রবিবার, ৩০ মে, ২০২১

"ছোটগল্প"–"অবসরের সঙ্গী"…

#নির্বাচিত_ছোটগল্প_৬📚
#অবসরের_সঙ্গী🍂
#জয়_ঘোষ🖋️

|| ১ ||

"তোর এত ব্যস্ততা সৌরাংশু? গত একমাস লকডাউন চলাকালীন তুই আমাকে একবারও ফোন করিসনি! যতবার আমি করেছি ততবার তুই বলেছিস, পাপড়ি এখন ফোন রাখ আমি একটু পরে করছি। তোর মনে আছে সৌরাংশু, আগে যখন তুই আমার সঙ্গে কথা বলছিস কিভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যেত আমরা বুঝতেও পারতাম না! আর সেই তুই কিনা এখন সামান্য এই কটা দিনের লকডাউনে এতটা পাল্টে গেলি? এতটা পরিবর্তন কি সম্ভব সৌরাংশু?"- কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল পাপড়ি। 
তবে ফোনের ওপারে থাকা সৌরাংশু নতুনত্ব কিছুই না বলে আবার সেই একি কথা বলল,,এখন ফোনটা কাট আমি একটু পরে কল ব্যাক করছি। 
বেচারা পাপড়ি রাগে-দুঃখে অভিমানে ফোনটা ছুড়ে ফেলে দিলো দরজার দিকে। তৎক্ষণাৎ রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠল ওর মা,, তোর কী হয়েছে বলতো পাপড়ি? সব সময় এরকম মেজাজ তিরিক্ষি করে রেখেছিস! ভালো করে কথা বললে কথা বলিস না? সাতটা কথা জিজ্ঞাসা করলে একটা উত্তর দিস! আজকে ফোনটাও পর্যন্ত ভেঙে ফেললি।
পাপড়ি মায়ের কথার একটাও উত্তর না দিয়ে দরজা খুলে লিফট দিয়ে উঠে গেল ফ্ল্যাটের ছাদে। আকাশের ঐ সাদা মেঘের মধ্যে কালো মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখে পাপড়ির চোখ থেকে অঝোরে জল পড়তে থাকলো। চোখের সামনে ভাসতে লাগল সৌরাংশুর সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর কথা।

স্কুল জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়ে কলেজে ওঠার শুরুতেই সৌরাংশুর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল পাপড়ির। কয়েকটা মেয়ে বন্ধু ছাড়া আর তেমন কারো সাথে আলাপ ছিল না পাপড়ির নতুন কলেজে। 
তারপর পাপড়ি প্রথম যেদিন সৌরাংশুকে দেখল একবারের জন্য চোখের পাতা ফেলতে পারেনি। কি নিখুঁত ভাবে তৈরি ছেলেটা। রূপে-গুণে কিছুতেই খামতি নেই। ব্যবহারটাও অদ্ভুত সুন্দর। খুব সহজেই সকলকে আপন করে নিতে পারে সৌরাংশু, এমনটাই ভেবেছিল পাপড়ি। কলেজের প্রায় অর্ধেক মেয়েরই ক্রাশ ছিল সৌরাংশু। সব মেয়েরা সেটা প্রকাশও করতো। কিন্তু পাপড়ি কখনো এমনটা ভাবিনি সৌরাংশু কে নিয়ে। এই ভাবেই চলছিল বেশ কয়েকটা দিন। তারপর সেদিন কলেজ ফেস্টে প্রথম ভালো ভাবে আলাপ হলো পাপড়ির সঙ্গে সৌরাংশুর।

–এই পাপড়ি.. তোকে কিন্তু তুই বলেই ডাকছি। এক্ষুনি যেন আবার বলিস না,, হাউ ডেয়ার ইউ সে দ্যাট!
–নারে আমি এমন কথা বলবো না। ক্লাসমেট কে তুই বলে সম্মোধন করবি এতে আবার সাহসের কি আছে?
–বাব্বা শান্তি। সব সময় যেমন গম্ভীরমুখে থাকিস, আমিতো ভাবলাম বোধহয় তুই খুব রেগে যাবি...
–ছার। তো তুই বল তোর কথা !
–আমার কথা নতুন করে কি বলব বল? আজ ছ-মাস কলেজে আসার পর থেকে তো দেখছিসই আমাকে। তা তোকে কিন্তু আজ বেশ সুন্দর লাগছে।
–রিয়েলি?
–হ্যাঁরে। যেমন নাম নাম পাপড়ি, ঠিক তেমনি পোশাক গোলাপি শাড়ি। দাড়া একটা সেলফি তুলি তোর সঙ্গে। 

সৌরাংশু হট করে পাপড়ির ঘাড়ে হাত দিয়ে বলল,, একটু মিষ্টি করে হাসো বন্ধু!
সৌরাংশুর এমন ব্যবহারে পাপড়ির নরম মনের মধ্যে কোথাও একটা সৌরাংশুর প্রতি ভালোবাসা জন্মে ছিল সেদিন। এরপর থেকে ক্লাস চলাকালীন দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকত সব সময়। সৌরাংশু এটা সেটা নিয়ে ইয়ার্কি করত মাঝেমধ্যে চোখের ইশারাতেই।
তারপর সময় সময়ের মত চলতে থাকলো। কলেজ জীবনের অর্ধেকটা দিন পেরিয়ে গেল। আজ সৌরাংশু পাপড়ি অনেকটাই খোলামেলা ভাবে নিজেদের কথা নিজেদের বলতে পারে। যাকে বলে, বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে গেছে দুজনে।
তবে কেন এত দূরত্ব?

ভরা জ্যৈষ্ঠের গরমকে ঠান্ডা করতেই বোধহয় আজ বিকেলে একটু বৃষ্টি নামবে। হঠাৎই আকাশের গর্জনে সম্বিত ফিরল পাপড়ির। তারপর দুটো হাত দিয়ে চোখের জল মুছে নিজের মনে মনেই বিড়বিড় করে উঠলো,"তুই এতটা বদলে গেলি কি করে রে সৌরাংশু? আমি যে তোকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারছি না।"

|| ২ ||

"এই শোন অংশু আমার কিন্তু একদম ভালো লাগছে না। এত দিন হয়ে গেল অথচ তুই আমাদের রিলেশনশিপটা গোপনে রেখেছিস! তুই আজকে ফেসবুকে পোস্ট করবি, ইন এ রিলেশনশিপ উইথ সুস্মিতা চক্রবর্তী। আর আমারটাতে থাকবে সৌরাংশু মিত্র। ওহ কি সুন্দর লাগবে দেখতে!"-ফোনের ওপার থেকে ভিডিও কলে কথাটা বলল সুস্মিতা। 

"আরে আর কিছুদিন অপেক্ষা কর না। সময় তো আর পার হয়ে যাচ্ছে না। কয়েকদিন পরেই দেব"-সৌরাংশু বলল।

"মানে?? কিছুদিন কিছুদিন করে তো তিন মাস কাটিয়ে ফেললি!"

"আচ্ছা দাঁড়া, দেব আজকেই। তার আগে একটা কিস দে..."

"কোন কথা নয়। আগে যেটা বললাম সেটা কর"

"ওকে করছি।"

অঝোরে বৃষ্টিতে একটানা ভিজে ছাদ থেকে নেমে ঘরে গেল পাপড়ি। খেয়াল করল ফোনটা মা মেঝে থেকে তুলে চার্জে বসিয়ে রেখেছে। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে মুঠো ফোনটা হাতে নিয়ে সৌরাংশুর কললিস্টে গিয়ে দেখল লাস্ট এক মাস, মাত্র পনেরো থেকে কুড়ি সেকেন্ড কথা বলেছে দুজনে। মাস চারেক আগে এক ঘন্টা কুটি মিনিট দু ঘণ্টা দশ মিনিট এর রেকর্ডিং কল গুলোর হঠাৎই একটাতে আঙ্গুলের টার্চ লেগে বাজতে শুরু করলো,,

–ভুলে গেলে বন্ধু? কালকে তো একবারও ফোন করলি না পাপড়ি!
–আরে কাল একটু কাজ ছিল রে।
–রাখতো… তুই তোর কাজ। আমার সাথে কথা বলাটাও তো তোর একটা কাজের মধ্যেই পড়া দরকার নাকি!
–হুম...সেটা তো মাথায় আসেনি।
–তা আসবে কেন? সারাদিন ওই বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে রাখলে আমার কথা কি আর মনে পড়ে!! যাইহোক, আজ সন্ধ্যাবেলায় একটু বেরোবি দরকার আছে। 
–দরকার মানে? আজ সন্ধ্যাবেলায় আমাকে পড়াতে যেতে হবে।
–হ্যাঁ... পরিয়ে তুমি উদ্ধার করে দিচ্ছ! যেটা বললাম সেটা করবি। আসতে বলেছি আসবি। 

সৌরাংশু এমন ভাবেই পাপড়িকে প্রত্যেকটা ব্যাপারে জোর করত। তবে কিন্তু পাপড়ি কিছু মনে করতো না বরং এর থেকে সৌরাংশুর প্রতি পাপড়ির ভালোবাসা আরো দ্বিগুন বেড়ে যেত। তার থেকেই সৌরাংশুর উপর পাপড়ির একটা অধিকারবোধ জন্মেছিল। 
কলেজে যেদিন সৌরাংশু না যেতো পাপড়িকেও যেতে দিত না সেদিন। পাপড়ি জিজ্ঞাসা করলে সৌরাংশু বলতো,"আমি যাচ্ছি না যখন বেকার তুই কি করবি! তার থেকে যেদিন যাব একসাথেই যাব। আর যেদিন যাব না একদমই যাব না।"

দূর্গা পূজায় ঠাকুর দেখতে যাওয়া থেকে শুরু করে বড়দিনের ঘুরতে যাওয়া পর্যন্ত সমস্ত জায়গাতেই সৌরাংশু পাপড়িকে নিয়ে ঘুরতে ভালোবাসতো। পাপড়ি মাঝেমধ্যে ঠোঁট ফুলিয়ে বলত,"সব সময় যদি তোর সঙ্গে বের হয় তাহলে বাকি বন্ধুদের সাথে কখন ঘুরবো!" পরিবর্তে সৌরাংশু বলতো,"হুম... বাকি বন্ধু? নাটক? তোর আবার কটা বন্ধু আছে রে! শুধু তো আমিই আছি।"

পাপড়ি সৌরাংশুর এই 'আমিই আছি' কথাটা শুনে আহ্লাদে ডগোমগো হয়ে মনে মনে বলত, "হ্যাঁ শুধু তুইই থাক। তুই আমার পাশে থাকলে আমার আর কাউকে প্রয়োজন নেই। তোকে নিয়েই আমি নতুন করে শুরু করতে চাই সৌরাংশু..." 
মনে মনে বললে কি হবে মুখে কোনো দিনই এমনকি এখনও পর্যন্ত সৌরাংশু কে পাপড়ি বলতে পারিনি যে, "সৌরাংশু আমি তোকে ভালোবাসি"… 

রেকর্ডারটা থামিয়ে গ্যালারিতে গিয়ে সেবার দুর্গাপুজোর বেশ কিছু ছবি দেখে পাপড়ি মনে করার চেষ্টা করলো সপ্তমীর সেই সন্ধ্যাটার কথা।

–তোকে এত সুন্দর একটা জামা গিফট করলাম আর সেটা তুই পড়লি না সৌরাংশু? আমি কত আশা নিয়ে ছিলাম যে, আজ ওই পিংক কালারের শার্টটা তুই পরবি।
–এই তুই থাম তো। ওই পিঙ্ক শার্টটা পড়লে আমাকে পুরো লেডিস লেডিস লাগবে। তোরও যেমন পছন্দ!

নীরব পাপড়ি একটু অভিমান মিশ্রিত মুখ নিয়ে চুপচাপ দাড়িয়ে রইল। অনেকক্ষণ পাপড়ি কোনো কথা বলছে না দেখে চিৎকার করে উঠল সৌরাংশু।

–কিরে কোন কথা বলছিস না কেন? না পোষায় চলে যা...। এরকম ভ্যাবলার মত মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকিস না আমার চোখের সামনে। ওসব রাগ ফাক আমাকে দেখাতে আসবি না একদম। ছিলিস তো ওই কলেজে চুপচাপ পড়ে। কেউ তোর দিকে ফিরেও তাকাতো না। আমি তোর সঙ্গে কথা বলেছিলাম বলেই না তুই একটা ভালো বন্ধু পেলি। তাই এসব নাটক আমাকে দেখাতে আসিস না। 

সেই সপ্তমীর সন্ধ্যায় পাপড়ি আর ভালোভাবে হাসতে পারিনি। সেদিন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে ছিল ওরা। একদিন কোনো কথা বলিনি সৌরাংশুর সাথে। তারপর হঠাৎই পরের দিন ফোন করে সৌরাংশু। 

–এ তাড়াতাড়ি বেরো। একটু কলেজ স্ট্রিটে যেতে হবে কতগুলো বই কেনার আছে! 

পাপড়ি নিরব।

–কিরে কোন কথা বলছিস না কেন? যাবি কি যাবিনা পরিষ্কার করে বল। 

পাপড়ি ইচ্ছা করেই বললো,

– না রে আমার একটু কাজ আছে। আজ যেতে পারবো না।
–ঠিক আছে যেতে পারবি না তো! কথাটা মনে রাখিস। 

সৌরাংশু কে হারানোর ভয়ে একটু ভেবে পাপড়ি বলল, যাবো। 

তারপর সেদিনই সবকিছুই মিটমাট হয়ে গেছিল সৌরাংশুর সঙ্গে পাপড়ির। পাপড়ি সেদিনের পর থেকেই বুঝেছিল 'যার উপর সে অভিমান করেছে সে নিজেই তার অভিমান এর মান দেয় না। ফলে বেকার নিজে কষ্ট পেয়ে লাভ নেই'। তবে লাস্ট কয়েক মাসে সৌরাংশুর থেকে এতো অবহেলিত হয়ে পাপড়ি খুবই ভেঙে পড়েছে।

সবে সন্ধ্যে হল,, চারদিকে শঙ্খর ধ্বনি আর সুন্দর ধুনোর গন্ধে পাপড়ির মনটা একটু হালকা হলো। আর নিজের মনেই এটা ভেবে খুশি হলে যে,, আরতো মাত্র কয়েকটা দিন তারপরেই তো লকডাউন কেটে যাবে, তখন সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। সৌরাংশু আবার আগের মত হয়ে যাবে। তখন পাপড়ি বলবে নিজের মনের কথা সৌরাংশু কে। ফোনটা হাতে নিয়ে ফেসবুকটা অন করল পাপড়ি। তৎক্ষণাৎ স্ক্রিনে যে দৃশ্য টা দেখল তাতে হাতপা ঠক ঠক কাঁপতে থাকলো পাপড়ির।

|| ৩ ||

"হলো এবার তোর শান্তি! মাথা খারাপ করে দিচ্ছে একেবারে রিলেশনশিপ প্রচার করার জন্য।"-আলতো করে সুস্মিতা কে বলল সৌরাংশু। 

"শান্তি মানে চরম শান্তি।" একটু থেমে আবার বলল,,"সৌরাংশু তোকে একটা কথা বলব রে, অনেকদিন ধরেই বলব ভাবছি!!"

"হ্যাঁ বল"

"আমার না মনে মাঝেমধ্যে মনে হয় পাপড়ি কে ভালোবাসে!"

"এই একদম চুপ। এখন শুধু তোর আর আমার কথা। আর অন্য কেউ এর মধ্যে ঢুকবে না।"

"তাও আমার যেটা মনে হয় সেটা বললাম।"

"এই সুস্মিতা পাপড়ির ব্যাপারটা তোকে আমি ভালো করে বলছি শোন। কলেজে প্রথমে যখন ওকে আমি দেখলাম তখন মনে মনে ভাবলাম যে, খুবই সাধারন একটি মেয়ে... ওর সঙ্গে কোনো ছেলে কথা বলে না। চুপ চাপ থাকে। এমন কাউকেই তো আমার চাই যে, নীরবে আমার সব আব্দার সহ্য করবে। আমি যখন যেখানে যেতে বলবো সেখানে যাবে। আমার কথাই হবে তার কাছে শেষ কথা। আমার রোজকার জীবনে এমনই একজন কে দরকার ছিল যে আমার ব্যস্ত সময়ের সঙ্গী হবে। কিন্তু এখনতো আমি তোকে পেয়ে গেছি। ফলে আর আমার ওকে দরকার নেই। সত্যি কথা বলতে আমার যখন প্রয়োজন হয় তখনই আমার পাপড়ির কথা মনে পড়ে। আর এখন তো আমার হাতে অঢেল সময়... এখন খামোকা ওর সঙ্গে কথা বলে লাভ আছে! যখন দরকার পড়বে তখনই আবার কথা বলব। আমার সবসময়ের সঙ্গী তো এখন তুই সুস্মিতা" 

সৌরাংশুর কথাগুলো শেষ হতেই ফোনটা কেটে দিলো সুস্মিতা। 

অনেকক্ষণ মেয়েকে চুপচাপ থাকতে দেখে পাপড়ির মা বলল,, পাপড়ি এভাবে কি জীবন চলে? তোর কি হয়েছে আমাকে বলবি!
চোখের জল মুছে পাপড়ি বলল,, আজকের পর থেকে তোমার মেয়ে একদম স্বাভাবিক হয়ে যাবে মা। তুমি চিন্তা করোনা। আজ রাতে কিন্তু আমার স্পেশাল মেনু করবে চিলি চিকেন আর তোমার হাতে স্পেশাল ফ্রাইড রাইস। 
তারপর ধীর পায়ে আস্তে আস্তে ব্যালকনিতে গিয়ে বসলো পাপড়ি। একভাবে আকাশের দিকে চেয়ে থেকে বিরবির করে বলে উঠলো,, সৌরাংশু আজ থেকে তোকে আমি ভুলে যাব। হ্যাঁ আমি আমার মন থেকেই ঠিক করে নিয়েছি। একটু আগে যখন দেখলাম ফেসবুকে তোর সঙ্গে সুস্মিতার রিলেশনটা, তখন এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হয়েছিল, পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। কিভাবে এবার বাঁচবো আমি!! তবে এখন ভাবছি না, এটাই বোধহয় ভালো হলো। একটা মিথ্যে আশা নিয়ে আমি বসেছিলাম। তবে আজকের পর থেকে আর কোনো আশা নেই আর তোর প্রতি আমার কোনো প্রত্যাশাও নেই। তুই ভালো থাকিস। 

কেটে গেল দুমাস। কোনো কারন ছাড়াই এই কয়েক মাস যোগাযোগ নেই পাপড়ির সঙ্গে সৌরাংশুর। পাপড়ি মাঝেমধ্যে অভ্যাসবশত সৌরাংশু হোয়াটসঅ্যাপ এ গিয়ে দেখে লাস্ট সিন কখন। মাঝেমধ্যে ভাবে একটা ফোন করবে সৌরাংশুকে। কিন্তু করে না। পাপড়িও নিজের মনে ঠিক করে নিয়েছে যে, সৌরাংশু যতদিন না ওকে ফোন করছে ততদিন পাপড়ি নিজে থেকে সৌরাংশুর সঙ্গে কোন যোগাযোগ করবে না। 

রাতের খাবার খেয়ে জানালাগুলো বন্ধ করার সময় হঠাৎই ফোনের ভাইব্রেশন হতেই স্কিনের উপর সৌরাংশুর নামটা দেখে কেঁপে ওঠে পাপড়ির হাত। হঠাৎ করেই গা-হাত-পা কেমন ভারী হয়ে গেল পাপড়ির। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে ফোনটা ধরল,,

কিন্তু কোন কথা বলছে না সৌরাংশু। পাপড়িও বলছে না। শুধু দুজনের নিঃশ্বাস শোনা যাচ্ছে স্পিকারে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সৌরাংশু কাঁপা গলায় বললো,,

–পাপড়ি…
–হুম।
–কেমন আছিস?
–আমি খুব ভালো আছি। তুই?
–ভালো নেই রে। একদম ভালো নেই তোকে ছাড়া। 

কথাটা শোনার পরেই মাথাটা গরম হয়ে গেল পাপড়ির। যে ছেলে ফেসবুকে নতুন রিলেশনশিপের স্ট্যাটাস দিয়ে কয়েকশো কমেন্টের রিপ্লাই দিতে পারে। সে আজ আবার অন্য একটা মেয়েকে বলছে আমি তোকে ছাড়া ভালো নেই। রীতিমতো চিৎকার করে বলল,,

–ভালো নেই মানে? নাটক করছিস তুই আমার সাথে! তোরই তো এখন ভালো থাকার কথা সুস্মিতার সঙ্গে। 

পাপড়ির এমন ভারিক্কি কণ্ঠস্বর শুনে চোখের থেকে জল পড়তে থাকল সৌরাংশুর। তারপরে আস্তে আস্তে বলল,,

–পাপড়ি আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি তোকে শুধুমাত্র নিজের প্রয়োজনেই ব্যবহার করেছি। একবারের জন্যও ভাবিনি তোর কথা। শুধুমাত্র নিজে যেটা ঠিক মনে করেছি সেটাই চাপিয়ে দিয়েছি তোর উপরে। 
–এসব কথা কি আমি শুনতে চেয়েছি?
–তুই শুনতে চাসনি তবে আজ আমাকে বলতেই হবে রে। সেদিন তোর কথা সুস্মিতা কে বলতেই ও আর কয়েকদিন আমার ফোন ধরেনি। আমি ফোন করতেই বললো,"সৌরাংশু আসলে আমি বাড়িতে বেকার বসেছিলাম তো সময় কাটছিল না। তাই তোর সঙ্গে কথা বলতে বলতে তুই আমার একটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলি। তবে এখন লকডাউন উঠতেই আবার কাজের মধ্যে ঢুকে পড়ে আমার না তোর কথা একদম মনে পড়ছে না রে। তাই এইরকম শুধুমাত্র একটা অভ্যাস এর সম্পর্কে আমি থাকতে চাই না।"

পাপড়ি বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরে সৌরাংশু আবার বলল,, পাপড়ি...! কিছু তো বল এমনভাবে চুপ থাকিস না।

নিজের মধ্যে জমিয়ে রাখা ক্ষোভ উপরে দিল পাপড়ি,,

–সৌরাংশু সুস্মিতা একদম ঠিক কথা বলেছে। সবটাই হচ্ছে অভ্যেস। আমারও তোর সাথে কথা না বলে থাকাটা একটা অভ্যাস হয়ে গেছে। ফলে আমি এখন সেই অভ্যাস এর কোন পরিবর্তন ঘটাতে চাই না। আসলে কি বলতো মানুষ এখন না খুবই একলা। এখন সবাই মানুষের ব্যস্ততার সঙ্গী, মানুষের সাফল্যের সঙ্গী, মানুষের চরম উন্নতির সঙ্গী হতে পারে। তবে কেউ তার অবসরের সঙ্গী হতে চাই না। ঠিক যেমন তুই তোর প্রয়োজনের সঙ্গী আমাকে করেছিস। তবে আমার মন খারাপের সঙ্গী হোসনি কক্ষনো।

একটু থেমে আবার বলে উঠলো পাপড়ি,,

–এই লকডাউনে ঘরে বসে আমি রীতিমত পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম সবসময় এক জায়গায় আবদ্ধ থেকে! তবে এই কদিনে নিজেকে সামলে নিয়েছি। এই লকডাউন আমাকে অনেকটা সংযম হতে শিখিয়েছে। যাগ্গে, তুই ভালো থাকিস। আর পারলে মাঝেমধ্যে যাদের সাথে একদম কথা বলিস না, তবে একসময় খুব বলতিস। সেই সব মানুষগুলোর একটু খোঁজ নিস। তখন দেখবি তোর একাকীত্ব কাটানোর সঙ্গী তারাই হবে। 

সৌরাংশু কে শেষ কথাগুলো বলেই ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিল পাপড়ি হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া পাপড়ির সারা শরীরে-মনে শীতল বাতাস ছড়িয়ে যেন বলে উঠলো,, একা চলতে শেখো। নিজের মন খারাপের সঙ্গী নিজেকেই হতে হবে। সবাই তোমার ব্যস্ততার সঙ্গী হবে। তবে কেউ তোমার অবসরের সঙ্গী হবে না। 

                                    ~সমাপ্ত~

আপনাদের মতামতের অপেক্ষায় রইলাম। 😊

# নাম- বিশ্বাস ও তর্ক। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ আধ্যাত্মিক আলোচনা-বাসর। 
 # বিষয় - *আধ্যাত্মিক।* 
  # নাম- 
          *বিশ্বাসে মিলায় বস্তু তর্কে বহু দূর।*
    ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

       বিশ্বাস মানুষের সামগ্রিক সত্তা। বিশ্বাস মানুষের চৈত্য শক্তির একটি গুণ। যার যত বিশ্বাসের শক্তি তার তত চৈত্য শক্তি। বিশ্বাস ছাড়া জীবনের এক পাও চলার উপায় নেই। এই বিশ্বাসের উৎস কোথায়? এর উৎসে আছে হৃদয়ের এক মহান অদৃশ্য শক্তি। এক মানসিক অবস্থা। মনের এক অভিব্যক্তি। মনের বল আনে। একে আঙুল দিয়ে দেখানো যায় না,যেমন মনকে। মনোলোকের আসনে জ্ঞান,ভক্তি,কর্মে অহরহ সম্পৃক্ত। কথার পিঠে সওয়ার হয়ে প্রাণে প্রাণে,বস্তুতে বস্তুতে,প্রাণে বস্তুতে আসে যায়। এই আসা ও যাওয়ার মধ্যে বিশ্বাসের লীলা চলে। বিশ্বাস আছে যদি হয়,তাকে শক্তিশালী করে বিশ্বাসহীনতা বলে আরেক বিশ্বাসের শরিক। বিশ্বাস ও অবিশ্বাস দুই বিপরীত ক্রিয়া ও প্রতিক্রিয়া।  বিশ্বাস নিয়ে বাঁচা যেমন সত্য,অবিশ্বাস আরেক সত্য। যা বিশ্বাসের ধারণ করতে সহায়ক। যত অবিশ্বাস তত বিশ্বাস। যত অবিশ্বাস তত বিশ্বাস। এখন এই বিশ্বাস কেমন? একটা উদাহরণ হয়ে যাক- ভগবানেকে যে আহার দেওয়া হয় তিনি যদি সশরীরে খেতেন তাহলে পৃথিবীতে খাদ্যে টান পড়ত। তিনি খান না বলে তাকে খাওয়ার দেখিয়ে খাই। সেই খাওয়ারকে ভক্তিযোগে এক অলংকৃত শব্দ দিয়ে প্রকাশ করি - নাম *প্রসাদ।* ভগবান এই যে সশরীরে খেলেন না,তা থেকে বিশ্বাসের দ্বন্দ্বমূলক ভাববাদে বললাম তিনি আছেন গোপনে,আর দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদে বললাম তিনি যে আছেন বুঝব কী করে,তা থেকে কূট প্রশ্ন,প্রশ্ন থেকে তর্ক। ভগবান আছেন,ভগবান নেই,তিনি যে আছেন বুঝব কি করে? সংশয় থেকে স্বামীজী ঠাকুরের কাছে সংশয় নাশ করেছিলেন। সংশয় নাশ করতে হলে শর্ত ভগবানকে ডাকার মত মনের গভীর ভক্তি ও বিশ্বাস থাকলে তিনি দেখা দেন। ধরা দেন। তাহলে তাকে পেতে হলে চাই বিশ্বাসের শক্তি। এই বিশ্বাসের শক্তি তাঁদেরই বেশী হয় যাঁদের অন্তঃকরণ সরল,অকপট ও ঋজু, বৌদ্ধিক জটিলতাহীন। তবে যাঁরা নিজেদের খুব যুক্তিবাদী,বস্তুবাদী বলে মনে করেন তাঁদের মধ্যে ভগবানে বিশ্বাস আসা বেশ কঠিন। মার্কসবাদীরা বস্তুবাদে বিশ্বাসী বলে ভগবানে বিশ্বাস করেন না,ধর্ম-ভগবানকে আফিমের নেশা বলেন। তবে এও সত্য কোনো বুদ্ধিজীবী যদি বিশ্বাসের অধিকারী হন তাহলে তিনি অত্যন্ত শক্তিশালী হন। কেননা বিশ্বাস আনে ইচ্ছাশক্তি। ইচ্ছাশক্তি থেকে আসে সংকল্পশক্তি। সংকল্প থেকে আসে দৃঢ়তা। আর বিশ্বাসের ফল ইচ্ছাশক্তি, দৃঢ় সঙ্কল্প আসে। এরা বিশ্বাসকে আরো উঁচুতে তুলে ধরে।
 বিশ্বাসের সঙ্গে তর্ক জুড়ে বসে কেন? কেন আবার, অবিশ্বাস নিয়ে আসে তার স্যাঙাৎ তর্ককে। ভগবান সশরীরে খান না,যদি খেতেন পৃথিবীতে খাদ্যের টান যদি হত,সচোক্ষে দেখা যেত, তখন ভগবানে বিশ্বাস আনা যেত। কিন্তু তা হয়না বলেই তো এত তর্ক।
  বিশ্বাসের ফল কিছু হাতে নাতে লাভ হয়,জল নিচের দিকে গড়ায়,দুয়ে দুয়ে চার,চাকা গড়ালে গতি আসবে,আগুনে হাত দিলে হাত পুড়বে,শরীর চর্চা করলে সুস্বাস্থের অধিকারী হওয়া যায় - এ সব বিশ্বাস থেকে এসেছে জ্ঞান। কিন্তু দইয়ের ফোঁটা নিয়ে পরীক্ষায় বসতে,জোড়া শালিক দেখলে সৌভাগ্য,কামড় খেলে প্রিয়জন মনে করছে বলে ভাবা,ভগবান সব দেখছেন, তাঁরই সংসার- এসব বলা মানে শুধুই তর্ক বাঁধে বিশ্বাস ও অবিশ্বাসের সংশয় থেকে।
 তাই যখন আমাদের বিশ্বাসের দৌড় জ্ঞানের সীমাবদ্ধতায় আটকে যায় তখন বিশ্বাসের হাতে ছেড়ে দিয়ে তর্ককে এড়ানোর কথা বলি - *তর্ক বহুদূর!* 
   ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা। ❤❤⚘⚘

বৃহস্পতিবার, ২৭ মে, ২০২১

# নাম- গৃহীজীবনের বুদ্ধত্ব। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

 
 #বিষয় - জীবন যেরকম। 
 #নাম-
    *গৃহীজীবনের বুদ্ধত্ব*
  ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

      বুদ্ধত্ব লাভ জীবনের বিশেষ সাধনার স্তর থেকে আসে। বুদ্ধত্ব লাভ মানে বোধি লাভ। গৌতম ওরফে রাজকুমার সিদ্ধার্থ রাজসিংহাসন ছেড়ে ছিলেন বোধি লাভের জন্য। বোধিলাভ থেকে তিনি ভগবান বুদ্ধ হয়েছিলেন। সংসার ছেড়েছিলেন। তাঁর প্রচারিত ধর্মের নাম বৌদ্ধধর্ম। আর শিষ্য সম্প্রদায় নিয়ে সংঘ। সংঘের সদস্যগণ হলেন বৌদ্ধ ভিক্ষুক ও ভিক্ষুনী। বুদ্ধ সংসারী মানুষের মধ্যে তাঁর ধর্ম প্রচারকে শিক্ষার অঙ্গ করেছিলেন। সংসারী মাত্রেই সুখ ও দুঃখের শিকার হন - সকল দুঃখের মূলে তিনি *তহ্না বা তৃষ্ণা*-কে দায়ী করেছিলেন। অহরহ পাপ করে - তহ্না থেকেই মূলতঃ আসে,তা থেকে মুক্তির জন্য অনুশোচনা নেই বলে সংসারী মানুষ অনন্ত দুঃখের কবলে পড়েন। এই দুঃখ থেকে মুক্তির জন্য বুদ্ধ অষ্টাঙ্গিক মার্গের( সৎ কর্ম, সৎ চেষ্টা,মিথ্যা না বলা,প্রাণি হত্যা না করা ...) কথা বলেছিলেন। সংসারী বা গৃহী মানুষের মনে শান্তির জন্য - বুদ্ধং শরণম্ গচ্ছামি,সংঘং শরণম্ গচ্ছামি - বুদ্ধের শিষ্যগণ বুদ্ধের শরণাপন্ন হতে বলেছিলেন। আর বুদ্ধের প্রচারিত বৌদ্ধধর্ম সংসারী মানুষের শান্তির আশ্রয়। গৃহী মানুষ সাংসারিক বন্ধনে থেকেও সাংসারিক মুক্তির পথ দেখিয়েছেন। গুরুই সেই পথ দেখান। গুরুবাদী চেতনা বৌদ্ধধর্মে পাই - গুরুই একমাত্র মুক্তির পথ বলে দিতে পারেন। মোহমুক্ত জীবন গৃহী লাভ করলে সংসারে থেকে সন্ন্যাসীর জীবনযাপন করেন। সংসার ভিন্ন জীবন হয় না। সংসারের মধ্যে থেকে  মোহমুক্ত জীবনযাপনই শান্তির পথ। তাই সাংসারিক যোগ। ঠাকুর শ্রাশ্রীরামকৃষ্ণ বলতেন মোহমুক্তই সংসারে বিষয়ী হয়েও বিষয়মুক্ত করে। দুধ ও জলের মিশ্রণ থাকলেও হাঁস যেমন দুধটুকু আলাদা করে খেতে জানে,ঠিক তেমনই বিষয়ী লোক বিষয়ের মধ্যেও মোহ বাসনা আলাদা করে চলতে পারেন যিনি তিনিই তো সাংসারিক সন্ন্যাসী। যেমন দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের সঙ্গে সাক্ষাত করতে গিয়ে ঠাকুর দিব্যদৃষ্টিতে ঠাকুরবাড়ির অন্দরমহল পর্যন্ত দেখে ফেলেছিলেন। আর ঠিক অব্যবহিত পরে ঠাকুরবাড়ি থেকে বেরিয়ে মথুরবাবুর কাছে দেবেন্দ্রনাথ যে কত বড় গৃহী সন্ন্যাসী ছিলেন সেই প্রশংসা করেছিলেন। ঠাকুরের আরেক ভক্তশিষ্য শ্রীমহেন্দ্র গুপ্ত ওরফে শ্রীমও (মাষ্টার)একজন শ্রেষ্ঠ গৃহী সন্ন্যাসী ছিলেন। বিদ্যাসাগরকেও ঠাকুর একই সংশাপত্র দিয়েছিলেন। কিন্তু বঙ্কিমচন্দ্রের বিষয়ের প্রতি বড্ড টান দেখে দেবেন্দ্রনাথ, শ্রীম,বিদ্যাসাগরের ধারায় ফেলতে কুন্ঠা প্রকাশ করেছিলেন। 
  গৃহী হলে বুদ্ধত্ব লাভ- অষ্টাঙ্গিক মার্গের আটটি নিয়ম হুবহু মানতে পারা সম্ভব না হলেও তার শরণাপন্ন হয়ে চললে ঐ পথেই গৃহীর বুদ্ধত্ব সম্ভব। স্বামীজীর  রামকৃষ্ণধর্ম সাংসারিক মানুষের জন্য - মূলমন্ত্র সেবা - জীব সেবা শিব সেবা। স্বামীজীর সেবার আদর্শে বুদ্ধের প্রভাব লক্ষণীয়। 
  তাই বুদ্ধত্ব লাভ একটি সাধনার পথ। শান্তির পথ। শত তীর্থ ও ধর্ম কর্ম করলেও শান্তি পাওয়া যায় না,যদি মন মোহমুক্ত না হয়। তাই গৃহীর বুদ্ধত্ব লাভের একমাত্র উপায়। বুদ্ধত্ব লাভের মত ও পথ গৃহীর জন্য সদা অপেক্ষায়। এজন্য দেহ ও মনকে যোগ্য করে তুলতে হয়। তার জন্য সাধনার পথে আসতে হয়। কিছুদিন সাধনায় ব্রত নিলাম,হঠাৎ একদিন সাধনার পথ কঠিন বলে আগের ভোগ,বাসনা অনেক সহজ ও শ্রেয় জ্ঞাণ করে ফিরে এলাম- এ হেন দোলাচল মনোভাবের জন্য বরং মোহমুক্তি কি,মোহজনিত দুঃখই বেশি আসে। তাই ধর্মের  পথে,সাধনার পথে থাকলে দোলাচল চলবে না,যেমন সাঁকোয় চড়লে ডান ও বাম হতে নেই,লক্ষ্য স্থির রেখে এগিয়ে যেতে হয়,এও ঠিক তেমনি। 
   তাই পরিশেষে বলি সংসারে থেকে বুদ্ধত্ব লাভ জীবনের কাছে সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ পাওয়া। তাই জীবনকে পেতে হয়,পলে জীবন পরমানন্দের পথে চালিত হয়। জন্ম সার্থক হয়।
         ********
@ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

রবিবার, ২৩ মে, ২০২১

# নাম- ইতি কুরুক্ষেত্র। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ আধ্যাত্মিক আলোচনা-বাসর। 
  # বিষয় - *কুরুক্ষেত্র।* 
   # নাম- 
            *ইতি-*
                    *কুরুক্ষেত্র।*
 ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

    কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কুরুসাম্রাজ্যের পতন আর ইতিহাসের মোগল সাম্রাজ্যের পতনে অনেক মিল কেউ যদি দেখেন তাহলে বড়ই উপকার হয়। রাজা অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র ও দুর্যোধনে এবং সাজাহান ও ঔরঙ্গজেবে মিল পাওয়ার ইঙ্গিতটি ধরিয়ে দিলাম।
       মানুষ যে মায়ার হাতের পুতুল,অহংকারের দাসত্বের পরিণাম ধ্বংস পুরাণ-ইতিহাস থেকে সেই শিক্ষা পাই। প্রসঙ্গ কুরুক্ষেত্র। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পেছনের ঘটনা দিয়ে শুরু করা যাক।
    মাতা সত্যবতীকে পুত্র ব্যাসদেব বলছেন- " মা,কুরুবংশের গৌরব এবার অস্তমিত হওয়ার পথে। দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি ধ্বংসের দিন গোনা শুরু। তা চোখে দেখার চেয়ে দু'জনে বনবাসে চলে যাই বরং। চলুন। তপোবনে যোগভ্যাসে দিন কাটাব।"
 সত্যবতী সাংসারিক মায়ায় আচ্ছন্ন,বলছেন- "রাজসভা,রাজত্ব,বীর পুত্র ভীষ্ম ও অন্যান্য সবাই...এত প্রিয়জন ছেড়ে বনবাসে! এ কেমন কথা!"
 বেদব্যাস তখন বললেন- "ধৃতরাষ্ট্র অভিশপ্ত আগের জন্মে।"
  সত্যবতী কৌতূহল নিয়ে বললেন- "কী রকম?"
  ব্যাসদেব বললেন- "ধৃতরাষ্ট্র আগের জন্মে একজন রাজা ছিলেন। একদিন মৃগয়ায় গেছেন। মৃগের পেছনে ধাওয়া করতে গিয়ে রাজা বনে পথ হারান। ক্লান্ত রাজা ক্ষুধায় ও তৃষ্ণায় কাতর। গাছের নীচে অন্ধকার দূর করতে আগুন জ্বেলে বসে আছেন। আর সেই গাছের উপরে এক পক্ষী তার স্ত্রীসহ শ'খানেক ছানাপোনা নিয়ে থাকত। রাজার সঙ্গীন দশা দেখে স্ত্রী পাখি রাজার জন্য আহারের ব্যবস্থা করতে বলে পুরুষ পাখিটিকে। তাই নিয়ে উভয়ের বচসা বাঁধে। বচসাকালীন অসতর্কতা বশতঃ স্ত্রী পাখি আগুনে পড়ে যায়। পাখিটিকে রাজা পুড়িয়ে খেয়েও খিদে আরো পায়। তখন বুঝতে পারলেন রাজা এই গাছে নিশ্চয় পাখির বাসা আছে। সত্যিই রাজা তাই দেখলেন। আর ঐ শতপাখির শাবকগুলিকে তীরের ডগায় একে একে নৃশংসভাবে মারলেন আর রাজা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ছানাদের বীভৎস মৃত্যু সহ্য করতে না পেরে পাখিটি রাজাকে অভিশাপ দিল- 'পরজন্মে তুমি অন্ধ হয়ে জন্মাবে। তোমার শতপুত্র হবে। তারা একে একে তোমার চোখের সামনে যুদ্ধে নিহত হবে। তখন তুমি বুঝবে সন্তানহারা পিতার দুঃখের কথা।' এই হলো সেই রাজা ধৃতরাষ্ট্র। আর তার শতপুত্র।"
 সত্যবতীর মনে হল,তিনি ঠিক সামলে নেবেন,এমন অমঙ্গুলে ঘটনা ঘটতে দেবেন না। সংসারের বাইরে গিয়ে কি শান্তি পাবেন। 
 বেদব্যাস তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারলেন না।
  কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ঘটনা যেভাবে সাজানো ছিল ঠিক সেভাবেই ঘটনি চলতে লাগল। প্রথমে যুদ্ধ না ঘটতে দেওয়ার অনেক বাদ প্রতিবাদ এসেছিল। কিন্তু পাপ ষোল কলায় পূর্ণ। যুদ্ধের নাম ধর্ম যুদ্ধ, তাই  যুদ্ধের কারণ। দুর্যোধনের পাপের জন্য ধর্ম যুদ্ধ হল আসন্ন। এই যুদ্ধের প্রধান কারিগর বিষ্ণুর অষ্টম অবতার শ্রীকৃষ্ণ। আর তাঁর দোসর নরঋষি অবতার অর্জুন।
 সত্যিই কি দুর্যোধন ও তার পক্ষে অংশগ্রহণকারী সব রাজণ্যবর্গ পাপী ও অধার্মিক ছিলেন। তাদেরও মৃত্যু ছিল অনিবার্য। কিন্তু তা তো হয়নি। পাপের স্বরূপ রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত পান্ডব শিবিরে হানা দিয়ে শিখন্ডী,ধৃষ্টদ্যুম্ন সহ দ্রৌপদীর পাঁচ সন্তানকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত অশ্বথামা,কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা বেঁচে থাকলেন কোন যুক্তিতে। আবার প্রশ্ন উঠেছিল দেবতারা পরোক্ষে পান্ডবদের সহায় হল কেন? দুর্যোধন যদি পাপী হয়,অহংকারী,অত্যাচারী অধর্মের বিরুদ্ধে ধর্ম যুদ্ধ হয়,তাহলে দেবতারা পান্ডবদের অন্যায় সহায়তা দিল কেন? যেমন- 
   সূর্যদেব পুত্র কর্ণের পক্ষ থেকে সরে এসে জয়দ্রথ হত্যায় ঐটুকু সাহায্যের  পেছনে ছলনার আশ্রয় কেন নিলেন। অর্জুনের যুদ্ধের সময় মনে হচ্ছিল কেউ যেন প্রদীপ্ত পুরুষ শূল হস্তে তার আগে আগে যুদ্ধ করছেন। অর্জুন ব্যাসদেবের কাছে জানতে পারলেন ঐ প্রদীপ্ত পুরুষটি হলেন মহাদেব। শূল হস্তে তিনি মহাযোদ্ধা। এক ত্রিশূল থেকে লাখ লাখ ত্রিশূল প্রতিপক্ষের সেনা ধ্বংস করছে। আর জয়দ্রথের পাশুপত অস্ত্র ছাড়া মৃত্যু ছিল অসম্ভব। শিবের সেই অস্ত্র নিতে ও অস্ত্র প্রয়োগ শিখতে কৃষ্ণ অর্জুনকে শিবের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন। 
  কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শেষ। এক নির্জন স্থানে বসে রথের উপর কৃষ্ণ ও অর্জুন। এমন সময় সেখানে উপস্থিত মহাবীর হনুমান। হনুমান কৃষ্ণকে বললেন- "আপনার নির্দেশমত প্রদীপের সাহায্য করেছি। এখন যুদ্ধ শেষ। অনুমতি দিলে ইন্দ্রলোকে যেতে পারি।" এই শুনে অর্জুন তখন কৃষ্ণের কাছে ব্যাপারটি জানতে চান। কৃষ্ণ তখন  বললেন- "তোমার  রথে সর্বসময় কপিধ্বজ হয়ে থাকতেন হনুমান। তাই কোনো বীর তোমার রথ ধ্বংস করতে পারেননি। শুধু কর্ণের হাত থেকে তোমার রথ হনুমান রক্ষা করতে পারেননি।" 
অর্জুন বললেন- "আমার রথ এই তো অটুট। কখন বিনষ্ট হল?"
  কৃষ্ণ হেঁসে বললেন- "সেই জন্য তো তোমাকে এই নির্জন স্থানে এনেছি।"
  তারপর রথ থেকে দু'জনে নেমে আসতেই মুহূর্তেই রথটি ভস্মীভূত হয়ে যায়। অর্জুন হতবাক। কৃষ্ণ বললেন- "এটি ছিল মায়াবী রথ। তোমার রথ কর্ণের বাণে অনেক আগে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সবার চোখে আমি ও হনুমান মায়া দ্বারা কাউকে বুঝতে দিইনি। এমনকি কর্ণ নিজে মায়াবী হয়েও ধরতে পারেনি। তাই তো তবেই তাকে বধ করা সম্ভব হলো।
 কৌরবদের পরাজয়ের কারণ- 
  কৌরবপক্ষের মহারথিদের অন্তর্দ্বন্দ্ব। যুদ্ধ জয়ের পুরো কৃতিত্ব নেওয়ার ইচ্ছে ছিল ভীষ্মের,কর্ণের, দ্রোণ ও শল্যের। এই মনোমালিন্য লেগেই থাকত। যুদ্ধের আগে ভীষ্ম কর্ণকে অর্ধরথ বলে ঘোষণা করায় কর্ণের খুব গোঁসা হয়। তিনি ভীষ্মের নেতৃত্বে যুদ্ধ না করার সিদ্ধান্ত  ঘোষণা করেন। আর রণকৌশল ছিল পান্ডবদের হত্যা নয়,কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ জয় করে পান্ডবদের বেঁধে আনা দুর্যোধনের কাছে। দুর্যোধনের  কাছে ভীষ্ম, কর্ণ ও দ্রোণ তিন বীর ছিলেন প্রধান। সকলে প্রতিশ্রুতিমতো কাজ করতে উপযুক্ত পরিবেশ পাচ্ছিল না। যদি তা পেত এই তিন বীরের সম্মিলিত শক্তিতে পাঁচ দিনেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যেত। প্রথম দুদিন যে যার মতো করে আলাদা ছিল। ঐ অন্তর্কলহের জন্য। 
  এর পরে ভীষ্মের শরশয্যা যুদ্ধে সংঘবদ্ধ এলো বটে কিন্তু তখন সে শক্তি ও উদ্যম অনেকটাই থিতু।
  সবই রণনীতির উপর দাঁড়িয়ে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ ধর্ম যুদ্ধ অপেক্ষা,যুদ্ধের রীতি নীতির সবটাই ছিল অধর্মের পথে। একাই কৃষ্ণ ছিলেন - নাট্যকার,প্রযোজক, পরিচালক। তাই  ধরতে পেরেছিলেন,ঘটকের পুত্র বারবারিক। ব্যাসদেব তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন - "মহাবীর বারবারিক আপনি তো পুরো যুদ্ধ দেখেছেন। আপনার মতে এই মহাযুদ্ধে কে সবচেয়ে বড় বীর?"
 তখন বারবারিক বলেছিলেন- "হে মহামুনি এই যুদ্ধে একজনই মহাবীর। তিনি স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। আপনারা যা দেখছেন সবই মায়া। একা বাসুদেব তার চক্র দিয়ে সকলকে বধ করেছেন। তা নাহলে কৌরব মহারথিদের বধ করা অসম্ভব ছিল।"
         *********
@ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

বৃহস্পতিবার, ২০ মে, ২০২১

# নাম- ক্রোধ ও অসহিষ্ণুতা। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।


   #বিষয় - ক্রোধ ও অসহিষ্ণুতা হল সঠিক বোধগম্যতার শত্রু।
   # নাম- ক্রোধ ও অসহিষ্ণুতা।
    ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

         মানুষের ভেতরে নানা ক্রিয়া প্রতিক্রিয়ার প্রকাশেই  মানুষ নামের পদবাচ্য,মানুষ নামের তাৎপর্য- মান+হুশ= মানুষ। মান ও হুশ থাকলেই মানুষ হবে না,এর জন্য কতকগুলি বাধা আছে। সেই বাধাগুলিই মান ও হুশের বিপরীতে নেগেটিভ দিক,আর তার বিপরীতে আছে পজিটিভ দিক। পার্থিব  যা কিছু শক্তির উৎস এই পজিটিভ ও নেগেটিভ আধানের রহস্যে। পজিটিভ ও নেগেটিভ আধান যেমন বিদ্যুৎ প্রবাহে ও আলো উৎপাদনের শক্তি,তেমনই মানুষের মধ্যেও পজিটিভ ও নেগেটিভ গুণের আধান তার ভেতরের পরিচিতি সে মানুষ হিসেবে কোন ধরণের প্রতি আকৃষ্ট। 
        নেগেটিভ না থাকলে পজিটিভের অস্তিত্ব বোঝা যেত না,যেমন অন্ধকারই আলোর দিকদর্শী। মৃত্যু জীবনের রক্ষক ( জীবন রক্ষা করে চলতে হয় মৃত্যুর পাত্রে),সৎ অসতের,অমান্য থেকে মান্যতার দিকে প্রভৃতি সকল বিষয়ের বিপরীত দিকের ভাবসকলই জীবনের মূল চাহিদা। তার উপর দাঁড়িয়ে জীবনের লক্ষ্য - ঠিক ঠিক বিষয় নির্বাচন করে আত্মার উন্নতি ঘটানো। এখানেই নির্বাচনের হেরফেরেই রয়েছে মানুষের ভালোমন্দ বিচার- একে অপরের বিচার করে,নিজের বিচার নিজে করে,মানুষ সামাজিক বলে সমাজও বিচার করে। এই ক্রোধ ও অসহিষ্ণুতাই জীবনকে বিশেষিত করে,এর ফলের উপর নির্ভর করে।
  মানুষের মধ্যে থাকে বক্রতা,আত্মবিরোধ,প্রকৃতি-বিকৃতি,আর তা থেকেই জন্ম নেয় অহংকারের স্বরূপে রণংদেহী ভাব। রণপ্রিয়তা। তা থেকে মারামারি,রক্তারক্তি,হিংসা,প্রতিহিংসা আসে। পরমানু বোমা ফাটানোর রহস্য এসব নেতিবাচক প্রভাবের ফল। কান্ডকে 'চিরন্তনী শান্তি' রচনা পরমানু বোমার প্রতিষেধক রাষ্ট্রসংঘ তৈরির উপদেশ দিয়ে রেখেছিলেন বোমা ফাটানোর আগে। কান্টের *লজিক* বক্তৃতামালায় বলেছিলেন- *মানুষ সবার উপরে সত্য* বলে মানুষের ভাবার ক্ষমতা আছে - ক) মানুষ জানতে পারে। খ) মানুষ জানে কী করা উচিত।  গ) আর ভবিষ্যতের ফল কী হতে পারে আশা করতে পারে। এই তিনটি শুভ বুদ্ধির অনিবার্য প্রশ্ন। তাই মান ও হুশের জন্ম দেয়।
   মানুষের শারীরিক গঠন,তার জীবকোষের বিচিত্র অবয়ব সংস্থান,তার মস্তিষ্কে ও মেরুদন্ডে কাম-ক্রোধ-লোভের তাড়না থেকে সচেতনে অহংকার অহরহ জন্ম হতে থাকে। এক জটপাকানো স্নায়বিক শরীরী ভাষার জন্ম হয়। এর জট ছড়ানোর জন্য বিবেক মূল্যবোধ,নীতি নৈতিকতা সীমান্ত রক্ষী মতো কাজ করে। ক্রোধ, অভিমান, হিংসা,প্রতিহিংসা,অসহিষ্ণুতা  শরীরের স্নায়বিক বিকৃতি। ব্যক্তিগত স্নায়বিক বিকৃতি থেকে সামাজিক ও রাষ্ট্রিক ক্ষমতার জাহির আসে। যেমন- প্যালেসটাইন-ইসরাইল দ্বন্দ্ব,কাশ্মীর সীমান্ত নিয়ে গন্ডগোল,আমেরিকা ও আলকালয়দা বিরোধ,আমেরিকার কৃষ্ণাঙ্গ অত্যাচার,ইরাকে শিয়া ও সুন্নীর মধ্যে প্রতিহিংসা - সবই ব্যক্তিগত স্তর থেকে গোষ্ঠীগত স্তরের পরিকল্পনায় বিপদে মানুষ নিরাপত্তার অভাব বোধ করে। মানুষের পাশে মানুষকে স্বার্থপর লাগে। সবই বিকৃত স্নায়বিক উত্তেজনা - ক্রোধ,হিংসা,অসহষ্ণুতা। ধর্মীয় বিভাজন সেই ধারার অঙ্গ,ধর্মান্তরীকরণ তারই অঙ্গ- আজ ধর্মীয় অসহিষ্ণুতা ভারতবর্ষের সহিষ্ণুতার ভিত্তি দুর্বল করে দিচ্ছে।
 তাই মানুষের মধ্যে বৈষম্য- ক্রোধ, হিংসা,অসহিষ্ণুতা সন্ন্যাসী বা ভিক্ষুকের ও যোগীর জন্য নয়। অপরাধ আসে ক্রোধ,অসিষ্ণুতা থেকে। তাই মানুষের বিচার হয়। সাজা হয়। বিচারক মহামান্য আদালত। বিচারক ধর্মাবতার। ক্রোধে কংস বোন দেবকীকে কারাগারে অন্যায়ভাবে বন্দী করে নিজের মৃত্যুর পরোয়ানা নিজেই রচনা করে, দুর্যোধনের দ্রৌপদীর প্রতি অপমানের ফল কুরুক্ষেত্র, অতি দর্প বা অহংকারের জন্য রাবণের পতন,শয়তানের প্ররোচনায় আদম ও ইভের স্বর্গচ্যূতি, ম্যাগবেথের উচ্চাশার জন্য পতন, ওথেলোর সন্দেহপ্রবণতার জন্য দেশদিমোনাকে হারানো,  রাজা কিংলিয়ারের অন্ধ সন্তানবাৎস্য,মীরজাফরের বিশ্বাসঘাতকতায় একটা দেশের ভবিষ্যত বদলে যায় - সবই অহংবুদ্ধির অশুভ পরিণাম। যথার্থই মানুষের ভালোমন্দভেদে ভিন্ন ভিন্ন ফল। 
  ক্রোধ ও অসহিষ্ণুতা মনুষ্যত্ব,মানবিকতা- এসবের বিপরীতে নেগেটিভ আধান। তার শক্তি অনুযায়ী মানুষের একটি শ্রেণি হয় গতিশীল।  শুভবুদ্ধি সম্পন্ন মানুষ মনে করে এগুলো জীবনকে বিপথে চালিত করে। তাই বোধগম্যতার বিচারে পরিত্যক্ত তথা বর্জনীয়। কারণ এই সব নেগেটিভ দিকগুলিই তো জীবনকে পশ্চাৎগামী করে। এরা বিপদের জন্য শত্রু।
     *********
@ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

বুধবার, ১৯ মে, ২০২১

# নাম- -'নৌকা'। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

 
 #বিষয় - শব্দ।
  #নাম- নৌকা।

     বাংলাদেশ নদীমাতৃক ও জলা-জঙ্গলের দেশ। বাংলা নামকরণে ইতিহাস বলছে - বাংলাদেশের মানুষের দেবতা *বোঙ্গা*। এই *বোঙ্গা* থেকেই *বঙ্গ* শব্দের উৎপত্তি। নদী,সমুদ্র দেশের যেন নার্ভ-স্পন্দন। প্রবাহিত জল তার প্রাণের স্বতঃস্ফূর্ত গতি। সেই জলপ্রবাহে শস্যশ্যামলা ধরিত্রীর ফসল নষ্ট হত। তার হাত থেকে রক্ষার জন্য বড় বড় *বাঁধ বা আল* দেওয়া হত। তা থেকে এ দেশের নাম - বঙ্গ+আল= বঙ্গাল বা বাঙ্গাল বা বাঙ্গালা। এই জলের হাত থেকে রক্ষা পেতে শুধু বাঁধ তার প্রধান প্রতিকার নয়,আরও অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থা একে একে এসেছিল,নৌকা তার মধ্যে অন্যতম। নদীনির্ভরতা থেকে রক্ষার আশ্রয় জলযান। এই জলযানের নৌকা হল একটি রূপ। অন্যান্য রূপ যেমন- বজরা,ডিঙি, ডোঙা,পানসি প্রভৃতি।
,  চর্যাপদে নৌকার কথা পাই,যা দেহসাধনার মোক্ষম উপায়ের কথা বলা হয়েছে। খরস্রোতা নদীর স্রোতে নৌকা কাছি দিয়ে বাঁধা থাকত। নৌকা বাইতে - *খুন্টি উপাড়ি মেলনি কাচ্ছি ...* খুঁটি বা নোঙরে বাঁধা নৌকার কাছি খুলে নৌকাকে স্রোতের বিপরীতে টেনে নিয়ে যাওয়ার কথা আছে। এই কাছির আরেক নাম গুন।
  শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে 'নৌকাখন্ড'-এ কৃষ্ণ মাঝি।রাধা সওয়ারী। মাঝ নদীতে কৃষ্ণ নৌকা ডোবানোর কি কেচ্ছা-কেলেঙ্কারীটাই না! শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকে এই ঘটনার জন্য আদি রসাত্মক কাব্য বলে অনেকেই অভিহিত করেছেন। রাধা ও কৃষ্ণের মাঝে নৌকা দৈহিক প্রেমের অনুঘটক।
  এর পর মঙ্গলকাব্যগুলিতে নৌকার কথা যেমন, মনসামঙ্গলে চাঁদের সপ্ত ডিঙা সাজিয়ে বাণিজ্যে যাওয়া ও মনসার কোপে একে একে সপ্তডিঙা ডুবে যাওয়া, চন্ডীমঙ্গলের বণিক খন্ডে ধনপতি সওদাগরের সিংহলে বাণিজ্য যাত্রা ও কালিদহে কমলেকামিনী দেখা, অন্নদামঙ্গলে ঈশ্বরী পাটনী নৌকায় গৃহবধূর বেশে পরপারের যাত্রী হয়ে ওঠা ও ঈশ্বরীর সন্তানকে দুধে ভাতে থাকার বর মঞ্জুর করা,সপ্তদশ শতাব্দীর আরাকান রাজসভার বাঙালি মুসলমান কবি দৌলতকাজী,আলাওলের কাব্যে নদীমাতৃক বাংলার নিখুঁত পরিচয় পাই। তারপরে লোকসংস্কৃতির সঙ্গীত - জারি,সারি,ভাটিয়ালি ...সবই মাঝি মাল্লাদের গান। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে নৌকা কাহিনীতে বাঙালির কাছে যেন নৌকা-পাঁচালী বাঙালিয়ানার পরিচয়কে মেদবহূল করেছে।
    উনিশ শতকে বাবুসমাজের কাছে নদীতে নৌকাবিহার একপ্রকার কেতাদুরস্ত আদবকায়দা ছিল।
  বঙ্কিমচন্দ্রের 'কপালকুন্ডলা' উপন্যাসে নৌকায় সাগরতীর্থে ভ্রমণ ও নবকুমার কাহিনী অংশ - "তুমি অধম বলিয়া আমি উত্তম না হইব কেন" - এক কালজয়ী বাক্যের জন্ম হয়়েছিল,যার সৃষ্টির  মূলে নদী,নৌকা বা বজরা। আর 'দেবীচৌধুরানী' বজরা আকাশের মেঘ দেখে কীভাবে মুভমেন্ট করত ,তাই তো রোমান্স কাহিনীর মূলে। 
 জোড়াসাঁকোর জমিদার ঠাকুর পরিবারের কাছে গঙ্গায় নৌকাবিহার ছিল শখের। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর নৌকাবিহারে ধ্যানের নির্জনতা খুব পছন্দের ছিল। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের কাছে পদ্মায় নৌকাবিহারের অভিজ্ঞতার কত কত ভুরি ভুরি লেখা। 
 একদিনের একটি ঘটনা। খুব ছোট্ট তখন রবীন্দ্রনাথের ছেলে রথীন্দ্রনাথ। বজরায় কবি রথীকে নিয়ে নৌকাবিহারে নেমেছেন। গোধূলি আসন্ন। সূর্যাস্ত দেখার লোভে ডেকে চেয়ারে বসে। নীচে খর স্রোত। সামনে বসে রথী। শিশুর সাথে একথা ওকথা হতে হতে হঠাৎই কবির নতুন জুতোর একপাটি গেছে জলে পড়ে। নিমেষে কবিও জলে ঝাঁপ দিলেন। স্রোতে জুতো আগে, কবি পিছু। জুতো জয় করে তবেই উঠলেন। যে কোনো বিপদ হতে পারত। ঘরে ফিরতে মৃণালিনী দেবী খুব রাগ করে নিদান দিয়েছিলেন,তুমি যাও যাই করো ঐ দুধের শিশুকে নিয়ে আর যেও না। এমন অনেক ঘটনা রবীন্দ্রনাথের লেখায় পাই।
      "মধুমাঝির ঐ যে নৌকা খানি ..." কিংবা 'দেবতার গ্রাস' কবিতায় নৌকা থেকে সেকালে সন্তান বিসর্জনের বেদনার ইতিহাস হয়েছিল নথিভুক্ত।
 রবীন্দ্রনাথের 'সোনারতরী' কাব্যের  নাম কবিতা- 'সোনার তরী'র শেষ কথা - "যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।" রবীন্দ্রনাথ পদ্মার বোটে বসে লিখেছিলেন একের পর এক ছোটগল্প। রবীন্দ্রনাথের জীবনে নৌকাবিহার ছিল এক অন্যতম অধ্যায়। 
  'খেয়া' কাব্য কবির আধ্যাত্মিক চিত্তে প্রশান্তির উদ্ধার। খেয়া নৌকায় কবি পরপারে পাড়ি দিয়েছেন। আর মৃত্যুচেতনার কথায়ও কবি বলেন- "আমার এ ক্ষুদ্র প্রাণ সুরের তরণী/ হাসিয়া ভাসায়ে দিলে, কৌতুকে ধরণী বেঁধে নিল বুকে।"
   তাই নৌকার কথা বলে কে শেষ করবে! শেষ যার নেই। নৌকা আমাদের ব্যবহারিক  ও আধ্যাত্মিক ভাবনার দ্বৈরথে চাপিয়ে বলতেই হয় এপার থেকে খেয়া বেয়ে ওপারে যাই সে তো মোর আয়ুষ্কালে মৃত্যুর পরোয়ানা। আমার নৌকা আমার দেহ। প্রাণ আমার দাঁড়। বুদ্ধি আমার মাঝি। চৈতন্য আমার নৌকার পাটাতন। 
                     ********
 @ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

সোমবার, ১৭ মে, ২০২১

চাওয়া-পাওয়া অনিশা


 চাওয়া-পাওয়া

অনিশা


অপ্রতিরোধ্য শক্তির কাছে হেরে গিয়ে সায়নী যখন তার ঠোঁটে মুখে, হারিয়ে যাওয়া প্রিয়তম মানুষটির স্বাদ পেল তখন সে বুঝতে পারল সে বুঝি এই শক্তির কাছে হেরে যেতেই চেয়েছিল। বহু বছর পর ডাকাতিয়া বাঁশির মতো বিয়ে বাড়ীতে নীলের গলার গলার আওয়াজ পায় তখন এই পড়ন্ত যৌবনে ও সায়নীর মন উচাটন হয়ে ওঠে। বিয়ে বাড়িতে সবাই তখন বিয়ে দেখতে ব্যস্ত, শুধু সায়নী মেয়ের মা বলে বিয়ে দেখতে নেই। সে একটু বুকে ব্যথা নিয়ে ঘরের এককোনে বসে ছিল। কেমন অজানা আশঙ্কায় মন দুরুদুরু। সেই আশঙ্কাকে সত্যি করে দিয়ে নীলের আগমন। নীলের বুকে নিষ্পেষিত হয়ে যেতে যেতে সায়নী ফিরে গেল বহুবছর আগে এমনি এক সন্ধ্যায়।

অভিষেকের সঙ্গে সায়নীর বিয়ে আর কয়েকটা দিন পরেই। অভিষেকদের অনেক বড় বাড়ি। কাকা জ্যাঠা সব মিলিয়ে অনেক ভাই-বোন। অভিষেকের খুব ফর্সা গায়ের রঙ দেখে সবাই তাকে রাঙা বলে ডাকত। অভিষেকের ঠাকুরমা বলতেন, "বড়, মেজ, সেজ, ন, ফুল, ফল। তারপর তো নতুন কিন্তু আবার রাঙাবাবু আমার কোথা থেকে এলেন?"  অভিষেকে দাদাদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে। বৌদিরা আদর করে রাঙা বাবু বলেই ডাকে। অভিষেকের বড় দাদা, বড় দিদিরা বয়সে অনেক বড়। বড়দির ছেলে নীল। সম্পর্কে অভিষেকের ভাগ্না। নীল মাঝেমাঝে মামার বাড়ি আসে। এখানে এলে সারাবাড়ি মাতিয়ে তোলে। নীলের গায়ের রং মাঝারি মাপের হলেও তার তার ঠোটের ও চোখের দুষ্টুমি ভরা হাসিতে সবাই কুপোকাত। বৌদিরা তো নীল বলতে অজ্ঞান। খুব মজা করে, আমুদে ছেলে। অভিষেকের সঙ্গে সায়নীর বয়সের অনেকটাই তফাৎ। প্রায় তার ভাগ্না নীলের বয়সী। সায়নীর মায়ের মৃদু আপত্তি থাকা সত্বেও সুপুরুষ ইঞ্জিনিয়ার পাত্রকে সায়নীর বাবা হাতছাড়া করতে চাননি। পাকা দেখার দিন বড়দি এসেছিল, নীলকে সঙ্গে নিয়ে। বড়দির তো খুব পছন্দ সায়নী কে। বাড়ি এসে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। নীল তো ওখানে থেকেই গেল।  বলেছে রাতে খাওয়া-দাওয়া করে যাবে। আর ওদের বাড়ির লোকেদেরও খুব ভালো লেগেছে। অভিষেকের কেমন যেন ব্যাপারটা ভাল লাগেনি অথচ মুখে কিছু বলতে ও পারছে না।


দেখতে দেখতে বিয়ের দিন এসে গেল। বিয়ের কাজকর্ম দেখাশোনা করার জন্য বড়দি কে দুদিন আগেই আসতে বলা হয়েছিল। সেইমতো বড়দি দুদিন আগেই এসেছে। নীল আসার পর থেকেই বলছে, "একবার নতুন মামীমার সঙ্গে দেখা করে আসবো।" অভিষেকের বড় বৌদিরা এই নিয়ে খুব হাসি ঠাট্টা করছে। "বড় মামীদের আর মনে ধরছেনা বুঝি? আমাদের কেষ্ট ঠাকুর বুঝি রাধার প্রেমে মগ্ন।" এই নিয়ে হাসি-ঠাট্টা যতই বেড়ে উঠছে অভিষেকের মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি দানা বেঁধে উঠেছে। ঠাকুরমা হয়তো কিছু একটা আন্দাজ করে মজা করে অভিষেককে বলেন, "ওরে ভাই, জানিস তো শ্রীকৃষ্ণ আসলে আয়ান ঘোষের ভাগ্না। রাধা হল কৃষ্ণের মামী। তাই তোর বৌদিরা একটু মজা করছে।" অভিষেক একটা কাজের বাহানা দিয়ে সেখান থেকে চলে যায়।


সন্ধ্যায় নীল সায়নীর এর কাছে যায়। সায়নী প্রথম দিনেই নীলকে দেখে তার জীবনের প্রথম ভালোলাগা অনুভব করতে পারে। নীল ও সায়নীকে ছেড়ে বাঁচতে পারবে না জানায়। এই কথা জানানোর জন্যই সেদিন থেকে গিয়েছিল ওদের বাড়ি। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। বিয়ের সব বন্দোবস্ত পাকা হয়ে গেছে। সায়নী বাবা মাকে এখন আর জানাতে পারবে না। আর এতে দুই পরিবারের অসম্মান। সায়নীকে কোনভাবেই রাজী করাতে পারেনি নীল। একবার শেষ বারের মতো দেখে আসবে সায়নী কে।

নীল যেতেই ওদের বাড়ির লোকজন সাদর অভ্যর্থনা জানান। সামান্য সৌজন্য দেখিয়ে নীল সায়নীর ঘরে যায়। ধীরে ধীরে ওদের কথাবার্তা শুরু হয়। নীল হঠাৎ গভীর আবেশে সায়নীকে জড়িয়ে ধরে।  সেদিন ও এই অপ্রতিরোধ্য শক্তির কাছে হেরে গিয়ে পরম সুখে সুখী হয়েছিল সে। যেন এই হেরে যাওয়াতেই সুখ। জীবনের চরম পাওয়ার মুহুর্তে তার দুফোঁটা চোখের জল জল গড়িয়ে পড়ে। তা দেখে নীলের মনে অপরাধ বোধ জেগে ওঠে। কিন্তু নীলকে ভুল প্রমাণ করে সায়নী নিজেই আবার নীলকে জড়িয়ে ধরে বিদায় জানায়।

আজ এত বছর পর সেই স্বাদ পাওয়ার জন্য তার মনটা যে উপোসী হয়েছিল, সায়নী নিজেও তা জানত না। শুধু একটি কথাই সে জানত, যা সারা পৃথিবীর কেউ জানে না এমনকি নীল ও জানে না, তা হলো তাদের সেই ভালোবাসার সন্তানকেই এত বছর বুকে আগলে বড় করেছে আজ তার বিয়ে। আর বাবা হিসেবে কন্যা সম্প্রদান করছে অভিষেক।

পৃথিবীতে সব চাওয়া যেমন পাওয়া যায় না, তেমনি সব চাওয়া চাইতেও নেই। এই অপ্রাপ্তিটুকু নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকতে হয়, কর্তব্য পালন করতে হয়। আজও সেদিনের মতো চোখের জলে শেষ আলিঙ্গন দিয়ে বিদায় জানাল সায়নী তার প্রিয় পুরুষকে।

# নাম- প্রতারণা। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।


 # বিষয় - অনুগল্প।
  #নাম- প্রতারণা।
  ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

     শ্রীমধুসূদন পাকড়াশী। শ্রী তার বাবার দেওয়া। বাবা শ্রী ডাকবেন বলে। সার্টিফিকেটে শ্রীমধুসূদন।
     বয়স পঁয়ত্রিশের কোঠায়।  স্ত্রী শুশীলা। সত্যিই শুশীলা। তরল পদার্থের মতো। যে পাত্রে রাখো তার মত রূপ নেবে। বললে বলে - "কী হবে, তুমি যা চাও তাই হয়ে! আমি যা তুমি তাই ভাবো। তুমি যা আমাকে নিয়ে ভাববে আমি তা হতে পারব না। তুমিই তো সব। তোমাকে আশ্রয় করে বেয়ে চলা স্ত্রীর ধর্ম।" একদম সোজাসাপটা জবাব। শুশীলার এই নির্ভরতা নিয়ে বাঁচা পছন্দ না হলেও কিছুই করার নেই। শুশীলা যা তাই থাকুক। বেশী ঘাটাঘাটি করলে যদি হিতে বিপরীত হয়ে যায়। ও যা চায় তাই হোক। তবে আফশোস থেকে গেল অফিসের রমনীকান্ত বউ নিয়ে যেভাবে কোলাব্যাঙের মত গাল ফুলিয়ে গল্প দেয় শ্রীমধুসূদন ওখানেই  মনে মনে হালকা।  আফশোসের শেষ নেই। মনের অবচেতনে রমনীর কাছে হতাশার কথা বলেও ফেলে। রমণী তখন বৌয়ের গর্বে আত্মহারা হয়ে বলে - "ভাগ্য এসব জানিস তো। ভাগ্য। মনে কিছু করিসনা। ভগবান সকলকে যেকোনো একটা দিকে ঘাটতি রাখেন। যেমন", এই বলতে গিয়ে রমণীকান্ত থেমে যায়। মনে মনে ভাবে ঘরের কথা বাইরে আনা সে লক্ষ্মণের গন্ডী অতিক্রম করার মতো বিপদ। প্রসঙ্গ বদলে রমণীকান্ত বলে - "চা চলবে?" এই বলে চায়ের অর্ডার দেয় অফিসের বলাইয়ের ক্যান্টিনবয় ভোলাকে। চা আসতে আসতে দেশ,রাজনীতির টুকিটাকি কথা,চা পানের ঝড়ো গতির তুলে বিদায় নিতে নিতে বলল- "কাল সুদের কটা টাকা দিবি রে।" রমণীর ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানানো ও হ্যাঁ শোনানোর আগেই শ্রীমধুসূদন উধাও।
     শ্রীমধুসূদনের সুদের ব্যবসা ছিল। অফিসের লোকেরা নিত। তবে চটা সুদে নয়। লোকের অভিশাপ লাগবে বলে। মনে করত দুঃসময়ে পড়েছে, ধার দেওয়া মানবিক কর্তব্য। সামান্য সুদ না নিলে ওদের শোধের বালাই থাকবে না। আর ধর্মও বজায় থাকবে না,খালি হাতে দেওয়া টাকার কাছে নিজেকে অপরাধী হতে হবে,একটু প্রফেশনাল না হলে লোকে তো বোকা ভাববে। শরীরটা ইদানিং একটু বেগড়বাই লাগছে। 
  শুশীলাদেবীকে রাতে শুতে শুতে কত রাত বলেছে "কাকে কত টাকা দিয়েছে।  শুশীলাদেবীর এসব শোনার ততটা ভাল লাগত না। আবার না শুনলে তার প্রিয় শ্রীমধু যদি রাগ করে তাই শোনার ভান করত। শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে যেত শ্রীমধু টেরও পেত না। গায়ে ঠেলা দিয়ে বুঝতে পারত যেন অর্জুনের পাশে শুভদ্রা ঘুমোল। ঋণ গ্রহীতাদের কাছে পাওনা টাকার হিসেব যে সে এতক্ষন বলেছে শুনেছে তো। পেটের অভিমন্যু অন্তত শুনতে পাবে। কিন্তু সুশীলা যদি ঘুমিয়ে যায়,তাহলে তো অভিমন্যুর মতো ব্যূহ কেটে বেরনো অধরা থাকবে। এই রাতের শয্যায় তাই ত বলা। কি উপযুক্ত সময় শিখিয়ে পড়িয়ে নেওয়ার। শ্রীমধুসূদনের এসব ভাবের গতি সোকেশে সাজানো দামী ওয়াইনের মতো। সুশীলার কাছে এসবের দর নিয়ে শ্রীমধুসূদনের সন্দেহ হয়।সন্দেহ হলেও কিছুই করার নেই। শুশীলা যা তাই মানাতে হবে,অগ্নিসাক্ষী করা সাতপাকে বাঁধা পড়া বউ যে।
   কিন্তু শুশীলা শুনেও শোনে না বা শোনার ভান করে। শ্রীমধুসূদন শুশীলার সে মনের খবর রাখে না,বা নাগাল পায় না। শুশীলা শুধু বলে - "হ্যাঁ,হ্যাঁ, ওসব ঠিক আছে। দু'একটা নাম সতীশ,সুভাষ নিজের নামের বর্ণের সাথে মিল যাদের ছিল তাদের নাম যখন বলত শ্রীমধুসূদন বুঝে নিত ট্রেনিং ঠিক আছে।
  হঠাৎই একদিন শুশীলার শ্রীমধু অফিসে স্ট্রোক। সেদিন তার প্রিয় শোল অম্বল দিয়ে পেট পুরে ভাত খেয়ে অফিসে গিয়েছিল। ভেতরে অ্যাসিডের ভয়ঙ্কর বিস্ফোরণে বাড়ী ফিরে লাশ হয়ে। শকসন্তপ্ত পরিবারের পাশে কত কত মানুষ দাঁড়ালো। শ্মশানযাত্রা পারলৌকিক ক্রিয়া সম্পন্ন হল। এরপর যা হয়। বাপের বাড়ির শুশীলার ভাইয়েরা দাঁড়ালো। শুশীলা অনেক কাঠখড় পুড়িয়ে ডাইং হারনেস চাকরী জুটল। সতীশ,সুভাষের কাছে পাওনা টাকা কিছুটা উদ্ধার হলো। বাকি সবের টিকি পাওয়া যায়নি। ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে মাত্র হাজার পড়ে। ও.টি. পি.নং বলে দিয়ে প্রতারকের পাল্লায় পড়ে উনপঞ্চাশ হাজার জলে গেছে। সে কথা বলার দুঃখের বোঝায় শ্রীমধুসূদন ক'দিন খুব মন মরাও ছিল। সেকথা রমণীকান্তকে একান্তে বলেছিল। মনের দুঃখ ভুলতে। কাউকে বলতে না বলেছিল শ্রীমধুসূদন। এই দুঃসময়ে রমণী শুশীলার কাছে বড়ই উপকারী বন্ধু বলে গায়ে পড়ে দরদ দেখানোর চেষ্টা করে। শ্রীমধুসূদন রমণীকেই বেশী ধার দিয়েছিল। বিবেকহীন। অকৃতজ্ঞ তাকে বলবেন বা কে ! শ্রীমধুসূদন নেই তো।
   শুশীলা দেড় বছরের ছেলে অঙ্কনকে নিয়ে সব ভুলতে চায়। তবে যেই তাকে সহানুভূতি ও দরদভরা কথা বলতে আসে,তাকে দেখে শুশীলার কেবল মনে হয় - ইনিও একজন প্রতারক নিশ্চয়!
         ********
@ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

বুধবার, ১২ মে, ২০২১

# নাম- আমাদের পরিবার। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ শব্দ আলোচনা-বাসর। 
  #বিষয় - পরিবার।
   # নাম- আমাদের পরিবার।     
        ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

         *পরিবার* কথাটি ব্যাপকার্থে এক তাৎপর্যবাহী শব্দ। বন্ধন কথাটিকে যথার্থ রূপ দিতে এই পরিবার কথাটির এসেছে। সৌর পরিবার আদি পরিবার। ন'টি গ্রহ তার সদস্য। এই ন'টি গ্রহ যে যার ভূমিকা নিয়ে সৌর পরিবারের একটি সার্কিট।  এমনি মহাবিশ্বে কত যে অগণিত পরিবার আছে তার ইয়ত্তা নেই। 
 আমাদের পৃথিবীতেও জীববৈচিত্র্যের উপর ভিত্তি করে অগণিত পরিবার। যে যার পৃথক পৃথক বৈশিষ্ট্য নিয়ে আইডেন্টিফায়েড। তারই একটা অংশ মানব সমাজ,পরিবার তার ভিত্তি। এক একটি পরিবার যুক্ত হয়ে সমাজ,রাষ্ট্র,বিশ্ব গঠিত। 
   আমাদের পরিবার একটা বিশেষ রূপের দিকটি বোঝায়। পরিবারের অনেক স্বরূপের একটি বিশেষ স্বরূপ। 
  পরিবার ব্যক্তি সীমায়,পরিবার বৃহত্তর সীমায়। আমার, আমাদের,তোমার, তোমাদের...পরিবারকে চিনতে এইসব পরিবারের আগে সর্বনামসূচক পদ পরিবারের ব্যক্তিবিশেষের পরিচয়। বাবা মা ভাই বোন কাকা কাকিমা,পিসি....একান্নবর্তী পরিবার। আবার পরিবার একান্ন না হয়ে অনুপরিবার এখন বর্তমানের প্রবণতা। আত্মীয়স্বজন নিয়ে পরিবারের পরিচয় ক্রমবর্ধিত।
 ব্যক্তিস্বাতন্ত্র্য থেকে ব্যক্তি পরিবার যেমন,তেমনি সমষ্টি সমণ্বয়ে পরিবার আরেক বৈশিষ্ট্যে বৈচিত্র্য। পরিবারের স্বরূপ - গৃহগত,বহির্গত। বহির্গত পরিবার সাধারণত সমাজ থেকে উঠে আসে। ব্যক্তিগত পরিবারের আচরণ সামাজিক পরিবারে প্রয়োগ দিয়ে কিছু কিছু স্বতন্ত্র বিধি প্রণয়ণের দ্বারা মাত্রা ভিন্ন ধরনের হয়। তবে পারিবারিক মূল্যবোধের ছকে পরিবার ভেতরের সংসার,পরিবার বাইরের সংসার। 
  ভেতরের পারিবারিক সংসারের চলার বিধি এক,বাইরের বিধি আরেক।  বাইরের বিধিতেই নব নব স্রষ্টা - 'আয় আরো বেঁধে বেঁধে থাকি।' (শঙ্খ ঘোষ)
    এই শুভবোধে আমরা প্রত্যেকেই কোন না কোনো মোটিভে পারিবারিক আবেগে চলমান। স্মরণে,মননে,চিন্তনে পরিবার আমাদের অস্তিত্বের ভিত্তি।
 আমার পরিবার নিয়ে আমার ব্যক্তিগত পরিয়।সেই পরিচয় সবার মাঝে উন্মুক্ত করতে আমার পরিবার বহুবচনে আমাদের পরিবার হয়ে যায়। লেখক ও লেখনী সেই পরিচয়ে আজ আনন্দের শত সহস্র ধারায় পরিবারের আবেগে সমুদ্রসম কল্লোলিত,পর্বতসম উচ্চশিখর পানে ধাবিত। আর এর সৌন্দর্য- কথা ও সুরে। সকলে সকলের মন প্রাণে অন্তর্বর্তী,এক আনন্দ নিকেতন। সকলের তরে সকলে, প্রত্যেকে পরের তরে - 'NOT ME BUT YOU' 
   প্রত্যেক পরিবার গঠনের একটা ইতিহাস থাকে। ঘটনা ছাড়া পরিবার হয় না। আমাদের 'লেখক ও লেখনী' পরিবারে একাধিক ব্যক্তিগত পরিবার সমণ্বিত।
 এই 'লেখক ও লেখনী' পরিবার গঠনেরও একটা ঐতিহাসিক চমক আছে। শুরুর দিনের কেলভিন চাকমা(বাংলাদেশ),অনিশা কুমার ও আমি ছাড়া আরও কয়েক জনের মিলিত প্রয়াসে,প্রতিলিপির সবাই বন্ধু ছিলাম, জুলাই মাসের বারো তারিখ কথা হয়। ১৪ জুলাই ২০২০ পরিবারের প্রতিষ্ঠা দিবস। যারা চলে গেছে তাদের কথা নাই বা বললাম। একটা দুঃখ আছে বলে মনে করা বৃথা, যেকোনো দুঃখ হৃদয়কে প্রসারিত করে না বলে তাই ,নাই বা বললাম। 
   একে একে পিউকে( পিয়ালী চক্রবর্তী,প্রতিলিপির ওয়ান্ডার ওম্যান নামে বিশেষ পরিচিত,আমি ওকে ধরে নিলাম আমার ছোট্ট বোন করে)পেয়ে খুব উচ্ছ্বসিত হয়েছিলাম - প্রতিলিপি ভাল লেখিকা বলে, অনিশা,সুদেষ্ণা,জিৎ চক্রবর্তী (জিতের সঙ্গে পরিচয়ের সূত্র সে চিরকাল মনে থাকার মতো),চুন্নি,মৌসুমী( আমার ছাত্রী - ব্যাঙ্গালোরবাসী) তারপর পারমিতা( পারো),প্রয়াতা পল্লবীকে আনে পিউ,সৌগতকে নেওয়ার জন্য বেশ অপেক্ষা করাটা ক্রমে ধৈর্য্য হারাচ্ছিলাম(কেন তা নাই বা বললাম,থাক না) লেখক বন্ধু খুব কাছের ছিলাম বলে,তারপর তো একে যে যেমন পেরেছে এনেছে,আবার অনেকে চলে গেছে,আবার পরিবারে ইনঅ্যাকটিভ অনেককে রিমুভ করে দিয়েছি। আমার বন্ধু বৈশালী ও রজত দু'জনে কি আমরা তিনজন তিনজনের পরিপূরক। তিথিকে নেওয়া নিয়ে খুব দ্বিধায় ভুগছিলেন,আর ওকে নিয়ে এখন আমার আনন্দ ও গৌরবের শেষ নেই। শ্রেয়া( শ্রী),সৃজনী (সৃজু)ও আমার গর্বের। ঈশিতা(ঈশু) কে নিয়ে মনের মধ্যে একটা ঘটনা আছে,পরিবারের যখন একটু টালমাটাল অবস্থা হচ্ছিল। সু,অনি, চুন্নি যেন ত্রিভুজের তিনটা বাহু। এলো শর্মিষ্ঠা ভট্ট(শর্মি) খুব ভাল লেখিকা হয়ে,আরাধনা(আরু) এলো দারুণ সঙ্গী হয়ে। পারমিতা অধিকারী সৌগতবাবুর বোন, ওর কাছে আমার মতো প্রিয় দাদা নাকি হয় না,কি বিনয়,এমনটি আমার কাছে দুর্লভ সম্মান। খুব সরল উচ্ছ্বসিত প্রাণ।  অঙ্কিতা(অঙ্কু),সোমা,মৌসুমী চন্দ্র মিষ্টির মতো  দুরন্ত পারফর্মারদের পেয়ে সত্যিই আমরা আপ্লুত। 
অস্মিতা ভট্টাচার্য - ম্যাগাজিনের প্রচ্ছদ তৈরি নিয়ে পিউ নিয়ে এলো,প্রথম প্রকাশিত হচ্ছে,প্রচ্ছদ কেমন হবে খুব দ্বিধায় ছিলাম,ও নিমেষে সমাধান করে ফেলল,ওই হলো ম্যাগাজিনের স্থায়ী প্রচ্ছদকারিনী। 
     পারো একদিন খুব অভিমান করে আর আসবে না বলে চুপ  হয়ে গেল,কেননা শব্দদিনে বেশ কঠিন শব্দ হয়ে গেছে,ও না লিখতে পেরে ক্ষোভ প্রকাশ করছিল বলে একটু বকে ছিলাম। অভিমান ভাঙিয়ে আনতে বেশ কষ্ট হচ্ছিল। আর যখন এলো রুদ্ধপ্রাণের আগল খুললে যা হয় আরকি! আজ ওর গুরুত্ব ও নিজেই। সৌগত বাবুর কথায় লেডি শিবরাম। এখুনি অভিমানে অভিযোগ করল বলে - "আমি আর কে?" সরল মন নিয়ে আমাকে সবসময় ঘিরে থাকে। আর প্রসেন আমার খুব প্রাণের সাথী। বিমানের মতো ভাই আর পেলাম কই! রাজনন্দিনী ছাত্রী বলে ও একটু দুরত্ব রেখে চলে। ও কালচারাল গ্রুপের একজন সেরা পারফর্মার,ওকে পাশে রাখলে বুকে বল পাই। অনিন্দ্য তুলনা অনিন্দ্যই। শুভ ভট্টাচার্য,আবীর মহাপাত্র চাকরী ও সংসারের ব্যস্ততায় একটু কম এলেও ওরা আছে। 
     আর যাঁর কথা অবশ্যই বিশেষভাবে স্মরণ করার মতো তিনি শ্রদ্ধেয় সবার মাতাজি শিপ্রা ঘোষ। সৌগত বাবুর সৌজন্যে এলেন। ইনি প্রতিলিপিতে মাতাজি খ্যাত,আমাদের পরিবারে সেই আবেগে যেন আরও সমৃদ্ধি নিয়ে এলেন। কথনে সবাইকে স্নিগ্ধ হাসিতে রাখেন,লিখনে সবার খুব আন্তরিক লাগে,রিভিউ দানে কি মুক্তচিত্ত। 
   পরিবারের সেরা পারফরম্যান্স ত্রৈমাসিক পত্রিকা প্রকাশ। পরিবারের নিজস্ব ব্লগের ভিউয়ার পনরো হাজার ছাড়িয়ে গেছে। ফেসবুকে আমাদের সাধ্যমত লেখালেখিতে কেউ কম নই। সদ্য ইউটিউব এ আমরা পারফর্ম করতে শুরু করেছি।
  সর্বোপরি সাপ্তাহিক কর্মসূচী অনুযায়ী আমরা আলোচনায় যেভাবে সক্রিয় থাকি,সেই সক্রিয়তা দেখে যে কেউ প্রসংসায় পঞ্চমুখ হয়ে বলেন - "অনেক গ্রুপ দেখেছি,এমন সক্রিয় খুব একটা দেখিনা।"
  সবাই খুব প্রানের। সবাই খুব প্রাণিত। এমন পরিবার কোথাও পাবে নাকো, সেই তো মোদের লেখক ও লেখনী পরিবার, আর কি চাই, সবার সেরার সেরা আমাদের পরিবার।
                           *********
@ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস। 

রবিবার, ৯ মে, ২০২১

পাওনার পাকে(সুদেষ্ণা দত্ত)

 


পাওনার পাকে

 সুদেষ্ণা দত্ত 

 অভিরাম বাবুর বাড়ীতে কান্নার রোল উঠেছে।পাড়াপ্রতিবেশীরাও সন্ধ্যা বেলা সেই শুনে ওনার বাড়িতে উপস্থিত।কিছুক্ষন আগেই হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে গত হয়েছেন ব্যবসায়ী অভিরামবাবু।এদিকে অভিরামবাবু দেখছেন দুজন সিং ওয়ালা ষন্ডামার্কা কালো,মোটা লোক তাঁকে কোথাও নিয়ে চলেছে।তিনি বেশ হাল্কা বোধ করছেন,যেন হাওয়ায় ভেসে চলেছেন।চুলগুলো উড়ে এসে মুখে লেগে সুড় সুড়ি দেওয়ায় এমন জোরে হেঁচে উঠেছেন যে লোক দুটো তাকে এক ধমক দিল যাত্রায় ব্যাঘাত ঘটছে বলে।একজন তো বিরক্তিতে বলে উঠল লোকটা কি খেত বলত—সিমেন্ট,না পাথর,নাকি তুলোর বস্তায় জল পড়েছে!এমনিতে বিশাল বপু অভিরামবাবু গজগমনই করেন।লোক দুটো আর এক কালো মোষের মত লোকের সামনে নিয়ে গিয়ে বলল ৪২ নম্বর দ্বারকা নাথ লেনের অভিরাম বাবুকে তারা নিয়ে এসেছে।অভিরামবাবু এতক্ষনে অনুধাবন করলেন তিনি মারা গিয়েছেন এবং যমরাজের সামনে দাঁড়িয়ে আছেন।এদিকে চিত্রগুপ্তেরও ডাক পড়েছে।কিন্তু পক্ককেশ পাকা দাড়ি চিত্রগুপ্ত তাঁর জাবদা খাতা দেখে জানান এ লোক সে লোক নন।তবে ভুল কোথায়! সবার মাথায় আকাশ ভেঙে পড়ে।চিত্রগুপ্ত যম দূতদের বলেন তৎক্ষণাৎ অভিরামবাবুকে মর্ত্যে ফিরিয়ে দিতে হবে।ভুল ধরা পড়ল যখন জানা গেল,মর্ত্যের মত সব জায়গায় অনভিজ্ঞ চুক্তিভিত্তিক কর্মচারী রাখা হচ্ছে।সেই ব্যক্তি স্বল্প শিক্ষিত।তিনি সবটা খেয়াল না করে চিরকুটে লিখে দিয়েছিলেন ৪২,ওটা হবে ৮২।চিত্রগুপ্ত অভিরামবাবুকে জানান মর্ত্যে তাঁর ১১.৫০ টাকা পাওনা আছে।যতদিন না তিনি সে টাকা ফেরত পাচ্ছেন ততদিন তিনি মরতে পারবেন না।অভিরাম বাবু স্বর্গপুরীর অনেক গল্প শুনেছেন।তিনি আর রোজকার তেল,নুনের হিসেব আর গিন্নীর খিটখিটের মাঝে মর্ত্যে ফিরতে চান না।কিন্তু তা বললে শুনছে কে!যমালয়েরও কিছু আইন-কানুন আছে।               এদিকে অভিরামবাবু আবার দেহ ধারণ করেছেন।সমবেত লোকজন তা দেখে স্বাভাবিকভাবেই পগার পার।অভিরাম বাবু মাথা চুলকেও মনে করতে পারছেন না কার কাছে তাঁর ১১.৫০ টাকা পাওনা আছে।মোবাইলের দোকানে গিয়ে খোকনকে জিজ্ঞেস করতেই সে কোনো মতে পাওনা নেই বলেই ভয়ে ঝাঁপ নামিয়ে দেয়।ওষুধের দোকানদারও একই ভূমিকা নেন।মুদিখানার দোকানদার রতুকে অনেক কষ্টে বোঝাতে সক্ষম হন তিনি ভূত নন, তিনি জীবিত।কিন্তু ততক্ষণে রতুর দাঁত-কপাটি লেগে গিয়েছে। বাড়ীতে ফিরেও এক অবস্থা।কেউ দরজা খোলে না।শেষে গিন্নীকে একটা দামি শাড়ির টোপ দেওয়াতে দরজা খুললে, তিনি বোঝাতে পারেন তিনি মারা যাননি।এদিকে দিন চলে যায়।তিনি কিছুতেই জানতে পারেন না,কোথায় তাঁর পাওনা আছে।মনে অস্বস্তি চলতে থাকে।প্রত্যহ নানা জায়গায় খোঁজ নেন।গিন্নীও স্বামীর নব জন্ম হওয়ায় তাঁকে আর খিটখিট করেন না।এদিকে গিন্নী যম পুরীর কোন ঘটনাই জানেন না।একদিন তিনি দিবা নিদ্রা দিচ্ছেন মনে করে গিন্নী পাশের বাড়ীর রমলা বৌদিকে একটা শাড়ী দেখিয়ে গল্প করছেন যে,ভাই চারদিকের যা পরিস্থিতি দোকান বাজার যাওয়া তো বন্ধই হয়ে গিয়েছে।তাই অনলাইনে এই শাড়ীটা কিনেছি।ডেলিভারি চার্জ নিল ১১১.৫০টাকা।কর্তাকে না বলে কোনদিন একটা টাকাও এধার ওধার করিনি।কিন্তু এই মাগ্গি গণ্ডার বাজারে চাইতে কেমন লজ্জা করল।তাই ১১.৫০ টাকা ওনার পকেট থেকেই দিলাম।আঁতকে উঠলেন অভিরামবাবু।ভাবলেন যমরাজ শুনতে পেলেন না তো!পরক্ষণেই ভাবলেন এই টাকা তো পাওনা নয়,এই টাকার উপর স্ত্রীর অধিকার আছে।তিনি জানেন যে এই টাকা তিনি কোন দিনই ফেরত পাবেন না।একেই যদি চিত্রগুপ্ত পাওনা বলেন,তবে এজন্মে আর তাঁর মৃত্যু হল না।মনের ভার লাঘব হয়েছে এতদিনে।জোরে জোরে নাক ডাকতে লাগলেন অভিরাম বাবু। 


  ©কপিরাইট রিজার্ভড ফর সুদেষ্ণা দত্ত।

ছবি সৌজন্য--গুগুল

রবিবার, ২ মে, ২০২১

# বিষয় - আধ্যাত্মিক। # নাম- সীতার সহিষ্ণুতা। ✍ মৃদুল কুমার দাস।

শুভ আধ্যাত্মিক আলোচনা-বাসর। 
 # বিষয় - আধ্যাত্মিক। 
#নাম- 
      *সীতার সহিষ্ণুতা।*
  ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

     ভারতীয় জীবন-দর্শন ও জীবনাদর্শের ভিত্তি রামায়ণ ও মহাভারত। মহাভারত তো বলেই দিয়েছে যা নেই মহাভারতে,তা নেই ভারতে। আর রামায়ণ হল ভারতীয় আদর্শ যে অতিথি দেবভবঃ,রাজকাহিনীর প্রাধান্য বাল্মীকি রামায়ণের মূলকাহিনীর রূপান্তরে বহুজাতি যে প্রাণের কথা পেয়েছিল তাই নিয়ে ভারতবাসীর গর্বের শেষ নেই। 
  বাল্মীকির রামায়ণ মহাভারতের পরে রচিত হয়,অথচ মহাভারতের আগে শেষ হয় বলে রামায়ণকে আদিকাব্য বলা হয়। দুই মহাকাব্যে বীর রসের প্রাধান্য থাকলেও,অন্যান্য ভাষায় যখন কাব্যখানি রচিত হয়েছে তখন কাব্যখানির কাহিনী কাঠামো ঠিক রেখে যে যার সংস্কৃতির ধারক ও বাহক হয়েছে। বিশেষ করে রামায়ণ ব্রহ্মদেশ,শ্রীলঙ্কা প্রভৃতি দেশে রামায়ণের আজও জনপ্রিয়তা তুঙ্গে।
 এই জনপ্রিয়তার পেছনে কাহিনীর অনেক গুরুত্বপূর্ণ দিকের মধ্যে সীতার সহিষ্ণুতা একটি অন্যতম দিক। 
  বাঙালিয়ানায় বাল্মীকি রামায়ণের মূল কাহিনী অব্যাহত রেখে কাহিনীর অনেকাংশে গ্রহণ বর্জন লক্ষ্য করি কৃত্তিবাসী রামায়ণে। কৃত্তিবাসী রামায়ণের কাহিনী যা বাঙালির গার্হস্থ্য ও পারিবারিক জীবনের কাছে যাতে অত্যন্ত রসগ্রাহী হয়, সেদিকে লক্ষ্য রেখে কৃত্তিবাস তাঁর সীতাকে বাঙালির ঘরের বধূর হুবহু আদলে গড়ে তুলেছেন। 
 সীতা বাঙালি ঘরের আদর্শ বধূ হিসেবে উপস্থিত। বাঙালি রমণীর মধ্যে যে সহিষ্ণুতাশক্তি সীতা তারই পূর্ণ প্রতিভূ। 
  ধরিত্রী-কন্যা। ধরিত্রীর মতো তিনি সর্বংসহা। পতিব্রতা। সত্যরক্ষার্থে রাজ অন্তঃপুরের সুখৈশ্বর্য ছেড়ে স্বামী অনুগামীনী হলেন বনবাসের দুঃখের তপস্যাকে সাদরে গ্রহণ করলেন। বনবাসের থাকার সময় মেয়েদের স্বাভাবিক দুর্বলতা সোনায় সাময়িক লোভ(স্বর্ণহরিণ) থেকে পাপের ফল রাবণের পরস্ত্রী অপহারকের ইচ্ছার অধীন হতে বাধ্য হলেন। নির্বাসন স্বর্ণ লঙ্কায় - বনবাস থেকে নির্বাসন লঙ্কার অশোককাননে ঠিকানা। সীতা স্বামীসঙ্গ সুখ থেকে বনবাসের চেয়েও আরও গভীরতর একাকীত্বের সহনশীলতার পরীক্ষার মাঝে পড়লেন। রাক্ষসী (চেঁড়ি) পরিবৃত দেবকীর কারাবাসের মতই দুঃখ ছিল নিত্যসঙ্গী। এই বিভূঁয়ে বিভীষণ পত্নী সরমা সুখ-দুঃখের যদিও সঙ্গী ছিলেন,সে সঙ্গ তো আর রাম ও লক্ষ্মণের সাথে থাকার চেয়ে মধুর তো নয়ই,বাড়তি অনবরত টেনশন স্বামী রঘুপতির এই দুর্ভেদ্য স্বর্ণালঙ্কার ভেদ করে,দুর্বৃত্য রাবণকে বধ তাঁকে উদ্ধার করা কি সম্ভব! সে তো চাট্টিখানি কথা নয়। সফল কি হবেন? একেবারে প্রিয় পরিজন বিহনে বন্দীজীবনের দুঃখের কথা সে বলার নয়। সরমা বড়জোর ক্রাইসিসপূরক। কিন্তু সীতার এই দুঃখের সহনশীলতায় বাঙালির চোখের জল বাঁধ মানেনি। সীতার সহনশীলতার এমন লঘুপাপে (সোনার হরিণ আকাঙ্খাপূরণ) গুরুদন্ড লাভে ধরিত্রীমাতা তার কন্যার প্রতি এমন অবিচার সহ্য করছেন কীকরে? তিনি সহ্য করবেন তো,মাতা ধরিত্রী যে তিনি। তাঁর কন্যা তো তেমনই হবেন। 
   সীতার সহিষ্ণুতার আরো কঠিন পরীক্ষার বাকী - এর চেয়েও ভয়ঙ্কর পরিণতি যে সামনে সীতা তা মনেও ভাবেননি। বিভূঁয়ে থাকার জন্য সীতাকে অগ্নিপরীক্ষা দিতে হলো পবিত্রতা সন্দেহে। স্বামীর সন্দেহ। কোনো প্রশ্ন না করে পতিব্রতা মনপ্রাণে বলেই,তিনি নির্দ্বিধায় পরীক্ষা দিলেন। 
 এবার অযোধ্যায় সীতাসহ রাম ফিরলেন। রাম রাজা হলেন।  কিন্তু রাজমাতাকে নিয়ে প্রজার মধ্যে কানাঘুষো - মহারানী কতটা পবিত্র। আবার সীতার বনবাসে নির্বাসন। এদিকে সোনার নকল সীতা বানিয়ে রামের রাজসূয় যজ্ঞ, আর ওদিকে বাল্মিকী আশ্রমে একাকী বনবাসে। শত দুঃখের মধ্যেও যেটুকু সুখ লব-কুশকে নিয়ে সন্তানবাৎসল্য। এখানেই নারীর পূর্ণতা। শত দুঃখের সহিষ্ণুতার মাঝে ওয়েসিস ( মরুভূমিতে মরুদ্যান)।
    সেই যে সীতার পিছু পবিত্রতার প্রশ্ন সীতাকে ঘিরে। লব-কুশের জন্য তাদের মা আবার অযোধ্যা ফিরলেন বটে কিন্তু অগ্নিপরীক্ষা তাঁর পিছু ছাড়ে না। আবার অগ্নিপরীক্ষা প্রজার সামনে। রামের প্রজানুরঞ্জক আদর্শ প্রতিষ্ঠার জন্য। সীতার এই বারবার অগ্নিপরীক্ষা এও সহ্যের শেষসীমায় পৌঁছলে তার একটা ফল তো ফলবেই - সীতার পাতাল প্রবেশ। সীতার এই সহিষ্ণুতার জন্য রামায়ণকে সীতাসর্বস্ব বাঙালির পাঁচালী কাব্য বলা হয়। 
  আর যুগ যুগ ধরে সীতার এই সহিষ্ণুতার মূলে নারীশক্তির সামর্থ কতটা তা প্রমাণিত। সীতার এই সহিষ্ণুতাই তার প্রমাণ। এর থেকেই নারীশক্তির প্রতি সমীহ আসাই আমাদের আদর্শের প্রতীক হয়েছে। সীতাসর্বস্ব রামায়ণ আমাদের সেই শিক্ষাদান করে। সীতা,সাবিত্রী,বেহূলা প্রমুখ ভারতীয় সহিষ্ণুতার প্রতীক। যুগে যুগে নারী এই গুণে তাঁর প্রাপ্য সম্মান আদায় করে আসছে। যে সমাজ যত সম্মান দিয়েছে সেই সমাজ তত অগ্রগতি লাভ করেছে। সীতা,সাবিত্রী,বেহূলা তারই পথ প্রদর্শক। 
             ********
 @কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

শনিবার, ১ মে, ২০২১

# নাম- জৈব অস্ত্র ও করোনা। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।


 # নাম- 'জৈব অস্ত্র ও করোনা।'
  ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

     জৈব যুদ্ধ বা বায়োলজিক্যাল ওয়ার হল জীবাণু-অস্ত্র নিয়ে যুদ্ধ। শত্রুপক্ষের প্রতি এই জৈব অস্ত্রের আঘাত হেনে ঘায়েল করার পদ্ধতি হল জৈবযুদ্ধ। জৈব যুদ্ধের ইতিপূর্বে জীবাণু অস্ত্র  যেমন- স্মলপক্স,অ্যানথ্রাক্স,প্লেগ প্রভৃতি। কোভিড-১৯ এই ধারায় নতুন সংযোজন। 
  বায়োলজিক্যাল সায়েন্সের প্রভূত উন্নতি থেকে এই জৈব অস্ত্র বা জীবানু অস্ত্র এসেছে। বিজ্ঞানী মহলে ভয়ানক আতঙ্ক তৈরী হয়েছে। অভিমন্যুর মত চক্রব্যূহে প্রবেশের উদ্দেশ্য ও লক্ষ্য আছে,কিন্তু তার হাত থেকে মুক্তির উপায়ের পথ জানা নেই, কারণ প্রতিরোধকারী অ্যান্টিবায়োটিক বা ভ্যাকসিন বিজ্ঞানীদের হাতে নেই বলে। জীবানু অস্ত্র  নিয়ে বিজ্ঞানীদের কাছে আতঙ্কের বিস্তর কারণ হল- জীবাণুর জেনেটিক কোড অর্থাৎ  DNA-এর গঠনগত ও অবস্থানগত বদল ঘটিয়ে নতুন নতুন জৈব অস্ত্র তৈরী করা যায় বলে। বিপদ জৈব টেররিস্টদের নিয়ে। একসময় মানবক্লোন হাতানোর জন্য তাদের ক্ষিপ্রগতিলাভ মানব সভ্যতা এই রসাতলে যায় যায় অবস্থা। তার হাত থেকে যদিও রেহাই পাওয়া গেল  কিন্তু জৈব অস্ত্রের হাত থেকে রেহাই কারো নেই। সে জৈব অস্ত্র কাউকে বাছবিচার করেনা। টেররিস্টরাও না।
  কোভিড-১৯ জৈব অস্ত্র হিসেবে বিশ্ব-স্বীকৃত। বিশ্বের অভিমত - কানাডার উইন্নিপগের পি-৪ ন্যাশনাল মাইক্রোবাইলোজি ল্যাব থেকে করোনা ভাইরাসের স্যাম্পল চুরি করেছে চিনে উহানের ল্যাবের এক গবেষক। সেই জীবানুর জেনেটিক মিউটেশন ঘটিয়ে করোনা ভাইরাস হিসেবে বিশ্ববাজারে মুক্তি দিয়েছে চিন। 
 এখন যা বিশ্বের অবস্থা দেখছি তা করোনার ট্রেলার চলছে মাত্র। চিন এই কুকীর্তির প্রযোজক বলে বিশ্বের দিকে দিকে চিন নিন্দিত। সে নিন্দার ঢেউ সামাল দেওয়া ঢং ছিল তুমি মেরে উড়িয়ে দেওয়ার। বিশ্ব পারেনি চিনতে এক ঘরে করার রক্তচক্ষুর ভয় দেখাতে। কারন চিন ধনী দেশ। আমেরিকার সমকক্ষ। বিশ্বস্বাস্থ্য সংস্থার সে এক প্রধান পরিচালকের ভূমিকায় অর্থ বিনিয়োগ করে। ইতিহাস  সেই সাক্ষ্য দিয়ে যাবে যতদিন পৃথিবী বেঁচে থাকবে।
   অস্ত্র দুই শ্রেণীর- পারমাণবিক অস্ত্র ও জৈব অস্ত্র। পারমাণবিক অস্ত্রে একসময় বিশ্বের ভয়ঙ্কর সঙ্কট নেমে এসেছিল। সে দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়। 
      পারমাণবিক অস্ত্র ব্যবহারের রাষ্ট্রনায়কদের অসুবিধা - এটি প্রয়োগে অনায়াসে দেশ চিহ্নিত হয়। ব্যায়সাপেক্ষ। কিন্তু জৈব অস্ত্র তৈরীতে খরচ কম। লক্ষ্য বস্তুর উপর প্রয়োগের ফল কিছু সময় নেয় সত্য,তার ফল সুদূরপ্রসারী,পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও। অস্ত্র বহন ও ছড়ানো সহজসাধ্য। জৈব অস্ত্রের প্রতিক্রিয়া বিলম্বিত বলে,এটি প্রয়োগের হোতা থাকেন নেপথ্যে। আর উৎস ও সংক্রমন পদ্ধতি সনাক্ত করা দুঃসাধ্য ব্যাপার হয়ে দাঁড়ায়। জৈব অস্ত্রের গতিপ্রকৃতি সাধারণ মানুষের কাছে অধরা বলে মানুষ ধ্বংসের মুখোমুখি হয় বেশী। পারমাণবিক অস্ত্রের চেয়েও ভয়ঙ্কর কতটা করোনা তারই নমুনা।
  আমাদের শরীর জীবানুর সঙ্গে অহরহ লড়াই করে অস্তিত্ব বজায় রেখেছে- strangle for existence - তবে জীবানু DNA মিউটেশন ঘটিয়ে মানুষের ইমিউনিটি পাওয়ারকে চ্যালেঞ্জের মুখে ফেলাই হল জৈব অস্ত্রের অসৎ উদ্দেশ্য। এমন জৈব অস্ত্র অ্যানথ্রাক্স একসময় বিশ্বের মানবসভ্যতার থরহরিকম্প অবস্থা হয়েছিল। এই জৈব অস্ত্র হিসেবে অ্যানথ্রাক্সের স্পোর্টস পাউডারে মিশিয়ে খামে ভরে ডাকে পাঠানো হত নানা জনের কাছে। সংক্রমিত ব্যক্তি আক্রান্ত হত পালমোনারি অ্যানথ্রাক্সে। শুরু হত শ্বাসকষ্ট,কাশি,রক্তপাত ও শেষে মৃত্যু। গবাদি পশু থেকে বেশী সংক্রমন ঘটত।
   জৈব অস্ত্র প্লেগ রোগকে ছড়ানো হয়েছিল ratflia-এর মাধ্যমে। একটা মানুষের রক্তে প্লেগ প্রবেশ মানে কমপক্ষে দশ হাজার  মুহূর্তে সংক্রমিত হয়ে পড়ত।
  বিশ্ব এখন জৈব যুদ্ধের আশঙ্কায় ভুগছে। আমাদের মত তৃতীয় বিশ্বের দেশগুলোর অবস্থা শেষের সেদিন কি ভয়ঙ্কর অবস্থার মত। বিশ্বে তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধ আসন্ন, যার অস্ত্র জৈব অস্ত্র। ২০২০ এই তৃতীয় বিশ্বযুদ্ধের করোনার ক্রান্তিকাল। দেশে করোনা মিউটেশন করে নিয়ে নতুন নতুন স্ট্রেন তৈরী হচ্ছে। ভারতীয় স্ট্রেন এখন  বিশ্বের কাছে ভয়ঙ্কর আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে। কি হয়! কি হয়! থেকে কি হবে! কি হবে! উত্তর নেই। শুধুই মৃত্যুর মিছিল! লাশের পরে লাশের পাহাড়,মানুষ বড় অসহায়। ধ্বংসের মুখোমুখি।
                **********
@ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...