বৃহস্পতিবার, ১৯ মে, ২০২২

গল্পঃ শীতোষ্ণতা। ✍️ নন্দিনী তিথি


এককালে এক অজ্ঞাত মরুভূমির এককোণে একটা বসতি গড়ে উঠেছিলো। একে অন্যকে ভালোবেসে নিজ নিজ বাড়ি ছেড়েছিল দু'জন তরুণ-তরুণী। তখন এই অজানা মরুভূমিই তাঁদের আশ্রয় দিয়েছিল। এরপরে এখানে থেকেই একে অন্যের হাত ধরে শুরু হয় তাঁদের পথ চলা। প্রতিদিন ভোর হতেই দু'জনে চলে যেতো কাজে আর বাড়ি ফিরতো সন্ধ্যে নামার আগে কোনো কোনো দিন সন্ধ্যে ঘোরও হয়ে যেতো। তাঁদের এই নিরলস পরিশ্রমের কারণ ছিলো দু'টো- ১. পেটের চাহিদা মেটানো এবং  ২. সাথে দু'টো টাকা জমানো।

এইভাবেই ওদের জীবন শুরু হলো, এবং চলতে লাগলো। ঋতু পরিবর্তনে ওদের প্রায়শই সমস্যায় পরতে হতো। সবথেকে যে সমস্যাটা বেশি হতো- গ্রীষ্মকালে ওদের মরুভূমির পাশে থাকাটা খুব কষ্টকর হয়ে যেতো। বিশেষ করে তরুণী আশার। কিন্তু তরুণ সুভাষ কিছুতেই গরমের কাছে হার মানতো না। ছোটবেলা থেকেই প্রতিনিয়ত মেডিটেশন ছিলো ওর সঙ্গী। এইসময় আশাকে সঙ্গে নিয়ে যতক্ষণ পারতো মেডিটেশনে বসতো আর চলে যেতো "মনের বাড়িতে"। মনের বাড়িতে তাদের বাড়িটি হতো তুষারের তৈরি, রোদ্রের তাপকে বানিয়ে নিতো বরফের শীতলতা। চারিপাশে থাকতো বৃষ্টির মুখরতা, মনের বাড়িতে গিয়ে রোদ্রের দুপুরকে বানিয়ে নিতো শীতের দুপুর, এবং সোয়েটার খুলে নদীতে নামতো শীতে কাঁপতে কাঁপতে। মেডিটেশনে মনের বাড়িতে গিয়ে ওরা গ্রীষ্মকালকে বর্ষাকাল, বসন্তের চিরিচিরি হাওয়া মাখানো দিন, এবং মাঝেমধ্যে শীতকালের কনকন শীতার্ত মানুষ বানিয়ে নিতো নিজেদেরকে। আর এই মেডিটেশন করার পর প্রতিবেলা তরুণ সুভাষবাবু তরুণী আশাকে বলতো আমাদের মেয়ে সন্তান হলে না আমরা ওর নাম রাখবো 'শীতষ্ণতা' ঠিকাছে আশা! আশা ওর কথা শুনে প্রত্যেকবারই একখানা মিঠামাখা হাসি দিয়ে বলতো- হুম। প্রথমে প্রায় ছ'মাস ওরা অন্যান্য কোনো বসতির সাথেই আলাপী তথা পরিচিত হয়ে উঠতে পারেনি। কারণ ওদের লক্ষ্য ছিলো নিজেদের পায়ে দাঁড়ানো মানে স্বচ্ছলতা। পরে ওদের একটু উঠে দাঁড়ানোর পরে আস্তে আস্তে ওদের পরিচিতি বাড়লো, সবাই ওদের ভালো জানতে শুরু করলো। তরুণ সুভাষকে সবাই একটু অন্যরকম ভালোবাসত। কোনো দরকারি কাজ বা কোনো আচার- অনুষ্ঠানের মিটিং, কোনো বড় দায়িত্ব নেয়ার ব্যাপারে, কোনো‌‌ কাজের যুক্তিসংহত পরামর্শ যেন তাঁকে ছাড়া হতোই না।

এইভাবে ওদের জীবন অতিবাহিত হতে লাগলো। এরই মাঝে চলে এলো ওদের ভালোবাসার প্রথম সন্তান। আনন্দে ওরা দিশেহারা, ফুটফুটে উজ্জ্বল শ্যামলা বর্ণের একটা ফুল যেন ওদের ঘরে এসে আলোকিত করলো, পরিপূর্ণতা আনলো জীবনের। নাম রাখলো চড়ুই। দুষ্টমিতে একশো'তে একশো ছিলো তাঁদের চড়ুই, কিন্তু ছোটবেলা থেকেই ওর মধ্যে একটা ব্যক্তিতের স্পর্শ লক্ষ্য করা গিয়েছিল। ধীরে ধীরে ওদের আরো দু'টো সন্তান এলো প্রথমে মেয়ে পরে আবারও একটা ছেলে। ওদের নাম রাখলো- পূর্ণতা আর নিপুণ। ওদের পরিবার এবার একদম পরিপূর্ণ। সবগুলোই বেশ মেধাবী ছিলো। লেখাপড়া ছাড়া অন্য কোনোকিছুতে নিপুণের মন নেই। সবথেকে শান্ত স্বভাবের ছেলে, একদম মায়ের স্বভাব পেয়েছে। পূর্ণতা! লেখাপড়ায় ভালো, কথাবার্তায় সে স্পষ্টবাদী,  স্বাধীনচেতা মনোভাবের। কিন্তু একটু বেশি একগুঁয়েমি স্বভাবের। আর চড়ুইয়ের কথা বলতে! সে যেমন দুষ্টুমিতে হাফেজ তেমন লেখাপড়ায় তেমনি বুদ্ধিমত্তায়, সামাজিকতায়। মানুষ কথায় বলে প্রথম তথা বড় সন্তান একটু হ্যাবলা স্বভাবের হয় কারণ তাঁরা সবার থেকে একটু বেশিই আদর পায়। আর উচ্ছন্নে যায়। কিন্তু চড়ুইয়ের ক্ষেত্রে পুরো উল্টো ব্যাপার।

সবথেকে মেধাবী ছিলো চড়ুই। ওকে নিয়ে ওদের অনেক আশা। কিন্তু দিন দিন ওরা বড় হতে লাগলো, খরচ ডাবল থেকে ডাবল হচ্ছিল। তিনটা ছেলেমেয়ের খরচ চালাতে গিয়ে ওদের সংসার টানাপোড়েনের মধ্যে দিয়ে চলতে লাগলো। আর পেরে উঠছিলো না ওরা, কোথা দিয়ে ওদের লেখাপড়ার খরচ চালাবে! চড়ুই মেডিক্যালে, পূর্ণতা মেট্রিকে গ্লোল্ডেন পেয়ে সদ্য ইন্টারে ভর্তি হলো। ভর্তি হতে অনেক খরচ, আবার বিজ্ঞান বিভাগের শিক্ষার্থী, প্রাইভেট না পড়লেই নয়। আর ছোটটা নিপুণ সে কেবল দশম শ্রেণীতে উত্তীর্ণ হয়েছে। এত্তো খরচ কোথা দিয়ে চালাবে, এই নিয়ে বাবু সুভাষের দিন রাত্রি ঘুম নেই চোখে। লেখাপড়া বন্ধ হয়ে যাওয়ার পথে প্রায়। সবে গড়ে ওঠা স্বপ্নগুলো যেন ভূমিকম্প লেগে শেষ হয়ে যাওয়ার পথে। এমতাবস্থায় চিন্তায় দিশেহারা হয়ে বাবু সুভাষ এই অবস্থা থেকে মুক্তি পাওয়ার কোনো উপায় খুঁজে না পেয়ে অবশেষে ঠিক করলো চড়ুইকে বিয়ে দেবে, এই চিন্তা মাথায় চাপালো। বাবার অবস্থা দেখে চড়ুইও মুখ বুঝে বাবার সিদ্ধান্তে মত দিলো। অনেক প্রস্তাব ভেঙ্গে যাওয়ার পর অবশেষে রায় বংশের একমাত্র মেয়ে একতার সঙ্গে  চড়ুইয়ের বিয়ে ঠিক হলো। দিন ঠিক করে ভালোভাবে বিয়ে কার্য সম্পন্ন হলো। সৃষ্টিকর্তা নিজেই বোধহয় এমন মর্যাদাশালী পরিবারের সঙ্গে বাবু সুভাষের পরিবারকে মিলিয়ে দিয়েছেন। এমন মেয়ে যেন পৃথিবীতে লাখে একটা। তার স্বভাবের পরিচয় দিতে গেলে তা বরফের মতো শান্ত, আচরণ তার বিজ্ঞ বিচারকের মত নৈপুণ্য, কথাবার্তায় যেন সে মায়া আর ভালোবাসার মন ভুলানো অধিকারী, হাঁটাচলায় মায়াবতী লক্ষ্মী, হাত পায়ের গঠন তা ঈশ্বর বোধহয় একটু বেশিই স্বযত্নে বানিয়েছেন। এখন আর তার গুনের বর্ণনায় না গিয়ে এবারে ক্ষ্যান্ত হই। কিন্তু একতার চেহারার গঠন ভালো হলেও অতটা সুন্দরী ছিলো না। বাবু সুভাষ যেন আজ ঈশ্বরের কাছ থেকে সেই মেয়েকে পেয়েছেন, যেখানে প্রতিদিন মেডিটেশনের পরে স্ত্রী আশাকে বলতো আমাদের মেয়ে হলে তাঁর নাম রাখবো 'শীতোষ্ণতা'। সেই শীতোষ্ণতাকে। আনন্দের অশ্রু ঝরিয়ে বরণ ডালা সাজিয়ে দু'জনে মিলে একতার হাতে চুমু খেয়ে বললো- "আয় মা শীতোষ্ণতা, তুই আমাদের সেই স্বপ্নের বাড়ির মেয়ে যার নাম কত বছর আগে ঠিক করে রেখেছিলাম। আজ এতো দিন ‌পরে  ঈশ্বর পাঠালো, কাছে পেলাম তোকে আমরা। 

আনন্দের জোয়ারে ভেসে যাচ্ছিলো সুভাষ আর আশার পরিবার। সবার চোখে বৃষ্টির মতো অশ্রু ঝরেছিলো সেদিন। সবাই আজ প্রতিষ্ঠিত, চড়ুই ডাক্তার হয়ে সে দুঃস্থ অসহায়দের পাশে দাঁড়িয়েছে, পূর্ণতা একজন ভার্সিটির আদর্শবান শিক্ষিকা হয়ে ভালোবাসার মানুষকে বিয়ে করে সুখে সংসার করছে, ভদ্র ছেলে নিপুণ সদ্য ইঞ্জিনিয়ারিং পাশ করে বেরিয়েছে। আর সবার আদরের রায় বংশের মেয়ে শীতোষ্ণতা(একতা) আজ ব্যাংকার এবং আশা সুভাষের কাছে থেকে তাদেরকে নাতিশীতোষ্ণতার মহিমায় ভরিয়ে রাখছে। 

বিশ্বেতে শান্তির পরিবার আজ আশা-সুভাষের পরিবার। আর বিরাজমান রবে চিরকাল।

Copyright © All Rights reserved Nandini Tithi.

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...