অণুগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান
অণুগল্প লেবেলটি সহ পোস্টগুলি দেখানো হচ্ছে৷ সকল পোস্ট দেখান

বৃহস্পতিবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

শিরোনাম-কণ্ঠস্বর✍️ ডা:অরুণিমা দাস

 শিরোনাম-কণ্ঠস্বর
✍️ ডা:অরুণিমা দাস

সময়ের নিয়মে বদল হয় অনেক। থেকে যায় কিছু কথা,কিছু কণ্ঠস্বর। প্রথমেই মনে পড়ে ছোটবেলার কথা। স্কুলে মিসরা বলতেন যে কাজ করবে সেটাই মন দিয়ে করো। নিজের একশো ভাগ দিয়ো। আজও তাদের কথা মেনে চলতে চেষ্টা করি। ক্লাস এইটে পড়ার সময়ে একজন দিদিমণি ছিলেন নন্দা দিদিমণি। অঙ্ক ক্লাস নিতেন। আর অঙ্কতে আমি ছিলাম সুপার ডুপার। সিলেবাসে অঙ্ক যে কেনো ছিলো সেই নিয়ে খুব ভাবতাম আমি! একদিন ক্লাসে বলেছিলাম নন্দু মেরি ইয়ারা,তু হ্যায় বহুত প্যারা। ম্যাম বলেছিলেন তোকে আমি বলে দিচ্ছি অঙ্ক জীবনে তোর দ্বারা কোনোদিন হবেনা। ম্যামের কথা কিন্তু অক্ষরে অক্ষরে ফলেছে। অঙ্ক থেকে আমি অনেক দূরে আজ। ম্যামের সাথে দেখা হয়েছিলো যখন বলেছিলাম ম্যাম আপনি ঠিক বলেছিলেন,অঙ্ক হবেনা আমার দ্বারা। ম্যাম আর সাথে থাকা আরও ম্যামরা বলেছিলেন জীবনের অঙ্ক কষিস তুই রোজদিন,আবার কোন অঙ্ক চাই তোর! এটাই আমাদের কাছে গর্বের। আজও ভুলিনি সেই কণ্ঠস্বরগুলো। ম্যাম আজ নেই আমাদের মধ্যে কিন্তু তাঁর বলা কথা রয়ে গেছে। ঠাকুমা,দিদা সবসময় বলতেন কারোর ভালো করতে না পারিস খারাপ করবিনা। খুব মনে পড়ে সেগুলো। চেষ্টা করি আমার দ্বারা কারোর ক্ষতি যেনো না হয়। এক বন্ধু ছিলো স্কুলে,অনেকদিন তার সাথে যোগাযোগ নেই কিন্তু সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় তার গানের ভিডিও আর গলা মনে দাগ কেটে যায় প্রতিদিন। কলেজজীবনে ম্যাম স্যারদের কথা খুব মনে পড়ে। গাইড স্যারের কথা জীবনকে সহজ ভাবে নিবি তাহলে ভালো থাকবি। মনে পড়ে এই কথাগুলো। স্যারের সাথে দেখা হলে আজও কেস নিয়ে আলোচনা হয়। আর কিছু বন্ধুদের বাঁকা কথা সেসবও মনে পড়ে। যারা আমার লেখা নিয়ে হাসাহাসি করতো তারা যখন লেখা পড়ার লিঙ্ক চায় তখন মনে হয় এরা তো হারিয়ে যায়নি এরা আমাকে চ্যালেঞ্জ নিয়ে এগিয়ে যেতে সাহায্য করেছে। সবাই ভালো থাকুক নিজের মতন। তাদের কথাগুলোই তাদের কথা মনে করিয়ে দেবে। 

"যোগাযোগ থাকুক বা না থাকুক, থেকে যায় কিছুজনের কণ্ঠস্বর
পড়লে মনে সেসব আজও হৃদ মাঝারে ওঠে যে ঝড়।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ১০ সেপ্টেম্বর, ২০২৬

সেদিনের ক্লাসরুমটা খুব চুপচাপ ছিলো✍️ ডা:অরুণিমা দাস

সেদিনের ক্লাসরুমটা খুব চুপচাপ ছিলো
✍️ ডা:অরুণিমা দাস


এই বিষয় দেখে দুটো ঘটনা মনে পড়ে গেলো। একটা প্রাইমারি স্কুলের ঘটনা ওই ক্লাস টু বা থ্রী হবে আরেকটা ক্লাস নাইনের অ্যানুয়াল রেজাল্টের দিনের ঘটনা। 
প্রাইমারি স্কুলের ঘটনাটা আগে বলা যাক। ক্লাস ওয়ান পাস করে গেছি মানে আমি সিনিয়র এরম একটা ব্যাপার লাগতো,সে কীভাবে পাস আর শেষের দিক থেকে কত নম্বরে নাম সেটা বলে নিজেকে আর লজ্জা দিতে চাইনা। সিনিয়র হলে আমাদের জুনিয়র ক্লাসের ওপর মাঝে মাঝে নজর রাখতে বলা হতো। টিফিনের পরের ক্লাসগুলো করার অত দরকার মনে হতোনা আমার। যখন জানতে পারতাম জুনিয়র ক্লাসের বাচ্চারা হল্লা করছে ওদের ক্লাস হচ্ছেনা তখন পৌঁছে যেতাম দিদিগিরি ফলাতে। একদিন এরকম গেছি দেখি একটা বাচ্চা মেয়ে কি একটা বিষয় নিয়ে যেনো খুব হাত পা নেড়ে কথা বলছে। চুপ করতে বলায় সে পাত্তা দিলোনা। তখন গিয়ে পিঠে কাঠের স্কেলের এক বাড়ি মেরেছি আর তারপরই আসল বিপদ ঘনিয়ে এলো। পরের দিন ক্লাসে হেড মিস্ট্রেস এসে আমার নাম ধরে ডেকে তারপর আমার কীর্তির কথা বলে জানালেন যাকে আমি স্কেলাঘাত করেছি সে এই স্কুলের প্রাক্তন প্রধান শিক্ষিকার নাতনী। গোটা ক্লাসরুমের সবাই শুনে চুপ করে রইল। আমার তো দুই কান তখন লজ্জায় লাল। তারপর নেক্সট দিন গার্ডিয়ান কল আর পেরেন্ট টিচার মিটিং। বাড়ী গিয়ে আমার ওপর বেত্রাঘাত চললো। সেই থেকে আমি হেভিওয়েট লোকেদের এড়িয়ে চলি। ম্যাডামদের সাথে যখন পরে দেখা হতো বলতেন দুষ্টুমিগুলো না করে পড়াশোনাটা করতে পারিস। তোর রেজাল্ট দেখে আমাদের লজ্জা হয় খালি তোরই হয়না। হেসে খেলতে চলে যেতাম মাঠে। হাল ছেড়ে দিয়েছিলেন ওনারা। এভাবে প্রাইমারি স্কুলের গণ্ডি পেরোলাম হাই স্কুলে গেলাম। 
দ্বিতীয় ঘটনা ঘটার আগে যখন নাইনের অ্যানুয়াল এক্সামে ইংলিশ পরীক্ষা দিচ্ছি। উফফ!সে কি কঠিন প্রশ্ন! দাঁত ভেঙে যাওয়ার জোগাড়। হলে যখন ইংলিশ ম্যাডাম এসেছিলেন প্রশ্ন কেমন হয়েছে জানতে আমি বলেছিলাম একদম ভালো হয়নি। শুনে সেদিনও সবাই এর ওর চোখের দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপ ছিলো। এক্সাম দিয়ে এসে বাড়িতে লাফালাফি কান্নাকাটি আমি পাস করবোনা ইংলিশে। ইংলিশ স্যার চেঞ্জ করতে বললাম। বাড়ীতে বলা হলো পরের এক্সামগুলো দিতে হবে তাই এসব নিয়ে না ভাবতে। তারপর বাকি এক্সাম গুলো দিলাম। আর রেজাল্টের আগের দিন তো পড়াশোনা শিকেয় উঠেছে। ইংলিশে কি হবে ৩৪ পাবো তো পাস নম্বর এটাই একমাত্র চিন্তা! পরদিন যখন রেজাল্ট বেরোবে সবাই ক্লাসে হাজির,হেড মিষ্ট্রেস এলেন,নাম ধরে ধরে রেজাল্ট বুক দিলেন সবাইকে। আর প্রথম নাম যখন আমার ডাকলেন আমি ভাবলাম এটা কোন দিক থেকে নাম ডাকছেন? এরপর দিদিমণি বললেন আমি নাকি ফার্স্ট হয়েছি। পুরো ক্লাস নিস্তব্ধ আর আমি অবাক! জিজ্ঞেস করলাম ইংলিশে পাস করেছি দিদিমণি? রেজাল্ট দেখে বললেন ওই চল্লিশের ঘরে পেয়েছিস। মনে মনে বললাম পাস করে গেছি তাহলে। এদিকে বন্ধুরা বলছে ন্যাকামি রাখ!ওদের বোঝাতে পারছি না ইংলিশ নিয়ে আমি কি পরিমাণ চিন্তায় ছিলাম!ওদের ন্যাকামি মনে হলে কিছু বলার নেই। তবে তারপর থেকে বন্ধুরা বিশাল ভালো ব্যবহার করতো। এই রূপ পরিবর্তন দেখে বুঝেছিলাম ভালো সময়ে সবাই আপন হতে আসবে কিন্তু ইংলিশ পরীক্ষায় পাশ নিয়ে চিন্তার সময়ে কেউ পাশে ছিলোনা। আজও একই নিয়ম চলে দুনিয়াতে। তাই নিজেই নিজের বন্ধু হওয়া ভালো।
তবে আমাদের সময়ে শিক্ষক শিক্ষিকাদের সবাই সম্মান করতাম। মজা করতাম আমরাও কিন্তু তাঁদের অসম্মান করার কথা কোনোদিন স্বপ্নেও ভাবিনি।

"ভাগ্যিস জেন জি নই আমরা,সবাই যে মোরা জেন ওয়াই 
সুশিক্ষায় শিক্ষিত হয়েছি,সকলকে সম্মান প্রদর্শন করতে চাই।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ২৩ জুলাই, ২০২৬

শিরোনাম - মাঝরাতের অচেনা ফোন✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - মাঝরাতের অচেনা ফোন
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

বছর দুয়েক আগের ঘটনা,তখন আন্দোলন চলছে তিলোত্তমাকে নিয়ে। মাঝে মাঝেই মঞ্চ থেকে ঘুরে আসতাম সবাই মিলে। পরিস্থিতি খুব সুবিধের ছিলোনা। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করার চেষ্টা চলছে। যে দিনের কথা বলছি,বলা ভালো যে রাতের কথা বলছি সেটি ছিলো স্বাধীনতা দিবসের আগের দিন,সেদিন সারাদিন ডিউটি করে এসে ফ্রেশ হয়ে ডিনার করে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম হোস্টেলে। মাঝরাতে হঠাৎ শোরগোল শুনে ঘুম ভেঙে গেলো। ফোনে দেখলাম একগাদা মেসেজ, তিলোত্তমার কলেজে নাকি ভাঙচুর হয়েছে। কেমন যেনো ভয় ভয় হতে লাগলো। কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে রইলাম। একটা ফোন এলো সেই সময়ে, ফোনের স্ক্রিনে দেখলাম কোনো নম্বর নেই। ফোন তুললাম, ওপারে ভেসে এলো একটা ভারী গলা,ম্যাডাম একদম দরজা খুলে বেরোবেননা। কোনোরকম শব্দ হলেও না। খুব সম্ভবত পরের হামলা কিছুক্ষণের মধ্যেই আপনার হাসপাতালে হতে পারে। ভুয়ো হুমকি মনে হলোনা কেনো যেনো! কি ভাবলাম রুমে লাইট জ্বেলে সারারাত থাকলাম। পরদিন সকালে উঠে দরজা খুলে বেরিয়ে দেখলাম থমথমে পরিবেশ। ব্রাশ করতে যাচ্ছি এমন সময়ে একজন মেয়ে দেখলাম ওয়াশরুমের দিক থেকে আসছে। আমাকে দেখে বললো কাল রাতে কি হয়েছিলো জানো? বললাম কি হয়েছিলো গো?!বললো কারা যেনো দলবল নিয়ে পাঁচিল টপকে এসেছিল আর আমাদের মেইন গেটে প্রায় জনা পঞ্চাশেক পুলিশ পাহারা ছিলো। মাঠের পাশে পুরো ধোঁয়ায় ভরেছিল। কারা করেছিলো এসব বোঝা যায়নি। তোমাকে সাবধান করতে দরজা ধাক্কা দিয়েছিলাম দু তিন বার। কিন্তু তুমি দরজা খোলোনি। ভেবেছিলাম ঘুমিয়ে পড়েছো হয়তো। আমরা সবাই মেইন দরজা যেটা দিয়ে অন্য ফ্লোরে যাওয়া যায় সেই দরজা ভালো করে দড়ি বেঁধে বন্ধ করেছিলাম। ছিটকিনি কাজ করছিলো না।  সব শুনলাম কিন্তু ওই ফোনের কথা কাউকে বলতে পারিনি। জানি না কে ছিলো ফোনের ওপারে কিন্তু আমায় সেদিন রক্ষা করেছিলো সেই একটা ফোন। তারপর বেশ কয়েক সপ্তাহ হোস্টেলে থাকিনি। বাড়ী থেকে ডিউটি করেছি। কিন্তু সেই রাতের কথা আজও মনে পড়লে গায়ে কাঁটা দিয়ে ওঠে।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ২৫ জুন, ২০২৬

থমকে দাঁড়ায় সময় যখন ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

থমকে দাঁড়ায় সময় যখন 
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

সক্কাল সক্কাল ঘুম থেকে উঠে দরজা খুলে বেরিয়ে দেখলাম চারপাশটা কেমন থম মেরে আছে। ভাবলাম কি হলো! হোস্টেলে বাকিরা কি ডিউটি চলে গেলো? এত শান্ত পরিবেশ তো সকালে থাকেনা। কেউ দৌড়চ্ছে বাথরুমে তো কেউ দৌড়চ্ছে ব্রাশ করতে। ঘড়িতে দেখলাম ৮ টা বেজে ৫২ মিনিট। যাইহোক ব্রাশ নিয়ে গেলাম বেসিনের কাছে। গিয়ে দেখি একি! একটা মেয়েও ব্রাশ নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে,কিন্তু স্থির। ব্রাশ করছেও না আবার ওখান থেকে সরছেওনা। দুবার ডেকে আশাহত হয়ে অন্য বেসিনে গেলাম। ভাবলাম ব্যাপারটা কি হলো? যাইহোক রুমে এসে দেখলাম সময় সেই এক। ৮:৫২ টা। একি আমি ভুল দেখছি? চোখ কচলে আবার দেখলাম কই না তো! ঠিক দেখছি। ফ্রেশ হয়ে ব্যাগ গুছিয়ে নীচে ক্যান্টিনে গেলাম খেতে। এরপর ডিউটি যেতে হবে। দেরী হলে ম্যাডাম  বকবেন। খেতে গিয়ে দেখি রান্নার দিদিরা সব এক জায়গায় দাঁড়িয়ে আছেন। সবাই কেমন স্থানু হয়ে আছেন। দুবার বললাম দিদি একটা ডিম টোস্ট। কিছু উত্তর এলো না। অগত্যা নিজেই বয়াম থেকে কেক নিয়ে হিসেবের খাতায় দাম লিখে বেরোলাম ডিউটিতে। রাস্তায় যাবার সময়ও অনেক লোককে দেখলাম দাঁড়িয়ে আছে কিন্তু হাঁটাচলা করছেনা। হাতঘড়ি দেখলাম এক দেখাচ্ছে ৮:৫২ টা। কেমন যেনো থমকে গেছে সময়। ওটি তে গিয়েও এক জিনিস দেখলাম। পেশেন্ট গুলোও স্থির হয়ে আছে। কি অদ্ভুত না! আমি একাই চলমান খালি আর বাকি সবাই কেমন চুপচাপ দাঁড়িয়ে রয়েছে। আজ আর ডিউটি করতে হবে না ভেবে দৌড় দিলাম কলেজ স্ট্রীট। বাস ট্রাম কিছুই চলছে না। তাই হেঁটেই যেতে হলো। ভাবছি আজ কি হলো! আমি একাই গতিশীল আর দুনিয়ার সবকিছু স্থিতিশীল। ভাবতে ভাবতে সোজা হাজির স্টল গুলোতে। যেখানে যা ডিসকাউন্ট অফার দিচ্ছে দেখে দেখে বই নিয়ে অনলাইন পেমেন্ট করে দিলাম। কেউ কিছু না বললেও যতই সুযোগ থাক বিনামূল্যে বই নিতে কেমন যেনো বাধলো। সব দোকানের লোকেরা কেমন একদৃষ্টে তাকিয়ে আছে আমার দিকে। এরপর গেলাম সরবতের দোকানে। না কিছুই নেই সেরকম। পকেটে থাকা কেক আর দোকানে দু গ্লাস জল খেয়ে হাটা দিলাম হোস্টেলের পথে। রাস্তা গুলো কেমন সব গুম মেরে আছে। কোনো গাড়ি ঘোড়ার আওয়াজ নেই,সবাই নিজের জায়গায় দাঁড়িয়ে আছে। কেবল আমি ছুটে চলেছি যেনো ইচ্ছে ঘোড়ায় সওয়ার হয়ে। 'কোলকাতা,তুমিও হেটে দেখাও কোলকাতা' গানটা খুব গাইতে ইচ্ছে করছে। রাস্তায় দেখলাম ঘোড়ার গাড়ীগুলো দাঁড়িয়ে আছে আর ঘোড়াগুলোও চুপ হয়ে আছে। হেটে হেটে হোস্টেল ফিরলাম। সময় সেই এক। রুমে ঢুকে একটু বসলাম। কেমন যেনো হারিয়ে যাচ্ছি চিন্তার সাগরে। ফোনের আওয়াজে সম্বিত ফিরলো। জুনিয়র ফোন করেছে,দিদি আজ ডিউটি আসবে তো? তাহলে কাবাব নিয়ে যাবো। বললাম হ্যা আসবো। উঠে দেখি নটা বেজে গেছে। বইগুলো যেগুলো আনলাম গুছিয়ে রাখতে হবে। কিন্তু কী হলো? বই কই? ফোনে দেখি হইচই চ্যানেল চলছে। ওয়েব সিরিজ দেখতে দেখতে ঘুমিয়ে পড়েছিলাম বোধহয়। রুমের দরজা খুলে দেখলাম সবাই দৌড়াদৌড়ি করছে রেডি হয়ে ডিউটি যাবে বলে। কই কেউ তো চুপচাপ দাঁড়িয়ে নেই। এতক্ষণ তাহলে? স্বপ্ন দেখছিলাম বুঝি! যদি সত্যিই এরম হতো ভালোই হতো। তারপর ভাবলাম,না! বরং স্বপ্ন স্বপ্নের জায়গায় থাক। এবার বাস্তবে ফিরে আসি। কোথায় যেনো বাজছে 'যখন সময় থমকে দাঁড়ায় নিরাশার পাখি দু হাত বাড়ায় স্বপ্ন......স্বপ্ন দেখে মন'। যাই হোক স্বপ্ন দেখে আর কাজ নেই,জলদি রেডি হয়ে দৌড়তে হবে,ওটি কলিং,অল আর ওয়েটিং। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শুক্রবার, ১২ জুন, ২০২৬

যে চিঠি কখনো হয়নি পাঠানো✍️ ডা: অরুণিমা দাস

যে চিঠি কখনো হয়নি পাঠানো
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

সারাদিনের কাজের পরে একটু লেখালিখি করা অভ্যেস অরিনের। মাঝে মাঝে বস যা কাজের টার্গেট দেয় নিজেকে পাগল পাগল লাগে অরিনের।ক্লায়েন্ট কল অফিস যাওয়া খাওয়া দাওয়া সব সামলে রাতে ঘুমোনোর আগে একটু লেখালিখি না করলে মনে হয় যে কিছু একটা হলো না যেনো। আজ মনে হলো একটু অন্য কিছু লিখবে। বইয়ের তাক থেকে ডায়েরীটা বের করলো। হঠাৎ কী মনে হলো বইগুলো খুলে দেখতে লাগলো অরিন। কত গল্পবই পড়েছে একসময় আর এখন স্ক্রিন টাইম এত বেশী হয়ে গেছে যে বই পড়ার ইচ্ছে থাকলেও হয়ে ওঠেনা। নিজের সংগ্রহের বইগুলো খুলে দেখতে লাগলো। দেখতে দেখতে একটা বই হাতে তুলে নিলো,পথের দাবী। বইটা খুলে কয়েক পাতা উল্টিয়ে দেখতে দেখতে হাতে এলো একটা চিঠি। চিঠি খুললো অরিন,পড়ে হারিয়ে যেতে লাগলো ছোটবেলার সেই দিনগুলোতে। স্কুল জীবনে খুব লেখালিখি করত, হয়তো ভালোই লিখত। বন্ধুরা সেই নিয়ে খুব হাসাহাসি করত তাই নিজেকে অতটা মেলে ধরতে পারতোনা। এই চিরকুটে একটা কবিতা লেখা আছে আর সেটা লেখা হয়েছিলো প্রকাশককে পাঠানোর উদ্দেশ্যে। কিন্তু চিঠি পৌঁছোয়নি তার গন্তব্যে। তখন ক্লাস নাইন,পড়াশোনাতে মনোযোগ দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো দিকে নজর দেওয়া বারণ ছিলো অরিনের বাড়ী থেকে। অরিন ভাবে এই চিঠি যদি প্রকাশকের দপ্তরে পাঠানো হতো কি হতে পারতো! হয়তো ছাপা হতো বা ছিড়ে ফেলে দেওয়া হতো। দুটোর কোনো একটা হতো। হলদেটে হয়ে যাওয়া চিঠি টা অরিনকে বড় আবেগপ্রবণ করে তুললো। 
- কি ভাবছো? হুম! স্ত্রী জয়িতা কখন এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি অরিন। 
- আবার কি পাঠাবে নাকি চিঠিটা? 
- না না, প্রকাশক এখনো এই পত্রিকা চালান কিনা জানিনা। তবে অনেক পুরোনো কথা মনে পড়ে গেলো,বুঝলে?
- হ্যা বুঝলাম। তোমাকে তো অনেকবার বলেছি লেখালিখি করো যখন দু একটা জায়গায় পাঠিয়ে দেখো। তুমি তো শুনতে চাওনা। 
- না থাক। একসময় যখন পাঠাতে চেয়েছিলাম অনেক আপত্তি এসেছিল। শুধু পড়াশোনা করেই বড় হওয়া যায় এটাই বলা হয়েছিলো। তার চেয়ে বরং লেখাগুলো ডায়েরিতে থাক। আর নিয়মিত পাঠিকা তো আছেই আমার। তোমার জন্যই তো রোজ লেখালিখিটা করতে পারি। অপেক্ষায় থাকি তোমার কেমন লাগলো লেখা সেটা জানার। 
- আমি একাই কেনো পাঠক হবো? আরও অন্যদেরও সুযোগ করে দাও তোমার লেখা পড়ার। 
- সে পরে দেখা যাবে।
- এই চিঠিটা গুছিয়ে রেখে দিও। এগুলোই তোমার জন্য শ্রেষ্ঠ সম্পদ। 
- হ্যা। তুমি যে এত ভালো বোঝো আমায় এটাই আমার জীবনের পাওনা।
- আর আমার আক্ষেপ একটাও প্রেমপত্র না পাওয়া তোমার থেকে,যে কিনা এত সুন্দর লেখে। 
- কি যে বলো! অরিন হেসে ফেললো। 
আসলে সব কথা তুমি বুঝেই যাও তাই আর আলাদা করে পত্র দিতে হয়না। 
- অনেক হয়েছে। এবার বইগুলো গুছিয়ে রেখে দাও। 
আবার কাল তো অফিস। পরে না হয় কোনোদিন দেখো আবার কোনো চিঠি খুঁজে পাও কিনা! এরম চিঠি কখনো পেলে আর নিজে নয় সবার আগে তোমাকেই পড়তে দেবো জয়িতা। তোমার তাহলে প্রেমপত্রের জন্য আক্ষেপটা থাকবেনা। হেসে ফেললো জয়িতা আর হয়তো হেসে উঠলো বইয়ের ভাঁজে থাকা চিঠিটা যে এতদিনের অপেক্ষায় ছিলো কেউ তো তাকে পড়বে,ফিরে যাবে পুরোনো দিনগুলোতে আর তাতেই চিঠিটা লেখা সার্থক হবে। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

যে চিঠি কখনো হয়নি পাঠানো✍️ ডা: অরুণিমা দাস

যে চিঠি কখনো হয়নি পাঠানো
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

সারাদিনের কাজের পরে একটু লেখালিখি করা অভ্যেস অরিনের। মাঝে মাঝে বস যা কাজের টার্গেট দেয় নিজেকে পাগল পাগল লাগে অরিনের।ক্লায়েন্ট কল অফিস যাওয়া খাওয়া দাওয়া সব সামলে রাতে ঘুমোনোর আগে একটু লেখালিখি না করলে মনে হয় যে কিছু একটা হলো না যেনো। আজ মনে হলো একটু অন্য কিছু লিখবে। বইয়ের তাক থেকে ডায়েরীটা বের করলো। হঠাৎ কী মনে হলো বইগুলো খুলে দেখতে লাগলো অরিন। কত গল্পবই পড়েছে একসময় আর এখন স্ক্রিন টাইম এত বেশী হয়ে গেছে যে বই পড়ার ইচ্ছে থাকলেও হয়ে ওঠেনা। নিজের সংগ্রহের বইগুলো খুলে দেখতে লাগলো। দেখতে দেখতে একটা বই হাতে তুলে নিলো,পথের দাবী। বইটা খুলে কয়েক পাতা উল্টিয়ে দেখতে দেখতে হাতে এলো একটা চিঠি। চিঠি খুললো অরিন,পড়ে হারিয়ে যেতে লাগলো ছোটবেলার সেই দিনগুলোতে। স্কুল জীবনে খুব লেখালিখি করত, হয়তো ভালোই লিখত। বন্ধুরা সেই নিয়ে খুব হাসাহাসি করত তাই নিজেকে অতটা মেলে ধরতে পারতোনা। এই চিরকুটে একটা কবিতা লেখা আছে আর সেটা লেখা হয়েছিলো প্রকাশককে পাঠানোর উদ্দেশ্যে। কিন্তু চিঠি পৌঁছোয়নি তার গন্তব্যে। তখন ক্লাস নাইন,পড়াশোনাতে মনোযোগ দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো দিকে নজর দেওয়া বারণ ছিলো অরিনের বাড়ী থেকে। অরিন ভাবে এই চিঠি যদি প্রকাশকের দপ্তরে পাঠানো হতো কি হতে পারতো! হয়তো ছাপা হতো বা ছিড়ে ফেলে দেওয়া হতো। দুটোর কোনো একটা হতো। হলদেটে হয়ে যাওয়া চিঠি টা অরিনকে বড় আবেগপ্রবণ করে তুললো। 
- কি ভাবছো? হুম! স্ত্রী জয়িতা কখন এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি অরিন। 
- আবার কি পাঠাবে নাকি চিঠিটা? 
- না না, প্রকাশক এখনো এই পত্রিকা চালান কিনা জানিনা। তবে অনেক পুরোনো কথা মনে পড়ে গেলো,বুঝলে?
- হ্যা বুঝলাম। তোমাকে তো অনেকবার বলেছি লেখালিখি করো যখন দু একটা জায়গায় পাঠিয়ে দেখো। তুমি তো শুনতে চাওনা। 
- না থাক। একসময় যখন পাঠাতে চেয়েছিলাম অনেক আপত্তি এসেছিল। শুধু পড়াশোনা করেই বড় হওয়া যায় এটাই বলা হয়েছিলো। তার চেয়ে বরং লেখাগুলো ডায়েরিতে থাক। আর নিয়মিত পাঠিকা তো আছেই আমার। তোমার জন্যই তো রোজ লেখালিখিটা করতে পারি। অপেক্ষায় থাকি তোমার কেমন লাগলো লেখা সেটা জানার। 
- আমি একাই কেনো পাঠক হবো? আরও অন্যদেরও সুযোগ করে দাও তোমার লেখা পড়ার। 
- সে পরে দেখা যাবে।
- এই চিঠিটা গুছিয়ে রেখে দিও। এগুলোই তোমার জন্য শ্রেষ্ঠ সম্পদ। 
- হ্যা। তুমি যে এত ভালো বোঝো আমায় এটাই আমার জীবনের পাওনা।
- আর আমার আক্ষেপ একটাও প্রেমপত্র না পাওয়া তোমার থেকে,যে কিনা এত সুন্দর লেখে। 
- কি যে বলো! অরিন হেসে ফেললো। 
আসলে সব কথা তুমি বুঝেই যাও তাই আর আলাদা করে পত্র দিতে হয়না। 
- অনেক হয়েছে। এবার বইগুলো গুছিয়ে রেখে দাও। 
আবার কাল তো অফিস। পরে না হয় কোনোদিন দেখো আবার কোনো চিঠি খুঁজে পাও কিনা! এরম চিঠি কখনো পেলে আর নিজে নয় সবার আগে তোমাকেই পড়তে দেবো জয়িতা। তোমার তাহলে প্রেমপত্রের জন্য আক্ষেপটা থাকবেনা। হেসে ফেললো জয়িতা আর হয়তো হেসে উঠলো বইয়ের ভাঁজে থাকা চিঠিটা যে এতদিনের অপেক্ষায় ছিলো কেউ তো তাকে পড়বে,ফিরে যাবে পুরোনো দিনগুলোতে আর তাতেই চিঠিটা লেখা সার্থক হবে। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বুধবার, ১৭ সেপ্টেম্বর, ২০২৫

আমার ডায়েরি✍️ ডা: অরুণিমা দাস

আমার ডায়েরি
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

সারাদিনের কাজের শেষে ডায়েরী লেখা অভ্যেস রিনির। ডিনার করে ডায়েরী টা খুলে বসলো ও। পাতা গুলো উল্টোতে গিয়ে একটা পাতায় গিয়ে চোখ আটকে গেলো ওর। ওর কলেজ জীবনের কিছু কথা নিয়ে লেখা ছিল।
পড়তে শুরু করলো ও। লেখা রয়েছে,
আশা করি তোমরা সকলে ভালো আছো। একসময় আমাদের চার জনের একটা দল ছিল। কলেজে পড়তে এসে তোমাদেরকে পেয়ে নিজেকে খুব লাকি ভেবেছিলাম। ভেবেছিলাম তিনটে বছর খুব আনন্দে কাটবে। কিন্তু মাস তিনেক পর বুঝতে পারলাম ভাবনা সব ভুল ছিল। তোমাদের ব্যবহারে নিজেকে খুব এলোমেলো লাগছিলো। তোমাদের মতো অতটা আধুনিক হতে পারিনি, না পোশাকে, না খাওয়াদাওয়া আর পানে। একটু একটু করে দূরে সরিয়ে দিচ্ছিলে আমায়। কোথাও খেতে বা ঘুরতে গেলে আমাকে আলাদা করে দিয়ে অনুভব করাতে বাধ্য করলে যে আমি ভিন্ন। বুঝতে পেরেছিলাম, আসতে আসতে সরে এলাম। কলমকে নিজের বন্ধু করলাম। দু একটা লেখা যখন সোশ্যাল মিডিয়াতে পোস্ট করতাম, হাসতে তোমরা। উল্টোপাল্টা মন্তব্যও করতে। কিন্তু দমে যাইনি আমি। হয়তো খুব ভালো লিখি না কিন্তু কলমকে বন্ধু করে খুব শান্তিতে আছি। আজও তোমাদের সাথে দেখা হলে হাসিমুখে কুশল বিনিময় করি। এটা আমার মা বাবার শেখানো আর আমি এটাকে ভদ্রতা বলে মনে করি । আজ তোমরা আমায় না ডাকলেও আর দুঃখ হয়না। নিজের জগতে আমি বেশ ভালো আছি। তোমাদের নেগেটিভ কথা আমার মধ্যে অনেক পজিটিভিটির সঞ্চার করেছে। তার জন্য আমি কৃতজ্ঞ তোমাদের কাছে। তোমরা তোমাদের মত করে ভালো থেকো ত্রয়ী। ঈশ্বরের কাছে তোমাদের সার্বিক মঙ্গল কামনা করি।
পুরোটা পড়ার পর চোখের কোলটা ভিজে এলো ওর। সত্যি এখন অনেক বেশী ভালো আছে ও। নিত্য দিনের অসম্মান হজম করার চেয়ে কলমের সাথে বন্ধুত্ব করে খুব শান্তিতে আছে ও। চিৎকার গুলো কলম দিয়ে বেরিয়ে যায় সহজেই। কষ্ট সব ধুয়ে মুছে যায় কালির স্রোতে। বুক ভরে একটা স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে রিনি। এরকম শান্তির জীবন যাপনের চেয়ে বড় কিছু হতে পারেনা। লোক দেখানো বন্ধুত্বের থেকে নিজেই নিজের বন্ধু হওয়া অনেক ভালো।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

                                          


শনিবার, ২৬ এপ্রিল, ২০২৫

জি ভরকে খাইয়ে আইসক্রিম✍️ ডা: অরুণিমা দাস

জি ভরকে খাইয়ে আইসক্রিম
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

এরম একটা বিষয় দেখে মনটা ছুট্টে চলে গেলো সেই মায়াভরা দিনগুলোতে। যখন নার্সারী স্কুলে পড়তাম,ছুটি হলেই দৌড়ে দৌড়ে গেটের বাইরে এসে ভ্যানকাকুর কাছে বায়না করতাম সবাই আইসক্রিম কিনে দেওয়ার জন্য। কাকু কিছুতেই কিনে দিতে চাইতো না। বলতো না বাবুরা,এসব খেতে নেই তোমাদের বাড়ি থেকে বকা দেবে আমায়। তারপর আমাদের সবাইকে ভ্যানে তুলে দরজা লক করে যে যার বাড়িতে ছেড়ে দেবার উদ্দেশ্যে রওনা দিতো। আর আমরা সবাই বাইরের দিকে আইসক্রিম গাড়িটার দিকে করুন চোখে তাকিয়ে থাকতাম। বাড়ি ফিরে দেখতাম দুপুরবেলায় কাকিমা জেঠিমা তাঁদের ছেলেমেয়েদের আইসক্রিম কিনে দিচ্ছেন। আমি আয়া মাসীর দিকে জুল জুল চোখে তাকিয়ে থাকতাম। মাসী বলতো বাবা বাড়ি আসার সময় নিয়ে আসবেন তোমার জন্য আইসক্রিম,মন খারাপ কোরোনা। গল্প বলতে বলতে দুপুরের খাবারটা খাইয়ে দিতো আমায় আর তারপর পরম স্নেহে মাথায় হাত বুলিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিতো। আরেকটু বড় যখন হলাম,আলাদা বাড়িতে আমরা থাকতে শুরু করলাম। তখন ঠাকুমা সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের সাথে থাকতেন আর তারপর দাদুর বাড়ীতে চলে যেতেন। যেই গরমের ছুটি পড়তো দুপুরে ঠেলা গাড়ি নিয়ে আইসক্রিম ওয়ালা গেলেই ঠাকুমার আঁচলে টান পড়তো। আর ঠাকুমা আঁচলের খুঁট খুলে ১ টাকা দিতেন আমায়। সেই ১ টাকা নিয়ে দৌড়াতাম দরজা খুলে। কোনোদিন নারকেল,কোনোদিন অরেঞ্জ কোনোদিন পাইন অ্যাপেল আইসক্রিম খেতাম। সাথে টিভিতে দেখতাম অসওয়ার্ল্ড কার্টুন,ওর একটা গান খুব মনে পড়ছে,'আইসক্রিম আইসক্রিম আইসক্রিম, চলিয়ে জি ভরকে খায়ে আইসক্রিম'। বাড়িতে মা এসে বকা দিতেন মাঝে মাঝেই কিন্তু তাতেও দমে যেতাম না। এরপর আসতে আসতে হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলে উঠলাম,তখন স্কুল ছুটির পর টিউশন পড়তে যাবার তাড়া। তার মধ্যেও ফাঁকা পেলে এক দুদিন কুলফি আইসক্রিম কিনে রিক্সাতে উঠে আয়েশ করে খেতে খেতে বাড়ি ফিরতাম। আর যেদিন সাইকেলে ফিরতাম সেদিন এক হাতে সাইকেলের হ্যান্ডেল ধরে আরেক হাতে আইস ক্রিম খেতে খেতে বন্ধুদের সাথে গল্প করতে করতে ফিরতাম। তারপর যখন আরো বড় হলাম, যখন আইস ক্রিম খেতে কোনো প্রতিবন্ধকতা রইলো না আর তখন আর সেভাবে মন টানতো না আইসক্রিম খাবার জন্য। জীবনটা অন্যরকম হয়ে গেছে এখন। বরং সেই ভ্যানকাকু,কাকিমা জেঠিমা এদের কথাগুলোও বেশি মনে আসে। মায়াভরা চোখে দাদা দিদিদের আইসক্রিমের দিকে তাকিয়ে থাকা দিনগুলো খুব বেশি করে মনে পড়ে। মাঝেমাঝেই ভাবি যদি সত্যিই টাইম মেশিন পেতাম আর সেই দিনগুলোতে ফিরে যেতে পারতাম তাহলে আরেকবার ছোটবেলার দিনগুলো কাটাতে পারতাম। যেটা হবেনা সেটা ভেবে লাভ নেই বরং স্মৃতির পথ ধরেই মাঝে মাঝে ঘুরে আসি,আর তাতেই মন ভালো হয়ে যায় এক নিমেষে।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

রবিবার, ৩০ মার্চ, ২০২৫

শিরোনাম - ইফতার✍️ ডা:অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - ইফতার
✍️ ডা:অরুণিমা দাস

আজ ঈদের শুভদিনে একটা ছোট্ট ঘটনা মনে পড়ে গেলো। তখন সবে ফার্স্ট ইয়ারে এমডি করতে ঢুকেছি,মাস নয়েক পর রমজান মাস শুরু হলো।হোস্টেলে আমাদের ফ্লোরে রোশনারা,ফিরোজা এরা রোজা রাখা শুরু করলো। আমাদের গার্লস গ্রুপ ও ছিল একটা। তো ফিরোজা আর রোশনারা বাদে যারা আমরা ইফতারে হামলে পড়তাম সুস্বাদু খাবার খেতে তারা ঠিক করলাম একটা রবিবার দিন যেদিন আমাদের কারোর কোনো ডিউটি থাকবেনা দিনের বেলায় তারাও ওদের দুজনের মতো খাবার না খেয়ে (যদিও আমরা এমনিতেই সবাই ডিউটি চক্করে ৮-৯ ঘণ্টা না খেয়েই থাকতাম) জল না খেয়ে ওদের সাথে ইফতারে খাবো একসাথে। তো যেমন কথা তেমন কাজ! সারাদিন নির্জলা আর খাবার ছাড়া কাটিয়ে দিয়ে ঠিক ইফতারের সময় খেতে বসা হবে সেই সময় মৌমি ভীষণ অসুস্থ হয়ে পড়লো,মাথা ঘোরাচ্ছে বলছিল, চোখে অন্ধকার দেখছে। ইফতার করা মাথায় উঠলো সবার,ওকে নিয়ে সকলে গেলাম মেডিসিন ওয়ার্ডে। আর এম ও স্যার বললেন ভেসোভ্যাগাল হয়ে গেছে। প্রচণ্ড ডিহাইড্রেটেড,এখুনি একে ফ্লুইড দাও আর মুখে কিছু খেতে দাও। পা দুটো একটু বালিশের ওপরে তুলে রাখুক। তারপর মোটামুটি স্টেবল হতে স্যার জিজ্ঞেস করলেন কি করে হলো এরকম? তখন ঐ ইফতার উপলক্ষ্যে সবার রোজা রাখার গল্প বললাম। স্যার হেসে বললেন পারিস ও ভাই তোরা! সব কটা যা একটা মিনারেল ওয়াটার বোতল কিনে জল খা। নয়তো বাকি গুলোও মাথা ঘুরিয়ে পড়বি সব। আর এত বেড কিন্তু নেই তোদের জন্য। সেদিন মৌমি একটু সুস্থ হতে স্যার বললেন দেখি কি কি অ্যারেঞ্জ করছিলি তোরা? তখন আবার হোস্টেলে ফোন করে ইফতারের সব খাবার হোস্টেলের ভিজিটিং রুমে আনানো হলো। স্যার ও খুব মজা করে খেয়েছিলেন সেদিন আমাদের সবার সাথে। আর বলেছিলেন দেখ ফিরোজা রোশনারা এরা প্রতি বছর রোজা রাখে, এদের অভ্যাস আছে আর এদের শরীরে বায়োলজিক্যাল ক্লকও এভাবে মানিয়ে নেয়। তোরা জল না খেয়ে গরমে থাকতে পারবি না, তাই এসব ওস্তাদি করতে যাস না। মৌমি আবার দুম করে সরি বলে ফেলেছিল। ফিরোজা ওকে জড়িয়ে বলেছিল কিসের সরি রে! তোদের এই কান্ড দেখে আমরা হতবাক। আমরা বললাম সত্যি খাবার ছাড়া থাকা গেলেও এতটা সময় জল ছাড়া থাকা অসহনীয়, জিভ ঠোঁট শুকিয়ে যাচ্ছিলো খুব কষ্ট হচ্ছিল। তোরা সত্যি খুব কষ্ট করে রোজা রাখিস রে! ফিরোজা বললো এখন এগুলো আমাদের অভ্যাস হয়ে গেছে। চল এরপর আর আমাদের কষ্ট বোঝার জন্য পাকামো মেরে তোদের জল আর খাবার না খেয়ে থাকতে হবে না! প্রমিস কর সবাই! মৌমি সহ আমরা সবাই প্রমিস করেছিলাম সেদিন। এখনো স্যারের সাথে দেখা হলে সেই দিনের কথা স্যার তুলবেন একবার হলেও। আজ ফিরোজা এসএস কে এম,রোশনারা মুর্শিদাবাদ,মৌমি ডায়মন্ড হারবারে,অর্চিতা ন্যাশনালে আর একজন এন আর এসে থাকলেও রমজান মাস শুরু হলে আর যে কোনো রকম উৎসবে সবাই আমরা ফোনের গ্রুপে মেতে উঠি এক অনাবিল আনন্দে,বুঝতেই পারিনা যে আমরা একে অপরের থেকে এতদূরে আছি, মনে হয় এই তো কালকের ঘটনা। এভাবেই স্মৃতির পাতায় জমে উঠছে কত কত গল্প।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ১৩ ফেব্রুয়ারি, ২০২৫

জীবনের গল্প✍️ ডা: অরুণিমা দাস

জীবনের গল্প
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

আজকেই ডিউটি তে আলোচনা হচ্ছিলো যে জীবনটা আজকাল কেমন হয়ে গেছে। যন্ত্রের মতো আসছি ডিউটি করছি রাউন্ড দিচ্ছি হোস্টেল ফিরছি। ছোটবেলাটা বড্ড মনে পড়ে সবার। শিশু শল্য বিশেষজ্ঞ এক দিদি বললেন চল আজ ছোটবেলার কিছু গল্প হয়ে যাক। শিশু দের নিয়েই যখন তোদের আমাদের জীবন বেষ্টিত আছে হোক কিছু শিশুসুলভ গল্প। দিদি শুরু করলেন,স্কুল থেকে পুলকারে ফিরছেন তখন রেজাল্ট বের করে মনে পড়লো জি কে তে তো উতরাতে পারেননি। অত্যন্ত নিপুণতার সাথে এফ টাকে এ করে হাসিমুখে বাড়ি ফিরেছেন। আর রেজাল্ট মায়ের হাতে পড়তেই বেধড়ক মার,চোখে সর্ষেফুল দেখার মতো অবস্থা প্রায়। শুনে আরেকজন দাদাও শুরু করলেন ছোটবেলায় কুকুরের লেজে পটকা বেঁধে দিয়ে তাকে সারামাঠ ছোটানোর গল্প। আমারও এক দুটো গল্প বেরোলো। বন্ধুদের কথা শুনে বাড়ি থেকে পয়সা চুরি করে ব্যাগে জমানো আর সেটা দিয়ে আলুকাবলি,চুরমুর খাওয়া। একদিন ব্যাগ পরিষ্কার করতে গিয়ে ঝনঝন করা কয়েনের শব্দ শুনে সেই শব্দ গুলো তারপর পিঠে পড়েছিল। ম্যাথে ২৯ পেয়ে বাড়ীতে ৪০ বলা, তারপর মার্কশিট আসতেই আসল খেলা শুরু। জুতো,স্কেল,ঝাড়ু কিছুই বাদ যায়নি, সবগুলোর মার খেয়েছি। আরে দেখ গল্প করতে করতে ওটি শেষ হয়ে এলো রে, ব্লাড ও চালিয়ে দিয়েছি দিদি। এবার বাচ্চাকে রিভার্স করানোর পালা। এরকম গল্প মাঝে মাঝেই হলে মন্দ হয় না বল? দিদি বলল। আমরাও বললাম একদম, তবেই না এই স্মৃতিভরা মেঠোপথে দু একবার চক্কর মেরে আসার সুযোগ হবে। ছোটবেলায় মনে হতো বড়ো কবে হবো? আর এখন বড় হয়ে মনে হয় ছোটবেলা কি আবার ফিরে পাবো?

"জীবন চলছে নিজের মতো করে,ছোটবেলা ফিরে পেতে খুব ইচ্ছে করে আজকাল
স্ট্রেসফুল বড়বেলাটা বুঝিয়ে দিচ্ছে কঠিন বাঁধনে বাঁধতে হবে জীবনের সুর লয় তাল।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস


সোমবার, ৯ ডিসেম্বর, ২০২৪

শিরোনাম-রক্তের টানে✍️ ডা:অরুণিমা দাস

শিরোনাম-রক্তের টানে
✍️ ডা:অরুণিমা দাস

সন্ধ্যে ছটা বাজে প্রায়। গাইনি ওটির বাইরে অস্থির ভাবে পায়চারী করছে অনিল আর ওর মা বাবা। ওটির মধ্যে অনিলের স্ত্রী রিক্তার সিজার চলছে। প্রায় আধঘন্টা পরে সিস্টার তোয়ালে মোড়া জ্যান্ত পুতুল এনে তুলে দিল অনিলের হাতে।ওর মা বাবা ছুটে এলেন,বললেন কী হয়েছে সিস্টার!ছেলে না মেয়ে? সিস্টার কিছুক্ষন চুপ করে রইলো,তারপর বললো স্যার এসে আপনাদের জানাবেন সবটা। বলে সিস্টার বাচ্চাটাকে অনিলের হাত থেকে নিয়ে চলে গেলো।কিছুসময় পরে ডা: ঘোষ বললেন আপনারা আমার চেম্বারে আসুন,কিছু কথা আছে। ওরা তিনজন গেলো ডা: ঘোষের চেম্বারে। ডা:ঘোষ জানালেন যে বাচ্চাটা জন্মেছে,অ্যাম্বিগুয়াস জেনিটালিয়া নিয়ে মানে ছেলের মত দেখতে হলেও ভেতরকার অঙ্গ গুলো মেয়ের মতো। একটা সেক্স চেঞ্জ অপারেশন করে হয়তো জিনিসটা ঠিক করা যাবে। অনিলের মা বললেন আচ্ছা বুঝেছি,তৃতীয় লিঙ্গের জন্ম দিয়েছে রিক্তা। আমি মেনে নেবোনা এই সন্তানকে,সাফ জানিয়ে দিলাম।অনিল কিছু বলতে যাচ্ছিলো! ওর মা বললো নয় ওই বাড়িতে আমি থাকবো নাহলে ওই পাপ থাকবে। এবার তুই ঠিক কর কি করবি? অনিল বুকের ওপর পাথর চাপা দিয়ে মায়ের আদেশ মেনে নেয়। নিজের মাকেই আজ তার কেমন যেন অচেনা লাগছে। কিকরে এরকম করতে পারে ওর মা? নিজের ছেলের অংশকে এভাবে অস্বীকার করতে পারছে মা?যেটা কোনোদিন মায়ের কাছে আশা করেনি কোনোদিন সে। কিন্তু মায়ের কাছে তখন মনুষ্যত্বের চেয়ে বংশমর্যাদা বেশী বড়ো হয়ে উঠেছিল।
এরপর বছর পনেরো কেটে গেছে।অনিলের কোনো সন্তান হয়নি আর। অনিলের মায়েরও বেশ বয়স হয়েছে। একদিন রাস্তা পার হবার সময় পাথরে হোচট খেয়ে পড়ে যান উনি। একটা গাড়ী এসে আচমকা ধাক্কা মারে। মাথা ফেটে বেশ রক্ত পড়ছে।রাস্তার লোকেরা জড়ো হয় কিন্তু কেউ ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে যায়না। ভিড় ঠেলে এগিয়ে আসে এক মহানুভব,বলে আপনারা সরে যান,আমি ওনাকে হাসপাতালে নিয়ে যাবো।ডাক্তার জানান বেশ গুরুতর চোট ওনার মাথায়,স্টিচ দিতে হবে আর এক ইউনিট রক্তও দিতে লাগবে। অনিলবাবুও এসে হাজির হন কিন্তু রক্তের গ্রুপ মেলেনা। সেই মহানুভব এগিয়ে এসে বলে আমারও এক গ্রুপ,আমি রক্ত দেবো। অনিলবাবু বললেন আপনার নাম?নীলাভ নিজের নাম বলে বললো আমি কিন্তু তৃতীয় লিঙ্গের মানুষ।অনিলবাবু একমুহূর্ত না ভেবেই নীলাভর রক্ত মাকে দেওয়ার জন্য রাজী হলেন। পরে যখন জ্ঞান ফিরলো অনিল বাবুর মায়ের,তখন জানতে পারলেন এক তৃতীয় লিঙ্গের ব্যক্তি তাকে রক্ত দিয়েছে!শুনে মাথা নীচু করে রইলেন,হয়তো বছর পনেরোর আগের দিনটি মনে পড়ছিল তাঁর। পাশের বেডে শুয়ে থাকা  নীলাভর মুখের দিকে তাকিয়ে দেখলেন তিনি,আজ মনে হচ্ছে এ তার অনেক দিনের চেনা কেউ,আজ বড়ো আপন মনে হচ্ছে নীলাভকে তাঁর।ঈশ্বর ছাড়া কেউ জানলোনা যে এই নীলাভই সেই সন্তান। কিছুকিছু সম্পর্কের সমীকরণ ওলট পালট হয়ে গিয়েও শেষ অব্দি হঠাৎ করে একদিন সিড়িভাঙা অঙ্কের মত মিলে যায়,হয়তো সকলের অজান্তেই আর অচেনা মানুষকেও ভীষণ চেনা লাগে।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস



সোমবার, ১১ নভেম্বর, ২০২৪

শিরোনাম - ছেঁড়া তার✍️ ডা:অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - ছেঁড়া তার
✍️ ডা:অরুণিমা দাস


দুর্গাপুজো শুরু হবার সময় মুখে যে হাসির রেশ ছিলো মাধবের আজ কালীপুজোর পরে সেই হাসি মিলিয়ে গেছে। কালীপুজোর প্যান্ডেলে ঢাক সহ বাকি জিনিস গোছাতে গোছাতে ভাবছিল একটা যদি স্থায়ী আয়ের ব্যবস্থা থাকতো তাহলে আজ এত কষ্ট থাকতো না জীবনে। তারপর প্যান্ডেলে সবাই বলাবলি করছিল এখন নাকি ডিজিটাল যুগ, ঢাকের বাদ্যি নাকি যন্ত্রে বাজানো যায়। এমনিতেই পুজো ছাড়া মাধবের কোথাও ডাক পড়েনা তার উপর যদি পুজোতেও আধুনিক যন্ত্রপাতি চলে আসে তার এই পেশাটাও চলে যাবে। কি ভাবে ছেলেটার পড়াশোনা চালাবে ভেবেই মনটা অস্থির হয়ে ওঠে। ঢাকটা যেনো তার দিকে করুনভাবে তাকিয়ে থাকে। মাধব তার পারিশ্রমিক বুঝে নিয়ে ঢাক কাঁধে করে বেরিয়ে পড়ে। যা পেয়েছে একমাসে সেই টাকায় বড়জোর আরেকটা মাস চলতে পারে। তারপর আবার সেই রোজের পয়সা রোজগারে ভিনদেশে নানা কাজে যাওয়া। এই কটাদিন ঢাকের যে বোল মনকে ভালো করে দেয় সেই ঢাক আবার পড়ে থাকবে নিঃসঙ্গ হয়ে। চোখ দুটোতে জল চিক চিক করে মাধবের। রাস্তায় যেতে গিয়ে পথের পাশে এক জায়গাতে চোখে পড়ে এক বহুরূপী খেলা দেখাচ্ছে,ভিড়ের মধ্যে মিশে সেই খেলা দেখতে দাঁড়ায় মাধব। খেলা দেখানোর শেষে বহুরূপী মাটি থেকে পয়সাগুলো কুড়িয়ে নিজের ঝুলিতে ভরছিলো। মাধবকে একা বসে থাকতে দেখে হাসিমুখে বলে কি হলো? বাড়ী যাবেনা? সবাই চলে গেলো তো! 
- যাবো,মনটা ভালো নেই। কাল থেকে অন্য কাজের খোঁজে বেরোতে হবে সেই নিয়ে ভাবছি। তুমি এত কষ্ট করে গান বেঁধে এই কটা টাকা পাও, তাও মুখে হাসি কি করে?
- আরে এর মধ্যেই ভালো থাকতে হয় ভাই। হাসতে ভুলে গেলে তো জীবনটা মলিন হয়ে যাবে। জীবনের তাল লয় বজায় রাখতে হলে হাসতে হবে যে রকম অবস্থায় থাকোনা কেনো। কাল থেকে পুজো হবেনা, ঢাক বাজাতে পারবেনা পয়সা আসবেনা ভেবে মন খারাপ কোরো না। কিছু তো কাজ আছে যেটা তুমি করে নিজেকে ভালো রাখতে পারবে। সেটাই করো। 
- মাধব ভাবে পয়সা উপার্জনের চাপে ভুলেই গেছে সে রান্নাটা ভালোই করে। মিড ডে মিলের কাজে নামতে মন তার চায়না কারণ ছেলে সেই স্কুলে পড়ে। কিন্তু এতো খারাপ লাগা তার থাকবেনা যদি নিজের ভালোবাসার কাজ টা সে মন দিয়ে করে। 
- ওঠো, এতো ভেবো না। দুপুর গড়িয়ে বিকেল হতে চললো।
হাসি মুখে মাধব উঠে পড়ে, বহুরূপীকে বিদায় জানিয়ে চলে নিজের বাড়ীর পথে। সে না হয় বহুরূপীর মতো খেলা দেখাবে না কিন্তু  নানা সাজে নিজেকে সাজিয়ে জীবনের ছন্দে নিজেকে এগিয়ে নিয়ে যেতে পারবে। তার টা বোধহয় ছিঁড়বে না এবার, জোড়া লেগে নিজের মতো করে বেঁচে থাকার সুর তুলবে। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

সোমবার, ১৭ জুন, ২০২৪

অনাদর✍️ ডা:অরুণিমা দাস

অনাদর
✍️ ডা:অরুণিমা দাস 

ঠাকুমার অসুস্থতার খবর শুনে রিমি অফিসের কাজ ছেড়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি ট্রেনে উঠে বসে। জানলার ধারে সিট পেয়ে গা এলিয়ে দেয় তাতে। অনেক কথা মনে পড়ে যায় ওর। ছোটবেলায় রিমি মায়ের কাছে শুনেছিল যে সে হয়েছিল যখন তার ঠাকুমা মুখ দেখতে পর্যন্ত আসেনি। কারণ তিনি চেয়েছিলেন যে তার নাতি হোক। নাতনী হোক সেটা চাননি তিনি। রিমির পর যখন ভাই জন্মালো ছয় বছর পরে তখন ঠাকুমা ওর মাকে একটু ভালো চোখে দেখতো। তবে বাড়ীতে মাছ মাংস বা ভালো খাবার এমনকি পুজোর জামাকাপড় সবই বরাদ্দ ছিলো ভাইয়ের জন্য। রিমি এগুলো দেখে খুব কষ্ট পেতো,কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতোনা। ভাই সবার আদর পেয়ে বিগড়ে যেতে শুরু করলো,রিমি প্রথমে কিছু বলতে গেলেও মেয়ে বলে তার কথার কোনো মূল্য দেওয়া হয়নি। এভাবে যেতে যেতে একদিন ভাই ধরা পড়লো ড্রাগ পাচার করতে গিয়ে। সেবারে বাবা আর ঠাকুমা গিয়ে ভাইকে ছাড়িয়ে আনলো কোনরকমে। আর সব দোষ গিয়ে পড়লো রিমির মায়ের ওপর। মেয়েকে দেখতে গিয়ে ছেলেকে মানুষ করার দিকে তার নজর নেই এই অভিযোগ এলো। রিমির মা কেমন যেনো চুপ করে গেলো। রিমি তখন গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে চাকরীর পরীক্ষাগুলো দিচ্ছে। চাকরী যখন পেলো তখন সে কারোর তোয়াক্কা না করে মাকে নিয়ে আলাদা হয়ে গেলো। যেখানে তার আর মায়ের কোনো মূল্য নেই সেখানে না থাকাই শ্রেয়। এদিকে ঠাকুমার আসকারা পেয়ে ভাইয়ের দৌরাত্ম্য বাড়তে লাগলো। বাবা নিজের মান সম্মান বাঁচাতে একদিন ঘর ছাড়লেন। ঠাকুমার তখন বোধহয় একটু টনক নড়েছিল,নাতিকে শাসন করতে শুরু করলেন কিন্তু সেটা অনেক দেরী হয়ে গেছিলো। নাতি তখন হাতের বাইরে চলে গেছে। মুখের ওপর শুনিয়েছিল যাওনা নিজের নাতনিকে নিয়ে থাকো,সে তো চাকরী করে সেখানে গিয়ে থাকো যাও। সেদিনের পর থেকে ঠাকুমা আর কিছু বলেননি নাতিকে। হয়তো বুঝেছিলেন একসময় অন্যায় করেছেন। দিনের পর দিন অবহেলায় অযত্নে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। রিমির মা খবর পেয়ে রিমিকে বলেন ওখানে গিয়ে থাকবেন বলে। বলেন উনি ভুল করেছেন বলে আমরাই বা ভুল করবো কেনো! রিমি প্রথমে গররাজি হলেও পরে মায়ের জেদের কাছে হার মেনে ঠাকুমার কাছে ফিরে যায়। বছর তিনেক ধরে সে,মা আর ঠাকুমা একসাথে থাকে। আজ মায়ের ফোন পেয়েই দৌড়ে দৌড়ে আসছে রিমি। শেষ স্টেশন এসে গেছে,নামুন ম্যাম। টিটির ডাকে ঘোর কাটে রিমির। পুরোনো কথা ভাবতে ভাবতে কোথায় যে হারিয়ে গেছিলো সে, বুঝতেই পারেনি। স্টেশনে নেমে একটা রিক্সা ধরে বাড়ীর পথে পা বাড়ায় সে। বাড়ী পৌছে দেখে যে ঠাকুমা শুয়ে আছে, মা বসে আছে বিছানায়। মুখটা ঠাকুমার কানের কাছে নিয়ে এসে বলে কি করো তুমি?ওষুধ গুলো খাওনা কেনো? 
-কাঁপা কাঁপা গলায় বলে অনেক ভুল করেছি, আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না রে দিদি। সেগুলো মনে পড়লে মনে হয় আমার আর থাকা উচিত নয় এই দুনিয়ায়।
-যা হয়ে গেছে সেগুলো মনে করে নিজেকে কষ্ট দিয়ে কি লাভ? আসলে কি জানো! অনাদরে বেড়ে ওঠা গাছেরাই কিন্তু ছায়া দেয়। আর সযত্নে লালন করা গাছেরা আগাছার মতো জাপটে ধরে কিন্তু ভালো কিছু করতে পারেনা। 
যতদিন আমার সাথে থাকবে পুরোনো কোনো কথা মনে করবে না, কথা দাও সময় মতো ওষুধ খাবে, খাবার খাবে। 
-সব করবো দিদি। আমার কথাটাও শুনতে হবে তোমায় এবার।
-কি কথা? শোনার মত হলে নিশ্চই শুনবো।
-কতদিন আর আমাদেরকে আগলে রাখবি? এবার নিজের একটা সংসার কর। 
-ওসব করে কি হবে ঠাকুমা? মায়ের কষ্ট তো দেখেছি আর ওসব ভালো লাগেনা গো। 
-সবার কপাল এক হয় না দিদি। আমার যে বড়ো ইচ্ছে তোর কোলে আবার মেয়ে হয়ে জন্মাতে। জানি তুই আমায় কোনোদিন অবহেলা করবিনা। 
রিমির চোখে জল চিকচিক করে। ঠাকুমার হাতে হাত রেখে বলে সত্যি আসবে তো! আমি রাখবো তোমার কথা। আর আমার মেয়ে হয়ে এলে কোনোদিন অনাদর হবেনা তোমার। ঠাকুমা শীর্ণ হাত দুটি দিয়ে জড়িয়ে ধরে রিমি আর ওর মায়ের হাত। এই মুহুর্তের সাক্ষী রইলেন শুধু ঈশ্বর। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শনিবার, ১৮ ফেব্রুয়ারি, ২০২৩

বোধবুদ্ধি✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 বোধবুদ্ধি
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

নেশায় বুদ হয়ে নন্দী ভৃঙ্গী দের নিয়ে মহাদেব ব্যস্ত কৈলাসে। মর্ত্যে শিব রাত্রি, সেই উপলক্ষ্যে কৈলাস সেজে উঠেছে। দুর্গা গোছাতে বসেছেন লাভ ম্যারেজের অ্যানিভার্সারী গুলোতে কি কি জিনিস পত্র পেয়েছিলেন সেইগুলো। কিন্তু এতো কোলাহল চলছে যে নিজের কাজ করতে পারছেন না মন দিয়ে। ওদিকে বৃষ আবার সকাল থেকে মুখ গোমড়া করে আছে, কিছুতেই স্নান করবেনা ঠান্ডায়। মহাদেব তাই তার জন্য গিজার লাগানোর কাজে বিশ্বকর্মাকে তলব করেছেন। নারদ আবার কৈলাস ফার্মেসি থেকে সর্দি কাশির ওষুধ এনে দুর্গাকে দিলেন। স্বামীর ঠান্ডা লাগবে জল গায়ে লেগে,তাই এই তৎপরতা। নন্দী মনের সুখে গাঁজা টানছে আর সাপ্লাই দিয়ে যাচ্ছে মহাদেবকে। হঠাৎ করে মাথায় জল পড়ায় নেশা কেটে গেলো। বেশ কিছুক্ষন জল পড়ার পর কেমন যেনো একটা অস্বস্তি বোধ হলো মহাদেবের,চামড়ায় কি সব বেরোচ্ছে যেনো! নন্দী ছুট্টে গিয়ে দুর্গাকে ডেকে আনলো। উনি হায় হায় করে এসে বললেন কি হলো এসব? নেশার ঘোর কেটেছে কিছুটা তখন মহাদেবের, বললেন আর কি গিন্নী? তোমার ভক্তরা মর্ত্যের জল দূষিত করেছে, তাই এসব হয়েছে। সব তো বড়ো বড়ো বাড়ী, কারখানা গড়তে ব্যস্ত। তা নালা নর্দমা সব বুজিয়ে ফেলে আবর্জনা সব যাবে কোথায়? চলো তোমায় ভালো করে সাবান দিয়ে স্নান করিয়ে দিই, দুর্গা বললেন। এই বছর যখন অক্টোবরে মর্ত্যে যাবো সবাইকে বলে আসবো পরিবেশ দূষণ যেনো রোধ করে। কারণ তোমার কিছু হলে আমি আর তো মর্ত্যেও পা রাখবো না। এই জন্যই তো তুমি আমার সেরা গিন্নী। এতো লোক আছে,এসব কি বলছো? লজ্জা বলে কিছু নেই তোমার! আরে ওসব নারী দের ভূষণ, আমার নেই ওসব। তুমি যে ভক্ত দের থেকে চোখ সরিয়ে স্বামীর সেবা করছো এটা কি কম বড়ো কথা! দুর্গা লজ্জা পেলেন। মহাদেব বললেন যারা এত কষ্ট করছে আমার মত স্বামী পাওয়ার জন্য তাদের জন্য একটাই আশীর্বাদ করি, সবাই যেনো মনের মানুষ পায় আর সুখী হয়। মুখে হাসি ফুটলো দুর্গার আর সমস্ত কৈলাস মহাদেবের জয়গানে মুখর হয়ে উঠলো। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ১৯ জানুয়ারি, ২০২৩

টার্গেট✍️ ডা: অরুণিমা দাস

টার্গেট
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

পছন্দের খেলা ছিলো দুটো, ক্রিকেট আর ক্যারম। একটা আউটডোর গেম আর একটা ইনডোর গেমস। যাইহোক টিভি তে যখন ক্রিকেট ব্যাট নিয়ে শচীন কে নামতে দেখতাম মাঠে, বেশ একটা অন্য রকম অনুভুতি হতো। আর নিজে যখন বাড়ির পাশের মাঠে খেলতে যেতাম আমার বন্ধুদের শর্ত দিতাম আমি শুধু ব্যাট ই করবো, বল করবো না। ওরা মাঝে মাঝেই প্রতিবাদ করতো, আমি শুনতাম না। আরও বলতাম যেদিন আমি খেলতে আসবো না সেদিনও আমার এম আর এফ ব্যাটটা দিয়ে ওদের খেলতে দেবো। কিন্তু যেদিন আসবো সেদিন ব্যাট আমার, যতক্ষণ ইচ্ছে ব্যাট করবো কিন্তু বল করবো না। বাড়িতে সবাই আমার এসব দুষ্টুমির জন্য বকা দিতো কিন্তু আমি গায়ে মাখতাম না। বন্ধুরা নাম দিয়েছিল হিটলার শচীন। বড়ো হবার পর ওদের বলেছিলাম ব্যাটটা কে মনে করি জীবনের হাল, কোনোদিন কোনো অবস্থাতেই ওটা ছাড়বো না। শচীন হতে পারবোনা হয়তো কোনোদিন কিন্তু জীবনের ইনিংস গুলো খেলতে হয়তো পারবো বা পারতে হয়তো হবেই। বন্ধুরা চুপ করে শুনেছিল। আজও দেখা হলে বলে ওই দিন গুলো খুব মিস করি, আমিও বলি সত্যি খুব মিস করি রে দিন গুলো। আজও গুছিয়ে রাখা আছে সেই ব্যাট টা। সময় পেলে ক্রিজে নেমে পড়ি।
আর ক্যারম টাও সময় পেলে খেলতে বসে পড়ি কলেজ কমন রুমে। ছোটবেলায় লাল গুটি জালে না পড়া অবদি খেলতাম। অন্য কেউ লাল গুটি ফেলে দিলে আমি আবার সেটা তুলে বোর্ডে রাখতাম আর টার্গেট করতাম ওটা ফেলার। সবাই হাসতো কিন্তু আমি আজও ভাবি ওই লাল গুটির মতন জীবনের টার্গেট পূরণ না করা অবদি লড়ে যাওয়া উচিত সবারই। আজকাল কার দিনে সময়ের অভাবে মাঠে নেমে খেলা ধুলা অনেক কমে গেছে। বাচ্চা রা পাহাড় প্রমাণ সিলেবাস শেষ করতে করতে হাপিয়ে উঠেছে, কিন্তু বিকেলে ১-২ ঘণ্টা নিয়ম করে খেলতে দেওয়া উচিত ওদের। প্রকৃতির সাথে একটা সংযোগ হবে এতে,জীবনের লড়াই টাও কিছুটা হলেও বুঝতে পারবে ওরা।

"হাতে থাক ব্যাট আর লড়তে থাকি জীবনের লড়াই
চলার পথ ক্রিজ হোক,সবার সাপোর্ট থাকা চাই।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস


সোমবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২২

শিরোনাম - ঘুঙুর✍️ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম - ঘুঙুর
✍️ডা: অরুণিমা দাস

বেশ কিছুদিন হলো বিয়ে হয়েছে তনুজা আর সৌরভের। দেখাশোনা করেই বিয়ে,তাই সম্পর্কটা মজবুত করার চেষ্টা দুজনের মধ্যে সমান ভাবে আছে। তনুজা মনে মনে স্বামীর যে ছবি এঁকে রেখেছিল তার সাথে সৌরভকে মেলানোর চেষ্টা করে। আগের সম্পর্কটা ভেঙ্গে যাওয়ার পর খুব ভেঙে পড়েছিল তনুজা। ওর ঠাকুমা বলেছিলেন মনের মানুষ যে হয় সে কখনোই ছেড়ে যাবে না তোকে,সে তোকে বুঝবে,তোর পাশে থাকবে। আর এই ছেলে বোধহয় তোর মনের মানুষ ছিলোনা। মনের মানুষের সাথে সম্পর্ক এতো ঠুনকো হবে না সে সেটা ভেঙে দেওয়া খুব সহজ হবে। সেদিন চুপ করে শুনেছিল তনুজা। তারপর থেকে মা বাবার ওপর বিয়ের ভার ছেড়ে দিয়েছিলো। 
এই কদিনে সৌরভের সঙ্গে বেশ একটা মনের মিল গড়ে উঠেছে ওর। সৌরভ পেশায় সফটওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার, আর সাথে একটা ক্লাউড কিচেন চালায়, দুঃস্থ বাচ্চাদের খাবার সার্ভ করে। বিয়ের পর তনুজা এর মধ্যে ইনভলভড হতে চেয়েছিল কিন্তু সৌরভ বলেছিলো কটাদিন একটু রিল্যাক্স করে নাও তারপর এসব করো। সৌরভ যখন অফিসে থাকতো,তনুজা লাঞ্চের পর বিশ্রাম নিয়ে ডান্স প্রাকটিস করতো টেপ চালিয়ে। একসময়  ওর খুব ইচ্ছে ছিলো ভালো ড্যান্সার হবে। কিন্তু বাড়ীর কারোর সায় না থাকায় ওর স্বপ্ন পূরণ হয়নি। সৌরভকে এসবের বিন্দুমাত্র বলেনি কোনোদিন। ভাবতো ও এসব মেনে নেবে কিনা! বিয়ের পর তনুজার প্রথম জন্মদিনে খুব বড়ো আয়োজন করেছে সৌরভ। তনুজার বাপের বাড়ীর সবাই আমন্ত্রিত। একফাঁকে সৌরভ তনুজাকে ডেকে বললো রুমে যাও, একটা দারুণ সারপ্রাইজ আছে তোমার জন্য। তনুজা বেডরুমে এলো,লাইট জ্বালতেই দেখলো,একি! বিছানায় সুন্দর করে সাজানো রয়েছে নাচের পোশাক আর এক জোড়া ঘুঙুর। আনন্দে তনুজার চোখে জল চলে এলো। দেখি পা দুটো দেখি! ঘুঙুরটা পরিয়ে দিই। তনুজার পা টা নিয়ে ঘুঙুর পরিয়ে দিলো সৌরভ। এসব তুমি কি করে জানলে? তনুজা জিজ্ঞেস করে। সৌরভ বলে জানিনা আমি তোমার মনের মানুষ হয়ে উঠতে পারবো কিনা! তবে তোমার ইচ্ছে অনিচ্ছের কথা এটুকু তো জানতেই পারি বলো। একদিন দুপুরে অফিস থেকে ফিরে দেখি তুমি ডান্স প্রাকটিস করছো, বাড়ীতে আর ঢুকিনি, মুগ্ধ হয়ে নাচ দেখছিলাম। তারপর তোমার মায়ের সাথে কথা বলে জানতে পারি যে তুমি ডান্স খুব ভালবাসতে। আজ তাই তোমার জন্মদিনে উপহার দিলাম যাতে তোমার স্বপ্নপূরণ হয়। আর এই নাও ক্লাসিক্যাল ডান্স স্কুলে ভর্তির ফর্ম, ফিল আপ করে নিও। আমি জমা দিয়ে আসবো। এখন চলো কেকটা কাটবে, সবাই অপেক্ষা করছে। আজ ঠাকুমার কথাগুলো খুব মনে পড়ছে তনুজার, মনের মানুষ সেই হয় যে না বলা সত্ত্বেও মনের সব কিছু বোঝে। সৌরভ বললো কি ভাবছেন ম্যাডাম? চলুন। হ্যা আসছি, বলে সৌরভের কানের কাছে মুখ নিয়ে গিয়ে তনুজা বললো "আমার প্রাণের মানুষ আছে প্রাণে, তাই হেরি তায় সকল খানে।" সৌরভ বললো বাকিটা শোনার অপেক্ষায় রইলাম। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শনিবার, ১ অক্টোবর, ২০২২

পুজোর স্মৃতি✍️ ডা: অরুণিমা দাস

বিষয় - অণুগল্প
পুজোর স্মৃতি
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

পুজো মানেই কাশফুল, শিউলি আর শরতের
আকাশে মেঘের আনাগোনা। ছোটবেলায় স্কুলে পুজোর ছুটি পড়ার আগে তিন দিন ধরে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো। তখন বোধহয় ক্লাস নাইনে পড়ি, নাটকের মহড়া চলছে একদিন, সবাই যে যার পাঠ মুখস্থ করতে ব্যস্ত। কিন্তু আমার এক বন্ধু পিউ ওর কিছুতেই পাঠ আর মনে থাকছে না। নাটকের নাম ছিলো 'চোখে আঙুল দাদা' আর ওর চরিত্র ছিলো চোখে আঙুল দাদার অভিনয়। খুব চিন্তায় পড়ে গেছে সবাই এমন সময় আমাদের ক্লাসের মাতব্বর থুড়ি মনিটর ডোনা বললো চাপ নিস না,আমি স্টেজের পিছন থেকে প্রম্পট করবো তুই খালি স্মার্টলি পাঠ গুলো বলে যাবি। পিউ এসব শুনে শান্ত হলো কিছুক্ষন। তারপর হঠাৎ করে বললো যদি টেনশনে শুনতে না পাই! উফফ থাম তো! সব পাবি, ডোনা বললো। 
এরপর নির্ধারিত দিনে স্টেজে নাটকের জন্য সবাই রেডী, ড্রেস পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে এদিক ওদিক। নাচ গান কবিতা এসব হবার পর ম্যাম নাটকের জন্য ঘোষণা করলেন। সবাই স্টেজের দিকে তাকিয়ে। পিউ কে আমরা ভরসা দিলাম সকলে, ডোনা এসে পিঠ চাপড়ে বললো যা চিন্তা করিস না, ম্যায় হুঁনা! পিউ মানে চোখে আঙুল দাদা স্টেজে উঠলো, প্রধান চরিত্র ওর। প্রথম কিছুক্ষন ভালোই চলছিল, ডোনা মাঝে প্রম্পট করতে গিয়ে চোখে আঙুল দাদার জায়গায় ওর তৈরী দানবের যে ডায়ালগ সেটা বলতে লাগলো। পিউ ও সেগুলো বলতে থাকলো, স্টেজের বাইরে চাপা গুঞ্জন শোনা যাচ্ছে, ম্যাম বলছেন কি সব বলছো পিউ? এটা তো দানবের ডায়ালগ! পিউ ভয়ে কেঁদে ফেললো। আর দানব টা মাটি থেকে উঠে ওর গলা টিপে বললো এই আমার ডায়ালগ বলছিস কেন তুই? তুই তো চোখে আঙুল দাদার পাঠ করছিস! পিউ বললো সুমনা (দানবের ভূমিকায় ছিলো) তুই এরকম করছিস কেনো? ভুলে গেছি আমি সব পাঠ, আর ডোনা পর্দার আড়াল থেকে আমাকে এটাই বলছিলো। যাইহোক পরিস্থিতি সামাল দিতে ম্যাম স্টেজে উঠে ওদের দুজন কে শান্ত করলেন। ডোনা কে ডেকে খুব বকলেন, বললেন তোমাদের এসব অসুবিধে আমায় বললে আরো বেশি করে রিহার্সাল করাতাম তোমাদের। বড়ো হয়ে গেছো বলে ছেড়ে দিয়েছিলাম তোমাদের নিজের মতো করে। আমার ভরসাটা তোমরা রাখলে না। এরপর নাটকটা আর হয়নি, নাটকের সবাই নিজের মতন করে নাচ গান করেছিল যে যেটা পারে। এসব ঘটনা গুলো মনে পড়লে আজও হাসি পায়। ম্যাডামের সাথে দেখা হলে উনিও হাসেন এসব মনে করে। বলেন এগুলোও তো স্কুলের স্মৃতি রে! এগুলো আকড়ে বেঁচে থাকার দিন এখন। সত্যিই দিনগুলো খুব ভালো ছিল, পুজোর আগে এসব অনুষ্ঠান এখন আর হয়না, তাই স্মৃতি হাতড়ে এই লেখাটা লিখে ফেললাম।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

সোমবার, ২২ আগস্ট, ২০২২

শিরোনাম - সহানুভূতি ✍️ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সহানুভূতি
✍️ডা: অরুণিমা দাস

কি এমন হয়েছিলো যে কপালে এমন ক্ষত হলো? ডা: ঘোষ ব্যান্ডেজ করতে করতে জিজ্ঞেস করলেন মনামিকে। ওই নিজেদের মধ্যে একটু কথা কাটা কাটি, মিসআন্ডারস্ট্যান্ডিং এসব আর কি! আপনাদের তো রিসেন্ট বিয়ে হয়েছে, এর মধ্যেই এতো আন্ডারস্ট্যান্ডিং এর প্রবলেম? মনামি বললো আসলে আমার হাসব্যান্ড সুনন্দ প্রতি মাসের শেষের দিকে কোথাও একটা যায়,বেশ কিছু টাকা উড়িয়ে আসে। আমার এক বন্ধু ওকে দেখেছে খারাপ এলাকায়। আচ্ছা, তাই নাকি? আপনি কোনোদিন ওনার কাছে জানতে চান নি উনি কোথায় যান? কি করেন টাকা নিয়ে? জানতে চাইলেই বলে আমার ওপর ভরসা রাখো,আমি কোনো বাজে কাজ করছি না! গতকাল আমি জোর করে জানতে চাই ওর কাছে, কোথায় যায়? কি করে? কার সাথে সম্পর্ক ওর যে ওই এলাকায় যেতে হয়? এসব শুনেই সুনন্দ রেগে গিয়ে আমাকে ধাক্কা মারে আর টেবিলের কোণে মাথাটা লেগে কপালটা কেটে যায় আমার। অন্যের কথায় স্বামীকে ভুল বুঝলে তুমি? সুনন্দ ডা: ঘোষের চেম্বারে ঢুকতে ঢুকতে বলে। আরে আপনি? আসুন বসুন। ডা: ঘোষ বললেন সুনন্দকে। হ্যা বসছি, আপনি তাহলে পরের মাস থেকে যাচ্ছেন তো ওখানে? হ্যা নিশ্চই যাবো,এতো ভালো কাজের সুযোগ পেয়েছি, আমি অবশ্যই যাবো। মনামি হা করে সুনন্দ আর ডা: ঘোষের কথা শোনে। সুনন্দ কে ডা: ঘোষ বলেন ওনাকে আর অন্ধকারে রেখে লাভ নেই। বলে দিন সব কথা। কি কথা সুনন্দ? মনামি জানতে চায়। সুনন্দ বলতে শুরু করে - আমি একদিন অফিস থেকে ড্রাইভ করে ফিরছিলাম, এক ভদ্রমহিলা আমার গাড়ির সামনে এসে পড়েন আচমকা। আমি ব্রেক কষে গাড়ী থামিয়ে দিই, উনি একটুর জন্য রক্ষা পান। গাড়ি থেকে নেমে যখন ওনার কাছে যাই, ওনার সাজ পোশাক আমার খুব উগ্র মনে হয়েছিলো। কথাবার্তাও লো কোয়ালিটির। আমায় বলছিলো তুই আজ আমার রাতের খদ্দের। আমি চমকে উঠে বলি কি বলছেন এসব? উনি বললেন এই লাইনে অনেকদিন আছি। কারোর অতিরিক্ত লালসার স্বীকার হয়ে দুটো বাচ্চা জন্ম দিয়েছি। আজকাল শুধু বাচ্চা দুটোর জন্য নিজেকে সাজিয়ে পেশ করি খদ্দেরের কাছে। সব শুনে আমার চোখ দিয়ে জল গড়িয়ে পড়ছিলো তখন। সামলে নিয়ে বললাম উঠুন গাড়িতে, আপনার বাচ্চাদের দেখে আসি চলুন। গিয়ে দেখি ওই নোংরা পরিবেশে বাচ্চা গুলো ভালো নেই। ওনাকে বলি বাচ্চাগুলোকে অন্য জায়গায় রাখুন, ওদের পড়াশোনা থাকার খরচ আমি দেবো প্রতি মাসে। এই অন্ধকার জায়গা থেকে ওদের সরিয়ে নিয়ে যান, নয়তো ওদের জীবন শেষ হয়ে যাবে। আপনি কেনো এত করছেন বাবু ওদের জন্য? কেউ তো হয় না ওরা আপনার। মুখে বললাম সব প্রশ্নের উত্তর হয় না! মনে মনে ভাবলাম আমিও তো অনাথ আশ্রমে মানুষ হয়েছি,আমার মাও এরকম কেউ ছিলেন হয়তো! আমি বুঝি বাচ্চা গুলোর কষ্ট টা, তাই আমি চাই না ওরা এভাবে নোংরা পরিবেশে থাকুক। এতোটা বলে সুনন্দ থামলো। 
মনামির চোখে জল! সুনন্দর হাত ধরে বললো খুব ভুল হয়ে গেছে আমার, আমি তোমায় ভুল বুঝেছিলাম। তুমি অনেক বড়ো মনের মানুষ। তোমাকে স্বামী হিসেবে পেয়ে আমি ধন্য। ডা: ঘোষ চেম্বার ছেড়ে বেরিয়ে যাচ্ছিলেন, সুনন্দ বললো পরের মাস থেকে আমি যেখানে যাই, ওখানকার মানুষদের চিকিৎসার জন্য আপনি যাচ্ছেন তো? ডা:ঘোষ বললেন নিশ্চয়ই যাবো, ওনারা এই সমাজের অঙ্গ, ওনাদের ভালো থাকাটা দরকার। আমি আছি আপনার পাশে। থ্যাংক ইউ ডা:ঘোষ, সুনন্দ বললো। 
ওই অন্ধকারে কেউ নিজের ইচ্ছেয় নিমজ্জিত হয় না,পরিবেশ পরিস্থিতি বাধ্য করে। মনামি বললো সরি সুনন্দ ভেরি সরি! ইটস ওকে, চলো বাড়ি যাই, আমাদের সম্পর্ক টা রিনিউ করে আবার নতুন করে শুরু করি। মনামি এগিয়ে চলে সুনন্দর হাত ধরে,সব ভুল বোঝাবুঝিকে দূরে সরিয়ে রেখে। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শিরোনাম-সাহস✍️ ডা: অরুণিমা দাস

 শিরোনাম-সাহস ✍️ ডা: অরুণিমা দাস সত্যি কথা বলতে সত্য কিন্তু অপ্রিয় হয়। মিথ্যেকে আড়াল করার অনেক পন্থা পাওয়া গেলেও সত্যকে চাপা দেওয়া একটু...