রবিবার, ১৯ জুন, ২০২২

টেলোমিয়ার উইল টেল দ্য স্টোরি ✍️ডা: অরুণিমা দাস

টেলোমিয়ার উইল টেল দ্য স্টোরি
✍️ডা: অরুণিমা দাস

বুড়ো হতে আমরা কেউ চাই না কিন্তু স্বাভাবিক নিয়মে বার্ধক্য আসে। বার্ধক্যের কারণ কী,এই সত্য জানতে উঁকি দিতে হবে আমাদের শরীরের ভেতরে। 
একটা বছর কাটিয়ে আমরা নতুন বছরে পা দিয়েছি। বাড়ছে বছরের সংখ্যা,সঙ্গে বয়স বাড়ছে। একটু একটু করে বড় হচ্ছি আমরা বা বলা ভাল বুড়ো হচ্ছি আমরা। মানুষের জীবনে বৃদ্ধি ও বিকাশের পাঁচটি দশার মধ্যে সর্বশেষ দশা হল বার্ধক্য। কিন্তু মজার কথা হল এই দশায় কেউই আমরা পৌঁছতে চাই না। এই বার্ধক্যে না যেতে চাওয়ার কারণই হল আমরা বার্ধক্যজনিত রোগকে ভয় পাই এবং শুধু তাই নয়, বার্ধক্য আমাদের কাছ থেকে আমাদের কাজের শক্তি কেড়ে নেয় আর একাকীত্বও বাড়িয়ে দেয়।
এককথায় বার্ধক্য হল এমন এক দশা যেখানে শারীরিক ক্ষমতা হারাতে থাকে,বিভিন্ন রোগ শরীরে বাসা বাঁধতে থাকে,মানুষ পরনির্ভরশীল হয়ে পড়ে। ২০১৫ সালে পাওয়া তথ্য অনুযায়ী সমগ্র পৃথিবীতে ৬০ বছর বয়সি বৃদ্ধের সংখ্যা ছিল ১২ শতাংশ, যা বেড়ে ২০৫০ সালে প্রায় ২২ শতাংশ হবে বলে ধারণা বিজ্ঞানীদের। কিন্তু শুধুই কি কালের নিয়মে বয়সবৃদ্ধির সঙ্গে আমাদের ত্বক কুঁচকে যায়, দৃষ্টিশক্তি কমে যায়, কর্মক্ষমতা হারায় আর বিভিন্ন রোগ দেখা যায় নাকি তার পেছনে রয়েছে কোনও বৈজ্ঞানিক ব্যাখ্যা? এরই হদিশ পেতে চেষ্টা করা যাক।

আমরা কেন বুড়ো হই,এই সহজ সত্যিটাকে বুঝতে গেলে সবার প্রথমে আমাদের দেহের কোষের দিকে একবার উঁকি দিতে হবে। কারণ সব রহস্য যে ওখানেই লুকিয়ে রয়েছে। আমাদের দেহের গঠনগত ও কার্যগত একক কোষের মধ্যে থাকা দুটি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কোষ অঙ্গাণু নিউক্লিয়াস ও মাইটোকনড্রিয়া বা আরও নিখুঁতভাবে বলতে গেলে এই দুই কোষ অঙ্গাণুর মধ্যে থাকা ডি এন এ এই কাজের মূল হোতা। ডি এন এ এর ক্ষতি ও তার মেরামতির ভুল,আমরা প্রায় সকলেই এই সত্যিটার সঙ্গে পরিচিত যে আমাদের দেহের গঠন থেকে শুরু করে সমস্ত কার্যকারিতার পেছনে রয়েছে নির্দিষ্ট ডি এন এ। তাই ডি এন এ এর এই গুরুত্বের কথা মাথায় রেখেই আমাদের কোষের মধ্যেই থাকে ডি এন এ এর ত্রুটি মেরামতির যন্ত্রপাতি। কোষীয় কোনও রাসায়নিক বিক্রিয়ার কারণে বা ইউভি রশ্মির কারণে যদি ডি এন এ এর কোনও ক্ষতি হয় তাহলে কোষের মধ্যে থাকা সেসব যন্ত্রপাতি দ্রুত  ডি এন এ এর সেই অংশটি মেরামত করে দেয় এবং এই ঘটনা কোষে প্রায় অবিরাম চলতেই থাকে। কারণ ডি এন এ এর প্রতিলিপিকরণের (রেপ্লিকেশন) সময় অনিচ্ছাকৃত হওয়া ক্ষতি,কোষের মধ্যে তৈরি হওয়া ROS (Reactive Oxygen Species) অর্থাৎ সুপার অক্সাইড, পারক্সাইড ইত্যাদি খুব দ্রুত ডি এন এ এর ক্রোমোজোম বিন্যাসে পরিবর্তন ঘটায় ফলে ডি এন এ তার স্বাভাবিক কর্মক্ষমতা হারিয়ে অস্বাভাবিক হয়ে ওঠে আর এই অস্বাভাবিকতাকে রুখতেই ডি এন এ এর ত্রুটি মেরামতির যন্ত্রপাতি কাজ করে এর স্বাভাবিক ক্রিয়াশীলতা বজার রাখার চেষ্টা করে। কিন্তু মুশকিল হল এইসব তীব্র অক্সিডেজের বিরুদ্ধে কাজ করতে করতে অনেক সময় ডি এন এ এর ত্রুটি মেরামতির যন্ত্রপাতিও নিজের কার্যক্ষমতা হারিয়ে ফেলে তখন কোষে এই ত্রুটিপূর্ণ ডি এন এ এর আধিক্য বাড়তে থাকে। ফলস্বরূপ কোষও তার কার্যকারিতা হারায় ও ধীরে ধীরে কোষ বার্ধক্য দশায় প্রবেশ করে। এভাবেই ডি এন এ এর ত্রুটি মেরামতির যন্ত্রপাতির ত্রুটিজনিত কারণে এক এক করে দেহের বিভিন্ন কোষগুলি বার্ধক্যের দশায় উপনীত হয়। এখানে একটি কথা না বললেই নয়, সেটি হল কৃত্রিম ও প্রক্রিয়াজাত খাবার গ্রহণ, যথেচ্ছ ধূমপান ইত্যাদি দেহকোষে এই ROS (রিয়াকটিভ অক্সিজেন স্পিসিস) এর পরিমাণ বৃদ্ধি করার পেছনে বহুলাংশে দায়ী। এ ছাড়া UV রশ্মি, দূষণ ইত্যাদি তো রয়েছেই।

টেলোমিয়ারের দৈর্ঘ্যের সংক্ষিপ্তকরণ - বার্ধক্যের এটা হলো মূল কারণ। 
যে-কোনও ক্রোমোজোমের শেষ প্রান্তে থাকা অংশটিকে টেলোমিয়ার বলা হয়। এই টেলোমিয়ার অংশটি কিন্তু রিপিটেটিভ কিছু ডি এন এ সিকোয়েন্স দ্বারাই তৈরি অর্থাৎ এই অংশে একই ডি এন এ সিকোয়েন্সের বারংবার পুনরাবৃত্তি ঘটে। তবে এই টেলোমিয়ার ক্রোমোজোমের শেষপ্রান্তকে যেকোনও ক্ষতির হাত থেকে রক্ষা করতে সাহায্য করে। সাধারণত ডি এন এ প্রতিলিপিকরণের (রেপ্লিকেশন) সময় প্রত্যেকবার প্রতিলিপিজনিত ত্রুটির কারণে একটু একটু করে এই টেলোমিয়ার অংশটি বাদ পড়তে থাকে। এভাবে টেলোমিয়ার অংশটি বাদ পড়তে থাকার ফলে ওই নির্দিষ্ট কোষটির ডি এন এ তার প্রতিলিপিকরণের ক্ষমতা হারায় ফলে ওই কোষও তার বিভাজন ক্ষমতা হারিয়ে ধীরে ধীরে অ্যাপোপটোসিস (প্রোগ্রামড সেল ডেথ) পদ্ধতির মাধ্যমে ধ্বংস হয়ে যায় এবং এভাবে কোষের মৃত্যু ঘটার ফলে বার্ধক্যের সূচনা হয়। সাধারণত যেকোনও সুস্থ স্বাভাবিক কোষ তার জীবনকালে চল্লিশ থেকে ষাট বার বিভাজিত হতে পারে তারপর সে তার বিভাজন ক্ষমতা হারায়। কোষের বিভাজনের এই সীমাবদ্ধতাকে বিজ্ঞানের ভাষায় বলে হেফ্লিক লিমিট। পেনসিলভেনিয়ার উইস্টার ইন্সটিটিউটের লিওনার্ড হেফ্লিকের নাম অনুসারে এর নামকরণ করা হয়েছে। কোষের এই বার্ধক্যই কিন্তু গোটা একটি জীবকে বার্ধক্য দশার দিকে ধীরে ধীরে ঠেলে দেয়। বার্ধক্যদশায় দেখা-যাওয়া সমস্ত ধরনের অক্ষমতার পেছনে আসল কারণ কিন্তু এগুলোই।

মাইটোকনড্রিয়ায় থাকা ডি এন এ এর ত্রুটিআমরা হয়তো অনেকেই জানি না যে নিউক্লিয়াস ছাড়াও আমাদের মাইটোকনড্রিয়ার মধ্যেও থাকে DNA। সাধারণত ৩৭ টির মতো জিন সমন্বিত এই অঙ্গাণুটি আমাদের কোষের শক্তিঘর (পাওয়ার হাউস) হিসেবেই পরিচিতি পেয়ে এসেছে। আমাদের ক্ষেত্রে যদিও এই DNA কোনও প্রকার বৈশিষ্ট্যের জন্য দায়ী নয়,কিন্তু সমস্যা হল আমাদের ক্ষেত্রে এর কোনও উপকারিতা না থাকলেও এর যে-কোনও ত্রুটি আমাদের সমগ্র কোষের কার্যকারিতাকে ব্যর্থ করতে যথেষ্ট। আগেই বলা হয়েছে যে এই মাইটোকনড্রিয়া আমাদের কোষের শক্তিঘর হিসেবে কাজ করে আর এই কার্য সম্পাদনের জন্য যে প্রক্রিয়াটি সবচেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ সেটি হল ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট চেইন বা ETC যার মাধ্যমেই আমাদের তথাকথিত শক্তি ATP বা অ্যাডিনোসিন ট্রাই ফসফেট উৎপন্ন হয় ও কোষের বিভিন্নপ্রকারের ক্রিয়া সম্পাদন করে। এই ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট চেনের মধ্যে দিয়ে তীব্র অক্সিডাইসড ইলেকট্রন যাতায়াত করার সময় ভুলবশত যদি তারা সেই পথ থেকে বিচ্যুত হয় তা হলেই সেখানে মুক্ত মূলক তৈরি হয় যা তাদের তীব্র অক্সিডেজ ক্রিয়ার দ্বারা অঙ্গাণুটির ক্ষতি করে আর সবচেয়ে বেশি ক্ষতি করে তার ডি এন এ এর। যেহেতু ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট চেনের মাধ্যমে ATP তৈরি হওয়ার সময় উপজাত হিসেবে অক্সিজেনও তৈরি হয় তাই এই মুক্ত মূলকগুলি সাধারণত সুপার অক্সাইড,পারক্সাইড ইত্যাদি হয়ে থাকে আর এগুলিই হল ROS (Reactive Oxygen Species) যা শুধু মাইটোকনড্রিয়ার নয়, সমগ্র কোষের তথা নিউক্লিয়াসে থাকা ডি এন এ এরও ক্ষতি করে। মাইটোকনড্রিয়াকে শক্তিঘর-এর পাশাপাশি ROS উৎপাদনের প্রধান কেন্দ্র হিসেবেও দেখা হয়ে থাকে। সাধারণত একটি কোষে একশোটিরও বেশি মাইটোকনড্রিয়া থাকে। তাই এখানে সৃষ্ট ROS সমগ্র কোষের ক্ষতি করতে সমর্থ। এই ROS এর ফলে মাইটোকনড্রিয়ার ডি এন এ এর সজ্জাক্রমের পরিবর্তন ঘটে সেখানে মিউটেশন দেখা যায়, ফলে ইলেকট্রন ট্রান্সপোর্ট চেনের জন্য প্রয়োজনীয় প্রোটিন সংশ্লেষণে সে ব্যর্থ হয়,ফলস্বরূপ এ টি পি উৎপাদন ব্যাহত হয় আর তার পাশাপাশি সমগ্র কোষের ক্রিয়াও শক্তির অভাবে প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। শুধু তাই নয়,বার্ধক্যজনিত বিভিন্ন রোগ যেমন, অ্যালজাইমার,পারকিনসন প্রভৃতি রোগের কারণও এই মুক্ত মূলক। ১৯৫৬ সালে হারম্যান,বার্ধক্যের অন্যতম কারণ হিসেবে মুক্ত মূলকের এই তত্ত্বটি সবার সামনে তুলে ধরেন।

এতো গেলো বয়স বাড়ার কারণ, এরপর দেখা যাক বয়স বাড়ার সাথে সাথে কি কি মানসিক পরিবর্তন ঘটে। এমনিতেই বয়স বাড়লে স্মৃতিশক্তি ক্ষীণ হয়, কাছের মানুষরা অনেকটা দূরে ঠেলে দেওয়ায় একাকীত্ব বোধ হয়,নিঃসঙ্গ হয়ে পড়ে মানুষ। এসব দুর করার জন্য নিজেকে সবসময় কিছু না কিছু কাজে এনগেজ রাখা উচিত। এতে অ্যালজাইমার ও অন্যান্য স্নায়ুরোগ প্রতিহত হয়।

আবার প্রোজেরিয়া নামক রোগে আক্রান্ত হলে কমবয়সীদের বয়স্কদের মতন দেখতে হয়। 

আচ্ছা আমরা কি কখনও ভেবে দেখেছি যে কিছু মানুষ অল্প বয়সেই প্রায় বার্ধক্যদশা যাপন করে আর কিছু মানুষ আশি বছর বয়সেও একদম সুস্থ সবল ও রোগমুক্ত জীবন কাটায়। এর পেছনে কারণ জানতে গেলে সবার আগে আঙুল উঠবে আমাদের জীবনযাত্রার মানের দিকে। নিয়মিত শরীরচর্চার অভাব, প্রসেসড খাবার খাওয়া, অসময়ে ঘুম,খাওয়া ও সর্বোপরি অনিয়ন্ত্রিত জীবনযাপন আমাদের অল্প বয়সেই কর্মক্ষমতা হারিয়ে যাওয়ার মূল কারণ। এবার আসা যাক বিখ্যাত বডিবিল্ডার মনোহর আইচের কথায় যিনি ছোটবেলায় একবার কালাজ্বরে আক্রান্ত হন এবং ফলস্বরূপ তাঁর শরীর-স্বাস্থ্য ভেঙে যায়। পরে কঠিন পরিশ্রম ও নিয়মিত শরীরচর্চার মাধ্যমে তিনি সম্পূর্ণরূপে সুস্থ জীবনযাপন করেন,তাঁর শারীরিক গঠন ছিল দেখার মতো। এমনকী তিনি ১০৪ বছর পর্যন্ত অর্থাৎ মৃত্যুর আগে পর্যন্তও কোনও রোগে ভুগেছিলেন বলেও জানা যায় না। তাই কমবয়সী থাকতে গেলে কোনও বাহ্যিক ক্রিম,বোটক্স ইত্যাদির দরকার পড়ে না। শুধু প্রয়োজন পড়ে সঠিক জীবনযাত্রার মানের, যার দ্বারা আমরা একশো বছর না হোক অন্তত ৬০ বা ৮০ পর্যন্ত সুস্থ স্বাভাবিক রোগমুক্ত জীবন কাটাতে পারি বা তথাকথিত যুবক যুবতী থাকতে পারি।

পরিসংখ্যান সূত্র : গুগল

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...