জমাট বেঁধে আছে একরাশ যন্ত্রণা । গলাটা কেউ যেন চেপে ধরে আছে ।


   কলেজে পড়ার সময় তৃণার সাথে বন্ধুত্ব হয়েছিল সৈকতের । সেই বন্ধুত্ব আস্তে আস্তে প্রেমে পরিনত হয় ।কলেজ ওদের জুটিকে সবাই চিনতো। খুব জনপ্রিয় ছিল ওরা।। দু বাড়ির পক্ষ থেকে ওদের সম্পর্কে কোন আপত্তি ছিল না । সৈকত আপত্তি করার মতো ছেলে ছিল না । তাই ওরা খুব আনন্দ করে ঘুরে বেড়াতো । কতদিন হয়েছে কলেজ থেকে ফেরার পথে  দুজনে ইচ্ছা করে  বৃষ্টিতে ভিজেছে ।   দুজনেই বৃষ্টি খুব ভালো বাসতো । এমন ও হয়েছে বৃষ্টিতে ভিজবে বলে এস, আর ম‍্যামের ক্লাস ফাঁকি দিয়ে দুজনে পালিয়ে গেছে। যদিও বন্ধুরা প্রক্সি দিয়ে দিতো । কতো স্মৃতি ভীড় করে আসছে মনে ।

তৃণা বলতো  সৈকতকে " আমাদের যখন বাড়ি হবে তখন বিশাল বড় একটা ছাদ বানাবো। সেখানে  দুজনে মিলে বৃষ্টিতে ভিজবো । আর লুকিয়ে লুকিয়ে ভিজতে হবে না" । আজও বৃষ্টি আসে আকাশ ঝেপে, তার চেয়েও অনেক জোরে বৃষ্টি আসে মনের কোনে । কিন্তু তৃণা আজ নেই তার পাশে ।আকাশে মেঘ দেখলেই আনমোনা হয়ে পড়ে সৈকত। কেন হলো এমন ভুল ? কি হয়েছিল সেদিন ?

 সেদিন ছিল বাইশে শ্রাবণ । কলেজে অনুষ্ঠান শেষে  আকাশ কালো করে তুমুল বৃষ্টি শুরু হয় । কিছুতেই কমতে চাইছে না । প্রকৃতি যেন সত্যিই শোকাতুর হয়ে পড়েছে  বিশ্বকবির প্রয়ান দিবসে।  এদিকে একটু একটু করে বেলা বেড়ে যাচ্ছে । বাড়িতে ফিরতে হবে । ঐ তুমুল বৃষ্টির মধ্যে বেরিয়ে পড়ে তৃনা আর সৈকত । বৃষ্টিতে ভিজতে দুজনের খুব ভালো লাগে । নিঝুম রাস্তায় দুজনে পাশাপাশি বৃষ্টিতে ভিজছে। এতো বৃষ্টিতে এগোতে না পেরে একটি গাছতলায় দাঁড়ায় দুজনে। দুজনের বুকে তখন দামামা বাজছে । দুরু দুরু বুকে হাতে হাত রাখে দুজনে। হারিয়ে যেতে চায় নিরুদ্দেশর ঠিকানায়। হঠাৎই সৈকত জড়িয়ে ধরে তৃণাকে। কিন্তু তৃণা দেখে সৈকত যেন দেহের সমস্ত ভার তার উপর ছেড়ে দেয়। টাল সামলাতে না পেরে মাটিতে বসে পড়ে তৃণা। আর সৈকত তার কোলের উপর অচৈতন্য হয়ে পড়ে যায় । কিছু বোঝার আগেই সব ঘটে যায়।  সেদিন কোনমতে বন্ধুদের ফোন করে সৈকতকে হসপিটালে ভর্তি করে তৃণা। 

 ঐ দিনই ছিল ওদের শেষ দেখা । এর পর সৈকতকে ওখান থেকে নিয়ে ভর্তি করা হয় বড় হসপিটালে। ওর ক‍্যানসার ধরা পড়ে । চোখের সামনে সব কিছু শেষ হয়ে যায় ।  তাই তৃণাকে হসপিটালে দেখা করতে দেয়নি । সৈকত চায়নি তার জীবনের সাথে তৃণাকে জড়াতে । তাই হসপিটাল থেকে ছাড়া  পাওয়ার পর সৈকত আর তৃণার সাথে যোগাযোগ করেনি । কোন ঠিকানা না রেখে চলে যায় বিদেশে । তার ভালোবাসার মানুষকে কষ্ট দিতে চায়নি । ভেবেছে একদিন সব ঠিক হয়ে যাবে। তৃণা ভুলে যাবে তাকে।

আজ সাত বছর পর আবার দেশে ফিরে আসে সৈকত । না, তার ক‍্যানসার হয়নি। ভুল চিকিৎসা হয়েছিল। যখনই সে জানতে পেরেছে সে সুস্থ তখনই ছুটে এসেছে তৃণার কাছে । কিন্তু অনেক দেরী হয়ে গেছে তখন। জীবন তো থেমে থাকে না । বাইরে প্রবল বৃষ্টির মতো চোখেও অবিরল বৃষ্টি ঝরেছে তৃণার । সে কিছুতেই বুঝতে পারেনা কেন সৈকত তাকে ছেড়ে চলে গেল ?  কোথায় গেল তাও জানেনা ।  কি তার অপরাধ ? আদৌ সে বেঁচে আছে কিনা ? একটু একটু করে চোখের জল শুকিয়ে যায় একদিন । জীবন আবার স্বাভাবিক ছন্দে ফেরে। তৃণার জীবনে আসে নতুন মানুষ । তাকে আঁকড়ে ধরে নতুন করে বাঁচতে চায় তৃণা।

 হঠাৎ একদল ছেলে মেয়ের কোলাহলে চিন্তাসূত্র ছিঁড়ে যায়  সৈকতের। হৈ হৈ করে দীঘার  বালুকাবেলায় আছড়ে পড়ে  একদল ছেলেমেয়ে। যেন উদ‍্যম সমুদ্র বল্গাহীন ভাবে ছুটে চলেছে । সেদিকে অপলক তাকিয়ে আছে সৈকত। টুপটাপ বৃষ্টি শুরু হয়েছে। ঢেউয়ের দোলায় লুটোপুটি খাচ্ছে ওরা। কাউকে কি চেনা লাগছে ? বৃষ্টিতে চশমা ঝাপসা হয়ে আসছে । আর বেশীক্ষন বসা যাবে না । এখন আর বৃষ্টিতে ভিজতে ভালো লাগে না।কেউ যেন খিলখিলিয়ে হেসে উঠলো।  চমকে যায় সৈকত ।এ হাসি তার চেনা।  দীর্ঘ এতো বছর ধরে  এই হাসি মুখটা মনের মধ্যে লুকিয়ে রেখেছিল সে । হ‍্যাঁ , ঐ তো তৃণা ।  বৃষ্টিতে ভিজছে । ঠিক আগের মতো । যেন উচ্ছল ঝরনা। শুধু পাশে আজ অন্য কেউ।

নীরবে সৈকত উঠে আসে সমুদ্রপাড় থেকে। বুকের মধ্যে জমানো একরাশ কষ্ট আর হতাশা নিয়ে বেরিয়ে আসে  আস্তে আস্তে।  । দূরে কোথায় যেন একটা গানের সুর ভেসে আসে ---- "আমি আবার তোমার আঙ্গুল ধরতে চাই ।"  চোখটা ঝাপসা হয়ে আসে ।


মুশলধারে বৃষ্টি শুরু হয়ে যায়। সবকিছু আবছা হয়ে আবার  আস্তে আস্তে  হারিয়ে যায় । শুধু একা সৈকত বিস্তৃর্ণ বালুরাশির দিকে উদাস দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে কাক ভেজা হয়ে।

সমাপ্ত।

Copyrights. are reserved for paramita mandal.

 

২টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...