সোমবার, ১৭ মে, ২০২১

চাওয়া-পাওয়া অনিশা


 চাওয়া-পাওয়া

অনিশা


অপ্রতিরোধ্য শক্তির কাছে হেরে গিয়ে সায়নী যখন তার ঠোঁটে মুখে, হারিয়ে যাওয়া প্রিয়তম মানুষটির স্বাদ পেল তখন সে বুঝতে পারল সে বুঝি এই শক্তির কাছে হেরে যেতেই চেয়েছিল। বহু বছর পর ডাকাতিয়া বাঁশির মতো বিয়ে বাড়ীতে নীলের গলার গলার আওয়াজ পায় তখন এই পড়ন্ত যৌবনে ও সায়নীর মন উচাটন হয়ে ওঠে। বিয়ে বাড়িতে সবাই তখন বিয়ে দেখতে ব্যস্ত, শুধু সায়নী মেয়ের মা বলে বিয়ে দেখতে নেই। সে একটু বুকে ব্যথা নিয়ে ঘরের এককোনে বসে ছিল। কেমন অজানা আশঙ্কায় মন দুরুদুরু। সেই আশঙ্কাকে সত্যি করে দিয়ে নীলের আগমন। নীলের বুকে নিষ্পেষিত হয়ে যেতে যেতে সায়নী ফিরে গেল বহুবছর আগে এমনি এক সন্ধ্যায়।

অভিষেকের সঙ্গে সায়নীর বিয়ে আর কয়েকটা দিন পরেই। অভিষেকদের অনেক বড় বাড়ি। কাকা জ্যাঠা সব মিলিয়ে অনেক ভাই-বোন। অভিষেকের খুব ফর্সা গায়ের রঙ দেখে সবাই তাকে রাঙা বলে ডাকত। অভিষেকের ঠাকুরমা বলতেন, "বড়, মেজ, সেজ, ন, ফুল, ফল। তারপর তো নতুন কিন্তু আবার রাঙাবাবু আমার কোথা থেকে এলেন?"  অভিষেকে দাদাদের সবার বিয়ে হয়ে গেছে। বৌদিরা আদর করে রাঙা বাবু বলেই ডাকে। অভিষেকের বড় দাদা, বড় দিদিরা বয়সে অনেক বড়। বড়দির ছেলে নীল। সম্পর্কে অভিষেকের ভাগ্না। নীল মাঝেমাঝে মামার বাড়ি আসে। এখানে এলে সারাবাড়ি মাতিয়ে তোলে। নীলের গায়ের রং মাঝারি মাপের হলেও তার তার ঠোটের ও চোখের দুষ্টুমি ভরা হাসিতে সবাই কুপোকাত। বৌদিরা তো নীল বলতে অজ্ঞান। খুব মজা করে, আমুদে ছেলে। অভিষেকের সঙ্গে সায়নীর বয়সের অনেকটাই তফাৎ। প্রায় তার ভাগ্না নীলের বয়সী। সায়নীর মায়ের মৃদু আপত্তি থাকা সত্বেও সুপুরুষ ইঞ্জিনিয়ার পাত্রকে সায়নীর বাবা হাতছাড়া করতে চাননি। পাকা দেখার দিন বড়দি এসেছিল, নীলকে সঙ্গে নিয়ে। বড়দির তো খুব পছন্দ সায়নী কে। বাড়ি এসে প্রশংসায় পঞ্চমুখ। নীল তো ওখানে থেকেই গেল।  বলেছে রাতে খাওয়া-দাওয়া করে যাবে। আর ওদের বাড়ির লোকেদেরও খুব ভালো লেগেছে। অভিষেকের কেমন যেন ব্যাপারটা ভাল লাগেনি অথচ মুখে কিছু বলতে ও পারছে না।


দেখতে দেখতে বিয়ের দিন এসে গেল। বিয়ের কাজকর্ম দেখাশোনা করার জন্য বড়দি কে দুদিন আগেই আসতে বলা হয়েছিল। সেইমতো বড়দি দুদিন আগেই এসেছে। নীল আসার পর থেকেই বলছে, "একবার নতুন মামীমার সঙ্গে দেখা করে আসবো।" অভিষেকের বড় বৌদিরা এই নিয়ে খুব হাসি ঠাট্টা করছে। "বড় মামীদের আর মনে ধরছেনা বুঝি? আমাদের কেষ্ট ঠাকুর বুঝি রাধার প্রেমে মগ্ন।" এই নিয়ে হাসি-ঠাট্টা যতই বেড়ে উঠছে অভিষেকের মনের মধ্যে একটা অস্বস্তি দানা বেঁধে উঠেছে। ঠাকুরমা হয়তো কিছু একটা আন্দাজ করে মজা করে অভিষেককে বলেন, "ওরে ভাই, জানিস তো শ্রীকৃষ্ণ আসলে আয়ান ঘোষের ভাগ্না। রাধা হল কৃষ্ণের মামী। তাই তোর বৌদিরা একটু মজা করছে।" অভিষেক একটা কাজের বাহানা দিয়ে সেখান থেকে চলে যায়।


সন্ধ্যায় নীল সায়নীর এর কাছে যায়। সায়নী প্রথম দিনেই নীলকে দেখে তার জীবনের প্রথম ভালোলাগা অনুভব করতে পারে। নীল ও সায়নীকে ছেড়ে বাঁচতে পারবে না জানায়। এই কথা জানানোর জন্যই সেদিন থেকে গিয়েছিল ওদের বাড়ি। কিন্তু তখন অনেক দেরি হয়ে গেছে। বিয়ের সব বন্দোবস্ত পাকা হয়ে গেছে। সায়নী বাবা মাকে এখন আর জানাতে পারবে না। আর এতে দুই পরিবারের অসম্মান। সায়নীকে কোনভাবেই রাজী করাতে পারেনি নীল। একবার শেষ বারের মতো দেখে আসবে সায়নী কে।

নীল যেতেই ওদের বাড়ির লোকজন সাদর অভ্যর্থনা জানান। সামান্য সৌজন্য দেখিয়ে নীল সায়নীর ঘরে যায়। ধীরে ধীরে ওদের কথাবার্তা শুরু হয়। নীল হঠাৎ গভীর আবেশে সায়নীকে জড়িয়ে ধরে।  সেদিন ও এই অপ্রতিরোধ্য শক্তির কাছে হেরে গিয়ে পরম সুখে সুখী হয়েছিল সে। যেন এই হেরে যাওয়াতেই সুখ। জীবনের চরম পাওয়ার মুহুর্তে তার দুফোঁটা চোখের জল জল গড়িয়ে পড়ে। তা দেখে নীলের মনে অপরাধ বোধ জেগে ওঠে। কিন্তু নীলকে ভুল প্রমাণ করে সায়নী নিজেই আবার নীলকে জড়িয়ে ধরে বিদায় জানায়।

আজ এত বছর পর সেই স্বাদ পাওয়ার জন্য তার মনটা যে উপোসী হয়েছিল, সায়নী নিজেও তা জানত না। শুধু একটি কথাই সে জানত, যা সারা পৃথিবীর কেউ জানে না এমনকি নীল ও জানে না, তা হলো তাদের সেই ভালোবাসার সন্তানকেই এত বছর বুকে আগলে বড় করেছে আজ তার বিয়ে। আর বাবা হিসেবে কন্যা সম্প্রদান করছে অভিষেক।

পৃথিবীতে সব চাওয়া যেমন পাওয়া যায় না, তেমনি সব চাওয়া চাইতেও নেই। এই অপ্রাপ্তিটুকু নিয়েই আমাদের বেঁচে থাকতে হয়, কর্তব্য পালন করতে হয়। আজও সেদিনের মতো চোখের জলে শেষ আলিঙ্গন দিয়ে বিদায় জানাল সায়নী তার প্রিয় পুরুষকে।

২টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...