বৃহস্পতিবার, ৩১ অক্টোবর, ২০২৪

শিরোনাম - কথোপকথন✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - কথোপকথন
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

ধরাধামে আসার পূর্বে কথোপকথনে ব্যস্ত কর্তা গিন্নী।
কইগো রেডী হলে নাকি? হ্যা আরেকটু মেকআপ বাকি করে নিই, দাড়াও একটু। স্বামী শিবকে উত্তর দিলেন কালী মাতা।
- আরে এতো মেক আপ করে হবেটা কি শুনি?
- আমার কালো রং যে, একটু সাজগোজ না করলে চলে বলো?
- দূর ওসব বাহ্যিক গো গিন্নী। মন তো তোমার কালো নয়,ভক্তদের জন্য সর্বদা আকুল। এতেই হবে গো!
-বরং এই দুনিয়ার যত কালিমা আছে, সেসব দুর করে নিজের কালো রং আরো উজ্জ্বল করো। আমি কালো বউকে নিয়েই খুশি। 
- আহা! ঢং দেখে আর পারি না। যাও রেস্ট করে নাও একটু।
- রেস্ট করেছি, কয়েকটা ডনবৈঠক ও দিয়েছি। দুদিন এখন আমার খাটাখাটনি যাবে, ওজন তো বেশ ভালোই তোমার। 
- হ্যা জানি খুব কষ্ট হয় তোমার! কি আর করবো বলো! আমার খুব লজ্জা লাগে। 
- আহা লজ্জা কিসের গিন্নী! তুমি তো সব গৃহিণীর অনুপ্রেরণা। তোমায় দেখেই তো তারা ঘরের কর্তা দের ওপর জোরজুলুম করে। 
- তা করে সে তো ভালো! স্বামীদের একটু দমিয়ে রাখা দরকার। এখন আমার কুচিটা একটু ধরে দাও দেখি। দেরী হয়ে যাবে যেতে নইলে। 
- সে ধরে দিচ্ছি। তার আগে নাও এই গয়নার সেটটা এনেছি তোমার জন্য,পরে নাও। 
- আরে এসব আবার কেনো? জানো তো আমার এসবের প্রতি মায়া নেই। 
- জানি গো! কিন্তু আমারও ইচ্ছে করে তোমায় কিছু দিতে। আবার ধনতেরাস চলছে এখন। তুমি পরে দেখো,ভালো লাগবে। 
- সে তুমি ফুলের মালা দিলেও আমার ভালো লাগবে গো। তোমার দেওয়া সামান্য জিনিসও আমার কাছে অনেক মূল্যবান। 
- নাও কুচি ধরে দিলাম, এবার চলো। 
হ্যা চলো,তোমার ডমরুটা নাও মনে করে। ভক্তরা সারাদিন না খেয়ে অপেক্ষা করছে,চলো এবার যাওয়া যাক। 
-হ্যা চলো গিন্নী। তোমার আশীষ যেনো সবাই পায়। দুনিয়ার সব কালো মুছে যাক তোমার আগমনে। আলোয় ভরে উঠুক চারিদিক। 

আলোকমালায় সেজে উঠেছে প্যান্ডেল সব। ঢাক বাজছে। শুরু হবে এক রাতের কালীপুজো। সব দুঃখ ভুলে সকলে মেতে উঠুক শ্যামা মায়ের আরাধনায়। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ২৪ অক্টোবর, ২০২৪

কার্যসিদ্ধির আসল রহস্য✍️ ডা: অরুণিমা দাস

কার্যসিদ্ধির আসল রহস্য
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

একতা যেমন কোনো কাজের জন্য আদর্শ একথা ঠিক, আর অপর দিকে এমন কিছু কাজ আছে যেখানে অনেক লোকের সমন্বয়ে কাজটা ভন্ডুল হয়ে যায়। একতা দিয়ে কোনো কাজ উদ্ধার করা যায় কিন্তু আবার কিছু কাজে বেশি লোক মিলিত হলে কাজটা আর হয়ে ওঠে না। সমস্ত জিনিসটাই নির্ভর করে মানুষের মানসিকতা ও কাজের ধরনের ওপর। আরো একটা কথা আছে 'নানা মুনি নানা মত' এই কথাটা কিছুটা হলেও প্রযোজ্য অধিক লোকের উপস্থিতিতে কোনো উদ্দেশ্য সফল না হবার জন্য। ব্যক্তি বিশেষের পারস্পরিক সম্পর্কের সমীকরণ ঠিক থাকলে, ইগো মাথা চাড়া না দিলে অনেক কঠিন কাজ খুব সহজ হয়ে যায়। একটা বাঁশের কঞ্চি যেমন সহজে ভাঙ্গা যায়, যেটা একত্রে দশটা কঞ্চি হলে ভাঙ্গা দুষ্কর হয়। আবার অপরদিকে কুড়িটা বাঁশের কঞ্চির মধ্যে যদি কোনো ভাবে মতের অমিল হয়, ইগো দেখা যায় মানে এককথায় কঞ্চিতে ঘুণ ধরে তখন কিন্তু সেগুলো ভাঙতে কয়েক সেকেন্ড লাগে মাত্র। তখন গাজন নষ্ট হবার মতন কাজ হয়ে যায়। 

"অধিক মানুষে কার্য নিরর্থক আবার একত্রে করলে পাওয়া যায় বল 
পারস্পরিক সম্পর্কের সমীকরণ ঠিক করে দেয় কোন কার্য হবে সফল।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

সোমবার, ২১ অক্টোবর, ২০২৪

সহাবস্থান✍️ ডা:অরুণিমা দাস

 সহাবস্থান
✍️ ডা:অরুণিমা দাস


আসুক রোদ,আসুক বৃষ্টি বাদলা- একসাথে থাকবো মোরা 
নীড় হোক যতই ছোট, কষ্টমাঝারে মনের শান্তিই সেরা।

নিউক্লিয়ার ফ্যামিলিতে নেই দাদু ঠাকুমার আদর,না আছে তাঁদের ছোঁয়া
ধনী হোক বা গরীব মিলেমিশে থেকে তাঁদের আশীর্বাদই পরম পাওয়া। 

ভাঙ্গা বিছানা হোক বা কাঁচভাঙ্গা জানালা,হয়না সেথায় স্থান সংকুলান
নাতি নাতনী আর পোষ্য পরিবৃত হয়ে থাকাতেই শান্তি পান।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ১৭ অক্টোবর, ২০২৪

লক্ষ্মী ও অলক্ষ্মী✍️ ডা:অরুণিমা দাস

 লক্ষ্মী ও অলক্ষ্মী
✍️ ডা:অরুণিমা দাস

লক্ষ্মী ও অলক্ষ্মী এই দুইয়ের বাস একত্রে। কিন্তু যখন মানুষের বিশ্বাসে কোনরকম চিড় ধরে, নিজেকে বড়ো ভাবতে থাকে, ভাবে এই অর্থ যশ মান সম্মান নিজের অর্জন করা তখনি লক্ষ্মী দেবী রুষ্ট হন ও আবির্ভাব হয় দেবী অলক্ষীর। এটাই বুঝেছি ব্রতকথার সারমর্ম হিসেবে। 
কাল লক্ষ্মীপুজোর সময় লক্ষ্মীদেবীর ব্রতকথা পাঠ করলাম তা থেকে বুঝলাম যখন মানুষের মধ্যে অহংবোধ মনুষ্যত্বের থেকে বড় হয় ঠিক তখনি অলক্ষ্মীর আগমন ঘটে,সংসারে সুখ শান্তি বিঘ্নিত হয়,দারিদ্র্য বাসা বাঁধে। অলক্ষীর আগমনের জন্য মানুষের নিজের কর্মদোষই দায়ী। তাই সবসময় নির্লোভ, সৎ ও প্রকৃত মনুষ্যত্বের অধিকারী হলে লক্ষ্মী দেবী আনন্দের সাথে সেই সংসারে বাস করেন, মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে পারেনা মানুষের অমানবিক দিক তথা অলক্ষ্মীর রূপ। 

"সৎ,নির্লোভ,সরল হোক মানুষ তাতেই লক্ষ্মী দেবী করবেন বাস
অলক্ষ্মীকে মাথাচাড়া দিয়ে উঠতে দিওনা, নিজের কুচিন্তায় টানো রাশ।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বুধবার, ১৬ অক্টোবর, ২০২৪

নাম — বৈদিক দিগন্ত ও উত্তরসুরী রামমোহন।

 নাম— বৈদিক দিগন্ত ও উত্তরসুরী রামমোহন।
 ✍️— মৃদুল কুমার দাস।
                  
বর্ধমান জেলার খানাকুল কৃষ্ণনগরের অদূরে রাধানগর গ্রামে রামকান্ত রায়ের ঘরে বাংলায় অষ্টাদশ শতাব্দীতে (১৭৭৪) এলেন,আর ঊনবিংশ শতাব্দীতে নবজাগরণের জনক হবেন সেদিন কেউ জানতে পারেননি, জানতে পারেননি  হিন্দু ব্রাহ্মণ ঘরে জন্মেও ব্রাহ্মণ্য শ্রেণির স্বার্থের ঘোরতর বিরোধী হবেন! তাদের ঘুম ছুটিয়ে দেবেন। গোটা ব্রাহ্মণ্য শ্রেণি একদিকে, আর রাজা রামমোহন একাই ঠিক বিপরীতে - সমানে টক্কর,রাজা শত বিপদের মধ্যেও পর্বতের মত সিদ্ধান্তে অবিচল।  দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। যেন এক লৌহমানব। তাঁর এমন দৃঢ় মননশীলতার মূলে রহস্যভেদ করা খুব একটা কঠিন ছিল না,তাই ছিল একপ্রকার সাবলীলভাবে সঠিক জ্ঞান অর্জন। এর মূলে তাঁর বহুভাষা শিক্ষা ও জ্ঞানের বিস্তৃত পরিধিই তাঁকে দৃঢ় মনোবলের অধিকারী করেছিল। তাঁর সম্পর্কে বাংলা চিরকাল বলে আসছে, বলে আসবেও— তিনি ছিলেন ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের পুরোধা প্রাণপুরুষ ও মণীষী। তাই  নিয়ে এই পরিক্রমা।

 *বৈদিক যুগ, ব্রাহ্মণ্য শ্রেণি ও স্ত্রীসমাজ*:- 
   বেদ হল বৈদিক সভ্যতার ভিত্তি। বেদের চারটি ভাগ - ঋক,সাম যজু,অথর্ব। চারটি বর্ণ - ব্রাহ্মণ,ক্ষত্রিয়,বৈশ্য ও শূদ্র। এ হল সমাজের শ্রেণি ভাগ, যা থেকে এসেছিল শ্রেণি বৈষম্য। এই শ্রেণি বৈষম্যে বর্ণশ্রেষ্ঠ ছিলেন ব্রাহ্মণ্য শ্রেণি। আর সবার নীচে যাদের তাচ্ছিল্যের দৃষ্টিতে দেখা হত,যেন মনুষ্যেতর জীব(যো দাস বর্ণমালা গুহাকঃ। ২/১২/৪) তারা হলেন শূদ্র। পুরুষসূক্তে প্রমাণ পাই- ব্রাহ্মণরা পুরুষের মুখ থেকে,রাজন্য বাহু থেকে,বৈশ্য উরু থেকে ও শূদ্র পা থেকে সৃষ্টি হয়েছিল(১০/৯০/১৫)। তবে নারীর স্থান নগন্য ছিল না। ঋগ্বেদের রচনায় তাই নিয়ে কয়েকটি স্তর পাই। প্রথম স্তরে মেয়েরা সংসারের শ্রী ছিলেন। স্তরানুক্রমে মেয়েদের সেই গৌরব আর থাকেনি। অথর্ব বেদ থেকেই এল সতীদাহ প্রথা। এমনকি মেয়েদের সম্পত্তি জ্ঞান করা হতো। সম্পত্তিতে নারীর স্থান গোরুর নীচে থাকত - 'অভাগার গরু মরে,ভাগ্যবানের বৌ'। নতুন গরু কিনতে টাকা লাগত কিন্তু নতুন বউ আনলে টাকা পাওয়া যেত। আরো যেমন অথর্ব বেদে পাই- যে নারীর পূর্বে একজন পতি ছিল,সে যখন দ্বিতীয় পুরুষকে লাভ করে তখন পঞ্চৌদন্য অজ দান করলে তার কোনো ক্ষতি হত না ( ৯/৫/২৭)। আবার ৫/১৭/৮,৯ সূত্রে পাই- কোনো নারীর দশটি পতি থাকলেও,সে যখন ব্রাহ্মণের পত্নী হয় তখন সেই ব্রাহ্মণই তার স্বীকৃত পতি। রাজণ্য বা বৈশ্য তার পতি নন। 
     ঋক বৈদিক যুগের বাক, গার্গী,মৈত্রেয়ী,শাশ্বতী,অপালাদের মতো বিদূষী নারী ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যের যুগে দুর্লভ। ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যের যুগ থেকে শিক্ষিতা নারীর সংখ্যা নিতান্তই নগন্য হয়ে দাঁড়ালো। এমনকি কেউ ভাগ্যক্রমে শিক্ষিতা হওয়ার সুযোগ পেলে তাঁকে "স্ত্রিয়ঃ সতীঃ তা উ যে পুংসঃ আহুঃ" (১/১১/৪ - তৈত্তিরীয় আরণ্যক।) অর্থাৎ নারী হয়েও তারা পুরুষবেশী হয়ে চলতেন। ক্রমে অবস্থা এমন দাঁড়াল,নারীর শিক্ষা বলতে গণিকা বিদ্যা,তাছাড়া আর অন্য কোনো শিক্ষাতে অধিকার ছিল না।          
 আর স্ত্রীর অধিকারের আরেক  মাত্রা হল কেবল কেবল সন্তান প্রসব,জননী হওয়া,আর সে সন্তান অবশ্যই পুত্র সন্তান হতে হবে। নিঃসন্তানাকে বিবাহের দশ বছর পরে ত্যাগ করা যেত। কেবল কন্যা সন্তান জন্ম দিলে বারো বছর,মৃতবৎসাকে পনরো বছর,আর কলহপরায়ণাকে তৎক্ষণাৎ ত্যাগ করা যেত। কেবল গণিকাকে শিক্ষা লাভ করতে হত। নারী অশুচি। নারী পাপিষ্ঠা ও অমঙ্গলের হেতু। তৈত্তিরীয় সাহিত্যের ৬/৫/১০/৩ সূক্তে পাই নারীর স্থান পুরুষের নীচে। জন্মের সময় শিশুকন্যাকে মাটিতে রাখা হত,আর শিশুপুত্রকে উপরে তুলে রাখা হত। এহেন নারী-পুরুষে বৈষম্যপীড়িত সমাজে মেয়েদের বেদ পাঠ করা মানে বেদের শুদ্ধতা নষ্ট হওয়া মনে করা হত। তাই মেয়েদের বেদ পাঠের উপর নিষেধাজ্ঞা ছিল। এসবই ব্রাহ্মণ্য শ্রেণির বিধানের অঙ্গুলি হেলনে সমাজ চালিত হত। নিজেদের শ্রেষ্ঠত্ব প্রমাণে সমাজের বিধানদাতা হতেন। কিন্তু এমন অরাজকতা আর কতদিন! বিশেষ করে স্ত্রীজাতির শিক্ষা নিয়ে এল মতান্তর। কারণ সন্তান লালন পালন ও শিক্ষাদান মায়ের উপর অনেকটাই নির্ভর করত। তা থেকেই যাঁদের সঙ্গে বৈদিক ব্রাহ্মণ্য শ্রেণীর মতান্তর হল তাঁরা  হলেন বিরোধীগোষ্ঠী। তথা প্রোটেস্টান্ট পন্থি। এই  প্রোটেস্ট্যান্টপন্থীদের কোনো আকাশ থেকে পড়ে পাওয়া নয়। ধর্মীয় ধ্বজাধারীদের দীর্ঘদিন অন্যায় দেখতে দেখতে যখন সহ্যের সীমা ছাড়িয়ে যায় তখন এঁদের জন্ম হয়। প্রত্যেক ধর্মে এদের বিপক্ষ মত নিয়ে সটান দাঁড়াতে দেখা যায়। 
     বেদ পাঠে মেয়েদের অধিকার থাকবে না, এই নিষেধাজ্ঞা নিয়েই হিন্দু প্রোটেস্টান্ট পন্থীদের কাছ থেকে প্রথম প্রতিবাদ এল। এই প্রতিক্রিয়াশীল প্রোটেস্টান্টপন্থী মেয়েদের বেদ পাঠের পক্ষে,কেননা সন্তান পালন থেকে,সন্তানের শিক্ষা দান সম্পন্ন করতে বেদ পাঠ অত্যন্ত জরুরী ছিল। যখন তাঁরা বিধানের বিরুদ্ধে কোনো সুরাহা করতে পারলেন না,তখন বেদ বিশেষজ্ঞ আদি বেদব্যাসের কাছে গেলেন এর যথার্থ বিহিত চাইতে। প্রোটেস্টান্টপন্থীদের যুক্তির সারবত্তা আছে জ্ঞান করে তাঁদের আশ্বস্ত করে বেদব্যাস কিছুদিন সময় চাইলেন,দেখা যাক কি করতে পারেন। কিছুদিন পরে তিনি মীমাংসা সূত্র বের করে ফেললেন- মহাভারত রচনার দ্বারা বেদের সারাংশ মহাভারত পড়লেই মেয়েদের বেদ পাঠ হয়ে যাবে। তাই মহাভারতকে বলা হয় পঞ্চম বেদ। এই প্রথম ব্রাহ্মণ্য শ্রেণিকে মেয়েদের ব্যাপারে ফতোয়া নিয়ে পিছু হটতে হল। 

  *বৌদ্ধধর্ম ও নারীসমাজ* 
    ব্রাহ্মণ্য শ্রেণী তাঁদের  ব্রাহ্মণ্য সাহিত্য দিয়ে ক্রমে নারীর জন্য শাস্ত্রীয় বিধি বিধানের দোহাই পেড়ে আকন্ঠ অরাজকতায় নিমগ্ন হতে হতে লাগলেন। বেদ পাঠের সরল সুরাহা গলার কাঁটাকে উপড়ে ফেলার প্রবল প্রতিক্রিয়াশীল হয়ে জোর কদমে প্রচার করতে লাগল নারীর সভায় যোগদানের অধিকার নেই (মৈত্রায়নী সাহিত্যের ৪/৭/৪)। কোনো শিক্ষা পাওয়া মানে স্বাধীন অর্থ উপার্জন,স্বাধীন জীবনযাপন। সেই সঙ্গে বলা হতে লাগল নারী নিজের দেহকে অবাঞ্ছিত সম্ভোগের হাত থেকে রক্ষা করতে পারে না,সে অধিকার তাদের নেই। (মৈত্রায়নী সাহিত্যের ৩/৬/৩; ৪/৬/৭; ৪/৭/৪; ১০/১০/১১; তৈত্তিরীয় সংহিতা ৬/৫/৮/২) তার ছেলেমেয়েদের সামনেই তার  স্বামী একাধিক পত্নী, উপপত্নী এনে অথবা গনিকালয়ে গমন করে তাকে অসম্মান করলে বিনা প্রতিবাদে সহ্য করে চলতে হবে। আর নারীর সামান্য পদস্খলন হলে কঠোর শাস্তি মাথা পেতে নিতে হবে। উত্তর বৈদিক সভ্যতা তথা ব্রাহ্মণ্য সাহিত্যের যুগ কেবল ব্রাহ্মণ্য শ্রেণির দম্ভ দেখল। ব্রাহ্মণ্য শ্রেণির অরাজকতার হাত থেকে মানুষকে রক্ষা করতে এলেন স্বয়ং বুদ্ধ ও তাঁর বৌদ্ধধর্ম। 
     বুদ্ধদেব তাঁর 'ত্রিপিটক' ও 'ধম্মপদ' দিয়ে যাগযজ্ঞ ও বর্ণ বৈষম্যের বিরুদ্ধে রুখে দাঁড়ালেন। একাই বুদ্ধ ব্রাহ্মণ্য শ্রেণির দুর্দিন ঘণিয়ে আনলেন। বুদ্ধের সাম্যের বাণীতে ব্রাহ্মণ্য শ্রেণি তাঁদের ভবিষ্যত নিয়ে বিস্তর দুর্ভাবনায় কাটাতে লাগলেন। প্রতিপত্তি একপ্রকার খর্ব হতে বসল। ব্রাহ্মণ্য শ্রেণির অত্যাচার দিনকে দিন এমন ভয়ঙ্কর হচ্ছিল, একাই বুদ্ধ তা প্রতিহত করলেন। ব্রাহ্মণ্য শ্রেণির এটি দ্বিতীয় পশ্চাদপসরণ। বৈদিক নারীসমাজের জন্য বুদ্ধ আনলেন আমূল সংস্কার। 
        নারীসমাজের জন্য মাতা গৌতমীই বুদ্ধকে ভাবতে প্রভাবিত করেছিলেন। তাঁর সময়ে অগ্রগন্যা নারীরা যেমন, ত্রিশরণাপন্না, সুপ্রিয়া, সুজাতা, পটাচারা,অম্বপালী,সুমেধা, ইসিদাসী,শুভা প্রমুখ। বিম্বিসার পত্নী ক্ষমা ও উৎপলবর্ণাকে বুদ্ধদেব অগ্রশ্রাবিকা উপাধি দান করেছিলেন। আর সুজাতার হাতে পায়েসান্ন খেয়ে তিনি বুদ্ধত্ব লাভ করেছিলেন যা নারীর মর্যাদার দৃষ্টান্তস্থানীয়। বুদ্ধ উত্তর যুগে রামায়ণে নারীর অধিকার নিয়ে মিশ্র প্রতিক্রিয়া পাই। তা বুদ্ধের প্রভাব অবশ্যই স্বীকার করতে হয়। যেমন- দশরথের মৃত্যুর পর চার রাণী দিব্যি বৈধব্য জীবনযাপন করছিলেন। মন্দোদরী সতী নারী ছিলেন। তিনি ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্যেও অনন্যা ছিলেন। রাবণ পরস্ত্রী অপহারক হলেও নারীর প্রতি সম্মান দেখিয়েছেন। অনার্যের হাতে আর্য নারীর সম্মান প্রতিষ্ঠিত হয়েছিল। রাবণের পরস্ত্রী অপহরণের কলঙ্ক  সীতা একজন নারী হিসেবে রাবণের উপর রোষ প্রকাশ সমাজ মান্যতা দিয়েেছিল। বৈদিক যুগে নারীরা ছিলেন চার দেয়ালের মধ্যে আবদ্ধ,স্বামী, পুত্রের অধীন। বাকস্বাধীনতাহীন পরাধীন। বুদ্ধ সেই প্রথা ভাঙলেন। মহামঙ্গল সূত্রে পাই- 
 - "মাতা-পিতু উপস্থাপনা পুত্তদারস্সা সঙ্গহো" - অর্থাৎ পুত্রের কর্তব্য মা বাবার সেবা করা,স্ত্রী পুত্রের ভরণপোষন করলে মঙ্গল হয়। সূত্রপিটকের দীর্ঘনিকায় গ্রন্থের মহাপরিনির্বাণ সূত্রে উল্লেখ আছে, বুদ্ধদেব তাঁর ভিক্ষু সংঘে বলেছিলেন- বৃদ্ধ স্ত্রীলোককে মাতার মত,তরুণীকে ভগ্নীর মত,আর বালিকাকে নিজ সন্তানের মত জ্ঞান দান করবে। কেননা নারী ব্যতীত পুরুষ অচল। তাঁরই পথে যেসব মহিলা বাগ্মীতায় অসামান্যা হয়েছিলেন তাঁরা হলেন, কৃশা, গৌতমী, শুক্লা, পূর্ণা,শুভা,পটাচরা প্রমুখ। 
  বুদ্ধের প্রচারিত ধর্মের টানে এলাকার পর এলাকা বৌদ্ধধর্ম গ্রহণে ঢল নেমেছিল। যেমন, পুন্ড্রবর্ধন ছিল বৌদ্ধধর্মহীন এলাকা। সেখানে একদিন সুগামাধার আমন্ত্রণে বুদ্ধ এলেন। গোটা এলাকা বৌদ্ধধর্মে দীক্ষিত হল। উত্তর দক্ষিণ পূব পশ্চিম শুধুই বৌদ্ধধর্মময়। বৈদিক সমাজের আমূল সংস্কারে বৌদ্ধধর্ম গ্রহনে ঢল নেমেছিল। বিশেষ করে নারী সমাজের শিক্ষা,স্বাস্থ্য,ব্যক্তি স্বাধীনতা প্রতিষ্ঠার জন্য  নারী সংগঠন বা ভিক্ষুনী সংগঠন গড়েছিলেন, ভিক্ষু সংঘ গঠনের ঠিক পাঁচ বছর পর। মেয়েদের অবাধ স্বাধীনতা দিয়েছিলেন ধর্মপ্রচারের। অশোকের মেয়ে সংঘমিত্রার বৌদ্ধধর্ম প্রচারের সিংহল যাত্রা বহির্বিশ্বে পা দেওয়া একটি যুগান্তকারী ঘটনা। 
     বৈদিক ব্রাহ্মণ্য শ্রেণির ঘোর দুর্দিন দেখা দিল। তখন বুদ্ধের ত্রিপিটক ও ধম্মপদকে সামাল দিতে,ব্রাহ্মণ্য শ্রেণি তাঁদের দুর্দিন ঘোচাতে শ্রীমদভাগ্বত গীতার শ্রীকৃষ্ণ ও উপনিষদের জ্যোতির্ময় পরমপুরুষকে আশ্রয় করে হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারে নামলেন। বুদ্ধ তখন চুপ করে থাকলেন। বুদ্ধের তিরোধান ঘটলে বুদ্ধের শিষ্য সম্প্রদায় ক্রমে মত ও পথ নিয়ে সহজযান ও হীনযান হয়ে ভাগাভাগি গেলেন- সহজযান ও হীনযানরূপে। বুদ্ধের তিরোধানের পর ক্রমে বৌদ্ধধর্মের পালে হাওয়ার টান এল। আবার সনাতন ব্রাহ্মণ্যধর্মের পুনঃরুজ্জীবনের সুযোগ ধীরে ধীরে গড়ে উঠল।
      তা সম্ভব হয়েছিল কুমারিল ভট্টের সৌজন্যে। শ্রীভট্ট বৈদিক ব্রাহ্মণ্য ধর্মের পুনঃরুজ্জীবন ঘটালেন তাঁর বৈশেষিক গ্রন্থ 'শ্লোকবর্তিকা' ও 'তন্ত্রবর্তিকা' দিয়ে।
 *বৌদ্ধধর্ম ও কুমারিল ভট্ট* :-
       কুমারিল ভট্ট (৭০০খ্রিঃ) ছিলেন ঘোরতর বুদ্ধ ও বৌদ্ধধর্ম বিদ্বেষী। জৈন বিরোধীও। উভয় ধর্ম বেদ-বিদ্বেষী ছিল বলে। 
        কুমিরিল ভট্ট ছিলেন দক্ষিণী বৈদিক ব্রাহ্মণ। পরম বেদানুরাগী। বুদ্ধের প্রতি বিদ্বেষের কারণ বুদ্ধ বেদজ্ঞানে জ্ঞানী হয়েও বেদ মানেননি বলে।
  যৌবনে শ্রীভট্ট নালন্দা বৌদ্ধবিহারে এসেছেন ন্যায়শাস্ত্র পড়তে। তাঁর গুরু ছিলেন আচার্য ধর্মপাল। একদিন ধর্মপাল শাস্ত্র ব্যাখ্যা করতে গিয়ে ভয়ঙ্কর বেদ নিন্দায় মুখর হলেন। তাই শুনে কুমারিল ভট্ট কাঁদতে লাগলেন। শেষে সহ্য করতে না পেরে বলে উঠলেন- "...বুদ্ধ বেদ জানা সত্ত্বেও বেদ মানেননি,একে চৌর্য ছাড়া আর কি বলা যায়?" তাই শুনে ধর্মপাল একেবারে ক্রোধে অগ্নিশর্মা। আর ধর্মপালের শিষ্যেরা তৎক্ষণাৎ কুমারিলকে হিড় হিড় করে টানতে টানতে ছাদে নিয়ে এসে ধাক্কা মেরে ফেলে দিলেন। অহিংস পৃজারী যাঁরা,তাঁরাই ধর্মান্ধতায় মত্ত হয়ে উঠলেন। কুমারিল তখন নীচে পড়তে পড়তে বলতে থাকেন- "বেদ যদি অভ্রান্ত হয়,তাহলে আমার শরীর যেন অক্ষত থাকে।" অত উঁচু থেকে পড়ে কুমারিল অক্ষত থাকলেন। তবে একটা চোখ নষ্ট হয়েছিল। তখন কুমারিল বললেন বেদ অভ্রান্ত। প্রতিপক্ষের প্রশ্ন তাহলে চোখ গেল কেন? 
    তখন কুমারিলের উত্তর ছিল, "বেদ যদি ...", 'যদি' —এই সংশয় বাক্য বলার জন্য শুধু চোখ হারাতে হল। কুমারিলের এই দৈবশক্তির প্রভাব দেখে ধর্মপালের শিষ্য সম্প্রদায় সকলে একে একে পালিয়ে বাঁচলেন।
        এবার সময় এল কুমিরিলের বৈদিক ব্রাহ্মণ্যশ্রেণীর হৃতগৌরব পুনরুদ্ধারের। কুমিরিলের জন্যই ক্রমে বৌদ্ধ সম্প্রদায়ের কোণঠাসা অবস্থায় পড়তে হতে লাগল। তর্ক যুদ্ধে কুমারিলের সঙ্গে বৌদ্ধরা পেরে উঠছেন না। এক বৌদ্ধগুরুতো বলেই ফেললেন- "আমি বিচারে পরাজিত হইয়াছি বটে কিন্তু আমি বেদকে স্বীকার করিব ন। তারচেয়ে বরং প্রাণত্যাগ করিব।" জৈন ধর্মসম্প্রদায়ও কুমারিলের কাছে তর্ক যুদ্ধে পেরে উঠলেন না। ধর্মে,ধর্মে (বৌদ্ধ, জৈন, ব্রাহ্মণ্য) বিদ্বেষ চরমে ওঠে। কেউ কারো ঘাটে জল খায় না। একে অপরের প্রবল প্রতিদ্বন্দ্বী। বৌদ্ধধর্মের সিদ্ধাচার্যগণ ব্রাহ্মণ্যশ্রেণি সম্পর্কে জোর প্রচার করতেন, ব্রাহ্মণরা বেদের অর্থ বোঝে না। শুধু মন্ত্র পড়ে, আগুনে ঘি ঢালে,ধোঁয়ায় চোখ জ্বালা করে। মানুষকে কেবল ধাঁধা দেয়। বৌদ্ধরা জৈন সন্ন্যাসীদের সম্পর্কে বলেন, শুধু নগ্ন হলেই মুক্তি ঘটে না,তাহলে সর্বাগ্রে কুকুর শেয়ালের মুক্তি ঘটত। সে ধর্মে ধর্মে এতো প্রবল বিদ্বেষ যে সাধারণ মানুষের অবস্থা বড়ই শোচনীয়। কাকে ধরেন,কাকে ছাড়েন এই নিয়ে প্রবল দ্বিধা।
  সে যাই হোক কুমারিল ভট্টের জনপ্রিয়তার কাছে কি বৌদ্ধধর্ম, কি জৈন ধর্ম পথে বসার অবস্থা হল। সাধারণ মানুষ আবার ব্রাহ্মণ্যধর্মের দিকে দলে দলে ভিড়তে থাকলেন। আবার বৈদিক সাহিত্যের ঐতিহ্যে মানুষের আস্থা ফিরে এল। কুমারিল যাগযজ্ঞাদি ও তার শুভ ফল প্রদর্শন করে বৈদিক ধর্মের প্রতি সমানে আস্থা ফিরিয়ে আনলেন। তাঁর অক্লান্ত প্রচেষ্টায় আবার বেদ বেদান্তের পঠনপাঠন পুনরায় শুরু হল। একসময় বৈদিক ব্রাহ্মণ্যধর্ম আর ফিরে আসা অসম্ভব যেভাবে মনে হচ্ছিল,কুমারিল ভট্ট একপ্রকার সেই অসম্ভবকে সম্ভব করে তুলেছিলেন। 
 কুমারিল ভট্ট বেদের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন মীমাংসা দর্শন দিয়ে। মীমাংসা দর্শন প্রণেতাদের বলা হয় মীমাংসক। এই মীমাংসকগণের প্রধান ছিলেন কুমারিল ভট্ট। 
      মীমাংসকগণের মত হল বেদের সম্পূর্ণ শক্তির দুটি ভাগ- একটি আস্তিক্য দর্শন, অপরটি নাস্তিক্য দর্শন। আস্তিক্য দর্শনের ছ'টি ভাগ। নাম ষড়দর্শণ। এই ষড়দর্শণের একটি হল মীমাংসা। মীমাংসা দর্শন বেদের ব্যাখ্যা সুস্পষ্ট করে। মীমাংসা দর্শনে দক্ষ হলে তবেই বেদান্ত বুঝতে সহজ হয়। তাই  মীমাংসা দর্শন সর্বোচ্চ মানের খুব শক্তিশালী বলে মীমাংসকগণ মনে করতেন। কেউ যদি মীমাংসকগণদের তর্ক যুদ্ধে হারিয়ে দিতে পারতেন,তখন স্থির হয়ে যেত  জগতের যত দর্শন আছে তিনি সবাইকে হারিয়ে দিলেন। 
  মীমাংসকগণদের তর্ক যুদ্ধে হারানোর জন্য এগিয়ে এলেন শঙ্করাচার্য। মীমাংসকগণের প্রধান কুমারিলের সঙ্গে তর্ক যুদ্ধের জন্য মনস্থির করলেন শঙ্করাচার্য। তাঁর দেখা কাশীতে পেলেন। কুমারিল তখন কাশিতে তূষের আগুনে আত্মাহূতি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত। আত্মাহূতি দেবেন কারণ তাঁর মধ্যে প্রবল অনুশোচনা জেগেছে- নিজের ধর্ম (বৈদিক)ত্যাগ করে বিধর্মী বৌদ্ধ হয়েছিলেন, বৌদ্ধধর্মকে জানার জন্য। বৌদ্ধধর্মের সারাবত্তা জানার পর বৌদ্ধধর্মের অসারতা প্রমাণ করেন। আর নিজ ধর্ম ত্যাগের পাপ থেকে মুক্তির জন্য তিনি তুষাগ্নিতে আত্মাহূতি দিয়ে তিলে তিলে নিজেকে শেষ করতে চান। ঠিক সেই সময় বৈদান্তিক সন্ন্যাসী শঙ্করাচার্য এলেন কুমারিলের কাছে তর্ক যুদ্ধের প্রস্তাব নিয়ে। তখন কুমারিল ভট্ট বললেন- "আমার তো এই অবস্থা দেখছ। আমি তো এখন পুড়ছি। এই অবস্থায় তোমার সাথে কী প্রকারে তর্ক করি। তার চেয়ে বরং মিথিলাতে আমার শিষ্য আছে,নাম মন্ডন মিশ্র,তুমি তাকে তর্ক যুদ্ধে হারাতে পারলে আমাকেই হারানো হবে।"
 শঙ্করাচার্য কাশীতে কুমারিলের মৃত্যু পর্যন্ত অপেক্ষা করতে লাগলেন। কুমারিলের মৃত্যু হলে সুষ্ঠুভাবে পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন করে মিথিলার উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন।

  *শঙ্করাচার্য ও বেদান্ত*-
     শঙ্করাচার্য(৭৮৮- ৮২০) মিথিলায় মন্ডন  মিশ্রের সঙ্গে দেখা করলেন। এবং মনের ইচ্ছের কথা বললেন। মন্ডন মিশ্রের ভাবধারা ছিল একজন গৃহস্থের জীবন একজন সন্ন্যাসীর জীবনের চেয়ে অনেক বেশি শ্রেয়। এ হেন ভাববাদী মীমাংসকের সঙ্গে শঙ্করাচার্য চান তর্ক যুদ্ধ করতে। তর্ক যুদ্ধ এই অল্প বয়সের এক বালকের সঙ্গে! বালককে তুচ্ছ মনে হল।
        তর্ক যুদ্ধের বিষয় হল জ্ঞাণকান্ড ও কর্মকাণ্ডের মধ্যে কোনটি বড়। আর তর্ক যুদ্ধের বিচারক মন্ডন মিশ্রের স্ত্রী উভয়া ভারতী। একজন নারী বিচারকের আসনে - সমাজে নারীর স্থান কত উচ্চ এ তারই প্রমাণ। দুই সপ্তাহের শেষে মন্ডন মিশ্র হার স্বীকার করলেন। কিন্তু স্ত্রী উভয়া ভারতী স্বামীর এই হার মানতে পারলেন না। বেজায় ক্ষিপ্ত। তখন তিনি নিজেই শঙ্করাচার্যকে তর্ক যুদ্ধে আহ্বান জানালেন। তর্ক যুদ্ধে অংশগ্রহণ করে উভয়া দেবী শঙ্করাচার্যকে কামশাস্ত্র নিয়ে একের পর এক প্রশ্নবাণে জর্জরিত করতে লাগলেন। শঙ্করাচার্য কামশাস্ত্রের তো কিছুই জানেন না। মাত্র আটবছরেই বেদ পড়ে শেষ করেছেন, তার পরেই সন্ন্যাস নিয়েছেন। একে তিনি কুমার। তার উপর সন্ন্যাসী। স্ত্রীলোকের মনের জগত,কামশাস্ত্র বিষয়ে জানা অসম্ভব। তাই শঙ্করাচার্য পনর দিন সময় চেয়ে নিলেন।
  এই সময় শঙ্করাচার্য কামশাস্ত্রে অভিজ্ঞতার জন্য এক অদ্ভূত পদ্ধতির আশ্রয় নিলেন। যার নাম 'পরকায়া প্রবেশ শিল্প'। এটি কেমন ব্যাপার!
    শঙ্করাচার্য নিজের আত্মাকে শরীর থেকে বের করে এক মৃত রাজার শরীরে প্রবেশ করালেন। সেই রাজার দুই স্ত্রী। তাদের সঙ্গে কামকলা নিয়ে আলোচনায় রত হন। তাদের কাছ থেকে একে একে যৌনজীবনের যা কিছু জানার সব জেনে নিলেন। সমস্ত উত্তর জেনে মৃত রাজার শরীর ছেড়ে বেরিয়ে এলেন। আশ্রয় নিলেন নিজের শরীরে। আর কামশাস্ত্রে তখন শঙ্করাচার্য একেবারে সকল প্রকার জ্ঞানের অধিকারী।
    আবার শুরু হল উভয়া ভারতীদেবীর সঙ্গে তর্ক যুদ্ধ। এবার আর ভারতীদেবী শঙ্করাচার্যের  সঙ্গে তর্ক যুদ্ধে এঁটে উঠতে পারলেন না। অবাক হয়ে ভাবতে লাগলেন,যুবকটি কামশাস্ত্রেও অগাধ পান্ডিত্যের অধিকারী। অচিরেই ভারতীদেবীও পরাস্ত হলেন। উভয়ে স্বামী ও স্ত্রী মিলে শঙ্করাচার্যের শিষ্যত্ব গ্রহণ করলেন। মন্ডন মিশ্র সুরেশ্বরাচার্য নামে নতুন নাম গ্রহণ করলেন।
  শঙ্করাচার্য অদ্বৈতবাদী বৈদিক ব্রাহ্মণ। বেদান্তবাদীও। তিনি আবার সর্বেশ্বরবাদে বিশ্বাসীও ছিলেন। তাঁর মতে মানুষের সত্যিকারের সত্ত্বা আত্মা হল শুদ্ধ চৈতন্য এবং পরম সত্য ব্রহ্মও শুদ্ধ চৈতন্য। উপনিষগুলির একটি সামগ্রিক ব্যাখ্যাদাতা হল বেদান্ত। শঙ্করাচার্য কেবল বেদান্তের ব্যাখ্যা দাতা। প্রবর্তক নন। পূর্ববর্তী মতগুলিকে শঙ্করাচার্য সুসংবদ্ধ করেছিলেন মাত্র। উপণিষদ,ভগবদ্গীতা ও ব্রহ্মসূত্র এই তিনের যোগসূত্রের ভিত্তি হল বেদান্ত। তাই দিয়ে হিন্দুধর্মকে সঠিক দিশা দেখান। আর তা ফলপ্রসূ করতে চার প্রান্তে চারটি মঠ স্থাপন করেছিলেন। এই চারটি মঠ হল ,শৃঙ্গেরী( কর্ণাটক),দ্বারকা(গুজরাত),পুরী( উড়িষ্যা),যশীমঠ( উত্তরাখন্ড)। এই বেদান্তের অনেক শাখা - দ্বৈতবাদ, অদ্বৈতবাদ, বিশিষ্টাদ্বৈতবাদ,অচিন্ত্যভেদাভেদ প্রভৃতি।

   *ধর্মের ক্ষেত্রে রাজনৈতিক ও আঞ্চলিক প্রভাব* :-
        আবার ব্রাহ্মণ্য শ্রেণি পুনঃরুজ্জীবিত হল গুপ্ত রাজাদের পৃষ্ঠপোষকতায়। তাঁরা আবার উচ্চপদে আসীন হতে লাগলেন। গুপ্তযুগে প্রথম হিন্দু মন্দির স্থাপিত হয়। ইতিমধ্যে খ্রীষ্টপূর্ব দু'শতক থেকে যে পৌরাণিক যুগ শুরু হয়েছিল,তা থেকে সময়ের সাথে সাথে পুরাণগ্রন্থ আঠারোটি,উপপুরাণ ছত্রিশটি রচিত হয়। আর বৈদিক যুগের তেত্রিশ দেবতা তেত্রিশ কোটিতে ঠেকে। ইন্দ্র, বরুণ, মিত্র,বিষ্ণু,শিব প্রমুখ। আর মাতৃশক্তি হিসেবে এলেন চন্ডী,দুর্গা,কালি...। শ্রেষ্ঠ পুরাণের স্বীকৃতি পেল ভাগবত। ভাগবতের পুরুষ সচ্চিদানন্দ হলেন জগতের সার। ব্রাহ্মণ্য শ্রেণির এ থেকেই গুরুত্ব আরোপ জোরদার হল। গুপ্তযুগে বৈদিক ব্রাহ্মণ্য শ্রেণির প্রাধান্য সর্বাধিক পর্যায়ে উন্নীত হয়।
   আবার এই গুপ্ত সাম্রাজ্যের পতনের পর রাজনৈতিক ক্ষমতার বিকেন্দ্রিকরণ ঘটল। ক্রমে সামন্ততান্ত্রিক ব্যবস্থার মাধ্যমে দেশ চালিত হতে থাকল। ছোট ছোট রাজ্যগুলি বড় রাজ্যগুলির আশ্রিত হয়ে চালিত হতে থাকল। এর প্রভাব ধর্মীয় ক্ষেত্রে পড়ল। অর্থাৎ ধর্মীয় ক্ষেত্রে আঞ্চলিক প্রভাব প্রাধান্য পেল। প্রথাসর্বস্ব হিন্দুধর্ম ব্রাহ্মণ্যশ্রেণীর আবার ক্ষমতা বিকেন্দ্রিকরণ হতে লাগল। সেনযুগ পর্যন্ত  বাল্যবিবাহ, কৌলিণ্য প্রথা, সতীদাহ প্রথাসর্বস্ব ব্রাহ্মণ্য শ্রেণির দৌরাত্ম্য দিনকে দিন বাড়তে থাকল। তার হাত থেকে মানুষ স্বস্তি পেতে এল গ্রামীণ ভক্তিবাদ,তন্ত্রবাদ,আউল,বাউল,পীর-ফকির-দরবেশ প্রভৃতি সন্তসাধকদের ভক্তিবাদী শাখা। সুফিবাদের হাত ধরে সন্তধারা। হিন্দুধর্মের বিধিবিধানের হাত থেকে রেহাই পেতে ইসলাম ধর্ম  স্বেচ্ছায় কেউ নিল,কাউকে বা বল প্রয়োগ করে ধর্মান্তরিত করা হয়েছিল। শ্রীচৈতন্য উদার মানবতাবাদের হাত ধরে হিন্দুধর্ম ও ইসলাম ধর্মের মধ্যে সম্প্রীতি রক্ষা করেছিলেন। তথা রক্ষিত হয়েছিল।
   এদিকে হিন্দুধর্মের পৌরাণিক যুগের গুরুবাদ ও ভক্তিবাদ ক্রমে অন্যতম পীঠস্থান হল কর্ণাটক। তা থেকে পৌঁছে যায় গুজরাত ও মহারাষ্ট্রে। অবশেষে কায়েম হল বৃন্দাবনে। ভক্তিবাদের প্রথম গুরু রামানন্দ। তিনি ব্রাহ্মণ। পরে গুরুদের মধ্যে প্রসিদ্ধ লাভ করলেন কবীর নামে এক জোলা,দাদু নামে এক ধুণি, রুইদাস নামে এক চামার। সপ্তদশ শতাব্দীতে এসে ঠেকল কেউ কেউ জন্ম সূত্রে হিন্দু ও কেউ কেউ মুসলমান সন্তসাধক। সকলেই জাত পাত ও পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে লাগলেন। রাজা রামমোহন রায়ের এই পৌত্তলিকতার বিরোধিতায় আধুনিক ভাবনার ফসল ফলেছিল। শ্রীচৈতন্য ছিলেন ষোড়শ শতাব্দীর নবজাগরণের পুরোধা-পুরোহিত, আর রামমোহনকে ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের পুরোধা-পুরুষ বলা হয়। বেদান্তবাদী শঙ্করাচার্যের তিনি ছিলেন সার্থক উত্তরসুরী। সেই রামমোহনকে পৌত্তলিকতা বিরোধিতায় এবার খুঁজে নিতে চাই।

  *হিন্দু ব্রাহ্মণ্য শ্রেণি ও রামমোহন*:-
           ন'-দশ বছর বয়সে রামমোহন রায় বিহারের পাটনায় প্রেরিত হন আরবী ও ফারসী ভাষা শিখতে। সেখানে পনর-ষোল বছর বয়স পর্যন্ত থেকে এই দুই ভাষায় অসাধারণ ব্যুৎপত্তি লাভ করেন। এই সময় কোরান পাঠ করে হিন্দুদের প্রচলিত পৌত্তলিকতার প্রতি তাঁর অশ্রদ্ধা জন্মে। ষোল বছর বয়সে পৌত্তলিক প্রণালী দোষ কীর্তন করে পারসীতে একখানি বই লিখেছিলেন। রামমোহনের এই সব কর্মকাণ্ডের জন্য পিতা রামকান্তের সঙ্গে মতান্তর থেকে গৃহত্যাগ করলেন। সন্ন্যাসী ফকিরের সাথে দেশভ্রমণ করতে করতে অবশেষে তিব্বতে পৌঁছে যান। আর সেখানেই বৌদ্ধদের কুসংস্কার ও পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ করতে গিয়ে প্রাণহানির কোপে পড়েন। শেষে কয়েকজন তিব্বতী মহিলাদের সাহায্যে সে যাত্রায় রক্ষা পান ও স্বদেশে পালিয়ে আসতে বাধ্য হন। আরবী,ফারসী ও সংস্কৃত ভাষা শিক্ষা ইতিপূর্বে সম্পন্ন করে অগাধ ব্যুৎপত্তি অর্জন করেন। তিব্বত থেকে দেশে ফিরে ইংরেজী ভাষায় যথেষ্ট দক্ষতার পরিচয় দেন। 
  জ্ঞানের প্রস্তুতি শেষ করে এবার তা প্রয়োগ না ঘটালে কীসের জ্ঞান লাভ!  ১৮১৪ খ্রীষ্টাব্দে মানিকতলা লোয়ার সার্কুলার রোড থেকে শুরু করলেন কুসংস্কার ও পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে প্রচার। রামমোহন তাঁর নিজস্ব ভাবনা প্রতিষ্ঠার জন্য চারটি পদক্ষেপ নিলেন- (১)কথোপকথন ও বিতর্ক (২) স্কুল প্রতিষ্ঠা ও শিক্ষাদান (৩) পুস্তক রচনা (৪) সভা-সমিতির সংগঠন। 
    আরবীয় মোতাজল সম্প্রদায়ের যুক্তিবাদ,ইউরোপীয় অষ্টাদশ শতাব্দীর দার্শনিকগণের একাংশের মতামত,আর বেদান্তের শ্রুতি,স্মৃতি,জৈমিনি সূত্র, গীতা,পুরাণ,পঞ্চম বেদ মহাভারত,একে একে উপনিষদগুলির বঙ্গানুবাদ করতে থাকলেন। ১৮১৫ খ্রীষ্টাব্দে 'আত্মীয়সভা' গড়লেন। এই সভা ছিল বেদান্ত চর্চার প্রাণকেন্দ্র। শহরের অনেক বিত্তবান বিশিষ্ট মানুষজনের নিত্য যাতায়াত ছিল এই সভায়। তাঁরা সভার সদস্য ছিলেন। সভায় শাস্ত্রীয় বিচারাদি জোর কদমে চলত। সাথে সাথে রামমোহন একেশ্বরবাদ নিয়ে ১৮১৫ থেকে ১৮২০-র মধ্যে বেদান্ত দর্শনের অনুবাদ 'বেদান্তসার'(১৮১৫), 'কেন' ও 'ঈশোপণিষদ'(১৮১৬) -এর অনুবাদ করেন। এছাড়াও কঠ,মূন্ডক ও মান্ডূক্যোপণিষদের অনুবাদ, হিন্দু একেশ্বরবাদ নিয়ে ইংরেজী ও বাংলাতে একের পর এক গ্রন্থ রচনা করতে লাগলেন। আর সতীদাহ প্রথা বিলোপ নিয়ে গ্রন্থ রচনা করে গোটা পণ্ডিতসমাজকে ক্ষেপিয়ে তুললেন।
  ১৮১৯ খ্রীষ্টাব্দে মাদ্রাজ প্রদেশের শাস্ত্রবীদ পন্ডিত সুব্রহ্মণ্য শাস্ত্রী কলকাতায় এসে দম্ভের সঙ্গে বললেন- "বঙ্গদেশে বেদান্ত ব্রাহ্মণ নাই,এজন্য রামমোহন রায় বেদ-বেদান্তের দোহাই দিয়ে যাহা ইচ্ছা তাহা বলিতেছেন ...."। তিনি রামমোহনকে কঠিন চ্যালেঞ্জের মধ্যে ফেলতে পৌত্তলিকতার সপক্ষে রামমোহনের বিরুদ্ধে বিতর্কে অংশগ্রহণের আহ্বান জানালেন। সেই মত বিতর্ক সভা আয়োজিত হল বিহারীলাল চৌবে নামক এক উত্তর পশ্চিমাঞ্চল দেশীয় ব্রাহ্মণের বাড়িতে। উদ্যোক্তা প্রধান সমাজপতি রাধামোহন দেব। এই খবর শুনে সভায় লোকেলোকারণ্য। উপস্থিত দেশের সব নামজাদা পন্ডিত। ব্রহ্মজ্ঞাণী রামমোহনকে হারাতে হবে। একদিকে রামমোহন ও তার দলবল। অন্যদিকে সুব্রহ্মণ্য শাস্ত্রী মহাশয়ের সঙ্গে রাধাকান্তদেব ও তার সাঙ্গপাঙ্গ। শাস্ত্রী ম'শাই শুরুতেই বাঙালির কৌলিণ্য নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিলেন- "বঙ্গদেশে সদব্রাহ্মণই নেই। তাই এখানে বেদ পাঠই উচিত নয়।" এই শুনে গোটা সভাস্থল কিছুক্ষণের জন্য স্তব্ধ হয়ে গেল। শেষে তুমুল বাকযুদ্ধে শাস্ত্রীয় বিচারের পর শাস্ত্রী মহাশয় রামমোহনের কাছে হার স্বীকার করলেন। শাস্ত্রীমহাশয়  মানতে বাধ্য হলেন নিরাকার ব্রহ্মোপাসনাই শ্রেষ্ঠ উপাসনা।
        কিন্তু গোঁড়া হিন্দু পণ্ডিতসমাজ এই হার স্বীকার অন্তর থেকে মেনে নেননি। রামমোহনের বেদান্ত লেখালেখির জন্য যশোরে ওলাউঠা রোগের প্রকোপ দেখা দেওয়ার ঘৃণ্য অপবাদ পর্যন্ত রামমোহনের উপর অক্লেশে চাপিয়ে দেন পণ্ডিত সমাজ। কিন্তু রামমোহন পিছু হটার নন। ধর্মসমন্বয়ের একেশ্বরবাদ ও সেই সম্পর্কিত বইগুলি তাঁর কাছে যেন ব্রহ্মাস্ত্র হয়ে উঠল।
  সেই সঙ্গে পাশাপাশি আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা ঘটল। তিনি যেন ঘটনার স্রষ্টা। কী সেই  ঘটনা?
     ১৮২৩ খ্রীষ্টাব্দে কমিটি অব পাবলিক ইনস্ট্রাকশন নামে একটি কমিটি স্থাপিত  হয়। এই কমিটি প্রাচ্য শিক্ষার জন্য এক লক্ষ টাকা বরাদ্দ করল। সংস্কৃত কলেজ স্থাপনের সিদ্ধান্ত হল। সংস্কৃত,আরবী,ফার্সী ভাষা শিক্ষার জোর তৎপরতা শুরু হল।তখন রামমোহন এহেন সিদ্ধান্তের প্রতিবাদ করে তদানীন্তন গভর্নর জেনারেল লর্ড আমহার্স্ট বাহাদুরকে পত্র লিখলেন। পত্রে দাবী করলেন শুধু প্রাচ্য শিক্ষাদান নয় পাশাপাশি এদেশীয়দিগকে ইংরেজী ভাষা ও জ্ঞান বিজ্ঞান না দিলে  জাতীয় জীবনের উন্নতি হবে না। এই নিয়ে রাজপুরুষদের দল ও দেশীয় বড়লোকগণ দুটি দলে ভাগ হয়ে গেলেন। রাজপুরুষগণ প্রাচ্য শিক্ষার পক্ষে- যা প্রাচীন তার সবটাই ভাল। অপর দল বলতে লাগলেন প্রাচীন সবই মন্দ। যা কিছু প্রতীচ্চ তার সবটাই ভাল। প্রথম দলে রাধাকান্তদেব ও তাঁর দলবল। আর দ্বিতীয় দলে নব্যশিক্ষিত শ্রেণি,যাঁরা রামমোহনের পক্ষে। শেষে এই দ্বিতীয় শ্রেণির জয় হল।
  রামমোহনের ঠিক এর পরেই পদক্ষেপ সতীদাহ প্রথার বিরোধিতা করা। তিব্বতে মরণাপন্ন রামমোহনকে সেদিন একদল তিব্বতীয় মহিলা বাঁচিয়েছিলেন কট্টর বৌদ্ধ লামাদের হাত থেকে। সেই থেকে নারীসমাজের যেখানে যত অত্যাচার সেখানে তিনি জোর সওয়াল করতেন। বাংলার বুকে নারীসমাজের জন্য এক নৃশংস প্রথা- ধূ ধূ করে জ্বলছে আগুন, নিথর স্বামীর সঙ্গে জ্যান্ত স্ত্রীকে বেঁধে রাখা হয়েছে। তার আর্তনাদ ধামাচাপা দিতে কাড়া-নাকাড়া, ঢাক,ঢোলের গগণ বিদারী শব্দ ছুটছে সহমরণের জন্য স্ত্রী যাতে পালাতে না পারে। সেই জন্য বুকের উপর বাঁশ চেপে রেখে দাঁড়িয়ে থাকে দু'দিকে যমদূত চেহারার ষন্ডামার্কা মানুষ। চোখের সামনে এসব দৃশ্য সহ্য করা কি যায়! বিলোপ করতে হবে। এজন্য বাধা নিতান্ত কম আসবে না। তা বলে থেমে থাকা কি যায়! নিজের ঘরও যে সেই নৃশংসতার বলী- ১৮১০-এর ৮ এপ্রিলে। রামমোহনের নিজের বাড়িতে ঘটেছিল সহমরণ - রামমোহনের বড় ভাই জগমোহনের দ্বিতীয় স্ত্রী অলকমণির সহমরণ ঘিরে। সেই দিনই  রামমোহন প্রতিজ্ঞাবদ্ধ হলেন এই প্রথা তিনি রদ করবেন একদিন না একদিন। ১৮১৯ এ সরকারের কাছে আবেদন পত্র দিয়ে আবার শুরু। ১৯২৩ এ পুলিশের একটি বিজ্ঞাপনে ৫৭৫ জন সতীদাহের উল্লেখ পাওয়া যায়। তার মধ্যে ৩২ জনের বয়স ২০ বছরের নীচে। ২০৮ জনের বয়স ২০ থেকে ৪০ এর মধ্যে। এই তথ্য থেকে আন্দোলন ১৯২৫ এ চরম আকার লাভ করে। আর রামমোহনের জোর সওয়াল- "বিধবার পুনর্ব্বার বিবাহ উচিত।" দুই জুজুধান পক্ষের বাদ বিবাদের সে লড়াই বলতে লড়াই! শেষে শেষ হাসিটিও রামমোহনের জন্য অপেক্ষায় ছিল। জয়ী হলেন রামমোহন। ১৯২৯ এর ৪ ডিসেম্বর বড়লাট লর্ড বেন্টিং সতীদাহ প্রথা রদ করলেন। আবারও গোঁড়া ব্রাহ্মণ্য পন্ডিত সমাজের  পরাজয়। 
     বাংলাদেশে বৈদিক বেদান্তের রামমোহন শঙ্করাচার্যের উত্তরসুরী। এর পরে আসবেন স্বামী বিবেকানন্দ। রামমোহনকে বলা হয় বেদান্তের আধুনিক রূপকার,পৌত্তলিকতার বিরুদ্ধে নব বৈদান্তিক হিন্দুত্বের হোতা। বেদান্তের শঙ্করাচার্যের সার্থক উত্তরসুরী।
                       ******** 
       # তথ্য ঋণ স্বীকার:-
     ১। বৌদ্ধদর্শণ ও নারীসমাজ।
     ২। কুমারিল ভট্ট ও মীমাংসাদর্শণ।
     ৩। শঙ্করাচার্য ও বেদান্তদর্শণ।
     ৪। রামতনুলাহিড়ী ও তৎকালীন বঙ্গসমাজ - শিবনাথ শাস্ত্রী।
    ৫। রামমোহন রচনাবলী।
    ৬। রামমোহন ও তৎকালীন সমাজ ও সাহিত্য  - প্রভাতকুমার মুখোপাধ্যায়।

  # কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস। 
                    **********

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...