অন্তর্দৃষ্টি
✍️ ডা: অরুণিমা দাস
বছর তিনেক আগের ঘটনা এটা, চণ্ডীগড় গিয়েছি পোস্ট গ্রাজুয়েট এন্ট্রান্স এক্সাম দেওয়ার জন্য। ইচ্ছে ছিল এক্সাম দিয়ে দু একটা দেখার মত জায়গায় ঘুরে নেবো। পরীক্ষা দিয়ে এসে প্ল্যান মত পরের দিন বেরোলাম ঘুরতে। রক গার্ডেন, রোজ গার্ডেন এগুলোর খুব নাম শুনেছিলাম হোটেল মালিকের কাছে। প্রথমে গেলাম রোজ গার্ডেন এর দিকে। নানা রঙের গোলাপের সমারোহ, দিল তো পুরো গার্ডেন গার্ডেন হয়ে গেছিলো। বেশ খানিকটা সময় রোজ গার্ডেনে কাটিয়ে রওয়ানা হলাম রক গার্ডেনের দিকে। রক গার্ডেনে পাথরের তৈরি নানা জিনিস দেখতে লাগলাম, অপূর্ব কারুকার্য করা সব। ঘুরতে ঘুরতে একটা জলাশয়ের কাছে এসে পৌঁছলাম। পাথরের ধাপ বেয়ে জল গড়িয়ে এসে পড়ছে সেই জলাশয়ে, নয়নাভিরাম দৃশ্য সব। জলাশয় টা পেছনে রেখে এগিয়ে যাচ্ছি একটা জায়গায় দেখি বেশ কিছু লোকের জটলা, কাছে গিয়ে দেখলাম একজন ভদ্রলোক বসে পোট্রেট আঁকছেন আর পাশে রাখা রয়েছে ওনার কর্মকাণ্ডের সব নজির। কেউ কেউ কিনেও নিচ্ছে এক দুটো পোট্রেট। এক সময় ভিড় কমতে দেখলাম যিনি পোট্রেট গুলো আঁকছেন তার চোখে একটা কালো চশমা। ওনার পাশে থাকা ভদ্রলোককে জিজ্ঞেস করলাম, চশমা পরে উনি ছবি আঁকেন? তিনি বললেন হ্যাঁ, আসলে ওর দৃষ্টি শক্তি খুব ক্ষীণ। অপটিক নিউরাইটিস রোগে আক্রান্ত ও, রড কোষ শুকিয়ে যাচ্ছে ধীরে ধীরে। ও ওই ক্ষীণ দৃষ্টি দিয়েই প্রকৃতির চিত্র রূপ মানসপটে কল্পনা করে রং তুলি দিয়ে পোট্রেট এঁকে ফেলে। শুনে খুব অবাক হলাম আর মনে মনে শিল্পীকে কুর্নিশ জানালাম। এরা সব জন্মগত প্রতিভা,ঈশ্বরের আশীর্বাদ ধন্য। মাঝে মাঝেই ছেলেটি হিন্দিতে বলছিল "মেরা আঁখো কি রশনি চলা যা রহে হ্যায় তো কেয়া হুয়া,মন মে উজালা লেকে বৈঠা হু! কিসিকা তাকত নেহি হ্যায় উস রশনি কো মুঝসে ছিন সাকতে হ্যায়!" এরকম মন ভালো করা কথা শুনে ভীষন ভালো লাগছিলো। মনের জোর থাকলে কোনোকিছুই অসম্ভব নয় এই দুনিয়ায়। দুটো পোট্রেট কিনেছিলাম ওই ছেলেটির কাছ থেকে। হাসি মাখা মুখটা আজও মনে পড়ে আর বাকী দিন গুলো ভালোই ঘুরেছিলাম চণ্ডীগড়। এসব মানুষ গুলোর না হেরে যাওয়ার কাহিনী গুলোই কারোর কারোর জীবনে ঘুরে দাঁড়ানোর অনুপ্রেরণা হয়ে যায় একটা সময়। ভালো থাকুক জীবনযুদ্ধে পরাজিত না হওয়া এসব মানুষেরা।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন