গল্প📖 লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
গল্প📖 লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

সোমবার, ১১ জানুয়ারি, ২০২১

বিষয় : ছোটগল্প # নাম : মহিলা সাহিত্যিক।। পর্ব৭ # লেখায় : শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 

মহিলা সাহিত্যিক।। পর্ব ৭


তনুরুচি পত্রিকায় লেখে। পুরুষ বা সমাজ বিমুখী সে। তার লেখার মধ্যে অব্যক্ত ব্যাথা আছে। ইদানীং মানসের থেকে কম্পিউটারের এডিটিং বিষয়ে জানছে। মানসের সাথে অফিসিয়াল ব্যাপার , মানে এই লেখালেখির বিষয় পর্যন্ত বন্ধুত্ব। তনুরুচি কি করে? চলে কি করে? নানা ছোট কাজে সে ব্যস্ত। সফ্ট টয়েজ বানানো থেকে টিউশন পড়ানো বিউটিসিয়ানের কাজ  , মানুষের নানা গল্প শোনে। মা মেয়ের চলে যায়। খুব ইচ্ছা বই বের করার। প্রকাশক ফর্টি চেয়েছে। তনুরুচি মনে মনে "চশমখোর" বলে গালি দেয়। ওদের টালির চাল গলে বৃষ্টি পড়ে, সেটা নিয়ে জল্পনা কল্পনা কম নয়। রেডিও আর ব্ল্যাক এ্যান্ড হোয়াইট অনিডায় খুশি থাকে। পাড়ায় দূর্গাপূজা বা কোন ফাংশনে তনুরুচি মাইকে থাকে, এই সবে তার বড়ো আগ্রহ। একটা চন্স। ওর একটা হাত চাই। নিরুপমার সাথে কখন কোন অনুষ্ঠানে দেখা হল। হয়ত নিয়তি কিংবা ওপরে কে যেন থাকে ওর কথা শুনে নিয়েছিল। বিখ্যাত সাহিত্যিক নাট্যকার প্রফেসর নিরুপমা রায় দস্তিদার। মিলেছে এক অনুষ্ঠানে। তারপর নিরুপমার খ্যাতির ঊজ্জ্বল্যে তনুরুচি আত্ম সমর্পণ করেছে। " দিদি আমিও লিখি, আপানার মতো বিখ্যাত মানুষের ছোঁয়ায় কৃতজ্ঞ। " তনুরুচির কথায় এবং পরিবেশনায় অনুষ্ঠান উদ্বোধনে আসা নিরুপমা নিজের কার্ড দিয়ে গিয়েছিল হেসে হেসে " এই মেয়ে এটা রাখো, সাহিত্যে তোমার দেখি খুব উৎসাহ, যোগাযোগ কোরো। " ভয়ে ভয়ে ওর বিউটিসিয়ানের একটা কার্ড এগিয়ে দিয়েছিল। মানসের কাছ থেকে বীনা পয়সায় কয়েক মাস আগে বানিয়ে এনেছিল কয়টা। সস্তা কার্ডটি নিরুপমা ওর সুসজ্জিত শান্তিনিকেতনের লেদার ব্যাগের কোনে গুঁজে দিয়েছিল।

বর্ধমান থেকে সুচিস্মিতা ফেসবুকে "ক্রিয়েটিভ আই" এর সাথে জুড়েছে । লাইক করেছিল। ফলোয়ার, এখন গ্রুপ মেম্বার। ওখান থেকেই ওদের ত্রৈমাসিক পত্রিকা বের হয়, তার এ্যাক্টিভ সদস্য। দামোদর বাবু ক্রিয়েটিভের এডিটর ওকে মহিলাদের বিভাগ দেখতে বলেছে। সুচস্মিতা কলেজ সামলে দিব্বি চালিয়ে যাচ্ছে। তবে মনে হাল্কা দম্ভ,হাওয়ায় ফুলে ওঠা টেন্টের মতো। সে যাই হোক নতুন এডমিন হয়ে প্রচুর বন্ধুত্ব পাঠিয়েছে ইথার জালে। মাছ পড়ছে টপাটপ। সাহিত্যর থেকে ওর সাথে বন্ধুত্বর ইচ্ছা বেশি। প্রচুর ম্যাসেজ এফ বি চ্যাট বক্স ভর্তি হয়। কত কবি লাফিয়ে পড়ে । কত শ্লীল অশ্লীল কবিতা আসে। কেউ অনুরোধ করে সুচিস্মিতা না মন্তব্য করলে কাব্য রঙিন হয় না। সুচিস্মিতাকে জলপাইগুড়ির ধীমান বর্মন লেখে : একটু ছোঁয়া নাই বা পেলাম
স্তনবৃন্ত থাক ঢাকা একুশে কুয়াশায়
যদি দেখি স্বপ্নে নগ্ন কায়া। ..... সহ্য করে হাসি মুখে সাহিত্যের খাতিরে! না নেশা তারও মনকে উচাটন করে। অনেক প্রশ্নের উত্তর হয় না। তা না হলে চল্লিশ ঊর্ধ্ব মানুষের সাথে রাত রাত কি এত চ্যাট বক্সে ফেবিকুউক দিয়ে এঁটে যাওয়া। অনেক কথাই হয়, যা হয়ত ঠিক না হলে ভালো লাগতো। সুচিস্মিতা এই ম্যাসেজের আশায় বোসে থাকে, বুকে পরোকিয়া  আনন্দ। ধীমানের কি কখনও কিছু মনে হয়!  এই সংবাদ আদানপ্রদানে সাহিত্য আদিরসাত্মক হয়, নাকি এটা আধুনিকতা? অদৃজাও ঠিক সেই সময় অশোক প্রামানিকে এফ বিতে ব্লক করল। অশোক নিজেকে নাক উঁচুমনা মানব বা দানব ভাবে। অদৃজাও ওর পত্রিকা, মানে সহকারী সম্পাদক যেখানে পত্রিকার জন্য সেও মেম্বার আনছিল। ধীমান বলেই দিল -" আপনাদের মতো মহিলারা পত্রিকার নামে বন্ধু খোঁজেন।" ব্যাস ব্লক। অপমানিত অদ্রিজা নিজেকে ভীষণ অপমানিত মনে করে।কি মনে করে লোকটা, সে কি পন্য! ব্যবসা করছে? অদ্রিজা ত্রিশের ঘরে গৃহবধু। সবে এই লেখালেখিতে। স্বামীর চাকরির কাজে দেশান্তরিতের দুঃখ ভুলতে ঢুকেছে। একি কান্ড! তার মতো সৎ চরিত্রা মহিলাকে যা খুশি বলে চলে যাবে, না কখনো তা হতে দিতে পারে না। মনের মধ্যে আগুনের গোলা ছোটাছুটি করে। এবার থেকে মানুষের জন্য একটু কর্কশ ব্যবহারই সে তুলে রাখে। এত সহজ হয়ে মেশা মানে পিশে দিয়ে যাবে । সহজ হলেই লোক নীচু করে। হয়ত মানুষের এক সহজাত স্বভাব তোলা জিনিসের প্রতি প্রবনতা বেশি। না পাওয়া না ছোঁয়া সমাদর দেয়। সমানে নেমে এলে আরও নীচে নামায়। তাই কি অহংকারের মুখোশ পরতে হয়!!যেমন নিরুপমা রায় দস্তিদার ম্যাডাম একটা নিজের তৈরী বলয়ের মাঝে বিরাজ করে! বলয়, নিজস্ব একটা বলয় বানানো শিখতে হবে।।
©কপিরাইট সর্তাধিকারী শর্মিষ্ঠা ভট্ট
(ক্রমশঃ ) 

শুক্রবার, ১ জানুয়ারি, ২০২১

বিষয় : গল্প # নাম : মহিলা সাহিত্যিক।। পর্ব ৬ # লেখায় : শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 মহিলা সাহিত্যিক।। পর্ব


"কিন্নর" এর বিদিশা বসুমতীদিকে দিনে দুপুরে ফোন করছে। কেবল সাহিত্যের কারনে নয়। রতন নাকি ডেসপারেট হয়ে উঠেছে। ওদিক থেকে তমার ফোন আসে। তার ঘর, সেই চার্লি চ্যাপলিনের "দ্যা গোল্ড রাশ" এর মতো পাহাড়ের খাদে পড়ি পড়ি করছে। বরফিলী ঠান্ডা হাওয়া ঘরটা উপড়ে ফেলতে চায়। গৃহকর্ত্রী আপ্রাণ চেষ্টা করছে বাঁচাতে। বসুমতীদিকে সাক্ষি মেনেছে। বসুমতীদির বাংলাদেশের ডাকে বিরাট সম্বর্ধনার জন্য তৈরী হচ্ছে, মাথায় উঠল। ফোন করে করে মিটমাট করাতে দিন কেটে যাচ্ছে হু হু করে। মিমাংসার ফল এমন হল, তমা বুঝল তার লেখক স্বামী ভুলবশত ভুল স্থানে ভুল বাক্য প্রয়োগ করে। রতন মনে মনে ভাবলো কি মেয়ে মাইরি, কখন গলে কখন কঠিন হয়, এমন সব বরফের কিউব নিয়ে চলা যায় না। গৌতম ভাবলো যত দোষ রতনটার, রাত বিরতে ফোন করে শালা। বিদিশা ও গৌতম এক সাথে ভাবলো বসুমতীদির লেখার আর দরকার নেই। রতনের সাথে ওঠে বসে , না জানি কেমন মহিলা! এমন কত সব হেমন্তের ঝরা পাতার মতো  সাহিত্যের দুনিয়ায় অহরহ গল্প ঝরে পড়ছে। সব তো তোলা যায় না। যতদূর ঝরা পাতা কালেক্ট করা যায়।

নীলাঞ্জনা বিকাশ ভবনে কাজ করে। হয়ত নিজেই জানতো না মনে কোন সুপ্ত ইচ্ছা ছিল কি না। তরুণ ঋতুপর্ণার বিয়ের পর নিজেকে কেন যেন এই সাহিত্য জগৎ থেকে দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ওর আর এই সম্বর্ধনা, কবি সম্মেলন, এমন কি কোলকাতা বই মেলার গ্যাদারিং ভালো লাগে না। সব ছেড়ে ও অন্য কোন পথ খোঁজে, এসব মেকি হাসি ও অভিনয় থেকে সে যেন মাঝে মাঝে হাঁপিয়ে যায়। আজকাল এনজিওতে তার মন লেগেছে বেশি। "বিইন্গ হিউম্যান"  ব্যানারের নীচে কাজ শুরু করেছে। কাল সকালে ওই কাজে ধনেখালী যাবে সুন্দরবন সংস্কৃতি ও বণ্য জীবন রক্ষার ওপর তার কাজ চালু করতে চলেছে। মনের এমন হঠাৎ বিষন্নতা মহিলা সাহিত্যিকদের নিত্যদিনের বিষয় । ওরা হয় সংসারে বা কর্মজীবনে ফিরে যায়। নয়ত আরও কিছু ভেবে নেয় মনকে সুস্থ রাখতে। যেমন তনুরুচি সাহিত্যের মহলে আজকাল নিজেকে ভীষণ একা মনে করছে।

তনুরুচি ঊচ্চমাধ্যমিক পাশ, কবিতা লেখায় তার নেশা। মনে আছে এই নেশার কারনে একবার হাতে ছেঁকা খেয়েছিল। তবু গোপনে লিখতো। আসলে ওর অসম্ভব বয়সে নিদারুণ প্রেমের কবিতার খাতা খানা মামির হাতে পড়েছিল। সেই থেকে মামা। বাপ মরা গলোগ্ৰহ ভাগ্নির এত সাহস, কারোর জন্য প্রেমের কবিতা লেখে! জলন্ত কাঠে চেটোটা  পুড়ে গেল। কঁকিয়ে কেঁদে উঠল তনুরুচি। হাতের জ্বলনে না কবিতা ভর্তি খাতা খানা উনুনে ধীরে ধীরে পুড়ে যেতে দেখে! ওর নতুন বয়সের অমৃতে বিষ ঢেলে দিলেন কেউ, মামা! না সমাজ? অসহায় গলোগ্ৰহদের জন্য কবিতার মতো বিলাসিতা খুব অন্যায়, খুবই অন্যায়।  

©copyright reserved for Sharmistha Bhatt. 

রবিবার, ২৭ ডিসেম্বর, ২০২০

বিষয় : গল্প# নাম : মহিলা সাহিত্যিক।। পর্ব ৫ লেখায় : শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 মহিলা সাহিত্যিক।। পর্ব


মালদার রবিকা বিশ্বাসকে কড়কড়ে তিনশো দিতে হল কাঁথির "শক্তিশেল"কে সুন্দর একটা প্রবন্ধের জন্য। মনটা খচখচ করে। ভাবতে থাকে এতই কি ফেলনা লেখে! রবিকা ঘরোয়া মহিলা, কেমন করে এক সম্মেলনে দেখা হয়েছিল ইব্রাহীম রজ্জাক মোল্লা  নামে স্কুল টিচারের সাথে। তার থ্রু এই "শক্তিশেল"....  অনেক খেটে এই ঐতিহাসিক প্রবন্ধ লিখেছিল। লেখক পয়সা পায় চিরকাল শুনেছে। পয়সা দিতে হতে নিজেকে কেমন যেন অসহায় লাগছে। কেউ শুনলে পাক্কা বলবে - পয়সা দিয়ে লেখা ছাপায়। কখনও কি সে প্রমাণ করতে পারবে, ওই প্রবন্ধটা কখনও সাধারণ ছিল না। কোন কি পথ আছে রবিকাদের নিজেকে প্রমাণ করার। এই মফস্বল থেকে কখনও প্রমাণিত হবে সে? কি ভাবে! পথ খোঁজে রবিকা।

তরুণ বড়ো এক কোম্পানিতে আছে। শখ ও কিছুটা আসক্তির কারণে এই সাহিত্যের জগতে পড়ে থাকা। প্রায় চল্লিশ পেরিয়ে গেছে। বিয়ে হয়নি। বাড়ীতে তেমন তাড়া দেবার কেউ নেই হয়ত। সাহিত্যের জগতে একটু দু কলম লিখলে জানতে চায় বয়স? তারপর প্রশ্ন বাড়ী? লোকেশন সিলেক্ট হয়ে গেলে বিত্ত বা স্ট্যাটাস। কটা গাড়ী , ঠিক কটা বৌ, কটা বান্ধবী ইত্যাদি। মহিলা হলে উল্টো ।কার সাথে আছে? বরই তো। বর ছেড়ে দিয়েছে? কেন? এই বয়সে এ্যাফেয়ার? হাজার প্রশ্ন কাটিয়ে এক সময় হয়ত হাঁপিয়ে গেলে জানতে চায়, কতগুলো লেখা? সেরা কোনটা? লেখার ধরন কেমন? তা সেই ওকাকুরার অনুষ্ঠান করানো তরুণ ঘোষও ডায়মন্ডহারবার সাহিত্য মেলায় আমন্ত্রিত। রতন ঋতুপর্ণাকে জুটি বেঁধে ঘুরতে দেখেছে অনেক সময়। হোটেলের ঘরে রতন ঋতুপর্ণাকে "উল্লাস " বলে গ্লাস ওপরে করতে দেখেছে। সেই মহিলা স্টেজে উঠে বলে, " আসলে মূল্যবোধ পাল্টে যাচ্ছে, আগে সিগারেট বড়োদের সামনে চলত না, আমাদের আগের জেনারেশনের সাহিত্যিকরা সিনিয়দের সামনে মেনে নিতেন তারা সব কাজে ছোট, যেহেতু তারা বয়সে ছোট। অনেক সময় ভুল ধরিয়ে দিতেও অনেক আড়ষ্টতা ছিল কিংবা ভুল ধরাতোই না। সময়ে আমরা দাদা বলে ভুল ধরিয়েদি। সিনিয়ররা আর গুরুগম্ভীর মাস্টার মশাই নেই। অনেক সহজ এক সম্বন্ধ। মূল্যবোধ অন্যখাতে বয়ে চলেছে, সহজ করে বাঁচাই আসল মোটো। " এত গভীর কথাও বলতে পারে মেয়েটা! আসে পাশে তো দিতি অরুন ধিতি  বিশ্বজয়  মিলির গ্র্যামি হয়ে ঘোরে। ধরন আলাদা। উগ্ৰ একটা ভয়হীন ভাব এদের লেখায় এবং স্বভাবে। অনেকে এই দলটা এড়িয়ে চলে। তরুণ অনেক বার শুনেছে ঋতুপর্ণা সঙ্গী মরশুমে বদলায়। এখন রতন! কিন্তু ও এখন এই সন্ধ্যায় একা কেন জেটিতে! রতন ওর ছায়া সঙ্গী কোথায়? এই সময় মফস্বল ফাঁকা , জেটি তো আরও। ও পায়ে পায়ে এগিয়ে যায় - এখানে একা কেন? বসবো?
- বসুন । আমি তো একাই। আপনি এই নিঃসঙ্গ দ্বীপে রতনের মতো বেলাকে খুঁজতে এলেন নাকি?
সামান্য নেশায় আছে। কেমন যেন মায়া হল । হাত বাড়িয়ে বলল - এখানটা ভালো নয় পর্না । যদি হটেলে গিয়ে কথা বলি তোমার আপত্তি আছে?
কি বুঝল ঋতুপর্ণা চুপচাপ বাচ্ছা মেয়ের মতো উঠে চলে এলো।

রতনের বুকে আগুন ছিল ঋতুর জন্য বোঝেনি তো। লোকে বলে এখন ওর মাল। বললেই হলো। তমা জুতিয়ে ইলিশ ফ্রাই করে দেবে। বেল্লা বরকে খাওয়ায়, ছেলে মানুষ করে, সর্বোপরি মাতাল রতনের সাহিত্যের মহল তৈরি করে, সাধন সঙ্গীনি। তাকে ফাঁকি দিয়ে ঋতু! না বাবা যত আগুন থাকুক নিভিয়ে দাও। তমা হারানো চলবে না। সাজানো বাগান শুকিয়ে যাবে। নিড কমফোর্ট। রতন মালের নেশায় হোটেলের এক ঘরে নিজের সাথে বকে। শেষ কবিতা শুনেই আজ ঋতুপর্ণাকে একা ছেড়ে ঘরে এসে ঢুকেছে। বলতে গেলে পালিয়েছে সে। ঋতুকে বড়ো আপন করে সাথে নিয়ে নদীর বুকে ভাসতে ইচ্ছা করছিল। বলেও ছিল মজার ছলে। কুকুরকে লাথি মারার মতো ঋতুপর্ণা মক্ষম ঝাড় দিয়েছে। "ঋতুপর্ণা সাহিত্য করতে এসেছে রতন স্যার, রাখেল হতে নয় "। তারপর বুকের জ্বালা বেড়েছে। আরও বাড়লো, এই মুহূর্তে বাড়লো যখন দেখল ঋতুপর্ণা আর তরুণ একটা টেবিলে বসেছে কফি নিয়ে। বলার কিছু নেই। সবাই প্রাপ্ত বয়স্ক। নিজের ইচ্ছার মালিক। কিন্তু ঋতুপর্ণা কি ওর আবেগের সাথে খেলেনি! মনে হতেই হতাশা চেপে ধরে। কিন্তু ঋতুপর্ণাকে সন্ধ্যায় কেন যে এমন অফার দিল। সব গেল। ঋতুপর্ণা বর খোয়ানো মেয়ে, বেচারা সেজে থাকে। তাতেই সব ফাঁসে। বড়লোকের বকা মেয়ে। আর কিছু মনে এল না, ঋতুপর্ণার বিরুদ্ধে মনে মনে এটুকু বিষোদগার করে নিজের ঘরে ফিরে গেল রতন।

ঠিক তার একমাস পরে ব্রাম্ভ মতে উপনিষদের মন্ত্র পড়ে অনাড়ম্বর বিয়ে হল তরুণ ঋতুপর্ণার। রতন সস্ত্রীক উপস্থিত ছিল। ঋতুপর্ণার সেদিনের কবিতা এমন ছিল :
আজ একটু বৃষ্টি চাই,
ভিজতে চাই প্রিয়তম।
আজ একটু কুয়াশা চাই
ভুলতে চাই সব পুরাতনো।
আজ দিশা চাই
দুহাতে ভরতে চাই সোনালী চূর্ণী যত।
একটু চুম্বন দিতে পারো!
ভুলবো  শত হতাহত।
অজস্র ক্ষত গোলাপি পাপড়ি
ঢেকে দিক আজ সুগন্ধি আঘ্রাণ।
©copyright reserved for Sharmistha Bhatt.

ক্রমশঃ

বুধবার, ২৩ ডিসেম্বর, ২০২০

#বিষয় : গল্প # নাম : মহিলা সাহিত্যিক।। পর্ব৪ # লেখায় : শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 

মহিলা সাহিত্যিক।। পর্ব




রতনের বাড়ী বসেছে আড্ডাটা, একচুয়ারি সাহিত্যের আড্ডা না বলে সাহিত্যিকদের আড্ডা বলা ভালো। রতনের বৌও আছে। বসুমতীদি শিলচর থেকে এসেছেন, তাই চেনা শোনা অনেকে দেখা করতে এসেছে। অনেক পত্রিকা ও বই বিনিময় এই সময় হয়ে যায়। একটু কথাও হল। "কিন্নর" চালায় গৌতম আর ওর বৌ বিদিশা এরা বসুমতীদির চেনা। নিজেদের দ্বিতীয় পূজাবার্ষিকী বসুমতীদির হাতে তুলে দিতে এসেছে। রতনের একটা বই ওরা প্রমোট করতেও পারে। আসলে ওদের মধ্যে পরিচিতি বাড়ানোর আশায় বসুমতীদি ওদের বাড়ীতে এই ঘরোয়া আড্ডা ডেকেছেন। রতন নতুন এদের সামনে গ্লাস খোঁজে নি। জানে ইমেজ বলে একটা কথা এ সব লাইনে টিকে থাকতে গেলে মেইনটেন করতে হয়। রতনের বৌ টিচার, প্রচুর খাবার আনিয়েছে। আর আনাবেই বা না কেন? বসুমতীদি বয়সে শুধু নয়, বড়ো পুরস্কার প্রাপ্ত মহিলা সাহিত্যিক। এমন মানুষ ঘরে এসেছে কম কথা !


রাজনৈতিক বেশ কিছু আলোচনা হল কিছুক্ষন, তারপর বসুমতীদিই তুললেন কথাটা, " ভাষাগত বড়ো ঝামেলা রে রতন ।" " তোদের আবার কি প্রবলেম, তোরা শিলচর তো এমনিই উল্টো বলিস। " " কি যে বলিস না, সত্যিই রে আরবি উর্দু কথ্য মিলিয়ে বাঙলা আর ভাষা নেই রে। র আর ড় অকথ্য ব্যবহার। " রতন কিছু বলতে যাচ্ছিল, বিদিশা বলে উঠল " সহমত দিদি। একটু বেশিই কথ্য বেশি চলে এসে খিচুড়ি হয়ে যাচ্ছে। " এবার চোখের চশমার খাঁক দিয়ে মেয়েটাকে লক্ষ্য করে রতন। বেশ প্রানবন্ত মেয়ে তো! তখুনি দরাজ গলায় বলে ওঠে


" এতই অসাড় আমি,চুম্বনও বুঝিনি


মনে মনে দিয়েছিলে,তাও তো সে তো না বোঝার নয়-


ঘরে কতো লোক ছিল তাই স্বীকার করিনি।


ভয়, যদি ক্ষতি হয়


কি হয়? কি হতে পারতো?এ সবে কি কিছু এসে যায়?


চোখে চোখ পড়া মাত্র ছোঁয়া লাগলো চোখের পাতায়।


সেই তো যথেষ্ট স্বর্গ, সেই স্পর্শ ভাবি আজ "... জয় গোস্বামী, স্পর্শ।


বসুমতীদির পরের দিন রবীন্দ্রসদনে স্বরচিত গল্প পাঠ। সেই জন্যই তাঁর আসা। রাতে আর আসর বেশি এগোতে পারলো না।


এর মধ্যে হাওয়ায় ভেসে রূপসা ঢুকে পড়েছে এদের দলে। সাহিত্যে একটু অনুরাগ আছে, মেয়েটা সাহিত্য বেশ ভালো বোঝে। বসুমতীদির সাথে রতনের বৌ পরিচয় করিয়ে দিল। আসলে রূপসা রতনের বৌয়ের আবিষ্কার। রতনের বৌকে তমাদি বলে, এই বড়ো বড়ো মানুষের ভীড়ে নিজেকে খেই হারা নৌকার মতো লাগছিল। তবে হঠাৎ একটা কাজ সে পেয়ে গেল, বসুমতীদির নতুন বের হওয়া গল্পের রিভিউ লেখা। রূপসা লক্ষ্য করেছে রতন থেকে বসুমতীদি সবাই বেশ এক জায়গায় উদার। কোথাও যেন এরা মন খুলতে জানে। এই নতুন ধরনের মানুষের সংস্পর্শে তার একটাই কথা মনে হল হাতের পাঁচটা আঙুলের মতো সাহিত্যের সব দল সমান নয়, সব সাহিত্যিক এক নয়, তাই একই ছাঁচে ফেলে বিচার করা উচিৎ নয়। মন দিয়ে সে তার কাজটা শেষ করতে বদ্ধপরিকর।


বসুমতীদির কোলকাতা আসায় দীজুদা দেখা করে গেলেন। তাঁর লেখা পাঁচশো তিরানব্বুই  পাতার সমালোচনার বই দিয়ে গেলেন। দীজুদা সত্তরের মানুষ। পাক্কা কমিউনিস্ট। ছাত্র উত্তালের দিনে কত গল্প যে তাঁর জানা। বসুমতীদির খুব ইচ্ছা সব গল্প এক সাথে করে একটা সত্তরের সংকলন বের করেন। বসুমতীদির আলাদা চলন বলন , বিলের হংসিনীর মতো আলাদা পরিচয় নিয়ে সদা আনন্দে বিরাজমান। কাজ করে চলেন, প্রাপ্য সম্মানের জন্য উতলে পড়া হ্যাংলামো তাঁর নেই।

ডায়মন্ডহারবার থেকে একটা সম্মেলনে রতনকে ডেকেছে। রতনের গলা কিন্তু অসাধারণ। ওকে বহুরূপী নাকি ডাকে। যাইহোক রতনের সাথে ঋতুপর্ণাদের দল চলেছে। সোনায় সোহাগা বড়ো হোটেল দিচ্ছে থাকার জন্য। গোলাপ না পদ্ম কি একটা ভ্যালি স্পন্সর করছে শোনা যায়। এই চিটফান্ড নাম দেওয়া কোম্পানিগুলো কিন্তু এখানে ওখানে পয়সা বিলিয়ে ভালোই ট্যাক্স ফাঁকি দেয়, তাতে কি সাহিত্যের পয়সা আসবে কোথা থেকে? সত্যি বলতে পয়সা খরচ করতে মধ্য ও নিম্ন মধ্যবিত্ত থেকে বেশিরভাগ আসা সাহিত্যের পরিমন্ডলের মানুষের পক্ষে একটু খিঁচ  হয়ে যায়। যাকে বলে হিচ্কি। রতন আর ঋতুপর্ণাকে নদীর ধারে দুদিন দেখা গেলে ভাবার কিছু নেই। বন্ধু তো ভাবাই যায়।
©copyright reserved for Sharmistha Bhatt.
ক্রমশঃ


সোমবার, ২১ ডিসেম্বর, ২০২০

বিষয় : গল্প # নাম : মহিলা সাহিত্যিক # পর্ব ৩ # লেখায় : শর্মিষ্ঠা ভট্ট

মহিলা সহিত্যিক # পর্ব ৩



 "সাঁচি"র জন্য অনুরাগের কাছে লেখা চাইতেই বলেছে বেশ কয়েক কপি পাঠিয়ে দিতে, অ্যাড এনে দেবে। এর আগেও অনুরাগ সাঁচি সাহিত্যসভা পিকনিকের প্ল্যাকার্ড বানিয়ে বিজ্ঞাপনের ব্যবস্থা করেছিল। দশ বারো জনের দল সামনের বাগানে বসে ,  সামনে ওই লেখাটা রেখে দু একটা ছবি। ওই ছবিগুলো নাকি পয়সা কালো থেকে সাদা করে দেয়। কোম্পানি একটা মোটা অঙ্কের টাকা অডিটের সময় সাহিত্য খাতে ব্যবহৃত দেখিয়ে দেয়। রিমা সাহিত্যের পথে নাম ও টাকার চেষ্টা করছে। কিন্তু লাভজনক তো নয়। মাঝে মাঝে ওরও মনে হয় সত্যিই হয়ত, ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো।

দিতি মুখার্জী নতুন আসা মেয়েটা কিন্তু অন্য রকম করে দেখে। ও বলে "এই দুনিয়ায় মানি ভাসছে, রিমাদি ।  তোমার এই লিটল ম্যাগাজিন যে কি কামাল দেখাতে পারে জানো না। " অনুরাগের কথা ভাবলেই দিতি এসে যায়। অনুরাগের এক্স গার্লফ্রেন্ড। এরা আজকাল রিলেশনে স্থির থাকতে পারে না। অবশ্য ভুতের বোঝার মতো বয়ে বেড়ানোর থেকে, এই ভালো। দিতি মুখার্জী লেখে ছপ্পড় ফেঁড়ে, বলেও এমন। একটু উগ্ৰ মনে হয় মেয়েটাকে। সব বিষয়ে জোর দিয়ে বলা, মিটিং মিছিলে এরা যায় না। তবে ছাত্র রাজনীতির বাইরে সচেতন নাগরিক কি করে থাকে! থাকা যায় না।হরতাল তাই প্রায় ধর্ষিতাদের জন্য ক্যান্ডেল যাত্রা করছে। নারীবাদী উগ্ৰতা ওর লেখায় আছে। একবার "আকাল"  থেকে ধাক্কা খেয়েছিল এই উগ্ৰ ও অকাঠ্য যুক্তির কারনে। ফ্লপ নায়িকা হয়, সাহিত্যিক ফ্লপ হয় না হয়ত। কিন্তু দিতির ছদ্মনাম নাম ফ্লপ লেডি রাইটার। রিসেন্ট "বোরখা" নামের ওর লেখা ভয়ের চটে অনেক পত্রিকা নিতে চায়নি। দিতি এখানেও পাঠিয়ে ছিল, অনেক ভেবে রিমা না বলেছে। তসলিমা সুরক্ষা পায় না, না বাবা অত সাহস তার নেই। কোন ঝামেলা চাই না। কি দরকার এই সব জিন্দাবাদ তুলে?" বোরখা " কে সিরিয়ালে আনবেই জিদে আছে দিতি। দেখা যাক অদৃশ্য অনেক চোখ ওর দিকে তাকিয়ে আছে। ওর এক যায়গায় অতি গালাগালির জন্য ওয়ার্নিং পেয়েছে। দিতিকে সাহিত্যের দুনিয়ার ছোট পাত্রে কিছুতেই ভরে রাখা যায় না। বেশিরভাগই অভিযোজন ও সমঝোতা করে নিজেদের গেঁথে দিয়েছে। অনেকেই শিখে নিয়েছে মেকি হেসে " দাদা আপনার এবারের পর্ব অসাধারণ, আমার নীল রজনীগন্ধা একটু ঢুকিয়ে দেবেন প্লিজ। " শিখে গেছে এমন সব কথা বলতে। আঙুরের থোকায় থাকা শিখতে হয়।

নীলাঞ্জনা ফোন করেছিল রিমাকে , একটা এনজিও থেকে কিছু লেখা দেবে, নেবে কি না। পরের মাসের জন্য জানিয়েছে। আজকাল লেখক লেখিকার ব্যক্তিগত জীবনে বড়ো আগ্ৰহ মানুষের। সেই চাহিদা পুরন করতেই এবার থেকে লেখকের ছোটো পরিচয় " সাঁচি "তে রাখবে। সেটাই বলতে ওদিকে হাসির আওয়াজ। নীলাঞ্জনা হাসছে। হাসি থামিয়ে বলল
" রিমা, কি লিখবে ওরা। রেড লাইনের মেয়ে আমরা। রঞ্জনা শেলি গোপি। টাইটেল নেই ওদের। ওদের কাছে পরিচয় কি চাইছো? বয়স চিরযৌবনা লিখবে?"  আবার হাসে নীলাঞ্জনা। এদের পরিচয় জানলে হয় পাঠক পালাবে, নয়ত বিস্ময়কর কৌতূহল নিয়ে পড়বে এদের লেখা। না গো সহজ লেখক  হতে পারবে না হয়ত। তবু আমরা চেষ্টা করছি একবার যদি এদেও চান্স দেওয়া যায়। তোমার "সাঁচি" যদি এগিয়ে আসে। রিমা উত্তর দিল ভেবে বলবে। নীলাঞ্জনা মেয়েটা দারুণ কাজ করে, কে জানে লোক কি ইচ্ছা করে ওর বদনাম দেয়!!

রিমা কল্যাণীতে একটা লেখা পাঠিয়েছিল। কিছুদিন আগে ও দিকের এডিটরের আওয়াজ শোনা গেল। "একটু লেখাটা ঠিক করতে হবে। বানান এত ভুল!" বিস্মিত রিমা বলে "কোথায় বলুন তো?" এমন সব ভুল ধরল । রিমা একটু বিরক্ত হয়েই বলে ফেলল
" ভুল ধরা মানে পুরো লেখাই পরিবর্তন করা নয়। "
" আপনারা মেয়েছেলেরা ঠিক মতো ব্যবস্থিত পারেন না। তাই। তাছাড়া আমারা তো আগেই বলেছি নির্বাচন মন্ডলীর নির্নয়ের ওপর কথা বলা চলবে না।"
একটু নরম হয়ে আলাপচারিতার দিকে যায় রিমা, "আপনি এসব ছাড়া কি করেন? মানে চলে কি করে?"
"মুদি দোকান আর পাশেই স্টেশনারি, বৌ চালায়।সাথে কির্তন "
রিমা আর কথা বাড়াল না।
©copyright  reserved for Sharmistha Bhatt.
ক্রমশ:📄

শনিবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২০

নাম : মহিলা সাহিত্যিক।। পর্ব২ # (গল্প) #লেখা :শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 

মহিলা সাহিত্যিক।। পর্ব



কাজল মল্লিকের মতো মহিলা সাহিত্যিক ছেয়ে গেছে। মাঝে মাঝে মনে হয় ,আজকাল পড়ে কম , লেখা যেন বেড়ে চলেছে। সাহিত্য চর্চার ভাষা ও ধরন পাল্টে যাচ্ছে খুব দ্রুত। এখন বাঙলার অলিতে গলিতে একটি মহিলা সাহিত্যিক পাবেই পাবে। তুমি লিখতে পারো এই কথায় কেমন একটা সুপ্ত আত্ম তৃপ্তি লুকিয়ে আছে । সাহিত্য সম্মেলনে এত ভুঁই ফোঁড় কবি সাহিত্যিক কোথা থেকে যে এসে যায়! আসলে শিক্ষিতের হার বাড়ছে। শিক্ষাগুলো এই ভাবেই পথ করে নিচ্ছে, এই ভাবে হতাশা বেকারত্ব ও একাকীত্ব  ইত্যাদি অনেক কিছুর ওষুধ! আত্ম তৃপ্তির এক সহজ উপায়। এমনি করে যায় যদি দিন যাক না। একটু অন্যরকম সময় কাটানো।

সংসারের সব কিছু সামলে হিমসিম রিমা তালুকদার লেখে, লিখতে তার বেশ লাগে। একটা দুটো পত্রিকার রিকোয়েস্ট এলে তখন তোড়জোড় করে লেখে, নেশার মতো । বকুনি খায়, বাচ্ছা কাঁদে বর রাতে পাশে ঘুমায় তবু লেখা চলে। লিখতে গিয়ে দেখেছে মনের মাঝে চাপা দুঃখর বড়ো টোটকা। লিখতে গেলে সব ভোলা যায়। তবে প্রায় খোঁটা খায় - ঘরের খেয়ে বনের মোষ তাড়ানো। কিংবা কোনো  পয়সা পাও , এত মেহেনতের কি লাভ? সাহিত্য কি লাভ লোকশান দেখে এন্ট্রি মারে! রিমা মুক্ত বিহঙ্গ হতে চায়।

রাত দুটো ওপাশ থেকে ফোন -" চিনতে পারছেন? " রিমার ঘুমন্ত বরের দিকে তাকিয়ে বলে "পারছি?  কোথায়? " ওপাশের গম্ভীর স্বর গাঢ় হয়
" তুমি নেই বলে বেলা, আমি একেলা" ।ফোনে ফিসফিসিয়ে বলে "আমি বেলা নই। "    " আমরা কেন্দুলির কবি মেলায় এসে হারিয়ে গেছি বেলা, তুমি আসবে একটু বাতি দেখাতে। " এবার রিমা ফোনটা টুক করে কেটে দিল। "মিলন যাত্রী"র রতন। কোন কবি সভায় গিয়ে ড্রিংস নিয়ে বসেছে। একটু চড়ে গেছে এখন ওর কবিতার বেলাকে ও ফোন করে করে খুঁজবে। কে জানে জীবনানন্দ বনলতা সেনকে এমন রাত দুটোয় ফোন করে খুঁজেছে কি না কখনও! এই কবিসভার আড্ডায় ড্রিংস কেন যে এত পপুলার ও উৎসাহের বিষয় বোঝে না। এক লাইন কবিতা পেন দিয়ে বের হল কি না ওই জলের জন্য পিপাসার্ত। সেদিন মহিষবাথানের কবি সম্মেলনে ঋতুপর্নাকে দেখেছিল স্টেজের পেছনে এক দু ঢোক নিতে। ওকেও অবশ্য অফার করেছিল, রিমার কেন জানি ওপন প্লেসে এসব ঠিক ভালো লাগে না। ওর বারনটা ওদের হয়ত ভালো লাগেনি। অরুন ধিতি ঋতুপর্ণা বিশ্বজয়  মিলি এদের একটা দল সব যায়গায় এটা ওদের চাই। তবে স্টেজে ওঠে  । আর এই রতন তো ওদের গড ফাদার। ও নাকি এ সব না চড়ালে লিখতেই পারে না। ওর আবার লেখার নির্দিষ্ট সময় ধরা বাঁধা আছে। ঘরের লোকজন সহ্য করে তাই। রিমা তো সারাদিন কাজ করেও মন পায় না,সংসারের পান থেকে চুন খশলে যত দোষ সাহিত্যের। পুরুষদের কত বিষয়ে রিবেট আছে। সময় কেনার রিবেট, রিমা পায় না সময়,একটুও না। ঘরের বৌদের নিজের জন্য সময়!  নীলাঞ্জনা অবশ্য বলে রতনের বর্তমানে ঋতুপর্ণার সাথে। ঋতুপর্ণার লাইফের ব্যাপারে কি যেন সেদিন বলছিল নীলাঞ্জনা। রিমার " সাঁচী " পত্রিকার জন্য লেখা চাইতে গিয়ে এ সব বলছিল বটে কিন্তু কাজের চাপে আর শোনা হয়নি।
©copyright  reserved for Sharmistha Bhatt.


বৃহস্পতিবার, ১৭ ডিসেম্বর, ২০২০

নাম: মহিলা সাহিত্যিক।। পর্ব ১ (গল্প) #লেখা : শর্মিষ্ঠা ভট্ট।

 

মহিলা সাহিত্যিক।। পর্ব


অফিসের কার কাছে যেন খবর পেয়েছিল লিটিল ম্যাগাজিনটার। তারপর একদিন শখ করে লেখাটা ডাকেই পাঠিয়ে দিল। বেশ সময় নিল উত্তর আসতে কিন্তু এক সোমবার অফিস থেকে ফিরে কলতলায় হাত পা ধুয়ে ফ্যান চালু করে নাইটি চড়িয়ে টিভি ঘরে বসেছে, মা চার সাথে খাম দিল। খাম খুলে এত খুশি যে হবে নিজেই ভাবেনি। সতেরো লাইনের কবিতা খানা ছেপে এসেছে এবং এডিটরের প্রসংশা পত্র। সেই শুরু।

মা আর নেই । বোনের মেয়েটা তার কাছে থেকেই কলেজে যায়। চলে যাচ্ছে। তবু মাঝে মাঝে একা লাগে। তবে ওর সাহিত্যিক হবার ইচ্ছা আরও বেড়ে সীমা ছাড়িয়ে চলেছে। ছোট ছোট কত লিটল ম্যাগাজিনে যে সে কবিতা পাঠায়। কত যায়গায় গোঁতা মেরে ঢুকে পড়ে সদস্য মন্ডলীর মাঝে। এইতো সন্ধ্যায় এক ম্যাগাজিন বার্ষিকী সাংস্কৃতিক ফাংশন রেখেছে, ওকাকুরায়। যাবেই, যেতে হবেই। যদিও জানে সহ সম্পাদিকা নীলাঞ্জনা ওকে পছন্দ করে না। তাতে কি! ছেড়ে দিলেই এই সাহিত্য ঘূর্ণন থেকে ছিটকে যাবে বাছা। তার থেকে বিউটি পার্লার ঘুরে এসে তসরটা গায়ে চড়িয়ে চারটের পর বেরিয়ে যাবে। সম্পাদক তরুণ আবার দিদি বলে ,আগে না গেলে ওর চোখে থাকা যাবে না। দেখা যাক কিছু পুরস্কার তো তুলে আনবেই।

" কি গো মাসি ফিরবে কটায় ? আমি কিন্তু এগারো হলে শুয়ে পড়বো চাবি নিয়ে যাও । "
"তুই ও চল না, তোর ড্যান্সের একটা পোগ্রাম করিয়ে দেবোই দেবো । "
" সে কি মাসি! ওদের নির্দিষ্ট সিডিউল নেই? "
" আহা বন্যা, তোর মাসির বাঁ হাতের চুটকিতে অনেক কিছু হয়। " একটা কটাক্ষ ছুঁড়ে বলল "তৈরি হয়ে নে আর লোপামুদ্রার ক্যাসেটটা নিয়ে নিস। "
মাসি বোনঝি পৌঁছেছে ওকাকুরা । তরুনের সঙ্গে পরিচয় ছাড়া অনুরোধ করল নাচের। তরুণ বিনয়ের সাথে নীলাঞ্জনার দিকে এগিয়ে দিল। ও ভালো ভাবেই জানে শক্ত যায়গা, অশান্তি হয় হোক আজ নিজের জেদ পুরো করবেই। ওকি ফেলনা! বন্যার কাছে মানসম্মান নেই!

মেকাপ রুমের সামনে তরুণকে ফিসফিস করে তড়পায় নীলাঞ্জনা " কোন আক্কেলে আমার কাছে পাঠালেন? "
"একটু সামলে নে বাবা। "
" সাহিত্যের স জানে না, আপনার প্রশ্রয়ে কিন্তু ...."
" পরে গালি দিস, এখন একটু সামলে নে, কবিতা বের হয় বলে মার্কেটিংটা নিজের গরজে করে, সেটাও তো দেখতে হবে। তুই সব পারিস, এবার উদ্ধার কর মা তারা"।
"কথায় না আপনি পাথর গলিয়ে দেবেন " হেসে এগিয়ে যায় নীলাঞ্জনা মেকাপ রুমের দিকে।
একটু গম্ভীর হয়ে বলে " দেখুন কাজলদি , আপনার বোনঝি, কি যেন নাম.... "
কাজল ধরিয়ে দেয় " বন্যা, মনবন্যা রায়"।
"সবার শেষে, কতক্ষনের ক্যাসেট? "
" ওই তো লোপামুদ্রা, একটু আগে যদি দাও, আমাদের আবার সেই মধ্যমগ্রাম বিরাটির পথ। "
"সরি দিদি হবে না "। খাতায় টাইম লিখে ওখান থেকে সরে পড়ে নীলাঞ্জনা, ইচ্ছা করে চেপে দিয়েছে। দরকার ভদ্রমহিলা সার্থপর শুধু নয়, বড়ো গায়ে পড়া কবি। নীলাঞ্জনা এমন ভাবে। যেখানে পায় মাথাটা ঢুকিয়ে দেয়। তবে অর্থ একটা বিষয়, এটা ও মাঝে সাঝে জোগাড় করে, তাই। নীলাঞ্জনা স্মার্ট শৈল্পিক, অনেক সময় ভাবে এসব থেকে মুক্তি নেবে। হয়ে ওঠে না, সাহিত্য চর্চা , ফেম পাবার বাসনা, দল মানে একটা কিছুতে নিজেকে ব্যস্ত রাখার ইচ্ছা থেকে নিজেকে দূরে রাখতে পারে না। পারে না ভক্তদের তালির শব্দ থেকে দূরে থাকতে।📙ক্রমশঃ

©copyright reserved for Sharmistha Bhatt

সোমবার, ১৪ ডিসেম্বর, ২০২০

বিষয় : অনুগল্প #নাম :পলাতক # লেখা : শর্মিষ্ঠা ভট্ট

 

পলাতক

শর্মিষ্ঠা ভট্ট


কলেজ ছেড়ে কুড়ি বছর। একই কলেজে তনুময় এখন প্রফেসর হয়েছে। আর ও সামান্যই....। তাই রিইউনিয়নে ইচ্ছা থাকলেও এ্যাভয়েড করতে পারল না। তাই যাবে। ভয়টাকে আর কত দিন বয়ে নিয়ে চলা যায়।

সেদিন ও স্পষ্ট দেখেছিল প্যান্ডেলের পেছন থেকে ওদের বেরিয়ে আসতে। তবু ওকেই সকলে আসার আগে পালাতে হল আর আজও পালাচ্ছে, নিজের থেকে। ট্যাক্সি🚖 ব্রেক মেরে কলেজের সামনে থামতেই চিন্তার সুত্র কেটে গেল। ভাড়া মিটিয়ে সেই গেটটার সামনে। চেনা একটা নিশ্বাস টানল বুকের ভেতর। চোখ বুঝতেই একুশ বাইশ বছরের ছ সাত ছেলেকে সিগারেট নিয়ে বেরিয়ে আসতে দেখছে। ইউনিয়নের ছেলে, বেশ চালাক চতুর। আর ও মফস্বল থেকে 🚶আসা তেলু ছেলে। মেয়েরা তখন তাই বলত।

পাঁচ ছটা ছেলে নিয়ে তাদের গ্রুপ তৈরি হল ফাস্ট ইয়ারে। ক্লাসেই থাকত মায়ের হাতের টিফিন খেত । প্রয়োজন না হলে নিজেদের জানান দিত না তেমন। কিন্তু রেজল্ট? চাপা থাকে না। কলেজ ওয়ালে প্রথম যখন তারই নাম। মেয়েরা ঘুরে দেখল । একটু সাজতে ভালো লাগল তার। একটু চুল উড়ল ,বুকের সার্টের দু তিন বোতাম নেই। সেকেন্ড ইয়ারে শেষ হতে হতে বদলে গেল। সেই গ্রুপের বন্ধু গুলো দেখা হলে সমিহ করে দূরে সয়ে যায়। সিগারেট হাতে কলেজ গেটের সেই ছ সাতটা ছেলে কখন তার এত কাছে হয়ে গেল ! এখানে দাঁড়িয়ে পুরো  সিনেমা শেষ করবি? পিঠে কেউ যেন ধাক্কা মেরে কলেজে ঢুকিয়ে দিল পঞ্চাশ পেরোনো সৌরভকে।

কলেজ বেশ আরও বড়ো হয়ে গেছে। অনেক পরিবর্তন  । তবু ক্যান্টিন আর ইউনিয়ন রুম একই যায়গায় একই রঙে বিদ্যমান। ভালো প্যান্ডেল হয়েছে স্টেজও। ফাংশন খাওয়া দাওয়া ভালো হল। বেশ কিছু চেনা মুখ পেয়ে গেল। কেউ টাক পড়া কেউ মোটা কেউ সাদা চুলের পাহাড়। মেয়েদের অনেকেই খাশা মাল্লু বরের ছয়ায় বিউটি পার্লার যাওয়ায় অঙ্গে চিকন এসেছে। তবে বয়স লোকাতে পারেনি। দুই একটা দুস্হ টাইপ সংসারে খাটা আন্টি টাইপও পুরোনো সহপাঠী পেল। কিন্তু তনুময় কোথায়? স্টেজের কাছে দেখল। গর্জন তর্জন করছে। সেই কুড়ি বছর আগে এ্যানুয়াল ফাঙ্কশন। আজও এগিয়ে গেল ওই দিকে। তরুণ একটি ছেলের হাত থেকে মাইকটা নিল। একটু অবাক সব ! !

ও শুরু করলো।........
চলে যাবেন না। আজ দাঁড়ান। তনুময় হয়ত চিনেছে ওকে, কারন অসংখ্য কোঁকড়ানো চুলে সাদা পেঁচানো চুল  আর গাম্ভীর্য ছাড়া কিচ্ছু বদলায়নি। তনুময় মাইক বন্ধ করতে বলছে । কিন্তু সৌরভ বলে উঠল - আজ মাইক বন্ধ করিস না তনুময়। একটা গল্প বলি শুনুন আপনারা, ইউনিয়ন পয়সা খেয়ে স্টুডেন্ট ঢোকায়। আমার অসাধারণ রেজাল্ট ছিল এসব আমি আগে জানতাম না বুঝতাম না। কিন্তু হয়ত এই পাড়ায় থাকা কিছু ছেলে আগে থেকেই জানে পড়াশোনা ছাড়াও ডিগ্রি এবং রোজগার হয়। হয়ত তার কলেজ ঢোকার পথ এমন  পিচ্ছিল ছিল। যাক সে সব। একটা মফস্বলের ছেলে একে একে কেমন ডুবে গেল তাই বলি।
তনুময় এর অনুগত ছাত্রদল ওর ইশারায় উসখুশ করছে একটু চেঁচিয়ে উঠল কেউ "বন্ধ করুন প্রোগ্রাম শেষ।" অন্য দল থেকে কেউ চিৎকার করল "চুপ, বলতে দাও। " সৌরভ বলে চলে - সেকেন্ড ইয়ারের শেষে ছেলেটা জেনে গেল কেমন করে মেয়েদের আকর্ষণ করতে হয় । কি করে লোকের নোটিশে এসে যাবে ইউনিয়নের চেয়ারে বসে, আমি আছি' টাইপের প্রদর্শন করে। ক্যান্টিনের টেবিল দখল। হৈ হট্টগোল  ,একটু আঁতলামো। ক্যান্টিনে বসে পুরো কলেজে চোখ রাখা  ।চা বা টিফিনের খাতায় জমে যাওয়া অর্ডার। বলতে গেলে ফুল টাইম ক্যান্টিন দখল । এ সব যে খোকলা কেবল চাকচিক্যময় এক ব্ল্যাক হোল বুঝতে অনেক দেরি করে ফেলল। ততক্ষনে এ্যাকশন হয়ে গেছে। ইউনিয়নের কিছু ছাত্র পেছনে পয়সা নিয়ে ছাত্র ঢোকায়। একটা নতুন ছাত্র ওটা ফাঁস করতে চেয়েছিল। ওর সখ ছিল বড়ো হয়ে সে সি বি আই তে আসবে। আর সেই নিয়ে পড়ছিল। আমার কাছে ম্যাথের জন্য আসত। তাই ভালো চিনতাম। এমন একটা ফাংশনের দিন, প্যান্ডেলের পেছনে সে খুন হল। প্যান্ডেলের পেছন থেকে আমি কিছু ছেলেকে বেরিয়ে আসতে দেখলাম। মাইকের জোর আওয়াজ থাকলেও আমি মৃত্যুর আর্তনাদ শুনে ছুটে গিয়ে দেখলাম... রক্তে লতপত আমার জুনিয়র। ওর বুকের ছুরি🔪 টেনে বের করলাম.... পিছনে কারো হাত আমার কাঁধে পিছনে ফিরে চিনলাম ইউনিয়নের এবং  ক্লাসের আমার প্রিয় বন্ধুটি! বলল - পালা.... সবাই আসার আগে পালা। ততক্ষন ছাত্র ছাত্রী প্রফেসর স্টাফ আরও অনেকে ছুটে আসছে।  আমি পালালাম ....... উত্তেজনায় অনেকটা বলে 🗣 নিশ্বাস নিয়ে দেখল তনুময়ের সিট ফাঁকা । সে কখন চলে গেছে। আবার ফিরে এলো নিজের কথায়.... হেসে বলল আমার নতুন  উপন্যাস "কলেজ ক্যান্টিন" প্রমোট করলাম আপনাদের সামনে, কেমন লাগলো? তালি পড়ছে হুড়মুড়িয়ে। সৌরভের আনা সাংবাদিক টাইপের ছেলেটা দু একটা ছবি এবং অন্যদের রিভিউ নিচ্ছে। সৌরভ তখনও মাইকে -🎙 আমার ছদ্মনাম 'পলাতক' । এই নামে প্রকাশিত হবে। আমি চাই আমার কলেজের প্রথম কুড়িজন লাকি পাঠককে ফ্রিতে বইটা দেওয়া হবে। আপনাদের আগ্রহ এবং সাথ একান্ত কাম্য 🙏ধন্যবাদ।। বেশ মোটা অঙ্কের ডোনেশন দিয়ে বেরিয়ে পড়ল খ্যাতনামা কথাশিল্পী সৌরভ সরকার। 

পথে আবার তার মনে পড়ে সেই ভঙ্কর দিনে শুধু পালানো আর পালানো। আর পরের দিন কাগজে তনুময়়ের । এটা কিিিন্তু   চায়নি।  

@copyright reserved for Sharmistha Bhatt

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...