প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
প্রবন্ধ লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বুধবার, ১ এপ্রিল, ২০২৬

এপ্রিল ফুল✍️ ডা: অরুণিমা দাসএপ্রিল ফুল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

এপ্রিল ফুল
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শুধু এপ্রিলের প্রথম দিনটাই কেনো ফুল বা বোকা বানানোর জন্য বরাদ্দ? আর অন্য দিনগুলো নয় কেনো? এ নিয়ে অনেক ইতিহাস রয়েছে। 
পয়লা এপ্রিল। বছরের ৯২ তম দিন। পথ চলা তখনও অনেক বাকি। ১৫৬২,পোপ গ্রেগরি খ্রিস্টানদের জন্য আনলেন নতুন ক্যালেন্ডার। এর আগে পর্যন্ত নতুন বছর পালিত হতো এপ্রিল ১ এ। এই পরিবর্তনের খবর গোটা পৃথিবীর জানতে লেগে গিয়েছিল বিস্তর সময়। মানুষ তখনও এপ্রিল ১ কে কেন্দ্র করেই পাঠিয়ে চলেছে শুভেচ্ছা বার্তা। আর সেগুলোই জমা হয়েছে মজার দিনের গল্প হিসাবে।
এই ছিল গল্প এক। গল্পই বটে! কারণ ইতিহাস আজও এই ঘটনার কোনও জ্যান্ত দলিল প্রকাশ করে উঠতে পারেনি। 
এটা তো গেলো ইতিহাস! কিন্তু বাস্তব? সেটা তো অন্য কিছু বলে। যখন ছোট ছিলাম তখন বড় হবার লোভ আমাদের বোকা বানায়। বলা হয় যখন ভালো করে পড়াশোনা করো, মাধ্যমিক পরীক্ষা জীবনের প্রথম বড় পরীক্ষা! তখন কি বোকা হইনা আমরা? উচ্চমাধ্যমিকের পরে ভালো কলেজে ভর্তি হয়ে গেলেই লাইফ সেট। এগুলো আসলে বোকা বানানোর দুর্দান্ত ফন্দি। এই ট্র্যাপে পা দিয়েই বছরের পর বছর আমরা বোকা হচ্ছি। বসের টার্গেট পূরণের ট্র্যাপ সেটাও আরেকটা বড় ট্র্যাপ। আর বিজ্ঞাপনে একটা প্রোডাক্ট কিনলে গাড়ি বাড়ি ফ্রী,লাকী ড্রতে বড় ইনাম! এসব তো বোকা বানানোর জন্য যথেষ্ট। চটকদার জীবনের হাতছানি,জীবনে সুখ শান্তি ঐশ্বর্যে থাকতে হলে প্রচুর পরিশ্রম করতে হবে,এটাও একটা ফাঁদ। মরীচিকার পেছনে ছুটে ছুটে ছোট থেকে বড় হই, বুড়ো হই। কিন্তু চালাক ও পরিণত হতে পারি কয়জন? কেউ ভাবছে নেশায় আসক্ত হয়ে দুঃখ ভোলা যাবে,কিন্তু নেশার জন্য তার শরীরের কতটা ক্ষতি হচ্ছে সেটা ভাবছেনা একবারও! বোকা কি হচ্ছে না সে? আবার কেউ ভাবছে অন্যের লেগপুল করে এগিয়ে যাবে। কিন্তু এটা ভাবেনা যে তার অসৎ কর্মের জন্য সে কতটা পিছিয়ে পড়বে! তাই এমন ভাবে কাউকে বোকা বানানোর দরকার নেই যাতে নিজেই জ্যাক অ্যাস হয়ে যেতে হয়। বোকা বানাও মজাদার উপায়ে কিন্তু কারোর ক্ষতি না করে। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শনিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৫

জন্মদিনে শরদিন্দু

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনী
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

বাংলা সাহিত্যে যাদের অবদান অনস্বীকার্য তাদের মধ্যেই একজন স্মরণীয় ও বরণীয় বিশিষ্ট সাহিত্যিক হলেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। ইনি তিরিশে মার্চ ১৮৯৯ সালে উত্তর প্রদেশে জৌনপুর নামক শহরে জন্ম গ্রহণ করেন।আর কোলকাতায় এসে ওনার নিবাস হয় বরানগরের আদিকুঠি এলাকায়। 

 পড়াশোনা ও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ:
মাত্র ষোলো বছর বয়সে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় ম্যাট্রিক পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হন। ছোটবেলা, স্কুল জীবন সবটাই মুঙ্গেরে কাটে তাঁর। আর খেলাধুলোতেও বেশ পারদর্শী ছিলেন তিনি। ছোট বেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর একটা ভালোবাসা ছিল,কিন্তু তাঁর বাবা তারাভূষণ বন্দোপাধ্যায় চাইতেন ছেলে ব্যারিস্টার হোক। বাবার ইচ্ছে আর নিজের সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ এই দুই ভাবনার অন্তর্দ্বন্দ্বে ভুগতেন তিনি। বাবার ইচ্ছে রাখতে তিনি বি এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর পাটনায় আইন নিয়ে পড়তে যান। কিন্তু মনে যার সাহিত্য বাস করে সে কি করে অন্য কাজে নিজেকে নিয়োজিত করবে! পরে তাঁর বাবাও হয়তো বুঝেছিলেন ছেলের মন নেই ওকালতিতে, তাই ছেলে নিজের মনের কথা শুনে সাহিত্য চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।

১৯ বছর বয়সে মুঙ্গেরের উকিল জীবন চক্রবর্তীর পৌত্রী পারুল দেবীর সাথে তার বিবাহ হয়। 
১৯২৬ সালে  পাটনা থেকে আইন পাস করে ওকালতি শুরু করেন তিনি। কিন্তু তাঁর ওকালতি জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ওকালতি শুরুর তিন বছরের মাথায় পাটনা ছেড়ে মুম্বাইয়ে পাড়ি দেন আর সেখানে মুভির জন্য স্ক্রিনপ্লে লেখা শুরু করেন। বেশিদিন মুম্বাই তে থাকেননি, ১৯৫২ সালে পুনে আসেন আর নিজের সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ কে প্রাধান্য দিয়ে মনোনিবেশ করেন সাহিত্য চর্চায়।

সাহিত্য জীবন - পড়াশোনা চলা কালীন কুড়ি বছর বয়সে কলেজে পড়ার সময়ে প্রথম সাহিত্য হিসেবে একটি কবিতা সংকলন প্রকাশ পায় যার নাম ছিল "যৌবন স্মৃতি"।এই সংকলনে প্রায় একুশটা মত কবিতা ছিল এবং প্রতিটি লেখাই ছিল পাঠকের মনোগ্রাহী। ওকালতি জীবনেই 'বসুমতী' তে ছাপা হয়েছিল তাঁর প্রথম গল্প 'উড়ো মেঘ'।শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার মধ্যে সব চেয়ে জনপ্রিয় ছিল গোয়েন্দা কাহিনী। এছাড়াও সামাজিক, রোমান্টিক, ডিটেকটিভ কাহিনী, ইতিহাস আশ্রয়ী উপন্যাস রচনা করেছিলেন তিনি। তাঁর বর্ণনা রীতি ছিল অসাধারণ আর ভাষার বুনন থাকতো খুব মজবুত। অতি সহজেই তাঁর লেখা তাই পাঠকের মনে আনন্দ দান করেছিল। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। উপন্যাসের পাশাপাশি লিখেছিলেন কবিতাও। তাঁর সাহিত্যে প্রেরণার কথা বলতে গিয়ে নিজের মা বিজলীপ্রভা দেবীর কথা বলেছেন যিনি কিশোর শরদিন্দুকে পড়ে শোনাতেন 'মেঘনাদবধ কাব্য'।সেই থেকেই তাঁর মনে সাহিত্য চর্চার উন্মেষ হয়।বম্বে টকিজ ছবির গল্প লেখক হিসেবে কাজ করার সুবাদে ভাবী,বচন, দুর্গা, কঙ্কন এগুলো তার গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বাণিজ্যিক ফরমায়েশি পালন ছিল না তাঁর রক্তে, তাই পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা একটু ফিরতেই  আবার তিনি সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। একটা কথা তিনি সবসময় বলতেন " জীবনকে এড়িয়ে কোনোদিন গোয়েন্দা গল্প লেখবার চেষ্টা করিনি "। কি, কেনো, কবে, কীভাবের উত্তর অন্বেষণ করতে করতে বাঙালি যে কখন গোয়েন্দা হয়ে ওঠে বোঝা মুশকিল। বাঙালির এই খানা তল্লাশি করার কাজে আজও তারা গোয়েন্দা গিরিতে চোখ বন্ধ করে ফলো করে ব্যোমকেশকে। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরেই বাঙালি তার প্রথম প্রাইভেট ডিটেকটিভ  হিসেবে পেয়েছিল সত্যান্বেষী কে। শরদিন্দু তাঁর বলিষ্ঠ লেখনীর মাধ্যমে গোয়েন্দা কাহিনী গুলোকে এক অন্য রকম মাত্রা দিয়েছিলেন। এক সাক্ষাৎ কারে বলেছিলেন " ওগুলো (ব্যোমকেশের কাহিনী গুলো) নিছক গোয়েন্দা কাহিনী নয়। প্রতিটি কাহিনী আপনি শুধু সামাজিক কাহিনী হিসেবেও পড়তে পারেন"। তাই শুধু গোয়েন্দা গল্পই নয়, শরদিন্দুর যে কোনো লেখাতেই জীবন সম্পৃক্ততার পূর্ণ প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। শুধু সমসাময়িক বা জীবনের দৈনন্দিন ঘটনা কেই তিনি শুধু প্রাধান্য দেননি, ইতিহাসকেও চমৎকার ভাবে দেখতে পারতেন তিনি। নিজেই বলতেন " আমি বাঙালিকে তাহার প্রাচীনের সাথে পরিচয় করাইয়া দিবার চেষ্টা করিয়াছি। বাঙালি যতদিন না নিজের বংশ গরিমার কথা জানতে পারিবে,ততদিন তাহার চরিত্র গঠিত হইবে না..."। তাই বাঙালি পেয়েছে 'কালের মন্দিরা ', ' গৌড়মল্লার ', ' কুমারসম্ভবের কবি', ' শিবাজী ও সদাশিব ' এর মত ঐতিহাসিক উপন্যাসকে। ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলেছিলেন " লোকে ইতিহাস পড়িবে না,কিন্তু আপনার বই পড়িবে"।ছোট গল্পেও তার অবদান অনস্বীকার্য। 'ভল্লু সর্দার', 'কর্তার কীর্তি' এই রচনা গুলো বারবার পড়েও পুনরায় পড়ার সাধ থেকে যায় পাঠকের মনে। বই পড়া, রচনার পাশাপাশি ভাষা চর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল বেশ। নিজে সংস্কৃত শিখবেন বলে পণ্ডিতও নিয়োগ করেছিলেন তিনি। 

জীবনের শেষ উনিশ বছর নিজের তৈরী বাড়ি মিথিলা তে কাটিয়েছিলেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়।  তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল শুধু বই আর বই। ভালো পাঠক না হলে ভালো লেখক হওয়া যায় না, শিক্ষিত পাঠক সৃষ্টি করে এক শিক্ষিত লেখকের। এর জলজ্যান্ত উদাহরণ ছিলেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। 
বড়োদের গল্প উপন্যাসের পাশাপাশি শিশু কিশোরদের জন্য ও তাঁর লেখালিখির পরিমাণ কম নয়। শিশু সাহিত্যে তাঁর স্মরণীয় নায়ক চরিত্র ছিল 'সদা শিব '।  

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুরস্কার প্রাপ্তি :
শরৎ চন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার (১৯৬৭)
রবীন্দ্র পুরস্কার ( তুঙ্গভদ্রার তীরে)

তাঁর এই সাহিত্যময় জীবন ছেড়ে অবশেষে ১৯৭০ সালে
 ২২ সেপ্টেম্বর পুনেতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলা সাহিত্য তাঁর এই অবদানের জন্য তাঁর কাছে চিরঋণী।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শনিবার, ১৫ জুলাই, ২০২৩

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স 
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

চিন্তাশক্তি,বুদ্ধি কিংবা বিশ্লেষণ ক্ষমতা মানুষের সহজাত। কিন্তু একটি যন্ত্রকে মানুষের মতো বুদ্ধিমত্তা দিয়ে, সেটিকে চিন্তা করানো কিংবা বিশ্লেষণ করানোর ক্ষমতা দেওয়ার ধারণাটিকে সাধারণভাবে আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বলা হয়। 
কিছুদিন আগেও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স ছিল দূর ভবিষ্যতের একটি কাল্পনিক বিষয়। কিন্তু সম্প্রতি এই দূরবর্তী ভবিষ্যতের বিষয়টি আমাদের দৈনন্দিন জীবনের অংশ হতে শুরু করেছে। তার প্রধান কারণ, পৃথিবীর মানুষ ডিজিটাল বিশ্বে এমনভাবে অভ্যস্ত হয়েছে যে, হঠাৎ করে অচিন্তনীয় পরিমাণ ডেটা সৃষ্টি হয়েছে এবং সেই ডেটাকে প্রক্রিয়া করার মত ক্ষমতাশালী কম্পিউটার আমাদের হাতে চলে এসেছে। এই ডেটা বা তথ্যকে প্রক্রিয়া করার জন্য বিজ্ঞানী এবং প্রযুক্তিবিদরা এমন একটি পদ্ধতি বেছে নিয়েছে যেটি মানুষের মস্তিষ্কের মতো করে কাজ করে। এটা নিউরাল নেট নামে পরিচিত। সহজভাবে বলা যায় এর একটি ইনপুট স্তর এবং আউটপুট স্তর রয়েছে যার মাঝখানের স্তরটি হচ্ছে ‘লুকোনো’ স্তর।
প্রথমে এই নিউরাল নেটকে ইনপুট এবং তার সাথে যুক্ত আউটপুট ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তখন ‘লুকোনো’ স্তরটি এমনভাবে পরিবর্তিত হতে থাকে যেন প্রশিক্ষণের জন্য দেওয়া ইনপুটের জন্য সত্যি আউটপুটটি পাওয়া যায়। একবার প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েগেলে এই নিউরাল নেটকে সম্পূর্ণ নতুন ইনপুট দিলেও সেটি সম্ভাব্য সঠিক আউটপুটটি দিতে পারবে। যত বেশি ডেটা দিয়ে প্রশিক্ষণ দেওয়া হবে,নিউরাল নেটটি তত ভালো কাজ করবে। একটি স্তর না রেখে একাধিক স্তর দিয়ে এই নেটকে আরো অনেক বুদ্ধিমান করা সম্ভব। তখন নেটটি নিজেই ডেটা ব্যবহার করে শিখে নিতে পারবে। এই প্রক্রিয়ার নাম ‘ডিপ লার্নিং’ এবং বলা যেতে পারে একটি সত্যিকারের আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের সবচেয়ে কাছাকাছি একটি প্রক্রিয়া।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রয়োগের ক্ষেত্রে প্রধানত  Java, Python, SHRDLU, LISP, CLISP ইত্যাদি প্রোগ্রামিং ল্যাংগুয়েজ ব্যবহার করা হয়।
কার্যকারিতা ও প্রয়োজনীতার ভিত্তিতে ডেভলপাররা তাদের পছন্দসই প্রোগ্রাম ব্যবহার করে থাকেন।
কদিন আগেও আমার পরীক্ষার আগে আমার এক বন্ধু চ্যাট জি পি টি নামক আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স এর নাম বলে। ওখানে প্রশ্ন টাইপ করে উত্তর পাওয়া যায়। কিন্তু উত্তর গুলো দেখে আমার ঠিক ভালো লাগলো না। ওকে বললাম নিজের ইন্টেলিজেন্স কাজে লাগিয়ে এর চেয়ে অনেক ভালো উত্তর দিতে পারবো আমরা। আর এসব চ্যাট জি পি টি মানুষেরই আবিষ্কার। তো এসব না করে বই পড়ে উত্তর তৈরি করাটাই আসল ক্রেডিট। এসব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স শুনতে বেশ ভালো লাগে কিন্তু ইনবর্ন ইন্টেলিজেন্স এর ভ্যালু অনেক, তাই এসব ভুলে পড়ায় মন দিই চল। পরে বই পরে বন্ধু বলেছিল অনেক ভালো উত্তর দেওয়া আছে।
ওসব আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স কাজে না লাগিয়ে নিজের পছন্দের কাজগুলো করলে এমনি ব্রেইন অনেক ডেভেলপড হয়, ইন্টেলিজেন্স বাড়ে।

"ডিভাইস অনেক রয়েছে,পাল্লা দিচ্ছে মানব বুদ্ধিকে
মস্তিষ্ক প্রসূত চিন্তাধারা কিন্তু ইউনিক সবদিক থেকে।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস 


বৃহস্পতিবার, ১৫ ডিসেম্বর, ২০২২

অজুহাতের দোহাই✍️ ডা: অরুণিমা দাস

অজুহাতের দোহাই
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

সকল মানুষের দুহাত থাকা সত্ত্বেও তৃতীয় হাতটি বেশী শক্তিশালী যেটা মানুষকে দিনের দিন অলস, ল্যাদখোর করে তুলছে, ঠেলে দিচ্ছে অবনতির দিকে। কী সেই তৃতীয় হাতটি! সেই তৃতীয় হাতের নাম হলো অজুহাত। আজকাল মানুষ নানা রকম অজুহাত দেখিয়ে কাজের জায়গায় ও অন্যান্য স্থলে নিজের পতন অনিবার্য করে তুলছে। চেষ্টায় তাদের নানা ত্রুটি রয়েছে,সেটা অস্বীকার করা যায় না। কিন্তু একবার চেষ্টা করে কোনো কাজ না হলে অজুহাত দেখিয়ে সেখান থেকে সরে না এসে পুনরায় চেষ্টা করা উচিত অবশ্যই,যাতে স্থিতধির নাগপাশে বন্দী না থেকে সফলতার মুখ দেখতে পারা যায়। 
অজুহাতের যে বিষাক্ত বিষ তাদের মনকে স্পর্শ করেছে,অসুস্থ করে তুলেছে সেই  অসুখ থেকে মুক্তি পাওয়ার একমাত্র অ্যান্টিডোট হলো চেষ্টা! পুনরায় চেষ্টা! "একবার না পারিলে দেখ শতবার,কিন্তু হেরে গিয়ে পিছিয়ে পড়া মানা বারংবার।" এভাবে বারবার চেষ্টা করতে করতে ঠিক চেষ্টার সুড়ঙ্গ ধরে পৌঁছে যাবে আলোর ঠিকানায় যেখানে অপেক্ষা করছে সাফল্যের সিড়ি বেয়ে ওঠার সর্বপ্রথম ধাপ। আর এই সিড়ি বেয়ে একবার উঠতে শুরু করলে খুব একটা পেছনে ফিরে তাকাতে হবে না। তাই অজুহাতের সুযোগ নিয়ে নিজের হাত দুখানি কে অচল না করে দেওয়াই শ্রেয়। বরং হাত দুখানি কাজে লাগিয়ে সফলতার শীর্ষে পৌঁছনোর জন্য অজুহাতকে পঙ্গু বানিয়ে ফেলাই এর থেকে পরিত্রাণ পাওয়ার একমাত্র রাস্তা। 

"হাত দুখানি কাজে লাগাও,যাতে না ঘটে কোনো বিড়ম্বনা
দুর করে অজুহাত এগিয়ে চলো,থাকবে সাফল্যের সম্ভাবনা।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শুক্রবার, ৭ অক্টোবর, ২০২২

শিরোনাম - চোদ্দো শাকের কথকথা✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - চোদ্দো শাকের কথকথা
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 "ওলংকেমুকবাস্তূকং, সার্ষপং নিম্বং জয়াং।             শালিঞ্চীং হিলমোচিকাঞ্চ পটুকং শেলুকং গুড়ূচীন্তথা।ভণ্টাকীং সুনিষন্নকং শিবদিনে খাদন্তি যে মানবাঃ,প্রেতত্বং ন চ যান্তি কার্ত্তিকদিনে কৃষ্ণে চ ভূতে তিথৌ।"

অর্থাৎ চোদ্দো শাক হল ওল, কেঁউ, বেথো, কালকাসুন্দা, সরষে, নিম, জয়ন্তি, শালিঞ্চা, হিংচে,পলতা, শুলকা, গুলঞ্চ, ঘেঁটু ও শুষনি। এই সব শাক শুভদিনে যে মানুষ খায় কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথির ভূত চতুর্দশীতে তার কাছে প্রেত ঘেঁষতে পারে না। এখানে প্রেত বলতে যদি রোগজীবানুদের বোঝানো হয় তবেই তা তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। কারণ ভূত আর জীবানু উভয়কেই তো চোখে দেখা যায় না! এবার আলোচনায় আসা যাক চোদ্দো শাকের কি কি ভেষজ গুণ আছে!

ওলঃ ওল গাছ প্রায় সবাই চেনে। মাটির নিচে থাকা কন্দ থেকেই পাতা জন্মায়। ওলের কন্দে ক্যালসিয়াম অক্সালেটের কেলাস বেশি থাকলে খাওয়ার সময় গলা চুলকোয়।

ভেষজ গুণাবলীঃ ওলের শুকনো কন্দের গুঁড়ো অর্শ, হাঁপানি, টিউমার, স্প্লীনের বৃদ্ধি ও রক্ত আমাশার ঔষধ হিসেবে প্রাচীনকাল থেকে ভারতে ব্যবহৃত হয়ে আসছে। টাটকা মূল ব্যবহৃত হয় কফনাশক ও বাতের চিকিৎসায়। 

কেঁউঃ এটা হল আদার এক জাতি। রাস্তার ধারে, পতিত জমিতে বা অরণ্যের নিচু জায়গায় কেঁউ যথেষ্ট দেখা যায়। মাটির নিচে এর কন্দ জন্মায়। তবে পাখিরা এর বীজসহ ফল খেয়ে দূরে মলত্যাগ করলে মলের সাথে বেরনো বীজ থেকে চারাগাছ জন্মায়। এভাবে কেঁউ দূরে ছড়িয়ে পড়ে ও বংশ বিস্তার করে।

ভেষজ গুণাবলীঃ কেঁউ পাতার রস ভালো হজম করায়, খিদে বাড়ায়। জ্বর, আমাশা, ডায়েরিয়া, কফ, কাটা-ছেঁড়া, ক্ষত, চর্মরোগ, জন্ডিস, আরথ্রাইটিস, কোষ্ঠকাঠিন্য, কুষ্ঠ, হাঁপানি, ব্রঙ্কাইটিস, রক্তাল্পতা, কৃমি, চুলকানি, বমিভাব ইত্যাদি রোগের ঔষধ ও সাপে কাটার প্রতিষেধক হিসেবে কেঁউ পাতার নির্যাস প্রাচীনকাল থেকে ভারতীয় সমাজে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

বেথুয়াঃ 
গ্রাম বাংলার খুব পরিচিত শাক হল বেথুয়া বা বেথো। মাঠে-বাগানে আপনা-আপনি জন্মায় আগাছার মতো, কেউ চাষ করে না। বেথুয়া শাকে প্রচুর ভিটামিন–এ, ভিটামিন–সি, লোহা, ক্যালসিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম, পটাশিয়াম, ফসফরাস ও জিঙ্ক এবং গুরুত্বপূর্ণ ৮ টি অ্যামাইনো অ্যাসিড থাকে।

ভেষজ গুণাবলীঃ কোষ্ঠবদ্ধতা, রক্তাল্পতা, অম্বল, কৃমি, কিডনি স্টোন, মুখে ঘা, পায়েরিয়া, চর্ম রোগ, বাত ও অর্শ প্রতিরোধে বেথুয়া শাক খুব উপকারী। গর্ভরোধক হিসেবে এর ব্যবহার রয়েছে।

কালকাসুন্দাঃ রাস্তার দুধারে, পতিত জমিতে, জঙ্গলে সব জায়গায় দেখা যায়। 

ভেষজ গুণাবলীঃ অ্যালার্জি, কোষ্ঠবদ্ধতা, হুপিং কাশি, কফ, জ্বর,  ম্যালেরিয়া, কনজাংটিভাইটিস ও ক্ষত নিরাময়ে কালকাসুন্দার পাতার রস খাওয়া হয়। মৃগি রোগীদের চিকিৎসায় গোটা উদ্ভিদের রস ব্যবহার হয়। রজঃস্রাবের সময় যন্ত্রণা হলে মূলের রস ভালো কাজ দেয়। আবার ডায়াবেটিস রোগের চিকিৎসায় কালকাসুন্দার ছাল ভেজানো জল খেলে উপকার হয়।

নিমঃ নিমের উৎপত্তি হল ভারতীয় উপমহাদেশ। এর নরম পাতা অনেকেই চিবিয়ে খায়। খুব তেতো স্বাদ।  বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা (হু) নিমকে ‘একুশ শতকের বৃক্ষ’ নামে অভিহিত করেছেন।

ভেষজ গুণাবলীঃ নিম পাতা বা পাতার রস কুষ্ঠ, চর্মরোগ, বহুমুত্র, জন্ডিস, একজিমার ভালো ঔষধ। ব্লাড সুগারের রোগীরা প্রতিদিন সকালে ১০-১২টা করে নিমপাতা চিবিয়ে খেলে সুগার কমে। নিম তেলের শুক্রানুনাশক ক্ষমতা থাকায় এটি জন্মনিয়ন্ত্রক হিসেবেও ব্যবহার করা যায়। নিমের ছাল ভিজিয়ে জল খেলে অজীর্ণ রোগ সারে।

সরষেঃ সরষে  ফুল থেকে জন্মায় সুন্দর ছোটো ছোটো শুঁটি। শুঁটির ভেতরে থাকে হালকা হলুদ বা বাদামি রঙের বীজ। বীজ থেকে প্রাপ্ত তেল ভারতে রান্নার কাজে সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হলেও এর শাকের জনপ্রিয়তাও কম নয়। গ্রিন স্যালাড হিসেবেও সরষে শাক কাঁচা খাওয়া হয়। আর মশলা হিসেবে সরষের ব্যবহার তো সারা ভারতেই প্রচলিত।

ভেষজ গুণাবলীঃ স্কিন, লিভার ও চোখের পক্ষে সরষে শাক খুব উপকারি। ভিটামিন K, C ও E এবং ক্যালশিয়াম, পটাশিয়াম, ম্যাগনেশিয়াম ও লোহার সমৃদ্ধ উৎস হল এই শাক। এই শাক খেলে ক্যানসার, হৃদরোগ ও অ্যাথেরোস্ক্লেরোসিস হবার সম্ভাবনা কমে। এছাড়া আর্থ্রাইটিস, অস্টিওপোরোসিস ও রক্তাল্পতা রোগের নিরাময়ে সরষে শাক যথেষ্ট উপকারি।

শালিঞ্চাঃ যে কোনও জলাশয়ের ধারে এই বীরুৎ জাতীয় লতানে গাছটিকে দেখা যায়।  এর আরেক নাম Joyweed। 

ভেষজ গুণাবলীঃ চোখ, চুল ও চামড়ার জন্য শালিঞ্চা শাক খুব উপকারী। ডায়েরিয়া, অজীর্ন, হাঁপানি, কফ, জ্বর, রাতকানা, খোসপাঁচড়া, একজিমা, অর্শ ও অন্ত্রে ঘায়ের চিকিৎসায় এই শাক খেলে উপকার হয়। এই শাক খেলে মায়ের স্তনদুগ্ধের পরিমাণ বাড়ে। প্রতিদিন ৭৫ গ্রাম করে শালিঞ্চা শাক খেলে ডায়াবেটিস রোগীর রক্তে সুগারের পরিমাণ কমে। চোখে জল পড়া, কনজাংক্টিভাইটিস, মায়োপিয়া ও ক্যাটারাক্ট চিকিৎসায় মূলের রস ব্যবহৃত হয়। 

জয়ন্তীঃ জয়ন্তী গাছ হল শিম পরিবারের শাখা-প্রশাখাযুক্ত উদ্ভিদ। 

ভেষজ গুণাবলীঃ উদরাময়, বহুমূত্র, আলবিনিসম, এপিলেপসি, মানসিক সমস্যা, জ্বর, টিউবারকুলোসিস, কিডনির সংক্রমণ, গনোরিয়া ইত্যাদি রোগের চিকিৎসায় ও কৃমিনাশকের কাজ করে। সদ্য প্রসূতিদের জন্য এই শাক খুব উপকারি। মেধা ও স্মৃতিশক্তি বাড়াতেও জয়ন্তী পাতার রস খাওয়ানো হয়।

গুলঞ্চঃগুলঞ্চ বর্তমানে বিলুপ্তপ্রায় ও সংরক্ষিত উদ্ভিদ।

ভেষজ গুণাবলীঃ গুলঞ্চকে স্বর্গীয় উদ্ভিদ বলে গণ্য করা হয় এর ভেষজ গুণের জন্য। ডায়াবেটিস, উচ্চ কোলেস্টেরল, অ্যালার্জিক রাইনাইটিস, লিম্ফোমা সহ অন্যান্য ক্যানসার, কুষ্ঠ, যক্ষ্মা, কোষ্ঠকাঠিন্য, বাত, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস, হেপাটাইটিস, পেপটিক আলসার, গনোরিয়া, সিফিলিস, জ্বর ইত্যদি নানা রোগের আয়ুর্বেদিক চিকিৎসায় গুলঞ্চ ব্যবহৃত হয়। গুলঞ্চ শাক খেলে ইমিউনিটি বাড়ে। গুলঞ্চের রস নিয়মিত খেলে রক্তে ইউরিয়ার মাত্রা সঠিক থাকে।

পলতা বা পটল পাতাঃ  ভারতে পুরো গ্রীষ্ম, বর্ষা ও শরৎকাল জুড়ে পটলই অন্যতম প্রধান সবজি।

ভেষজ গুণাবলীঃ শ্বাসতন্ত্রঘটিত যে কোনও রোগ সারাতে পটল পাতা উপকারি। রক্তবর্ধক ও রক্তশোধক হিসেবে এবং লিভার ও চর্ম রোগ সারাতে পটল পাতা খুব কার্যকর। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত ব্যক্তিদের রক্তে শর্করার পরিমাণ কমাতে এবং রক্তে ব্যাড কোলেস্টেরল কমাতে পটল পাতার কার্যকরী ভূমিকা বিজ্ঞানীরা প্রমাণ করেছেন। পটল পাতা নিয়মিত খেলে কোষ্ঠকাঠিন্য ও মানসিক অস্থিরতা দূর হয়। পটল পাতা ক্ষিদে ও হজমশক্তি বাড়ায়। জন্ডিস, কফ, জ্বর, পিত্তজ্বর, টাইফয়েড, অর্শ, কৃমি, ডায়েরিয়া ইত্যাদি রোগে পটল পাতা খেলে কাজ দেয়।

ভাঁট বা ঘেঁটুঃ ঘেঁটু হল অসাধারণ ভেষজগুণসম্পন্ন উদ্ভিদ। 

ভেষজ গুণাবলীঃ ঘেঁটুতে প্রচুর ফ্ল্যাভোনয়েড (ভিটামিন বি ২)  থাকায় এটি ক্যানসার প্রতিরোধে সক্ষম। এছাড়া চুলপড়া, হাঁপানি, কফ, বাত, জ্বর, চর্মরোগ, লিভারের রোগ, মাথার যন্ত্রণা, কৃমি, কোলেস্টেরল, ব্লাড সুগার ইত্যদি রোগ প্রতিরোধে ঘেঁটু পাতা খুব কার্যকর। 

হেলেঞ্চা বা হিংচেঃ হেলেঞ্চা বা হিংচে হল জলজ লতানে গাছ। 

ভেষজ গুণাবলীঃ আয়ুর্বেদে হেলেঞ্চাকে রক্তশোধক, পিত্তনাশক, ক্ষুধাবর্ধক, ব্যথানাশক, জীবানুনাশক ও জ্বরনাশক হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। এই শাক নিয়মিত খেলে রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বাড়ে। কোষ্ঠকাঠিন্য, হাঁপানি, ডায়েরিয়া ও স্নায়ুরোগের ভেষজ চিকিৎসায় হেলেঞ্চা ব্যবহৃত হয়। হেলেঞ্চা শাকে যথেষ্ট অ্যান্টি-অক্সিড্যান্ট থাকায় এর ক্যানসার প্রতিরোধী ভূমিকা রয়েছে। মাথার যন্ত্রণায় মাথায় এই শাক বেটে লাগালে যন্ত্রণা কমে। হেলেঞ্চা শাক নিয়মিত খেলে ব্লাড সুগার কমে।

শুষনিঃ নরম কান্ডের এই লতানে উদ্ভিদটি জলাশয়ের পাড়ে বা ভেজা জায়গায় জন্মায়। 

ভেষজ গুণাবলীঃ জনশ্রুতি রয়েছে যে শুষনি শাক খেলে ঘুম পায়। তাই ইনসোমনিয়াতে যাঁরা ভোগেন তাঁদের নিয়মিত শুষনি শাক খেলে কাজ দেয়। এ ছাড়া নিয়মিত শুষনি শাক খেলে মাথার যন্ত্রণা, তীব্র মানসিক চাপ, উচ্চ রক্তচাপ, হাঁপানি, শ্বাসকষ্ট, গায়ে ব্যথা,পায়ের পেশির অনিয়ন্ত্রিত সংকোচন, বাত, জিভে ও মুখে ক্ষত, চর্মরোগ ইত্যদি দূর হয়। শুষনির কাশি ও কফ নিরাময়কারী ভূমিকা বিজ্ঞানীদের দ্বারা প্রমাণিত। চোখের রোগ, ডায়াবেটিস ও ডায়েরিয়া নিরাময়ে শুষনি পাতার রস কার্যকর। সন্তান প্রসবের পর মায়েরা শুষনি শাক খেলে দুগ্ধক্ষরণ বাড়ে। সাপের কামড়ে শুষনি পাতার রস দিয়ে চিকিৎসা করার প্রচলিত রীতি রয়েছে।

শেলুকা বা শুলফাঃ মশলা উৎপাদক উদ্ভিদ হিসেবে শুলফা পরিচিত। 

ভেষজ গুণাবলীঃ মাতৃদুগ্ধের পরিমাণ বাড়াতে ও বাচ্চাদের পেটের রোগ সারাতে শুলফা শাক খুব উপকারী। বাচ্চাদের গ্রাইপ ওয়াটারের একটা উপাদান এই শুলফা শাক থেকে আসে। চোখের রোগ, চোখে ঘা, পুরানো ক্ষত, জ্বর, স্নায়ু রোগ, জরায়ুর ফাইব্রয়েড ইত্যদি রোগের নিরাময়ে শুলফা খুবই কার্যকর। বাচ্চাদের পেট ফাঁপায় শুলফা বীজ জলে ভিজিয়ে সেই জল খেলে দারুণ কাজ দেয়। শুলফা বীজ থেকে প্রাপ্ত তেল সায়াটিকা বাত, রিউম্যাটয়েড আর্থ্রাইটিস, স্পন্ডাইলোসিস, হাঁপানি, ব্রংকাইটিস, কফ ইত্যাদি রোগের চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।

এই চোদ্দো শাকের সবগুলো আজকাল সব জায়গায় পাওয়া যায় না। তাই বাঙালি ভূত চতুর্দশীতে চোদ্দো শাক খাওয়ার রীতি বজায় রাখতে গিয়ে শাকের তালিকাকে অনেকটা পরিবর্তন করে ফেলেছে। এখন শহুরে এলাকায় যে চোদ্দো শাক বেশি প্রচলিত সেগুলো এই সব শাকের মধ্যে থেকেই নির্বাচিত – পালং, মুলো, লাল শাক, কলমি, শুষনি, সরষে, পাট, নটে, ধনে, মেথি, পুঁই, লাউ, কুমড়ো, হিংচে ও গিমে। অবশ্য গ্রামের দিকে চোদ্দো শাকের তালিকায় পুনর্ণবা, কুলেখাড়া, বন নটে, কাঁটা নটে, তেলাকুচো, চিকনি, থানকুনি, শতমূলি, আমরুল, নুনিয়া ইত্যদিও যোগ হয়েছে। বলাবাহুল্য এইসব শাকের ভেষজ ও পুষ্টিগত গুণও অসাধারণ।
স্থানভেদে ও শাকভেদে নানা শাকের রেসিপি নানারকম। তবে বেশিরভাগ বাঙালি এই সব শাকের ভাজা বা চচ্চড়ি খেতে পছন্দ করে। শাকের তালিকা লক্ষ্য করলে দেখা যাবে যে পুরোনো তালিকার বেশিরভাগ শাকই ছিল প্রকৃতির স্বাভাবিক শাক। নয়া তালিকার অনেক শাকও স্বাভাবিক শাক। এদের আমরা চাষ করি না। এগুলো মাঠে-ঘাটে আপনিই জন্মায়। এই শাকে না আছে কোনও কীটনাশক, না আছে কোনও রাসায়নিক সার। ফলে এই সব শাকের পুষ্টিগুণ অসাধারণ। পালং, নটে, মুলো, পুঁই ইত্যদি শাক চাষে ব্যাপক কীটনাশক ও রাসায়নিক সার ব্যবহার করা হয়। তাই আমরা যদি মাঠে-ঘাটে জন্মানো শাকগুলি বেশি বেশি খেতে পারি তবে আমাদের স্বাস্থ্য রক্ষা করা অনেক সহজ হবে। এ জন্য এইসব দেশীয় শাককে চিনতে হবে। মোবাইল আর ল্যাপটপের দুনিয়ায় সারাদিন ঘোরাঘুরি করলে তো আর এই সব শাক চেনা সম্ভব নয়। পাশাপাশি জানতে হবে এই সব শাক রান্নার পদ্ধতিও। যাঁরা রেসিপি জানতেন, সেই সব মানুষ বর্তমানে নেইও। বর্তমান প্রজন্ম ফাস্ট ফুডের চক্করে পড়ে এসব শাকের থেকে অনেক দূরে সরিয়ে নিয়েছে নিজেদের। কিন্তু ফাস্ট লাইফে ফাস্ট ছুটতে হলে এসব শাকের ভূমিকা যথেষ্ট রয়েছে আর শুধু কালীপুজোর আগের দিনই নয়,বছরে মাঝে মধ্যে এইসব শাক খেয়ে মুখের স্বাদ বদল করা উচিত। 

"যতই খাও বার্গার,পিৎজা প্যাটিস আর মোমো চাইনিজ
শাক ও খেয়ো মাঝে মাঝে,তবেই প্রিভেন্ট হবে  ডিজিস"।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শনিবার, ১ অক্টোবর, ২০২২

শিরোনাম - পরিপক্কতা ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - পরিপক্কতা
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

পরিপক্কতা বলতে আমরা যেটাকে ম্যাচুরিটি বলি আর কি! সেটা শুধু শারীরিক হয় না, মানসিক হয়। আর মানসিক পরিপক্কতা শারীরিক পরিপক্কতার চেয়ে অনেক বেশী সংবেদনশীল। একজন ছেলে বা মেয়ে যখন বয়: সন্ধিকালে প্রবেশ করে তখন হরমোনের জন্য শারীরিক যেসব পরিবর্তন হয়, তেমনি মানসিক অবস্থারও পরিবর্তন ঘটে। একটা উৎফুল্লতা বা ইউফোরিক স্টেজে তারা থাকে, আর অনেক বেশি আবেগপ্রবণ হয়ে থাকে। এইসময় ইমোশনাল ডিসব্যালান্স কে ওভার কাম করে তাদের সঠিক দিশা দেখানোর জন্য তাদের সঙ্গে সব সময় বন্ধুর মতো মেশা উচিত। কোনো কিছুই জোর করে চাপিয়ে দেওয়া উচিত নয় একদম। সব কিছুর ঘেরাটোপে তাদের জীবন বন্দী করে রাখাও যেমন ঠিক নয় তেমনি অতিরিক্ত স্বাধীনতাও দেওয়া ঠিক নয়। বন্ধু সুলভ আচরণ করে মনের গভীরে গিয়ে মানসিক দোলাচলের কারণ জানা দরকার, কোনো সাহায্যের জন্য হাত সব সময় বাড়িয়ে দেওয়া খুব প্রয়োজন। যাতে এই সময় থেকে তারা ভবিষ্যতের জন্য সঠিক পথ অনুসরণ করতে পারে, সেই দিশা তাদের দেখানো উচিত। প্রয়োজন পড়লে দু চারটে অ্যাডোলেসেনট কাউন্সিল এর সিটিং ও নেওয়া যেতে পারে। জীবনের সব মুহূর্তের মত এই পরিপক্ব হবার মুহূর্ত টাও তারা যাতে সুন্দর ভাবে উপভোগ করতে পারে স্ট্রেস ফ্রী হয়ে সেই চেষ্টাই সর্বদা করা উচিত। 

"বয়: সন্ধিকালে চলে যে নানা হরমোনের খেলা
গুরুত্ব দিও সকলকে,কোরোনা কোনো অবহেলা।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২২

আলো আঁধারের খেলা ✍️ডা: অরুণিমা দাস

আলো আঁধারের খেলা
 ✍️ডা: অরুণিমা দাস

জীবন মানে আলো আঁধারির মিশেল। আলো আর আঁধার একটা কয়েনের এপিঠ ওপিঠ। যখন কোনো মানুষ অন্ধ হয়, দুনিয়ার রূপ,রস আস্বাদন করতে সে অক্ষম হয় কিন্তু তাই বলে আলো কিন্তু অন্ধকারে পরিণত হয়না তার জন্য। প্রকৃতির নিয়মে সূর্য চন্দ্র ওঠে,আলোকিত থাকে চারিপাশ। শুধু অন্ধকারের নাগপাশে আবদ্ধ থাকে সেই অন্ধ মানুষের জীবন। কোনো কিছুর বিনিময়ে আলো যেমন অন্ধকারে পরিণত হয় না তেমনি অবস্থার বিপাকে পড়ে কারোরই নৈতিক জ্ঞান, বুদ্ধি বিসর্জন দেওয়ার কোনো প্রয়োজন রয়েছে বলে মনে হয় না। জ্ঞানচক্ষু উন্মীলিত হোক সকলের, আঁধারে নিজেকে ডুবিয়ে না রেখে আলোর দিশায় এগিয়ে নিয়ে যান সকলে। অন্ধত্ব একটা প্রতিবন্ধকতা মাত্র, তার জন্য আলো কখনোই অন্ধকার হয়ে যাবে না। 
প্রতিটি মানুষের জীবনে ব্যর্থতা রয়েছে। যখন মানুষ ব্যর্থ হয়ে নিজের জীবনের প্রতি আর আস্থা রাখে না, এমনকি জীবনের সমস্ত আশা আকাঙ্ক্ষার কথা ভুলে শেষ দিনের আশায় প্রহর গুনতে থাকেন। তখন এই উক্তি বা বাণী মানুষকে হতাশার মুখ থেকে বার করে নতুন করে বাঁচার পথ দেখায়। 
 
থেকো না অন্ধকারে,দিচ্ছে আলো হাতছানি দেখো দিয়ে মন
আলো আঁধারের খেলা চলছে আর চলবে যে সারাজীবন।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

মঙ্গলবার, ৯ আগস্ট, ২০২২

জীবন শুধুই গতিময় ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

জীবন শুধুই গতিময় 
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

এই জগৎ স্থিতিশীল নয়। অনন্তকাল ধরে এটি চলবে মহাকালের গতি যেদিন থেমে যাবে সেদিন ঘটবে মহাপ্রলয়। এই যাত্রা পথে আমাদের জীবনও তাই এবং ভবিষ্যতেও গতিশীল। গতিশীলতার মধ্যেই ফুটে ওঠে জীবনের লক্ষণ। সংগ্রাম পূর্ণ আমাদের জীবন। জীবনে বেঁচে থাকতে হলে কাজের প্রয়োজন। কর্মই মানুষকে গতিশীল রাখে। অলস মানুষেরা সমাজে জীবন্মৃত অবস্থায় পড়ে থাকে। স্রোতস্বিনী নদীর জলের বয়ে চলার জন্য সেখানে শেওলা জমাতে পারে না। কিন্তু স্রোতহীন নদী শেওলায় ভরে যায় এবং এতে জল নষ্ট হয়ে ব্যহারের অযোগ্য হয়। তেমনি কর্মময় জীবনই হচ্ছে জীবন। কর্মহীন জীবন মৃত্যুর নামান্তর। এ পৃথিবী হচ্ছে এক বিরাট রণক্ষেত্র। সংগ্রাম করে,যুদ্ধ করে এখানে নিজের অস্তিত্ব টিকিয়ে রাখতে হয়। ডারউইন বলেছেন, "প্রকৃতির জগতে যে অধিকতর যোগ্য সেই টিকে থাকবে।" অথাৎ পৃথিবীতে বাঁচতে হলে, টিকে থাকতে হলে সংগ্রাম করেই টিকে থাকতে হবে। দৃষ্টি রাখতে হবে সামনের দিকে, পেছনের দিকে নয়। চিন্তা,চেতনায় যারা অগ্রসর তারাই এগিয়ে যায় প্রগতির পথে আর তারাই আনে বিবর্তন, সৃষ্টি করে নতুন সভ্যতা। মানুষের কল্যাণের জন্য তারাই আবিষ্কার করে নতুন নতুন উপাদন। আর যারা কর্মহীন তারা জড় পদার্থের মত অচল। এরা কোন উপকারেই তো আসেই না বরং অপরের চলার গতিকে ব্যাহত করে। তাই এরা যেমন উপেক্ষিত তেমনি অবাঞ্চিত।
কর্মহীন জীবন কোন মানুষেরই কাম্য হতে পারে না। এতে করে মানুষ অচল ও অসাড় হয়ে পড়ে। কাজই মানুষের জীবনে আনবে গতি। যে গতিতে মানুষ জীবনের অর্থ খুঁজে পাবে। এগিয়ে চলাই জীবন, থেমে যাওয়া যে মরণ। 
ছোট্ট একটা গল্প দিয়ে শেষ করবো। এক মেয়ের গল্প যে ফার্স্ট ইয়ার এমবিবিএস এ এনাটমি বায়োকেমিস্ট্রি আর ফিজিওলজি দেখে ঘাবড়ে গেছিলো, ভেবেছিল মেডিক্যাল পড়া ছেড়েই দেবে। ভয়ে কোনো ক্লাসে যেত না। ফল স্বরূপ ফাইনাল এক্সাম এনাটমি, বায়োকেমিস্ট্রিতে সাপ্লি পেলো। বন্ধুরা দূরে সরে গেলো। ম্যাডাম দেখা হলে বলতো এই যে দুটো সাবজেক্টে ফেল করলি পোস্ট গ্রাজুয়েট এন্ট্রান্স এক্সাম দিতে অসুবিধে হবে। ফাইনাল ইয়ারে চারটে সাবজেক্ট। কি করে পাস করবি? মুখে ক্রুর হাসি। চুপ করে সব কথা হজম করেছিল মেয়েটি সেদিন। বন্ধুরা সব সেকেন্ড ইয়ারে উঠে গেছে। প্যাথলজি, মাইক্রোবায়োলজি, ফার্মাকোলজি পড়া শুরু করেছে আর সে! তখনি এনাটমি আর বায়োকেমিস্ট্রির মাঝে স্যান্ডউইচ হচ্ছে প্রতিদিন। তিনমাস পর সাপ্লি এক্সামের ডেট এলো। পরীক্ষা দিয়ে এলো কোনো রকমে। দুটো সাবজেক্টের ম্যাডাম গম্ভীর ভাবে পরীক্ষা নিলো। পাস না ফেল কিছু বোঝা গেলো না। যাইহোক কোনো রকমে পাস হলো সে সাপ্লি এক্সামে। এদিকে সেকেন্ড ইয়ারে তিনমাসে তখন ক্লাস অনেক এগিয়ে গেছে। কেউ কেউ কোলকাতা গিয়ে কোচিং নিচ্ছে। মেয়েটি কলেজেরই এক স্যারের কাছে প্যাথলজি কোচিং নিতে ভর্তি হলো। বাকি সাবজেক্ট নিজেই পড়তো। হাল ছেড়ে দেয়নি কোনোদিন সে। মোটামুটি যখন প্যাথলজিটা আয়ত্ত করেছে স্যার বললেন এক্সট্রা নোটস দেবো, পড়তে পারবি? কোনোকিছু না ভেবেই হ্যা বলে দিলো মেয়েটি। প্যাথলজি প্রাকটিক্যাল খাতায় যে স্লাইড গুলো  আঁকতো মেয়েটি স্যাররা ভেরি গুড বলতেন। সাইন করে গুড লিখেও দিতেন। দিন এমন এলো যে একটা সাপ্লি পাওয়া মেয়ের কাছে বেশি মার্কস নিয়ে পাস করা বন্ধুরা আসতো স্লাইডের ছবি কারেক্ট করাতে। সেকেন্ড ইয়ারে ওই ল্যাগ যাওয়া তিনমাসের পড়া পড়ে পাস করতে কোনো কষ্ট হয়নি সেরকম। কারণ মেয়েটি কোনোদিন থেমে থাকেনি। বায়োকেমিস্ট্রি ম্যাম আবার খোজ নিয়েছিলেন মেয়েটি ফার্মাকোলজিতে পাস করেছে কিনা! কারণ ওনার ধারণা ছিল বায়োকেমিস্ট্রি তে ফেল করলে ফার্মাকোলজি তে ফেল অবধারিত। এরকম সব টিচার হলে কী আর বলা যায়!
যাইহোক এরপর আর কোনো সাপ্লি জোটেনি মেয়েটির ভাগ্যে। প্রতি ইয়ারে ফাইনাল এক্সামে স্যার ম্যাম সবাই জিজ্ঞেস করতেন মেয়েটিকে, "তোকে সাপ্লি কে দিয়েছিলো রে?" মেয়েটি হাসি মুখে এড়িয়ে যেতো সেই প্রশ্ন। ফাইনাল ইয়ার পাস করে ইন্টার্নশিপ শেষে যখন গাইনি তে হাউসস্টাফশিপ করতে ঢুকলো মেয়েটি,গাইনির স্যার বলেছিলেন একি কাজ পারবে? মনে হয় না খুব ভালো কাজ পারবে! এরপর একবছর হাউস স্টাফ শিপ শেষে সেই স্যারই বলেছিলেন আরো তিনটে মাস রিনিউ করে এই ইউনিটে থেকে যা না! মেয়েটি নাকচ করেছিল পোস্ট গ্র্যাজুয়েশন এক্সামের প্রিপারেশন নেবে বলে! তারপর লড়াই করে পোস্ট গ্রাজুয়েশন এন্ট্রান্স এক্সাম ক্লিয়ার করার পর একদিন কলেজে আন্ডার গ্রাজুয়েট ডিগ্রী সার্টিফিকেট আনতে গিয়ে সেই বায়োকেমিস্ট্রি ম্যামের সাথে দেখা। ম্যাম রেজাল্ট জেনেছিলেন কোথাও থেকে। চলে যাচ্ছিলেন মুখ লুকিয়ে। মেয়েটি গিয়ে প্রণাম করে বলেছিল "ভালো আছেন ম্যাম?" ম্যাম বললো হ্যা রে! তোর এমডি ক্লাস কবে থেকে শুরু হবে? কোন কলেজ হলো জানাস। সেদিন আর ক্রুর হাসি নেই ম্যামের মুখে। অনুতাপের ছোঁয়া লেগেছিল মুখে। সেদিন ম্যামকে ক্যান্টিনে নিয়ে গিয়ে মিষ্টি খাইয়েছিল মেয়েটি। আজও ম্যাম ফোন করলে হাসি মুখে কথা বলে মেয়েটি,এটাই যে ভদ্রতা। যে ম্যাম একদিন সাপ্লি নিয়ে হেসেছিল সে আজ বলেন বাবু এরপর সুপার স্পেশালিটিটা করতে হবে! তুই পারবি। লড়াই চালিয়ে যাবি, হাল ছেড়ে দিবি না কিন্তু। মেয়েটি বলে চেষ্টা করবো ম্যাম,জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত লড়াই করে যাবো,বিশ্রাম নেবার জন্য স্থির সময় তো ভগবান ঠিক করে রেখেছেনই! ম্যাম চুপ করে শোনেন সে কথা। 
"চলুক লড়াই জীবনে প্রতিপদে এগিয়ে যাওয়ার
বিশ্রামের জন্য মাটির নিচে জায়গা করা আছে সবার।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ৪ আগস্ট, ২০২২

চাই না খ্যাতি,মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

চাই না খ্যাতি,মানুষ হয়ে বাঁচতে চাই
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

আজকেই ঘটে যাওয়া একটা ঘটনা বলি, হয়তো আজকের বিষয়ের সাথে কিছুটা হলেও মিল পাওয়া যাবে। 
আজকের ওটি তে ঘটা একটা ঘটনা শেয়ার করতে চলেছি। ছোট্ট ছয় বছরের বাচ্চা এসেছে যার নাকের হাড় বাঁকা, আমাদের ভাষায় ডেভিয়েটেড নাসাল সেপটাম বলে যাকে। বাচ্চাটার আস্থমার হিস্ট্রি ছিল। শ্বাসকষ্ট হতো মাঝে মধ্যে। সব জেনেও বর্তমানে অবস্থা স্থিতিশীল থাকার জন্য অজ্ঞান করে অপারেশন শুরু করা হয়। পেশেন্টকে ভেন্টিলেটরে দেওয়া হয়। বেশ কিছুক্ষন ওটি চলার পরে হঠাৎ বাচ্চাটির স্যাচুরেশন কমতে শুরু করে, আর মুখের টিউব দিয়ে গোলাপী রঙের ফেনা বেরোতে থাকে। আমরা সার্জেনদের ওটি বন্ধ করতে বলি সঙ্গে সঙ্গে। আমাদের স্যার এসে আমাকে যা নয় তাই বলে ঝাড়তে শুরু করেন। কাঁদো কাঁদো অবস্থা তখন আমার। সিনিয়ররা কেউ খুব একটা আমার সাপোর্টে কথা বলেনা প্রথমে। এরকম ঘটনা হবার কারণ খুঁজতে গিয়ে দেখা যায় ভেন্টিলেটর মেশিনে সমস্যা, তাই বাচ্চাটির শরীরে অক্সিজেন সরবরাহ কমে গিয়ে সাচুরেশন কমছিল আর তার ফলেই লাং ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে ইডিমা ডেভেলপ করে। স্যার পরিষ্কার বলে দিলেন নিজের রেপুটেশন খারাপ করবেন না তাই এর সমস্ত দায় পি জি টি র ঘাড় দিয়েই যাবে। খুব কষ্ট হচ্ছিল তখন শুনে। নিজে বিখ্যাত বলে আজ সব দোষ পি জি টির, যাইহোক কিছু বলার নেই এতে। পি জি টি যখন ঘেমে নেয়ে ক্লান্ত হয়ে সব ম্যানেজমেন্ট করে পেশেন্ট কে স্ট্যাবল করে দিলো তখন স্যারের মুখের কথা চেঞ্জ, কার কাছে ট্রেনিং পাচ্ছিস দেখতে হবে তো! তখনো পি জি টি চুপ, কারণ স্যারের মুখের ওপর কথা বলা স্বভাব নয় তার। স্যার পরে অনেক করে ভালো কথা বললেও পি জি টি স্যারের সাথে আর একটাও কথা বলেনি। কেস খারাপ হলে দায় স্যার নেবেন না। আর ভালো হলে ক্রেডিট স্যারের। এরম ভাবে বিখ্যাত স্যার না হয়ে সাধারণ ভাবে জীবন কাটানো পি জি টির সম্মান অনেক বেশী আমার কাছে। খ্যাতির শীর্ষে উঠবো বলে মানুষকে মানুষ জ্ঞান করবো না, এরকম অমানুষ হয়ে বিখ্যাত হবার কোনো প্রয়োজন নেই আমার। টিম ওয়ার্ক করতে গেলে কোনো ডিসাস্টার হলে দোষ পুরো টীমের, কারোর একার নয়। যাই হোক শেষ অব্দি বাচ্চাটা ভালো আছে, বিকেলে গিয়ে দেখেও আসা হয়েছে। শেষ ভালো যার, সব ভালো তার। 
পরম করুনাময় ঈশ্বরের কাছে অসংখ্য ধন্যবাদ বিপদে পাশে থাকার জন্য আর মুখোশের আড়ালে থাকা মানুষের আসল রূপ গুলো দেখানোর জন্য।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ২১ জুলাই, ২০২২

শিরোনাম- অবিজিত ✍️ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম- অবিজিত
✍️ডা: অরুণিমা দাস



"অবজ্ঞা অবহেলা হাসিঠাট্টা তোমায় নিয়ে যে যতই করুক  
তোমায় কখনো যেনো থামাতে না পারে সেইসকল নিন্দুক।"

যারা কাজ করে ভুল তাদেরই হয়। আর যারা সেই ভুল নিয়ে হাসি তামাশা করে তাদের মত নীচু মানসিকতার লোকেরা এই দুনিয়ার কলঙ্ক। এসব হাসি মজা মাথায় রেখে সেগুলোকে পজিটিভ ওয়ে তে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নাম ই চ্যালেঞ্জ। তাই লাইফ কে কখনোই বলা উচিত নয় "হোয়াই মি"! বলা উচিত "অলওয়েজ ট্রাই মি"!

আজ একজন এমন ব্যক্তির কথা বলতে চলেছি যার মস্তিষ্কের বিকাশ তার সমসাময়িক বাচ্চাদের মত ছিল না। কিছুটা ধীর গতিতে হচ্ছিলো। তার জন্য তাঁকে স্কুলে স্যার সহপাঠী দের উপহাসের পাত্র হতে হয়েছিলো। কিন্তু তাদের এই উপহাস তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি কোনো গণ্ডিতে। একদিন ঠিক তার প্রতিভার বিকাশ ঘটেছিল আর সেই প্রতিভার জোরেই তিনি একদিন বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। 

অনেক বড় বিজ্ঞানী ছিলেন তিনি। জন্ম হয়েছিল ১৮৭৯ সালে জার্মানির মিউনিখ শহরে। অথচ এই বিজ্ঞানীর ছেলেবেলা ছিল একেবারেই সাদাসিধে এবং সম্ভাবনাহীন। কেউ তখন ভাবতেও পারেনি এই ছাপোষা ছেলেটিই বড় হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হবেন। এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যে পুরস্কার, নোবেল প্রাইজ সেটাও তিনি পাবেন বিজ্ঞানের একটি থিওরি আবিষ্কার করে। এই ব্যাক্তি সর্বপ্রথম আলোচনায় আসেন একটি নিবন্ধ লিখে। নিবন্ধের বিষয় আপেক্ষিকতাবাদ। অথচ ভেবে দেখলে বোঝা যায় আত্মভোলা,বেখেয়ালি এই বিজ্ঞানির বয়স তখন মাত্র কুড়ি। সেই জন্মের পর থেকেই কিন্তু তিনি আত্মমগ্ন থাকতে ভালোবাসতেন। অহেতুক কিছু বলা একেবারেই ছিল স্বভাববিরুদ্ধ। একটা ঘটনা বলা যাক - ওনার সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে,তিনি কথা বলতে শুরু করেন দেরিতে, চার বছর বয়সে। পড়তে শেখেন আরও পরে,সাত বছর বয়সে। ডিলেড ডেভেলপমেন্টাল মাইলস্টোন ছিল তার। তিন পেরিয়ে চারে এসেও তিনি যখন কথা বলছিলেন না তখন বাবা-মা খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। এক রাতে তাদের দুশ্চিন্তার অবসান ঘটল। খাবার টেবিলে তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন, স্যুপটা খুব গরম! তাঁর মুখে কথা শুনে সবাই খুব অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, এতদিন তুমি কথা বলোনি কেন? তিনি উত্তর দিলেন,এতদিন তো সব ঠিকমতই চলছিল।সেই ছেলেবেলাতেই কতটা ভাবুক প্রকৃতির ছিলেন তিনি অথচ তার এই স্বভাবটিকেই মানুষ অন্য চোখে দেখত। একবার তো ক্লাসটিচার তার বিরুদ্ধে মন্তব্যই করে ফেললেন, এ বোকা ছেলেকে দিয়ে কিছু হবে না। আসলে ঘটনা হয়েছিল যে ছেলেবেলায় খুব শান্ত স্বভাবের ছিলেন। ক্লাসে স্যার কিছু জানতে চাইলে অনেক ভেবে উত্তর দিতেন। চট করে কিছু বলতে পারতেন না। ভাবতে গিয়ে দেরী তো হতোই,উপরন্তু তোতলামির কারণে কথা আটকে যেত। ফলে সহপাঠী, শিক্ষকদের কাছে তিনি প্রায়ই হাসির পাত্র হতেন। এসব কারণে ক্লাসটিচার একদিন বলেই ফেললেন,ছেলেটি আস্ত বোকা! ওকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।কিন্তু ছেলেটির মা এসব কথা মোটেই বিশ্বাস করতেন না। বরং সবাইকে শুনিয়ে বলতেন, তোমরা দেখে নিও ও বড় হলে অধ্যাপক হবে। অনেক নাম করবে। পরে মায়ের কথাই সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। ছেলেটি বড় হয়ে অধ্যাপক তো বটেই, অনেক বড় বিজ্ঞানী হয়েছিলেন।  ভাগ্যিস মা তখন ছেলেটির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আসলে মায়েরা তো এমনই হয়, তাই না! ছেলে একটু ভাবুক তাতে কী! সে বন্ধুদের সঙ্গে মারামারি তো দূরের কথা দুষ্টুমি পর্যন্ত করত না। সে থাকত তার মতো। তাই দেখে সবাই তাকে অন্যরকম বোকা ভাবত। কিন্তু তিনি মোটেও বোকা ছিলেন না। তিনি ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন কৌতূহলী।  হেরম্যান ছিলেন ছেলেটির বাবা। তিনি একবার ছেলেকে উপহার হিসেবে একটা কম্পাস কিনে দিলেন। কম্পাস পেয়ে ছেলেটি সারাক্ষণ শুধু সেটা নিয়েই মেতে থাকেন। হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন, আরে! কম্পাসের কাটা কেবল একদিকেই ঘুরে যাচ্ছে, কোনো অবস্থাতেই কাটা অন্যদিকে ফেরানো যাচ্ছে না কেন? তখন বাবার কাছে এর কারণ জানতে চাইলেন। বাবা ছেলের কৌতূহলী মনের পরিচয় পেয়ে খুব খুশি হলেন। তিনি ছেলেটিকে এর কারণ ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে বললেন। ছোটবেলার এই কৌতূহলই ছেলেটিকে বিজ্ঞানী করে গড়ে তুলেছিল। তাই তো হওয়ার কথা। তুমি যদি কোনো কিছু দেখে মনে প্রশ্ন না আসে সে তাহলে শিখবে কীভাবে? সে জন্যই তো বড়দের কাছে প্রশ্ন করে জেনে নিতে হয়। ছোটবেলায় ছেলেটির ইচ্ছা ছিল আলোর রথে চড়বেন। আলো নিয়ে তিনি সব সময় ভাবতেন। ক্লাসে বসে সূর্যের আলো, বাড়িতে বৈদ্যুতিক আলো নিয়ে ভাবতে গিয়ে অনেকবার বড়দের বকুনিও তাকে শুনতে হয়েছে। ১৪ বছর বয়সে আলোর রথে চড়ার বৈজ্ঞানিক পন্থা নিয়ে তিনি ভাবতে শুরু করেন। আপেক্ষিক তত্ত্ব তৈরির সময় এই ভাবনাই তাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে। অনেক বড় হয়েও কিন্তু তার মাথা থেকে আলোর রথে চড়ার এই ভূত যায়নি। তো একদিন হয়েছে কী! ছেলেটির স্কুল একেবারেও ভালো লাগত না। কিন্তু কী আর করা! মায়ের আদেশ স্কুলে যেতেই হবে। তাই বাধ্য হয়ে স্কুলে যাওয়া। মা বলেছে, বড় হয়ে অধ্যাপক হতে হবে, তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও পড়াশোনা করা। কিন্তু করলে কী হবে, ক্লাসে গিয়ে শেষ বেঞ্চে দেয়ালের কোণে চুপচাপ বসে থাকতেন। একদিন সূর্যের আলো জানালার কাঁচ ভেদ করে কীভাবে ক্লাসের ভেতর আসছে একমনে এ নিয়ে ভাবছিলেন। হঠাৎ স্যার তাকে দাঁড় করিয়ে পড়া জিজ্ঞেস করলেন। অমনোযোগী থাকায় তিনি উত্তর দিতে পারলেন না। স্যার তাকে শাস্তিস্বরূপ হল রুমে পাঠিয়ে দিলেন। হল রুম ছিল বেশ বড় এবং ঠাণ্ডা। ছেলেটির কিন্তু জায়গাটা বেশ পছন্দ হলো। ক্লাস থেকে বের করে দেয়ায় তিনি বরং খুশিই হলেন। কারণ সেখানে বসে তিনি অন্তত নিরিবিলি নিজের মতো করে ভাবতে পারবেন।ক্লাস, স্যারের তিরস্কার, সহপাঠীদের বিদ্রুপ- সব ভুলে ছেলেটি সেই ঠাণ্ডা হল রুমে বসে সূর্যের আলো নিয়ে ভাবতে ভাবতেই ক্লাসের সময়টুকু পার করে দিলেন। এই ভাবনাটাই ছিল তার গবেষণা। আর এই গবেষণা করেই তিনি আবিষ্কার করেছিলেন আপেক্ষিক তত্ত্ব E=mc^2।বড় হয়ে আমরা এসব নিয়ে পড়াশোনা করেছি ফিজিক্স এ। তাই কথা কম,কাজ বেশী এই মনোভাব নিয়ে চললে লোকের কথা আর গায়ে এসে লাগে না। জীবনে সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়ার দিশা দেখিয়ে দেয় লোকজনের এই হাসি,ঠাট্টা অবহেলা গুলো।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

মঙ্গলবার, ১৫ মার্চ, ২০২২

বেঙ্গলি কালচার

বেঙ্গলি কালচার
 
✍️ডা: অরুণিমা দাস



বাঙালি সংস্কৃতি বলতে সাধারণত বোঝানো হয় বিশেষ সমাজের সাহিত্য, সংগীত, ললিত কলা, ক্রিড়া, মানবিকতা, জ্ঞানের উৎকর্ষ ও আরো অনেক শান্তি ও সৌন্দর্যের সমাহার। এর পরও ব্যাপক দৃষ্টিতে দেখলে সংস্কৃতি হলো মানুষের জ্ঞান, আচার-আচরণ, বিশ্বাস, রীতিনীতি, নীতিবোধ, চিরাচরিত প্রথা, সমষ্টিগত মনোভাব, সামাজিক প্রতিষ্ঠান এবং অর্জিত কীর্তিসমূহ। নৃতাত্ত্বিক দিক দিয়ে সংস্কৃতি আবার ভিন্ন ধরনের একটি জটিল ধারণা। যেহেতু সব সংস্কৃতিই উৎস, বিকাশ, মূল্যবোধ এবং সংগঠনের দিক দিয়ে বিশিষ্ট, তাই বাহ্যিক রূপরেখা, তার বিবিধ প্রকাশ এবং নির্যাসে এক সংস্কৃতি অন্য সংস্কৃতি থেকে যথেষ্ঠ পৃথক। হাজার হাজার বছর ধরে নানা নৃতাত্ত্বিক এবং ধর্মীয় গোষ্ঠী ও শাখা-গোষ্ঠী, নানা শ্রেণির মিলন, পারস্পরিক প্রভাব এবং সমন্বয়ের ফলে গড়ে উঠেছে বঙ্গীয় সংস্কৃতি। বহু শতাব্দী ধরে সংস্কৃতির বিভিন্ন, এমনকি, পরস্পর-বিরোধী উপাদানের সহাবস্থান এবং সমন্বয়ের ফলে বঙ্গীয় অঞ্চলে বাঙালিত্বের এমন এক বৈশিষ্ট্য গড়ে উঠেছে যাকে বলা যায় বঙ্গীয় সংস্কৃতি এবং এক কথায় বলা যায় বঙ্গদেশ ও বাংলাভাষীদের সংস্কৃতি।
বাঙালি সংস্কৃতির ভিত্তি  বঙ্গীয় সংস্কৃতি যেহেতু বাংলাদেশ এবং বাংলাভাষীদের সংস্কৃতি, সে কারণে ‘বাঙ্গালা’ নামে একটি স্বতন্ত্র অঞ্চল গড়ে ওঠার আগে অথবা বাংলা ভাষা পুরোপুরি বঙ্গীয় বৈশিষ্ট্য লাভ করার আগেকার আঞ্চলিক সংস্কৃতিকে বাঙালি সংস্কৃতি বলে অন্তত তত্ত্বগতভাবে আখ্যায়িত করা যায় না। আবার এও স্বীকার্য যে,সুলতানি আমলের বাঙ্গালা রাজ্য অথবা বাংলা ভাষা গড়ে ওঠার মুহূর্ত থেকে বাঙালি সংস্কৃতির জন্ম হয়নি। বঙ্গীয় সংস্কৃতির ভিত্তি গড়ে উঠেছিলো আরো অনেক আগে থেকে।
বাঙ্গালা নামে পরিচিত এই বিরাট এলাকায় ছিলো অনেকগুলি রাজ্য-গৌড়, রাঢ়, দক্ষিণ রাঢ়, সুহ্ম, বরেন্দ্রী,সমতট এবং বঙ্গ। এছাড়া বিভিন্ন সময়ে আরও ছোটোখাটো রাজ্য ছিল। ১৩৫০-এর দশকে গৌড়ের সুলতান শামসুদ্দীন ইলিয়াস শাহ সোনারগাঁ জয় করে ‘শাহ-ই বাঙালিয়ান’ অর্থাৎ বাঙালিদের শাহ উপাধি গ্রহণ করেন। বৃহত্তর ‘বাঙ্গালা’র জন্ম তার আগে হয়নি। অন্য দিকে, বাংলা ভাষাও আবার মোটামুটি ওই সময়েই নিজের বৈশিষ্ট্য অর্জন করে স্বতন্ত্র ভাষার রূপ লাভ করে। দুদিক থেকেই বিবেচনা করলে বঙ্গীয় সংস্কৃতির বয়স তাই আটশো অথবা বড় জোর এক হাজার বছর। এর চেয়ে একে পুরানো বলে গণ্য করা যায় না। কিন্তু এই সংস্কৃতি গড়ে উঠেছিল এই অঞ্চলের হাজার হাজার বছরের পুরানো সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের ওপর ভিত্তি করে। একটা দৃষ্টান্ত দিয়ে বলা যায় যে, খাদ্যাভ্যাসের কারণে বাঙালিদের নাম ‘ভেতো’ বাঙালি। আর্য অথবা মুসলমানরা এ দেশে ধান আনেননি, ধানের চাষ এ অঞ্চলে আরম্ভ হয়েছিল অন্তত পাঁচ হাজার বছর আগে। পরে কখনো আর্য, কখনো সেন, কখনো তুর্কি, কখনো আফগান, কখনো মোগল এবং সবশেষে ইংরেজরা বঙ্গভূমি দখল করেছেন, তবু বাঙালিদের ভাত খাওয়ার অভ্যাসে পরিবর্তন হয়নি। ভাত বাঙ্গালীর একটি সাংস্কৃতিক ভিত্তি।
বঙ্গীয় সংস্কৃতির স্বাতন্ত্র্যের কারণ ভারতীয় উপমহাদেশের অন্যান্য সংস্কৃতির সঙ্গে যথেষ্ট মিল থাকলেও,বঙ্গভূমির ভৌগোলিক বৈশিষ্ট্য এবং বিবিধ নৃতাত্ত্বিক সংমিশ্রণের ফলে এর সংস্কৃতি নিজস্বতা লাভ করেছে। এর অবস্থান দীর্ঘদিনের শাসনকেন্দ্র দিল্লি থেকে শত শত মাইল দূরে ভারতীয় উপমহাদেশের একেবারে এক প্রান্তে। ধর্ম, দর্শন ও ধারণা, সাংস্কৃতিক ধারা ও শাসনকাঠামো - যা কিছু এই প্রান্তিক ভূখন্ডে এসে পৌঁছেছে, তা-ই অল্পকালের মধ্যে বঙ্গীয় চরিত্র দিয়ে প্রভাবিত হয়েছে। তদুপরি জালের মতো বিস্তৃত নদী-শাখা নদী এবং বনভূমি-পরিপূর্ণ বঙ্গদেশ আবার বহু ভাগে বিভক্ত হয়ে পড়েছে, ফলে এসব অঞ্চলেও সংস্কৃতি খানিকটা স্বাতন্ত্র্য লাভ করেছেন। এসব উপ-সংস্কৃতিও জাতি, ধর্ম, বর্ণ, এবং বহু উপভাষার কারণে বৈশিষ্ট্যমন্ডিত।
বৈদিক,বৌদ্ধ, জৈন এবং ইসলাম ধর্মের মতো প্রধান প্রধান ধর্মের উৎপত্তি-স্থান থেকে বঙ্গভূমি বহু দূরে অবস্থিত,সে কারণে এই সব ধর্মের কোনোটাই তার আদি এবং অকৃত্রিম রূপে এ অঞ্চলে পৌঁছায়নি। তদুপরি, এসব বহিরাগত ধর্মের সঙ্গে স্থানীয় ধর্মীয় বিশ্বাস এবং আচারের সমন্বয় ঘটেছে। এভাবে বঙ্গদেশের হিন্দু, বৌদ্ধ,জৈন এবং ইসলাম ধর্ম যেমন বঙ্গীয় বৈশিষ্ট্যপূর্ণ তেমনি বিভিন্ন ধর্মের অনুসারীদের মধ্যেও ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠান এবং সামাজিক রীতিনীতির কিছু মিল লক্ষ করা যায়। সপ্তম শতাব্দীতে চীনা পর্যটক হিউয়েন সাং লিখেছেন যে,তিনি বিভিন্ন ধর্মাবলম্বী স্থানীয় লোকদের ধর্মীয় দর্শন,আচার-আচরণ এবং সামাজিক রীতিনীতিতে অনেক সাদৃশ্য দেখেছেন। তিনি আরও লক্ষ করেন যে,বঙ্গীয় বৌদ্ধধর্ম মূল বৌদ্ধধর্ম থেকে অনেকটাই আলাদা।
বসতি এবং নৃতত্ত্ব পশ্চিম, উত্তর এবং মধ্যবঙ্গের তুলনামূকভাবে উঁচু এলাকা ছাড়া প্রাচীন বঙ্গভূমির অন্যান্য এলাকায় লোকবসতি ছিল খুব কম। মনে হয়,এখন যেমন জনবসতির একক হিসেবে হাজার হাজার গ্রাম গড়ে উঠেছে, সুলতানি আমলের আগে তা তেমন সংখ্যায় গড়ে ওঠেনি। দশম শতাব্দী থেকে রচিত বাংলা ভাষার আদি নিদর্শন চর্যাপদে গ্রামের কোনো উল্লেখ নেই। নিরাপত্তা এবং উৎপাদনের জন্যে লোকেরা তখন বোধ হয় ‘পুরী’ এবং ‘নগরে’ বাস করতেন। বসতির এই বৈশিষ্ট্য উপ-নাগরিক সামন্ততান্ত্রিক সংস্কৃতি গড়ে ওঠার সম্ভবত প্রধান কারণ ছিল। আর নৃতাত্ত্বিক দিক দিয়ে বেশির ভাগ বাঙালিই অস্ট্রো-এশিয়াটিক, কিন্তু দ্রাবিড় গোষ্ঠীও এর মধ্যে মিশিছে। এই দুটি প্রধান নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠী ছাড়া, বাঙালিদের মধ্যে তিববতী-চীনা এবং সেমেটিক রক্তেরও সংমিশ্রণ ঘটেছে।
সামাজিক গঠন বাঙালি সমাজ আগাগোড়াই পিতৃতান্ত্রিক এবং সোপানভিত্তিক। আর্যরা বঙ্গদেশে আসার আগে পর্যন্ত সামাজিক কাঠামো ঠিক কেমন ছিলো তা জানা না-গেলেও প্রাক-আর্যযুগে জাতিভেদ প্রথা ছিলো বলে মনে হয় না। অপর পক্ষে, আর্যরা যে বৈদিক ধর্ম নিয়ে এসেছিলেন, তাতে জাতিভেদ এবং বর্ণভেদ অনুযায়ী গোটা সমাজ চারটি স্তরে বিন্যস্ত ছিলো। এগুলো হলো ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয়, বৈশ্য এবং শূদ্র। ব্রাহ্মণদের সংখ্যা কম হলেও, তাঁরাই ছিলেন সমাজে সবচেয়ে শ্রদ্ধেয় এবং প্রভাবশালী আর সমাজের বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ অংশ।শূদ্ররা ছিলেন সবচেয়ে নিচের তলায় অবস্থিত এবং সবচেয়ে অবহেলিত ও শোষিত। দারুণ বৈষম্যকারী এই বর্ণভেদ প্রথা কেবল ধর্মের দিক দিয়েই বৈষম্য সৃষ্টি করেনি, বরং এ ছিল সামাজিক এবং অর্থনৈতিক বৈষম্যের ধর্মের বিধিবদ্ধ স্থায়ী ব্যবস্থা। বর্ণভেদ প্রথা কার্যত শ্রেণিভেদ প্রথা ছাড়া অন্য কিছু নয়। তা সত্ত্বেও জাতিভেদ-প্রথা সমাজের নিচের তলার লোকেরা নিজেদের মধ্যে কঠোরভাবে পালন করতেন না।
জাতিভেদ প্রথা বর্ণভেদেরই বহিঃপ্রকাশ। এই প্রথা অনুযায়ী শূদ্ররা অস্পৃশ্য। ক্ষত্রিয়দের সংখ্যা বঙ্গদেশে খুব কম ছিল। বৈশ্য এবং অন্য কোনো কোনো গোষ্ঠীর হিন্দুদের দিয়ে পরে তৈরি হয় কায়স্থ সম্প্রদায়। এ ছাড়া বৈদ্য সম্প্রদায় হলেন চিকিৎসা পেশার সঙ্গে জড়িত। তত্ত্বগতভাবে বৌদ্ধ এবং মুসলমানদের মধ্যে কোনো জাতিভেদ প্রথা থাকার কথা নয়, কিন্তু বঙ্গদেশে এসে তাঁরাও এই প্রথা দিয়ে প্রভাবিত হন এবং এক ধরনের জাতিভেদ প্রথার মধ্যে পড়ে যান। 
 মুসলমানরা আসার পর বর্ণহিন্দুরা সাধারণ মুসলমানদেরও গণ্য করতেন শূদ্রদের মতো। মুসলমানরা নিজেরা তাঁদের সমাজকে বিভক্ত করেন আশরাফ এবং আতরাফ এই দুই ভাগে। আতরাফ ছিলেন প্রধানত দেশীয় এবং নিম্নশ্রেণির মুসলমানরা। এই শ্রেণিভেদ প্রথা দিয়ে মুসলমানরা এতোটাই প্রভাবিত হয়েছিলেন যে,তাঁরা মসজিদেও এটা বজায় রাখেন সেখানে সুলতান এবং তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের জন্যে থাকতো উঁচু আসন। এ ছাড়া
আশরাফ এবং আতরাফদের মধ্যে বিবাহ হতো না, অথবা তাঁরা একত্রে ভোজনও করতেন না। বঙ্গসমাজের শতকরা আশি ভাগ অথবা তারও বেশি শূদ্র এবং গ্রামের মুসলমান। তাঁরাই ছিলেন উৎপাদন ব্যবস্থার সঙ্গে সরাসরি জড়িত - চাষী, শ্রমিক এবং নাপিত,জেলে, ছুতোর এবং জোলাদের মতো পেশাদার দক্ষ শ্রমিক।
মধ্যযুগে পরিবারগুলো একক পরিবার ছিল না, যদিও পরিবারের আয়তন ছিলো ছোট। উনিশ শতকের গোড়া থেকে হিন্দুদের মধ্যে একান্নবর্তী পরিবার গড়ে উঠতে থাকে বিশেষ করে শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এবং ছোট-বড় জমিদার পরিবারে। জমির মালিকদের মধ্যে এই প্রথা সম্ভবত গড়ে উঠেছিল ১৭৯৩ সালে প্রণীত চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের অন্যতম ফলাফল হিসেবে।
ধর্ম এবং বিশ্বাস খ্রিস্টের জন্মের কয়েক শতাব্দী আগে মোটামুটি একই সময়ে বৈদিক এবং বৌদ্ধধর্ম বঙ্গদেশে পৌছেছিল। তারপর এই দুই ধর্ম স্থানীয় ধর্ম ও বিশ্বাসসমূহকে প্রভাবিত করে। চন্দ্রকেতুগড়ের প্রত্নতাত্ত্বিক ভগ্নাবশেষ থেকে মনে হয় হিন্দু রাজারা দক্ষিণ-পশ্চিম বঙ্গ অর্থাৎ দক্ষিণ রাঢ়ে খ্রিস্টপূর্ব তৃতীয়/দ্বিতীয় শতাব্দীর মধ্যে নিজেদের বেশ শক্ত ভিত্তির ওপর স্থাপিত করেন। অপরপক্ষে,আনুমানিক খ্রিস্টপূর্ব চতুর্থ শতাব্দী থেকে গড়ে ওঠা মহাস্থানগড়ের ভগ্নাবশেষ দেখে মনে হয় বৌদ্ধরা তখনই পুন্ড্রবর্ধন অর্থাৎ উত্তরবঙ্গে বেশ বড়ো রকমের বসতি স্থাপন করেছিলেন। এই দুই ধর্ম এতো প্রবল ছিল যে, এদের প্রভাবে স্থানীয় ধর্মগুলো ধীরে ধীরে প্রায় লোপ পায়। তবে এই দুই ধর্মকেও স্থানীয় ধর্ম এবং আচার-আচারণ যথেষ্ট প্রভাবিত করে। যেমন বৈদিক ধর্মে স্থানীয় অনেক দেবদেবী ঢুকে পড়েন, যাঁদের অস্তিত্ব মূল বৈদিক ধর্মে ছিল না।
বঙ্গদেশের সবচেয়ে পুরানো যে রাজার কথা নিশ্চিতভাবে জানা যায়, তাঁর নাম শশাঙ্ক। সপ্তম শতাব্দীর এই রাজা ছিলেন হিন্দু। অপর পক্ষে, বৌদ্ধ পাল-রাজাদের রাজত্ব আরম্ভ হয় পরের শতাব্দীতে।শশাঙ্ক কেবল হিন্দুধর্মের পৃষ্ঠপোষক ছিলেন না,তিনি বৌদ্ধদের ওপর নির্যাতন চালিয়েছিলেন। পাল রাজারা কয়েক শতাব্দী ধরে বৌদ্ধধর্মের পৃষ্ঠপোষণা করলেও, হিন্দুদের ওপর নিপীড়ন করেছিলেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায় না। পালদের পর যে সেন বংশ ক্ষমতায় বসেন, তাঁরা ছিলেন হিন্দুধর্মের উৎসাহী পৃষ্ঠপোষক। বৌদ্ধরা তাঁদের আমলে নির্যাতিত হয়েছিলেন বলে প্রমাণ রয়েছে। তাঁদের শাসনকালে বৌদ্ধ ধর্ম তার গৌরব হারায় এবং বৌদ্ধদের সংখ্যা দ্রুত হ্রাস পায়। সেনরা, তদুপরি, বর্ণভেদ প্রথাকে কঠোরভাবে প্রচলিত করেন এবং সংস্কৃত শাস্ত্র ও সাহিত্যের পৃষ্ঠপোষণা করেন।
১২০৪ সালে লক্ষ্মণসেনকে পরাজিত করে বখতিয়ার খলজী মুসলিম শাসন প্রবর্তন করলে পরিবর্তনের আরও একটা ঢেউ আসে। খলজীর পরপর বঙ্গভূমিতে এসেছিলেন অনেক মুসলমান ধর্মপ্রচারক। অংশত সুলতানের সহায়তা নিয়ে তাঁরা স্থানীয় লোকদের ইসলাম ধর্মে দীক্ষা দেওয়ার কাজ উৎসাহের সঙ্গে আরম্ভ করেন। প্রথম দুইশত বছরে ইসলামে দীক্ষা দেওয়ার কাজ কতোটা সাফল্য লাভ করেছিল, তা পরিষ্কার জানা না গেলেও এ সময়ে বৌদ্ধদের সংখ্যা খুবই হ্রাস পায় এবং হিন্দুদের মন্দির নির্মাণের কাজ পুরোপুরি বন্ধ হয়ে যায়। সেনরা যে বর্ণভেদ প্রথা জোরালোভাবে চালু করেছিলেন, তার অত্যাচার থেকে রক্ষা পাওয়ার উদ্দেশে বৌদ্ধরা একযোগে ইসলামে দীক্ষা নিয়েছিলেন কিনা, তা অনুমানের বিষয়। তাছাড়া, নিম্নবর্ণের হিন্দুরাও ব্যাপক সংখ্যায় ইসলাম গ্রহণ করেছিলেন বলে মনে হয়। শক্তি প্রয়োগ করে ইসলাম ধর্মে দীক্ষা দেওয়ার বহু প্রমাণ থাকলেও, অন্তত তত্ত্বগতভাবে ইসলাম ধর্মে যে-সামাজিক সাম্যের কথা বলা হয়েছে, তা বহু সংখ্যক দীক্ষার কারণ হতে পারে।
এর পরবর্তী কয়েক শতাব্দীতে বঙ্গভূমিতে ইসলাম ধর্মের যথেষ্ট বিবর্তন হয়। পারস্য থেকে আসা পীর/দরবেশরা যে-ভক্তিবাদী ইসলাম ধর্ম প্রচার করেছিলেন, স্থানীয় লোকেরা তা দিয়ে আকৃষ্ট হয়েছিলেন। অপরপক্ষে, আরব ধর্মপ্রচারকরা নিয়ে এসেছিলেন মৌলবাদী ইসলাম, যা স্থানীয় লোকেদের আকৃষ্ট করেনি। সতেরো শতক নাগাদ বঙ্গীয় ইসলাম আগেকার বৌদ্ধ এবং হিন্দু ধর্মের মতোই একটা স্থানীয় সমন্বয়ী ধর্মের রূপ লাভ করে এবং সমাজের নিচের তলার লোকেরা এই বঙ্গীয় ইসলাম দিয়েই প্রভাবিত হন।
ইসলাম ধর্মের এই আক্রমণের মুখে হিন্দু ধর্মের মধ্যেও সংস্কার চলতে থাকে। যেমন, দেবীবর ঘটক হিন্দু ধর্মের পবিত্রতা রক্ষার উদ্দেশে বর্ণপ্রথার নিয়মগুলো আরও দৃঢ়ভাবে চালু করতে চেষ্টা করেন। কিন্তু সময়ের ধারা বইছিলো উল্টো খাতে। এই পরিস্থিতিতে ষোলো শতকের গোড়ায় চৈতন্যদেব (১৪৮৬-১৫৩৩) ভক্তি এবং প্রেমের আদর্শের ওপর স্থাপিত বৈষ্ণব ধর্ম প্রচার করেন। যে জাতিভেদ প্রথা সমাজকে স্থায়ী শ্রেণীতে বিভক্ত করেছিলো এবং যা ছিলো সামাজিক নির্যাতনের প্রধান হাতিয়ার, চৈতন্যদেব তাকে পুরোপুরি অস্বীকার করেন। এই ধর্ম কেবল হিন্দু ধর্মকে ইসলামের আক্রমণ থেকে রক্ষা করেনি, বরং পরবর্তী দু শতাব্দী ধরে বৈষ্ণব ও সামগ্রিকভাবে হিন্দু ধর্মচর্চায় নতুন জোয়ার এনেছিল। তাছাড়া এর প্রভাবে সহজিয়া,বাউল এবং কর্তা-ভজার মতো ভক্তিবাদী সম্প্রদায়ও জন্ম দেয়। এসব সম্প্রদায় প্রথমেই জাতিভেদকে অস্বীকার করে। তদুপরি এরা বিধিবদ্ধ ধর্মের চেয়ে গুরুভক্তি এবং নামহীন এক দেবতার ভজনাকে গুরুত্ব দেয়। বঙ্গভূমির বিচিত্র ধর্মগুলোর মধ্যে যদি কোনো মিল থেকে থাকে, তা হলো এই গোঁড়ামিবর্জিত নমনীয়তা এবং সমন্বয়ধর্মী ভক্তিবাদ।

ভাষা বাংলা ইন্দো-ইউরোপীয় ভাষা গোষ্ঠীর অন্যতম ভাষা। এ ভাষা বঙ্গভূমির আদি ভাষা ছিল না। তখন বিভিন্ন অঞ্চলের আদিবাসীদের মধ্যে বিভিন্ন ভাষা প্রচলিত ছিলো। আর্যরা সঙ্গে নিয়ে আসেন পূর্বাঞ্চলের প্রাকৃত ভাষা। বৌদ্ধরা এনেছিলেন পালি ভাষা, যা প্রাকৃতের মতো সংস্কৃত ভাষারই একটি মৌখিক রূপ। বহু শতাব্দী ধরে উচ্চারণ ও ব্যাকরণগত বিবর্তনের মধ্য দিয়ে এই প্রাকৃত থেকে বাংলা ভাষা স্বতন্ত্র রূপ লাভ করে। এই ভাষার আদি রূপ খানিকটা পাওয়া যায় দশম শতাব্দী থেকে রচিত চর্যাপদে। তবে বাংলা ভাষা তখনও একেবারে আলাদা ভাষা হিসেবে আত্মপ্রকাশ করেনি, মিশে ছিলো অহমিয়া এবং ওড়িয়া ভাষার সঙ্গে। তাই সঠিকভাবে বললে বলতে হয়, চর্যাপদে যে-বাংলা দেখা যায়, তা প্রাক্-বাংলা। আনুমানিক পনেরো শতকে রচিত শ্রীকৃষ্ণকীর্তন খাঁটি বাংলা ভাষার আদিতম নিদর্শন। মধ্যযুগের অন্যান্য কাব্য থেকেও সেকালের ভাষার আভাস পাওয়া যায় - যদিও এসব কাব্যের আদি পাঠ পাওয়া যায় না। এসব কাব্যের যে পান্ডুলিপি এ পর্যন্ত পাওয়া গেছে, সেগুলো মূল কাব্য রচিত হওয়ার অনেককাল পরের প্রতিলিপি। অপরপক্ষে, সেকালের গদ্যের কোনো নমুনাই বলতে গেলে পাওয়া যায় না।
বাংলা ভাষা যেহেতু সংস্কৃত ভাষার মৌখিক রূপ প্রাকৃত থেকে উৎপন্ন, সে কারণে এ ভাষার শব্দাবলীর প্রধান ভাগই হয় সংস্কৃত, নয়তো সংস্কৃত শব্দের বিবর্তিত রূপ (যেমন চন্দ্র থেকে চাঁদ)। তবে এ অঞ্চলের আদি ভাষাগুলোর কিছু শব্দও বাংলায় রয়ে গেছে (যেমন চাউল, ঢেঁকি)। স্থানীয় ভাষার কিছু বৈশিষ্ট্যও বহিরাগত বাংলাকে প্রভাবিত করেছে (যেমন, কোনো কোনো ক্রিয়া-বিভক্তিতে)। মুসলিম শাসন বাংলা ভাষাকে প্রভাবিত করেছিলো দুভাবে। প্রথমত, এ সময়ে বাংলা ভাষায় হাজার হাজার আরবি-ফারসি শব্দ ঢুকে পড়ে। দ্বিতীয়ত, যে বাংলাকে সেনরা অবহেলা করেছেন এবং ব্রাহ্মণরা ঘৃণা করেছেন, সুলতানরা পনেরো শতক থেকে তারই পৃষ্ঠপোষণা করতে আরম্ভ করেন। সতেরো/আঠারো শতকে কিছু পর্তুগিজ শব্দও বাংলা ভাষায় এসে যায় (যেমন  আনানাস)। বিদেশী ভাষার ঢেউ আর একবার বাংলা ভাষায় লাগে ব্রিটিশ রাজত্ব স্থাপিত হওয়ার পর। সেই সুবাদে এখন বাংলায় কয়েক হাজার ইংরেজি শব্দ প্রতিদিনের শব্দে পরিণত হয়েছে। বাক্য-গঠনে এবং যতিচিহ্নেও (যেমন কমা, সেমিকোলোন, আশ্চর্যবোধক চিহ্ন) ইংরেজির প্রভাব রয়েছে। এ ছাড়া, স্থানীয় ভাষা বাংলার চর্চা বাড়িয়ে আইন-আদালতের ভাষা ফারসিকে সরিয়ে দেওয়া যায় কিনা, তারও চেষ্টা ইংরেজ প্রশাসন করেছিল আঠারো শতকের শেষ কয়েক দশক ধরে। বাঙালি সংস্কৃতির অন্যান্য দিকের মতো বাংলা ভাষাও নমনীয় এবং সমন্বয়ধর্মী। ছাপাখানা প্রবর্তিত হওয়ার পর এবং নতুন ধরনের লেখ্য সংস্কৃতির প্রভাবে আঠারো শতকের দ্বিতীয় ভাগ থেকে বাংলা গদ্যচর্চা আগের তুলনায় অনেকটাই বৃদ্ধি পায়।
সাহিত্য চর্যাপদকে বাংলার নিদর্শন হিসেবে গণ্য করলে বাংলা সাহিত্যের ঐশ্বর্যমন্ডিত ঐতিহ্য প্রায় হাজার বছরের। অন্যান্য ভাষার সাহিত্যের মতো বাংলাও তার যাত্রা শুরু করেছিল ধর্মীয় কাব্য দিয়ে, আরও সঠিক করে বললে, ভক্তিবাদী গান দিয়ে। চর্যাপদ থেকে আরম্ভ করে মধ্যযুগের বিশাল সাহিত্যভান্ডার- এর প্রায় সবটাই হলো ঈশ্বরমুখী এবং এর মধ্যে ছিলো বৌদ্ধ, হিন্দু এবং মুসলমানদের ধর্মীয় সাহিত্য। ব্যতিক্রম দেখা যায় শাহ মুহাম্মদ সগীর,দৌলত কাজী এবং আলাওলের কিছু রোমান্টিক কাব্যে। হিন্দু কবিরা তাঁদের রোমান্টিক অনুভূতি, আবেগ এবং অভিজ্ঞতা প্রকাশ করেছিলেন রূপকের মাধ্যমে কেবল রাধাকৃষ্ণের প্রেমের কাহিনী নিয়ে রচিত বৈষ্ণব সাহিত্য। বস্তুতঃ উনিশ শতকের আগে পর্যন্ত বাঙালি কবিরা তাঁদের নিজেদের ‘মনের কথা’ বলতে গেলে প্রকাশই করেননি।
মধ্যযুগে সুফিবাদের মতো ভক্তিবাদী দর্শনের উদ্ভব এবং বৈষ্ণব, সহজিয়া, বাউল, কর্তাভজা ও সখীভাবকের মতো ধর্মীয় সম্প্রদায় আত্মপ্রকাশ করার পর সত্যপীর/সত্যনারায়ণ এবং দক্ষিণ রায়/বড় খান গাজীর মতো লৌকিক দেবতার দেখা মেলে। এবং সাহিত্যেও একটা সমন্বয়বাদী ধারার সৃষ্টি হয়। এই সাহিত্য ছিল বাঙালিত্বের ধারণাপুষ্ট। এ রকম এক অর্থে ধর্মনিরপেক্ষ ধর্ম এর আগে কখনও বঙ্গীয় সমাজে ছিল না। এই ক্রান্তিলগ্নে দেব-দেবীরাও মানুষের বেশে দেখা দিতে আরম্ভ করেন।
এরপর উনিশ শতকে ইংরেজি সাহিত্যের প্রভাবে বাঙালি কবি এবং লেখকরা মানবতা এবং নিজেদের ব্যক্তিগত আবেগ ও অনুভূতিকে তাঁদের লেখার মাধ্যমে প্রকাশ করতে আরম্ভ করেন। এই নতুন সাহিত্য ঈশ্বরমুখী নয়, মানবমুখী। সাহিত্যের বিষয়বস্ত্ত এবং মূল ভাবধারাই এ সময়ে বদলে যায়। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে এটা একটা যুগান্তর। প্রকৃত পক্ষে, এই মানববাদী নতুন সাহিত্য দিয়েই বঙ্গীয় রেনেসাঁর সূচনা হয়। এতে বিরাট অবদান রেখেছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর, মাইকেল মধুসূুদন দত্ত, বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় এবং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর। হিন্দু পুরাণভিত্তিক সাহিত্য নতুন করে লেখার সময়ে প্রথম দুজন তাদের পুনর্ব্যাখ্যা দান করেন এবং এই পুরাণের দেবদেবীকে মানুষে পরিণত করেন আর শেষের দুজন একই কাজ করেন, তবে একটু ভিন্ন রীতিতে।
আনুষ্ঠানিক শিক্ষা-ব্যবস্থার বিকাশ এবং ছাপাখানার প্রতিষ্ঠার ফলে বাংলা সাহিত্যে সৃজনশীলতার এমন স্ফূরণ ঘটে যে, যা এর আগে কখনো এমন ব্যাপকভাবে ঘটেনি। তবে এও সত্য যে, এই মুদ্রিত সাহিত্যের বিকাশ ঘটার ফলে মধ্যযুগে যে লোকসাহিত্য এবং মৌখিক সাহিত্যের শ্রীবৃদ্ধি হয়েছিলো, সেই ধারা দ্রুত শুকিয়ে আসে। তদুপরি, হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে নাগরিক সাহিত্যের বিকাশ ঘটে অসমানভাবে, কারণ মুসলমানরা হিন্দুদের তুলনায় ইংরেজি এবং বাংলা - উভয় শিক্ষায় অনেকটাই পিছিয়ে ছিলেন। তবে উনিশ শতকের শেষ দিক থেকে এই দু্ই সম্প্রদায়ের মধ্যে ব্যবধান ক্রমশ কমে আসতে আরম্ভ করে কারণ তখন থেকে আরম্ভ করে বিশ শতকের প্রথম কয়েক দশকের মধ্যে অনেক মুসলমান সাহিত্যিক আত্মপ্রকাশ করেন। এঁদের মধ্যে সবচেয়ে উল্লেখযোগ্য ছিলেন মীর মোশরাররফ হোসেন, নজরুল ইসলাম এবং জসীমউদ্দীন।
সাহিত্যে আরেকটি ঐতিহাসিক বিকাশ লক্ষ করা যায় তার আঙ্গিকের ক্ষেত্রে। মধ্যযুগে রচিত হয়েছিল কেবল আখ্যানমূলক কাব্য, কিন্তু উনিশ শতকে ইংরেজি সাহিত্য থেকে নতুন আঙ্গিক নিয়ে লেখা হয় মহাকাব্য,পত্রকাব্য,সনেট, খন্ড কবিতা, নাটক, উপন্যাস, ছোটগল্প এবং প্রবন্ধ। আর বিশ শতকে এসে বিশেষ করে রবীন্দ্রনাথের হাতে আরও উন্নতমানের সাহিত্য রচিত হয় এবং তা বিশ্বমানের মর্যাদা লাভ করে।
নগরায়ণ এবং নাগরিক সাহিত্য বিকাশ লাভ করায়, লোকসাহিত্য একদিকে যেমন ক্ষয়িষ্ণুতার দিকে এগিয়ে যায়, তেমনি রবীন্দ্রনাথ, দীনেশচন্দ্র সেন এবং অন্যান্য উৎসাহী গবেষকদের সম্মিলিত চেষ্টার ফলে তা আবার লিখিত আকারে সংগৃহীত হয় এবং ব্যাপকতর পাঠকদের কাছে পৌঁছে যায়। ফলে লোকসাহিত্য ও লোকসঙ্গীত কতোটা ঐশ্বর্যমন্ডিত এবং সুন্দর, শহরের শিক্ষিত পাঠকরা ও শ্রোতারা তা অনুভব করেন।
বঙ্গীয় সমাজ প্রধানত গ্রামীণ বলে উপনিবেশিক আমলের মাঝামাঝি কাল পর্যন্ত বাংলা সাহিত্য খানিকটা সংস্কৃত এবং ফারসি সাহিত্য দিয়ে প্রভাবিত হলেও তা ছিল মূলত লৌকিক। ইংরেজি শিক্ষা এবং সাহিত্যই একে নাগরিক চরিত্র দান করে। তা সত্ত্বেও লোকসাহিত্যের প্রভাব একটু দুর্বলভাবে হলেও উনিশ ও বিশ শতকেও অব্যাহত থাকে। নাগরিক সম্প্রদায়ের শিকড়ও গভীরভাবে গ্রামে প্রোথিত হওয়ায়, বাংলা সাহিত্যে গ্রামের দিকে ফিরে তাকানোর একটা প্রবণতা লক্ষ করা যায়। যেমন জীবনানন্দ দাশ এবং বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় অথবা জসীমউদ্দীন এবং আল-মাহমুদের রচনায় বারবার গ্রাম ফিরে আসে নানা রূপে। এখনকার অসংখ্য উপন্যাস এবং নাটকেও গ্রামের দিকে ফিরে তাকানোর এই প্রবণতা লক্ষ করা যায়।
সঙ্গীত,নাটক,সিনেমা সাহিত্যের মতো বাংলা সঙ্গীতের উত্তরাধিকারও ঐশ্বর্যমন্ডিত। চর্যাপদ এবং মধ্যযুগের সাহিত্যের অনেকটাই ছিল আসলে গান। কোন রাগ এবং তালে গাইতে হবে প্রতিটি চর্যার (শ্রীকৃষ্ণকীর্তনেরও) শুরুতেই তা উল্লিখিত হয়েছে। গৌড় ও বঙ্গাল এবং আরও পরে ভাটিয়ালির মতো রাগসমূহের নাম থেকে বোঝা যায় যে বঙ্গভূমিতে সুবদ্ধ এবং লোকসঙ্গীতের নিজস্ব ধারা সেকালেই গড়ে উঠেছিল। বৈষ্ণব সঙ্গীতজ্ঞরা মধ্যযুগেই রাগ এবং লোকসঙ্গীতের সমন্বয় ঘটিয়ে বঙ্গের নিজস্ব ভক্তিবাদী কীর্তন গানের ধারা প্রবর্তন করেছিলেন এবং তাকে প্রামাণ্য রূপ দিয়েছিলেন। বঙ্গের আর আর-একটি বিশিষ্ট ভক্তিবাদী সঙ্গীতের ধারা হলো বাউল গান। এই বিশেষ শ্রেণির গানের একজন শ্রেষ্ঠ রচয়িতা এবং সুরকার ছিলেন লালন ফকির (১৭৭৪-১৮৯০)। বাউল গান তার সরলতা এবং সৌন্দর্যের জন্যে বিখ্যাত এবং এখন একুশ শতকের গোড়াতেও তার আবেদন হারিয়ে ফেলেনি। বাংলা সঙ্গীতের অন্যান্য ধারার মধ্যে আছে ভাটিয়ালি, ভাওয়াইয়া, কবিগান, জারিগান ইত্যাদি। প্রথম দু ধরনের গান শহর এবং গ্রাম উভয় জায়গায় জনপ্রিয় আর শেষ দু ধারার গান গ্রামে খুবই জনপ্রিয়।
উনিশ শতকের গোড়ায় বঙ্গদেশে দু ধরনের সুবদ্ধ সঙ্গীতের সূচনা এবং বিকাশ লক্ষ করা যায়- টপ্পা ও আখড়াই এবং বাংলা ধ্রুপদ। তাছাড়া, এ সময়ে বাংলা সঙ্গীতের জগতে ইউরোপীয় বাদ্যযন্ত্র আসতে আরম্ভ করে, বিশেষ করে বেহালা এবং মাউথ অর্গান,যার সংক্ষিপ্ত রূপ হলো হারমোনিয়াম। বাংলা সাহিত্যের মতো বাংলা সঙ্গীতের ক্ষেত্রে উনিশ শতক থেকে আরম্ভ করে বিশ শতকের প্রথম ভাগ পর্যন্ত সৃজনশীলতার একটা স্ফূরণ ঘটে। এই সময়ে নিধু গুপ্ত, গিরিশচন্দ্র ঘোষ, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর, দ্বিজেন্দ্রলাল রায়, অতুলপ্রসাদ সেন এবং নজরুল ইসলামের মতো বিখ্যাত গীতিকার ও সুরকারের বিশাল অবদানে বাংলা গানের জগৎ সমৃদ্ধ হয়ে ওঠে। বাঙালি সংস্কৃতির অন্যান্য শাখার মতো উনিশ শতকে যে গানের ধারা তৈরি হয়, তা ভারতীয় সঙ্গীত থেকে খানিকটা ভিন্ন এবং বঙ্গীয় বৈশিষ্ট্যমন্ডিত।
মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে বাদ্যযন্ত্রের বলতে গেলে কোনো উল্লেখ নেই। কিন্তু উনিশ শতকের মাঝামাঝি সময় থেকে বঙ্গদেশে নিজস্ব বাদ্যযন্ত্রীদের আবির্ভাব ঘটে। আর, বিশ শতকে বাদ্যযন্ত্রীদের সংখ্যাই কেবল বৃদ্ধি পায়নি, বরং আলাউদ্দীন খানের নেতৃত্বে আলি আকবর খান এবং রবিশঙ্করের মতো বিশ্বমানের শিল্পীদেরও বিকাশ ঘটে। বিশ শতকে কণ্ঠ শিল্পীরাও ‘রাগপ্রধান গান’ নামে সুবদ্ধ সঙ্গীতের একটি বিশিষ্ট ধারা গড়ে তোলেন। কিন্তু যে ধারার উদ্ভব এবং বিকাশ সবচেয়ে বেশি মাত্রায় ঘটে, তা হলো আধুনিক গান। এ গান আসলে রাগসঙ্গীত, লোকসঙ্গীত এবং পশ্চিমা সঙ্গীতের এক ধরনের সমন্বয়। এর আদি রচয়িতা রবীন্দ্রনাথ। তাঁর এসব গান রবীন্দ্রসঙ্গীত নামে বিখ্যাত এবং জনপ্রিয়তা অর্জন করেছে। নজরুল ইসলাম, পঙ্কজ মল্লিক, সলিল চৌধুরী এবং অন্যরা মিলে এই ধারায় নতুন নতুন বৈশিষ্ট্য নিয়ে আসেন। কিন্তু বেশির ভাগ আধুনিক গানেই রবীন্দ্রনাথ প্রবর্তিত দুটি বৈশিষ্ট্য কমবেশি অনুকরণ কর হয়। এই দুই বৈশিষ্ট্য হলো - গানের চারটি তুক বা সুরের স্তবক এবং কথার প্রাধান্য।
গীতগোবিন্দ এবং শ্রীকৃষ্ণকীর্তন থেকে মনে হয়, আদি-মধ্যযুগেও বঙ্গভূমিতে এক ধরনের সাঙ্গীতিক পালা প্রচলিত ছিলো। এ ছাড়া, সে সময়ে মুক্তমঞ্চ যাত্রাপালাও বিকাশ লাভ করতে থাকে। চৈতন্যদেব এ রকমের একটি পালায় অভিনয় করেছিলেন বলে জানা যায়। তার দু শতাব্দী পরে আঠারো শতকে যখন বাংলা গদ্য বিকাশ লাভ করতে থাকে, তখন যাত্রাপালায় কাহিনী এবং গদ্যসংলাপ বৃদ্ধি পায়। এর ফলে তাতে নাটকীয়তাও বাড়তে থাকে। বাঙালিরা আরও কতো কাল এই যাত্রা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকতেন, তা অনুমানের বিষয়। কিন্তু ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি শাসন ভার নেওয়ার আগেই কলকাতায় একটি ইংরেজি থিয়েটার স্থাপিত হয়। কয়েক দশক পরে স্থাপিত হয় আরও বড় এবং আরও উন্নতমানের একটি থিয়েটার। এই দুই থিয়েটার বাঙালিদের জন্যে অনুকরণ করার মতো আদর্শ দান করে। গেরাশিম লেবেদফ নামে কলকাতায় বসবাসকারী একজন রুশ ভদ্রলোক বাঙালিদের উৎসাহ এবং চিন্তাকে আরও উস্কে দেন একটি ইংরেজি নাটক বাংলায় অনুবাদ করে বাঙালি অভিনেতা-অভিনেত্রীদের সাহায্যে ১৭৯৫ সালের শেষে এবং ১৭৯৬ সালের গোড়ার দিকে মঞ্চস্থ করার মাধ্যমে। এর জন্যে তিনি কলকাতায় একটি মঞ্চ নির্মাণ করিয়ে নিয়েছিলেন। ১৮৩০-এর দশকে প্রসন্নকুমার ঠাকুর এবং নবীন বসু যে একাধিক নাটক অথবা যাত্রা পালা নিজেদের মঞ্চে অভিনয় করিয়েছিলেন, লেবেদফের দৃষ্টান্ত তার পেছনে অনুপ্রেরণা হিসেবে কাজ করা অসম্ভব নয়।
তবে ১৮৫২ সালের আগে বাংলা ভাষায় কোনো নাটক প্রকাশিত হয়নি। একবার নাটক রচনার ধারা শুরু হবার পরে পরবর্তী কয়েক বছরে আরও অনেকগুলো নাটক প্রকাশিত হয়েছিল। ইতোমধ্যে ১৮৫৭ সাল নাগাদ কলকাতায় ব্যক্তিগত উৎসাহে মঞ্চ নির্মাণ এবং তাতে নাটকের অভিনয় আরম্ভ হয়। প্রথম দিকে প্রধানত সামাজিক ও পৌরাণিক নাটক এবং প্রহসনের অভিনয় জনপ্রিয়তা অর্জন করে। এভাবে একাধিক মঞ্চে বেশ কয়েকটি নাটক ও প্রহসন সাফল্যের সঙ্গে অভিনীত হওয়ার পর শিক্ষিত সমাজ একটি সাধারণ মঞ্চ স্থাপনের প্রয়োজনীয়তা অনুভব করেন। শেষ পর্যন্ত ন্যাশনাল থিয়েটার নামে সেই মঞ্চ স্থাপিত হয় ১৮৭২ সালের ডিসেম্বর মাসে এবং সেখানে প্রথম অভিনীত হয় নীলচাষীদের ওপর অত্যাচারের কাহিনী নিয়ে রচিত দীনবন্ধু মিত্রের জনপ্রিয় নাটক নীলদর্পণ। তার কয়েক বছরের মধ্যে হিন্দু ন্যাশনাল থিয়েটার, গ্রেট ন্যাশনাল থিয়েটার এবং বেঙ্গল থিয়েটার নামে আরও কয়েকটি থিয়েটার গোষ্ঠী গড়ে ওঠে। সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী থিয়েটার ‘স্টার’ প্রতিষ্ঠিত হয় ১৮৮৩ সালে। এর পেছনে সবচেয়ে বড়ো ভূমিকা ছিল সেকালের বিখ্যাত অভিনেতা ও নাট্যকার গিরিশচন্দ্র ঘোষ এবং বিখ্যাত অভিনেত্রী বিনোদিনী দাসীর।
বিশ শতকে আরও কয়েকটি নামকরা থিয়েটার প্রতিষ্ঠিত হয় এবং দেখা দেন শিশির ভাদুড়ী ও অহীন্দ্র চৌধুরীর মতো শক্তিশালী অভিনেতা। আর কিছু পরে যাত্রা শুরু হয় সিনেমা এবং টেলিভিশনের। বাংলা থিয়েটার এখনো বিশ্বমানের না হলেও, বিশেষ করে সত্যজিৎ রায়ের কয়েকটি চলচ্চিত্র সারা পৃথিবীতে খ্যাতি লাভ করেছে। সুযোগ এবং সুযোগ্য অভিনেতা-অভিনেত্রীদের অভাবে বাংলাদেশের সিনেমা-শিল্প অবশ্য অনেকটাই পিছিয়ে আছে। ১৯৪০ এর দশকে বহুরূপী নাট্যগোষ্ঠীর যাত্রা শুরু হওয়ার পর থেকে এবং নবান্ন নাটকের অভিনয় থেকে বাংলা থিয়েটার এবং নাটক উভয়েরই যথেষ্ট উন্নতি হয়েছে। মুসলমান সমাজের বিরূপ মনোভাবের কারণে বাংলাদেশে নাটকের অভিনয় দীর্ঘকাল কোনো উৎসাহ পায়নি। কিন্তু স্বাধীনতার পর থেকে বাংলাদেশের থিয়েটারে দ্রুত অগ্রগতি হয়েছে।
বহু শতাব্দী ধরে বাঙালি সংস্কৃতি পরিশীলিত এবং বৈদগ্ধ্য লাভ করে তা কেবল নাগরিক বৈশিষ্ট্য অর্জন করেনি, বরং একটা আন্তর্জাতিক চরিত্রও অর্জন করেছে। তা সত্ত্বেও সাধারণ বাঙালিরা মূলত লোক উপাদান দিয়ে মুগ্ধ হন। বাংলার লোকসাহিত্য, লোকসঙ্গীত, লোকনৃত্য, লোকনাট্য ইত্যাদির সঙ্গে ভক্তিবাদ বাঙালি মানসকে যথার্থভাবে প্রতিফলিত করে।
ব্রিটিশ উপনিবেশিক শাসন ও পরিবর্তনের জোয়ার  তেরো থেকে আঠারো শতকের মধ্যভাগ পর্যন্ত মুসলিম শাসনকে এক কথায় বলা যায় শাসকের পরিবর্তন- হিন্দুদের বদলে মুসলমানের। কিন্তু এর ফলে বাঙালি সমাজের সামন্ততান্ত্রিক কাঠামোয় তেমন কোনো মৌলিক পরিবর্তন আসেনি। ব্রিটিশ শাসনের সময়ে সেই সামন্ততন্ত্রের ভিত্তিতে নাড়া লাগে। ১৭৯৩ সালের চিরস্থায়ী বন্দোবস্তের ফলে প্রজাদের ওপর জমিদারদের পরোক্ষ শাসন বহাল থাকলেও, ব্যবসা-বাণিজ্য, নির্মাণ শিল্প, সেবামূলক শিল্পসহ অর্থনীতির সর্বত্রই দেখা দেয় পুঁজিবাদের প্রকাশ। এ সময়ে যে ব্যবসায়ী, ঋণদাতা এবং চাকুরিজীবী শ্রেণির উদ্ভব ঘটে তাও ঘটেছিল উপনিবেশিক শাসনের প্রয়োজনে।
স্থানীয় জনগণের প্রতি ভালোবাসা থেকে নয়, উপনিবেশিক শাসনের জন্য প্রয়োজনীয় জনবল তৈরি করার উদ্দেশ্যেই স্কুল, কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, টেক্সটবুক সোসাইটি ইত্যাদি প্রতিষ্ঠিত হয়। ফলে আনুষ্ঠানিক শিক্ষাব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি হয়। বঙ্গীয় সমাজে এ ধরনের শিক্ষা-কাঠামো কখনও ছিল না। বলা যেতে পারে, এই শিক্ষাব্যবস্থা থেকে দেশীয়রা যে লাভবান হন, তা হয়েছিলেন পরোক্ষ ফল হিসেবে। উপনিবেশিক শক্তি যা-কিছু গুরুত্ব দিয়ে শক্ত ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত করে, তা করেছিল শোষণকে আরও ফলপ্রসূ করার উদ্দেশ্যে। কিন্তু এসব উদ্যোগের ফলে বঙ্গীয় সমাজের ভিত্তিমূলেই প্রবল ধাক্কা লেগেছিলো।
ব্রিটিশ আমলে বঙ্গদেশে একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি গড়ে ওঠে। এই শ্রেণিও গড়ে উঠেছিল উপনিবেশিক কারণে। উপনিবেশ থেকে কেন্দ্রে সম্পদ স্থানান্তরিত করা এবং উপনিবেশিক শাসন ব্যবস্থা সুচারুভাবে চালানোর উদ্দেশে একটা স্থানীয় মধ্যবিত্ত শ্রেণির দরকার ছিল-যার একাংশে থাকবে একটি ভূমি-মালিক শ্রেণি, অন্য অংশে থাকবে শিক্ষিত এবং চাকুরেদের একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি। এই মধ্যবিত্ত শ্রেণিই বঙ্গীয় গ্রামীণ সংস্কৃতিকে এগিয়ে নিয়ে এবং বৈদগ্ধ্য দান করে বর্তমান আকারে পৌঁছে দিয়েছে। ধর্মনিরপেক্ষ শাসন-ব্যবস্থা, আগেকার ধর্মীয় শিক্ষার জায়গায় উদারনৈতিক ইংরেজি শিক্ষার প্রসার এবং উন্নতি, পাশ্চাত্য ধ্যানধারণার প্রভাব, নগরায়ন এবং প্রযুক্তি - সবই আধুনিক বাঙালি মনন গঠনে সাহায্য করেছিল।
এই পরিবেশ দ্বারকানাথ ঠাকুর থেকে রাধাকান্ত দেব থেকে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের পিতার মতো সমাজের সকল ধরনের উদ্যোগী পুরুষের জন্যে বিবিধ সুযোগ-সুবিধার দ্বার খুলে দিয়েছিল। ঠাকুরদাস বন্দ্যোপাধ্যায় ১৮১০ সালের দিকে গ্রাম থেকে প্রথম যৌবনেই কলকাতায় এসেছিলেন ভাগ্যের সন্ধানে। প্রথমে এক দোকানে চাকুরি পেয়েছিলেন দু টাকা বেতনের। তিনি কলকাতায় না এলে এবং উপনিবেশিক শাসনের অধীনে নতুন সুযোগ-সুবিধা সৃষ্টি না হলে বাঙালি সমাজ বিদ্যাসাগর বলে কাউকে পেত না। অথবা রাধাকান্ত দেবের মতো একজন শূদ্র কলকাতার ব্রাহ্মণসহ হিন্দু অভিজাত সমাজের দলপতি হতে পারতেন না।
আগেই বলা হয়েছে যে, বর্ণভেদ প্রথা কেবল ধর্মীয় ব্যবস্থা নয়, বরং সমাজ-কাঠামোর ওপরও তা গুরুতর প্রভাব ফেলেছিল। জীবিকার জন্যে একজন ব্যক্তি কী করবে, এই প্রথা স্থায়ীভাবে তা নির্ধারিত করে দিত। এই প্রথা অনুযায়ী জেলের বংশধরেরা প্রজন্মের পর প্রজন্ম জেলে হবে; একই ভাবে নাপিতের বংশধরেরা নাপিত, জোলার বংশধরেরা জোলা, ঝাড়ুদারের বংশধরেরা ঝাড়ুদার, বৈদ্যের বংশধরেরা বৈদ্য এবং ব্রাহ্মণের বংশধরেরা ধর্মকর্মের কাজ করবে বলে প্রত্যাশা করতো। গ্রামের মুসলমানরাও মোটামুটি এই প্রথাই পালন করতেন। তাই তাঁরা বেশির ভাগ প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে কৃষিকাজে জড়িত ছিলেন। উপনিবেশিক আমলে এই কঠোর প্রথা শিথিল হতে থাকে এবং সমাজে সীমাহীন সচলতা আসে। মুসলমানসহ সমাজের নিচের তলার লোকরা কৌলিক বৃত্তির প্রতি আনুগত্যবশত দীর্ঘকাল ইংরেজি শিক্ষার দিকে এগিয়ে যাননি অথবা সেই সুবাদে নতুন যুগের সুবিধেগুলোর সুযোগ নেননি। ফলে তাঁরা শিক্ষাদীক্ষায় বর্ণহিন্দু এবং উচ্চশ্রেণির হিন্দুদের তুলনায় অনেক পিছিয়ে পড়েন।
উপনিবেশিক আমলে বাঙালি সমাজের অগ্রগতি হয়েছিল অসমানভাবে এবং প্রধানত সমাজের ওপর তলার লোকেরাই এর ফলে উপকৃত হয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও উনিশ শতকের সমাজ এবং সংস্কৃতির অনেক দিকেই সৃজনশীলতার একটা অসাধারণ স্ফূরণ ঘটেছিলো। বিশেষ করে ভাষা, সাহিত্য, সঙ্গীত ও নাটকসহ প্রদর্শনমূলক শিল্পকলা, স্থাপত্য, ধর্ম ও সমাজ-সংস্কার, এমন কি, অনেক অর্থনৈতিক কর্মকান্ডেও এই স্ফূরণ লক্ষ করা যায়। রেনেসাঁর কেবল দুটি দিকের কোনো বিকাশ এ সময়ে তেমন দেখা যায় না- চিত্রশিল্প আর ভাস্কর্যের। ছয় শতাব্দীর মুসলিম শাসন এর আংশিক কারণ হতে পারে। স্থাপত্যেরও সেই অর্থে কোনো পুনর্জাগরণ হয়নি, যা হয়েছিল, তা হলো বিশেষ করে কলকাতা নগরীকে কেন্দ্র করে পাশ্চাত্য স্থাপত্যের বিকাশ। রোমান অথবা গ্রিক স্থাপত্যের মতো কোনো আদর্শ বঙ্গদেশে ছিলো না, যার অনুকরণে স্থাপত্যের রেনেসাঁ হতে পারে। বৌদ্ধদের স্থাপত্যরীতি মুসলিম আমলেই বর্জিত হয়েছিল। বৌদ্ধ স্থাপত্যের শ্রীবৃদ্ধি না-ঘটিয়ে তাঁরা নিয়ে এসেছিলেন পারস্য এবং দিল্লির স্থাপত্যের রীতি। কিন্তু ইংরেজরা এনেছিলেন স্থাপত্যের একেবারে নতুন আদর্শ। নতুন শহর কলকাতায় এই স্থাপত্যরীতি অনুকরণ করাও সহজ ছিল, কলকাতা আগে থেকেই নগরীর রূপ নিয়ে থাকলে এটা সম্ভব হতো না।
এই যে সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে সৃজনশীলতার স্ফূরণ, ঐতিহাসিকরা একে সাধারণত বঙ্গীয় রেনেসাঁ বলে থাকেন। এতে অবদান রেখেছিলেন হিন্দু জমিদার শ্রেণি এবং শিক্ষিত মধ্যবিত্ত শ্রেণী। এ ছিলো ঐতিহাসিক এবং নতুন যুগসৃষ্টিকারী। এই রেনেসন্সের প্রভাবে বাঙালিরা ধর্মনিরপেক্ষতা, যুক্তিবাদ, উদারনৈতিকতা, ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য, এক কথায় আধুনিকতার ধারণা দিয়ে প্রভাবিত হন। এ থেকে আবার পরের দিকে স্বাজাত্যবোধের জন্ম হয়। তবে বঙ্গীয় রেনেসাঁর প্রকাশ ছিল নিতান্ত আংশিক এবং সীমিত। কারণ রেনেসাঁর প্রধান দুটি ক্ষেত্র - চিত্রকলা এবং স্থাপত্যে এর কোনো প্রকাশ ঘটেনি, বা সমাজের প্রধান ভাগ অর্থাৎ মুসলমান এবং নিম্নবর্ণের হিন্দুরাও এর আলোক থেকে বঞ্চিত হয়েছিলেন। তবে পরে এই প্রক্রিয়া তাঁদেরও ধীরে ধীরে খানিকটা প্রভাবিত করেছিলো।
আধুনিক বাঙালিদের প্রাত্যহিক জীবনযাত্রা এবং বিবাহ ও পরিবারের মতো সামোজিক প্রতিষ্ঠানকেও পশ্চিমা চিন্তাধারা প্রভাবিত করেছিল। উপনিবেশিক আমলের আগে মহিলাদের রাখা হতো অশিক্ষিত এবং অন্তঃপুরে বন্দী করে। আর বিবাহ ছিলো নিতান্তই সন্তান জন্ম দিয়ে পরিবার গড়ে তোলার একটা প্রক্রিয়া। ইংরেজি শিক্ষা এই পুরুষতান্ত্রিক চিন্তাধারাকে পরিবর্তন করে - প্রথমত নাগরিক সমাজে। নগরের শিক্ষিত সমাজে এর ফলে স্ত্রীশিক্ষার প্রচলন হয় এবং পর্দাপ্রথাও ধীরে ধীরে শিথিল হয়। এমনকি মেয়েদের পোশাকেও দ্রুত পরিবর্তন লক্ষ করা যায়। মোট কথা, উচ্চশ্রেণির নাগরিক সমাজের অনেক মহিলাই যথেষ্ট পরিমাণে আধুনিক হয়ে ওঠেন। রোমান্টিক প্রেমের ধারণাও ক্রমশ দানা বাঁধতে থাকে এবং সমাজও আস্তে আস্তে তা স্বীকার করে নেয়। তবে এখনও তা সামাজিক রীতিতে পরিণত হয়নি। রোমান্টিক প্রেমের উন্মেষের ফলে স্বামী-স্ত্রীর সম্পর্ক আগের থেকে ঘনিষ্ঠ হয়ে ওঠে এবং পারস্পরিক প্রেমের ওপর গড়ে ওঠে, এভাবে পরিবারে মহিলাদের মর্যাদা বৃদ্ধি পায়। বস্ত্তত, বাঙালি নারীদের বর্তমান অবস্থা, বিশেষ করে শিক্ষিত নাগরিক সমাজের নারীদের অবস্থান মোটামুটি সন্তোষজনক ও ন্যায্য বলে বিবেচিত হতে পারে। কিন্তু এই অবস্থা থেকে উনিশ শতকের প্রথম দিকে তাঁদের অবস্থা কী শোচনীয় ছিলো, তা অনুমান করা অসম্ভব। পরিবর্তিত পরিবেশে পরিবার, সমাজ এবং অর্থনীতিতে নারীরা বেশ গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেন। ১৯৪৭ সালের দেশবিভাগ এবং ১৯৫০ সালের দাঙ্গার পরে পূর্ব বাংলা থেকে ব্যাপকহারে শিক্ষিত হিন্দুদের দেশত্যাগ এবং ১৯৭১ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের জন্মের ফলে নারীদের মর্যাদা আরও বৃদ্ধি পেয়েছে এবং তাঁরা আগের তুলনায় গুরুত্বপূর্ণ সামাজিক ও অর্থনৈতিক ভূমিকা পালন করার সুযোগ পাচ্ছেন।
দেশবিভাগের পর সংস্কৃতির পরিবর্তন দেশ থেকে সম্পদ পাচার করা এবং তার ফলে দেশের অর্থনৈতিক দুর্দশা ঘটানো ছাড়া, উপনিবেশিক শাসনের একটা প্রধান কুফল ছিল হিন্দু-মুসলমানের সামাজিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে। তার আগে এই দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে বিবাহ এবং ভোজন চলতো না বটে, কিন্তু গ্রামের মধ্যে তারা মোটামুটি শান্তিতে পাশাপাশি বসবাস করতেন শতাব্দীর পর শতাব্দী। তাঁদের মধ্যে গ্রাম-সম্পর্ক গড়ে ওঠার ফলে তাঁরা ছিলেন একটা বড়ো পরিবারের মতো। কিন্তু ব্রিটিশ শাসনের সময়ে দুই সম্পর্কের মধ্যে বিচ্ছিন্নতাবাদ ক্রমশ জোরদার হতে থাকে। এর প্রধান কারণ দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে অসমান উন্নয়ন। এর ফলে দুই সম্প্রদায়ের পারস্পরিক সম্পর্ক তিক্ত হয়ে ওঠে এবং পরস্পরের প্রতি বৈরিতা জন্ম নেয়। ১৯২৬ সাল থেকে তা সহিংস দাঙ্গার রূপ নেয়। এরই চূড়ান্ত পরিণতি হলো ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে বঙ্গ-বিভাগ, কার্যত যা হয়ে দাঁড়ায় বঙ্গ সংস্কৃতি ও সমাজের স্থায়ী বিভাগ।
মধ্যযুগের সাহিত্য থেকে মনে হয় না যে, উনিশ শতকের আগ পর্যন্ত বাঙালিদের মধ্যে রাজনীতি বা দেশপ্রেমের চেতনা জেগেছিল। মধ্যযুগে যেমন সমাজ-সচেতন কবি মুকুন্দরাম চক্রবর্তীর চন্ডীমঙ্গল থেকে দেখা যায় দেশের রাজা বা সুলতান কে, তিনি তাও সঠিকভাবে জানতেন না। এমনকি, সুলতান কে তা তিনি পরোয়াও করতেন বলে মনে হয় না। বরং ডিহিদার কে, সেটা তাঁর জন্যে অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ ছিলো। গ্রামের লোকদের মধ্যে গ্রামের বাইরের অবস্থা সম্পর্কে তেমন আগ্রহও ছিল না। সাধারণ মানুষরা গোটা জীবন কাটিয়ে দিতেন দু-তিন মাইল ব্যাসার্ধের একটা বৃত্তের মধ্যে। দেশ শাসনে অংশ গ্রহণের সুযোগ উপনিবেশিক শাসন আমলেই সৃষ্টি হয়েছিল, যদিও তারই ফল দেশ-বিভাগ।
দেশবিভাগের দরুণ বঙ্গদেশ স্থায়ীভাবে দু ভাগে বিভক্ত এবং সমাজের প্রধান দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ভেদ বড়ো করে দেখা দিলেও, পূর্ব পাকিস্তানের মুসলমান সম্প্রদায়ের ওপর এর একটা ইতিবাচক প্রভাব পড়ে। দেশবিভাগ এবং পরে সাম্প্রদায়িক দাঙ্গার ফলে পূর্ব পাকিস্তান থেকে উচ্চশ্রেণির হিন্দুরা ব্যাপকভাবে পশ্চিমবঙ্গে চলে যাওয়ায়, শিক্ষা এবং অর্থনৈতিক কার্যক্রমে যে মুসলমান সম্প্রদায় এ যাবৎ হিন্দুদের তুলনায় পিছিয়ে ছিলেন, তাঁরা রাতারাতি সর্বত্রই বিনা প্রতিযোগিতায় উন্নতির পথে এগিয়ে যাওয়ার সুবর্ণ সুযোগ পেলেন। ফলে শিক্ষিত এবং ছোট ব্যবসায়ীদের একটি মধ্যবিত্ত শ্রেণি তুলনামূলকভাবে কম সময়ের ভেতর মুসলমানদের মধ্যে গড়ে উঠলো।
পাকিস্তান আমলে এক দিকে শিক্ষার বিকাশ এবং অন্য দিকে শোষণ ও বাঙালিদের ওপর ভিন ভাষা আরোপের প্রয়াসের ফলে জন্ম নেয় ভাষা আন্দোলন (১৯৪৮-৫২)। ১৯৭২ সালে স্বাধীন বাংলাদেশের অভ্যুত্থানের আগ পর্যন্ত এই ভাষা আন্দোলন দেশের রাজনীতিকে বিপুলভাবে প্রভাবিত করে। তদুপরি পাকিস্তানের দুই অংশের মধ্যে কেবল ধর্মীয় জাতীয়তাবাদের ভিত্তিতে যে মিলন কৃত্রিমভাবে ঘটানো হয়েছিল, তা থেকে অচিরেই বাঙালি মুসলমানদের মধ্যে একটা স্বরূপের সংকট দেখা দেয়। তাঁরা বাঙালি ছিলেন কিনা, সে বিষয়ে কোনো কালেই তাঁরা নিশ্চিত ছিলেন না, কিন্তু ভাষা আন্দোলনের পর তাঁরাই ভাষাভিত্তিক ধর্মনিরপেক্ষ বাঙালি জাতীয়তাবাদী আন্দোলনে শরিক হন। এর প্রত্যক্ষ প্রভাব পড়ে বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের বর্ধিত চর্চায়। শেষ পর্যন্ত পূর্ব পাকিস্তানের সাহিত্যে প্রামাণ্য বাংলা ভাষা থেকে সামান্য ভিন্ন স্বাদের এক ধরনের বাংলার উন্মেষ লক্ষ করা যায়। তাছাড়া, ইতিবাচক ফল দেখা দেয় হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি তাঁদের চিরকালের বিতৃষ্ণা, এমনকি, অবিশ্বাস ও ঘৃণা হ্রাস পায়। পশ্চিমবঙ্গেও মুসলমানদের সঙ্গে চাকরি-বাকরির ক্ষেত্রে প্রতিযোগিতা কমে যাওয়ায় দেশ বিভাগের কয়েক দশকের মধ্যে মুসলমানদের প্রতি অবিশ্বাস ও ঘৃণাবোধ হ্রাস পায়; যদিও দুই সম্প্রদায়ের মধ্যে ঘনিষ্ঠতা জন্মেনি।
দেশ-বিভাগ, স্বাধীন বাংলাদেশের উদ্ভব এবং সেই সঙ্গে জীবন রক্ষাকারী উন ঔষুধপত্র ও টিকা আবিষ্কারের ফলে দুই বাংলাতেই জনসংখ্যা বৃদ্ধি পেয়েছে, এবং তার ফলও পড়েছে বঙ্গীয় সমাজের ওপর। ফলে একদিকে বেকারত্ব ও দারিদ্র্য বৃদ্ধি পেয়েছে, অন্যদিকে গ্রামের ব্যাপক সংখ্যক লোক কাজের খোঁজে শহরে, এমনকি বিদেশে চলে যাচ্ছেন। উনিশ শতকের শেষ পর্যন্ত কালাপানি পার হয়ে বিদেশে যাওয়াকে লোকাচার অনুযায়ী রীতিমতো নিষিদ্ধ বলে গণ্য করা হতো, কিন্তু এখন যথাসর্বস্বের বিনিময়ে লোকে একবার বিদেশে গিয়ে কোনো কাজ করতে পারলে, তা সে কাজ যতোই তুচ্ছ হোক, জীবনকে ধন্য মনে করে। সেদিন বিগত যখন বাঙালিরা ঘরমুখো ছিলেন এবং বেকার থাকতে ভালোবাসতেন। বাংলাদেশে কর্মসংস্থানের অভাবে দেশের শতকরা প্রায় পাঁচ ভাগ লোক অন্যান্য দেশে কাজ করছেন, বেশির ভাগই সাধারণ শ্রমিক হিসেবে। তবে দক্ষ কিছু পেশাদারও অন্যান্য দেশে কাজ করছেন, এঁরা বেশির ভাগই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক, ডাক্তার, আইনজীবী, সরকারী চাকুরে ইত্যাদি। হাজার হাজার বাঙালি বিদেশে সাফল্যের সঙ্গে ব্যবসা প্রতিষ্ঠান এবং ছোটখাটো শিল্প প্রতিষ্ঠানও গড়ে তুলেছেন। বাংলাদেশের স্বাধীনতার পর আর-একটা গোষ্ঠী বড়ো শিল্প ও ব্যবসা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার উদ্যোগ নিয়েছেন কারণ একটা দেশ এসব ছাড়া চলতে পারে না। মুসলমান সমাজে এটা অভিনব।
গ্রাম থেকে ক্রমবর্ধমান মাত্রায় লোকজন শহরে চলে যাওয়ার ফলে জাতিভেদ প্রথা প্রায় লোপ পেয়েছে, কিন্তু তার জায়গায় শ্রেণিবৈষম্য দেখা দিয়েছে প্রবল আকারে। যেমন, নগরীতে এখন অত্যন্ত ধনী এবং বস্তিবাসীরা প্রায় পাশাপাশি বাস করেন। তা ছাড়া, ধনী এবং দরিদ্রের মধ্যে ভেদাভেদ বৃদ্ধি পাচ্ছে। ব্যাপক শিল্পায়ন এবং ট্রেড ইউনিয়নের বিকাশ ঘটার পরে মুনিবদের প্রতি শ্রমিকদের আন্তরিক শ্রদ্ধাবোধ হ্রাস পেয়েছে, তার জায়গায় বৃদ্ধি পেয়েছে ঘৃণা এবং শত্রুতা। গ্রাম-সম্পর্কের মতো কোনো সম্পর্ক নগরীতের গড়ে ওঠে না। শিক্ষার হার দ্রুত বৃদ্ধি পাচ্ছে এবং নাগরিক জীবনযাত্রা কেবল নগরবাসীদের ওপরই প্রভাব ফেলছে না, বরং তা শহরে বসবাসকারী গ্রামবাসীদের মাধ্যমে গ্রামেও প্রসারিত হচ্ছে। ফলে জীবনযাত্রাসহ গ্রামীণ সংস্কৃতির সব দিকই ক্রমবর্ধমান মাত্রায় নাগরিক সংস্কৃতি দিয়ে প্রভাবিত হচ্ছে।
সিনেমা এবং ইলেক্ট্রনিক মাধ্যমসহ যোগাযোগ ব্যবস্থার অভূতপূর্ব উন্নতি এবং সাম্প্রতিক বিশ্বায়নের প্রক্রিয়া বিভিন্ন বিরোধী সংস্কৃতিকেও কাছাকাছি নিয়ে আসছে এবং বিভিন্ন ধর্মীয় ও আঞ্চলিক সম্প্রদায়গুলো ঐক্যের দিকে যাচ্ছে। ওদিকে, ভাষার কথা চিন্তা করলে বলতে হয়, যোগাযোগ ব্যবস্থা উন্নতির ফলে প্রামাণ্য ভাষা আঞ্চলিক ভাষাগুলো দিয়ে এবং আঞ্চলিক ভাষাগুলো প্রামাণ্য ভাষা দিয়ে প্রভাবিত হচ্ছে। মুসলমানপ্রধান বাংলাদেশের ভাষায় যেমন মুসলিম জীবনের সঙ্গে জড়িত শব্দ বৃদ্ধি পাচ্ছে, পশ্চিমবঙ্গের বাংলায় তেমনি বহু হিন্দি পরিভাষা ঢুকে পড়ছে। বলিউডের সিনেমা এবং ধারাবাহিক অনুষ্ঠানগুলিও বাঙালি সংস্কৃতির ওপর প্রভাব ফেলছে, বিশেষ করে পোশাক এবং সঙ্গীতে। পোশাকের পরিবর্তন অবশ্য মহিলাদের মধ্যেই সবচেয়ে বেশি লক্ষ করা যাচ্ছে। মহিলারা চিরদিনের শাড়ি বর্জন করে সালওয়ার-কামিজ পরতে আরম্ভ করেছেন। অথচ ছয়শো বছরের মুসলিম শাসন এবং দুশো বছরের ব্রিটিশ শাসনও শাড়িকে বদলাতে পারেনি, যদিও পূর্বোক্ত দুই আমলে পুরুষদের পোশাকে বিরাট পরিবর্তন এসেছিল। খাদ্যাভ্যাসেও এই দুই আমলের প্রভাব পড়েছিল।
খাদ্যাভ্যাস  বাঙালিরা চিরকাল ভেতো বাঙালি বলে পরিচিত হলেও, গত অর্ধশতকে তাঁদের খাদ্যাভ্যাসে বড়ো রকমের পরিবর্তন এসেছে। গরিবরা চালের বদলে শস্তা গমের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন, আর ধনীরা বিদেশী খাবারে অভ্যস্ত হয়ে পড়ছেন, বিশেষ করে চীনা এবং পাশ্চাত্যের খাদ্যে। হ্যামবার্গার এবং হট ডগের মতো পশ্চিমা খাবার এবং স্থানীয়ভাবে তৈরি চীনা ও থাই খাবার নাগরিক সমাজে এতোই ছড়িয়ে পড়ছে যে, মহিলারা তা বাড়িতেও তৈরি করার কৌশল শিখে ফেলছেন।
অবশ্য এসব পরিবর্তন আসার পরও বাঙালিদের সঙ্গে কতোগুলো খাদ্যকে অভিন্ন করে দেখা হয়। মহিলারা যেমন শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে রান্নায় তাঁদের সৃজনশীলতার পরিচয় দিয়ে নানা রকমের মিষ্টান্ন এবং আচার তৈরি করেছেন, যা উপমহাদেশের অন্য কোথাও তৈরি হয় না। তাঁদের মিষ্টির জন্যে বাঙালিরা এতোই সুপরিচিত যে, গোপাল হালদার এক জায়গায় বাঙালি সংস্কৃতিকে রসিকতা করে রসগোল্লা এবং সন্দেশের সংস্কৃতি বলে বর্ণনা দিয়েছেন। কোনো কোনো খাবার আবার দেশের বিভিন্ন অঞ্চলে স্বাদে এবং নামে খানিকটা আলাদা।
বাঙালি হিন্দু ও মুসলমানদের এবং ধনী ও দরিদ্রদের খাদ্যাভ্যাসের মধ্যে বিরাট পার্থক্য লক্ষ করা যায়। যেমন, উচ্চশ্রেণির মুসলমানরা মাংসের বিশেষ ভক্ত হলেও, হিন্দুরা সাধারণত মাছ এবং সবজি বেশি পছন্দ করেন। হিন্দুদের মধ্যে শাক্তরা অবশ্য মাংসের ভক্ত। আর, দরিদ্র হিন্দু ও মুসলমানদের খাদ্যাভ্যাস কমবেশি একই রকম, তাঁরা যা জোটাতে পারেন, তাই খান। চর্যাপদের একটি পংক্তি থেকে মনে হয় সেই প্রাচীন কালেও দরিদ্রের মধ্যে ভাতের টানাটানি ছিল, এখনো তাই আছে। দরিদ্রদের প্রধান খাদ্য ভাত আর শাক। মাঝেমধ্যে মাছ এবং ডাল। ডাল এক সময় বঙ্গদেশে ছিল বলে মনে হয় না। কিন্তু এখন ধনী ও গরিব সবাই ডাল পছন্দ করেন।
রান্নার পদ্ধতি হিন্দু এবং মুসলমানদের মধ্যে যথেষ্ট আলাদা। ভিন দেশ থেকে আসা উচ্চশ্রেণির মুসলমানরা স্থানীয় রীতিতে রান্না করা খাবার ভালোবাসতেন না। তাঁরা তাঁদের সঙ্গে নিয়ে এসেছিলেন সেইসব রান্না যা পরে মোগলাই খাবার নামে পরিচিত হয়। সাম্প্রতিক কালের আগ পর্যন্ত অবশ্য তা সাধারণ মুসলমানদের মধ্যেই প্রবেশ করেনি, হিন্দু সমাজে তো নয়ই। পর্তুগিজ এবং ইংরেজরা যখন তাঁদের সঙ্গে নতুন খাদ্য নিয়ে এলেন, তখন তাও ধীরে ধীরে হিন্দু ও মুসলমান উভয় সমাজে প্রবেশ করতে থাকে।
বাঙালিত্ব বিশেষ করে আধুনিক কালে বাঙালিদের সংস্কৃতি বিচিত্র রূপ লাভ করলেও, তার মধ্যে কিছু বৈশিষ্ট্য রয়ে গেছে, যা শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে বাঙালি সমাজে স্থায়ী আসনে প্রতিষ্ঠা লাভ করেছিল। যেমন, বাঙালি মহিলাদের এখনো উপমহাদেশের এক দল নারীর মধ্যে সহজেই আলাদা করে চিনে নেওয়া যাবে। ক্রমবর্ধমান ব্যস্ত জীবনযাত্রার মধ্যেও বাঙালিরা ঢিলেঢালা জীবনধারা পছন্দ করেন এবং কয়েকজন মিলে আড্ডা দিতে ভালোবাসেন। তাঁদের অনেকেই হুজুগে, দীর্ঘমেয়াদী ফলাফলের কথা না ভেবে সবাই মিলে লাফিয়ে পড়তে পছন্দ করেন। জীবনের বহু ক্ষেত্রে আধুনিক হয়ে উঠলেও, তাঁদের মধ্যে ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যের বিকাশ ঘটেছে সামান্যই। তাঁদের মধ্যে আত্মীয়তার বন্ধন খুব জোরালো। কিছু ব্যতিক্রম ছাড়া,বিবাহের আয়োজন করেন পিতামাতারা, এবং তাঁদের মধ্যে বিবাহপূর্ব ও বিবাহ-বহির্ভুত প্রেম সামান্যই দেখা যায়। গ্রামীণ জনগণের মধ্যে দারিদ্র্য এবং ভূমিহীনতা বৃদ্ধি পেলেও মধ্যবিত্ত এবং ধনীদের মধ্যে প্রতিযোগিতা এবং নিজেদের জাহির করার একটা সংস্কৃতি গড়ে উঠেছে। বিরাট সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালিরা আগে কৃষিনির্ভর ছিলেন, কিন্তু বিশ শতকে জনসংখ্যার বিস্ফোরণের ফলে অনেক বাঙালিই এখন গ্রামের বদলে শহরে গিয়ে স্বল্প-দক্ষ বা অদক্ষ শ্রমিকে পরিণত হয়েছেন। বাঙালি চরিত্রের আরেকটি বৈশিষ্ট্য হলো তাঁরা সাধারণত নমনীয় মধ্যপন্থায় এবং সমন্বয়ধর্মিতায় বিশ্বাসী। সে কারণে তাঁরা যেকোনো উগ্রবাদের পথ সাধারণত এড়িয়ে চলেন। 

বুধবার, ২৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

মাইথোলজি অফ মিশর

মাইথলজি অফ মিশর
✍️ ডা: অরুণিমা দাস


মাইথলজি মানে পুরাণ বিষয়ক আলোচনা। ভারতীয় পুরাণ ছেড়ে আজ একটু অন্য দেশের পুরাণে চোখ রাখা যাক। একটু অন্যরকম ভাবে উপস্থাপন করলাম আজকের বিষয়টিকে।

 *প্রাচীন মিশরের দেব-দেবীদের ইতিকথা* 

প্রাচীন পৃথিবী সম্পর্কে আমাদের জানার আগ্রহের কোনো শেষ নেই। তারা কী করতো, কীভাবে চলাফেরা করতো,তারা কি খেত,নানা রোগের চিকিৎসাপদ্ধতি কেমন ছিলো ইত্যাদি নানান বিষয় প্রায় সময়ই আমাদের মাথায় ঘোরাফেরা করে।  আদি যুগের মানুষেরা কোন রুপে তাদের কল্পনা করতো, কোন কাজে কোন দেব-দেবীর আরাধনা করতো, আর সেই সাথে কেমনই বা ছিলো সেই দেব-দেবীর নিজেদের গল্প সেই বিষয়গুলোই তুলে ধরার চেষ্টা করলাম আজকের লেখায়।

 ন্যুট 
 
ইনি ছিলেন আকাশ ও তারাদের দেবী। তার বিশাল দেহ ভূ-পৃষ্ঠের উপরে একটি প্রতিরক্ষামূলক স্তর তৈরি করে মানবজাতিকে রক্ষা করে বলে বিশ্বাস করতো প্রাচীন মিশরীয়রা। প্রতিদিন রাতে তিনি সৌর দেবতা রা-কে খেয়ে ফেলতেন এবং প্রতিদিন সকালে তাকে আবার নতুন করে তিনি জন্ম দিতেন!

 শুশু

ইনি ছিলেন শুষ্ক বাতাসের দেবতা। তাকে সাধারণত মাথায় পালক শোভিত একটি মুকুটসহ দেখা যায়। তার কাজ ছিলো মূলত ন্যুটের দেহকে উপরে তুলে রেখে আকাশ ও মাটিকে পৃথক রাখা!


 গেব

ছিলেন পৃথিবীর দেবতা। তিনি ছিলেন একইসাথে আকাশের দেবী ন্যুটের ভাই ও স্বামী। প্রাচীনকালে মিশরীয়রা মনে করতো যে, পৃথিবীতে যতো ভূমিকম্প হয়, সেগুলো আসলে গেবের হাসির কারণে হয়ে থাকে!


 আমুন

এককালে মিশরীয়দের কাছে বেশ ক্ষমতাশালী দেবতা বলে পরিচিত ছিলেন আমুন। এমনকি মিশরের ইতিহাস থেকে জানা যায় যে, এককালে তাকে ‘দেবতাদের রাজা’ বলেও মনে করা হতো। কখনো কখনো সূর্য দেবতা রা’র সাথে মিলিত হয়ে তিনি ‘আমুন-রা’ নাম ধারণ করতেন।

আনুবিস

মানুষের মতো দেহ ও শেয়ালের মতো মাথাবিশিষ্ট আনুবিসকে ভাবা হতো মৃত্যুর দেবতা। প্রাচীন মিশরে প্রায়ই শেয়ালদের দেখা যেত কবরস্থান থেকে মৃতদেহ তুলে খাচ্ছে। এখান থেকেই আনুবিসের শেয়ালের মতো মাথার ধারণাটি এসেছে বলে ধারণা করা হয়। প্রাচীন মিশরীয় রাজাদের দেহ মমিকরণের সাথে যুক্ত পুরোহিতরাও আনুবিসের অনুকরণে মুখোশ পরতেন।

বাস্টেট

বাস্ট, বাস্টেট, উবাস্টি ও পাস্‌খ নামে পরিচিত ছিলেন এ দেবী। তাকে বিভিন্ন জিনিসের সংরক্ষক মনে করা হতো দেখে তার রুপও ছিলো বিভিন্ন। প্রথমদিকে বাস্টেটকে ভাবা হতো মিশরের নিচু এলাকা গুলোর রক্ষাকর্ত্রী দেবী। এজন্য তখন তাকে সিংহীর রুপে দেখা যেত। পরবর্তীতে তাকে নিরাপত্তা ও আশীর্বাদের দেবী এবং নারী-শিশু- বিড়ালের রক্ষাকর্ত্রী মনে করা হতো। সেই সাথে সূর্যোদয়, সঙ্গীত, নৃত্য, আনন্দ, পরিবার, উর্বরতা ও জন্মের দেবীও ধরা হতো তাকে। কখনো কখনো বাস্টেটকে বিড়াল রুপেও দেখা গিয়েছে।

 বেস 

গর্ভবতী নারী, সদ্য জন্ম নেয়া শিশু ও পরিবারের রক্ষক হিসেবে দেখা হতো কিম্ভূতকিমাকার বামন এ দেবতাকে। তিনি গায়ে সিংহের চামড়া জড়িয়ে রাখতেন। কোনো শিশুর জন্মের সময় তিনি সারা ঘরে ঝুমঝুমি বাজিয়ে নেচে নেচে অশুভ আত্মাকে দূরে রাখতেন বলে বিশ্বাস করতো প্রাচীন মিশরীয়রা। আর যখন কোনো বাচ্চাকে কোনো কারণ ছাড়াই হাসতে দেখা যেতো, তখন তারা ভাবতো যে রুমের কোথাও বসে বেস হয়তো বাচ্চাটিকে ভেংচি কাটছে!


 হাপি

নীলনদের সৃষ্ট বার্ষিক প্লাবনের দেবতা হিসেবে দেখা হতো হাপিকে। বিশালাকার পেট ও স্তনবিশিষ্ট এ দেবতার মাথায় থাকতো বিভিন্ন জলজ উদ্ভিদ।

হাথর 

সৌরদেবতা রা এর কন্যা হাথরকে দেখা হতো নারী, সৌন্দর্য, ভালোবাসা, আনন্দ ও সঙ্গীতের পৃষ্ঠপোষক দেবী হিসেবে। গরু, নারীদেহ কিন্তু কানটি গরুর কিংবা নারীদেহ কিন্তু গরুর শিং মাথায় জড়িয়ে রাখা- এ তিন রুপেই দেখা যেত হাথরকে।

 হোরাস

ওসাইরিস ও আইসিসের পুত্র হোরাসকে দেখা যেত বাজপাখি কিংবা মানুষের দেহ ও বাজপাখির মাথার সংমিশ্রিত এক রুপে। হোরাসকে আকাশের দেবতা ভাবতো প্রাচীন মিশরীয়রা।


 আইসিস

প্রাচীন মিশরের অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ এক দেবী ছিলেন আইসিস। তাকে সর্বশ্রেষ্ঠ জাদুকর মনে করতো মিশরীয়রা। তাই জাদুর দেবী হিসেবে তিনি পরিচিত ছিলেন সর্বত্র। জীবন দানকারী, আরোগ্য প্রদানকারী এবং রাজাদের প্রতিরক্ষক হিসেবে দেখা হতো আইসিসকে। কখনো নিজের মাথায় একটি সিংহাসন নিয়ে, আবার কখনো পুত্র হোরাসকে স্তন্যদানরত অবস্থায় দেখা যেতো আইসিসকে।

 খেপ্রে 

খেপ্রে, খেপ্রি, খেপ্রা, খেপেরা ইত্যাদি নানা নামে পরিচিত এ দেবতাকে মিশরীয়রা গুবরে পোকাদের দেবতা বলে ভাবতো। গুবরে পোকাদের বিভিন্ন প্রাণীর মল গড়িয়ে নিয়ে যেতে দেখে প্রাচীন মিশরীয়রা ভাবতো যে, খেপ্রে হয়তো সূর্যকে তার কক্ষপথে স্থাপন করে এসেছেন!

খ্‌নুম 

ভেড়ার মাথাওয়ালা খ্‌নুম বা খ্‌নেমু নামে পরিচিত এ দেবতাকে মিশরীয়রা নীল নদের উৎসের দেবতার মর্যাদা দিয়েছিলো। একই সাথে তাকে জলপ্রপাত, উর্বরতা ও সৃষ্টির দেবতা ভাবা হতো। তার কাছে থাকা কুমোরের চাকাতেই তিনি নীলনদের তীরের মাটি থেকে প্রথম মানুষ তৈরি করেছিলেন বলে এককালে বিশ্বাস করতো মিশরীয়রা।


খোন্সু

আমুন ও মুতের ছেলে খোন্সুকে খোন্স, খেন্সু, খুন্স ইত্যাদি বিভিন্ন নামেও ডাকা হতো। প্রাচীন মিশরে তাকে চাঁদ, চাঁদের আলো ও সময়ের দেবতা হিসেবে গণ্য করা হতো।

মা’আত

আইন-কানুন, নীতি-নৈতিকতা ও বিচার ব্যবস্থার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়াদির দেবী হিসেবে ভাবা হতো মা’আতকে। উটপাখির পালক মাথায় জড়ানো অবস্থাতেই তাকে চিত্রায়িত হতে দেখা গেছে।

ম্যুট 

সৌরদেবতা রা’র কন্যা ম্যুটকে শকুনদের দেবী হিসেবে কল্পনা করতো প্রাচীন মিশরীয়রা। দীর্ঘাকায় এ দেবীর পরনে থাকতো উজ্জ্বল রঙয়ের পোষাক, মুকুটে শোভা পেত শকুন।

নেফিথিস

অনেক ক্ষমতার অধিকারী দেবীকে নেফিথিসকে প্রাচীন মিশরীয়রা ‘চমৎকার দেবী’ বলেও সম্বোধন করতো। তবে সময়ে সময়ে চমৎকার এ দেবী ভয়ংকরও হয়ে উঠতে পারতেন। রাজার শত্রুদেরকে তিনি তার নিঃশ্বাস দিয়ে শেষ করে দিতে পারেন বলে বিশ্বাস করতো মিশরীয়রা। তাই তাকে রাজাদের প্রতিরক্ষক বলা হতো। মৃত্যু, ক্ষয় ও অন্ধকারের এ দেবীর জাদুবিদ্যায় ছিলো অসাধারণ পারদর্শীতা ও অদ্ভুত আরোগ্য প্রদানের ক্ষমতা।

ওসাইরিস

প্রাচীন মিশরের দেবতাদের মাঝে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ একটি স্থান দখল করে আছেন ওসাইরিস। মিশরের প্রথম রাজা হিসেবে চিত্রায়িত এ দেবতাকে তারা ভাবতো শস্যের দেবতা হিসেবে। ফারাওয়ের ক্ষমতা দখলের লড়াই নিয়ে নিজ ভাই সেথের কাছে খুন হন ওসাইরিস। পরে অবশ্য ওসাইরিসের ছেলে হোরাস সেথকে পরাজিত করে ফারাও হয়েছিলেন। মিশরীয়রা বিশ্বাস করতো যে,স্ত্রী আইসিস তাকে পুনরায় জীবিত করেছিলেন। এরপর তিনি পাতালপুরিতে চলে যান শাসক হিসেবে এবং মৃতদের বিচার করতে!


 প্‌তাহ
প্‌তাহকে স্থাপত্যশিল্পের দেবতা হিসেবে কল্পনা করতো মিশরীয়রা। তারা ভাবতো যে, নিজের কল্পনা ও মুখ নিঃসৃত শব্দের সাহায্যেই বিশ্ব সৃষ্টি করেছেন প্‌তাহ! মমিবেশী এ দেবতার হাত দুটো বের হয়ে থাকতো ব্যান্ডেজের ভেতর থেকে। সেই হাত দিয়ে ধরা থাকতো একটি লাঠি।

রা
রারা,রে ইত্যাদি নানা নামে পরিচিত এ দেবতা ছিলেন মিশরীয় মিথলজির অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ এক দেবতা। মূলত সৌরদেবতা থাকলেও তার ক্ষমতা ছিলো অনেক। মানুষের মতো দেহ ও বাজপাখির মতো মাথাধারী রা’র মাথায় থাকতো সৌর চাকতি।
প্রতিদিন সকালে পূর্বদিকে তার জন্ম হতো ও রাতে পশ্চিমে ঘটতো মৃত্যু। দিনের বেলায় সৌর নৌকায় চড়ে তিনি ঘুরে বেড়াতেন পুরো আকাশ জুড়ে। আর রাতের বেলায় পাতালপুরিতে গিয়ে শায়েস্তা করে আসতেন বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের। অন্যান্য দেবতাদের উপর তার ক্ষমতা এতটাই বিস্তৃত ছিলো যে,তিনি মাঝে মাঝেই তাদের ক্ষমতা আত্মীকরণ করতে পারতেন। এভাবেই আমুন-রা (আমুন ও রা), মন্টু-রা (মন্টু ও রা), রা-হোরাখ্‌তি (রা ও হোরাস) নামগুলো এসেছিলো রা’র জন্য।

সবেক
কুমিরের মতো মাথা ও বাকিটুকু মানবদেহের অধিকারী সবেককে কুমিরদের দেবতা মনে করা হতো এককালে।

 সেথ 
গেব ও ন্যুটের ছেলে সেথকে সেত, সেতেখ, সুতি ও সুতেখ নামেও ডাকতো প্রাচীন মিশরীয়রা। মরুভূমি, বজ্রপাত ও অকল্যাণের দেবতা হিসেবে ভাবা হতো সেথকে। তার মাথায় থাকা পশুটি আসলে কী সে সম্পর্কে জানা যায় নি। কখনো কখনো আবার জলহস্তী, শূকর কিংবা গাধার রুপেও দেখানো হয়েছে সেথকে।


টেফনাট
সিংহীর মাথা ও মানুষের শরীরধারী টেফনাট ছিলেন শু-এর স্ত্রী। তাকে পানি ও উর্বরতার দেবী হিসেবে ভাবা হতো।

 ঠথ
লেখালেখি কিংবা গণনায় ব্যস্ত হিসেবে চিত্রায়িত ঠথ ছিলেন জ্ঞানের দেবতা। মানবদেহ ও আইবিস পাখির মাথাবিশিষ্ট ঠথের হাতে লেখালেখির জন্য সবসময় কলম ও বোর্ড থাকতোই!
ওয়াজ-ওয়েরআংশিক পুরুষ ও আংশিক নারী হিসেবে চিত্রায়িত এ দেবতাকে উর্বরতার দেবতা বলে ভাবতো মিশরীয়রা। কখনো কখনো তাকে গর্ভবতী হিসেবেও দেখানো হয়েছে!

তাওয়ারেত
দেবী তাওয়ারেত ছিলেন জলহস্তীর মতো দেখতে। যেহেতু মা জলহস্তী তার বাচ্চাদের রক্ষা করতে আক্রমণাত্মক হয়ে উঠে (এটা তো দুনিয়ার যেকোনো মা-ই করবে!), তাই গর্ভবতী মায়েরা নিজেদের গর্ভের সন্তানকে রক্ষার জন্য তাওয়ারেতের মন্ত্রপূত কবচ পরতেন।
ওয়াজেতগোখরা সাপের মতো করে চিত্রায়িৎ এ দেবীকে মিশরের নিচু অঞ্চলের প্রতিরক্ষার দায়িত্বে নিয়োজিত বলে এককালে মনে করতো মিশরের অধিবাসীরা।

সপদু

তিনি ছিলেন একজন যুদ্ধের দেবতা।
সেশাতকখনো ঠথের কন্যা আবার কখনো ঠথের স্ত্রী হিসেবে দেখানো হতো দেবী সেশাতকে! তাকে লেখালেখি, গণিত, জ্যোতির্বিদ্যা ও স্থাপত্যবিদ্যার দেবী মনে করা হতো।
ক্বেতেশসিরিয়া থেকে মিশরীয় মিথলজিতে ঢুকে পড়া দেবী ক্বেতেশকে দেখা হতো উর্বরতার প্রতীক হিসেবে।

সার্কেত
সার্কেতকে এককালে মিশরের অধিবাসীরা ভাবতো বিচ্ছুদের দেবী হিসেবে। তিনি যেমন খারাপ লোকদের গায়ে বিচ্ছুর হুল ফুটিয়ে দিতেন, তেমনি ভালো লোকেরা বিচ্ছু বা সাপের বিষে আক্রান্ত হলে তাদের রক্ষার ব্যবস্থাও করতেন!
রায়েত-তাওয়িতাকে বলা যেতে পারে সৌরদেবতা রা-এর সঙ্গিনী।
সেকারসেকারকে বলা হতো বাজপাখিদের দেবতা।


ক্বেবুইউত্তর দিক থেকে প্রবাহিত বাতাস নিয়ন্ত্রণকারী দেবতা ছিলেন ক্বেবুই!

 সেখমেত

আগুন ও যুদ্ধের দেবী বলে পরিচিত সেখমেতের মাথাটি ছিলো সিংহীর এবং দেহটি ছিলো একজন নারীর। তার নিঃশ্বাসের ফলেই মরুভূমি সৃষ্টি হয়েছে বলে বিশ্বাস করতো মিশরের লোকজন!

 পাখেত

পাখেত নামে এ দেবীর মাঝে একই সাথে স্নেহ ও আক্রোশকে খুঁজে পেত মিশরের অধিবাসীরা। কারণ তিনি ছিলেন একইসাথে মায়ের মতো স্নেহময়ী ও যুদ্ধের মতো ধ্বংসাত্মক বিষয় দুটোর দেবী।
নেখবেতশকুনের মতো দেখতে এ দেবী ছিলেন মিশরের উঁচু এলাকা, শিশুর নিরাপদ জন্ম ও ফারাওদের রক্ষার কাজে নিয়োজিত।
মেন্‌হিতসিংহ ও যুদ্ধের দেবী ছিলেন মেন্‌হিত।
কুকনারী ও পুরুষ উভয়ের বৈশিষ্ট্য সম্পন্ন কুককে দেখা হতো অন্ধকার জগতের সাথে সম্পৃক্ত এক সত্ত্বা হিসেবে। তাকে কেক, কেকু প্রভৃতি নামেও ডাকা হতো।
মাফদেতমিশরীয় উপকথার একেবারে শুরুর দিকে খোঁজ মিলে মাফদেতের। বিড়াল বা বেজির ন্যায় চিত্রায়িত এ দেবী সাপ ও বিচ্ছুদের হাত থেকে তাদের রক্ষা করবে বলে বিশ্বাস করতো মিশরীয়রা।
কেবেচেতদেবতা আনুবিসের কন্যা কেবেচেতকে প্রাচীন মিশরীয়রা ক্বেবেহেত, কেবহুত, কেবেহুত, ক্বেবেহুত ও কাবেচেত নামেও ডাকতো। তিনি ছিলেন সজীবতা ও বিশুদ্ধতার দেবী।
মাহেসসিংহের ন্যায় মস্তকধারী মাহেস ছিলেন প্‌তাহের ছেলে। তাকে যুদ্ধের দেবতা হিসেবে মান্য করতো লোকজন।
হেকেতব্যাঙের আকৃতিধারী দেবী হেকেত ছিলেন জীবন ও উর্বরতার প্রতীক।
গেঞ্জেন ওয়েররাজহাসের মতো দেখতে এ দেবতাকে আসলে কোন কাজ নিয়ন্ত্রণের ভার দিয়েছিলো তার অনুসারীরা তা জানা যায় নি! তবে প্রাচীন মিশরের বিভিন্ন চিত্রকর্মে প্রায়ই দেখা মেলে তার।


 বাবি
বাবি বাবিবাবা, বাবি প্রভৃতি নামে পরিচিত এই স্বত্ত্বা ছিলেন বেবুনদের দেবতা। বেবুনদের সাথে মানুষের চারিত্রিক কিছু বিষয়ের মিল দেখে তখন মানুষ ভাবতো যে, বেবুনেরা বুঝি তাদের মৃত পূর্বপুরুষ!
আপেপ সাপের মতো দেখতে এ দেবতা আপেপ, আপেপি, অ্যাপোফিস ইত্যাদি নামে পরিচিত। তাকে অন্ধকার জগত ও বিশৃঙ্খলার সাথে সম্পৃক্ত বলে মনে করতো মিশরীয়রা।
আমুনেত দেবতাদের রাজা হিসেবে খ্যাত আমুনের স্ত্রীর নাম ছিলো আমুনেত। অন্যান্য আরো দেবীর মতো তাকেও সৃষ্টির দেবী বলে বিশ্বাস করতো প্রাচীন মিশরীয়রা।
আন্‌হুর‘আন্‌হুর’ শব্দের অর্থ ‘আকাশ বহনকারী’। নাম শুনেই তার কাজের ধরণ সম্পর্কে অনুমান করা যায়। আন্‌হুর ছিলেন একইসাথে আকাশ ও যুদ্ধের দেবতা।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস


গুগল থেকে কিছু তথ্য নেওয়া আর হায়ারোগ্লিফের দেশে বইটি থেকেও কিছু তথ্য পেয়েছি।




 

সোমবার, ২১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

ভাষা দিবস নিয়ে কিছু কথা

ভাষা দিবস নিয়ে কিছু কথা
✍️ ডা: অরুণিমা দাস


"ইংরেজীটা দাদা বড্ড কঠিন
 হিন্দী টাও ঠিকঠাক আসেনা,
 বাংলা ছাড়া এই মুখেতে,
 আর কিচ্ছু যে রটে না"।

 ভূমিকাঃ
বাঙালির ইতিহাস সরলরৈখিক না হলেও তাদের ইতিহাসে অসংখ্য উজ্জ্বল চিহ্ন আছে যা অর্জনের সমৃদ্ধতায় সমুজ্জ্বল। এমনই একটি চিহ্ন নিঃসন্দেহে ১৭ নভেম্বর, ১৯৯৯। ইউনেস্কোর সিদ্ধান্তে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে একুশে ফেব্রুয়ারিকে স্বীকৃতি বাঙালির জন্য এ উজ্জ্বল বাক্যের সূচক। বাঙালি জাতি হিসেবে আমাদের গর্ব অহংকার বাংলা ভাষা "মাদার ল্যাঙ্গুয়েজ অফ দি ওয়ার্ল্ড” আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃতি পেল। বিশ্বের মানুষ এখন থেকে প্রতিবছর একুশে ফেব্রুয়ারীতে বাঙালি জাতির মাতৃভাষা ভালোবাসার গাঁথা শুনবে এবং নিজেরাও উদ্বুদ্ধ হবে এবং একই সঙ্গে ছোট-বড় সকল জাতিগোষ্ঠীর মাতৃভাষাই মর্যাদার সঙ্গে অবস্থান করবে।

 ভাষা আন্দোলনের আদি কথাঃ 
পাকিস্তান সৃষ্টির অব্যবহিত পূর্বে আলিগড় মুসলিম বিশ্ববিদ্যালয়ের তৎকালীন উপাচার্য ড. জিয়াউদ্দিন উর্দুকে পাকিস্তানের একমাত্র রাষ্ট্রভাষা করার প্রস্তাব উপস্থাপন করেন। পূর্ববঙ্গ থেকে ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ এ প্রস্তাবের ঘোর বিরোধিতা করেন এবং বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার দাবি উত্থাপন করেন। এভাবে পাকিস্তান জন্মের আগেই ভাষা আন্দোলনের সূত্রপাত ঘটে।

বিশ্বসভায় বাংলাদেশের ও বাঙালি জাতির মহা বিজয়ঃ
"আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস" ঘোষনা বিশ শতকের অন্যতম ঘটনা। যা ছিলো এদিন বাংলাদেশের জাতির ইতিহাসের অন্যতম মাইলফলক। আজ তা বিশ্ব সম্প্রদায়ের কাছে স্মরণীয় একটি দিবস হিসেবে স্বীকৃতি লাভ করাতে দলমত নির্বিশেষে সকল বাংলাদেশী নাগরিক গর্বিত ও আনন্দিত। দেশের মানুষ নানাভাবে নানা প্রক্রিয়ার মধ্য দিয়ে স্মরণ করবে আমাদের এই যুগান্তকারী অর্জনকে। বাঙালি জাতির রক্তস্নাত ভাষা আন্দোলন একুশে ফেব্রুয়ারি আজ ইতিহাসের গণ্ডি অতিক্রম করে সমগ্র বিশ্বে সম্পদে পরিণত হয়েছে। বাংলাদেশের জন্য এটি একটি অনন্য অর্জন। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস সারা বিশ্বের মানুষের জন্য এক ধরনের প্রতীকী আত্মপ্রসাদের জন্ম দিয়েছে। বাঙালি আত্মপ্রসাদের মূর্ত রুপ বাংলা একাডেমি। কারণ অমর একুশের ভাষা শহীদদের রক্তের শব্দ ভিতের উপর দাঁড়িয়ে আছে এ প্রতিষ্ঠান। ইউনেস্কো একুশে ফেব্রুয়ারিকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে পালনের সিদ্ধান্ত নিয়ে শুধু মাতৃভাষার জন্য আমাদের সংগ্রাম এবং আত্মদানকেই স্বীকৃতি দেয়নি, অমর একুশের শহীদের আত্মদান থেকে উৎসারিত স্বাধীনতা আন্দোলন স্বাধীনতা অর্জন কেউ মর্যাদা দিয়েছে। বিশ্বের বিভিন্ন দেশে প্রতিবছর বাংলাদেশের শহীদ দিবস একুশে ফেব্রুয়ারি যখন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে মর্যাদা সঙ্গে পালিত হবে তখন আমাদের একবুক অনাবিল আনন্দ ও অতুলনীয় গর্ববোধে ভরে উঠবে। মহান মে দিবস এখন শুধু শিকাগো শহরে সীমাবদ্ধ থাকছে না পৃথিবীর সকল দেশে পালিত হচ্ছে, তেমনি একুশে ফেব্রুয়ারি ঢাকার শহীদ মিনারে নয়, বরং পৃথিবীজুড়ে মর্যাদার সঙ্গে পালিত হবে। সেসব দেশের জনগণ নতুন করে জানতে পারবে কিভাবে সালাম,বরকত,রফিক,জব্বার নিজেদের অমূল্য প্রাণের বিনিময়ে মাতৃভাষাকে রক্ষা করেছেন।
মাতৃভাষা হিসেবে বাংলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র
ব্রিটিশ আমল থেকে পাকিস্তানি আমল পর্যন্ত মাতৃভাষা হিসেবে বাংলার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র অব্যাহত ছিল। ১৯৪৭ সালে দেশভাগের পূর্ব থেকেই বাংলাভাষাকে লড়াইয়ে নামতে হয় উর্দুর প্রতিপক্ষ হিসেবে।পাকিস্তান প্রতিষ্ঠার পূর্বে রাষ্ট্রভাষা বিতর্কে উর্দুর দাবিদারদের যারা বাংলা ভাষার স্বপক্ষে কলম যুদ্ধের সূচনা করেন,তাদের মধ্যে ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহর পরেই উল্লেখ করতে হয় কবি ফখরুল আহমদ ও প্রাবন্ধিক আব্দুল হকের নাম। ডঃ মুহাম্মদ শহীদুল্লাহ দৈনিক আজাদে এক প্রবন্ধে বলেন,"অধিকাংশ জনসংখ্যার ভাষা হিসেবে বাংলায় পাকিস্তানের রাষ্ট্রভাষা হওয়া উচিত, যদি দ্বিতীয় রাষ্ট্রভাষা করার প্রয়োজন হয় তখন উর্দুর কথা বিবেচনা করা যেতে পারে"।
কিন্তু পাকিস্তানের তৎকালীন উচ্চমহল,শাসক এবং প্রশাসক যারা মোহাজের হয়ে ভারত থেকে পাকিস্তান এসেছিলেন তারাই উর্দুকে অন্যান্য মাতৃভাষার উপর চাপিয়ে দিতে চেষ্টা করতে থাকলেন। পাকিস্তানের অন্যান্য অঞ্চলে তা মেনে নিলেও বাংলা ভাষা তাঁর সেই প্রাচীন সংগ্রামী ঐতিহ্যের কারণে মেনে নিলোনা। পৃথিবীর মাতৃভাষা গুলোর মধ্য বাংলা ভাষার সম্ভবত একমাত্র ব্যতিক্রম যে, এ ভাষাটিকে তার প্রাচীন রূপ থেকেই মর্যাদা ও অধিকারের প্রশ্নে লড়াই করে আসতে হয়েছে। বাংলার প্রাচীন কালে সেন শাসন আমলে বাংলা ভাষার চর্চার বিরুদ্ধে সুস্পষ্ট ধর্মীয় নিষেধাজ্ঞা জারি করে বলা হয়েছিল,বাংলা ভাষার চর্চা করলে রৌরব নামক নরকে যাবে।

 জাতিসংঘ থেকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষার মর্যাদা ও স্বীকৃতিঃ
মাতৃভাষার জন্য বাঙালি জাতির আত্মদান বৃথা যায়নি,ইউনেস্কো কর্তৃক আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবসের স্বীকৃতির মধ্য দিয়ে আবারও সরব হয়ে উঠেছে।ইউনেস্কো কর্তৃক এ সিদ্ধান্তের মাধ্যমে বিশ্বের আড়াই হাজারের উপর ভাষাকে স্বীকৃতি দেয়া হয়েছে।এসেছে শুধু ভাষার স্বীকৃতিই নয় বরং আরো ব্যাপক স্বীকৃতির দ্যোতক। একুশের মধ্য বাঙালির ভাষাভিত্তিক ভবিষ্যতের বীজ। অমর একুশকে আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়ার মধ্য দিয়ে বাঙালি প্রতীকি বিজয় নির্দেশিত হয়েছে। ভাষা শহীদের আত্মদানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলেছে। একুশে ফেব্রুয়ারি চেতনা এখন শুধু মাতৃভাষার পরিধি অতিক্রম করে সকল পর্যায়ে মানবাধিকার বাস্তবায়ন করার একটি শক্তিশালী মাধ্যমে পরিণত হয়েছে।

 উপসংহারঃ
বিদায়ী সহস্রাব্দ শেষ হবার আগেই আমাদের মাতৃভাষার দাবিতে আত্মহুতি দানকারী শহীদদের মিলেছে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। অবশ্য এর আগে এমন অনেক আত্মত্যাগের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি মিলেছে। কারণ সেগুলো ছিল উন্নত দেশগুলোর ঘটনা। আর মাতৃভাষার জন্য আমাদের সংগ্রাম ত্যাগ এসবের স্বীকৃতি মিলতে মিলতে পার হয়ে গেল ৪৮ বছরেরও বেশি সময়। হোক তবুও আমরা তা পেয়েছি। সর্বোচ্চ অঙ্গীকার ও নিরলস সংগ্রামের মধ্য দিয়ে আমরা আমাদের মাতৃভাষাকে রক্ষা করেছি। স্বাধীনতা অর্জন করেছি এবং সর্বশেষ আমরা আমাদের মাতৃভাষা ও তার জন্য যে আত্মোৎসর্গ তার স্বীকৃতি পেয়েছি।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শিরোনাম - দুরত্ব✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - দুরত্ব ✍️ ডা: অরুণিমা দাস আধুনিকতা মানেই অন্যরকম একটা ব্যাপার, উন্নতির পথে এগিয়ে যাবার সিড়ি তৈরি করে দেয় আধুনিকতা। আজকাল কেউ আ...