মঙ্গলবার, ২৪ মে, ২০২২

ডোয়ার্ফি ✍️ডা: অরুণিমা দাস

 ডোয়ার্ফি
✍️ডা: অরুণিমা দাস

উহহু! কপালের বাঁদিকটা চিনচিন করে উঠলো ব্যথায়। উঠে বসতে গেলো বরফি,কিন্তু পারলোনা। শরীরটা বড্ড দুর্বল লাগছে ওর। পাশের বেডে থাকা এক বয়স্ক দাদু বললেন আহা উঠো না বাছা! অনেকটা কেটে গেছিলো তোমার, রক্তও বেরিয়েছিল অনেক। তাই এখন একটু দুর্বল লাগবে। সিস্টার মেডিসিন রেডী করছিল,ওদের কথা শুনে বরফির বেডের পাশে এসে বললো এখন একদম রেস্ট তোমার। কতগুলো সেলাই পড়েছে জানো! আমার আবার রেস্ট! হাসালে দিদি। সার্কাস দেখাতে দেখাতে জীবনটাই একটা সার্কাস হয়ে গেছে। এরম বোলোনা বরফি। সেদিন তুমি না থাকলে ওই বাচ্চাটাকে বাঁচানো যেত কি! সেদিনটা আর মনে করতে চাইনা দিদি। বাচ্চাটা রাস্তা পার করতে গিয়ে একটু হলেই ট্রাকের তলায় পড়ছিল। আমি খালি দৌড়ে গিয়ে ওকে ধাক্কা মেরে সরিয়ে দিয়েছিলাম। আর নিজে টাল সামলাতে না পেরে পাথরের ওপর মাথাটা ঠোক্কর খেয়ে গেছিলো। তারপর আর মনে নেই কিছু। তারপরেরটা আমি বলছি! বলতে বলতে ঘরে ঢুকলেন ডা: পল্লব। আরে আপনি স্যার? হ্যা বরফি আমি! আর শুধু আমিই নই সেদিন যে বাচ্চাটাকে বাঁচিয়ে ছিলে তার মা বাবা আর সে তিনজনেই এসেছে তোমার সাথে দেখা করবে বলে। তাই! আমার সাথে?চোখে মুখে বিস্ময় ফুটে উঠে বরফির। কেমন আছো আঙ্কেল? জিজ্ঞেস করে সেদিনের সেই বাচ্চাটা যাকে বরফি বাঁচিয়েছিল। বরফির চোখ দিয়ে অজান্তেই দু ফোঁটা জল গড়িয়ে পড়ে, এত সম্মান কেউ দেয়নি তাকে আজ পর্যন্ত। সার্কাসে সবাই ওই দেড় ফুট,কালার বয় এসব বলেই ডাকতো। ভালো আছি বাবু, তুমি কেমন আছো? আমিও ভালো আছি আঙ্কেল। আচ্ছা আঙ্কেল তোমার সেদিনকার জামা আর ওসব রঙিন চুল, টমেটোর মত লাল নাক ওগুলো কোথায় গো? ওহ ওগুলো! ওসবতো আমি সার্কাসে খেলা দেখানোর সময় পরিগো। এখন তো হাসপাতালে আছি,তাই ওসব পরিনি। বাবুর বাবা মা এগিয়ে এসে বললো কি বলে যে আপনাকে ধন্যবাদ দেবো বরফি আমরা জানিনা। সেদিন আপনি তুতুনকে না বাঁচালে আমাদের জীবনে আঁধার নেমে আসতো আজ। আপনার কাছে আমাদের কৃতজ্ঞতার শেষ নেই আর। না না এসব বলবেন না আপনারা,বরফি বললো। ছোটবেলা থেকে মা বাবা ছাড়া আছি তো,জানি কষ্টটা। আজ যদি আমি বামন না হয়ে সাধারণ মানুষের মতো চেহারার অধিকারী হতাম কেউ আর ঘেন্না করতো না আমায়। এরম বোলো না বরফি। তোমার এই রঙিন পোশাকের নিচে আছে একটা রঙিন মন যেটা দিয়ে তুমি সবাইকে আনন্দ দান করো, ডা: পল্লব বললেন। আচ্ছা শোনো বরফি এনারা কি বলছেন? তুতুনের বাবা বরফির হাত ধরে বললেন আমি তো বাড়ীর জন্য বেশী সময় দিতে পারি না, বাচ্চাটা একা একাই থাকে। ওর মাও তো নানান কাজে ব্যস্ত থাকে। তুমি ওর সর্বক্ষণের সঙ্গী হবে? আমাদের বাড়িতে থাকবে ওর গভর্নেস হয়ে? কিন্তু আমার সার্কাসের কাজ? আমার ওখানকার বন্ধুরা? ওদের ছেড়ে আমি কি করে থাকবো? বরফি বলে। অনেক আশা নিয়ে এসেছি গো আমরা,বরফি। মাফ করবেন আমায়, আমি আমার সার্কাস ছেড়ে কোথাও যাবো না,মন টিকবে না। এটাই এখন আমার ঘর বাড়ী সব হয়ে গেছে। কিরে ডোয়ার্ফি! আছিস কেমন? শুনলাম একদম হিরোর মত একটা বাচ্চার জীবন বাঁচিয়েছিস! মালিক আপনি? সার্কাসের মালিককে দেখে বরফি খুব অবাক হয়। দেখ কারা এসেছে! বলতে বলতে মালিকের পেছনে আরো তিন চারজন বেঁটে মানুষ ঢোকে। বরফি কে বলে তুই কি আমাদের ছেড়ে চলে যাবি রে? না না আমি তুতুনের বাবাকে বলে দিলাম আমার সার্কাস আর বন্ধুদের ছেড়ে গিয়ে কোথাও শান্তি পাবো না আমি। ডোয়ার্ফি, কাল তোর ছুটি হবে হাসপাতাল থেকে, আমরা এসে নিয়ে যাবো তোকে। এরপর একসপ্তাহ রেস্ট তোর, খেলা দেখাতে হবে না। পুরো সুস্থ হয়ে খেলা দেখাস না হয় আবার। মালিকের কথা শুনে বরফির বেশ ভালো লাগে,এদের ছেড়ে কিছুতেই সে শান্তি পাবে না অন্য জায়গায় গিয়ে। তুতুন মুখ ঝুলিয়ে বসেছিল, বরফি বললো কি হলো? কথা বলবেনা আমার সাথে? না আঙ্কেল তুমি তো আমার বাড়ী গেলে না! যাবো বাবু, তোমার ঠিকানা নিয়ে রাখলাম। যখন এখানে আসবো সার্কাস দলের সাথে ঠিক তোমার সাথে দেখা করে যাবো। আর এখন যতদিন সার্কাস থাকবে এখানে তুমি এসো মাঝে মাঝে,দেখা হবে,প্রমিস! কোনো মায়ায় আর জড়াতে চায়না বরফি, সেই বাঁধন ছিঁড়ে গেলে কষ্ট অনেক বেশি তাতে। তার চেয়ে ডোয়ার্ফি হয়ে রঙিন পোশাকে মানুষকে আনন্দ দেওয়ার কাজটাই বরং ভালো। মনের মাঝে বেজে উঠলো 
"জিনা ইহা, মরনা ইহা ইসকে ইসিভা জানা কাহান!
 জী চাহে জব হামকো আওয়াজ দো,হাম হ্যায় বহি, হাম থে যাহা।"

 ©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...