#অবসরের_সঙ্গী🍂
#জয়_ঘোষ🖋️
|| ১ ||
"তোর এত ব্যস্ততা সৌরাংশু? গত একমাস লকডাউন চলাকালীন তুই আমাকে একবারও ফোন করিসনি! যতবার আমি করেছি ততবার তুই বলেছিস, পাপড়ি এখন ফোন রাখ আমি একটু পরে করছি। তোর মনে আছে সৌরাংশু, আগে যখন তুই আমার সঙ্গে কথা বলছিস কিভাবে ঘন্টার পর ঘন্টা কেটে যেত আমরা বুঝতেও পারতাম না! আর সেই তুই কিনা এখন সামান্য এই কটা দিনের লকডাউনে এতটা পাল্টে গেলি? এতটা পরিবর্তন কি সম্ভব সৌরাংশু?"- কথাগুলো এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলল পাপড়ি।
তবে ফোনের ওপারে থাকা সৌরাংশু নতুনত্ব কিছুই না বলে আবার সেই একি কথা বলল,,এখন ফোনটা কাট আমি একটু পরে কল ব্যাক করছি।
বেচারা পাপড়ি রাগে-দুঃখে অভিমানে ফোনটা ছুড়ে ফেলে দিলো দরজার দিকে। তৎক্ষণাৎ রান্নাঘর থেকে চেঁচিয়ে উঠল ওর মা,, তোর কী হয়েছে বলতো পাপড়ি? সব সময় এরকম মেজাজ তিরিক্ষি করে রেখেছিস! ভালো করে কথা বললে কথা বলিস না? সাতটা কথা জিজ্ঞাসা করলে একটা উত্তর দিস! আজকে ফোনটাও পর্যন্ত ভেঙে ফেললি।
পাপড়ি মায়ের কথার একটাও উত্তর না দিয়ে দরজা খুলে লিফট দিয়ে উঠে গেল ফ্ল্যাটের ছাদে। আকাশের ঐ সাদা মেঘের মধ্যে কালো মেঘের আড়ালে লুকিয়ে থাকা বৃষ্টির সম্ভাবনা দেখে পাপড়ির চোখ থেকে অঝোরে জল পড়তে থাকলো। চোখের সামনে ভাসতে লাগল সৌরাংশুর সঙ্গে কাটানো দিনগুলোর কথা।
স্কুল জীবনের সমাপ্তি ঘটিয়ে কলেজে ওঠার শুরুতেই সৌরাংশুর সঙ্গে আলাপ হয়েছিল পাপড়ির। কয়েকটা মেয়ে বন্ধু ছাড়া আর তেমন কারো সাথে আলাপ ছিল না পাপড়ির নতুন কলেজে।
তারপর পাপড়ি প্রথম যেদিন সৌরাংশুকে দেখল একবারের জন্য চোখের পাতা ফেলতে পারেনি। কি নিখুঁত ভাবে তৈরি ছেলেটা। রূপে-গুণে কিছুতেই খামতি নেই। ব্যবহারটাও অদ্ভুত সুন্দর। খুব সহজেই সকলকে আপন করে নিতে পারে সৌরাংশু, এমনটাই ভেবেছিল পাপড়ি। কলেজের প্রায় অর্ধেক মেয়েরই ক্রাশ ছিল সৌরাংশু। সব মেয়েরা সেটা প্রকাশও করতো। কিন্তু পাপড়ি কখনো এমনটা ভাবিনি সৌরাংশু কে নিয়ে। এই ভাবেই চলছিল বেশ কয়েকটা দিন। তারপর সেদিন কলেজ ফেস্টে প্রথম ভালো ভাবে আলাপ হলো পাপড়ির সঙ্গে সৌরাংশুর।
–এই পাপড়ি.. তোকে কিন্তু তুই বলেই ডাকছি। এক্ষুনি যেন আবার বলিস না,, হাউ ডেয়ার ইউ সে দ্যাট!
–নারে আমি এমন কথা বলবো না। ক্লাসমেট কে তুই বলে সম্মোধন করবি এতে আবার সাহসের কি আছে?
–বাব্বা শান্তি। সব সময় যেমন গম্ভীরমুখে থাকিস, আমিতো ভাবলাম বোধহয় তুই খুব রেগে যাবি...
–ছার। তো তুই বল তোর কথা !
–আমার কথা নতুন করে কি বলব বল? আজ ছ-মাস কলেজে আসার পর থেকে তো দেখছিসই আমাকে। তা তোকে কিন্তু আজ বেশ সুন্দর লাগছে।
–রিয়েলি?
–হ্যাঁরে। যেমন নাম নাম পাপড়ি, ঠিক তেমনি পোশাক গোলাপি শাড়ি। দাড়া একটা সেলফি তুলি তোর সঙ্গে।
সৌরাংশু হট করে পাপড়ির ঘাড়ে হাত দিয়ে বলল,, একটু মিষ্টি করে হাসো বন্ধু!
সৌরাংশুর এমন ব্যবহারে পাপড়ির নরম মনের মধ্যে কোথাও একটা সৌরাংশুর প্রতি ভালোবাসা জন্মে ছিল সেদিন। এরপর থেকে ক্লাস চলাকালীন দুজনেই একে অপরের দিকে তাকিয়ে থাকত সব সময়। সৌরাংশু এটা সেটা নিয়ে ইয়ার্কি করত মাঝেমধ্যে চোখের ইশারাতেই।
তারপর সময় সময়ের মত চলতে থাকলো। কলেজ জীবনের অর্ধেকটা দিন পেরিয়ে গেল। আজ সৌরাংশু পাপড়ি অনেকটাই খোলামেলা ভাবে নিজেদের কথা নিজেদের বলতে পারে। যাকে বলে, বেস্ট ফ্রেন্ড হয়ে গেছে দুজনে।
তবে কেন এত দূরত্ব?
ভরা জ্যৈষ্ঠের গরমকে ঠান্ডা করতেই বোধহয় আজ বিকেলে একটু বৃষ্টি নামবে। হঠাৎই আকাশের গর্জনে সম্বিত ফিরল পাপড়ির। তারপর দুটো হাত দিয়ে চোখের জল মুছে নিজের মনে মনেই বিড়বিড় করে উঠলো,"তুই এতটা বদলে গেলি কি করে রে সৌরাংশু? আমি যে তোকে ছাড়া এক মুহূর্তও থাকতে পারছি না।"
|| ২ ||
"এই শোন অংশু আমার কিন্তু একদম ভালো লাগছে না। এত দিন হয়ে গেল অথচ তুই আমাদের রিলেশনশিপটা গোপনে রেখেছিস! তুই আজকে ফেসবুকে পোস্ট করবি, ইন এ রিলেশনশিপ উইথ সুস্মিতা চক্রবর্তী। আর আমারটাতে থাকবে সৌরাংশু মিত্র। ওহ কি সুন্দর লাগবে দেখতে!"-ফোনের ওপার থেকে ভিডিও কলে কথাটা বলল সুস্মিতা।
"আরে আর কিছুদিন অপেক্ষা কর না। সময় তো আর পার হয়ে যাচ্ছে না। কয়েকদিন পরেই দেব"-সৌরাংশু বলল।
"মানে?? কিছুদিন কিছুদিন করে তো তিন মাস কাটিয়ে ফেললি!"
"আচ্ছা দাঁড়া, দেব আজকেই। তার আগে একটা কিস দে..."
"কোন কথা নয়। আগে যেটা বললাম সেটা কর"
"ওকে করছি।"
অঝোরে বৃষ্টিতে একটানা ভিজে ছাদ থেকে নেমে ঘরে গেল পাপড়ি। খেয়াল করল ফোনটা মা মেঝে থেকে তুলে চার্জে বসিয়ে রেখেছে। ওয়াশরুম থেকে বেরিয়ে চুলগুলো ছেড়ে দিয়ে মুঠো ফোনটা হাতে নিয়ে সৌরাংশুর কললিস্টে গিয়ে দেখল লাস্ট এক মাস, মাত্র পনেরো থেকে কুড়ি সেকেন্ড কথা বলেছে দুজনে। মাস চারেক আগে এক ঘন্টা কুটি মিনিট দু ঘণ্টা দশ মিনিট এর রেকর্ডিং কল গুলোর হঠাৎই একটাতে আঙ্গুলের টার্চ লেগে বাজতে শুরু করলো,,
–ভুলে গেলে বন্ধু? কালকে তো একবারও ফোন করলি না পাপড়ি!
–আরে কাল একটু কাজ ছিল রে।
–রাখতো… তুই তোর কাজ। আমার সাথে কথা বলাটাও তো তোর একটা কাজের মধ্যেই পড়া দরকার নাকি!
–হুম...সেটা তো মাথায় আসেনি।
–তা আসবে কেন? সারাদিন ওই বইয়ের মধ্যে মুখ গুঁজে রাখলে আমার কথা কি আর মনে পড়ে!! যাইহোক, আজ সন্ধ্যাবেলায় একটু বেরোবি দরকার আছে।
–দরকার মানে? আজ সন্ধ্যাবেলায় আমাকে পড়াতে যেতে হবে।
–হ্যাঁ... পরিয়ে তুমি উদ্ধার করে দিচ্ছ! যেটা বললাম সেটা করবি। আসতে বলেছি আসবি।
সৌরাংশু এমন ভাবেই পাপড়িকে প্রত্যেকটা ব্যাপারে জোর করত। তবে কিন্তু পাপড়ি কিছু মনে করতো না বরং এর থেকে সৌরাংশুর প্রতি পাপড়ির ভালোবাসা আরো দ্বিগুন বেড়ে যেত। তার থেকেই সৌরাংশুর উপর পাপড়ির একটা অধিকারবোধ জন্মেছিল।
কলেজে যেদিন সৌরাংশু না যেতো পাপড়িকেও যেতে দিত না সেদিন। পাপড়ি জিজ্ঞাসা করলে সৌরাংশু বলতো,"আমি যাচ্ছি না যখন বেকার তুই কি করবি! তার থেকে যেদিন যাব একসাথেই যাব। আর যেদিন যাব না একদমই যাব না।"
দূর্গা পূজায় ঠাকুর দেখতে যাওয়া থেকে শুরু করে বড়দিনের ঘুরতে যাওয়া পর্যন্ত সমস্ত জায়গাতেই সৌরাংশু পাপড়িকে নিয়ে ঘুরতে ভালোবাসতো। পাপড়ি মাঝেমধ্যে ঠোঁট ফুলিয়ে বলত,"সব সময় যদি তোর সঙ্গে বের হয় তাহলে বাকি বন্ধুদের সাথে কখন ঘুরবো!" পরিবর্তে সৌরাংশু বলতো,"হুম... বাকি বন্ধু? নাটক? তোর আবার কটা বন্ধু আছে রে! শুধু তো আমিই আছি।"
পাপড়ি সৌরাংশুর এই 'আমিই আছি' কথাটা শুনে আহ্লাদে ডগোমগো হয়ে মনে মনে বলত, "হ্যাঁ শুধু তুইই থাক। তুই আমার পাশে থাকলে আমার আর কাউকে প্রয়োজন নেই। তোকে নিয়েই আমি নতুন করে শুরু করতে চাই সৌরাংশু..."
মনে মনে বললে কি হবে মুখে কোনো দিনই এমনকি এখনও পর্যন্ত সৌরাংশু কে পাপড়ি বলতে পারিনি যে, "সৌরাংশু আমি তোকে ভালোবাসি"…
রেকর্ডারটা থামিয়ে গ্যালারিতে গিয়ে সেবার দুর্গাপুজোর বেশ কিছু ছবি দেখে পাপড়ি মনে করার চেষ্টা করলো সপ্তমীর সেই সন্ধ্যাটার কথা।
–তোকে এত সুন্দর একটা জামা গিফট করলাম আর সেটা তুই পড়লি না সৌরাংশু? আমি কত আশা নিয়ে ছিলাম যে, আজ ওই পিংক কালারের শার্টটা তুই পরবি।
–এই তুই থাম তো। ওই পিঙ্ক শার্টটা পড়লে আমাকে পুরো লেডিস লেডিস লাগবে। তোরও যেমন পছন্দ!
নীরব পাপড়ি একটু অভিমান মিশ্রিত মুখ নিয়ে চুপচাপ দাড়িয়ে রইল। অনেকক্ষণ পাপড়ি কোনো কথা বলছে না দেখে চিৎকার করে উঠল সৌরাংশু।
–কিরে কোন কথা বলছিস না কেন? না পোষায় চলে যা...। এরকম ভ্যাবলার মত মুখ করে দাঁড়িয়ে থাকিস না আমার চোখের সামনে। ওসব রাগ ফাক আমাকে দেখাতে আসবি না একদম। ছিলিস তো ওই কলেজে চুপচাপ পড়ে। কেউ তোর দিকে ফিরেও তাকাতো না। আমি তোর সঙ্গে কথা বলেছিলাম বলেই না তুই একটা ভালো বন্ধু পেলি। তাই এসব নাটক আমাকে দেখাতে আসিস না।
সেই সপ্তমীর সন্ধ্যায় পাপড়ি আর ভালোভাবে হাসতে পারিনি। সেদিন তাড়াতাড়ি বাড়ি ফিরে ছিল ওরা। একদিন কোনো কথা বলিনি সৌরাংশুর সাথে। তারপর হঠাৎই পরের দিন ফোন করে সৌরাংশু।
–এ তাড়াতাড়ি বেরো। একটু কলেজ স্ট্রিটে যেতে হবে কতগুলো বই কেনার আছে!
পাপড়ি নিরব।
–কিরে কোন কথা বলছিস না কেন? যাবি কি যাবিনা পরিষ্কার করে বল।
পাপড়ি ইচ্ছা করেই বললো,
– না রে আমার একটু কাজ আছে। আজ যেতে পারবো না।
–ঠিক আছে যেতে পারবি না তো! কথাটা মনে রাখিস।
সৌরাংশু কে হারানোর ভয়ে একটু ভেবে পাপড়ি বলল, যাবো।
তারপর সেদিনই সবকিছুই মিটমাট হয়ে গেছিল সৌরাংশুর সঙ্গে পাপড়ির। পাপড়ি সেদিনের পর থেকেই বুঝেছিল 'যার উপর সে অভিমান করেছে সে নিজেই তার অভিমান এর মান দেয় না। ফলে বেকার নিজে কষ্ট পেয়ে লাভ নেই'। তবে লাস্ট কয়েক মাসে সৌরাংশুর থেকে এতো অবহেলিত হয়ে পাপড়ি খুবই ভেঙে পড়েছে।
সবে সন্ধ্যে হল,, চারদিকে শঙ্খর ধ্বনি আর সুন্দর ধুনোর গন্ধে পাপড়ির মনটা একটু হালকা হলো। আর নিজের মনেই এটা ভেবে খুশি হলে যে,, আরতো মাত্র কয়েকটা দিন তারপরেই তো লকডাউন কেটে যাবে, তখন সব কিছু ঠিক হয়ে যাবে। সৌরাংশু আবার আগের মত হয়ে যাবে। তখন পাপড়ি বলবে নিজের মনের কথা সৌরাংশু কে। ফোনটা হাতে নিয়ে ফেসবুকটা অন করল পাপড়ি। তৎক্ষণাৎ স্ক্রিনে যে দৃশ্য টা দেখল তাতে হাতপা ঠক ঠক কাঁপতে থাকলো পাপড়ির।
|| ৩ ||
"হলো এবার তোর শান্তি! মাথা খারাপ করে দিচ্ছে একেবারে রিলেশনশিপ প্রচার করার জন্য।"-আলতো করে সুস্মিতা কে বলল সৌরাংশু।
"শান্তি মানে চরম শান্তি।" একটু থেমে আবার বলল,,"সৌরাংশু তোকে একটা কথা বলব রে, অনেকদিন ধরেই বলব ভাবছি!!"
"হ্যাঁ বল"
"আমার না মনে মাঝেমধ্যে মনে হয় পাপড়ি কে ভালোবাসে!"
"এই একদম চুপ। এখন শুধু তোর আর আমার কথা। আর অন্য কেউ এর মধ্যে ঢুকবে না।"
"তাও আমার যেটা মনে হয় সেটা বললাম।"
"এই সুস্মিতা পাপড়ির ব্যাপারটা তোকে আমি ভালো করে বলছি শোন। কলেজে প্রথমে যখন ওকে আমি দেখলাম তখন মনে মনে ভাবলাম যে, খুবই সাধারন একটি মেয়ে... ওর সঙ্গে কোনো ছেলে কথা বলে না। চুপ চাপ থাকে। এমন কাউকেই তো আমার চাই যে, নীরবে আমার সব আব্দার সহ্য করবে। আমি যখন যেখানে যেতে বলবো সেখানে যাবে। আমার কথাই হবে তার কাছে শেষ কথা। আমার রোজকার জীবনে এমনই একজন কে দরকার ছিল যে আমার ব্যস্ত সময়ের সঙ্গী হবে। কিন্তু এখনতো আমি তোকে পেয়ে গেছি। ফলে আর আমার ওকে দরকার নেই। সত্যি কথা বলতে আমার যখন প্রয়োজন হয় তখনই আমার পাপড়ির কথা মনে পড়ে। আর এখন তো আমার হাতে অঢেল সময়... এখন খামোকা ওর সঙ্গে কথা বলে লাভ আছে! যখন দরকার পড়বে তখনই আবার কথা বলব। আমার সবসময়ের সঙ্গী তো এখন তুই সুস্মিতা"
সৌরাংশুর কথাগুলো শেষ হতেই ফোনটা কেটে দিলো সুস্মিতা।
অনেকক্ষণ মেয়েকে চুপচাপ থাকতে দেখে পাপড়ির মা বলল,, পাপড়ি এভাবে কি জীবন চলে? তোর কি হয়েছে আমাকে বলবি!
চোখের জল মুছে পাপড়ি বলল,, আজকের পর থেকে তোমার মেয়ে একদম স্বাভাবিক হয়ে যাবে মা। তুমি চিন্তা করোনা। আজ রাতে কিন্তু আমার স্পেশাল মেনু করবে চিলি চিকেন আর তোমার হাতে স্পেশাল ফ্রাইড রাইস।
তারপর ধীর পায়ে আস্তে আস্তে ব্যালকনিতে গিয়ে বসলো পাপড়ি। একভাবে আকাশের দিকে চেয়ে থেকে বিরবির করে বলে উঠলো,, সৌরাংশু আজ থেকে তোকে আমি ভুলে যাব। হ্যাঁ আমি আমার মন থেকেই ঠিক করে নিয়েছি। একটু আগে যখন দেখলাম ফেসবুকে তোর সঙ্গে সুস্মিতার রিলেশনটা, তখন এক মুহূর্তের জন্য আমার মনে হয়েছিল, পায়ের তলা থেকে মাটি সরে গেল। কিভাবে এবার বাঁচবো আমি!! তবে এখন ভাবছি না, এটাই বোধহয় ভালো হলো। একটা মিথ্যে আশা নিয়ে আমি বসেছিলাম। তবে আজকের পর থেকে আর কোনো আশা নেই আর তোর প্রতি আমার কোনো প্রত্যাশাও নেই। তুই ভালো থাকিস।
কেটে গেল দুমাস। কোনো কারন ছাড়াই এই কয়েক মাস যোগাযোগ নেই পাপড়ির সঙ্গে সৌরাংশুর। পাপড়ি মাঝেমধ্যে অভ্যাসবশত সৌরাংশু হোয়াটসঅ্যাপ এ গিয়ে দেখে লাস্ট সিন কখন। মাঝেমধ্যে ভাবে একটা ফোন করবে সৌরাংশুকে। কিন্তু করে না। পাপড়িও নিজের মনে ঠিক করে নিয়েছে যে, সৌরাংশু যতদিন না ওকে ফোন করছে ততদিন পাপড়ি নিজে থেকে সৌরাংশুর সঙ্গে কোন যোগাযোগ করবে না।
রাতের খাবার খেয়ে জানালাগুলো বন্ধ করার সময় হঠাৎই ফোনের ভাইব্রেশন হতেই স্কিনের উপর সৌরাংশুর নামটা দেখে কেঁপে ওঠে পাপড়ির হাত। হঠাৎ করেই গা-হাত-পা কেমন ভারী হয়ে গেল পাপড়ির। তারপর নিজেকে সামলে নিয়ে ফোনটা ধরল,,
কিন্তু কোন কথা বলছে না সৌরাংশু। পাপড়িও বলছে না। শুধু দুজনের নিঃশ্বাস শোনা যাচ্ছে স্পিকারে। কিছুক্ষণ চুপ থেকে সৌরাংশু কাঁপা গলায় বললো,,
–পাপড়ি…
–হুম।
–কেমন আছিস?
–আমি খুব ভালো আছি। তুই?
–ভালো নেই রে। একদম ভালো নেই তোকে ছাড়া।
কথাটা শোনার পরেই মাথাটা গরম হয়ে গেল পাপড়ির। যে ছেলে ফেসবুকে নতুন রিলেশনশিপের স্ট্যাটাস দিয়ে কয়েকশো কমেন্টের রিপ্লাই দিতে পারে। সে আজ আবার অন্য একটা মেয়েকে বলছে আমি তোকে ছাড়া ভালো নেই। রীতিমতো চিৎকার করে বলল,,
–ভালো নেই মানে? নাটক করছিস তুই আমার সাথে! তোরই তো এখন ভালো থাকার কথা সুস্মিতার সঙ্গে।
পাপড়ির এমন ভারিক্কি কণ্ঠস্বর শুনে চোখের থেকে জল পড়তে থাকল সৌরাংশুর। তারপরে আস্তে আস্তে বলল,,
–পাপড়ি আমার ভুল হয়ে গেছে। আমি তোকে শুধুমাত্র নিজের প্রয়োজনেই ব্যবহার করেছি। একবারের জন্যও ভাবিনি তোর কথা। শুধুমাত্র নিজে যেটা ঠিক মনে করেছি সেটাই চাপিয়ে দিয়েছি তোর উপরে।
–এসব কথা কি আমি শুনতে চেয়েছি?
–তুই শুনতে চাসনি তবে আজ আমাকে বলতেই হবে রে। সেদিন তোর কথা সুস্মিতা কে বলতেই ও আর কয়েকদিন আমার ফোন ধরেনি। আমি ফোন করতেই বললো,"সৌরাংশু আসলে আমি বাড়িতে বেকার বসেছিলাম তো সময় কাটছিল না। তাই তোর সঙ্গে কথা বলতে বলতে তুই আমার একটা অভ্যাস হয়ে গিয়েছিলি। তবে এখন লকডাউন উঠতেই আবার কাজের মধ্যে ঢুকে পড়ে আমার না তোর কথা একদম মনে পড়ছে না রে। তাই এইরকম শুধুমাত্র একটা অভ্যাস এর সম্পর্কে আমি থাকতে চাই না।"
পাপড়ি বেশ কিছুক্ষণ চুপ থাকার পরে সৌরাংশু আবার বলল,, পাপড়ি...! কিছু তো বল এমনভাবে চুপ থাকিস না।
নিজের মধ্যে জমিয়ে রাখা ক্ষোভ উপরে দিল পাপড়ি,,
–সৌরাংশু সুস্মিতা একদম ঠিক কথা বলেছে। সবটাই হচ্ছে অভ্যেস। আমারও তোর সাথে কথা না বলে থাকাটা একটা অভ্যাস হয়ে গেছে। ফলে আমি এখন সেই অভ্যাস এর কোন পরিবর্তন ঘটাতে চাই না। আসলে কি বলতো মানুষ এখন না খুবই একলা। এখন সবাই মানুষের ব্যস্ততার সঙ্গী, মানুষের সাফল্যের সঙ্গী, মানুষের চরম উন্নতির সঙ্গী হতে পারে। তবে কেউ তার অবসরের সঙ্গী হতে চাই না। ঠিক যেমন তুই তোর প্রয়োজনের সঙ্গী আমাকে করেছিস। তবে আমার মন খারাপের সঙ্গী হোসনি কক্ষনো।
একটু থেমে আবার বলে উঠলো পাপড়ি,,
–এই লকডাউনে ঘরে বসে আমি রীতিমত পাগল হয়ে যাচ্ছিলাম সবসময় এক জায়গায় আবদ্ধ থেকে! তবে এই কদিনে নিজেকে সামলে নিয়েছি। এই লকডাউন আমাকে অনেকটা সংযম হতে শিখিয়েছে। যাগ্গে, তুই ভালো থাকিস। আর পারলে মাঝেমধ্যে যাদের সাথে একদম কথা বলিস না, তবে একসময় খুব বলতিস। সেই সব মানুষগুলোর একটু খোঁজ নিস। তখন দেখবি তোর একাকীত্ব কাটানোর সঙ্গী তারাই হবে।
সৌরাংশু কে শেষ কথাগুলো বলেই ঘরে ঢুকতে যাচ্ছিল পাপড়ি হঠাৎ একটা দমকা হাওয়া পাপড়ির সারা শরীরে-মনে শীতল বাতাস ছড়িয়ে যেন বলে উঠলো,, একা চলতে শেখো। নিজের মন খারাপের সঙ্গী নিজেকেই হতে হবে। সবাই তোমার ব্যস্ততার সঙ্গী হবে। তবে কেউ তোমার অবসরের সঙ্গী হবে না।
~সমাপ্ত~
আপনাদের মতামতের অপেক্ষায় রইলাম। 😊
অপূর্ব ।মুগ্ধ হলাম ।👏👏👏👏
উত্তরমুছুন