ক্লিওপেট্রা ও অজানা কিছু ইতিহাস
✍️ ডা: অরুণিমা দাস
মাত্র ৩৯ বছরের সংক্ষিপ্ত জীবনে কখনো ছিলেন রাজকন্যা,কখনো বা পরাক্রমশালী রানী, আর কখনো তিনি ছিলেন প্রেয়সী। ক্লিওপেট্রাকে মনে করা হয় সম্মোহনী সৌন্দর্য্য ও ক্ষমতার স্বত্ত্বাধিকারী। রুপোলি পর্দায় তাঁকে রুপসী হিসেবে উপস্থাপন করা হলেও আধুনিক ইতিহাসবিদদের মতে,পরমাসুন্দরী হিসেবে তার খুব বেশি খ্যাতি ছিল না। তবে তাঁর তীক্ষ্ম বুদ্ধিমত্তা, মন্ত্রমুগ্ধকর ব্যক্তিত্ব, সহজাত রসবোধ,প্রচণ্ড উচ্চাভিলাষ ও তা বাস্তবায়নের অদম্য ইচ্ছাশক্তির জোরে তিনি সর্বকালের সেরা মহিলাদের মধ্যে স্থান করে নিয়েছেন। ক্লিওপেট্রাকে ঘিরে ইতিহাসে বিতর্ক আর রহস্যের যেন শেষ নেই। যেমন রহস্যময় তার জীবন ও রাজ্য শাসন,তেমনি রহস্যময় তার প্রেম। তাঁকে নিয়ে গল্প-কবিতা-উপন্যাসের পাশাপাশি নির্মিত হয়েছে চলচ্চিত্রও। উইলিয়াম শেক্সপিয়র, জর্জ বার্নাড শ,জন ড্রাইডেন, প্লুটার্ক, হেনরি হ্যাগার্ড, ড্যানিয়েল প্রত্যেকেই আলাদাভাবে ফুটিয়ে তুলেছেন তাঁর চরিত্র। হ্যালিওয়েল তাকে 'দ্য উইকেডেস্ট উইম্যান ইন দ্য হিস্ট্রি' হিসেবে অভিহিত করেছেন।
প্রেম আর মৃত্যু এই নারীর জীবনে একাকার হয়ে গেছে। তিনি যেমন ভালোবাসার উদ্যাম হাওয়া বইয়ে দিতে পারতেন,তেমনি প্রয়োজনে মারাত্মক হিংস্র হতেও বিন্দুমাত্র দ্বিধাবোধ করতেন না।
দান্তের মতে,লালসার শাস্তি হিসেবে তিনি নরকের দ্বিতীয় স্তরে দাউ দাউ করে পুড়ছেন। কারো কারো দৃষ্টিতে তিনি ছিলেন 'সারপেন্ট অব দ্য নাইল'। অনেকে আবার তাঁর আবেদনময়ী দিকটিকেই বেশি গুরুত্ব দিয়েছেন। ফারাও রাজবংশের সর্বশেষ রাণী ক্লিওপেট্রা শুধুমাত্র মিশরীয় ইতিহাসের এক বিস্ময়কর নামই নন, ইতিহাসের সবচেয়ে বিখ্যাত নারীদের মধ্যেও তিনি একজন।
ক্লিওপেট্রার সংক্ষিপ্ত জীবনী - খ্রিস্টপূর্ব ৬৯ সালে প্রাচীন মিসরের আলেকজান্দ্রিয়ায় জন্ম ক্লিওপেট্রার।তার পুরো নাম ক্লিওপেট্রা সপ্তম ফিলোপেটর। মেসিডোনিয়ান বংশোদ্ভূত সপ্তম মিশরীয় রানী হওয়ায় তাকে এই পরিচিতি বহন করতে হয়।
গ্রিক শব্দ kleos আর pater থেকেই ক্লিওপেট্রা। যার স্ত্রী বাচক অর্থ করলে দাঁড়ায় "গ্লোরী অফ দ্য ফাদার"। তার আগে আরো ছয়জন কিওপেট্রা ছিলেন। তার পূর্বপুরুষ টলেমি ছিলেন মহামতি আলেক্সান্ডারের একজন সেনাপতি। খ্রিষ্টপূর্ব ৩২৩ সালে আলেক্সান্ডার মারা গেলে তার অন্যতম সেনাপতি টলেমি মিশরে স্বাধীন রাজবংশ প্রতিষ্ঠা করেন। কিওপেট্রা এই বংশেরই শেষ শাসক। তার মৃত্যুর মধ্য দিয়ে মিসরে প্রায় ৩০০ বছরের মেসিডোনিয়ান শাসনের অবসান ঘটে। তার মায়ের দিকের পরিচয় অবশ্য পাওয়া যায় না। এ কারণে তিনি রোমানদের মতো শ্বেতাঙ্গ ছিলেন নাকি মিশরীয়দের মতো কৃষ্ণাঙ্গ তা জানা যায়নি।
অধিকাংশ ইতিহাসবিদের মতে খ্রিস্টপূর্ব ৫১ অব্দে রোম সম্রাট টলেমি অলেতিস মারা যান। মারা যাওয়ার আগে তার বিশাল সাম্রাজ্য ১৮ বছর বয়সী কন্যা ক্লিওপেট্রা [ক্লিওপেট্রা-৭] ও ১o বছর(কারো কারো মতে ১২ বছর) বয়সী পুত্র টলেমি-১৩-কে উইল করে দিয়ে যান। সেই সঙ্গে মৃত্যুর সময় রোমান নেতা পম্পেকে রাজ্য ও তার সন্তানদের দেখাশোনা করার দায়িত্ব দিয়ে যান। তখনকার মিশরীয় আইন অনুসারে দ্বৈত শাসনের নিয়মে রানী ক্লিওপেট্রার একজন নিজস্ব সঙ্গী থাকা বাধ্যতামূলক ছিল। কাজেই ক্লিওপেট্রাকে বিয়ে করতে হয় তারই ছোটভাই টলেমি-১৩ কে, যখন টলেমির বয়স ছিল মাত্র ১০বছর (কারো কারো মতে ১২ বছর)। ফলে আইনগতভাবে রাজ্য পরিচালনার দায়িত্বভার অর্পিত হলো ক্লিওপেট্রা এবং তার স্বামী (ওরফে ছোট ভাই) ত্রয়োদশ টলেমির উপর। ক্ষমতায় আরোহণের পর নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েও ক্লিওপেট্রা তার শাসন চালিয়ে গেলেন।
ধারণা করা হয় কিওপেট্রার বড় দুই বোনের একজন (ক্লিওপেট্রা ষষ্ঠ) শৈশবেই মারা গিয়েছিলেন ও অপরজনকে (বেরেনিস) টলেমি অলেতিস-ই হত্যা করেছিলেন। এ ছাড়া ক্লিওপেট্রার ছোট আরো দুটি ভাই ছিল।
সে সময়ের মুদ্রায় অঙ্কিত ক্লিওপেট্রার প্রসন্ন ভাব, গোলাকার দৃঢ় চিবুক,ধনুকের মতো ঢেউ খেলানো ভুরু যুগলের নিচে অনিন্দ্য সুন্দর চোখ, প্রশস্ত ললাট আর সুতীক্ষ্ম নাকের চমৎকার সমন্বয় দেখা যায়। প্রখর বুদ্ধিমত্তা আর যেকোনো পরিস্থিতিতে খাপ খাইয়ে নেয়ার ক্ষমতা,সম্মোহনী ব্যক্তিত্ব তাকে করেছিল তুলনাহীন। তবে ক্লিওপেট্রা ও টলেমি-১৩ এর মধ্যকার সুসম্পর্ক স্থায়ী হয়নি। সিংহাসনে বসার মাস কয়েক পরেই দু’জনের মধ্যকার সম্পর্কে চিড় ধরে। ক্লিওপেট্রাও সব সরকারি দলিলপত্র থেকে তার ভাইয়ের নাম মুছে ফেলতে থাকেন। এমনকি মুদ্রায় তার একক পোর্ট্রেট ও নাম সংযোজন করেন। তবে তিনিও টিকতে পারেননি। দুর্ভিক্ষ, বিশৃঙ্খলা, প্রাসাদ ষড়যন্ত্রের ফলে ক্লিওপেট্রাকেও সরে যেতে হয় ক্ষমতা থেকে। কিন্তু তিনি দমে যাননি মোটেও ধারণা করা হয় বোন আরসিনোইকে নিয়ে আরব সৈন্যদের সহায়তায় তিনি সিরিয়ায় চলে যান এ সময়।
ক্লিওপেট্রার মৃত্যু ও সমাধি নিয়ে নানান মত রয়েছে, সাথে রয়েছে রহস্যও।
তাঁর সৌন্দর্যের প্রতিদ্বন্দ্বী তিনিই। চোখের চাহনি বুকে কাঁপন ধরায় অতি বড় সম্রাটেরও। তীব্র অথচ সূক্ষ্ম কামনার অট্টহাসি কিংবা ডুমুরের ডালিতে থাকা বিষাক্ত অ্যাম্পের ছোবলের কথা লেখা আছে ইতিহাসের পাতায়। মিশরের সেই রহস্যময়ী ক্লিওপেট্রা এখনও বিস্ময়। তাঁর জীবনের গল্প এখনও ছত্রে ছত্রে রহস্যে মোড়া। মৃত্যু, সে তো আরও গভীর রহস্যময়। কোথায় তাঁর সমাধি, সেটাও এত দিন অধরা ছিল। মিশরীয় সেই রহস্যের জট খুলছে একটু একটু করে। একদল গবেষকের দাবি, অচিরেই খোঁজ মিলতে পারে ক্লিওপেট্রার সমাধির। ক্লিওপেট্রা সাধারণ মানুষের কাছে একটা ধাঁধার মতো। ইতিহাসের এক একটা অধ্যায়, এক এক রকম ভাবে তুলে ধরেছে তাঁর বর্ণময় জীবনকে। ক্লিওপেট্রা সপ্তম থিয়া ফিলোফেটর ছিলেন মিশরের রানি। প্রাচীন মিশরের শেষ ফারাও। তাঁর জন্মের আগে ছিলেন ছ’জন ক্লিওপেট্রা।
খ্রিস্টপূর্ব ৩০ সাল। বন্দি ক্লিওপেট্রা বিষাক্ত অ্যাম্পের কামড় খেয়ে আত্মহত্যা করেন। কথিত আছে এই সাপ তাঁর কাছে ডুমুরের ঝুড়িতে লুকিয়ে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল।এর পরের অধ্যায়টা পুরোপুরি রহস্যে মোড়া। সেই যে হারিয়ে গেলেন ক্লিওপেট্রা, তাঁর কবরের খোঁজও মিলল না। জনশ্রুতি, অ্যান্টনির সঙ্গেই তাঁকে সমাধি দেওয়া হয়েছিল। অনেকের বিশ্বাস আলেকজান্দ্রিয়াতেই সমাহিত করা হয় ক্লিওপেট্রাকে। ৩৬৫ খ্রিস্টাব্দে সুনামিতে ধ্বংস হয় এই শহর। অনেকে আবার মানেন আলেকজান্দ্রিয়ার অদূরে নীল নদের অববাহিকায় ট্যাপোসিরিস ম্যাগনায় রয়েছে তাঁর সমাধি। এই দাবিতেই মান্যতা দিচ্ছেন গবেষকরা। কারণ সম্প্রতি সেখানে একটি সমাধি আবিষ্কার করেছেন পুরাতত্ত্ববিদরা। সেখানে রয়েছে ২০০০ বছরের পুরোনো দুটি মমি। এই মমি দু’টি সোনার পাতে মোড়া। পুরাতত্ত্ববিদদের দাবি, তৎকালীন মিশরীয় সমাজের উচ্চপদস্থদের এ ভাবে সমাহিত করা হত। এক্সরে করে দেখা গিয়েছে মমি দু’টির মধ্যে একটি পুরুষ। অন্যটি নারী। সোনার ওই পাতে কিছু গুবরে পোকার ছবি পাওয়া গিয়েছে। যা মিশরে পুনর্জন্মের প্রতীক। এর থেকে পুরাতত্ত্ববিদদের অনুমান, এগুলি তৎকালীন মিশরের কোনও ক্ষমতাশালী পুরোহিতের। যাঁদের সঙ্গে ক্লিওপেট্রার যোগাযোগ ছিল। মমির পাশে কিছু মুদ্রাও পাওয়া গিয়েছে, যা ক্লিওপেট্রার সময়ের। এই দলের প্রধান,লিভারপুল বিশ্ববিদ্যালয়ের মিশরীয়বিদ্যার অধ্যাপক গ্লেন গডেনহো জানান, ২০০০ বছর পুরোনো ওই মমি দুটি। তাই সেগুলির পরীক্ষায় কিছুটা সময় লাগবে। তবে মমি দুটি যে ভাবে সোনার পাতে মোড়া ছিল, তাতে পরিষ্কার, সেগুলি তৎকালীন মিশরের কোনও ক্ষমতাশালী ব্যক্তির। টোপোসিরিস ম্যাগনায় ১৪ বছর ধরে খননকাজ চালাচ্ছেন ক্যাথলিন মার্টিনেজ। তিনিও আশাবাদী ওই এলাকায় অচিরেই খোঁজ মিলবে ক্লিওপেট্রার সমাধির। কারণ ওই এলাকার খুব কম অংশেই এখনও খননকাজ চালানো সম্ভব হয়েছে।এমনটা হলে ইতিহাসের সবচেয়ে চর্চিত একটা অধ্যায় স্পষ্ট হবে। ফিরে আসবেন সেই সুন্দরী, যাঁর সৌন্দর্যে মজে তামাম বিশ্ব। হয়তো জানা যাবে কী ভাবে হারিয়ে গেলেন ক্লিওপেট্রা, পাঠকদের সামনে আসবে আরও অজানা ইতিহাস। অপেক্ষায় রইলাম জানার জন্য।
এই ইতিহাস সংক্ষেপে বলছিলেন বিমল বাবু তার সহকারী অমিত বাবুকে। আজ অফিসে বিমল বাবু তার স্বেচ্ছাবসরের চিঠি দিতে এসেছেন। অমিত বাবু বললেন আপনার তো একটাই মেয়ে, তার বিয়ের কথা ভাববেন না? চাকরি ছেড়ে দিচ্ছেন যে!
- আর বলবেন না, মেয়ের জন্যই তো চাকরি ছাড়ছি।
- কেনো কেনো?
- মেয়ে এখন একটা বড়ো কোম্পানি তে জব করছে, সিনিয়র কনসালট্যান্ট। আমাকে আর ওর মাকে কলকাতায় ফেলে রাখবে না। মুম্বাই নিয়ে চলে যাবে। বলছে তোমরা যেমন ছোটবেলায় আমায় আগলে রেখে মানুষ করেছো এখন আমার দায়িত্ব তোমাদের আগলে রাখা। আর কদিন এরকম ছুটে দৌড়ে অফিস যাবে? দু বছর কম চাকরি করলে কিছু যাবে আসবে না। তাই আজ চাকরি ছাড়ার চিঠি দিয়ে পরশু চলে যাবো মুম্বাই।
- ও আচ্ছা। আপনারই কপাল বিমল বাবু।
- কেনো? আপনার তো ছেলেকে নিয়ে খুব গর্ব, অনেক বড় চাকরি করে যে।
- হ্যা, তা করে। কিন্তু মনটা আপনার মেয়ের মতো বড়ো নয়। বলেই দিয়েছে নিজেরা নিজেদের সামলে রেখো। বছরে এক আধবার হয়তো আসবে, তাও যদি ক্লায়েন্টের দরকার হয় তবেই।
- আমার মেয়েকে নিয়ে খুব গর্ব হয়। ছেলে না থাকার কোনো দুঃখই নেই আমার। সত্যিই 'সি ইস গ্লোরি অফ ফাদার।' আজ আসি, অফিসের বাকি কাজ গুলো করে নিই। পরশু না হয় যাওয়ার আগে আপনার সাথে দেখা করে নেবো।
- হ্যা, আসুন। খুব ভালো থাকবেন। আপনার মেয়ের নাম ক্লিওপেট্রা হলে কিন্তু বেশ হতো।
- হা হা, ভালো বলেছেন। আসি। আবার দেখা হবে।
একগাল হাসি নিয়ে বিমল বাবু বেরিয়ে গেলেন অমিত বাবুর ডেস্ক থেকে।
গুগল, ক্লিওপেট্রা র জীবনী, হায়রোগ্লিফের দেশে বই থেকে কিছু তথ্য নেওয়া হয়েছে। আর শেষ অংশটি ক্লিওপেট্রার নামের সাথে মিল রেখে একটা ছোট গল্পের রূপ দেওয়ার চেষ্টা করেছি মাত্র।
©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস