অনাদর
✍️ ডা:অরুণিমা দাস
ঠাকুমার অসুস্থতার খবর শুনে রিমি অফিসের কাজ ছেড়ে দিয়ে তাড়াতাড়ি ট্রেনে উঠে বসে। জানলার ধারে সিট পেয়ে গা এলিয়ে দেয় তাতে। অনেক কথা মনে পড়ে যায় ওর। ছোটবেলায় রিমি মায়ের কাছে শুনেছিল যে সে হয়েছিল যখন তার ঠাকুমা মুখ দেখতে পর্যন্ত আসেনি। কারণ তিনি চেয়েছিলেন যে তার নাতি হোক। নাতনী হোক সেটা চাননি তিনি। রিমির পর যখন ভাই জন্মালো ছয় বছর পরে তখন ঠাকুমা ওর মাকে একটু ভালো চোখে দেখতো। তবে বাড়ীতে মাছ মাংস বা ভালো খাবার এমনকি পুজোর জামাকাপড় সবই বরাদ্দ ছিলো ভাইয়ের জন্য। রিমি এগুলো দেখে খুব কষ্ট পেতো,কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলতোনা। ভাই সবার আদর পেয়ে বিগড়ে যেতে শুরু করলো,রিমি প্রথমে কিছু বলতে গেলেও মেয়ে বলে তার কথার কোনো মূল্য দেওয়া হয়নি। এভাবে যেতে যেতে একদিন ভাই ধরা পড়লো ড্রাগ পাচার করতে গিয়ে। সেবারে বাবা আর ঠাকুমা গিয়ে ভাইকে ছাড়িয়ে আনলো কোনরকমে। আর সব দোষ গিয়ে পড়লো রিমির মায়ের ওপর। মেয়েকে দেখতে গিয়ে ছেলেকে মানুষ করার দিকে তার নজর নেই এই অভিযোগ এলো। রিমির মা কেমন যেনো চুপ করে গেলো। রিমি তখন গ্র্যাজুয়েশন শেষ করে চাকরীর পরীক্ষাগুলো দিচ্ছে। চাকরী যখন পেলো তখন সে কারোর তোয়াক্কা না করে মাকে নিয়ে আলাদা হয়ে গেলো। যেখানে তার আর মায়ের কোনো মূল্য নেই সেখানে না থাকাই শ্রেয়। এদিকে ঠাকুমার আসকারা পেয়ে ভাইয়ের দৌরাত্ম্য বাড়তে লাগলো। বাবা নিজের মান সম্মান বাঁচাতে একদিন ঘর ছাড়লেন। ঠাকুমার তখন বোধহয় একটু টনক নড়েছিল,নাতিকে শাসন করতে শুরু করলেন কিন্তু সেটা অনেক দেরী হয়ে গেছিলো। নাতি তখন হাতের বাইরে চলে গেছে। মুখের ওপর শুনিয়েছিল যাওনা নিজের নাতনিকে নিয়ে থাকো,সে তো চাকরী করে সেখানে গিয়ে থাকো যাও। সেদিনের পর থেকে ঠাকুমা আর কিছু বলেননি নাতিকে। হয়তো বুঝেছিলেন একসময় অন্যায় করেছেন। দিনের পর দিন অবহেলায় অযত্নে অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন। রিমির মা খবর পেয়ে রিমিকে বলেন ওখানে গিয়ে থাকবেন বলে। বলেন উনি ভুল করেছেন বলে আমরাই বা ভুল করবো কেনো! রিমি প্রথমে গররাজি হলেও পরে মায়ের জেদের কাছে হার মেনে ঠাকুমার কাছে ফিরে যায়। বছর তিনেক ধরে সে,মা আর ঠাকুমা একসাথে থাকে। আজ মায়ের ফোন পেয়েই দৌড়ে দৌড়ে আসছে রিমি। শেষ স্টেশন এসে গেছে,নামুন ম্যাম। টিটির ডাকে ঘোর কাটে রিমির। পুরোনো কথা ভাবতে ভাবতে কোথায় যে হারিয়ে গেছিলো সে, বুঝতেই পারেনি। স্টেশনে নেমে একটা রিক্সা ধরে বাড়ীর পথে পা বাড়ায় সে। বাড়ী পৌছে দেখে যে ঠাকুমা শুয়ে আছে, মা বসে আছে বিছানায়। মুখটা ঠাকুমার কানের কাছে নিয়ে এসে বলে কি করো তুমি?ওষুধ গুলো খাওনা কেনো?
-কাঁপা কাঁপা গলায় বলে অনেক ভুল করেছি, আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না রে দিদি। সেগুলো মনে পড়লে মনে হয় আমার আর থাকা উচিত নয় এই দুনিয়ায়।
-যা হয়ে গেছে সেগুলো মনে করে নিজেকে কষ্ট দিয়ে কি লাভ? আসলে কি জানো! অনাদরে বেড়ে ওঠা গাছেরাই কিন্তু ছায়া দেয়। আর সযত্নে লালন করা গাছেরা আগাছার মতো জাপটে ধরে কিন্তু ভালো কিছু করতে পারেনা।
যতদিন আমার সাথে থাকবে পুরোনো কোনো কথা মনে করবে না, কথা দাও সময় মতো ওষুধ খাবে, খাবার খাবে।
-সব করবো দিদি। আমার কথাটাও শুনতে হবে তোমায় এবার।
-কি কথা? শোনার মত হলে নিশ্চই শুনবো।
-কতদিন আর আমাদেরকে আগলে রাখবি? এবার নিজের একটা সংসার কর।
-ওসব করে কি হবে ঠাকুমা? মায়ের কষ্ট তো দেখেছি আর ওসব ভালো লাগেনা গো।
-সবার কপাল এক হয় না দিদি। আমার যে বড়ো ইচ্ছে তোর কোলে আবার মেয়ে হয়ে জন্মাতে। জানি তুই আমায় কোনোদিন অবহেলা করবিনা।
রিমির চোখে জল চিকচিক করে। ঠাকুমার হাতে হাত রেখে বলে সত্যি আসবে তো! আমি রাখবো তোমার কথা। আর আমার মেয়ে হয়ে এলে কোনোদিন অনাদর হবেনা তোমার। ঠাকুমা শীর্ণ হাত দুটি দিয়ে জড়িয়ে ধরে রিমি আর ওর মায়ের হাত। এই মুহুর্তের সাক্ষী রইলেন শুধু ঈশ্বর।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন