#বিষয় - শব্দ।
#নাম- নৌকা।
বাংলাদেশ নদীমাতৃক ও জলা-জঙ্গলের দেশ। বাংলা নামকরণে ইতিহাস বলছে - বাংলাদেশের মানুষের দেবতা *বোঙ্গা*। এই *বোঙ্গা* থেকেই *বঙ্গ* শব্দের উৎপত্তি। নদী,সমুদ্র দেশের যেন নার্ভ-স্পন্দন। প্রবাহিত জল তার প্রাণের স্বতঃস্ফূর্ত গতি। সেই জলপ্রবাহে শস্যশ্যামলা ধরিত্রীর ফসল নষ্ট হত। তার হাত থেকে রক্ষার জন্য বড় বড় *বাঁধ বা আল* দেওয়া হত। তা থেকে এ দেশের নাম - বঙ্গ+আল= বঙ্গাল বা বাঙ্গাল বা বাঙ্গালা। এই জলের হাত থেকে রক্ষা পেতে শুধু বাঁধ তার প্রধান প্রতিকার নয়,আরও অন্যান্য বিকল্প ব্যবস্থা একে একে এসেছিল,নৌকা তার মধ্যে অন্যতম। নদীনির্ভরতা থেকে রক্ষার আশ্রয় জলযান। এই জলযানের নৌকা হল একটি রূপ। অন্যান্য রূপ যেমন- বজরা,ডিঙি, ডোঙা,পানসি প্রভৃতি।
, চর্যাপদে নৌকার কথা পাই,যা দেহসাধনার মোক্ষম উপায়ের কথা বলা হয়েছে। খরস্রোতা নদীর স্রোতে নৌকা কাছি দিয়ে বাঁধা থাকত। নৌকা বাইতে - *খুন্টি উপাড়ি মেলনি কাচ্ছি ...* খুঁটি বা নোঙরে বাঁধা নৌকার কাছি খুলে নৌকাকে স্রোতের বিপরীতে টেনে নিয়ে যাওয়ার কথা আছে। এই কাছির আরেক নাম গুন।
শ্রীকৃষ্ণকীর্তনে 'নৌকাখন্ড'-এ কৃষ্ণ মাঝি।রাধা সওয়ারী। মাঝ নদীতে কৃষ্ণ নৌকা ডোবানোর কি কেচ্ছা-কেলেঙ্কারীটাই না! শ্রীকৃষ্ণকীর্তনকে এই ঘটনার জন্য আদি রসাত্মক কাব্য বলে অনেকেই অভিহিত করেছেন। রাধা ও কৃষ্ণের মাঝে নৌকা দৈহিক প্রেমের অনুঘটক।
এর পর মঙ্গলকাব্যগুলিতে নৌকার কথা যেমন, মনসামঙ্গলে চাঁদের সপ্ত ডিঙা সাজিয়ে বাণিজ্যে যাওয়া ও মনসার কোপে একে একে সপ্তডিঙা ডুবে যাওয়া, চন্ডীমঙ্গলের বণিক খন্ডে ধনপতি সওদাগরের সিংহলে বাণিজ্য যাত্রা ও কালিদহে কমলেকামিনী দেখা, অন্নদামঙ্গলে ঈশ্বরী পাটনী নৌকায় গৃহবধূর বেশে পরপারের যাত্রী হয়ে ওঠা ও ঈশ্বরীর সন্তানকে দুধে ভাতে থাকার বর মঞ্জুর করা,সপ্তদশ শতাব্দীর আরাকান রাজসভার বাঙালি মুসলমান কবি দৌলতকাজী,আলাওলের কাব্যে নদীমাতৃক বাংলার নিখুঁত পরিচয় পাই। তারপরে লোকসংস্কৃতির সঙ্গীত - জারি,সারি,ভাটিয়ালি ...সবই মাঝি মাল্লাদের গান। মধ্যযুগের বাংলা সাহিত্যে নৌকা কাহিনীতে বাঙালির কাছে যেন নৌকা-পাঁচালী বাঙালিয়ানার পরিচয়কে মেদবহূল করেছে।
উনিশ শতকে বাবুসমাজের কাছে নদীতে নৌকাবিহার একপ্রকার কেতাদুরস্ত আদবকায়দা ছিল।
বঙ্কিমচন্দ্রের 'কপালকুন্ডলা' উপন্যাসে নৌকায় সাগরতীর্থে ভ্রমণ ও নবকুমার কাহিনী অংশ - "তুমি অধম বলিয়া আমি উত্তম না হইব কেন" - এক কালজয়ী বাক্যের জন্ম হয়়েছিল,যার সৃষ্টির মূলে নদী,নৌকা বা বজরা। আর 'দেবীচৌধুরানী' বজরা আকাশের মেঘ দেখে কীভাবে মুভমেন্ট করত ,তাই তো রোমান্স কাহিনীর মূলে।
জোড়াসাঁকোর জমিদার ঠাকুর পরিবারের কাছে গঙ্গায় নৌকাবিহার ছিল শখের। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর নৌকাবিহারে ধ্যানের নির্জনতা খুব পছন্দের ছিল। পরবর্তীকালে রবীন্দ্রনাথের কাছে পদ্মায় নৌকাবিহারের অভিজ্ঞতার কত কত ভুরি ভুরি লেখা।
একদিনের একটি ঘটনা। খুব ছোট্ট তখন রবীন্দ্রনাথের ছেলে রথীন্দ্রনাথ। বজরায় কবি রথীকে নিয়ে নৌকাবিহারে নেমেছেন। গোধূলি আসন্ন। সূর্যাস্ত দেখার লোভে ডেকে চেয়ারে বসে। নীচে খর স্রোত। সামনে বসে রথী। শিশুর সাথে একথা ওকথা হতে হতে হঠাৎই কবির নতুন জুতোর একপাটি গেছে জলে পড়ে। নিমেষে কবিও জলে ঝাঁপ দিলেন। স্রোতে জুতো আগে, কবি পিছু। জুতো জয় করে তবেই উঠলেন। যে কোনো বিপদ হতে পারত। ঘরে ফিরতে মৃণালিনী দেবী খুব রাগ করে নিদান দিয়েছিলেন,তুমি যাও যাই করো ঐ দুধের শিশুকে নিয়ে আর যেও না। এমন অনেক ঘটনা রবীন্দ্রনাথের লেখায় পাই।
"মধুমাঝির ঐ যে নৌকা খানি ..." কিংবা 'দেবতার গ্রাস' কবিতায় নৌকা থেকে সেকালে সন্তান বিসর্জনের বেদনার ইতিহাস হয়েছিল নথিভুক্ত।
রবীন্দ্রনাথের 'সোনারতরী' কাব্যের নাম কবিতা- 'সোনার তরী'র শেষ কথা - "যাহা ছিল নিয়ে গেল সোনার তরী।" রবীন্দ্রনাথ পদ্মার বোটে বসে লিখেছিলেন একের পর এক ছোটগল্প। রবীন্দ্রনাথের জীবনে নৌকাবিহার ছিল এক অন্যতম অধ্যায়।
'খেয়া' কাব্য কবির আধ্যাত্মিক চিত্তে প্রশান্তির উদ্ধার। খেয়া নৌকায় কবি পরপারে পাড়ি দিয়েছেন। আর মৃত্যুচেতনার কথায়ও কবি বলেন- "আমার এ ক্ষুদ্র প্রাণ সুরের তরণী/ হাসিয়া ভাসায়ে দিলে, কৌতুকে ধরণী বেঁধে নিল বুকে।"
তাই নৌকার কথা বলে কে শেষ করবে! শেষ যার নেই। নৌকা আমাদের ব্যবহারিক ও আধ্যাত্মিক ভাবনার দ্বৈরথে চাপিয়ে বলতেই হয় এপার থেকে খেয়া বেয়ে ওপারে যাই সে তো মোর আয়ুষ্কালে মৃত্যুর পরোয়ানা। আমার নৌকা আমার দেহ। প্রাণ আমার দাঁড়। বুদ্ধি আমার মাঝি। চৈতন্য আমার নৌকার পাটাতন।
@ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।
👌👌👌👌👌
উত্তরমুছুনখুব সুন্দর লিখেছেন দাদা।
উত্তরমুছুনKhub sundor
উত্তরমুছুনঅনবদ্য প্রকাশ।👌👌👌
উত্তরমুছুনঅনবদ্য প্রকাশ।👌👌👌
উত্তরমুছুনঅনবদ্য 👌👌👏👏
উত্তরমুছুনঅসাধারণ 👌👌
উত্তরমুছুনঅসাধারণ 👌👌
উত্তরমুছুনখুব সুন্দর 👌👌👌💐💐💐
উত্তরমুছুনasadharan lekha dada .....mob prob. er jonno bes kikhudin uposthit thakte parbo na...... maf kormen .....ei bhabei lekha porbo ....fb o blog e apnader sathe dekha hobe .....
উত্তরমুছুনasadharan lekha dada .....mob prob. er jonno bes kikhudin uposthit thakte parbo na...... maf kormen .....ei bhabei lekha porbo ....fb o blog e apnader sathe dekha hobe .....
উত্তরমুছুনঅসাধারণ লেখা দাদা..💐👌💐
উত্তরমুছুনসাহিত্য,ইতিহাসের মিশ্রনে তথ্যপূর্ণ অসাধারন লেখনী।
উত্তরমুছুন