ছোটগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
ছোটগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ৩০ জুলাই, ২০২৬

শিরোনাম - বন্ধ দরজার আড়ালে✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - বন্ধ দরজার আড়ালে
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

বন্ধুদের নিয়ে ছুটিতে গ্রামে ঘুরে আসার প্রস্তাব দিলো তন্ময়। শুনে তো বাকি তিন বন্ধু রাকেশ,শুভ আর সিদ্ধার্থ একপায়ে খাড়া। চারজন ই কলেজে পড়ছে ইতিহাস নিয়ে। ওদের ইচ্ছে ভবিষ্যতে আরও পড়াশোনা করার, গবেষণা নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার। তো পুরোনো বাড়ী শুনে তিন বন্ধুর মনে একরাশ খুশির ছোঁয়া,যদি কিছু ইতিহাস বেরিয়ে আসে। তন্ময় বললো আমি ছোটবেলায় গরমের ছুটিতে যেতাম তখন খুব একটা কিছু বুঝতামনা। তবে জমিদার বাড়ী আমাদের, সব সময় চাকর বাকর ভর্তি থাকতো। আমি যেখানে যেতাম কেউ না কেউ সঙ্গে থাকতো। তারপর আসতে আসতে দিন বদলালো,জমিদারির সেই মেজাজ আর রইলোনা।পড়াশোনা করে চাকরি পেয়ে কাকু জেঠু সব গ্রাম ছাড়লো। এখন থাকে বলতে আমার দাদুর দূরসম্পর্কের এক ভাইপো আর রামদীন কাকা। এ চিঠি লিখে সব জানিয়ে দিয়েছি। ওরা স্টেশনে থাকবে। যথাসময়ে রওনা দিয়ে দিলো চারজন। পইপই করে তন্ময়ের বাবা বলে দিলেন ঘুরতে যাচ্ছ যাও কিন্তু বাড়ীর যেখানে সেখানে যেওনা। কাকা দের কথা শুনবে। সবাই ঘাড় নেড়ে সায় দিলো। মায়েদের ও আশ্বস্ত করলো কিছু দুঃসাহসিক করবে না ওরা। গোকুলগড় স্টেশনে গাড়ি থামলো। নেমে দেখলো কাকারা দাঁড়িয়ে আছে ওদের নিয়ে যাবে বলে। ওরা সবাই চললো গ্রামের বাড়ির পথে।  বাড়িতে পৌঁছে রামদীন কাকা ওদের সবাইকে দোতলার ঘরে নিয়ে গেলো। দুটো ঘরে ওদের থাকার ব্যবস্থা হয়েছে। দরজা খুলে ঢুকলো সবাই। আরেক কাকা বেশী কথা বললো না ওদের সাথে।
রামদীন বললো সাধন বাবু কেমন যেনো হয়ে যাচ্ছেন দিন দিন। যাইহোক খোকা বাবুরা তোমরা এত দূর থেকে এসেছো, হাত মুখ ধুয়ে নাও। আমি দেখি তোমাদের খাবার ব্যবস্থা করি। তন্ময় বললো খাবো পরে আগে বাড়িটা ঘুরে দেখি সবাই। আচ্ছা দেখো। ওরা চারজন একটু ফ্রেশ হয়ে বাড়ী দেখতে বেরোলো। বেশ ভালো লাগছিলো ওদের। আগে তিনতলার ঘরগুলো দেখলো, ছাদ থেকে ঘুরে এলো। শুভ বললো পুরোনো বাড়ী, গুপ্তধন কিছু পাবো নাকি রে তন্ময়? সিদ্ধার্থ বললো না মনে হয় জমিদারি তো ওদের চুকে বুকে গেছে। তন্ময় বললো চল এবার নিচের ঘরগুলো দেখবো। দোতলায় নেমে বারান্দা ধরে ঘুরতে লাগলো ওরা। একদম কোণার দিকে একটা ঘর দেখলো যার দরজা দুটো তালা দিয়ে বন্ধ। ঘরের দিকে তাকালে এক অমোঘ আকর্ষণে ওদের মনে হলো দরজা খুলে যেনো কিছু পাওয়া যাবে। রামদীন কাকার ডাকে ওদের চিন্তায় ছেদ পড়লো। কাকা বললো চলো খাবার ঘরে চলো। তন্ময় বললো আচ্ছা কাকা এই দরজাটা বন্ধ কেনো? কি আছে দরজার আড়ালে? 
- দেখো খোকা বাবু তোমরা ঘুরতে এসেছো, ঘোরো খাওয়া দাওয়া করো মজা করো চলে যাও। এসব দরজা নিয়ে আলোচনা ঠিক নয়। এই ঘরে কেউ ঢোকা বারণ। পূজা করে এই দরজায় তালা দেওয়া হয়েছিলো। তখন আমি তোমাদের মতন। এর বেশি কিছু জানি না। 
- আচ্ছা কাকা আমরা কেউ যাবো না। চিন্তা কোরো না তুমি। 
মুখে বললেও ওদের মনে একটা কৌতূহল তৈরি হচ্ছিলো। প্রথম কয়েকদিন ঠিক ছিলো সব,ওরা বাড়িতেও জানালো যে ভালো লাগছে ওদের। ঘুরছে, খাওয়া দাওয়া সব ভালো। 
কিন্তু দিন কয়েক পরে সিদ্ধার্থ বললো একদিন চল রাতে আমরা দরজা খুলে দেখবো কি আছে! বাকিরা খুব একটা সায় দিলোনা তাতে। একটু দমে গেলো সিদ্ধার্থ। 
একদিন রাতে যখন সবাই ঘুমিয়ে পড়েছে, সিদ্ধার্থর মনে হলো কেউ যেনো ওকে ইশারা করে ডাকছে। 
বিছানা থেকে উঠে এগিয়ে যেতে লাগলো ও। মনে হলো ওকে কেউ নিয়ন্ত্রণ করছে যেনো। সোজা এগিয়ে যেতে লাগলো সেই বন্ধ দরজার দিকে। দরজার সামনে গিয়ে দেখলো দরজাটা খোলা। কে খুললো তবে? দরজা দিয়ে ঢুকে ও দেখলো ঘরের ভেতর একটা কেমন গন্ধ, দেওয়াকে অনেক পশু পাখির মাথা ঝোলানো। গা টা কেমন গুলিয়ে উঠলো। হাত ধরে এক ঝটকায় কে যেনো ওকে ভেতরের দিকে নিয়ে যেতে লাগলো। সেখানে গিয়ে ওর চোখের সামনে ভেসে উঠতে লাগলো এক অত্যাচারের দৃশ্য। কিছু মানুষ কারোর পায়ে পড়ে বলছে এবারের মতন মাপ করে দিন বাবু,পরের বার ঠিক সময়ে সব পাওনা মিটিয়ে দেবো। তারপরও অত্যাচার কমলো না, আরও বেড়ে গেলো। লুটিয়ে পড়লো এক সময় মানুষগুলো। আর সহ্য করতে না পেরে সিদ্ধার্থ বসে পড়লো। একি দেখলো ও?  কারা যেনো ওর কানের কাছে ফিসফিস করে বলছে দরজা খুলে গেছে এবার আমরা আর বন্দি থাকবো না। জমিদারকে শেষ করবো। ভয়ে সিদ্ধার্থ কেঁদে ফেললো। বার বার বোঝাতে লাগলো সে জমিদার নয়। একসময় জ্ঞান হারিয়ে ফেললো সিদ্ধার্থ। যখন জ্ঞান ফিরলো দেখলো বিছানায় শুয়ে আছে। বাকি তিন বন্ধু উদ্বিগ্ন মুখে ওর দিকে তাকিয়ে আছে। রামদীন কাকা দুধ নিয়ে এসে বললো খেয়ে নাও। বারণ করলেম ওই দিকে যেও না,সেই গেলে। কথা শুনলে না আমার। আজ পুরোহিত মশাইকে ডেকেছি। ওই ঘর আবার বন্ধ করতে হবে। কিন্তু কী আছে ওই ঘরে কাকা? দেখো বেশী কিছু জানিনা আমি তবে যেটুকু শুনেছি আমাদের তন্ময় বাবুর পূর্বপুরুষরা খুব অত্যাচারী ছিলেন,প্রজারা পাওনা দিতে না পারলে এই ঘরে এনে বন্দি রাখতেন আর অমানুষিক অত্যাচার করতেন। কেউ ফিরে যায়নি এই ঘর থেকে। তবে ওনার দাদু জমিদারি পাওয়ার পর থেকে প্রজারা শান্তিতে থাকতো। খুব ভালো মানুষ ছিলেন উনি। উনিই এই ঘরে তালা বন্ধ করে দিয়েছিলেন। কিন্তু হয়তো ভুলে গেছিলেন দরজার পেছনে যারা রয়ে গেলো তারা মুক্তির অপেক্ষায় রয়েছে। তারপর থেকে এই দরজা খোলা হয়নি কোনোদিন। কাল এই দাদাবাবু না গেলে হয়তো দরজা খোলা হতনা কোনোদিন। তোমরা তৈরি হয়ে নাও। পুরোহিত মশাই চলে আসবেন। ওরা চারজন তৈরি হয়ে নীচে গেলো। পুজো শুরু হয়ে গিয়েছে। পুরোহিত মশাই পুজোর শেষে দোতলার দরজায় তালা দিতে এসে কি মনে হলো,বললেন আর তালা দিতে লাগবেনা। যারা ছিলো তারা বেরিয়ে গিয়েছে। সিদ্ধার্থ হঠাৎ দেখলো কিছু ছায়ামূর্তি ওকে নমস্কার করে যেনো বাতাসে মিলিয়ে যাচ্ছে। যেনো বলছে ধন্যবাদ জানাই আমাদের মুক্ত করে দেওয়ার জন্য। হাসিমুখে ওদের দিকে তাকিয়ে রইলো সিদ্ধার্থ। কাকে যে কোন কাজে লাগাবেন ঈশ্বর তিনিই জানেন। এরপর আর কয়েকদিন থেকে ওরা ফিরে এসেছিল শহরে। কলেজ জয়েন করে সিদ্ধার্থ জানতে পারে ওর লেখা এক ঐতিহাসিক প্রবন্ধ সিলেক্ট হয়েছে ভবিষ্যতে এই নিয়ে গবেষণাও করতে পারবে। ওর কেরিয়ারয়ের আরেক দরজা যেনো খুলে গেলো। ঠিক করলো ওই গ্রামে যাবে ও আরেকবার। ওখানকার জমিদারি প্রথার ইতিহাস নিয়েও কিছু লিখবে ও। ওর মনে হতে লাগলো ওখানে গিয়ে একটা দরজা খুলেছিল বলে মহাবিশ্ব ওর জন্য আরও অনেকগুলো দরজা খুলে দিতে শুরু করেছে। তন্ময়রা সবাই ওর সাফল্যে খুব গর্বিত। সিদ্ধার্থও মন দিয়ে কাজ চালিয়ে যায় ওকেও যে বড় হতে হবে। ও যে কোনো এক গ্রামের গরীব প্রজার উত্তরপুরুষ সেটা কেউ না জানলেও ও তো জানে।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ২ জুলাই, ২০২৬

মধ্যরাতের ট্রেন-এক রূঢ় বাস্তবের মুখোমুখি✍️ ডা: অরুণিমা দাস

মধ্যরাতের ট্রেন-এক রূঢ় বাস্তবের মুখোমুখি
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

স্টেশনে বসে অনেকক্ষণ ধরে ট্রেনের অপেক্ষা করছে বিকাশ আর ওর তিনজন বন্ধু পায়েল, শিল্পী ও তরুণ। আসানসোলে এক বন্ধুর বিয়ে ছিলো, সেখান থেকেই ফিরছে ওরা সবাই। গিয়ে আবার কাল দুপুরে কলেজে ক্লাসে যোগ দিতে হবে। রাত প্রায় দেড়টা। ট্রেন আসার কথা ছিলো ১:১৫ টা নাগাদ কিন্তু এখনো অবদি এসে পৌঁছয়নি। একটু চিন্তায় আছে ওরা চারজন। শিল্পী বললো সকালে ট্রেন ধরলেই হতো। কি দরকার ছিল এত রাতের ট্রেন বুক করার? ভয় পাচ্ছিস নাকি? বিকাশ আড়চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করলো। ভয় ঠিক নয় কিন্তু মশার কামড় আর চোরদের চক্করে পড়লে কি হবে সেটাই ভাবছি। দেখনা মোবাইলে টাওয়ার আসছেনা ভালো,ট্রেন কতদূর এলো বোঝা যাচ্ছেনা, বললো তরুণ। আসবে ট্রেন আসবে, বিকাশ সবাইকে সাহস জোগাতে লাগলো। আরও মিনিট পনেরো অপেক্ষার পর ট্রেন ঢুকলো স্টেশনে। ওরা চারজন ট্রেনে উঠলো। উঠে যে যার মতো সিট নিয়ে বসে পড়লো। বেশি লোকজন নেই রাতের ট্রেন বলে কথা। ট্রেন স্টার্ট করলো সবাই ওরা একে অপরকে আশ্বাস দিলো যে এবার পৌঁছে ক্লাস করতে পারবে। বিকাশ উঠলো টয়লেট যাবে বলে। যাওয়ার সময় পাশের কুপে হাসাহাসি শুনতে পেলো। ভাবলো ওর মতন কেউ হয়তো গ্রুপে এসেছে তাই হাসিমজা চলছে। সোজা চলে গেলো টয়লেটের দিকে মাথা না ঘামিয়ে। ফিরে এসে দেখলো ওদের কুপে একজন অচেনা লোক সাথে আবার সেলফি স্টিক নিয়ে বসে আছে। বিকাশকে ঢুকতে দেখে তরুণ আলাপ করিয়ে দিলো দেখে বিকাশ ইনি হলেন প্রকাশ যিনি বিভিন্ন অফবিট জায়গা এক্সপ্লোর করেন আর সেগুলোকে প্রমোট করেন,যেমন পরিত্যক্ত ট্রেনের কামরায় কীভাবে নিজেকে মানিয়ে নেওয়া যায়! জল খাবার ছাড়া কিভাবে আছি এসব দেখিয়ে পাবলিকের মন জয় করা যায়। বেশ ভালো প্রমোট হয়। দার্জিলিং সাইডে গেছি। 
ওহ আচ্ছা। 
এখন একটু ঘুমিয়ে পড়ি আমরা? প্রকাশ আপনিও যান ঘুমিয়ে পড়ুন। প্রকাশ বিড়বিড় করলো এরপর যা হবে ঘুম উড়ে যাবে আপনাদের। কিছু বললেন? বিকাশ জিজ্ঞেস করলো। না না! কিছুনা। প্রকাশ উঠে চলে গেলো নিজের সিটে। বিকাশ বাকি তিনজনকে ধমক দিল অচেনা লোককে কেনো এতো কথা বলছিস? পায়েল বললো উনি তো নিজেই এসে হাজির হলেন। আচ্ছা ছাড় এসব চল ঘুমিয়ে পড়ি। সবাই কম্বল মুড়ি দিয়ে শুয়ে পড়লো। বেশ কিছুক্ষণ ঘুমিয়েছে,কেমন একটা ভ্যাপসা গন্ধ নাকে আসছে আর ট্রেন মনে হলো দাঁড়িয়ে গেছে,আর এগোচ্ছেনা। তরুণ উঠে বসলো বাকিরাও জেগে গেছে। হঠাৎ করেই প্রকাশ ঢুকলো ওদের কুপে। বললো ট্রেন আর এগোবেনা। দেখুন বাইরে কি ভীষণ ঝড় আর বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে। গাছের ডাল ভেঙে পরে ট্রেন আটকে গেছে। তরুণ রা সকলে জানলা দিয়ে উঁকি মারলো দেখলো বিশাল ঝড় উঠেছে। কি হবে এবার? পায়েল এর শিল্পী ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করলো? বিকাশ কিছু বলার আগেই প্রকাশ বললো আমার সাথে আসুন আমি অনেক জায়গা ঘুরি তো,একটা ভালো আস্তানাতে নিয়ে যাবো আপনাদের। বিকাশদের মনে হলো ওরা যেনো নিজেরা কিছু ভাবতে পারছেনা। প্রকাশকে ফলো করতে লাগলো। ট্রেন থেকে নেমে ঝড়ের সঙ্গে যুদ্ধ করতে করতে এগিয়ে যেতে লাগলো। প্রকাশের খুব একটা অসুবিধে হচ্ছিলো না ঝড়ে। খানিক দূর যাওয়ার পর প্রকাশ ওদের এনে তুললো একটা ভাঙ্গা পরিত্যক্ত ট্রেনের কামরায়, আগাছাতে ভর্তি। ওরা চারজন একে অপরের হাত ধরে দাঁড়িয়ে রইলো। নড়ার শক্তি টুকু নেই যেনো। আজ তোমরা আমার অতিথি। শুনবে আমার গল্প? এবার একটু বেশী ভয় পেতে লাগলো ওদের চারজনের। প্রকাশ বললো এই পরিত্যক্ত জায়গাগুলোতে আমি ঘুরে ঘুরে নিজেকে প্রমোট করি আর জায়গাগুলোকেও। আমরাও চারজনের একটা গ্রুপ ছিলাম। একদিন এরম কাজ করতে করতে সেলফি নিতে যাই আর ঠিক সেই সময়ে একটা ট্রেন এসে পড়ে। বাকি তিনজন সরে গেলেও আমি ট্রেনের তলায় চলে যাই আর ওরা কেউ আমার রক্ষা করতেও আসেনি। যে যার মতো পালিয়ে যায়। এই নাকি বন্ধুত্ব! 
তারপর? আপনি কি তাহলে? কাঁপা কাঁপা গলায় জিজ্ঞেস করেন শিল্পী।
হ্যা আমি সেদিন কাটা পড়ি। তারপর থেকে ঘুরে বেড়াই আর চারজনের কোনো গ্রুপ দেখলে খুব রাগ হয় জানো! আপনি কি আমাদেরকেও তাহলে? না না ভয় পেয়োনা। তোমাদের কিছু করবোনা। একটাই অনুরোধ তোমাদের,খালি একটু আমার বাড়ীতে জানিয়ে দিয়ো। সেই বন্ধুরা তো কিছু জানায়নি। এখনো বেওয়ারিশ হয়ে পড়ে আছি। আজও আমার জন্য পথ চেয়ে বসে আছে বোন,মা,বাবা। ওদের একটু বলে দিও আর আমায় ক্ষমা করতে বলো। হয়তো এসব প্রমোট করার খেয়াল মাথায় না চাপলে পড়াশোনা করে বড় হতে পারতাম। গলাটা ধরে এলো প্রকাশের। 
আপনার ঠিকানা দিন আমরা চেষ্টা করবো আপনার খবর পৌঁছে দেওয়ার। 
এই নাও আমার ঠিকানা। অনেক ধন্যবাদ গো তোমাদের। ওই দিকে তাকিয়ে দেখো তোমাদের ট্রেন ঠিক হয়ে গেছে,ঝড় থেমে গেছে। তোমরা সাবধানে যাও। আর হ্যা বন্ধুত্ব ঠিক একরকম অটুট থাক তোমাদের। ওরা চারজন এগিয়ে গেলো, পেছনে তাকিয়ে দেখলো প্রকাশ ওদের হাত নাড়ছে আর একটু একটু করে মিলিয়ে যাচ্ছে। ওরা চারজন কথা রেখেছিল,প্রকাশের বাড়ীতে সব জানিয়েছিল। প্রকাশের বাড়ীর সবাই ভেঙে পড়লেও সময়ের সাথে মানিয়ে নিয়েছিলো। তারপর থেকে প্রকাশের বাড়ীতে মাঝে মাঝেই যাতায়াত চলে ওদের। প্রকাশের কৃতজ্ঞতা আর উপস্থিতি ওরা মাঝে মাঝেই বুঝতে পারে কিন্তু তাতে ওদের আর ভয় করেনা কারণ জানে ওদের কোনো ক্ষতি প্রকাশ হতে দেবেনা। এখন প্রকাশের বাবা মা বোনের জন্য ওরা চারজন এক নিশ্চিন্ত আশ্রয়। বিকাশ আজও বন্ধুদের বলে যতই ট্রেনে যেখানে যাই ওই রাতের জার্নি আজও এক রূঢ় বাস্তবের মুখোমুখি দাঁড় করিয়ে দেয়। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ১৮ জুন, ২০২৬

বন্ধ ঘরের জানালা✍️ ডা: অরুণিমা দাস

বন্ধ ঘরের জানালা
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

ফাইনাল পরীক্ষার শেষে তিন্নি আর ওর ভাই টুবাই এসেছে মামাবাড়িতে। এসে দাদু দিদা মামা মামীদের আদর যত্নে ওরা বেশ আনন্দেই আছে। সাথে আছে মামাতো ভাই তমাল,ভালোই দিন কাটছে তিনজনের। এদিকে ওদের যা অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মন,তাই ওদের মা বার বার বলে দিয়েছে কোনো দুঃসাহসিক কাজ যেনো না করে ওরা। এর আগে এক রহস্য সমাধান করতে গিয়ে নিজেরা ভালোই বিপদে পড়েছিল। ওরা দু ভাই বোন প্রথম কদিন শুনেছিল মায়ের কথা। তারপর যেই করে সেই। একদিন ঘটলো এক ঘটনা। মামাতো ভাইয়ের সাথে এক ফাঁকা জায়গায় ক্রিকেট খেলতে গিয়ে বেচারা তিনজন আটকে গেলো প্রবল বৃষ্টির কারণে। কোনোরকমে গাছের তলায় দাঁড়ালেও যা ঝড় আর বৃষ্টির বেগ ওরা তিনজন এক নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে লাগলো। হঠাৎ করেই খুঁজে পেলো এক বাড়ী যদিও সেটা তালাবন্ধ বাইরে থেকে, তাও বাড়ীর কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। শেডের তলায় দাঁড়িয়ে যদি একটু ঝড় বৃষ্টি থেকে বাঁচা যায়। তমাল বললো ভুল হলো রে, তোদের এদিকে না আনলেই হতো। এই বাড়িটা তো আরোই ফাঁকা, কি জানি কখন যে বৃষ্টি কমবে! আরে দাড়া না তমাল দা, বৃষ্টি কমে গেলেই তো বেরিয়ে পড়বো আমরা। এত ভয় দেখাস না, তিন্নি বললো। তিনজন প্রায় কাকভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো, টুবাই প্রায় চেঁচিয়ে বলে উঠলো ওই দেখ দিদি আলো জ্বলছে মনে হচ্ছে,এই বাড়ী থেকেই আসছে মনে হচ্ছে। তমাল বললো ভুল দেখেছিস তুই, ওদিকে আর তাকাসনা। তুমি কি ভূতের ভয় পাচ্ছো তমাল দা? বলেই তিন্নি ফিক করে হেসে ফেললো। তিনজন অনেকক্ষণ ধরেই দেখলো একটা আলো জ্বলছে, সম্ভবত বাড়ীর পেছন দিক থেকে আসছে আলোটা। বৃষ্টি একটু ধরতে ওরা এগোলো আলোর উৎস সন্ধানে। অস্ত্র বলতে দুটো ব্যাট আর একটা বল ওদের কাছে রয়েছে। বাড়ীর পেছনে গিয়ে দেখলো একটা জানলা দিয়ে আলো আসছে। জানলা টা হালকা খোলা ছিলো, তিন্নি ঠেলা মারতেই খুলে গেলো জানলাটা। যা দেখলো তিনজন চমকে উঠলো। প্রায় গোটা পাঁচ ছয়েক কম্পিউটার চলছে। এক কোণায় অনেকগুলো অস্ত্রশস্ত্র পড়ে আছে। তিন্নি তমালকে ইশারায় একটা ভিডিও করতে বললো। কিন্তু তমাল বোঝার আগেই তিন্নি আর টুবাইয়ের মুখ যেনো কেউ চেপে ধরলো। তারপর আর কিছু মনে নেই ওদের। যখন সম্বিত ফিরলো ওদের দেখলো একটা ঘরে দু ভাইবোন হাত পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তমাল দা? কোথায় তুমি? টুবাই তিন্নিকে বললো দাদা মনে হয় আমাদেরকে উদ্ধার করতে সবকথা বলতে গেছে মামাবাড়িতে। তিন্নি ঘষটে ঘষটে দরজার কাছে গিয়ে দেখলো বাইরে দুজন বন্দুকধারী পাহারা দিচ্ছে। এদিকে ওদের মামাবাড়িতে হুলস্থূল পড়ে গেছে, কোথায় গেলো তিনজন! রাতের দিকে তমাল ফিরলো বিধ্বস্ত অবস্থায়। ওকে দেখে সবাই চেঁচিয়ে উঠলো তিন্নি আর টুবাই কোথায়? তমাল কোনোরকমে সব বললো। মামা আর দাদু সব শুনে কেমন হতভম্ব হয়ে গেলো। কি করবে না করবে বুঝতে পারছিল না কেউ। মামী বললেন পুলিশে জানানো দরকার। দিদা বললেন এতে যদি ওদের ক্ষতি করে ওই দুষ্কৃতী গুলো! 
এদিকে রাত গভীর হতেই তিন্নি অনেক চেষ্টা করে ভাইয়ের বাঁধন আলগা করে দিলো। তারপর টুবাই ওকে বাঁধন মুক্ত করলো। একপাশে খাবার রাখা ছিলো। ওরা কিছু খেলো না। কি ভাবে বেরোবে এই প্ল্যান করতে লাগলো। ঘরে যে জানলা ছিলো তার শিক গুলো কিছুটা কমজোরী ছিলো। তিন্নি চেষ্টা করতে লাগলো যদি খোলা যায় একটা শিক অন্তত। কিন্তু লাভ হলোনা,আওয়াজ পেয়ে বাইরের পাহারাদার গুলো এসে ওদের বন্দুক দেখিয়ে আবার হাত পা বেঁধে ফেলে রেখে গেলো। দরজা খোলা থাকার জন্য তিন্নি শুনতে পেলো কাল কিছু অস্ত্র এরা পাচার করবে আর ওই কম্পিউটারগুলো হলো সাইবারক্রাইমের উৎস। কিন্তু কী করবে ভেবে পায়না! 
পরের দিন সকালে, 
তিন্নি আর টুবাই শুনতে পেলো একটা হেলিকপ্টারের শব্দ, বাড়িটার ওপর যেনো চক্কর দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পুলিশের আনাউন্সমেন্ট, পুরো বাড়ী ঘিরে ফেলা হয়েছে। কেউ কোথাও পালানোর চেষ্টা করবেন না। ওদের ঘরের জানালার শিক ভেঙে তমালদা ঢুকে এলো। ওদের বাঁধন মুক্ত করলো। বললো তিন্নি তোর ক্লিপ বাইরে পড়ে থাকতে দেখে বুঝেছি তোরা এখানেই আছিস। কিন্তু তমাল দা তুই কি করে কাল পালাতে পারলি? যখন দেখলাম তোদের ওরা মুখ চেপে ধরেছে আমি একটু দূরে গাছের আড়ালে চলে যাই। অন্ধকার হওয়ায় ওরা দেখতে পায়নি আমায়। কিন্তু মেন গেট দিয়ে বেরোতে গিয়ে ওদের একজন আটকাতে আসে আমায়। তাকে ব্যাট দিয়ে দু তিনবার মারতেই সে নিজেকে সামলাতে আমাকে ছেড়ে দেয়। তারপর কোনোরকমে পালাতে পারি আমি। বাড়ী গিয়ে সব বলতেই দাদু আর বাবা পুলিশে খবর দেয়। এত তাড়াতাড়ি সব হয়েছে যে দুষ্কৃতী গুলো পালাতে পারেনি। আজ ওরা পালানোর প্ল্যান করছিল কিন্তু তার আগেই পুলিশ নিয়ে আমরা চলে এসেছি। চল চল দেখ গুলি গালার আওয়াজ পাচ্ছিস! সবকটা ধরা পড়লো বোধহয়। ওরা তিনজন বাইরে বেরোলো। দাদু ওদের দেখে জড়িয়ে ধরলো। পুলিশ অফিসার এসে বললেন আজ এই তিনজন বাচ্চার জন্য আমরা একটা বড় গ্যাংকে ধরতে পারলাম। আমরা বাচ্চা নই,টুবাই বললো। হেসে উঠলো সবাই। পুলিশ অফিসার বললেন সরি তোমরা বাচ্চা নও,তোমরা সব সাহসী যোদ্ধা। আমাদের আগামী অনুষ্ঠানে তোমাদের পুরস্কৃত করা হবে। এত বড় একটা গ্যাং তোমরা ধরিয়ে দিয়ে দেশকে রক্ষা করলে। ওদের মামা বললো চল বাড়ী,দেখ ওখানে কি পুরস্কার অপেক্ষা করছে তোদের জন্য? পুলিশের জিপ ওদের সবাইকে নামিয়ে দিয়ে গেলো। মামাবাড়ি পৌঁছে দেখে গ্রামের সবাই দাঁড়িয়ে আছে ওদের মিষ্টিমুখ করাবে বলে,সাথে নিউজ চ্যানেলের রিপোর্টার রাও। আর পাশে মামী,দিদা আর তিন্নি 
টুবাইয়ের মা বাবাও। মাকে দেখে তিন্নি একটু ভয় পেলেও দাদু বললো চল আমি আছি। যেখানেই তোদের পাঠাই রহস্য তোদের পেছন ছাড়েনা, তিন্নির মা বললেন। এবারে কিন্তু তমাল দা আমাদের নিয়ে গেছিলো খেলতে ওখানে, আমাদের কোনো দোষ নেই,বললো টুবাই। ওর কথা শুনে সকলে হেসে উঠলো। আমি কিছু করিনি পিসি, সব দোষ বৃষ্টির কিন্তু। চল চল মিষ্টি খাবি, তিন্নির বাবা বলে উঠলেন। ওদের সকলকে নিয়ে বাড়ী ঢুকলেন দাদু আর মামা। দাদু বললেন এরম দুঃসাহস ওরা দেখাবেনা তো কারা দেখাবে? ওদের কেউ বকবেনা। থ্যাঙ্ক ইউ দাদু! তিন্নি টুবাই আর তমাল একসাথে বলে উঠলো। দাদু ওদের কানে কানে বললেন নেক্সট টাইম ওয়েটিং ফর এনাদার অ্যাডভেঞ্চার। সিওর! তিন্নি বললো। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

সোমবার, ৬ অক্টোবর, ২০২৫

শিরোনাম - নাড়ু কাহিনী✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - নাড়ু কাহিনী
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

ও দেবী! চলো তাড়াতাড়ি। পুজো শুরু হয়ে যাবে তো! পেচুটা তাগাদা দিচ্ছে লক্ষী দেবীকে। 
-দাড়া আগে বাক্স প্যাটরা গুলো দেখে নিই ভালো করে। রেইনকোট নিয়েছি আবার ছাতা নিয়েছি। একদিকে বৃষ্টিতে খারাপ অবস্থা আরেকদিকে কেউ নেচে গেয়ে বেড়াচ্ছে। 
-হ্যা দেবী! ইউনিটি ইন ডাইভারসিটি একদম জ্বাজ্জল্য প্রমাণ দেখছি। চলো এগোই। 
লক্ষীদেবীর হাত ধরে পেচু সব ঘরে ঘরে যেতে লাগলো। সব জায়গায় আয়োজন দেখে পেচুর তো জিভে জল এসে যাচ্ছে। লক্ষী দেবী বললেন আড়ম্বর দেখিসনা পেচু! দেখ যেসব জায়গায় সারল্যের ছোঁয়া সেখানে অনাড়ম্বর ভাবে আয়োজন সেখানে কি তারা মন থেকে ডাকছে না? সবাই ডাকছে, কেউ ভালোবেসে ডাকছে তো কেউ বাহ্যিক আড়ম্বর দেখাতে ব্যস্ত। বেশী খাওয়াদাওয়া করিসনা,রাত জাগতে হবে আবার!
পুজোর শেষে,
হ্যা রে পেচু নাড়ু তো অনেকগুলো ছিলো রে! কম হলো কি করে? তোকে না বলেছি বেশী মিষ্টি খাবিনা! দাঁত খারাপ হলে তোকে ডেন্টিস্টের কাছে নিয়ে যেতে পারবোনা বাপু। আমার অনেক কাজ আছে পেচু। বাড়ী ফিরলে পড়তে বসতে হবে,সরু দিদি বকবে নয়তো। 
- না দেবী! আমি বেশি নাড়ু খাইনি গো। সত্যি বলছি।
- তাহলে গেলো কোথায়? কিছু নাড়ু আমি ভাই আর দিদিদের জন্য এক্সট্রা নিয়ে যেতাম। 
- দেখো না থালাতে আছে আরো,নিয়ে নাও। 
- দেখি তোর পেছনে! কি লুকোচ্ছিস রে? 
- কই দেবী? কিছু না তো?
- কিছু না বললেই হবে? দেখি দেখা। 
আরে একটা প্যাকেট! খোল দেখি। 
- তেমন কিছু নয় দেবী। কয়েকটা নাড়ু নিয়েছি এক্সট্রা আর সাথে একটু মুড়কি। 
- কার জন্য শুনি একটু? 
- আমার পেচির জন্য নিয়েছি একটু। তবে হ্যা তোমার ভাগ থেকে নয় পুরোটা। কিছুটা আমার ভাগের আর কিছুটা তোমার ভাগের থেকে নিয়েছি। 
- বুঝেছি। তোদের ভালোবাসা এরম অটুট থাকুক। 
তোমাদের দেখেই তো শিখছি দেবী। লক্ষী নারায়ণ হলেন আমার আইডল। 
- হয়েছে অনেক ভালো ভালো কথা বলেছো! রাত জেগেছো, গিয়ে ঘুমোতে হবে এবার। চলো আসি আমরা। তোমার পেচি অপেক্ষা করে আছে তোমার জন্য। 
- হ্যা চলো। এই দিনের জন্য আবার এক বছরের অপেক্ষা করতে হবে।

কোজাগরী লক্ষী পুজোর শুভেচ্ছা জানাই সকলকে। সকলের মঙ্গল হোক,ভাবনাচিন্তা সমৃদ্ধ হোক।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

সোমবার, ১০ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

শিরোনাম_তবু মনে রেখোকলমে_ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম_তবু মনে রেখো
কলমে_ডা: অরুণিমা দাস

বেশ অনেকদিন পর একটা বইমেলা শুরু হচ্ছে নীলু দের ছোট্ট শহরে। শহর বললেও ভুল হবে, আধা শহর আর আধা গ্রাম আর কি। তো এরকম জায়গায় মেলা খুব একটা হয় না, কিন্তু হলে সেখানে মানুষের ভিড় উপচে পড়ে। সে বই পড়ার জন্যই হোক বা খাওয়ার জন্যই হোক। নীলু শুনে ঠিক করলো মেলা যাবেই যেমন করে হোক,তাই পছন্দের বই সব লিস্টে রাখতে শুরু করলো। বন্ধু সোহমের সাথে প্ল্যান করলো যে কবে কখন যাবে এসব। বাড়িতে যখন জানালো মা বাবা বললেন যাও বন্ধুর সাথে ঘুরে এসো কিন্তু বেশি রাত কোরো না। প্ল্যান মত নীলু আর সোহম বেরিয়ে পড়লো মেলার উদ্দেশ্যে। প্রথমে বাস আর তারপর অটো করে পৌঁছলো মেলা প্রাঙ্গণে। বেশ ভালোই সাজিয়েছে মেলাটা, অনেক গুলো বইয়ের স্টল আর সাথে কিছু লিটল ম্যাগাজিনের স্টলও রয়েছে। সোহম হঠাৎ বলে উঠলো তিয়াস যদি থাকতো আজ খুব মজা করতো ও এখানে। নীলু শুনে বললো ওসব ভেবে কি করবি বল তো! ওর মায়াভরা চোখ টা মনে পড়লেই চোখের পাতা ভিজে আসে, মন ভার হয় রে খুব। লিখত তো বেশ ভালোই, কিন্তু কেউ যথার্থ মূল্যায়ন করলো না ওর লেখার। সেই অভিমানেই হয়তো চলে গেলো ও। এসব কথা বলতে বলতেই ওরা হাজির হলো একটা বইয়ের স্টলে। নিজের লিস্ট করা বইয়ের থেকে দুটো বই পেয়ে গেলো ওখানে নীলু। বই গুলো কিনে নিলো আর সোহম কে বললো আজ কিন্তু আমরা সব ম্যাগাজিনের দোকান গুলোতে যাবো। ওখানে শুনেছি নবীনদের লেখাকেও প্রাধান্য দেওয়া হয়। সোহম বললো হ্যাঁ যাবো তো নিশ্চয়ই রে। তিয়াস থাকলে ওর লেখাও আজ ছাপা হতো, আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর রে এই ব্যাপারে। নীলু বললো আমিও কনফিডেন্ট এই ব্যাপারে কিন্তু পাগল টা আর বুঝলো কই! আমাদের কে ছেড়ে চলেই তো গেলো। সোহম বললো আর ওর কথা মনে করিস না রে, কষ্ট বাড়বে বই কমবে না। ওর ডাইরি টাও যদি পেতাম রে খুব ভালো হতো। কিছু লেখা ছাপানো যেতো। কী বলিস রে নীলু? নীলু ঘাড় নাড়লো। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো ছাড় ভাই, এসব ভেবে লাভ নেই কিছু। সময় যা নিয়ে গেছে সেসব চাইলেও ফিরে পাওয়া যায় না রে। চল আমরা মেলা ঘুরে দেখি আর কোথায় কি বই এসেছে! হ্যাঁ চল, সোহম বললো।

খানিক এগোনোর পর একটা ম্যাগাজিন স্টল চোখে পড়লো ওদের। স্টলের নামটা বেশ অন্যরকম।
"অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি"। দোকানে গিয়ে ওরা দুজন বিভিন্ন রকম ম্যাগাজিন ঘাটতে লাগলো। দোকানের একজন এগিয়ে এসে বললো দু একটা লেখা পড়ে দেখতে পারেন কিন্তু। নীলু বললো এরকম নাম কেনো আপনাদের স্টলের?? উনি বললেন দেখুন অনেকেই আছেন যারা লেখেন ভালো, কিন্তু কদর পায় না তাদের লেখা। আমাদের টিম সেই সব লেখা সন্ধান করে আনে আর আমরা সেই লেখা গুলোকে প্রকাশ করে রূপ দিয়ে থাকি। নীলু বললো বাহ বেশ ভালো উদ্যোগ তো। "যদি সময় মত খোঁজ পেতাম আপনাদের! তাহলে হয় তো"... বিড়বিড় করলো নীলু।  কিছু বলছেন? দোকানদার বললো। না না কিছু না, কিছু বলিনি। ও আচ্ছা, তাহলে দেখুন লেখা গুলো। খুব মন দিয়ে ম্যাগাজিনের লেখা গুলো দেখছিলো নীলু আর সোহম।

নীলু...অ্যাই নীলু!! কেউ যেনো ডাকলো মনে হলো, নীলু একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো পেছনে। কোই কেউ তো নেই! সোহম বললো কি রে? কী হলো? নীলু বললো কেউ যেনো আমার নাম ধরে ডাকলো। সোহম বললো কই কেউ নেই তো রে! তুই ভুল শুনেছিস হয়তো! হ্যাঁ রে, হতে পারে আমি ভুল শুনেছি। দেখ এই লেখাটা দেখ, একদম অন্য স্বাদের লেখা, সোহম বললো। কই কি লেখা দেখি! নীলু বললো। সোহমের হাত থেকে নিয়ে দেখলো লেখাটা। লেখা রয়েছে "মন খারাপের সময়ে লেখা যদি আসে ভেতর থেকে, বুঝবে তুমি সব দুঃখ জয় করে নিতে সক্ষম"। নীলু বললো এটা নিশ্চয় কোনো লেখকের লেখা প্রকাশ পাওয়ার অপেক্ষার জন্য লেখা। সোহম বললো হতেই পারে। নীলু আবার কিছুক্ষন পর একটা ডাক শুনতে পেলো, কানের কাছে কেউ ফিসফিস করে যেনো বললো অ্যাই নীলু... যা না আরেকটু ভেতরের দিকে,  দেখ ঐ তাকে সবুজ যে বইটা ওর বারো নম্বর পেজে যা, দেখ লেখাটা পড়ে। নীলু সম্মোহিতের মত এগিয়ে গেলো সবুজ মলাটে বাঁধানো বইটা নিতে। বই খুলে বারো নম্বর পেজে চলে গেলো সোজা, দেখলো উপরে লেখা অধরা স্বপ্ন,নিচে লেখকের নাম তিয়াস। নীলু চমকে উঠলো,ডাকলো সোহম কে। সোহম ছুটে গেল নীলুর ডাকে। নীলু ওর দিকে বাড়িয়ে দিল লেখাটা। সোহম পুরোটা পড়লো, শেষ দুটো লাইন খুব মন ছোঁয়া, "অধরা স্বপ্নেরা দিচ্ছিল ধরা, আশায় ছিলাম লেখক হব কিন্তু ছোঁয়ার আগেই স্বপ্নগুলো,উপহাসের পাত্র হলাম। দুনিয়া থেকে তাই ছুটি নিলাম"। সোহম পড়ে বললো এটা তো আমাদের তিয়াসের লেখা। চল তো বিক্রেতা কে জিজ্ঞেস করি এই লেখা কোথায় পেলেন উনি? দুজনের প্রশ্নের উত্তরে বিক্রেতা জানালেন একজন ভদ্রলোকের সাথে ওনার ট্রেনে দেখা হয়েছিল, উনি কথায় কথায় জানতে পারেন যে আমরা লেখা সংগ্রহ করে ম্যাগাজিনে প্রকাশ করি। তাই উনি পরে আমার সাথে কন্টাক্ট করে একটা ছোট ডায়েরী তুলে দেন। আর বলেছিলেন ছেলে বেঁচে থাকতে তো তার লেখা পড়েও দেখিনি, সবসময় দুর ছাই করেছি। হয়তো সেই দুঃখেই সে আমাদের ছেড়ে চলে গেলো। ওর যাওয়ার পর যখন লেখা গুলো পড়লাম তখন বুঝতে পারলাম কি বড়ো ভুল করেছি? শুধু পড়াশোনা করেই যে বড়ো হওয়া যায় না, আরো অন্য ভাবেও যে নাম করা যায় সেটা যখন বুঝলাম অনেক দেরি হয়ে গেছে। নীলু সব শুনে বললো উনি তাহলে তিয়াসের বাবা হবেন।

আরে এই তো উনি এসে গেছেন দেখুন, বিক্রেতা ভদ্রলোক বললেন। নীলু আর সোহম পেছন ফিরে দেখলো ধুতি পাঞ্জাবি পরা এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। ওদের দেখে বললেন খুব চেনা লাগছে তোমাদের। নীলু আর সোহম নিজের পরিচয় দিল, জানালো তিয়াসের সাথে এক ক্লাসে পড়তো। এখন ওরা ক্লাস টুয়েলভ পাস করে কলেজে ভর্তির জন্য অপেক্ষা করছে। তিয়াস বেঁচে থাকলে আজ তোমাদের মত... আর শেষ করতে পারলেন না কথা গুলো, ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললেন তিয়াসের বাবা। নীলু বললো এখন অনেকটা দেরী হয়ে গেছে কাকু, আগে যদি বুঝতেন এতো বড়ো ক্ষতি হতো না আর আমরা তিয়াস কে হারাতামও না। ও সত্যি খুব ভালো লিখত। অনেক কিছু দিতে পারতো লেখক সমাজকে,কিন্তু সেটা হতে দেওয়া হলো না। তিয়াসের বাবা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
ওই সবুজ মলাটে বাঁধানো বইটা কিনলো নীলু। এতে যে ওর বন্ধু তিয়াসের ছোঁয়া রয়েছে। বইটা নিয়ে নীলু আর সোহম বেরিয়ে পড়লো দোকান থেকে। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে একটা বেঞ্চ দেখে ওখানে বসলো দুজন। সোহম বললো একটু জিরিয়ে নিই এখানে। অনেকটা হেঁটেছি রে। নীলুর হাতে ধরা সবুজ বইটা। হঠাৎ একটা পাতা উড়ে এসে পড়ল। বাতাস নেই তো সেরকম, পাতা এলো কোথা থেকে? সোহম বললো। দাঁড়া দেখছি, বলে নীলু পাতাটা তুলে ফেলতে যাবে এমন সময় পাতার ওপর একটা লেখা পড়লো ওর চোখে," আছি তোদের পাশে সবসময়, আমার লেখাকে যে তোরা দিয়েছিস সম্মান, ঋণী আমি তোদের কাছে চিরকাল" নিচে লেখা তিয়াস। সোহমকে লেখাটা দেখালো নীলু। সোহম পড়ে বললো কেনো যে চলে গেলো পাগলটা আমাদের ছেড়ে?? লোকের কথায় কেউ নিজের জীবন শেষ করে? নীলু বললো একটু যদি বাড়ির লোক ওকে বুঝতো, অকালে ওকে ঝরে যেতে হতো না রে। একটা দমকা হাওয়া বয়ে গেলো নীলু কে ছুঁয়ে, কানে যেনো কেউ বলে গেলো "মৃত্যুর পরে যে পেলো আমার লেখা স্বীকৃতি, এতেই খুশি আমি, আত্মার যে নেই কোনো ইতি" খুব ভালো থাকিস তোরা, আসি এখন আমি। নীলু যা শুনলো বললো সোহম কে। সোহম বললো কিছু ঘটনা সত্যিই আমাদের ব্যাখ্যার বাইরে। তিয়াস আজও আমাদের মধ্যেই আছে, বইমেলায় সশরীরে থাকতে না পারলেও ওর কায়াহীন ছায়া এসে দেখা করে গেলো আমাদের সাথে। যেখানেই থাক ও খুব ভালো থাকুক। চল বাকি মেলাটা ঘুরে নিই। হাঁটা লাগলো ওরা দুজন। নীলু বললো এই বইমেলা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ স্মৃতি হয়ে থাকবে রে। চল এগোই।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

সোমবার, ৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

সরস্বতী বন্দনা✍️ ডা:অরুণিমা দাস

 সরস্বতী বন্দনা
✍️ ডা:অরুণিমা দাস

ধরাধামে যাওয়ার জন্য রেডী হয়ে গিয়েছেন মা সরস্বতী ও তাঁর প্রিয় হাসা। লাগেজ চেকিং চলছে, দেবী দুর্গা সব গুছিয়ে দিচ্ছেন মেয়েকে। ওদিকে সরস্বতীর ফোনে ব্রহ্মা কলিং,ফোন ধরতেই তাড়া দিলেন ব্রহ্মা। হাসার ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে সরস্বতী বললো হয়ে এসেছে প্রায়,ক্যাবটা ডেকে দিন। ক্যাব নম্বর থেকে ওটিপি সব এসে গেলো দেবীর ফোনে। ক্যাবে উঠে হাসার কত গল্প। জানলা দিয়ে বাইরেটা দেখতে দেখতে যাচ্ছে হাসা আর নানা প্রশ্ন করছে সরস্বতীকে। হাসা বলছে দুদিন পূজো এবারে তাই দু রকম পাঞ্জাবী নিয়েছে। শুনেই দেবী বলছেন আজকাল খুব স্টাইল বেড়েছে তোর হাসা! শুনে মুখ ফুলিয়ে হাসা বললো অমনি আমার দিকে নজর তোমার? এই দেখো খাতাটা, কতো দাবি ছাত্র ছাত্রীদের, নিজেরা দুদিন ঘুরবে বলে বইপত্র তোমার জিম্মায় রেখে দিয়ে লিখেছে "দেখো আমায় পরীক্ষায়।" 
আর কত দেখবো বল? পড়াশোনার যা হাল আজকাল সবাই তো বইপত্র বাদ দিয়ে অন্যদিকে মন দিয়েছে। 
প্যান্ডেলে ঢুকতেই, 
ঐ দেখো মা মেয়েটা অঙ্ক বইটা রাখছে তোমার পাশে। দেখেছি হাসা,কেনো রেখেছে বল তো? দুদিন বইটা আমার কাছে রাখলে ওকে দুদিন অঙ্ক করতে হবেনা। তবেই না বাইকের পেছনে চেপে চুল উড়িয়ে ঘুরবেন উনি। তারপর পরীক্ষার আগে মেসেজে আসবে এই যাত্রা উতরে দাও দেবী! পরের বার ঠিক পড়ব। এই পরের বার যে কবে আসবে সেটা আমিও জানিনা বুঝলি! 
চল এসব বাদ দিয়ে আলপনা দেখি,প্যান্ডেলের ডেকোরেশন গুলো দেখি। এতো প্রসাদ দেখেছ মা? এই তুই খাই খাই করবি না হাসা! দুদিন থাকতে হবে তারপর পেট খারাপ করলে হবে না। এখন কিসব পেটের অসুখ হচ্ছে শুনছি। আগে মোবাইল চিপে জিবি শুনেছি,এখন দেখছি রোগের নামও সেই দিয়ে। তাই খাই খাই করিসনা। দেখে শুনে খেয়ে ভালো করে ফিরতে হবে। আমরা বরং দেখি কেউ কিছু গল্প বই দিলো কিনা! সেগুলো পড়লে বরং রাত্রিটা বোরিং লাগবেনা,ঠিক সময় কেটে যাবে। আরে কেউ ওসব গল্পের বই পড়েনা আজকাল,সব গল্প শোনে অডিও চ্যানেলে। বরং ওদের কান ধরে বলো কয়েকটা মোবাইল দিয়ে যেতে, সিরিজ দেখে সময় কেটে যাবে। আরে হাসা,ফোন দিলে আর সেলফি গ্রুপফি উঠবে কি করে? ছাড় আমরা বরং রাত্রে একটা লোকাল ট্যুর করে নেবো। এই দেখ কিসব শিল্পমেলা হচ্ছে, ওতে ঘুরে টুকিটাকি জিনিস কিনে নিয়ে গেলে ভাইবোনেরা খুশি হবে। আর রইলো বাকি পড়াশোনা! সে ওদের আমি আশীর্বাদ সব সময় করবো। বাকীটা ওদের চেষ্টা আর অধ্যবসায়ের ওপর নির্ভর করছে। হ্যা তা ঠিক বলেছো। পুজো শুরু হলো বলে, চল চুপ করে বসবি। বাণী বন্দনা শুরু হলো বলে, সকলকে সরস্বতী পুজোর আন্তরিক শুভেচ্ছা জানাই। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

সোমবার, ৩০ সেপ্টেম্বর, ২০২৪

শিরোনাম - ভাব সম্প্রসারণ✍️ ডা:অরুণিমা দাস স্কুলে যখন পড়তাম তখনকার একটা ঘটনা মনে পড়ে গেলো। ক্লাস তখন নাইন,বাংলা ক্লাস চলছে। ভাব সম্প্রসারণের জন্য একটি বিষয় দিয়েছেন দিদিমনি। নিজেদের মতন করে লিখছি। লিখে খাতা জমা দেওয়ার পালা,সবাই খাতা জমা দিলো। শুধু তনুকার মুখের দিকে একটু অন্যভাবে তাকালেন দিদিমনি। বললেন পরের দিন সবার খাতা ফেরত দেবেন। তো সেদিনের মতো ক্লাস শেষ করে সকলে বাড়ীর পথে পা বাড়ালাম। স্কুলের ছুটির সময় কিছু অন্য স্কুলের ছেলে গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতো। বন্ধুরা সব মজা করতে কাউকে জাম্বো বা কাউকে দাদাভাই এসব বলতো মজা করে। আমাদের বন্ধু গ্রুপের মধ্যে ছিলো তনুকা, আর তার জন্য বাইরে অপেক্ষা করতো উৎসবদা। পুজো তখন আসবে আসবে আর ওদের প্রেম তখন সবে তিনমাসের,তাই দুজনের নানা প্ল্যান থাকতো। আমাদের সাথে কিছু কিছু শেয়ার করতো তনুকা। দুজনে মিলে সাইকেলে করে বাড়ী ফিরতো,প্রতিমা তৈরী দেখতে যেতো,প্যান্ডেলের প্রস্তুতি দেখতে যেতো এসব গল্প বলতো। এরকম বাড়ী ফেরার সময়ে বাংলা দিদিমণির সাথে দেখা,দিদিমনি তনুকাকে দেখে দাঁড় করালেন আর বললেন দেখো ক্লাস নাইনে পড়ছো,পড়াশোনাটা ঠিক করে করো একটু। উৎসবদা তো পালাতে যাচ্ছিলো,দিদিমনি ওনাকেও দাঁড়াতে বলেন। বললেন যেটা বলবো আশা করি দুজনেরই কাজে লাগবে। তনুকার পড়াশোনাতে মনোযোগ কমছে দিন দিন,দুজন দুজনের জন্য আছো এই ভরসাটুকু দিয়ে নিজেদের মধ্যে পড়াশোনা নিয়ে আলোচনাটা বাড়াও। নিজের পায়ে দাঁড়াতে গেলে পড়াশোনা খুব দরকার। তনুকা বললো বুঝেছি ম্যাম আমি ভাব সম্প্রসারণের খাতায় খুব ভালো লিখতে পারিনি। দিদিমনি বললেন ভালো লিখতে ঠিক পারবে তার জন্যই মনটা দিও পড়াশোনাতে। উৎসবদা মাঝে বলে উঠলো দিদিমনি পুজোটা চলে গেলে আমরা ভালো করে পড়বো। কথা দিলাম ম্যাম এরপর আপনার কোনো অভিযোগ থাকবে না তনুকাকে নিয়ে। দিদিমনি বললেন কথা দিলে কিন্তু! মনে রেখো। যাও এখন যেখানে যাচ্ছিলে। আপনিও চলুন না দিদিমনি আমাদের সাথে। না না তোমরা যাও,তনুকাকে ভালবাসি বলে বললাম কথাগুলো। আপনি বলেই এত ভালো করে বোঝালেন দিদিমনি। অন্য কেউ হলে বাড়ীতে কমপ্লেইন করে দিতো। চলুন না ম্যাম কাশ ফুলের বনে গিয়ে একটু বসি। জীবনে চলার পথে কোথাও ভুল হলে আপনি না হয় শুধরে দেবেন। সেই দিনের পর মাঝে মাঝেই ওরা দুজন দিদিমণির বাড়ীতে যেতো পড়াশোনাতে কোনো অসুবিধে হলে। স্কুল শেষ হবার পর উৎসব দা ভর্তি হয় ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউটে আর তনুকা ভর্তি হয় কেমিস্ট্রি অনার্স নিয়ে। ওদের বিয়েতেও দিদিমনি অনুঘটকের কাজ করেছিলেন। আজও দিদিমণির সাথে ওদের যোগাযোগ আছে। জমিয়ে সংসার করছে দুজনে। পুজোর প্রেম শুধু যে প্যান্ডেলে ঘোরা আর ঠাকুর দেখার জন্যে নয় সেটা ওরা প্রমাণ করে দিয়েছিলো। দিদিমণির খুব কাছের মানুষের মধ্যে আমাদের কয়েকজনের সাথে তনুকা এমনকি উৎসবদাও আছে আজ পর্যন্ত। দিদিমনি বলেন তোরা সত্যিই আমার গর্ব।স্কুলের সেই দিনগুলো নিঃসন্দেহে সোনায় মোড়া দিন ছিলো। ©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শিরোনাম - ভাব সম্প্রসারণ
✍️ ডা:অরুণিমা দাস

স্কুলে যখন পড়তাম তখনকার একটা ঘটনা মনে পড়ে গেলো। ক্লাস তখন নাইন,বাংলা ক্লাস চলছে। ভাব সম্প্রসারণের জন্য একটি বিষয় দিয়েছেন দিদিমনি। নিজেদের মতন করে লিখছি। লিখে খাতা জমা দেওয়ার পালা,সবাই খাতা জমা দিলো। শুধু তনুকার মুখের দিকে একটু অন্যভাবে তাকালেন দিদিমনি। বললেন পরের দিন সবার খাতা ফেরত দেবেন। তো সেদিনের মতো ক্লাস শেষ করে সকলে বাড়ীর পথে পা বাড়ালাম। স্কুলের ছুটির সময় কিছু অন্য স্কুলের ছেলে গেটের বাইরে দাঁড়িয়ে থাকতো। বন্ধুরা সব মজা করতে কাউকে জাম্বো বা কাউকে দাদাভাই এসব বলতো মজা করে। আমাদের বন্ধু গ্রুপের মধ্যে ছিলো তনুকা, আর তার জন্য বাইরে অপেক্ষা করতো উৎসবদা। পুজো তখন আসবে আসবে আর ওদের প্রেম তখন সবে তিনমাসের,তাই দুজনের নানা প্ল্যান থাকতো। আমাদের সাথে কিছু কিছু শেয়ার করতো তনুকা। দুজনে মিলে সাইকেলে করে বাড়ী ফিরতো,প্রতিমা তৈরী দেখতে যেতো,প্যান্ডেলের প্রস্তুতি দেখতে যেতো এসব গল্প বলতো। এরকম বাড়ী ফেরার সময়ে বাংলা দিদিমণির সাথে দেখা,দিদিমনি তনুকাকে দেখে দাঁড় করালেন আর বললেন দেখো ক্লাস নাইনে পড়ছো,পড়াশোনাটা ঠিক করে করো একটু। উৎসবদা তো পালাতে যাচ্ছিলো,দিদিমনি ওনাকেও দাঁড়াতে বলেন। বললেন যেটা বলবো আশা করি দুজনেরই কাজে লাগবে। তনুকার পড়াশোনাতে মনোযোগ কমছে দিন দিন,দুজন দুজনের জন্য আছো এই ভরসাটুকু দিয়ে নিজেদের মধ্যে পড়াশোনা নিয়ে আলোচনাটা বাড়াও। নিজের পায়ে দাঁড়াতে গেলে পড়াশোনা খুব দরকার। তনুকা বললো বুঝেছি ম্যাম আমি ভাব সম্প্রসারণের খাতায় খুব ভালো লিখতে পারিনি। দিদিমনি বললেন ভালো লিখতে ঠিক পারবে তার জন্যই মনটা দিও পড়াশোনাতে। উৎসবদা মাঝে বলে উঠলো দিদিমনি পুজোটা চলে গেলে আমরা ভালো করে পড়বো। কথা দিলাম ম্যাম এরপর আপনার কোনো অভিযোগ থাকবে না তনুকাকে নিয়ে। দিদিমনি বললেন কথা দিলে কিন্তু! মনে রেখো। যাও এখন যেখানে যাচ্ছিলে। আপনিও চলুন না দিদিমনি আমাদের সাথে। না না তোমরা যাও,তনুকাকে ভালবাসি বলে বললাম কথাগুলো। আপনি বলেই এত ভালো করে বোঝালেন দিদিমনি। অন্য কেউ হলে বাড়ীতে কমপ্লেইন করে দিতো। চলুন না ম্যাম কাশ ফুলের বনে গিয়ে একটু বসি। জীবনে চলার পথে কোথাও ভুল হলে আপনি না হয় শুধরে দেবেন। সেই দিনের পর মাঝে মাঝেই ওরা দুজন দিদিমণির বাড়ীতে যেতো পড়াশোনাতে কোনো অসুবিধে হলে। স্কুল শেষ হবার পর উৎসব দা ভর্তি হয় ইন্ডিয়ান স্ট্যাটিসটিকাল ইনস্টিটিউটে আর তনুকা ভর্তি হয় কেমিস্ট্রি অনার্স নিয়ে। ওদের বিয়েতেও দিদিমনি অনুঘটকের কাজ করেছিলেন। আজও দিদিমণির সাথে ওদের যোগাযোগ আছে। জমিয়ে সংসার করছে দুজনে। পুজোর প্রেম শুধু যে প্যান্ডেলে ঘোরা আর ঠাকুর দেখার জন্যে নয় সেটা ওরা প্রমাণ করে দিয়েছিলো। দিদিমণির খুব কাছের মানুষের মধ্যে আমাদের কয়েকজনের সাথে তনুকা এমনকি উৎসবদাও  আছে আজ পর্যন্ত। দিদিমনি বলেন তোরা সত্যিই আমার গর্ব।স্কুলের সেই দিনগুলো নিঃসন্দেহে সোনায় মোড়া দিন ছিলো।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস



সোমবার, ২৬ আগস্ট, ২০২৪

শিরোনাম - গোপালের স্বাদবদল✍️ ডা:অরুণিমা দাস

শিরোনাম - গোপালের স্বাদবদল
✍️ ডা:অরুণিমা দাস 

দিয়ার ঠাকুমা রমা দেবী গোপালের বড়ো ভক্ত।নিয়মিত গোপালের পুজো করেন নিষ্ঠাভরে,দিয়া পাশে বসে দেখে।গোপালের সামনে সাজানো ফল,মিষ্টি দেখে দিয়া একদিন ঠাকুমাকে জিজ্ঞেস করে আচ্ছা ঠামি গোপাল দাদা ফল,নাড়ু এসব কেনো খায়?দাদা তো আমার মত ম্যাগি,চিপস খেতে পারে বলো!!ঠামি শুনে বলেন চুপ করো দিদিভাই,গোপাল সবসময় ফল,নাড়ু,মাখন এসবই খেতে ভালোবাসে।দিয়া সব শুনে চুপ থাকলো। 

জন্মাষ্টমী উপলক্ষে দিয়াদের বাড়িতে বেশ বড়ো করে পুজো হয়।সকাল থেকেই পুজোর জোগাড় করছে ঠাকুমা আর দিয়ার মা।পুরোহিত মশাই এসে জোগাড়যন্ত্র সব ঠিক আছে কিনা দেখছিলেন, হঠাৎ একটা থালার দিকে চোখ যেতেই আঁতকে উঠে বললেন একি অনাচার রমা দেবী??রমাদেবী হাতজোড় করে বললেন কোনো ত্রুটি হয়েছে কী??পুরোহিতমশাই বললেন ঘোর অনাচার হয়েছে।গোপালের প্রসাদে ম্যাগি আর চিপস,এসব কি হচ্ছে??চেঁচামেচি শুনে দিয়ার মা বাবা ছুটে এলেন।দিয়ার মা সব দেখে বললেন এটা দিয়ারই কাজ।পাশের ঘর থেকে কান ধরে দিয়াকে নিয়ে এলেন,বললেন তুমি এসব করেছ তো!!যাও ওই ম্যাগীর প্লেট আর চিপস সব তুলে আনো।মায়ের কাছে বকুনি খেয়ে কাঁদোকাঁদো মুখে প্লেটগুলো তুলে আনলো।দেখলো তার গোপাল দাদার মুখ চোখ কেমন শুকনো হয়ে গেছে।মনে মনে বললো কি করবো বলো দাদা??আমি জানি তুমি এসব খেতে চাও,কিন্তু ওরা তোমায় এসব দিতে দেবে না। পুরোহিত মশাই পুজোর জায়গা শুদ্ধ করে পুজোতে মন দিলেন।গোপালের আসনে ফুল দেওয়ার সময় মনে হলো ওনার হাতে দুফোঁটা জল পড়লো।সবাই তাকিয়ে দেখে গোপালের চোখে জল।দিয়া সেটা দেখে বললো প্রতিদিন এক খাবার খেতে ভালো লাগেনা দাদার,গোপাল দাদাকে তাই আমি ম্যাগি দিয়েছিলাম।হঠাৎ পুরোহিত মশাই বললেন রমা দেবী,একবার ম্যাগীর প্লেটটা রাখুন তো সামনে।একথা শুনে দিয়া একছুটে ম্যাগীর প্লেটটা নিয়ে এসে গোপাল দাদার সামনে রাখলো আর মনেমনে বললো খাও দাদা।সবাই তাকিয়ে দেখলো গোপালের মুখে হাসির ঝিলিক।ঠাকুমা দিয়াকে জড়িয়ে ধরে বললেন এতদিন পুজো করেও গোপালের মনের কথা বুঝতে পারিনি দিদিভাই, তুমি বুঝে গেলে কি করে??দিয়া বললো দুপুরে যখন তুমি ঘুমাও তখন তো আমি ঠাকুরঘরে এসে কত গল্প করি গোপাল দাদার সাথে।সবাই শুনে খুব হাসতে লাগলো।দিয়ার বাবা বলে ওঠেন তাহলে গোপাল দাদারও স্বাদ বদল করতে ইচ্ছে করে মাঝে মাঝে,কি বলো দিয়া??দিয়া বললো হ্যা বাবা,ওই জন্য ফল মিষ্টি সরিয়ে ম্যাগি দিয়েছিলাম।আর দিয়ার গোপাল দাদা প্রাণভরে দিয়াকে আশীর্বাদ করে বললেন এভাবেই সবার ইচ্ছে গুলোকে পূরণ করার চেষ্টা কোরো,যেভাবে আমার ইচ্ছে পূরণ করলে।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস 

সোমবার, ২০ মে, ২০২৪

শিরোনাম - গেম অফ নেচার✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - গেম অফ নেচার
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

আজকের ব্রেকিং নিউজ! আর কয়েক ঘণ্টা পর পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। মোবাইলে এটা শুনেই রায়ান ভাই ঋতানকে ডাকলো, উঠে পড় ভাই। আমাদের জিনিসপত্র গুছিয়ে নিতে হবে। কেনো রে দাদা? কি হয়েছে? আরে আজ বিকেলে পৃথিবী ধ্বংস হয়ে যাবে। চটপট গুগল ড্রাইভে মুভি আর স্টোরি বুকগুলো আপলোড করে নে। আর হ্যা ব্যাকপ্যাক টা গুছিয়ে নে, অবশ্যই ওয়াটার প্রুফ কভার টা নিবি। আমরা তো তলিয়ে যাবো জলের তলায়, সেখানে এগুলোই হয়তো বেচেঁ থাকবে আমাদের স্মৃতি হিসেবে। কিন্তু দাদা তুই কোথায় যাবি আমায় ছেড়ে? কেঁদে উঠলো ঋতান। আরে কোথাও যাবোনা রে! আমরা তো একসাথে জীবাশ্ম হয়ে বেচেঁ থাকবো। শুনে আরো জোরে দাদাকে জড়িয়ে ধরলো রিতান। দাদা আমার ভিডিও গেমস গুলো? ওসব ভুলে যা ভাই। একটু পরেই আর্থ ডিসাস্টার গেম শুরু হবে। মুখে হাসি ফোটালেও রায়ান মনের মধ্যে গুমরোতে থাকে, ভাইকে ছেড়ে থাকবে কি করে সে? আর বিকেলের খেলার মাঠ টা? বন্ধুগুলো কেও হারিয়ে ফেলতে হবে। ল্যাপটপ খুলে সব ফ্রেন্ডস কে মেইল করতে থাকে। একটা গুগল মিট অ্যারেঞ্জ করার প্ল্যান করে। মিটিংয়ে আলোচনা হতে থাকে আজ যদি সবাই ফ্ল্যাট বাড়ি না তুলে গাছ গুলোকে বাঁচতে দিত হয়তো পৃথিবী ধ্বংস হতোনা। কেউ কেউ আবার মঙ্গল গ্রহে যাওয়ার কথা বলতে থাকে। রায়ান বলে অনেক দেরি হয়ে গেছেরে। দেখ বাইরে আকাশটা কেমন থম মেরে গেছে। দুর্যোগের পূর্বাভাস এটা। আকাশে একটা লাল আলোর রেখা আর তার সাথেই হঠাৎ করে ল্যাপটপ কানেকশন অফ হয়ে যায়। বন্ধুগুলো সব হারিয়ে যেতে থাকে গুগল মিট থেকে। রায়ান চেঁচিয়ে উঠল, রীতান তুই কোথায়? পৃথিবী বোধহয় ভাসতে চললো। রীতান ব্যাকপ্যাক নিয়ে দাদার পাশে এসে দাঁড়ালো। মুখ টা ভয়ে শুকিয়ে গেছে। বাবা মায়ের ডিভোর্সের পর দাদাই তার কাছে বাবা মা সব। সমুদ্রের জল আগ্রাসী হয়ে ধেয়ে আসছে, ডুবতে শুরু করেছে পৃথিবী, রেড অ্যালার্ট জারি হয়েছে। ল্যাপটপ আর অন হলো না। মোবাইলের স্ক্রিনে ফুটে উঠছে অন্যান্য জায়গা ধ্বংস হবার ছবিগুলো। রায়ান তার লাইব্রেরীটা ঘুরে দেখে নেয়,বইগুলোকে আর তো দেখতে পাবেনা কোনোদিন। পারলে বইগুলো নিয়েই না হয় ডুবত অতল জলের গভীরে। জল ঢুকতে শুরু করেছে ঘরে,পকেটে ফোনটা নিয়ে নিজের প্রিয় লেখার ডায়েরিটা নিয়ে বুকে জড়িয়ে ধরে রায়ান। পাতা খুলে লিখতে শুরু করে,
" ধ্বংস হচ্ছে পৃথিবী,সৃষ্টিরা বেচেঁ থাক নিজের মতো করে
অতল জলের গভীরে খুঁজো রায়ান ঋতান থাকবে জীবাশ্মের ভিড়ে"!
কোনরকমে এই দুটো লাইন লেখার পরই অতল এক গহ্বরে হারিয়ে যেতে থাকে রায়ান,একটা হাতে ডায়েরি অন্য হাতে ভাইকে শক্ত করে জড়িয়ে ধরা। বিশাল জলরাশি সব গ্রাস করে নিচ্ছে স্থলভাগকে। প্রকৃতির ধ্বংসলীলার কাছে যে মানুষ নিমিত্ত মাত্র। জলের গভীরে তলিয়ে যাওয়ার সময় ভাইয়ের মুখের দিকে চেয়ে শুধু বলে,ভালো থাকবো আমরা যেখানেই থাকবো। একেই বোধহয় বলে রিভেঞ্জ অফ নেচার।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস



বুধবার, ১০ এপ্রিল, ২০২৪

ঈদের চাঁদ ✍️ডা:অরুণিমা দাস

ঈদের চাঁদ 

✍️ডা:অরুণিমা দাস 


কই রে! কই গেইল্যি রহিমের মা! আয় বাইরে আইস্যা দেইখ্যা যা কি আনছি! আব্দুল ডাক দেয় তার বিবি হালিমাকে। বাড়ীর মধ্যে থেকে হালিমা বেরিয়ে আসে,বলে এত চেঁচাও ক্যান্? কও কি হইছে কি? আবদুল বলে আজ এক জায়গায় মজুরের কাম কইরা বেশ কিছু ট্যাহা পাইছিরে বিবি। তাই রহিমের লাইগ্যা কিছু ফল আর মাংস আনছি। ইফতারে তো কুনোদিন ছেলেটারে ভালো কিছু খেতে দিতে পারি নাই রে। আগে বসো দাওয়ায়,খানিক সময় জিরোয় লও দেখি। খালি কাম আর কাম! দিন দিন শরীল খান ভাইঙ্গা পড়তাসে,সে দিকে খেয়াল আছে তোমার? আরে এতো কষ্ট কইরা রহিম রে পড়াইতাসি, ও বড়ো হইলে আমাদের কষ্ট কমবে রে। হ্যা আব্বু,আমি বড়ো হই,অনেক বড় চাকরী করুম,তোমারে আর আম্মুরে শহরে নে যাবো। কুনো কষ্ট থাকবেনা আর আমাদের। আল্লাহর কাছে দোয়া করি বাপ,তোর কথাখান যেনো সইত্য হয়। এর মাঝেই হালিমা ফল আর লেবুর জল এনে হাজির করে, বলে চলো নামাজ পইর‍্যা ইফতার কইর‍্যা লও। আমি তারপর খাইয়া মাংস রান্না কইরবো। রহিম ভালোছেলের মত ফল আর সরবত খেয়ে নেয়। তারপর দাওয়ায় গিয়ে পড়তে বসে। উঠোনে হালিমা রান্না করতে যায়,আব্দুল ওখানে গিয়ে বসে। হালিমা বলে এই মাসে যে ঘরখান সারাইবে বলছিল, খেয়াল আছে তোমার? হ,আছে রে। এক খান ঘরই তো মোদের, কইষ্ট হয় রে জানি। সেটাও ভাইঙ্গা পড়সে। সেই ঘরেই রাতে রহিম পড়ে, আমরা কথা বইললে ওর অসুবিধা হয় রে,জানি। গরম কাইলটা ভাবতাসি আমরা দুজন বাইরে উঠানে মাদুর বিছায়া শুইয়া পড়বো। ঘরখান ছোট তো কি হইছে বল? খোদা এত বড় আকাশ দিছে, তার নিচেই শুইয়্যা আমরা গল্প করে কাটাইয়া দিবো। কি বলিস বিবি? হ,বুঝছি!টাকার টানাটানি যা। এই সময়ে তুমিই বা কোথায়  টাইক্যা পাইবে  বলো? রোজতো কাম ও জুইট্যে না তোমার। আরও কিছু পয়সা জমাইরে, শীত আইস্যার আগেই ঘরটা ঠিক কইরা দিবো,কইথ্যা দিলাম। আল্লাহর দয়ায় আজ রহিমের মুখে ফল তুইল্যা দিতে পারসি যখন, ওনার দয়াতেই একদিন ঘরটাও সাইর‍্যা ফেলাইবো দেখিস। হ তাই যেনো হয়, রোজ তো তাই দোয়া করি। এখন না হয় ঈদের চাঁদ দেইখ্যার অপেক্ষায় আকাশের নিচেই রাতে ঘুমাইয়া পইড়বো। দুরে কোথাও থেকে গান ভেসে আসে ওদের কানে, "নীড় ছোট ক্ষতি নেই, আকাশ তো বড়ো।"
স্বপ্ন সত্যি হোক হালিমা আর আবদুলের। শীতের আগে যেনো ঘর ঠিক করে নিতে পারে ওরা আর রহিম মানুষের মতো মানুষ হোক, এই প্রার্থনাই করি ঈশ্বরের কাছে। খুব ভালো কাটুক ওদের রমজানের বাকী কটা দিন আর খুশিতে ভরে উঠুক ঈদ।
                      ✍️✍️✍️✍️✍️✍️

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস



সোমবার, ৪ ডিসেম্বর, ২০২৩

ক্যান্টিনের অন্দরে✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 ক্যান্টিনের অন্দরে
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

কলেজে ভর্তি হবার পর নতুন নতুন বন্ধুদের সাথে গল্প আড্ডা মারার জন্য একদম উপযোগী জায়গা ছিলো ক্যান্টিন। কলেজে উঠে একটু বড়ো বড়ো ভাব এসেছে তখন। ছেলেদের জন্য লুকিয়ে তামাক সেবন করার উত্তম জায়গা ছিলো ক্যান্টিন। অনেক টুকরো টুকরো ঘটনা মনে আসছে। একদিন আমাদের এক বন্ধু শ্রেয়ান সিগারেটটা ধরিয়ে টান দেবে এমন সময় মাথায় এক গাট্টা আর কানমলা খেলো। এসবের চোটে বিষম খেয়ে ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে দাদা দাড়িয়ে আছে। আমরা উল্টো দিক থেকে ওর দাদা কে আসতে দেখেছিলাম কিন্তু দাদা আমাদের হাত দেখিয়ে চুপ থাকতে বলেছিল। সেদিনের পর থেকে শ্রেয়ান ক্যান্টিনকে সেফ মনে করতো না, কলেজের বাথরুমটা ওর জন্য সেফ ছিলো। 
আর আহমেদ কলেজের ক্যান্টিনে আমরা বন্ধুরা মিলে খেতে গেছি, ছটা মতন ফিশ ফ্রাই অর্ডার করেছি আর সাথে চা। আমি চা খাই না বলে বন্ধুরা পেছনে লাগছে কমপ্ল্যান খাবি বোর্নভিটা খাবি এসব বলছে। আমি নিরুত্তর হয়ে ফিশ ফ্রাই খাচ্ছি। সকলের খাওয়া হলে বিল এলো। বিল দেখে একটু অবাক লাগলো, বেশ কম। বিল মিটিয়ে সবাই মেনু দেখি ফিশ ফ্রাই এর জায়গায় ফিশ ফিঙ্গারের দাম ধরেছে। আমরা তাড়াতাড়ি করে ব্যাগ পত্র গুটিয়ে পালাচ্ছি, ওরা বোধয় বুঝতে পেরেছিল। অনেকবার ডেকেছিল কিন্তু আমরা তখন হাওয়া। পরে যদিও ওই ক্যান্টিনের সকলকে কফি আর রোল খাইয়েছিলাম আমরা সবাই। তবে আমার জন্য চায়ে পে চর্চা টা কফি পে চর্চা তে বদলে গেছিলো।
এরপর এম বি বি এস পড়তে ঢুকে মেডিক্যাল কলেজের ক্যান্টিনে প্রচুর গল্প জমে আছে পাঁচ বছরের। একদিন বন্ধুরা সকলে মিলে খেতে বসেছি চিকেনে দেখি বেশ কয়েকটা আরশোলা। আমরা চেঁচামেচি শুরু করেছি ক্যান্টিনের দাদা শান্ত স্বরে বললো আরে চাইনিজ ফুড তো মাঞ্চুরিয়ান, দু একটা আরশোলা থাকলে কি ক্ষতি? আমরা রেগে গিয়ে বেশ ঝাড়লাম দাদাকে। পরে অবশ্য ভালো চিকেন পাকোড়া খাইয়েছিল আমাদের ক্যান্টিনের দাদা। বেশ ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছিলো পাঁচ বছরে। তবে দাদা বলতো তোরা সব মা বাবার স্বপ্ন, পড়াশোনা ভালো করে করিস। কলেজে উঠেছিস বলে নিজেদের বখিয়ে দিসনা। দাদার কথা গুলো তখন বুঝতে না পারলেও এখন উপলব্ধি করতে পারি একটু একটু।
তারপর পোস্ট গ্র্যাজুয়েশনে পড়তে ঢুকে প্রথম ছমাস কোভিডের জন্য ক্যান্টিনে সেরকম যাওয়া হতো না। আর আন্ডার গ্র্যাজুয়েট জীবনের থেকে পোস্ট গ্র্যাজুয়েট জীবন টা অন্য রকম ছিলো। এখানে সবাই কলিগ বন্ধু কেউ নয় বুঝলাম। তাও ডিউটির চাপে যখন ফাঁকা পেতাম কাকিমার ক্যান্টিনে চলে যেতাম আড্ডা দিতে। কাকিমা খুব আন্তরিক ভাবে আমাদের আপ্যায়ন করতেন। আড্ডা দিতে বসে কার ওটি তে কোন কেস ঘেটেছে আর কিভাবে ম্যানেজ করেছে সেসব গল্প হতো। স্যার ম্যাডামদের নতুন নতুন নাম দেওয়া হতো, সেসব নিয়ে দীর্ঘ আলোচনা চলত কার জন্য কোন নামটা মানাবে। এই ভাবেই তিনটে বছর কেটে গেলো। তবে ওটিতে ব্যস্ত থাকলে কাকিমাকে একটা ফোন করে দিলেই খাবার এসে যেতো। 
আর এখন সময়ের অভাবে খুব একটা ক্যান্টিনে যাওয়া হয়ে ওঠেনা। ক্যান্টিনের পাশ দিয়ে যাওয়ার সময় পুরনো কথাগুলো মনে পড়লে বেশ আনন্দে ভরে ওঠে মনটা।

©️রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

সোমবার, ৬ নভেম্বর, ২০২৩

শিরোনাম-বৌ হরণ✍️ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম-বৌ হরণ
✍️ডা: অরুণিমা দাস


আজ সেনগুপ্ত বাড়িতে মহা সমারোহ। এবাড়ির ছোট ছেলে বিজয়কৃষ্ণের আজ বিয়ে। পাশের পাড়ার শ‍্যামলীর সাথে। বাড়িতে খুব হৈচৈ। পুরনোদিনের বাড়ি। বাবা, কাকা, জেঠ‍্যা কাজের লোক সবাই মিলে প্রায় কুড়িজন মতো লোকজন এবাড়িতে বসবাস করে।ওরা নিজেরাও তো ভাইবোন অনেক। বিজয়কৃষ্ণ কলকাতায় থেকে পড়াশোনা করে । গরমের ছুটিতে বাড়িতে এসেছে। মা আগেই মেয়ে দেখে রেখে দিয়েছিল। তাই ছুটিতে আসার সাথে সাথেই বিয়ে। মেয়েকে একবার দেখেনি পর্যন্ত। তখন অবশ্য এমনই হতো।


যাইহোক বিয়ে তো মিটে গেল বেশ ভালোভাবেই।  কিন্তু দুজনেই বেশ ছোট। তাই বিয়ের পরেই পাঠিয়ে দেওয়া হলো মেয়েকে বাপের বাড়িতে। বড় হবে , আর এদিকে বিজয়ের লেখাপড়া শেষ হবে , তখন মেয়ে আবার শশুর বাড়িতে আসবে। তখনকার দিনে এমন হতো। বিজয়ের ও তাই হলো ।


কিন্তু নিজের বিয়ে করা বৌকে একবার চোখের দেখাও দেখতে পেলো না কলকাতায় চলে যাওয়ার সময়। বড়দের সামনে দেখা করা  যেতনা তখন।বড় লজ্জার ব‍্যাপার ছিল। এদিকে নতুন বৌ রেখে যেতেও ইচ্ছা করছে না।  কিন্তু কি আর করা । বাধ‍্য হয়ে চলে যেতে হলো। কিন্তু মন তো বসছে না কিছুতেই কলকাতায়। তাই সে প্লান করলো বৌ চুরি করবে।


কিন্তু প্ল্যান তো একা করা যায় না। বিজয় বন্ধুদের জানালো ব্যাপারটা। বন্ধুরা সবাই মিলে উপায় ভাবতে লাগলো। কেউ বললো চল কালকের ট্রেনে তোর শ্বশুর বাড়ী। গিয়ে নিয়ে আসবি বউ কে। বিজয় বললো না এরকম হয় না, চুরি মানে চুরি ই করবো। ভাবতে দে একটু। সারারাত ধরে ভেবে বিজয় প্ল্যান করলো ছদ্মবেশে যাবে শ্যামলী দের বাড়ীতে। পরদিন বিজয় ফকির সেজে আর এক বন্ধুকে মেয়ে সাজিয়ে চললো শ্বশুর বাড়ী। বিজয় শুনেছিল শ্বশুরের দয়ার শরীর, কাউকে কখনো ফেরান না। পরদিন দুপুরে হাজির হলো শ্বশুর বাড়ী। দরজা খুললো শ্যামলী নিজেই। ফকির বাবা কে দেখে প্রণাম করে বললো আসুন বাবা ভিতরে আসুন। ফকির বলে উঠলো কিরে বেটি তোর মুখ এত শুকনো কেনো? কিছু হয়েছে নাকি? শ্যামলী কিছুক্ষন চুপ থেকে বললো হ্যা বাবা,আমার মনের মানুষ চলে গেছে অনেক দূরে। মন বড্ড খারাপ তার জন্য। কিন্তু আপনি কি করে জানলেন?


ফকির বললেন আমি সব জানি বেটি। বল কোথায় আছে তোর মনের মানুষ?


- সে তো শহরে আছে বাবা। অনেক দূরের পথ। আমি জানিও না কি ভাবে যাবো।


- আচ্ছা আমি আর আমার মেয়ে বেরিয়েছি তীর্থে যাবো বলে। আজ তো অনেক বেলা হলো। একটু জিরিয়ে নিয়ে কাল আবার বেরোব। তোর বাসায় একটু থাকতে দিবি?


ওদের কথার মাঝে শ্যামলীর বাবা এসে হাজির। ফকির কে দেখে প্রণাম করে বললেন কি চাই বাবা? শ্যামলী বললো ফকির বাবা আর ওনার মেয়ে আশ্রয় চান আজকের রাতটা। ওনারা তীর্থে যাবেন। শ্যামলীর বাবা বললেন হ্যাঁ কোনো অসুবিধে নেই। তুই যা তোর মাকে গিয়ে বল এনাদের খাবার ব্যবস্থা করতে। আমি সেরেস্তায় গেলাম। শ্যামলী ঘাড় নাড়লো। মাকে ডাক দিল। কাজের লোক নিয়ে এসে তাদের খাবার খেতে দিল শ্যামলীর মা। খাওয়া শেষে ফকির একটা কাগজ গুঁজে দিলো শ্যামলীর হাতে। শ্যামলী আড়ালে গিয়ে খুলে দেখলো লেখা আছে রাতে দরজা খুলে রেখো, আসবে তোমার মনের মানুষ। রাতের বেলা সকলে খাওয়া দাওয়া সেরে ফকির বাবা আর তার মেয়েকে অতিথি সদনে পাঠিয়ে ঘুমোতে গেলো। ঠিক রাত বারোটার সময় শ্যামলীর দরজায় টোকা পড়লো। দরজা ভেজানো ছিলো। দরজা খুলে দেখে ফকির বাবার মেয়ে দাড়িয়ে আছে। চট করে মেয়েটা ঘরে ঢুকে শ্যামলীকে একটা বোরখা দিলো।বললো এটা পরে নাও। নিচে বাগানে ফকির বাবা অপেক্ষা করছেন, যাও তার কাছে। শ্যামলী বললো কেনো? বেশি কথা বলো না, পরো বোরখাটা আর বেরিয়ে পড়ো। সকলের কাগজের লেখাটা মনে রেখো। আমায় বিশ্বাস করতে পারো। নিচের দারোয়ানদের ঘুম পাড়িয়ে রাখা আছে। তারা জেগে ওঠার আগে বেরোতে হবে তোমাদের। শ্যামলী বোরখা পরে বাগানে হাজির হয়। ফকির বাবা পেছন করে দাঁড়িয়ে ছিলো। শ্যামলী বললো বাবা আমায় ডেকেছেন? ফকির মুখ ঘুরিয়ে তাকালো। শ্যামলী অবাক! কোথায় ফকিরের গোঁফ দাড়ি? এযে তার মনের মানুষ। কিছু বলতে যাবে, ফকির তার মুখ চেপে বললো চলো শেষ ট্রেন টা ধরতে পারলে আমাদের আর কেউ ধরতে পারবে না। বিয়ের পর বৌ ছেড়ে থাকার থেকে বউ চুরি ঢের ভালো আর চুরি বিদ্যা মহা বিদ্যা যদি না পড়ে ধরা। শ্যামলী আর ফকির বাবা রাতের অন্ধকারে স্টেশনের দিকে রওনা হলো, বিজয়ের মুখে হাসির রেখা, শেষ অব্দি বউ চুরিতে সাকসেসফুল হলো সে।


©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস



বৃহস্পতিবার, ১৯ অক্টোবর, ২০২৩

মর্ত্যে আগমন লাইভ

মর্ত্যে আগমন লাইভ
✍️ ডা:অরুণিমা দাস

কিরে তোরা সকলে তৈরী হলি? উমা দেবী শাড়ির আঁচল ঠিক করতে করতে বলেন। মা আমার বাটার ফ্লাই ক্লিপ টা খুঁজে পাচ্ছি না! কোথায় রেখেছো গো? লক্ষ্মীর কথায় উমাদেবী ভ্রু কুঁচকে বললেন দেখো গে যাও তোমায় ভাইবোনদের ঘরে। আমি কি সব কিছুর ঠেকা নিয়ে বসে আছি? লক্ষ্মী চুপ করে সরে গেলো। কার্তিক চন্দ্র এসে বললো হাই মাম্মা! হেয়ার ট্রিটমেন্ট করিয়েছি দেখো তো কেমন হয়েছে? উমা দেবী একবার তাকিয়ে চমকে উঠে বললেন ওগো শুনছো দেখে যাও তোমার ছেলের কাণ্ড! ওদিকে উনি তো ছয় দিনের প্রস্তুতি নিচ্ছেন, গঞ্জিকা সেবনের সব জিনিস পত্র সংগ্রহ করছে নন্দী ভৃঙ্গী। গিন্নীর ডাক শুনে জটা জুটো সামলে দৌড়ে এসে বললেন কি হয়েছে উমা? 
কি হয়েছে মানে? দেখো কাতু কি করেছে? চুলটাকে রংচং দিয়ে নষ্ট করেছে। এসব ওই মর্ত্যের ছোড়া গুলোকে দেখে শিখে এসেছে নিশ্চয়ই। না না মাম্মা, কার্তিক বললো। এই ট্রিটমেন্টটা আমায় বিশু মামা বলেছেন। এতে নাকি চুল ভালো থাকে। তোমার বিশু মামা কে দেখছি, ফিরে আসি মর্ত্য থেকে। বাবা খুব বাজে লাগছে কি? না রে, মডার্ন হবি, কিন্তু মন যেনো নিষ্পাপ থাকে। খালি একটু সজারুর কাটার মত লাগছে তোর মাথাটা। ওহ বাবা, ওটাকে স্পাইক বলে। যাক গে আমি তো ছাই মেখে থাকা মানুষ,অত বুঝিনা বাপু। তোদের সাজতে দেখলে আমার খুব ভালো লাগে রে! কোথায় একটু শাসন করবে তা নয়! উনি আরো তোল্লাই দিচ্ছেন ছেলে কে! আরে গিন্নি চটছো কেনো? আমাদের ছেলে মেয়ে গুলো তো আর অবাধ্য নয়। কদিন একটু মামাবাড়ি গিয়ে আনন্দ করে আসুক না। দাড়াও তোমার আর দুজন বাচ্চার খোজ নিই। তারা কে কি করছে! গনু বাবা কোথায় তুই? এই তো আমি প্রায় তৈরী মা! তোর চোখে এটা কি বাবা? কেনো মা সানগেলাস! ইদুর টা ফিচ ফিচ করে বলে। সেটা কি রে গনু? আরে মাম্মা এটা টাইটান থেকে করানো স্পেশাল সানগ্লাস। ওই মর্ত্যে গিয়ে রোদে রোদে ঘুরে যাতে চোখের ক্ষতি না হয় কিনেছি অনলাইন অর্ডার দিয়ে। তোদের পাশে আমিই বোধয় বড্ড সেকেলে লাগবো। না মা একদম না! তুমি যাই পরো না কেনো ইউনিক লাগে সব সময়, সরু এসে বললো। দেখো তো মা এই হেড ফোন টা কেমন হয়েছে? উমা দেবী বললেন এসব কেনো সরু? আরে মা মর্ত্যে ওই তোমার ভক্তদের ওসব হিন্দি গানের মাইকের শব্দে আমার মাথা ধরে যায়। তাই এই হেড ফোন কানে দিয়ে একটু ইনোভেটিভ কিছু শুনবো মোবাইলে। আচ্ছা আচ্ছা বুঝেছি। তোরা সব ব্যাগপত্র গুছিয়ে নে। অসুর টা ক্যাব বুক করছে। এসে গেলে আমরা রওনা দেব। বলতে বলতে অসুর এসে বললো মা জননী ক্যাব আসতে আধ ঘণ্টা মতো লাগবে। সিংহ কে দেখেই লক্ষ্মী ছুটে এসে বললো এই তুমি আমার ক্লিপ টা মাথায় নিয়েছো কেনো? বা রে! গরমে আমার কেশর গুলো এদিক ওদিক ছড়িয়ে থাকে,কষ্ট হয় না! তাই এটা দিয়ে সেট করলাম কেশর গুলোকে। এখন বেশ আরাম লাগছে। দেখো না মা! এই বনু চল আমার থেকে ক্লিপ নিবি। সরু বললো। সবার কথার শেষে শিবজী বললেন যাও সবাই সব কিছু দেখে নাও। বাবার কথায় সবাই যে যার ঘরে গেলো। উমা দেবী কে বললেন সাবধানে যেও, তোমায় ছাড়া ঘর টা ফাঁকা ফাঁকা লাগবে। ঢং যত, আমি বেরোলেই তো নন্দী ভৃঙ্গিকে নিয়ে গাঁজা সেবন করতে বসবে। আমার কথা কি ভাবো! ভাবলে এসব করতে না! আচ্ছা কম খাবো না হয়, ছাড়তে তো পারবোনা। যাও তোমার ভক্তরা সব অপেক্ষা করছে, সবাইকে এই কটাদিন হাসিখুশীতে মাতিয়ে রেখে আবার ফিরে এসো কৈলাসে। এই বুড়ো অপেক্ষা করবে তোমার জন্য,ছেলে মেয়েদের জন্য। ওই দেখো হর্নের আওয়াজ, ক্যাব বোধয় এসে গেলো। যাও যাও গিন্নী। হ্যা আসি,তুমিও নিজের খেয়াল রেখো। চার ছেলে মেয়ে অসুরদের নিয়ে উমা দেবী উঠলেন গাড়ীতে। শিবজি সকলকে হাসিমুখে সি অফ করলেন। গাড়ী এগিয়ে চললো কৈলাশ থেকে মর্ত্যের পথে।

মা দুর্গা আসছেন বাপের বাড়ী, সকলে তৈরী হয় ওনাকে সাদরে গ্রহণ করার জন্য। শুভ হোক শারদীয়া। খুব ভালো কাটুক পুজো সকলের। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

সোমবার, ১৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৩

বিশ্বকর্মা পুজো স্পেশাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

বিশ্বকর্মা পুজো স্পেশাল
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

ও বিশু দা,সব রেডি তো? গাড়ী টা ঠিক আছে কিনা চেক করে নিয়েছো? হাতিয়া বলে উঠলো। 
- হ্যা চেক করে নিয়েছি সব। তোর ওপর কোনো দায়িত্ব দিয়ে কি আর আমি নিশ্চিন্ত হতে পারি?
- এরকম করে বললে তো? জানো আমি কি করছিলাম?
- কি রাজকার্য করছিলে শুনি? নিজের খাবার গুলো প্যাক করছিলে! এই তো? 
- না গো বিশু দা! আমি তোমার জন্য অনলাইনে এস্পেশাল মাঞ্জা দেওয়া সুতো অর্ডার দিচ্ছিলাম। ডেলিভারির ঠিকানা মর্ত্যে দিয়েছি। 
- বা বেড়ে বুদ্ধি হয়েছে তো তোর! ডায়েট টা  করতে   বলেছিলাম ওই জন্য। বুদ্ধি খোলতাই হচ্ছে তোর। 
- ডায়েট তো সেরকম করিনি বিশু দা! সরস্বতী দি বলেছিল অনলাইনে অর্ডার টা দিতে। দিদি তো এসব অনলাইন জিনিস গুলো ভালো বোঝে। 
- হ্যা তুমি তো আবার দিদি ভক্ত। তা তোমার দিদির এসব অনলাইনে কাজ করার যে সফটওয়্যার সেটা কিন্তু বানায় তোমার এই বিশু দা। বুঝেছ?
- হাতিয়া ঘাড় নেড়ে বললো হ্যা দাদা!
ওদের কথার মাঝে বিশু দাদার ফোনে একটা কল আসে। ফোন খুলে দেখে মা দুর্গার ফোন। বিশু দা বলে হ্যা মা বলুন, এই তো বেরোবো একটু পরেই। আপনার কোনো চিন্তা নেই। কাল গনু আসবে তো! ওর জন্য সব প্যান্ডেল রেডী কিনা, নিরাপত্তা কেমন থাকবে ওর সব দেখে নেবো আজ রাতের দিকে। ওকে খালি অ্যান্টাসিডটা গুছিয়ে পাঠিয়ে দেবেন। আহা! বাছা আমার একটু খেতে না হয় ভালোইবাসে, তা বলে এরকম বলবে তুমি বিশ্বকর্মা? না মা সেটা নয়, সাবধান থাকা ভালো। আপনি কি রাগ করলেন? না বিশু রাগ করিনি। তবে হ্যা বাপু মর্ত্যে গিয়ে আবার বেশি ঘুড়ি লাটাই নিয়ে ব্যস্ত হয়ে যেওনা! ওসব মাঞ্জা সুতো দিয়ে যেনো আমার কোনো ভক্তের ক্ষতি না হয় দেখো। আচ্ছা মা খেয়াল রাখবো। তাহলে বেরিয়ে পড়ো এবার। সাবধানে যেও বাছা। পৌঁছে সরু কে একটা মেসেজ করে দিও। হ্যা মা মেসেজ করে দেবো। রাখি এখন। 
এই হাতিয়া চল চল। গাড়ীতে উঠি। ওখানকার যা রাস্তা ঘাট পৌঁছতে অনেক সময় লাগবে। ভক্তরা না খেয়ে রয়েছে সব। 
-ছাড়ো তো বিশু দা! রাতে তো সব ছাইপাশ খেয়ে পড়ে থাকবে তোমার ভক্ত রা! মাইকের শব্দ আর ওদের উদ্দাম নাচে আমার ঘুমটাই মাটি হবে। সে যাই হোক,ফিরে এসে ঘুমিয়ে নেবো। 
-হ্যা সে যা পারিস করিস,এখন চল বেরোই আমরা। প্যান্ডেলে সকলে অপেক্ষা করছে। 
- চলো বিশু দা। 
একটা বছরের অপেক্ষার পর বেশ ভালোই লাগে খাতির যত্ন পেতে। কি বলো? 
-ভালো বলেছিস হাতিয়া। 
বিশুদা আর হাতিয়া গাড়ীতে উঠে রওনা দিলো মর্ত্যের পথে। ভালো কাটুক বিশ্বকর্মা পুজো সকলের। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শনিবার, ২৯ জুলাই, ২০২৩

স্বপ্ন যদি সত্যি হতো✍️ডা: অরুণিমা দাস

স্বপ্ন যদি সত্যি হতো
✍️ডা: অরুণিমা দাস

সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠেই তাতান বললো,গুড মর্নিং বাঘু! উঠে পড়ুন এবার। বাঘুর কোনো সাড়া না পেয়ে তাতান বিছানা থেকে নেমে ওকে খুঁজতে গেলো। দেখলো বারান্দায় বসে আছে বাঘু, লেজটা খালি নাড়ছে। কিরে? চল! ব্রেকফাস্ট করবি। বাঘু চুপ করে রইলো। তাতান গিয়ে ওর গলা জড়িয়ে বললো চল রে! দেখলো ওর চোখ টা ভিজে আছে। কিরে? বনের কথা মনে পড়ছে? ঘাড় নাড়লো বাঘু। তাতান বললো চল টেবিলে চল। তোর জন্য সারপ্রাইজ আছে, কাল বাবা বলছিলো। তাতানের পিছন পিছন চলতে লাগলো বাঘু। টেবিলের কাছে আসতেই সক্কলে বাঘুকে বললো হ্যাপি টাইগার্স ডে।
দেখ সোনা, তোর জন্য কত আয়োজন, মুখ ভার করে থাকিসনে কিন্তু। বাঘু কেঁদে ফেললো, বললো এসব করে কি হবে বলো তো? সেই ছোটবেলা থেকে তোমরা আমায় মানুষ করছো! গুলির আঘাতে লুটিয়ে পড়া এই অবলা বাঘকে তোমরা বাড়িতে এনে সেবা করে বাঁচিয়ে তুলেছো! এটাই আমার জন্য অনেক গো। আজ আলাদা করে টাইগার্স ডে পালন করে আমার পুরনো দিনগুলো মনে করিয়ে দিও না। তাতান যখন পড়ে, দিনদিন বাঘের সংখ্যা কমে আসছে, সুন্দরবন আর অন্য অভয়ারণ্য গুলোতে, খুব কষ্ট হয় শুনে। মানুষকে বড্ড ভয় লাগে,ভয় লাগে যদি তোমাদের থেকে আমায় কেউ ছিনিয়ে নিয়ে চলে যায়! কে ছিনিয়ে নিয়ে যাবে তোকে? আমি যতদিন আছি ফরেস্ট অফিসারের পদে, কেউ তোকে কোথাও নিয়ে যাবে না, তাতানের বাবা বললেন। এখন আয় তোর জন্য খাবার গুলো রান্না করেছে তোর মা, খেয়ে নিবি আয়। আগে আয় কেকটা কাট। একদম দুঃখ করবিনা। আমরা চেষ্টা চালাচ্ছি যাতে তোদের প্রজাতিটা বিলুপ্ত না হয়ে যায়। বাঘের সংখ্যা যাতে না কমে তার চেষ্টা চলছে বুঝলি বাঘু। তোমাদের কাছে আছি বলেই হয়তো এখনো ইতিহাসের পাতায় ঠাই হয়নি আমার, কৃতজ্ঞ আমি তোমাদের কাছে। অনেক বড়ো বড়ো কথা হলো,কেকটা কাট এবার। তাতানের স্কুল, আমার অফিস যাওয়ার আছে। বাঘু আর তাতান দুজনে মিলে কেক কেটে সবাইকে খাওয়ালো। আসছে রবিবার আমরা সুন্দরবনের ইলিশ উৎসবে যাচ্ছি,সবাই খুব মজা করবো। বাঘুকেও ওর বন্ধুদের সাথে কিছুক্ষন সময় কাটাতে দেবো। বাঘু আনন্দে তাতানের পায়ে মাথা ঘষতে লাগলো, তাতানের ঘুমটা ভেঙে গেলো হঠাৎ! এটা কি স্বপ্ন ছিলো তাহলে? উঠে দেখলো পায়ের কাছে টেডি বাঘ টা পড়ে আছে। কাল তাহলে সুন্দরবন নিয়ে পড়ছিল, বাঘের সংখ্যা কমে আসছে, সেটাই বোধয় স্বপ্ন হয়ে দেখা দিলো। মায়ের ডাকে স্কুল যাওয়ার জন্য তৈরি হতে বিছানা থেকে নামলো। মনে মনে ভাবলো সব স্বপ্ন যদি সত্যি হতো কতই না ভালো হতো। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শনিবার, ১০ ডিসেম্বর, ২০২২

শিরোনাম - নিঃসঙ্গতা ও একটা বাড়ী✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - নিঃসঙ্গতা ও একটা বাড়ী
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

বাড়ীর সামনের বাগানে বসেছিলেন মিনতি দেবী। ওনাকে বাগানে ছেড়ে দিয়ে গেছে কাজের মেয়ে সুমনা। ছেলে প্রথম কয়েকদিন বিদেশে নিয়ে গিয়ে রাখলেও মন থেকে মানিয়ে নিতে পারেননি মিনতি দেবী। গাঁয়ের বাড়ির প্রতি টান আবার তাকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে দেশে। নিঃসঙ্গ হলেও তাঁর বুকের ভিতর একটা পুরনো দিনের বাড়ির ছবি গাঁথা হয়ে আছে। যে বাড়িতে একসময় অনেক ঠাকুর চাকর ছিলো, নায়েব গোমস্তা ছিল। গমগম করতো সারাদিন। তারপর একসময় জমিদারী উঠে গেলো, ছেলে গাঁয়ের মায়া ত্যাগ করে বিদেশে পাড়ি জমালো। কত কি মনে পড়ছে আজ মিনতি দেবীর! হঠাৎ পায়ের কাছে কিছু একটা এসে পড়লো। ঝুঁকে পড়ে দেখলেন একটা ক্রিকেট বল পড়ে আছে। দাও না গো বল টা! একটা বাচ্চা সামনে এসে বললো। বল টা তুলে দিলেন বাচ্চাটার হাতে। নাম জিজ্ঞেস করায় বললো টুটুল আমার নাম। 
-তা টুটুল বাবু রোজ খেলা হয় নাকি? 
-হ্যা খেলি তো! রোজ বিকেলে খেলতে আসি। 
-তাহলে আমার কাছেও এসো মাঝে মধ্যে। তোমার মত আমার একটা নাতি আছে। কিন্তু আমার কাছে থাকে না,খুব মনে পড়ে ওর কথা বুঝলে!
- আমারো ঠাম্মা আছে জানো! কিন্তু আমাদের সাথে থাকে না। মা বলে ঠাম্মা বন্ধুদের সাথে আশ্রমে থাকে। 
- মিনতি দেবী মনে মনে বললেন ও বৃদ্ধাশ্রম! বুঝেছি।
- কি বুঝলে? 
- কিছু না কিছু না! যাও তুমি খেলতে যাও। 
টুটুল চলে গেলো। 
মিনতি দেবীর চারপাশের নিঃসঙ্গতা বলে উঠলো এই তো একটা কথা বলার লোক পেলে! ওর মধ্যে তুমি নাতি আর তোমার মধ্যে ও ঠাম্মাকে খুঁজে পেয়েছে। 
কদিনে বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেছে মিনতি দেবী আর টুটুলের মধ্যে। টুটুল একদিন পুরো বাড়ীটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল। ফ্ল্যাট বাড়ীতে থাকতে থাকতে দম বন্ধ হয়ে আসে ওর। খুব ছোট জায়গা,এই শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে যায়। নিজের ঠাম্মা র কাছে দেশ বাড়ীর গল্প শুনেছে, এরকম একটা বাড়ীর ছবিই মনে মনে একেছিল কিন্তু যাওয়া হয়নি কোনোদিনই। আজ সেই গল্প গুলো একটু একটু করে সত্যি মনে হতে লাগলো। 
ধীরে ধীরে টুটুল বড়ো হয়, মিনতি দেবীরও বয়স হতে থাকে। টুটুল কলেজে পড়তে যায় আর সেভাবে আসা হয়না মিনতি দেবীর কাছে। তবে রবিবার গুলো নিয়ম করে আসে টুটুল। ছেলের দেশে ফেরার সম্ভাবনা নেই জেনে তার সম্মতি নিয়ে টুটুলকে বাড়ীটা দান করেন মিনতি দেবী। বেশ কয়েক বছর পর সুপ্রতিষ্ঠিত টুটুল বাড়িটায় বানিয়েছে অনাথ আশ্রম। ওর ধারণা অনাথ শিশুদের বুকের মাঝেও নিশ্চয় এরকম একটা বাড়ীর স্বপ্ন ঘুমিয়ে আছে। আজ আর মিনতি দেবী নিঃসঙ্গ নন। বয়সের ভার তার শরীরকে ন্যুব্জ করলেও মনকে নাড়া দিতে পারেনি। অনাথ বাচ্চারা সেটা হতে দেয়নি। তাদের সাথে খুব আনন্দ করে দিন কাটান মিনতিদেবী। আজ আর বাড়ীটাও নিঃসঙ্গ নয়,একদল কচিকাঁচাদের সাথে সেও মেতে উঠেছে আনন্দে। টুটুলকে প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করেন ওর মহৎ কাজের জন্য। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শিরোনাম-সাহস✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম-সাহস ✍️ ডা: অরুণিমা দাস সত্যি কথা বলতে সত্য কিন্তু অপ্রিয় হয়। মিথ্যেকে আড়াল করার অনেক পন্থা পাওয়া গেলেও সত্যকে চাপা দেওয়া একটু...