অপ্রতিরোধ্য
✍️ ডা: অরুণিমা দাস
পোল্যান্ডের ওয়ার্স শহরের এক মেয়ে, যার নাম ছিল মানিয়া। পাঁচ ভাইবোনের মধ্যে সবচেয়ে ছোট ছিল সে। বাবা নামকরা অধ্যাপক আর মা ওয়ার্সের বোর্ডিং স্কুলের প্রধান শিক্ষিকা ছিলেন। বাড়িতে সর্বদা বিদ্যার পরিবেশ বিরাজ করতো। এমনকি সন্ধ্যে বেলা মানিয়ার বাবা বিজ্ঞান বিষয়ক আলোচনার আসর বসাতেন পাঁচ ভাইবোনকে নিয়ে। মানিয়ার ও ধীরে ধীরে বিজ্ঞানের প্রতি অনুরাগ জন্মাতে শুরু করেছিল। কিন্তু বিধি বাম, মারিয়ার যখন দশ বছর বয়স তখন মা দুরারোগ্য যক্ষ্মা রোগে আক্রান্ত হয়ে শয্যাশায়ী হন। কিছুদিন পর মানিয়ার বড়ো দিদিও অসুস্থ হয়ে মারা যান।
আর সেইসময় রাজনৈতিক পরিস্থিতি জটিলতর হয়ে ওঠার কারণে আর পোলিশ চেতনায় বিশ্বাসী হবার কারণে তখনকার সরকার মানিয়া র বাবাকে পদত্যাগ করিয়ে নিম্ন শ্রেণীর একটি চাকরি দেন।
পরিবারের আর্থিক সংকটে মানিয়ার আর ভাইবোনদের পড়াশোনা প্রায় বন্ধের মুখে চলে যায়।
কিন্তু মানিয়া হাল ছাড়বে না কিছুতেই, বিজ্ঞানের বই গুলো যে তাকে টানছে। সেই অমোঘ আকর্ষণ সে পারেনি উপেক্ষা করতে। রেগুলার স্কুলের মানিয়া ও তার মেজো বোন ব্রণিস্লা ভর্তি হতে পারেনা যেহেতু তারা মেয়ে ছিলো। কিন্তু হাল ছাড়ার পাত্রী ছিল না মানিয়া। পোলিশের এক ভ্রাম্যমাণ স্কুলে তারা দুজন ভর্তি হয়। কিন্তু আর্থিক অবস্থা এতটাই ভেঙে পড়েছিল যে তাদের দুজনের একসাথে পড়া চালিয়ে যাওয়া সম্ভবপর ছিল না।
মানিয়া আর ব্রণিস্লা চুক্তি করলো যে একে অপরের পড়ার খরচ যোগাবে। মানিয়া এখন বোনের পড়ার খরচ দেবে আর বোনের পড়াশোনা শেষ হলে সে দিদির পড়ার খরচ জোগাবে। সেই শর্ত অনুযায়ী মাসিক পাঁচশ রুবেলের বিনিময়ে মানিয়া এক অভিজাত রুশ আইনজীবীর বাড়ীতে গভর্নেসের কাজ নেয়। প্রায় তিন বছর সেখানে কাজ করেছিল মানিয়া। এই সময়ে ওই রুশ পরিবারের বড়ো ছেলে কাজিমিয়েরেজ জোরভস্কির আসে তার জীবনে। কিন্তু নিয়তি সহায় ছিল না, তাই সম্পর্ক টা পোক্ত হয় না। মানিয়া র পরিবার গরীব হওয়ার কারণে রুশ পরিবার এই সম্পর্ক মেনে নেয়নি। আর কাজিমিয়েরেজ ও পরিবারের বিরুদ্ধে যায়নি। বিচ্ছেদে আহত হয়ে মানিয়া কাজ ছেড়ে দেয়।
ইতোমধ্যে মানিয়ার বোন শিক্ষার কার্যক্রম শেষ করে চিকিৎসকের পেশায় নিয়োজিত হয়। আগের শর্ত অনুযায়ী এবার মানিয়া তার বোনের আর্থিক সহায়তায় বিজ্ঞানের উচ্চশিক্ষার জন্য প্রথমে অস্ট্রিয়ার শাসনাধীনে ক্রাকো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়তে যান। কিন্তু সেখানে বিজ্ঞান ক্লাসে যোগ দিতে চাইলে বিশ্ববিদ্যালয়ের সচিব অসম্মতি জ্ঞাপন করে মানিয়াকে জানিয়ে দেন যে,বিজ্ঞান মেয়েদের জন্য নয়, তিনি যেন রন্ধন শিক্ষা ক্লাসে যোগ দেন। তবে এসব বাধা মানিয়াকে তার বিজ্ঞানর প্রতি আগ্রহকে দমিয়ে রাখতে পারেনি।
১৮৯১ এর শেষের দিকে মানিয়া পোল্যান্ড থেকে ফ্রান্সের উদ্দেশ্যে পাড়ি জমান। তিনি প্যারিসের সোরবর্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে ভর্তি হয়ে পদার্থবিজ্ঞানে, রসায়নে এবং গণিতের মধ্যে ডুবে থাকতেন। এবং বিশ্ববিদ্যালয়ের কাছে ল্যাটিন কোয়ার্টারে একটি গ্যারেজ ভাড়া করে সেখানে বসবাস শুরু করেন। তবে অল্প কয়েকদিনের জন্য তিনি বোনের বাড়িতেও ছিলেন। মানিয়ার আয় তখন ছিল খুবই সীমিত। প্রায় সময় তাকে খিদেয় কাটাতে হত। মানিয়া দিনে পড়তো, সন্ধ্যায় পড়াতো এবং পড়িয়ে যা আয় করতো,তা ছিল খুবই সামান্য। ১৮৯৩ সালে তাকে পদার্থবিজ্ঞানে ডিগ্রি দেয়া হয়।
এরপর তিনি গ্যাব্রিয়েল লিপম্যানের শিল্পভিত্তিক গবেষণাগারে কাজ শুরু করেন। এরই মধ্যে তিনি আরেকটি ডিগ্রি অর্জনের মাধ্যমে ফেলোশিপ পেয়ে যান। এরপর থেকে তাকে আর পেছনে ফিরে তাকাতে হয়নি। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের ভালোভাবে পড়াশোনা চালিয়ে যান।
তার এই জীবন সংগ্রামে পাশে পেয়েছিলেন স্বামী পিয়ের কুরিকে, যিনি শুধু পড়াশোনাই নয় সর্বক্ষেত্রে সাহায্য করেছিলেন মানিয়া কে। মানিয়া ও পিয়েরের জীবনে সংসার,গবেষণা,আর ভালোবাসা যেন হাত ধরাধরি করে চলছিল। মানিয়া ও পিয়েরে যৌথভাবে গবেষণা শুরু করেন। ১৮৯৮ সালে এই দম্পতি প্রথমে প্লিচব্লেন্ড থেকে তেজস্ক্রিয় পদার্থ পোলোনিয়াম এবং পরে রেডিয়াম আবিষ্কার করেন, যা ইউরেনিয়াম হতে দশ লক্ষ গুণ বেশি শক্তিশালী। এই রেডিয়ামের ব্যবহার অপরিসীম। কুরি দম্পতি প্রমাণ করলেন যে, কোনো কোনো মৌলের পরমাণু ক্রমাগত ভেঙে গিয়ে রশ্মি বিকিরণ করে। এই বিকিরণ অন্য কোনো পদার্থ ভেদ করেও যেতে পারে। এই ধরনের পদার্থকে বলে তেজস্ক্রিয় পদার্থ, আর এই গুণকে বলে তেজস্ক্রিয়তা।
১৯০৩ সালে দুজনে মিলে নোবেল পুরস্কার ও পেয়েছিলেন। পরে ১৯১১ সালে মানিয়া দ্বিতীয় নোবেল পুরস্কার পান। তেজস্ক্রিয়তা নিয়ে কাজ করার জন্য ব্লাড সেল নষ্ট হয়ে গিয়ে মানিয়া আক্রান্ত হন অ্যাপ্লাস্টিক অ্যানিমিয়া তে। তখন সব গবেষণা বন্ধ হয়ে শয্যাশায়ী হয়ে পড়েন মানিয়া। জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত শিক্ষার জন্য তিনি নিবেদিত প্রাণ ছিলেন।
গল্পে যে মানিয়া র কথা বলেছি সেটা ছিল ওনার ডাক নাম বা বাড়ীর নাম। পোশাকি নাম ছিল মেরী কুরি বা মাদাম কুরি। যাকে আমরা চিনি তেজস্ক্রিয়তায় অবদানকারীনি হিসেবে। শিক্ষার প্রতি ন্যায় নিষ্ঠতা আর ভালোবাসাই তাকে শতকষ্টের মধ্যেও সমাজে প্রতিষ্ঠা এনে দিয়েছিল।
মাদাম কুরি অ্যান্ড পিয়েরে কুরির জীবনী বইটি ছোটবেলায় পুরস্কার পেয়েছিলাম। সেই বইটি থেকে তথ্য নিয়েই এই লেখাটি লিখলাম।
©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস।