বুধবার, ৩০ জুন, ২০২১

# নাম-দুর্নীতি। ✍ মৃদুল কুমার দাস।

শুভ শব্দ আলোচনা-বাসর। 
    #বিষয় - *শব্দ।*
      # নাম- *দুর্নীতি।*
    ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

       দুঃ + নীতি = দুর্নীতি- খারাপ নীতি। খারাপ আচার। জীবনের নেতিবাচক ভূমিকা। 
  জীবনের কাঠামো গড়ে ওঠে ব্যক্তি-পরিবার-সমাজ-দেশ নিয়ে। বিশেষ করে বাঁচার জন্য সমাজের সহযোগিতা সবচেয়ে বেশি লাগে। সবই দরকার। তাই আনে জীবনের  বিকাশ। সবই একপ্রকার ঋণ। খাদ্য-বস্ত্র-বাসস্থান - নিত্য ভোগ্যপন্যের মধ্যে নিজের উৎপাদনের অংশ নিতান্তই সামান্য। ভাষা,সংস্কৃতি সবই বৃহত্তর মানবগোষ্ঠী গড়ে ওঠার মিলিত সুফল ভোগী সকলে। এই ঋণ শোধ করার চেষ্টা বা আগ্রহ যার ভেতর নেই  সে পরশ্রমজীবী। পরজীবীতাই দুর্নীতির জন্ম দেয়। সমাজের ঋণ শোধের চেয়ে পরনির্ভর হয়ে স্বার্থলোভী হয়। আর ঋণশোধের যথাসাধ্য চেষ্টার মধ্যেই নীতির পরিচয় থাকে। আর এর অভাবকে বলে দুর্নীতি। এর উদাহরণের শেষ নেই। এই দুর্নীতিকে আশ্রয় করে গড়ে ওঠে যে একধরণের আচরণ তাকে বলে ভ্রষ্টাচার। তার বিরুদ্ধে প্রতিবাদ থাকে,কিন্তু নির্মূল করা যায় না। এর নিরাময় বা নির্মূল দুঃসাধ্য বলে এ হল সমাজের দুরারোগ্য ব্যাধি। সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে এর কুঅভ্যাস ছড়ানো। পরিবেশ দূষণ সম্পর্কে সচেতন হয়েও যেমন পরিবেশ দূষণ অহরহ করে চলি,এও ঠিক তেমনি দুর্নীতি জেনেও দুর্নীতি করা একটা স্বভাবের দাস সকলেই। যে এর থেকে মুক্ত হতে চায় সেই সমাজের ঋণ স্বীকার করলে দুর্নীতি মন থেকে নিকেশ করতে পারে।
   দুর্নীতির নানা রূপ আছে। কিছু প্রতিনিয়ত ঘটছে বলে চমক নেই,একটা গা সহা ব্যাপার। কিছু খুব চমকপ্রদ। ই.ডি.,সি.বি.আই.- দুর্নীতি দমন শাখার ভূমিকায় চোখ ভ্যাবাচ্যাকা খায়। ভাল  লোক আকন্ঠ দুর্নীতিতে ডুবে,দুর্নীতি দমন শাখা করে দেখায়। চিত্রশিল্পী শুভাপ্রসন্ন তুমিও। মন্ত্রী,আমলা তোমরাও।
   দুর্নীতি প্রতিরোধ করতে নীতির কথা বলি - অন্যায় যে করে,অন্যায় যে সয় উভয়েই সমান অপরাধী। অপরাধ মুখে বলি,কাজে তাকেই মদত দিই হরে দরে। দুর্নীতি রোধের আইন বিপক্ষে দাঁড়ায়। কিন্তু আইন বাবাজির ফাঁকতাল গলে দুর্নীতি দিব্যি টিকে থাকে। আইন মানুষের তৈরী। দুর্নীতিও। আইন দিয়ে দুর্নীতি রোখার অনেক প্রতিষ্ঠান আছে। তবুও কি দুর্নীতি রোখা যাচ্ছে! কারণ দুর্নীতি সামাজিক ব্যাধি।
      সমাজের যেখানে যত দুর্বলতা সেখানে তত দুর্নীতির আখড়া। দুর্নীতি ইচ্ছা করেও তৈরি হয়। কাজ জমিয়ে রেখে। কাজে যে সমাজ যত এগোবে তার দুর্নীতি তত কমবে। কীরকম?
  ধরা যাক ব্যাঙ্কে একটি ছেলে যত হাতের কাজ দ্রুত সেরে রাখবে তত কাজের জায়গা তৈরী হবে। ছেলেটি তাই করছে দেখে ইউনিয়ন তাকে সাবধান করে দিল এত কাজ করা চলবে না,কাজ জমতে দিতে হবে। কাজ জমলে বাড়তি রোজগারের সুযোগ মিলবে। বাড়তি পয়সা দিয়ে কাজ করাতে হবে কর্তৃপক্ষকে। এতে ইউনিয়নের ক্ষমতা জাহির হবে। অপরপক্ষে যাদের কাজ জমে আছে তারা বাড়তি পয়সা দিয়ে কাজ করিয়ে নেবে। কাজের ধরণ দুর্নীতির জন্ম দেয়। বেতনের বিনিময়ে সমাজকে কাজ দেব। সেই কাজের উপর নিয়ন্ত্রণ রেখে আসি যাই বেতন পাই,দুটো বাজলে পায়ে চটি গলাই,টাইমে লোকাল নাহলে ফেল হবে,হাতের কাজ হাতে থাকুক,বাড়তি কাজ বলে বিজ্ঞাপন দিয়ে বেতনের উপরি নিয়ে কাজ করা যাবে। মানে সমাজের চোখে কত বড় অন্যায়কারী,দুর্নীতি পরায়ণ হয়েও পার পেয়ে যায়। এটাই সিস্টেম বলে দিব্যি চালায়। এই থেকেই তো দুর্নীতির আখড়া তৈরি হয়। এজন্য দেশ পড়ে বিপদে।
  ভারতবর্ষ একটি কেলেঙ্কারির দেশ। বোফর্স,হাওলা,কয়লা,শেয়ার,স্টাম্প পেপার,হালে যেদিকে চোখবন্ধ করে দশটা ঢিল ছুঁড়বে আটটাই কেলেঙ্কারির গায়ে লাগবে। কেলেঙ্কারির হলাহলে সকলে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে প্রভাবিত হয়ে চলেছি। সর্বত্রে দালালি। শিক্ষা যদি জাতির মেরুদন্ড হয়,এখানে কেলেঙ্কারি সুযোগ বুঝে ঢুকছে। পড়তে লাগে,চাকরি পেতে লাগে।  স্বাস্থ্যের মত জায়গায় দুর্নীতি,স্বজনপোষন সে বলতে! চিকিৎসায় দালাল চক্র এখন রমরমা। করোনা ভ্যাকসিন নিয়ে জাল জুয়াচ্চরি হচ্ছে মানুষের দুর্বলতার সুযোগকে ঘিরে। দুর্নীতি রন্ধ্রে রন্ধ্রে। দুর্নীতি না হওয়া অস্বাভাবিক। যেখানে দেখিবে ছাই,উড়াইয়া দেখ ভাই দুর্নীতির তাল তাল মণিমাণিক্য তোমাকেও সাদরে অভ্যর্থনা করবে। বিপথে রোজগার করে অনেক সম্পদের অধিকারী,আমিও করব না কেন- এই বেপরোয়া মনোভাবই তো দুর্নীতির জন্ম দেয়। দুর্নীতির জন্ম হচ্ছে ভোগবাদ মনোভাবের জন্য। ভোগবাদের হাতছানির  কাছে মানুষ সংযম রক্ষা করতে পারছে না। আর সেই সুড়ঙ্গপথে দুর্নীতির ধামাকা। পরিবেশ দূষণের ন্যায় দুর্নীতি দূষণ এখন আধুনিক ভোগবাদের নতুন *অভিজ্ঞান জীবনম্।*
         *******
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

মঙ্গলবার, ২৯ জুন, ২০২১

#নাম- মানবিকতা। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ চিত্র আলোচনা-বাসর। 
  # বিষয় - *চিত্র।*
       # নাম- *মানবিকতা।*     
       ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

        শ্রমিকের শ্রমের মূল্য দেওয়া একটি সামাজিক কর্তব্য। শ্রমই জীবনের মূল্য নির্ধারণ করে। এই শ্রমের মূল্যের যে ফল তার সবাই আমরা উপভোক্তা পরোক্ষ ও প্রত্যক্ষভাবে বিনিময় প্রথার মাধ্যমে। এই উপভোক্তার মনে শ্রমের মূল্য যার কাছে যেমনভাবে গুরুত্ব তার জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গি তেমনভাবে গড়ে ওঠে। এই দৃষ্টিভঙ্গির পার্থক্যে মানুষে মানুষে পার্থক্য গড়ে ওঠে।
     মানবিকতা বিচারের মানদণ্ড সবার ভেতরে বিরাজ করে। এই মানদণ্ডটি হল মান ও হুশ = মানুষ। প্রত্যেকেই মানুষ,আবার মানবিকতার বিচারে কেউ মন্দ কেউ ভাল। কেউ স্বার্থপর তো কেউ নিঃস্বার্থ। কেউ শোষক তো কেউ সেবক। এভাবেই মানুষ সবসময়ই নিজেকে মেলে ধরছে। কর্মের মাধ্যমে,আচরণের মাধ্যমে তারই নিরন্তর প্রকাশ ঘটে।
   ছবিটির মধ্যে এক রিক্সোওয়ালার প্রতি মানবিকতার নিদর্শন দেখতে পাচ্ছি। 
       রিক্সোওয়ালার পেশা সমাজের শ্রমজীবী মানুষদের মধ্যে নীচের সারিতে বলে সমাজ গণ্য করে আর্থিকগতভাবে দুর্বল শ্রেণির বলে। তাই এদের প্রতি সহানুভূতি দেখালে সবচেয়ে মানবিকতার উত্তম নিদর্শন দেখানো হয়,কেননা দুর্বলের প্রতি সহানুভূতি দেখানো মানে শ্রেষ্ঠ মানবিকতা দেখানোর সুযোগ। সবল দুর্বলের প্রতি সহানুভূতি দেখিয়ে একপ্রকার স্বার্থও সিদ্ধি করে। দরদ একটা ছোঁয়াচে রোগ বলে দরদের বদনাম আছে। দরদীর দরদ প্রকাশ করেও নিস্তার নেই - দুর্নাম ও সুনাম দরদ বিচারের মানদণ্ড। 
   ছবিটি বেশ দৃষ্টিনন্দন। দু'জনেই সেবক। সেবা পরস্পর পরস্পরের দিকে বিনিময় ঘটছে। আবার এও বলা যায় একজন শ্রম দিচ্ছে। আরেকজন শ্রমের ফল ভোগ করছে। বর্ষার ছাতা রিক্সোওয়ালার মাথায় ধারণ করে মহিলাটি সেবাপরায়ণ মনোভাবে এক প্রকার কর্তব্যপরায়ণা বলে প্রমাণিত করছে। এই সেবার মধ্যে দাতা ও গ্রহীতার নিঃস্বার্থ মনোভাব খুব ভাল লাগছে। ভাল লাগছে কারণ দৃশ্যটা বিরল বলে। বাস্তবে এমন দৃশ্য আখছার দেখা যায় বলে। আর দৃশ্যটির একটু টি আর পি বেশী,ছাতা ধারণকারী মহিলা বলে। এও বিজ্ঞাপনের স্টাইল। মানবিকতার বিজ্ঞাপন। বিজ্ঞাপনে মেয়েদের দর বেশি। চিত্র স্রষ্টার এ হল মানবিকতার বিজ্ঞাপন। এমন চিত্র সমাজের কাছে দারুণ গ্রহণযোগ্যতা পাবে,কেননা কথায় ও কাজে অনেক ফারাক আছে বলে,সেই ফাঁকিতে সমাজ এভাবেই বিজ্ঞাপন হয়। এই বিজ্ঞাপনে কত লাইক,কমেন্ট ও শেয়ার সমাজমাধ্যমে জুটে গেছে। আমরা ছবিটার দিকে তাকিয়ে একটা গতিশীল ভাবনায় সমৃদ্ধ হচ্ছি - করে না দেখাই ভাবতে অসুবিধা নেই। ভাবনা আপনাপন।
     ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।
         ******
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

শুক্রবার, ২৫ জুন, ২০২১

#নাম- বিখ্যাত জীবন ও জীবন বিখ্যাত। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।


  #বিষয় - *জীবন যেরকম।*
  #নাম -
       বিখ্যাত জীবন ও জীবন বিখ্যাত।
    ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

      *"এ জীবন লইয়া কী করিব,এ জীবন লইয়া কী করিতে হয়।"* - এই কথাগুলি বঙ্কিমচন্দ্র বলেছিলেন। জীবন কেমন হওয়া উচিত যে যার নিজের জীবন সম্পর্কে জ্ঞান লাভ থেকে তার জীবন সেরকম হয়। প্রত্যেক জীবনের একটা দার্শনিক উপলব্ধি থাকে। যেমন- 
  জীবন মানে আর ক'দিন,যাকিছু এ জীবনেই আছে,পরজন্ম বলে কিছু নেই।
  জীবন ও মৃত্যু আয়ুর এপার ও ওপার। 
   জন্মেছ যখন মৃত্যু একদিন হবে। মৃত্যুকে এতো ভয় কেন!
 জীব সেবা শিব সেবা।
   এমন কত কথাই না দার্শনিক আধারে জীবনকে তুলে ধরা হয়। জীবন দর্শনের মোড়কে ধরা থাকে,যেমন দেহ ত্বকের মোড়কে। সুন্দর ত্বক সুন্দর দেহ সৌষ্ঠব। সুন্দর দর্শন সুন্দর জীবন।
    আবার এমনও বলা যায় জীবন মানেই দার্শনিক পাত্রে তেল বা জলের মত তরল পদার্থ। যে পাত্রেই রাখো সেই পাত্রের আকার নেবে। 
সেই ধারায় এও এক দার্শনিক উপলব্ধির কথা - জীবন বিখ্যাত মানেই সুখ ও শান্তির জীবন। মৌলিক অধিকার নিয়ে জীবন সুন্দর। পারিবারিক সুখের জীবন। পারিবারিক সুখ ও শান্তি যার যার নিজস্ব। সে জীবনের কোনো বিখ্যাত হওয়া লাগে না। জীবন তার বিখ্যাত।নিজস্ব বৃত্তে যে যার শ্রেষ্ঠত্ব অর্জন করে দিন যাপন করে। 
  কিন্তু বিখ্যাত হতে গেলে ( বঙ্কিমচন্দ্র, রবীন্দ্রনাথ,শরৎচন্দ্র...) অনুশীলন চাই। জীবনে ফাঁকি দিয়ে কোনোদিন বিখ্যাত হওয়া যায় না। একজন লেখক না হয়েও লেখা পড়ার জন্য বিখ্যাত হওয়া যায়। লেখা পড়ায় তার আনন্দ। আর লেখকের অনেক দায়,ভাল লেখক হওয়ার। ভাল লেখক না হলে বিখ্যাত লেখক হতে পারবেন না। ফাঁকি দিয়ে বিখ্যাত হওয়া যায় না। বালজাক,তলস্তয়,ডিকেন্স,দস্তয়ভস্কি বিখ্যাত হয়েছেন লেখাকে ঘিরে প্রথম পশ্ন দিয়ে - 'কী লিখব?' গুস্তেভ ফ্লবেয়ার বলতেন 'কেমন করে লিখব?' এই প্রশ্নেই এদের বিখ্যাত হওয়া লুকিয়ে ছিল। যেমন আমাদের বঙ্কিমচন্দ্রের জীবন সম্পর্কে প্রশ্নই আমাদের জীবনকে এক লহমায় চিনিয়ে দেয়। জীবন নিয়ে যদি বঙ্কিমচন্দ্রের মত ভাবতে না শিখি তাহলে  বিখ্যাত হওয়া,নিজেকে চিনতে না পারার অনেক দুর্বলতা থেকে যাবে। জীবন বিখ্যাত তার ন্যায়,নীতি,মূল্যবোধে। আর বিখ্যাত হওয়ার জন্য চলার অর্থ অন্য। 
         জীবন বিখ্যাত সবার,জীবনানুরাগী বলে- সবার উপরে মানুষ শ্রেষ্ঠ বলে। কিন্তু জীবন নিয়ে বিখ্যাত জীবন হতে গেলে অনেক পথ অতিক্রম করতে হয়। ঈশ্বরের কৃপার উপর অনেকে বিশ্বাস করে। মহামানব,মহান মণীষীর শিরোপায় তখন বিখ্যাত জীবনের জন্ম হয়। মানুষের দুবার  জন্ম হয় - মানুষ মাত্রেই জন্মালে বিখ্যাত বা শ্রেষ্ঠ মান ও হুশের জন্য। আর  দ্বিতীয় জন্ম তাকে বিখ্যাত হতে হয়। দেশে মানুষেমাত্রেই বিখ্যাত হওয়ার অভাব নেই,কিন্তু বিখ্যাত মানুষের অভাব আছে। সবাই বলতে পারে,লিখতে পারে ক'জন। তাই জীবন বিখ্যাত। কিন্তু বিখ্যাত জীবন লাভের জন্য চাই অনেক মেহনত। 
      ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।
         *********
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

বৃহস্পতিবার, ২৪ জুন, ২০২১

#নাম -ক্ষান্তবাদ।✍ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ শব্দ আলোচনা-বাসর। 
 # বিষয় - *শব্দ বিশ্লেষণ।*
   # নাম-  *'ক্ষান্তবাদী'*
  ✍ - মৃদুল কুমার দাস।
   
       জীবনের সহিষ্ণুতা একটি বিশিষ্ট গুণ, সহিষ্ণুতা,নীরবতা,স্থিতধী,উদারতা মন ও উষ্ণ তথা উগ্র  মেজাজের বিপরীত গুণাবলী। এই গুণগুলি দিয়ে  বিপরীতগামী পরম শত্রুকে জয়ের পন্থা। সর্বাবস্থায় মনে সাম্য ও শান্তভাব বজায় রাখার নাম ক্ষান্তবাদ। একটি পুরাকালের কাহিনি বললে বিষয়টি যথার্থ বোধগম্য হবে।
   পুরাকালে বারাণসীতে কলাবু নামে এক বদমেজাজি রাজা ছিলেন। তাঁর রাজ্যে কুন্ডলকুমার নামে এক বৈভবশালী ব্রাহ্মণ ছিলেন। হঠাৎ একদিন সমূহ বিত্ত বৈভব বিলিয়ে দিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে হিমালয়ে চলে যান। কিছুদিন পরে পুনরায় স্বস্থানে ফিরে এলেন এক বৈরাগ্য সন্ন্যাসীর বেশে। প্রথম দিন রাজা কলাবুর আতিথ্য গ্রহণ করলেন। পরদিন নগরে ভিক্ষান্ন সংগ্রহের জন্য সেনাপতির গৃহে গেলেন। সেনাপতি সন্ন্যাসীর নানা প্রকার মিষ্ট বাক্যে বড়ই খুশি। খুশি হয়ে রাজার উদ্যানবাটীতে থাকার ব্যবস্থা করে দেন সেনাপতি। 
  একদিনের ঘটনা। রাজা কলাবু সুরাপানে মত্ত হয়ে রাজনর্তকীদের সঙ্গে নিয়ে সেই সন্ন্যাসী যেখানে থাকেন  সেই উদ্যানবাটীতে এলেন। সেখানেই নৃত্যগীতের আসর বসানোর জন্য রাজা শয্যা পাতার নির্দেশ দিলেন। এক সময় রাজা কলাবু প্রধান নর্তকীর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। এদিকে নর্তকীরা দেখলেন রাজা যখন নিদ্রায় গেছেন, এই সুযোগে উদ্যানের ফলমূল আহরণ করতে উদ্যানে ঘুরে বেড়ানো যাক। সেই মত  গেলেন রাজনর্তকীরা। তাঁরা তখন দেখলেন এক শালবৃক্ষের নীচে বসে এক সন্ন্যাসী ধ্যান করছেন। খুব মজা হবে সন্ন্যাসীর ধ্যান ভঙ্গ করে। সন্ন্যাসীর কাছে যেতেই,তাঁরা অবাক। ইনিই তো সেই কুন্ডলকুমার। এখন সন্ন্যাসী! তাঁর কাছে নানা উপদেশ শুনতে লাগলেন নর্তকীরা। সবাই উপদেশের যাদুতে একেবারে মন্ত্র-মুগ্ধ। এমন সুন্দর অনেকটা সময় কাটাতে পেরে ধন্য হলেন সবাই। 
     এদিকে রাজা ঘুম ভেঙে দেখলেন প্রধান নর্তকী ছাড়া কেউ নেই। রাজাকে নর্তকীদের খোঁজ দিলেন এক অনুচর।  সেই মত রাজা দেখলেন গাছের তলায় সন্ন্যাসীকে ঘিরে সবাই উপদেশ শুনছে।
      তাই দেখে রাজা কলাবু তো রেগে অস্থির। রাগতঃ স্বরে বলতে লাগলেন এই ভন্ড সন্ন্যাসীকে শিক্ষা দেওয়া জরুরি। রাগে অগ্নিশর্মা রাজা কলাবু সন্ন্যাসীকে উগ্র মেজাজে বললেন-"আপনি কোন মতাবলম্বী?"
  তখন সন্ন্যাসী শান্তভাবে  উত্তর  দিলেন- "আমি একজন ক্ষান্তবাদী। সকল অবস্থায় আমি ক্রোধ সম্বরণ করে মনকে শান্ত রাখি। তাই আমার ক্ষান্তি। 
 তখন রাজা আরো ক্রুদ্ধ হলেন। কাঁটার চাবুকে সন্ন্যাসীকে ক্ষতবিক্ষত করতে জহ্লাদকে নির্দেশ দিলেন। তাতে সন্ন্যাসীকে নির্বিকার দেখে ক্রমে ক্রোধের বশবর্তী হয়ে হাত পা কাটতে বললেন রাজা। শুধু সন্ন্যাসী বললেন ক্ষান্ত আমার হাত পায়ে থাকে না। এর পর চোখ,কান, নাক সব কাটার নির্দেশ দিলেন। তাতেও সন্ন্যাসী ক্ষান্ত। সন্ন্যাসী বললেন ক্ষান্ত তাঁর হাতে পায়ে নয়। আরো গভীরে। সন্ন্যাসী একইভাবে ক্ষান্তমনে তেমনি নির্বিকার। শেষে প্রাণ গেলেও আমাকে এমনিভাবেই ক্ষান্ত হয়ে দেখতে পাবেন রাজন। প্রবল রোষ দিয়ে যখন কিছুই হলো না,রাজা রুষ্ট মনেই স্থান ত্যাগ করলেন। আর সন্ন্যাসী সেই একইভাবে বলতে লাগলেন- "কোন অবস্থাতেই আমি আমার ক্ষান্তধর্ম বিসর্জন দিতে পারব না রাজন।" কথাগুলো রুষ্ট মনের উপর যেন ঘৃতাহূতি লাগল রাজার কাছে। ক্ষান্তবাদ সন্ন্যাসীকে স্বধর্মচ্যূত করার অক্ষমতা ও ব্যর্থতা থেকে হতাশাগ্রস্থ রাজা স্থান ত্যাগ করলেন। এদিকে জহ্লাদ বেচারা  সন্ন্যাসীর কাছে করজোড়ে বিনীত স্বরে বললেন - "আমি আজ্ঞার দাস। এটাই আমার পেশা। তাই হে বোধিসত্ত্ব যে এই কাজ করিয়েছেন তাকে ছাড়া অন্যকাউকে ও আমাকে দোষের ভাগীদার করবেন না।"
সন্ন্যাসীর মুখে সেই একই কথা। তিনি বললেন- "আমার পক্ষে কারো প্রতি ক্রুদ্ধ হওয়া অসম্ভব।" এই বলে সন্ন্যাসী তৎক্ষণাৎ প্রাণ ত্যাগ করলেন। আর রাজা কিছুটা দূর গেছেন, এমন সময় ধরণী দ্বিধা হল,আর রাজাকে তৎক্ষণাৎ ধরণীর অগ্নিশিখা গ্রাস করল। রাজার উদ্যানের থেকে বেরনো আর হল না।
    ক্রোধ মানুষকে বিপন্ন করে। শান্ত,স্থিতধী,নির্বিকার মন যথার্থ সত্যের সন্ধান দেয়। অশান্ত হৃদয়,উগ্র মেজাজ মানসিক বিকৃতির লক্ষণ। জাগতিক জীবন সংসারের নানা কর্মকান্ড থেকে কেউ অস্থির,চঞ্চল,ক্রোধী হয়। রক্ত মাংসের শরীর বলে সাফাই গাই। আসলে এগুলি মনের বিকাশের অন্তরায়। ক্রোধ,কামনা,বাসনা,ভোগ,লালসাপ্রিয়তা মানুষকে অভিশপ্ত করে,আর শান্ত,সৌম্য,ক্ষান্ত,নির্লিপ্ত জীবন-দর্শন জীবনকে দেয় পুণ্য,লোভী,ক্রোধী,হিংসা,ঈর্ষাভাব থেকে শত্রুতা আসে। ক্ষুদ্রতা তুচ্ছতার বোধ আসে। 
 সংসার সুখ ও দুঃখের, তার কারণ লোভ লালসা ভোগাকাঙ্খা। এ সবের মধ্যে যত জড়াবে তত আমার  আমার অহংকার আসে। আর হৃদয়কে যত সত্য সুন্দরের মুক্ততীর্থগামী করবে তত জীবনের আনন্দ। সন্ন্যাসীর এই উপদেশ ছিল  হয়তো এতক্ষণ ধরে,তাই শুনে রাজনর্তকীদের মোহিত করেছিল। কারণ রাজার ভোগ্যপন্যের বাইরে তাদের কোনো মুক্ত জীবনের উল্লাস-আনন্দ ছিল না। রাজা নিজের অহংকারের কাছে অশান্ত,শুধু রোষ পোষণ করতে শিখেছে,তা থেকে নিজের ধ্বংসের কারণ হয়েছে। আর ক্ষান্তবাদ জীবনের সেই শুভচেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে আমাদের জীবনকে করেছে মনোগ্রাহী। তাই রাজা কলাবু যতটাই ঘৃণার উদ্রেগ করলেন, সন্ন্যাসী ততটাই মনকে শুভ চেতনায় উদ্বুদ্ধ করলেন। ক্ষান্তবাদ একটি হৃদয়ের সেই অনুকরণীয় সৌন্দর্য। 
     ধন্যবাদ।  শুভেচ্ছা।
             ******
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

সোমবার, ২১ জুন, ২০২১

# পিথাগোরাস,জন্মকথা, বিবর্তন,মা ও নবজাজাতকের যত্ন। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

# বিষয় - *বিজ্ঞান।*
   # নাম- 
       *সন্তান উৎপাদনের বিবর্তন-কথা।*
       
     সন্তান উৎপাদনের রহস্য নিয়ে লোক সংস্কারের জন্ম কবে থেকে শুরু সে খবর জানা নেই, তবে পিথাগোরাসের সময় তথা পিথাগোরাস সন্তান উৎপাদন  নিয়ে কি বলেছিলেন তা থেকেই শুরু করি তাহলে।
           পিথাগোরাস ছিলেন গ্রীক পন্ডিত ও ধর্মগুরু। তিনি জ্যামিতি শাস্ত্রের নিজের নামাঙ্কিত উপপাদ্য সমকোণী ত্রিভুজ ও তার ক্ষেত্রফলের স্রষ্টা। গীর্জার ধর্মগুরু ছিলেন বলে অনেক নতুন নতুন গির্জা বানাতে গিয়ে মাপজোক করতেন,আর তা থেকেই ক্ষেত্রফলের সূত্র বের করেছিলেন, তা থেকেই উপপাদ্যের জন্ম। তিনি আবার একটি সম্প্রদায়ও  তৈরি করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন আচার সর্বস্ব ধর্মগুরু। আরণবিধি শিষ্যদের দিয়ে প্রচার করতেন। এই আচরণবিধিগুলির অন্যতম যেমন -
      ছোলা জাতীয় দানা খাওয়া নিষিদ্ধ,পড়ে থাকা জিনিস কুড়নো যাবে না, সাদা মোরোগ ছোঁয়া বারণ, ফুলের মালা ছেঁড়া পাপ, উনুন থেকে হাঁড়ি সরালে যেন ছাইতে হাঁড়ির ছাপ না থাকে ইত্যাদি বিষয়ক।
    শুধু ভাবতেন আচরণবিধির প্রচার করেই কি আর গুরুগিরিতে আটকে রাখা যায়! সন্তানের জন্ম ও তার মূলে নারী-পুরুষের ভূমিকা কী তা নিয়ে আদি থেকেই কৌতূহলের শেষ ছিল না। কেবল বিশ্বাসের ছড়াছড়ি। তিনি সেই বিশ্বাসের উপর পাঁচশ' খ্রীঃ পূঃ সন্তান উৎপাদনের একটি নিজস্ব তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন,যা শুনলে বর্তমানে আঁতকে উঠি।কী সেই তত্ত্ব? দেখা যাক।
  তিনি বলছেন সন্তানের জন্ম দাতা কেবলমাত্র পিতা। পুরুষের শুক্রাণু হল ভ্রুণ। শুক্রাণু মানুষের ক্ষুদ্র সংস্করণ। তা রক্ত বাহিত হয়ে সারা শরীরে ঘুরে বেড়ায়। ঘুরে ঘুরে সারা শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের খবর নেয়। তারপর গোটা মানুষের আদল নেওয়ার জন্য মাতৃজঠরে স্থান করে নেয়। পূর্ণাঙ্গ মানুষের রূপ নেয় মাতৃজঠরে। এক্ষেত্রে নারীর কাজ কেবল একটি আধার হওয়ার। নারীর কাজ হল কেবল আধার হওয়া। এছাড়া সন্তান উৎপাদনে নারীর কোনো ভূমিকা নেই।
       এই তত্ত্বকে নিজের নামাঙ্কিত উপপাদ্যের সাথে জুড়ে দিয়েছিলেন পিথাগোরাস। তিনি বললেন,সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজ কেমন হবে,তা নির্ভর করে ভূমি ও লম্বের ওপর। অতিভুজ যেমন ওই দুটি বাহুর নির্যাস, তেমনি সন্তানও নারী-পুরুষের নির্যাস।
        এই তত্ত্ব থেকে  শিষ্য প্লেটো পৌঁছে যান একেবারে ফর্মুলায় তাঁর 'দ্য রিপাবলিক'গ্রন্থে। এই ভাবে ফর্মুলা দিলেন, উন্নত নর ও নারীর সন্তান উন্নত,আর নীচ নর-নারীর সন্তান অবশ্যই নিম্নমানের। তাই সুনাগরিক সৃষ্টি করতে রাষ্ট্রনায়কগণের উচিত প্রজননের এই ফর্মুলার সাহায্যে কে কার শয্যাসঙ্গী হবে তা ঠিক করে দেওয়া।
       পিথাগোরাস ও প্লেটোর তত্ত্বকে একেবারে উড়িয়ে দিলেন অপর গ্রীক শিক্ষাগুরু অ্যারিস্টটল। প্রমাণ করে ছাড়লেন, পিথাগোরাসের তত্ত্ব পুরোপুরি মনগড়া। অ্যারিস্টটল বললেন, সন্তান যদি শুধু বাবার লক্ষণ নিয়ে জন্মায় তবে মা-দিদিমা-ঠাকুমার লক্ষণ পায় কীভাবে?  আরো যুক্তি যে পুরুষ দাঁড়ি-গোঁফ গজানোর আগেই সন্তানের জন্ম দেয়, তার সন্তানের আবার দাঁড়ি-গোঁফ গজায় কেন। কিংবা মেয়ে সন্তান ও স্ত্রী জননাঙ্গের খবর পায় কোথা থেকে। অ্যারিস্টটলের যুক্তি খন্ডন করা ছিল অসম্ভব। অ্যারিস্টটলকে মানল সবাই। অ্যারিস্টটল বললেন সন্তান জন্ম দেওয়ার কৃতিত্ব একা পুরুষের নয়। নারী শুধু আধার নয়, অনেক গুরুদায়িত্বও পালন করে, সন্তান প্রসবের আগে পর্যন্ত।
      কী সেই গুরুদায়িত্ব? পুরুষ শুক্রাণু দিলে নারী কী দেয়? এই নিয়ে চলল আরো শতাব্দীর পর শতাব্দী অনুসন্ধান। বিশ্বাস থেকে অন্ধবিশ্বাস কোনো ব্যাপার ছিল না। শধু ভাবলে অবাক হতে হয়, অন্ধবিশ্বাসগুলি তখনো দা ভিঞ্চি বা গালিলেও গালিলেই কিংবা নিউটনের যুগেও দিব্যি ঘুরে ফিরে বেড়াত। মহাকাশ বিষয়ে অনেক জানা হয়ে গেলেও নারী কীভাবে গর্ভবতী হচ্ছে তা তখনো মানুষ জানত না। জানত না অনেক প্রশ্নের উত্তর। যেমন অন্যতম জমজ বাচ্চা কেন জন্মায়? গর্ভবতী হওয়ার জন্য যৌন সংসর্গের প্রকৃষ্ট সময় পূর্ণিমা না অমাবস্যা। তাই নিয়ে জ্যোতিষীর বাজার ছিল খুব রমরমা। আরো কত শত বিশ্বাস। আরো বিশ্বাস জড় থেকেও নাকি জীবের সৃষ্টি।
      অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ১৭৬০-এর দশকে এই বিতর্কের অবসানের জন্য পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণ দিলেন স্প্যালানজানি। যিনি পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণিত সত্যে উপনীত হন যে জীবের জন্ম আর এক জীব থেকে। তাঁর স্ত্রী ব্যাঙ ও পুরুষ ব্যাঙ নিয়ে জলের ট্যাঙ্কে পরীক্ষাই তারই প্রমাণ দিয়েছিলেন। তাঁর এই কৃতিত্বকে ইতালি চিরস্মরণীয় করে রাখতে স্কানডিয়ানোতে একটি মর্মরমূর্তিকে আজও মর্য্যাদার সঙ্গে রক্ষা করে চলছে। 
  সন্তান উৎপাদনের গবেষণায় ম্যান্ডেলা ও বংশগতি অনেক অগ্রগতির  ফল এনেছে। বিজ্ঞানের গবেষণায় বর্তমানে সন্তান উৎপাদন কীভাবে হয় তা আর অজানা নয়। তবে
     সন্তান উৎপাদন কীভাবে (How) হচ্ছে সে উত্তর জানা, কেবল জানা নেই যা 'হোয়াই'-এর উত্তর। অর্থাৎ কেন বিপরীত লিঙ্গ পরস্পরকে খোঁজে তা আজও অজানা। কই ব্যাকটেরিয়ার বেলায়তো লাগে না,তারা কিন্তু দিব্যি বংশবৃদ্ধি করতে পারে। পারে সত্য, কিন্তু আদি থেকেই তারা যে এক কোষী ছিল, তাই আছে। কিন্তু জীব বহুকোষী। কোষের ভিত্তি জীন। এই জীনেই লুকিয়ে আছে 'কেন'-এর রহস্য। জীনের কেরামতিতে জনন,সন্তান উৎপাদন,সন্তানে জিনের ট্রানসপারেশন,জীবদেহের কাঠামো জীববৈচিত্র্য,জীবানু (ভাইরাস,ব্যাকটেরিয়া) ও তাকে প্রতিরোধ করতে ইমিউনিটি ক্রমশ জীববিজ্ঞানের বিষয় ভিত্তিক জ্ঞানের অঙ্গ হয়েছে। বিশেষ করে জনন ক্রিয়া থেকে সন্তান উৎপাদন,আর সন্তান জন্মের পর জীবদেহের কোষ বিভাজন, বংশবৃদ্ধির মূলে জনন ক্রিয়া মূল ভিত্তি। আর তার অনেক রহস্য। এই রহস্যের 'কেন'-র উত্তর আজও নেই।

**গর্ভাবস্থায় ও প্রসবোত্তর যত্ন আত্তির কিছু কথা:-
 ১। গর্ভবতী মা গাইনো স্পেশালিস্টের আন্ডারে থাকবেন। দশ সপ্তাহের পর থেকে দশবার চেক আপ করাবেন।
২। গর্ভবতী মাকে গর্ভাবস্থায় দশ কেজি ওজন বাড়াতে হবে, তিন কেজি শিশুর তবে জন্ম হবে।
৩।  গর্ভবতী মাকে দশ ঘন্টা ঘুমোতে হবে। দিনে দুই,রাতে আট।
৪।  দশ মাস গর্ভাবস্থায় রক্তে শতকরা দশগ্রাম হিমোগ্লোবিন হতে হবে। প্রথম তিনমাস বাদে প্রতিদিন একটি করে ফালিক অ্যাসিড ভিটামিন ট্যাবলেট খেতে হবে,এবং তা চলবে প্রসবের পর চার মাস পর্যন্ত, যতদিন  শিশু বুকের দুধ খাওয়া পর্যন্তও চলতে পারে।
 ৫। গর্ভের দশ মাসের মধ্যে দুটি টিফিনেস টকসয়েড ইঞ্জেকশন নিতে হবে। প্রথমটি পাঁচ মাসে,দ্বিতীয়টি ছ'মাসে। আর তৃতীয়টি নিতে হবে প্রসবের পর দ্বিতীয় মাসে।
 @ আর প্রসবের সময় যত্ন -
     ১।প্রথম গর্ভবতীর প্রসবের জন্য সময় দশ থেকে বারো ঘন্টা। দ্বিতীয় বা তার বেশী হলে পাঁচ ছ' ঘন্টা। 
  ২। দশ আপগারওয়ালা শিশুকে প্রসবের করাতে হবে। যাতে প্রসবকালে শিশু খুব ভাল কাঁদে। যত প্রবল কাঁদবে তত শিশু সুস্থতার লক্ষন। একে বলে দশ আপগার শিশু।
 

  # ঋণ অস্বীকার -
       ১। পথিক গুহ ( 'দেশ' ১৭-জুন ২০১৭) 
  ২। 'সুখী জীবন'- অধ্যাপক ডঃ সি.এস. দাঁ (গাইনো স্পেশালিস্ট),পৃঃ :- ১৬০
           *********

    # কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

শুক্রবার, ১৮ জুন, ২০২১

# নাম- সম্পর্ক ও জীবন। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।


 # নাম- সম্পর্ক ও জীবন।  
        ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

      সম্পর্ক একটি যোগ প্রক্রিয়া। যেকোনো যোগ যেকোনো সম্পর্ক। এই সম্পর্ক আধ্যাত্মিক,সম্পর্ক ব্যবহারিক। আধ্যাত্মিক যখন  তখন তা ভগবানের সঙ্গে সম্পর্ককে ঘিরে জীবনের পরিক্রমা। ধর্মীয় ভাবনায় মন্দির-মসজিদ-গির্জাকে ঘিরে শ্রেণি-গোষ্ঠীর যে যার সঙ্গে সম্পর্কের মেলবন্ধন। যার ধর্মাচারণ যেমন তার ঈশ্বর তেমন। সে যোগের মহান অনুষ্ঠান- ভাব,ভক্তি ও ভালবাসার। ব্যক্তি থেকে সর্বজনীন সম্পর্কের নানা পরিচয়।
  আর ব্যক্তিগত থেকে সর্বজনীন সম্পর্কের পরিচয়ে ব্যবহারিক জীবনের  সঙ্গে মানুষের সঙ্গে মানুষের,মানুষের সঙ্গে জড়ের,প্রকৃতির সম্পর্ক,জড়ের সঙ্গে জড়ের সম্পর্ক- সম্পর্কেই জ্ঞানের বিশ্ব থেকে মহাবিশ্বে বিচরণ। সম্পর্কের বিচারের অনন্ত পরিসীমায় শুধু মানুষের ব্যবহারিক সম্পর্কের দিকের কথা বলে শেষ করা যাবে না। 
  মানুষের সঙ্গে মানুষের সম্পর্ক তিন ধরনের দেখা যায়। যেমন- 
     ১। আত্মীয় সম্পর্ক।
     ২। ব্যবসায়িক সম্পর্ক।
     ৩। আগ্রাসী সম্পর্ক।
            প্রথমটি পারিবারিক- বাবা মা সন্তান সন্ততি ছাড়াও আত্মিক সম্পর্কে আত্মীয়স্বজন। রক্তের সম্পর্কে বেশী ঘনিষ্ঠতা বোধ হয়। অহংয়ের সঙ্গে খুব গভীর সম্পর্ক থাকে। আমার, আমরা, আমাদের থেকে ঘনিষ্ঠতা। একে অপরের পরিপূরক হয়ে চলি।
দ্বিতীয়টি যে ব্যবসায়িক সম্পর্ক,তা একাধিক পক্ষ সংক্রান্ত সম্পর্ক। পারিবারিক সম্পর্কের থেকে সম্পূর্ণ আলাদা। ক্রেতা ও বিক্রেতার সম্পর্ক। ক্রয় ও বিক্রয়ের সম্পর্ক। স্বার্থের সম্পর্ক। সবরকম ভোগ্যপন্য বিনিময়ের লাভ লোকসানের সম্পর্ক। স্বার্থ শেষ সম্পর্ক শেষ। নতুন সম্পর্ক সে ভোগবাদের নিরিখে আসে। এই ব্যবসায়িক সম্পর্কের স্তর নানাপ্রকার,থরে থরে সন্নিবেশিত। শুধু পরিচয় থেকে সম্পর্ক ভিন্ন ভিন্ন। তবে প্রয়োজনের জন্য।
  আর তৃতীয় যে সম্পর্ক- আগ্রাসনের সম্পর্ক। দুই পক্ষ  পরস্পরের সম্পর্কে থাকে দূরত্ব-ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্পর্ক। যেমন- ব্রিটিশ ভারতে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রবেশ বণিকের মানদন্ড নিয়ে। চূড়ান্ত পরিণতি রাজদন্ডের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করে। সে সম্পর্ক বাংলার নবাব সিরাজদ্দৌলা চাননি বলে পলাশীর যুদ্ধ হয়,আর বিশ্বাসঘাতক মীরজাফর ও অন্যান্যরা স্বার্থের সম্পর্কে বাঁধা পড়েছিল বলে ব্রিটিশ সাম্রাজ্যবাদের প্রবেশ ঘটেছিল। এ সাম্রাজ্যবাদ ও পরাধীন সম্পর্ক থেকে স্বাধীনতার জন্য বিপ্লবের সম্পর্ক ছিল বলে কত প্রাণের বিনিময়ে এসেছিল স্বাধীনতা। প্রায় দু'শ বছরের ব্রিটিশ শাসনের সঙ্গে ঘর করে কত রক্তপাত ঘটেছিল, ইতিহাস তার সাক্ষ্য দেয়। ইচ্ছার বিরুদ্ধে সম্পর্ক বলে ব্রিটিশ শক্তি ছিল আমাদের সঙ্গে সাম্রাজ্যবাদের আগ্রাসন সম্পর্ক। আরো সহজ করে বলি। যেমন- ডাকাত ও গৃহস্থের সম্পর্ক। একজনের ইচ্ছার বিরুদ্ধে আরেক সম্পর্ক স্রেফ আগ্রাসন থেকে। হ্যাকারও একজন আগ্রাসক- সকলে অর্থ যখন সামলায়, হ্যাকার তখন অজান্তেই অর্থ হাতায়। ইচ্ছার বিরুদ্ধে অর্থ অপহরণ করে। এ হল আগ্রাসন সম্পর্ক। নারী নিগ্রহও সমগোত্রীয়। অপরাধের বিচার,জেল হাজত সব ন্যায়-অন্যায় সম্পর্ক।
  রাষ্ট্রের গঠন,ক্ষমতার লড়াই, রাষ্ট্র দখল এ সব জানতে ইতিহাসের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপন করতে হয়। বিজ্ঞানের সঙ্গে সম্পর্কে আসে বৈজ্ঞানিক ধ্যানধারণা। সাহিত্য সংস্কৃতির সঙ্গে সম্পর্ক,সামাজিক সম্পর্ক ও সম্পর্কিত জীবনের মূল বৈশিষ্ট্য।
 সম্মিলিত জাতিপুঞ্জ দেশে দেশে শান্তির সম্পর্ক রক্ষার জন্য একটি সংস্থা। ওয়ার্ল্ড হেল্থ অর্গানাইজেশন (হু) বিশ্ব সাস্থ্য সংস্থা- বিশ্বের স্বাস্থ্য রক্ষার জন্য দেশের সঙ্গে দেশের সমন্বয়ের সম্পর্ক গড়ে তোলার জন্য প্রতিষ্ঠিত। 
  জলের সঙ্গে মাছের সম্পর্ক- জল ছাড়া মাছ যেমন বাঁচে না,তেমনি মানুষ সম্পর্ক ছাড়া বাঁচতে পারবে না। এই সম্পর্কের দ্বারা সত্তার বিকাশ হয়। সম্পর্ক বিকাশকে ত্বরান্বিত করে,সম্পর্ক অধঃপতনকে ত্বরান্বিত করে - সম্পর্ক সদ,সম্পর্ক অসদ। সৎ সঙ্গে স্বর্গবাস,অসৎ সঙ্গে সর্বনাশ। সুতরাং সুন্দর সম্পর্ক সুন্দর জীবন,খারাপ সম্পর্ক অধঃপতিত জীবন। শোষণ,নিপীড়ন,অত্যাচার,অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের সম্পর্কের নাম বিদ্রোহ। আর ন্যায়,নীতি,সততা,প্রেম,প্রীতি মূল্যবোধের সঙ্গে জীবনের সম্পর্ক মানে সুন্দর জীবন। সকল মানুষ সম্পর্কের বলেই যে যার পরিচয় গড়ে তোলে। 
     জন্ম হোক সেথা সেথা,সঠিক কর্মের সঙ্গে সম্পর্কই জীবনের যথার্থ উন্নয়ন।
     এতো গেল সম্পর্কের ব্যবহারিক দিক। আরো আছে সম্পর্কের কিছুকথা।
     সম্পর্কের প্রথম সুত্র- দুটি কোষ (শুক্রাণু ও ডিম্বানু) একত্রে মিলনের সম্পর্ক থেকে সেই সম্পর্কের শুরু। জন্ম থেকে মৃত্যু পর্যন্ত কেবল সম্পর্কের সমীকরণ। যত সম্পর্কের বিস্তার জীবন তত বিস্তৃত। সম্পর্কের লীলার দুটি ধারা - একটি সুখ-দুঃখ,আরেকটি আনন্দ। সুখ-দুঃখ দৈনন্দিনতার সামগ্রী,আনন্দ সেই দৈনন্দিনতাকে অতিক্রম করার সামগ্রী। সুখ ও দুঃখের সম্পর্কে প্রাত্যহিকতায় হৃদয় সঙ্কুচিত ও প্রসারিত হয়,আর আনন্দ কেবল হৃদয়কে প্রসারিত করে। যত আনন্দের প্রকাশ তত হৃদয়ের বিস্তার। ফুল আপনার জন্য ফোটে না,ধূপ আপনার জন্য পোড়ে না - সেই হৃদয় আপনার তরে নহে,অপরে বিলিয়ে সেবার সম্পর্ক চায়, সেই তো ফুলের মত বিকশিত হতে,ধূপের মত বিলিয়ে দিতেই। এই সম্পর্কই পথ,সম্পর্কই মত। 
  শিশুকে ভালবাসি মানে নিজের শৈশবকে পাব বলে,মাতৃত্ব ও পিতৃত্ব চাই মানে পিতা ও স্বর্গের সুখ ও আনন্দ,আর জননী জন্মভূমি স্বর্গের চেয়েও বড় - সম্পর্কের এক একটি দুর্লভ সংকলণ। সম্পর্কের যত মায়া ও মোহ, তত ধরিত্রীময়,আর সম্পর্ক যত মায়া ও মোহ থেকে মুক্ত, তত ভাবসকলকে সুষুম্নাবাহিত করে ভাবসকল আরো আরো উর্ধগামী করে সহজানন্দ, বিরমানন্দ,পরমানন্দ দান করে। পরমপুরুষ পরমানন্দ তথা সচ্চিদানন্দের সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপিত হয়। আবার মাতৃভাবে জগন্মাতার সঙ্গে সম্পর্ক স্থাপিত হয়। সম্পর্কের এই পার্থিব থেকে অপার্থিব,রূপ থেকে অরূপে,সীমা থেকে অসীমে অভিসার হল সম্পর্কের মহোত্তর সাধনা ও সিদ্ধি।
   সম্পর্কের শেষ নেই যেখানে সম্পর্কের কথা শেষ করি কি প্রকারে। সম্পর্কের জয় হোক।
              *********
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

বুধবার, ১৬ জুন, ২০২১

#নাম- আষাঢ়স্যদিবসা। ✍ - মৃদুল কুমার দাস

শুভ সান্ধ্য আলোচনা-বাসর।
  # বিষয় - *আষাঢ় মাস।* 
    # নাম- *আষাঢ়ে মন।* 
       ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

      কালিদাসের *মেঘদূতম্* এ শুরু *("কশ্চিৎকান্তাবিরহগুরুণা স্বাধিকারপ্রমত্তঃ..."*) বিরহের কাব্যকথা দিয়ে,আর তারপরেই সেই বিখ্যাত লাইন *"আষাঢ়স্য প্রথম দিবসে মেঘমাশ্লিষ্টসানুং..."*  বিরহীর কাছে আষাঢ় মৃত সঞ্জীবনী সুধা। বিরহী যক্ষ মেঘকে দূত করে আষাঢ়ের প্রথম দিবসে যক্ষ তার প্রিয়াকে বার্তা পাঠাচ্ছে তাকে নিয়ে প্রিয়া যেন বেশী চিন্তা না করে। আর মেঘ-ভজনায় মেঘের স্তুতি করতে যক্ষ বিন্দুমাত্র কার্পণ্য না কর বলছে, - 'হে পুষ্কর বংশজাত...'-এই বলে মেঘবন্দনা করেছে মেঘের কাছে প্রিয়াকে খবর দেওয়ার কাজ যাতে পায়। মেঘকে সম্বোধন করে বলেছে তুমি যখন নদ নদী নগরীর উপর দিয়ে বয়ে যাবে দেখবে কত নারী পুরুষ তোমার জন্য বিরহে কাতর,যেমন আমার প্রিয়া আমার জন্য যেভাবে কাতর। মেঘদূতম্ এক কালজয়ী সৃষ্টি। আষাঢ় নিয়ে আলোচনা করব,আর মেঘদূতম্ এর ভাব আসবে না সে কি হয়! আষাঢ় নিয়ে আলোচনা করতে গিয়ে রবীন্দ্রনাথের কবিতা আসবেই - "নীলনবঘণে আষাঢ় গগনে তিল ঠাঁই আর নেই রে/ওরে তোরা ঘরের বাহিরে যাসনে...." - বর্ষা ও বসন্ত কবির প্রিয় ঋতু। এই দুই ঋতু প্রধানের কারণ শান্তিনিকেতনের দান। শান্তিনিকেতনের পরিবেশ কবিকে এই দুটি ঋতুর গভীরে অমৃতকুম্ভের সন্ধান দিয়েছিল। বিশেষ করে বর্ষাঋতু আবার সবার আগে। রবীন্দ্রনাথের বর্ষা কলকাতার জোড়াসাঁকোতে আর শান্তিনিকেতনে আকাশ পাতাল পার্থক্য অনুভূতিতে কীভাবে আসত 'ভানুসিংহের পত্রাবলি'র এক জায়গায় বলছেন- *"শান্তিনিকেতনের  মাঠে যখন বর্ষা নামে বৃষ্টি নামে তখন তার ছায়ায় আকাশের আলো করুণ হয়ে আসে, .....কলকাতায় বর্ষামঙ্গল গান হবে। কিন্তু যে গান শান্তিনিকেতনের মাঠে তৈরি সে-গান কি কলকাতা শহরের হাটে জমবে। .... আষাঢ় মাসের বর্ষাকে এ শহরে যেমন মানায় না..."* বলছেন জোড়াসাঁকোয় বর্ষামঙ্গল গানের আয়োজক দীনেন্দ্রনাথ ঠাকুর যেন কলকাতা থেকে শান্তিনিকেতনে পালিয়ে বর্ষামঙ্গল গানের আয়োজন করলে খুব আনন্দ পেতেন। 
      কালিদাস আষাঢ়ের মেঘ ও বর্ষাকে গ্রীষ্মের দাবদাহ থেকে ধরিত্রীর জীবসকলের মুক্তির আনন্দ দেখেছেন। আর কালিদাসের যোগ্য উত্তরসুরী রবীন্দ্রনাথের কাছে আষাঢ় ও বর্ষাঋতুর যেমন প্রাধান্য,আমরাও কবির  রোমান্টিক ভাবের সঙ্গে একাত্ম হয়ে আষাঢ়ের দূতকে পাই  শ্রাবণের ধারায় শ্রাবণীরূপে।
  সেই কবিতার ছোট্টবেলার বর্ষায় কাগজের নৌকা বানিয়ে স্রোতের মুখে ভাসিয়ে দিতাম। নৌকো স্রোতের টানে চলত,পিছু পিছু আমিও চলতাম। সেই ঘটনাকে রবীন্দ্রনাথ কাব্য করে জীবনের দর্শন মূর্ত করতে বুঝিয়ে দিলেন ঈশ্বর যেন এই জীবনকে ঐ নৌকার মত আয়ুস্রোতমুখে ভাসিয়ে দিয়েছেন,আয়ুস্রোতে আমরা সবাই ভেসে চলেছি,ধরিত্রী তাই ধারণ করেছেন,ঠিক আমরা স্রোতে শৈশবে যেমন নৌকা ভাসাই। আষাঢ় এলে ছোট্টবেলার তাই পুলক জাগে স্রোতে নৌকা ভাসাব। আর এখন সে সরল সৌন্দর্য থেকে অনেক দূরে এসে এখন জীবনটাই আয়ুস্রোতে ভেসে যাওয়ায় আছি। 
 নদীর যৌবগতি দেখে চোখ জুড়াই। আবার প্রকৃতির নিয়ন্ত্রণাধীন বলে কূল ছাপিয়ে শান্ত জীবনের উপর হামলা এই সামান্য জীবনের উপর দুঃখের আঘাত নামে( সাম্প্রতিক যশ)। মাথায় কলাপাতা, মানকচুর পাতা চাপিয়ে স্কুলে যাওয়া,স্কুলে না যাওয়ার ফন্দিতে ইচ্ছে করে জল কাদায় চিৎপটাংয়ের অভিনয় সে কি আর ভোলার!
     মুষলধারে বৃষ্টি গ্রামে কৃষকের তালপাতার পেখিয়া মাথায় ধান রোয়া, বাড়ির ছাতার চেয়ে পেখিয়া মাথায় রাস্তায় নেমে গলা ছেড়ে বলতাম "আয় বৃষ্টি ঝেপে .." সে মজার দিন আর নেই। এখন চাষের জমি,লাঙল,বলদের দিন গেছে। আষাঢ় এলে নিম্নচাপের দুঃস্বপ্নে নীল হয়ে যাই। অভিজ্ঞতা এখন আর সেই মধুর নেই। হয়তো আছে,বয়সের জন্য স্বাদ বদলে গেছে। এ বলার শেষ নেই। 
       ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।
           *********
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

#নাম- জামাইষষ্ঠী।✍ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ শব্দ আলোচনা-বাসর।
   # বিষয় - *জামাইষষ্ঠী।*
   ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

    বারো মাসে তের পার্বণ- এর জামাইষষ্ঠী বেশ ভালই জায়গা করে নিল। কেন না সংসারের মাঙ্গলিক ব্যাপার আছে বলে। স্ত্রী আচার আছে বলে। স্ত্রী যে সেই মঙ্গলের আধার বলে। একটা উপোষ সারাদিনের ক'সের কল্যাণ উৎপাদন ভাবা যায়! এ চাট্টিখানি কথা নাকি! স্ত্রী আচার বলে কথা! সংসারের মঙ্গলের বিধান বলে কথা! নিজের সন্তানের মঙ্গল অনেক ত চাওয়া হল,গোত্রান্তরিত কন্যা সন্তানের স্বামী আরেক নতুন সন্তান,তার মঙ্গলের জন্য স্পেশাল অনুষ্ঠানের একটা ব্যবস্থা থাকবে না তা কি হয়! তারই বিধান আসুক তাহলে। বিধানে মঙ্গলের দলিল রচিত হোক। পাত্র-পাত্রী শাশুড়ি ও জামাই। পার্শ্ব চরিত্র শ্বশুর বাড়ির পরিবারের বাকি সব আবাল বৃদ্ধ বণিতা। এক পারিবারিক সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান। সদ্য সদ্য জামাই ঠিক নতুন জামার মত। কি আনন্দ আকাশে বাতাসে। মেয়ের বাপের বাড়ি আসার মোক্ষম দাওয়াই। এই যে ক'দিন আগে ছিল ঘরের সদস্যা,জীবনের চাহিদায় নিয়মের নিগঢ়ে পড়ে এখন সে পরের বাড়ীর। যত দূর,কাছে পাওয়ার তত আকর্ষণ। তার আগমনের স্পেশাল অফার লাগিয়ে দাও জৈষ্ঠের ষষ্ঠিপূজোর সঙ্গে জামাই জন্য মঙ্গলের অনুষ্ঠান-বাহানায়। শাশুড়িকে উপোষ করিয়ে নিষ্ঠাসহকারে পারিবারিক অনুষ্ঠানটি হোক।
একজনের উপোষ সবার ভূরিভোজ কি মঙ্গলের দর কম নাকি! এক জনের দুঃখের বদলে সুখের খবর - এ হবে ঘরে ঘরে খাওয়ার উৎসব! ভূরিভোজ। ভূরিভোজে নিরীহ পশুবধ! বাণিজ্যের বাজারে হুল্লোড়। এক পারিবারিক হৈ হুল্লোড়ের দৌড় সামাজিক হৈ হুল্লোড় পর্যন্ত। জামাই ও শাশুড়ি মধ্যমনি। বাকিরা আনন্দের উপভোক্তা। দেবী ষষ্ঠীর পূজো উপলক্ষ্য, একজনের উপোষ সে তো দেবীর জন্য ভক্তি অনেক। খাওয়ার ঢাক গুড়গুড় বাদ্যির কাছে ওসব ভক্তি যা হওয়ার হবে। কিন্তু লক্ষ্য থাকবে কব্জি ডুবিয়ে ভূরিভোজ। আর মঙ্গল তো ওতেই। 
  জয় জামাই ষষ্ঠী। সবার মঙ্গল হোক। পারিবারিক অনুষ্ঠান জয়যুক্ত হোক।😆😆❤❤🙏🙏

#গল্প-জামাই আদর #কলমে-সোমা দে।


রাতুল আজ খুব খুশী। কারণ আজ জামাইষষ্ঠী। বিয়ের পর তাঁর প্রথম জামাইষষ্ঠী। তাই সে একটু বেশী আনন্দিত। শ্বশুরবাড়ি থেকে নিমন্ত্রণ পাবার আগেই সে শ্বাশুরীর জন্য সুন্দর একটি গিফ্ট আগের থেকেই কিনে রেখেছিল। শ্বাশুরির কাছ থেকে নিমন্ত্রণ পাবার পর তাঁর আনন্দটা আরো বেড়ে গিয়েছিল। 

যথাসময়ে রাতুল তাঁর স্ত্রীকে নিয়ে শ্বশুরবাড়ি উপস্থিত হল। রাতুলের শ্বশুরবাড়ির সবাই নতুন জামাইকে পেয়েতো খুব খুশী। জামাইষষ্ঠীর নিয়মকানুন সব পালন করা হল। রাতুল শ্বশুরবাড়িতে নতুন বউয়ের মতোই লজ্জা পেয়ে একজায়গায় চুপ করে বসেছিল। শ্বশুরতো এমন লাজুক জামাই পেয়ে আরো খুশী। 

দুপুরবেলায় রাতুল যখন খেতে বসলো তখন দেখল তাঁর খাবার থালটি খুব সুন্দর করে সাজানো হয়েছে। এছাড়া কত রকমের মেনু রয়েছে। এটা দেখে রাতুলের প্রচন্ড খিদে পেয়ে গেল। আসনে বসে সে প্রথমে ডাল ভাত ও বেগুনী খাওয়া শুরু করল। কিন্তু ডাল ভাত খেয়ে তাঁর শরীরটা কেমন করে উঠলো। যাক এবার বাদবাকি মেনু গুলিও অনেক কষ্টে খেল।যেই খাসির মাংস খাওয়া শুরু করল রাতুল আর নিজেকে ঠিক রাখতে পারলা।চিৎকার করে নিচে পা ছড়িয়ে বসল।প্রচন্ড ঘামতে লাগলো। কানটা ও বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। জামাইয়ের এরকম অবস্থা দেখে সবাই ভয় পেয়ে গিয়ে তাড়াতাড়ি তাঁর সেবা শুশ্রুষা শুরু করে দিল।একটু সুস্থ হওয়ার পর রাতুল খুব লজ্জা পেয়ে গেল। রাতুল লাজুক কনের মতোই বললো যে সে ঝাল খেতে পারেনা। 

প্রথম বছরের জামাইষষ্ঠীতে রাতুলের বেশ ভালো কেটেছিল তাইতো পরের বছরের জামাইষষ্ঠীর কথা ভাবলে রাতুলের গায়ে কাটা দিয়ে উঠতো। 

@ কপিরাইট রিজার্ভ ফর সোমা দে।

রবিবার, ১৩ জুন, ২০২১

স্বর্গে করোনা(রম্য রচনা)সুদেষ্ণা দত্ত

 


স্বর্গে করোনা (রম্য রচনা)

সুদেষ্ণা দত্ত   

মহিষাসুরের পর এক নতুন অসুরের আবির্ভাব হয়েছে—করোনাসুর।স্বাভাবিকভাবেই দেবতাকুলের সঙ্গে তার মোটে সদ্ভাব নেই।তারপর আবার এই অসুর দেবতাদের ভক্ত মানে বেছে বেছে মানুষগুলোকেই ধরছে।দুর্গার বাহনকে ধরতে গিয়েছিল,কিন্তু তার কেশর ফোলানোয় ব্যাটা ভয় পেয়ে গিয়েছে। এদিকে কে তাকে আগে দমন করে সেরার শিরোপা পাবে,তা নিয়ে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। অশ্বিনী কুমার আবার বলেছেন,মাস্ক না পড়লে,হাত না ধুলে, ভ্যাক্সিন না নিলে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখলে, এই অসুরকে দমন করা মুস্কিল হি নেহি,নামুমকিন।        

   দেবরাজ ইন্দ্রের এখন গুরুত্ব অনেক কমে গিয়েছে।মানবকুল আর বিশেষ ডাকাডাকি করে না।তাই মাঝে মাঝেই ইদানীং মানবকুলকে জব্দ করার জন্য বজ্রপাত ঘটাচ্ছেন।তবে ভিড় এড়িয়ে তিনি থাকতে পারেন।কিন্তু যেহেতু দেবরাজ,কিছু দায়িত্ব তো থেকেই যায়।তাই আজ অমরাবতীতে চলছে দেব—দেবীদের ভ্যাক্সিনেশন।সামাজিক দূরত্ব বিধির দিকে নজর রাখার দায়িত্ব পড়েছে মিত্রের উপর।তিনি সবাইকে নিয়ে চলতে পারেন।        

  প্রজাপতি ব্রহ্মা বয়োজ্যেষ্ঠ বলে তাঁকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।হঠাৎ মিত্র শুনতে পান ‘নারায়ণ নারায়ণ’ ধ্বনি।চমকে ওঠেন আর ভাবেন ঝামেলা লাগল বলে!কারণ ইতিমধ্যে মা মনসা পুরোনো স্বভাব মত ফাঁকতালে লাইনে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন।আবার ইন্দ্র বলে ওঠেন, “আমার বাড়ীতে ভ্যাকসিনেশনের ব্যবস্থা হয়েছে,আমার কিছু বাড়তি সুবিধা পাওয়া উচিত।আমাদের সাথে অপ্সরাদেরও ভ্যাকসিন হোক,নাহলে আমি নাচ দেখব কি করে!”মনসা মনে মনে ভাবেন, “পুরুষ মানুষ চিতাতেও সোজা হয় না বাপু।সবাই প্রাণ ভয়ে মরচে,আর ইনি একেবারে রসে টইটম্বুর—নাচ দেখবেন”!যথারীতি ঝামেলা লেগে গেল।মিত্র কুপন ধরিয়ে সবাইকে নির্দিষ্ট সময় বেধে দিলেন।তাতে ঝামেলা কিছুটা মিটল।কিন্তু এবার সমস্যা দেখা দিল অগ্নিদেব আর বরুণ দেবকে নিয়ে।অশ্বিনীকুমার অগ্নিদেবকে ভ্যাক্সিন দিতে নারাজ।তিনি অগ্নিদেবকে ভ্যাক্সিন দিতে গেলে জ্বলে—পুড়ে যাবেন।তখন রফা হল অগ্নিদেবকে ভ্যাক্সিন দেওয়ার সময় বরুণ দেব তাঁর কাজ করবেন,আবার বরুণ দেবের বেলায় ঠিক উল্টোটা—নাহলে ওনার ভ্যাক্সিন শরীরে প্রবেশের আগেই ধুয়ে যাবে।      

  এদিকে মহামায়াদের আসার সময় হয়ে গিয়েছে।কিন্তু তাঁদের দেখা নেই।গনু আগেই কুপন নিয়ে গিয়েছে।হঠাৎ একটা বুলেট এসে দাঁড়ায়।কেতোর বুলেট থেকে নামলেন মহামায়া।কিন্তু ভোলানাথ নামতে গিয়ে ছেঁড়া বাঘ ছাল সাইলেন্সারে আটকে সোজা পপাত চ,মমার চ !মহামায়া খেঁকিয়ে বললেন, “কতবার করে বললাম নতুন বাঘ ছালটা পর।কিন্তু বুড়ো শুনলে তো!বলে কিনা বাড়ী ফিরে ওটাকে বাতিল করবেন,তাই নতুন পরে আর কাচাকাচির ঝক্কিতে যাবেন না।এদিকে ধুলো,মাটিতে পড়ে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস ধরে আর কি”!হঠাৎ নারদ বলে ওঠেন, “না মা ও ভয় আপনি করবেন না।বাবা তো সবসময় ওই ছাইভস্মই মেখে থাকেন।ব্ল্যাক ফাঙ্গাস ভয়ে পালাবে”।মহামায়া তৃণয়ন দিয়ে নারদকে ভস্ম করতে যাচ্ছিলেন,এদিকে বাবারে,জ্বলে গেল রে,বলে চেঁচিয়ে ওঠেন মহাদেব।সাইলেন্সারে বেশ খানিকটা পা পুড়ে গিয়েছে বাবার।সিলভার এক্স লাগিয়ে দিলেন জামাই নারায়ণ।  

আজ কেতো বেশ কেত মেরে বাবরি চুলে জেল লাগিয়ে ডেনিমের প্যান্ট শার্ট পরে এসেছে।ময়ূরে চেপে এলে তিনজনে আসতে পারতেন না।এদিকে পেট্রোল,ডিজেলের যা দাম!কিন্তু মহামায়ার অনেক দিনের বাসনা কেতোর আইবুড়ো নাম ঘুচুক।আজ যেহেতু ১৮ বছর বয়স থেকে সকলেই ভ্যাক্সিন নিতে পারবে,তাই অমরাবতীতে নিশ্চয় সুন্দরী মেয়েদের বন্যা বয়ে যাবে!তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও কেতোকে কিছু বলেননি।এদিকে কেতোকে দেখে প্রমীলা বাহিনী খুব ঝাড়ি মারছে।যা ঝাক্কাস হয়ে এসেছে,তায় এলিজেবেল ব্যাচেলর।তাই আজ কেতোর টি.আর.পি একেবারে রাজ্যসরকারের দেনার মতোই চড়চড় করে বাড়ছে।মহামায়ার বাকি ছেলেমেয়েরাও নিজের নিজের বাহনে এসে গিয়েছেন।লক্ষ্মী—সরস্বতী চিন্তা করছেন কোন ভ্যাক্সিন নেবেন কোভিশিল্ড না কোভ্যাক্সিন।অনেকেই বলছেন কোভ্যাক্সিন বেশি ভাল।এদিকে পুজোয় মামা বাড়ী গেলে কোভিশিল্ড না নিলে যদি আবার স্বর্গে ফেরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।অগত্যা কোভিশিল্ড নেওয়ার সিদ্ধান্ত।        

  ইদানীং গনু দুই বোনের বুদ্ধিতে মাস্ক,স্যানিটাইজারের দোকান দিয়েছে।কারণ কেতো ফুলবাবু, এদিকে বুলেটে পেট্রোল চাই ফুল ট্যাঙ্কি!স্বরস্বতীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অভিভাবকরাও তাঁকে বিশেষ গুরুত্ব না দেওয়ায় আয় কমেছে।লক্ষ্মী ইদানিং একটা কোম্পানির ফিন্যান্স এডভাইজার নিযুক্ত হয়েছিলেন।কিন্তু ওয়ার্ক ফ্রম হোমের চক্করে তাঁর বেতনেও কোপ পড়ছে।তাই এই ভাবনা!দেবদেবীদের একাধিক হাত হওয়ায় স্যানিটাইজারের বাজার খুব ভাল।সমস্যা দেখা দিচ্ছে মাস্ক নিয়ে। ব্রম্ভা,কালী ,এমনকি গনুর নিজের জন্যও বিশেষ কায়দায় মাস্ক বানাতে হয়।মা কালী ফলহারিণী অমাবস্যার জন্য মর্ত্যে গিয়েছেন তাই আজ ভ্যাক্সিন নিতে আসতে পারেননি।নাহলে গনু,মা কালীর বিশেষ অর্ডার দেওয়া মাস্ক এখানেই দিয়ে দিতেন। 

মা কালী দিন দুই হল মর্ত্য থেকে ফিরেছেন।তিনি জানেন গনু খেতে খুব ভালোবাসে আর অর্ডারী মাস্কও নেওয়ার আছে।তিনি মর্ত্য থেকে প্রচুর ফল,মিষ্টি এনেছেন।গনু এসে বলে বাপরে মাসী তোমার ঘরে পচা ফলের গন্ধে তো টিকতে পারছি না।মা কালী হেসে বলেন,তোর লম্বা শুঁড় তো,তাই তুই বেশি গন্ধ পাচ্ছিস।আমি তো কোন গন্ধই পাচ্ছি না রে গনু।গনু বলে গন্ধ পাচ্ছ না মানে!তবে কি....! বলেই দে দৌড়!ফ্যালফ্যাল করে মা কালী গনুর গমন পথের দিকে চেয়ে থাকেন।   

 ভক্তের ভগবান কি ভক্তের ডাক উপেক্ষা করতে পারেন!এই মহামারীর সময় নিজেরা সুরক্ষিত থাকুন,আর আমাদের দেব-দেবীদেরও শান্তিতে থাকতে দিন।মনে মনেই তাঁদের স্মরণ করুন।অযথা তাঁদেরও বিপদ বাড়াবেন না।নাহলে আমাদের রক্ষা করার কেউ থাকবেন না।মাস্ক,স্যানিটাইজার আর সামাজিক দুরত্বই হোক আপনার সুস্থতার চাবিকাঠি।   

নিছক মজার উদ্দেশ্যে এই লেখা।কারোর ধর্মীয় আবেগকে আঘাত করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়।  


 ©কপিরাইট রিজার্ভড ফর সুদেষ্ণা দত্ত।        

ছবি সৌজন্য:গুগুল        

শনিবার, ১২ জুন, ২০২১

শুভ চিত্র আলোচনা-বাসর ।#বিষয়- চিত্রালোচনা ।#নাম-প্রকৃতি "মা "।


 মা (প্রকৃতি) ,তোমাকে উজাড় করে, 
    দিয়ে এলাম কত কিছু ।
     যা দিই তা শতগুনে ফিরল 
      আমার পিছু পিছু ।🙏
  # কলমে: বৈশালী চট্টোপাধ্যায় ।

বৃহস্পতিবার, ১০ জুন, ২০২১

De Ja Vu (ছোটোগল্প)

 Deja Vu
কলমে: শুভ্রজিৎ চক্রবর্তী
ম্যাগমা থেকে শীতলিকরণ ও পৃথকীকরণের মাধ্যমে আলাদা আলাদা পাথর সৃষ্টি  কিভাবে হয় সেটা পড়াতে পড়াতে আই আই টি খড়গপুর থেকে আসা অতিথি অধ্যাপক প্রোফ. মুখার্জী হঠাৎ খেয়াল করলেন জিৎ, মানে অরুনজিত চক্রবর্তী ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, তার চোখের ভাষা পড়ার ক্ষমতা, বিচক্ষণ মুখার্জী সাহেবের বাইরে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে জিতের মন এখন অন্য কোথাও। একটু বিরক্তি নিয়ে মুখার্জী সাহেব পড়া থামিয়ে জিতের কাছে গিয়ে দাড়ালেন । জিতের কোন হুঁশ নেই। ক্লাসের সবাই তাকিয়ে আছে আর ভাবছে আজকে জিতের কপালে দুঃখ আছে। জিতের সাথে সদ্য প্রেমে পড়া পিউ এর মাথায় চিন্তার রেখা। পিউ ভাবছে এতবার বোঝানো সত্বেও ছেলটার আক্কেল হলো না। মুখার্জী সাহেব খেয়াল করলেন, জিৎ বিড়বিড় করে কিছু বলছে। ভালো করে শোনার  চেষ্টা করলেন। “জানি, আমি চিনি, দেখেছি, সব, আগে.."। 

গুরু গম্ভীর গলা নিয়ে মুখার্জী সাহেব চিৎকার করে জিৎ কে ধরে ঝাঁকিয়ে দিলেন। হঠাৎ করা চিৎকার আর ঝাঁকুনিতে  জিতের প্রচন্ড মানসিক চাপ পড়ে । ও প্রায় অজ্ঞান হয়ে যায়। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে , পিউ চিৎকার করে উঠলো, মুখার্জী সাহেব কলেজের মেডিক্যাল রুমে খবর দেওয়ার জন্য বেয়ারাকে ডেকে  পাঠালেন।

ষ্ট্রেচারে করে জিৎ কে মেডিকেল রুমে নিয়ে যাওয়া হলো, সেখানে অল্প চিকিৎসার পর জিতের জ্ঞান ফিরলো, কিন্তু ও আর স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। ও যেনো মানসিক বিকারগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। সেখান থেকে ওকে মানসিক হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হলে, দু-তিন দিনের চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠে। ডাক্তার ওকে পনেরো দিনের জন্য বেড  রেস্ট নিতে বলেন। সেই পনেরো দিন দুবেলা  পিউ ওর খবর নিতে জিতের মেস  বাড়িতে আসতো। 

জিতের কাছে পিউ জিতের ব্যাপারে নতুন কিছু তথ্য জানতে পারে। জিতের এরকম বরাবরই হয়ে থাকে। হঠাৎ করে যে কোন সময় ওর মনে হয় যে এই পরিস্থিততে ও আগেও ছিলো, এরকম ঘটনা ওর সাথে আগেও ঘটে গেছে। তখনই ওর মাথা গুলিয়ে যায়, নিজের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ডাক্তারী  ভাষায় এটাকে  temporal lobe seizures বলা হয়। এটা একটা neurological disorder বা খিঁচুনি। ফ্রেঞ্চ ভাষায় এটাকে Deja Vu বলা হয়। কম বেশি প্রায় সবার ক্ষেত্রেই এটা হয়ে থাকে। দুর্লভ ক্ষেত্রে এটা মানসিক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে আর এটাই হয়েছে জিতের সাথে। এই খিঁচুনি অনিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক ক্রিয়াকলাপের সাথে জড়িত যা আমাদের মস্তিষ্কের স্নায়ু কোষকে ভুলভাবে চালিত করতে পারে। টেম্পোরাল লোব খিঁচুনি অন্য ব্যক্তির সাথে যোগাযোগের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। এগুলির বেশিরভাগ 30 সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয়। ব্যাক্তি চারপাশ সম্পর্কে সচেতনতা হারাতে পারেন । কিন্তু জিতের ক্ষেত্রে এই রোগ দীর্ঘায়ু হতে লাগলো। 
সেই পনেরো দিনে জিতের অসুস্থতা আরো বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে ও একটা মানসিক রুগীতে পরিণত হতে থাকে। সর্বক্ষণই ওর মনে হতে থাকে যে এই পরিবেশের সাথে ও আগেও সম্মুখীন হয়েছে। সাংঘাতিক প্রতিভাশালী জিৎ একজন পাগল ব্যক্তিতে পরিণত হতে লাগলো। সারাক্ষণ বিড়বিড় করে বলতে থাকে, “দেখেছি, জানি, সব আগেও ঘটেছে.. .. “ ইত্যাদি।  কোন একদিন ও নিজের মেস ছেড়ে বেরিয়ে যায়। 
পিউএর প্রথম আর সদ্য প্রেমের অবসান হয়। কিন্তু পিউ কোনভাবেই জিৎকে মন থেকে বের করতে পারেনি। হাজার হলেও প্রথম প্রেম। দেখতে দেখতে কলেজ জীবন শেষ হয়ে এলো । পিউ চাকরি পেয়ে অন্য শহরে স্থানান্তরিত হয়ে গেলো। দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর কেটে গেলো। 

এরই মধ্যে পরিবারের চাপে ও সময়ের দাবিতে পিউকে বিয়ে করে সংসার করতে হয়েছে। আজকে ওর একমাত্র সন্তান সৃজিতার দশম জন্মদিন। সৃজিতার প্রত্যেক জন্মদিনেই পিউ রাস্তার গরীব, ঘরছাড়া অসহায় লোকেদের ভালো খাবার দাবার ও কাপড় দান করে। এ বছরও তার অন্যথা নয়। স্বামী-সন্তানকে নিয়ে গাড়ি করে প্রচুর খাবার দাবারের প্যাকেট ও জামা কাপড় নিয়ে পিউরা রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়াচ্ছে  আর এরকম অসহায় ব্যক্তিদের দান করছে। 

হঠাৎ করে এক পাগলকে দেখে পিউ থমকে উঠলো। খাবার আর জমাকাপড় হাত থেকে নিতে গিয়ে সেই পাগলটাও যেনো থমকে গেলো। বহুদিন ধরে না কাটা দাড়ি – গোঁফের মাঝখানে, ছেড়া-ফাঁটা কাপড় পরিহিত, প্রায় অর্ধনগ্ন অবস্থায় থাকা জিৎকে চিনতে পিউ এর বেশিক্ষণ লাগলো না। পিউ এর চোখের দিকে তাকিয়ে জিৎ ও যেনো চিনতে পারলো  পিউকে, কোথাও যেনো এরকম পরিবেশ ও আগেও দেখেছে, সব যেনো ওর চেনা ঠেকছে। ও যেনো আগেও এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। “দেখেছি, জানি, আগেও হয়েছে..” বিড়বিড় করতে করতে জিৎ ছুটতে থাকে, পেছন থেকে পিউ চিৎকার করে ডাকে, “দাঁড়াও, দাঁড়াও, শোনো”। পিউ এর মনে পড়ে যায়, প্রথম প্রেম নিবেদন করার পর পিউ এভাবেই প্রথম ভালোবাসার উপহার দিয়েছিল জিৎকে। উপহার গ্রহণ করার সময় জিতের সেই দৃষ্টি আর এই দৃষ্টির মধ্যে মিল খুজে পায় পিউ। পিউএর মনে উথাল পাতাল চলতে থাকে। প্রথম ভালোবাসা ওর মনে মোচড় দিয়ে জেগে ওঠে। পিউ অনুভব করে মায়া আর মুগ্ধতা মাকড়সার জালের মত, একবার জড়িয়ে গেলে তার থেকে বেরিয়ে আসা খুব কঠিন। দেখতে দেখতে জিৎ চোখের দৃষ্টির বাইরে মিলিয়ে যায়।দূর থেকে বহুদূরে.....
সমাপ্ত

(C) All rights reserved for Subhrajit Chakravorty
 

বুধবার, ৯ জুন, ২০২১

# নাম- বজ্রগর্ভ প্রকৃতি। ✍ - শূদ্র।

শুভ সান্ধ্য আলোচনা-বাসর।
 # বিষয় - *বজ্রগর্ভ প্রকৃতি।* # নাম- *বজ্রগর্ভ মেঘ।* 
       ✍ - *শূদ্র।*

     প্রাচীন যুগে বিভিন্ন সভ্যতায় বজ্রকে কল্পনা করা হয়েছে ইন্দ্র,থর,জিউস,অভিন প্রভৃতি দেবতার অস্ত্র বজ্র হিসেবে। তাঁরা শাস্তি দিতে শত্রুপক্ষের উপর এই অস্ত্র ব্যবহার করতেন। 
  এই বজ্র সৃষ্টির মূলে বৈজ্ঞানিক মত অ্যামোনিয়া,মিথেন,হাইড্রোজেন, জলীয়বাস্প একসঙ্গে  বিক্রিয়া ঘটায় বজ্রপাত। সেই গ্যাসগুলি বজ্রপাত জাত বিদ্যুতপ্রবাহের দ্বারা বিক্রিয়া ঘটে অ্যামাইনো অ্যাসিড তৈরী হয়। এই অ্যাসিড নাকি একসময় প্রাণের বীজ বপন করে বলে অনেকের বৈজ্ঞানিক গবেষণার দ্বারা প্রমাণ করেছেন। 
      বজ্রপাত সৃষ্টির মূলে বায়ুর উলম্ব গতি মূল শক্তি। কারণ বায়ুর উলম্বগতির সঙ্গে মেঘের কণারা পরস্পর বিক্রিয়ার ফলে ধণাত্মক ও ঋণাত্মক বৈদ্যুতিক আধানে ভাগ হয়। বাতাস মেঘকে এই আধানে ভাগ করে বজ্র তৈরী করে। তাই বজ্রপাতের সময় তড়িৎ চুম্বক সৃষ্টি হয়। আর এই বজ্র সৃষ্টি হয় সাধারণত ৬০ কিমি উচ্চতায়। আর তার পতনে কাছাকাছি উচ্চতায় পাহাড়,উঁচু অট্টালিকা শিকার হয়।
  বজ্রপাতে তাপমাত্রা তৈরী হয় ৩০০০০(ত্রিশ হাজার) ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড পর্যন্ত। আর গরম হাওয়া শকওয়েভ সৃষ্টি করে বলে বিকট শব্দ হয়।
  প্রতি এক বর্গ কিমি স্থানে বছরে কতবার বিদ্যুতের চমকানি হয় তা ১৯৯৭ থেকে ২০১৩ পর্যন্ত হিসেবের গবেষণায় পাঁচশ' টি স্থান চিহ্নিত হয়,যেখানে সবচেয়ে বেশী বজ্রপাত হয়। এই বজ্রপাত প্রবণ এলাকায় বছরে হাজার হাজার বজ্রপাত হয়। গবেষণায় দেখা গেছে সমুদ্রের চেয়ে স্থলভাগে,শীতকালে তুলনায় গ্রীষ্মকালে এবং দিন ও রাতের চব্বিশ ঘন্টার মধ্যে দুপুর থেকে সন্ধ্যার মধ্যে সবচেয়ে বেশী বজ্রপাত হয়।
  পৃথিবীর মধ্যে আফ্রিকায় সবচেয়ে বেশী বজ্রপাতপ্রবণ এলাকা রয়েছে। ৫০০এর মধ্যে ২৮৩। আফ্রিকার জলবায়ুর উষ্ণতার জন্য যে হয় তা আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
 তাহলে প্রশ্ন পৃথিবীর উষ্ণতা বৃদ্ধির সাথে কী বজ্রপাত বাড়ছে? এবং বাড়লে কতটা বাড়ছে? সহজ উত্তর বাতাস যত গরম হবে তত ঝড় বৃষ্টি সৃষ্টিকারী বাতাসের জলীয়বাস্প ধারণের ক্ষমতা বাড়ে। অঙ্ক কষে বের করে প্রমাণিত সত্য এক ডিগ্রি সেন্টিগ্রেড তাপমাত্রা বাড়লে ১২ শতাংশ পর্যন্ত বজ্রপাত বাড়তে পারে। আর বর্তমান বিশ্বের পরিবেশ ও তার তাপমাত্রা বৃদ্ধির ঘাতক গ্রীণহাউস গ্যাসসহ,ওজন স্তরের ফুটো,বরফের গলন,সমুদ্র জলের তাপমাত্রা বৃদ্ধি আর কোনো খবর জানতে বাকি নেই যে ধরিত্রীর অবস্থার ভয়ানক সঙ্কটের কারন।
  তাই পৃথিবীর সঙ্কট কতটা ভারী সেই বিজ্ঞাপন সবসময়ই চোখের সামনে খাড়া দাঁড়িয়ে। আর বজ্রপাত  ঘর পোড়া গরুর সিঁদুরে মেঘ দেখার ভয়ের মত বিশ্ব আতঙ্কে ভুগছে। এই শতাব্দীর শেষে পৃথিবীর তাপমাত্রা চার ডিগ্রি বাড়বে। ফলে কি কি ঘটবে তা সহজেই অনুমেয়। আর বজ্রপাত তো বর্তমানের চেয়ে ডাবল হবে। দুপুর থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত বজ্রপাত মুষলধারে বৃষ্টির মতো হবে।
ভারত বাংলাদেশ ভৌগলিক সীমায় এক,মানুষের সৃষ্টি সীমারেখা আলাদা স্বাধীন রাষ্ট্র হলেও ভৌগলিক
পরিবেশে এক। বঙ্গোপসাগরের দানে এই দেশ দুটিতে পরিবেশের দান সমবন্টন থাকবে। এই তো গতকাল ০৭/০৬/২০২১ সোমবার, ভারতবর্ষের শুধু পশ্চিমবঙ্গেই ছাব্বিশ জন একদিনে বজ্রপাতে মারা গেল, যা সর্বকালের রেকর্ড। বঙ্গোপসাগরের দোষ  না মানুষের দোষ,প্রশ্নের উওর সবাই  তারস্বরে বলবে কে দায়ী। 
              *******
@ কপিরাইট রিজার্ভ ফর শূদ্র।

সোমবার, ৭ জুন, ২০২১

রামায়ণে গন্ডগোল। (রম‍্যরচনা ) কলমে -- পারমিতা মন্ডল।

রামায়ণে গন্ডগোল।( রম‍্যরচনা)

কলমে -- পারমিতা মন্ডল।

আজ গ্রুপে চলছে রাম রাবনের যুদ্ধ । মাঝে মাঝে লক্ষ্মনকেও দেখছি মাথা ঝাঁকিয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে । শত হলেও সে তো দাদা অন্ত প্রান।  বৌদিকেও বেশ শ্রদ্ধা ভক্তি করে । এতদিন জানতাম সীতা জনক রাজার পালিত কন্যা । মাটি খুঁড়ে সীতাকে তিনি পেয়েছিলেন। এখন আবার শুনছি সে নাকি আসলে রাবনের মেয়ে । সম্পর্কগুলো বড্ড গুলিয়ে যাচ্ছে। আগে এটা ঠিক করে বুঝে নেই কে কার মেয়ে, কে কার বৌ তারপর লিখছি।

একটি কথা মনে উঁকি মারছে। বলেই ফেলি । কি আর হবে ? বড়জোর কেউ একটা পচা ডিম ছুঁড়ে মারবে । এর বেশী তো নয় ? আচ্ছা লক্ষ্মন কি দাদাকে ভালোবেসে বনে গিয়েছিল নাকি বৌদিকে ? এই প্রশ্নের উত্তর আমি আজও পাইনি। আসলে ঘর, সংসার নিজের বিয়ে করা বৌ সবাইকে ছেড়ে কেন যে চৌদ্দ বছরের জন্য দাদা- বৌদির সাথে বনে গিয়েছিল কে জানে ? রাম- সীতাকে একটু শান্তিতে হানিমুন ও করতে দিলো না ।" কাবাব মে হাড্ডি " কোথাকার !  কি দরকার ছিল তোর যাওয়ার বাবা?  সীতার কপালে তো রাজপ্রাসাদের সুখ জুটলো না, উল্টে লক্ষ্মনের জন্য বনে এসেও রোমান্স করতে পারলো না । মাঝখান থেকে রাবন এসে উদয় হলো । যাও বা  মোটামুটি ব‍্যালেন্স করে চলছিল, রাবন এসে সব সমীকরণ উল্টে দিল।

 আচ্ছা লক্ষ্মনের কি দরকার ছিল সূর্পনখার নাকটা কাটার । তোর না হয়  প্রেম-ট্রেপ নেই শরীরের। নিজের বৌকে ঘরে ফেলে রেখে পরের বৌ থুড়ি দাদা বৌদির পিছনে ঘুরছিস । তাই বলে কি সবাই তাই হবে ? সূর্পনখার ভালো লেগেছিল বলেই তো প্রেম নিবেদন করতে গিয়েছিল।  তুই তা রিফিউজ করতে পারতিস ? তাকে বোঝাতে পারতিস । বলতে পারতিস ঘরে বৌ আছে ।তা না করেএকেবারে  নাক কেটে দিবি ? ওর সৌন্দর্যটা নষ্ট হয়ে গেল না ? এই জন্য তো রাবন ক্ষেপে গিয়েছিল। কত হার্বাল মলম , লতা, পাতা লাগিয়েছিল ঘা ঠিক করার জন্য। কিছুতেই ঠিক হয়নি। তখন তো প্লাস্টিক সার্জারি ছিল না । তাই ঠিক করতে পারেনি। এই জন্য তো রাবনের এতো রাগ। রেগে গিয়ে সীতাকে হরণ করলো।


 সীতাকে হরণ করার সময় রাবন নিশ্চয়ই জানতো না সীতা তার মেয়ে । যদি জানতো তাহলে হয়তো হরণ করতো না । যদিও এর কতটা সত‍্যতা আছে , সে বিষয়ে সন্দেহ আছে। 
 

সীতার রূপে রাবন মুগ্ধ হয়েছিল । তাই তাকে কিডন‍্যাপ করে নিয়ে গিয়েছিল। লুকিয়ে রেখেছিল অশোকবনে।  কিন্তু তখনো তো গোয়েন্দাদের অভাব ছিলনা । হনুমান ঠিক খুঁজতে খুঁজতে পৌঁছে গিয়েছিল।খুঁজে বের করেছিল সীতাকে।  তার সাহায্য উদ্ধার পেয়েছিল সীতা।কিন্তু প্রশ্ন হলো হনুমান তুই সোনার লঙ্কা পোড়াতে গিয়েছিলি ভালো কথা । কিন্তু নিজের মুখটা কেন পোড়ালী বোকা ?কেউ কি তোর পোড়া মুখ ঠিক করে দিলো ? লক্ষ্মনের জন্য  ঔষধি গাছ খুঁজে না পেয়ে পাহাড় তুলে নিয়ে এসেছিলি । কিন্তু তোর যখন মুখটা পুড়লো লক্ষ্মন তোর কি ঘন্টা করেছিল ?  সার্জারি করে তো মুখটা ঠিক করে দিতে পারতো । ও শুধু লোকের নাক কাটতেই জানে । তুই বোকা হনুমান শুধু শুধু সারাজীবন ঘুরলি ওদের পিছনে। আর আজীবন পোড়ামুখো হয়ে  রইলি। 

রামের কথা কি আর বলি ? মেরুদন্ডহীন এক কাপুরুষ। নিজের বৌকে যখন রক্ষা করতে পারবি না , তখন কি দরকার ছিল তোর সাথে করে বনে জঙ্গলে ঘুরে বেড়ানোর ? তোর সত্য তুই পালন করনা ? কি দরকার ছিল ভাই আর বৌটাকে কষ্ট দেওয়ার ? আসলে নিজে তো কোন কাজ জানতো না । তাই বৌকে নিয়েছিল রান্না করতে আর ভাইকে নিয়েছিল বাজার করতে। যেই না অযোধ্যায় ফিরে এলো চৌদ্দ বছর পর তখনই মনে পড়লো বৌ অসতী হতে পারে। অগ্নিপরীক্ষা দিতে হবে । এতোদিন কিন্তু মনে হয়নি। বনে জঙ্গলে বৌ পাশে ছিল,। রাজপ্রাসাদে এসেই বৌয়ের দোষ ধরা পড়লো।

আর রাবন তোর এতো ছুকছুকানী বাতিক কেন রে ? নিজের তো অনেক গুলো বৌ ছিল। তাও পরের বৌ দেখলে থাকতে পারিস না কেন রে ? কি হলো শেষ পর্যন্ত ? প্রানটা গেল তো ? এই রাবনগুলো আজকাল খুব বাড় বাড়ন্ত হয়েছে  । দেখি কে আসে এদের বধ করতে ?

 All rights are reserve by paramita.

হনুমানের হতাশা(সুদেষ্ণা দত্ত)

 


হনুমানের হতাশা 

সুদেষ্ণা দত্ত

 রম্য রচনা  

রাম—রাবণের কূটনীতিতে আমি হয়ে গেলাম ক্ষুদিরাম।লঙ্কায় আগুন ধরাতে গিয়ে লাভ তো কিছুই হল না।মাঝখান থেকে এখনও মুখপোড়া বদনাম নিয়ে ঘুরছি।ব্যাটা রাবণটার দশ মাথার বুদ্ধির সঙ্গে আমি এঁটে উঠব কেন!দিল আমার লেজে আগুন দিয়ে।লঙ্কা তো আমার চেনা জায়গা নয়,ধুত্তোর রামায়ণের যুগ!না আছে স্মার্ট ফোন,না আছে জিপিএস—খুঁজে পাব কি করে নদী, নালা,ঝর্ণা।বোকা আমি দিলাম লেজকে মুখে ঢুকিয়ে।উরিবাবা সে জ্বালা বলে বোঝানোর নয়।তোমরা যখন ঝাল লঙ্কার পকোড়া খেয়ে,তার উপর চা খেয়ে হুসহাস কর,এ তার থেকেও অনেক বেশি।মনে হচ্ছিল সিলভারএক্স খেয়ে ফেলি।         

বাপ কা বেটা সিপাহীকা ঘোড়া।রাবণের ছেলেটাও হয়েছে বাপের মতই বজ্জাত।কোথায় রামরা তোদের অতিথি,আতিথেয়তা করবি—বৈদেশিক সম্পর্কের উন্নতি হবে।দুটো পয়সা আসবে!তা না দিল লক্ষণকে শক্তিসেল মেরে।কে ওষুধ জোগাড় করবে!না,ছাই ফেলতে ভাঙা কুলো হনুমান!আবার পাড়ি অন্ধকারে অজানার উদ্দেশ্যে বিশল্যকরনী আনতে।আবার শর্ত আলো ফুটলে হবে না।পারবে না এই হনুমান।নিজেরা গেলেই তো পারতিস।রাম ছিল কিন্তু রামদেব তো ছিল না।এদিকে আমি কি ছাই বিশল্যকরনী চিনি!গায়ে গতরে খাটতে পারি তুলে নিলাম গন্ধমাদন।এদিকে সূর্যদেব উঁকি মেরেছেন।নিলাম বগলদাবা করে।সারা শরীর জ্বলে যাচ্ছে।গন্ধমাদনকে গ্যারেজ করে আমি ওষুধের দোকানে গেলাম।ও ব্যাটারাও কম নয় প্রেসক্রিপশন ছাড়া একটি ওষুধও দিল না।এদিকে আগেই বললাম রামদেব না থাকায় এন্টি বার্ন কোন ভেষজ গন্ধমাদনে ছিল কিনা তাও জানি না।আবার না ছিল পার্লার তাই কেমিক্যাল পিলিং টিলিং কি সব হয় তাই দিয়ে মুখটারও একটু বিউটিফিকেশন হল না। তোমরা তো বাপু খুব সঙ্কটমোচন,সঙ্কট মোচন কর।কিছু ওষুধ বিষুধ দাও বাপু যাতে জ্বালা পোড়াগুলো একটু কমে।   


©কপিরাইট রিজার্ভড ফর সুদেষ্ণা দত্ত।

ছবি সৌজন্য--গুগুল

মহাকাব্য বিকৃত করার ধৃষ্টতা বা ইচ্ছা কোনোটাই আমার নেই।শুধু মজার জন্য লিখলাম।কেউ কিছু মনে করবেন না।কাউকে আঘাত করার উদ্দেশ্য আমার নয়।

রবিবার, ৬ জুন, ২০২১

#সুন্দরবন অভিযান #কলমে -সোমা দে।

সকলেই বলে সুন্দরবন জায়গাটি খুব সুন্দর। এটা শুনে দীপকবাবুরও সেখানে যেতে খুব ইচ্ছা করে কিন্তু নানান অসুবিধার জন্য তাঁর আর সেখানে যাওয়া হয়না। 

দীপকবাবু হলেন একজন প্রাইমারী স্কুলের শিক্ষক। একদিন তিনি স্কুলে গিয়ে শুনলেন যে সব শিক্ষকরা আলোচনায় বসেছেন।আলোচনার বিষয় হল কোথায় পিকনিকে যাওয়া যায়? এটা শুনে দীপকবাবু সাথে সাথে সুন্দরবনে যাওয়ার কথা বলে উঠলেন ।সবাই রাজীও হয়ে গেলেন। সবাই সুন্দরবন যাওয়ার দিনও ঠিক করে ফেললেন। 

এক শনিবারে দীপকবাবু স্কুলের সব শিক্ষকদের নিয়ে বেলা এগারোটায় সুন্দরবনে উপস্থিত হলো। সবাই লঞ্চ থেকে নেমে সরাসরি হোটেলে না গিয়ে সুন্দরবনের চারিদিকটা একটু দেখতে গেলেন। দীপকবাবু প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে পড়েছিলেন তাই তিনি তাদের সঙ্গে গেলেননা। হোটেলের উদ্দেশ্যে রওনা দিলেন। 

দীপকবাবু মাঝপথে একটা আওয়াজ শুনতে পেলেন।শুনলেন প্রচুর মানুষের চিৎকার। তারপর তিনি দেখলেন প্রচুর মানুষ টিন পিটিয়ে চিৎকার করতে করতে কোথায় যেন দৌড়ে যাচ্ছে। তিনি সেখানে গিয়ে সেই মানুষদের মধ্যে একজনকে জিজ্ঞাসা করলেন
 -"কি হয়েছে ? সবাই এইভাবে দৌড়াচ্ছে কেন? "
মানুষটি দীপকবাবুকে বললেন গ্রামে বাঘিনী ঢুকেছে। তাই তারা এইভাবে গ্রাম থেকে বাঘিনীকে তাড়াচ্ছে। দীপকবাবু এটা শুনে প্রচণ্ড ভয় পেয়ে গেলেন।

এদিকে স্কুলের আর সব শিক্ষকরা গ্রামে বাঘিনী ঢুকেছে এই শুনে তাড়াতাড়ি হোটেলে ফিরলেন। কিন্তু দীপকবাবুকে হোটেলে না দেখে সবাই চিন্তায় পড়ে গেলেন।যখন  তিনটে বাজে তখন সবাই আবার একসঙ্গে দীপকবাবুকে খুঁজতে বের হলো। 
অনেকক্ষণ তাঁকে ডাকাডাকির পর ও যখন কোন খোঁজ পাওয়া গেলনা তখন সবাই মিলে পুলিশের কাছে গিয়ে সব জানালো। সবাই হোটেলে ফিরে আসলো। কিছুক্ষণ পর পুলিশও এলো হোটেলে, দীপকবাবুকে নিয়ে। সবাই পুলিশের কাছে শুনলেন যে "দীপকবাবু বাঘিনীর নাম শুনে ভয়ে সেখানেই একটা আমগাছের উপর উঠে বসে ছিল। সেখান থেকে তাকে উদ্ধার করা হয়েছে। তিনি এতটাই ভয় পেয়েছিলেন যে তিনি আম গাছ থেকে নিচে নামতেই চাইছিলেন না। অনেক কষ্টে তাঁকে নিচে নামিয়ে হোটেলে আনা হয়েছে।" দীপকবাবুর এই কান্ড শুনে সবাই হেসে উঠলেন। কিন্তু দীপকবাবু এতটাই ভয় পেয়েছিলেন যে তাঁর জন্য আর কারো সুন্দরবনও ঘোরা হয়নি। 

পরেরদিন দীপকবাবুও বাড়ি ফিরে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেললেন। আর ঠিক করেছিলেন জীবনে কখনও সুন্দরবনে যাবেননা। 

@ কপিরাইট রিজার্ভ ফর সোমা দে।

মান্ডবী~অনিশা

#নাম_মান্ডবী
#কলমে_অনিশা কুমার

আমি মান্ডবী। হ্যাঁ, ঠিক এই  নামেই একটি নদী আছে দক্ষিণ ভারতে। কিন্তু আমি নদী না। ভালোবাসলে নারীরা হয়ে যায় নরম, নদীর মতো। কিন্তু আমি ভালোবাসা পেলাম কোথায়? জন্ম থেকে না পারলাম কাউকে ভালোবাসতে, না পেলাম কারুর ভালোবাসা। রামায়নে আমি উপেক্ষিতা এক নারী। 

মিথিলার রাজা জনকের প্রকৃত নাম সীরধ্বজ। তাঁর ভাই কুশধ্বজ। জনক রাজা, তাই তাঁর নাম সর্বজন বিদিত।রাজা জনক একদিন যজ্ঞভূমি কর্ষণ কালে লাঙলের রেখায় এক সুন্দরী শিশু কন্যা পান। লাঙলের রেখার অন্য নাম সীতা তাই তিনি সেই কন্যার নাম সীতা রাখেন। এরপর আমাদের দুই বোনের জন্ম। কিন্তু কোথাও আমাদের উল্লেখ নেই, কারণ আমরা অনাদৃতা। তারপর মিথিলার জনকপুরের রাজা জনক ও এবং তার স্ত্রী সুনয়নার একমাত্র কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। এবং তিনি সীতার কনিষ্ঠ বোন। তিনি উর্মিলা, রাজকন্যা হিসাবে সমাদৃতা ও হিন্দু মহাকাব্য রামায়নের একটি বিশেষ চরিত্র। শুধু শিশুকাল হতেই আমি অবহেলিতা। 

যখন কৈশোরে পদার্পণ করলাম, শুনলাম আমাদের চারবোনেরই স্বয়ম্বর সভা হবে। সীতা, ঊর্মিলা, মাণ্ডবী আর শ্রুতকীর্তি । আমরা চার বোনের প্রত্যেকেই বধূ বেশে সজ্জিতা। বরমাল্য হাতে নিয়ে নিজের নিজের ভাগ্য বেছে নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছি। হরধনু ভঙ্গ করেছেন শ্রীরামচন্দ্র, সীতা তাঁর গলাতেই মাল্যদান করবেন। এরপর আমার পালা। কিন্তু তার আগেই লক্ষণকে উর্মিলার স্বামী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়ে গেছে। আমাদের আর আর পছন্দের কোন মূল্য নেই।  বাকি দুই কন্যা মাণ্ডবী ও শ্রুতকীর্তির সাথে যথাক্রমে ভরত ও শত্রুঘ্নের বিবাহ সুসম্পন্ন হল। তাহলে কেন এই স্বয়ম্বর সভার প্রহসন? আমি কি এক নির্জীব জড় পদার্থ? সীতা তো কুড়িয়ে পাওয়া এক মেয়ে। আমার রাজবংশে জন্ম, রাজকন্যা আমি। শুধু রাজার খেয়াল খুশী আচরনে আজ আমি অবহেলিতা। 
অবশেষে মেনে নিতে বাধ্য হলাম ভরতকে স্বামী হিসাবে। স্বামীকেই ভালোবেসে সুখী হওয়ার চেষ্টা করবো। কিন্তু সেখানে ও বাদ সাধলেন বিধাতা। প্রথম থেকেই শ্বাশুড়ী মায়ের ইচ্ছানুযায়ী তিনি মাতুলালয়ে বাস করেন। সুতরাং স্বামী সোহাগ কোনদিনই পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। অবশেষে রামচন্দ্র বনবাসে গেলেন। এখানে খলনায়িকা হয়ে গেলেন আমার শ্বাশুড়ি মা। আরে, "দশচক্রে তো ভগবান ও ভূত হন।" ক্রমাগত বাপের বাড়ির লোক যদি তাঁকে লোভ দেখাতে থাকেন, তবে তিনি ও তো মানুষ। ইচ্ছে তো হতেই পারে রাজমাতা হবার। আমারও কি আনন্দে হৃদয় আকুল হয়নি! দুচোখ কি স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠে নি রাজরানী হওয়ার খুশীতে!

কিন্তু ভরত? সে কি পাথর দিয়ে তৈরী? নববিবাহিতা স্ত্রীকে রেখে দিনের পর দিন মাতুলালয়ে। আবার সিংহাসন পেয়ে ও তাতে অবহেলা! কি প্রমান করতে চান ভরত! তাঁর মহানুভবতা! মহাকাব্যে তিনি তাঁর ত্যাগ দিয়ে মহাপুরুষ হয়ে থাকবেন? তিনি চোদ্দ বছর রামচন্দ্রের খড়ম না রেখে যদি নিজেই রাজত্ব করতেন আর রামচন্দ্র ফিরে এলে তা ফেরত দিয়ে দিতেন তবে রামায়নের কোন অংশেই কি তার প্রভাব পড়ত? কিন্তু তিনি বৈরাগী হয়েই রইলেন। আমাদের চারবোনের মধ্যে সীতা রামচন্দ্রের অনুগামী হয়েছিলেন, তাই তিনি মহিয়সী। উর্মিলাকে লক্ষণ ফেলে রেখে দাদার অনুগামী হয়ে বনে চলে গিয়েছিলেন, তাই তার প্রতি সবাই সহানুভূতিশীল। শ্রুতকীর্তির কথা না লেখা হলেও সে শত্রুঘ্নর সঙ্গে সুখেই ছিল। কিন্তু আমি বিবাহিতা হয়েও স্বামী সুখে বঞ্চিতা, রাজকন্যা হয়েও রাজরানী হওয়ার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিতা, মহাকাব্যে উপেক্ষিতা জনমদুখী, এক অভাগী

শুক্রবার, ৪ জুন, ২০২১

#বিষয় - রম্যরচনা। # নাম- কৈশোর কেল্লা। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ রম্যরচনা- বাসর।
  #বিষয় - রম্যরচনা।
     # নাম- কৈশোর কেল্লা।
           ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

      পাড়ার কয়েকজন বিভিন্ন সাইজের সব অল্প বয়সের ইচড়ে পাকা ছেলেপিলে সব। এই বয়সের এসে সেই দিনগুলোর কথা মনে হলে মনে মনে তীর্থযাত্রা হয় যেন। 
   গরমের সময় সকাল স্কুল। স্কুল থেকে ফিরে পাকা আম কুঁড়োর বস্তা থেকে বের করে পুকুরে ঝপাং। জল কমে আসে পুকুরে। সেই জলে পাঁক তুলে স্নান,মা পাড়ে গিয়ে লাঠি যতক্ষণ না নাগান  জল থেকে ওঠার জো নেই। লাঠির বাড়ির ভয়ে অপর পাড় দিয়ে উঠে সে অনেক রকম ভিরকুটি। 
   এবার দুপুরে ঘুম। তিনটার সময় মাষ্টার আসবেন পড়াতে। ছেলে মেয়ে করে জনা দশেক। সবার মধ্যে আমি ছিলাম টার্গেট। পড়তে বললেই ঘন ঘন প্রস্রাব পায়। মাষ্টারমশা'ইয়ের কড়া নজরদারিতে আমার খুব রাগ হত। আর ওতেই মাষ্টারি করার খুব মজা পেতেন মাষ্টারমশাই। ঘনা নাম। মাষ্টারমশাই বসেই বলতেন- "ঘণা যা সারার সেরে আয়। এর মাঝে আর যাওয়া যাবে না। আমার খুব লজ্জা হত। মেয়েদের সামনে বলে একটু বেশী হত। এমনকি মাঝে মাঝে মাঝে আমাকে ইন্টারভ্যাল দিলে পেছন পেছন নেপলাকে পাঠাত। যে নেপলা ছিল মাষ্টারমশাইয়ের স্পাই। আমার পড়ার সময় নেপলাকে শত্রু মনে হত। ওকে পাঠাত সত্যিই কাজ করছি না,দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে সময় কাটাই দেখতে। সঠিক রিপোর্ট না দেওয়ার জন্য এই ব্যাপারে নেপলার পেছনে কিছু খরচাপাতি হত,ঘুষ দিতে,আমার বিরুদ্ধে কোনো সাক্ষী না দেয়।
  ইদানিং সেই নেপলাকে মাষ্টারমশাই যেন কোথাও সন্দেহ হতে লাগল। নেপাল ঠিক ঠিক কাজ করছে না। তাই একদিন নিজে গিয়ে দেখল আমি প্রসাব করার নাম করে যে গেছি,প্রস্রাবের নাম করে কি একটা কাগজ পড়ছি। আসলে কাগজটা ছিল একটা প্রেম পত্র। স্কুলে দিয়েছিল অমল। দিশাকে দিতে। সেটা ভুল ক্রমে ব্যাগে থেকে গেছে। এই পড়ার সময় যদি মাষ্টারমশাই ব্যাগ হালটে পেয়ে যায়,তাহলে কেলেঙ্কারি আরকি। ব্যাগ থেকে কি একটা বের করে নিয়েছি মাষ্টারমশাই আড় চোখে দেখেছে। বুঝতেও পেরেছি। আর সেদিন নেপলাকে না পাঠিয়ে নিজে গেছেন আড়ালে দেখতে কি করি। দেখলেন আমি প্রস্রাবের ভান করছি। যতটা খোলার খুলে কম্ম করার চেষ্টা করছি। হয় নাকি। আসলে তো পায়নি। ঐ কাগজটা ছিঁড়তে গেছি। কাগজে মন। অথচ প্রস্রাবের ভান। আসলে ছেঁড়ার আগে কৌতূহল দেখি কি লিখেছে। এই কাজে মনোযোগে বিভোর আমি। হঠাৎই মাষ্টারমশাই গলা চড়িয়ে বললেন- "ঘনা এই তোর বাইরে আসার বাহানা। চমকে উঠলাম। টপ টপ যে পড়ছিল,দ্রুত ঢোকাতে গিয়ে বাকিটা প্যান্টের শুকনো খিদে খেল। তাতেই সর্বনাশ! এ খাওয়া এমন বোঝা যাবেই। লজ্জা দেবেই। আবার মেয়েদের মাঝে। আর কি পড়েছিলাম জেরা চললে,সত্যিটা যদি জানাজানি হয়! তাই মার কাছে গিয়ে বায়না আজ পড়তে যাব না। প্যান্টের এই অবস্থা। মা বললেন- "প্যান্ট পাল্টে যা।" 
  তখন জেরার সামনে পড়ার ভয়ে বায়না - "আজ আর পড়ব না।" মা বুঝলেন গুরুতর ব্যাপার। ব্যাটার আমার লজ্জার কারণ। কিন্তু জেরার মুখোমুখি হওয়ার ব্যাপারটা যদি জানতেন সেদিন মা রেহাই দিতেন কিনা,আজও সেই সন্দেহ ঘিরে মনে মনে হাসি পায়। মা গিয়ে মাষ্টারমশাইকে বললেন। কি অদ্ভুত ব্যাপার মাষ্টারমশাই কিছুই বললেন না। বাকিদের পড়িয়ে চলে গেলেন। তবে নেপলাও আমার মত পড়ায় ফাঁকিবাজ । যতই মাষ্টারমশাই নেপলাকে আমার স্পাই ভাবুন না কেন, আসলে নেপলাকে এটা ওটা ঘুষ দিয়ে দলে টেনেছি কীভাবে মাষ্টারমশাই ঘুণাক্ষরে টের পাননি। হায় আজ সেই সোনার দিনগুলোর জন্য কি না মনে মনে হারিয়ে যাই।
          ********
@ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার।

বুধবার, ২ জুন, ২০২১

# নাম- রাজা রামমোহন রায় ও সংস্কারক। ✍ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ আলোচনা-বাসর।
  # বিষয় - *রামমোহন।*
    #নাম- *সংস্কার মুক্তির রাজা রামমোহন রায়।*
  ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

    রামমোহন রায়ের রাজা উপাধি দিল্লির সম্রাট দ্বিতীয় আকবর শাহ ১৮২৯এর আগষ্ট মাসে দিয়েছিলেন। যেকোনো উপাধি দান ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানির এক্তিয়ারভুক্ত আইন বলবৎ ছিল। নবাব সরকারের কাছে রামমোহনের রাজা উপাধি দানের পর কোম্পানির কাছে তাঁরও এক্তিয়ারের কথা জানিয়ে(৮ জানুয়ারী,১৮৩০)সরকারকে চিঠি দেন। কিন্তু নবাবের এই দৌত বড়লাট বেন্টিং তাঁর সেক্রেটারীর মাধ্যমে জানিয়ে দেন কোম্পানি তা মান্যতা দেবে না। এ ছিল এক গভীর রাজনৈতিক ষড়যন্ত্র। কোম্পানি নবাবের বার্ষিক আয়ের শর্ত ভঙ্গ করেছিলেন, চুক্তির প্রাপ্য টাকায় বিদ্রোহ সংগঠিত করতে পারেন বলে। এরই আইনী লড়াই করতে নবাবের দূত হিসেবে ব্রিটিশরাজ চতুর্থ জর্জের রাজসভায় যাবেন,আর যেতে গেলে রাজা উপাধি চাই। তাই ব্রিটিশ কোম্পানি উপাধি দিতে অস্বীকার করেন। তখন রামমোহন এই জটিল আবর্তন এড়ানোর জন্য বড়লাটকে জানিয়ে দিলেন তিনি সাধারণ নাগরিক হিসেবেই বিলেতে যাবেন। আর বাদশাহের বক্তব্যের আইনী লড়াই করবেন। রামমোহন বিলেত গিয়েছিলেন ১৮৩০ এর ১৯ নভেম্বর। বিলেতের সাধারণ নাগরিক রামমোহনকে রাজা হিসেবেই সংবর্ধনা দিয়েছিলেন। ইষ্টইন্ডিয়া কোম্পানির লন্ডনস্থ কর্তৃপক্ষ  রামমোহনের উপাধি স্বীকার না করলেও তাঁকে সংবর্ধনা দিতে কসুর করেননি। তবে ইস্টইন্ডিয়া কোম্পানির বিরুদ্ধে নবাবের হয়ে আইনী লড়াই ছিল এক যুগান্তকারী ঘটনা। আইনী লড়াইয়ে অনেক জল গড়িয়েছিল। কোম্পানি নানা ছল চাকুরী করে আইনের ফাঁক দেখিয়ে নবাবের নাহ্য অধিকার পেতে কোনো সুরাহা করেনি,কোম্পানির সে নির্মমতার কথা ইতিহাসের দলিল সাক্ষ্য বহন করে চলে।  
  এই রাজা উপাধি নিয়ে কোম্পানির এই রাজনৈতিক দূরভিসন্ধি রামমোহনের মত ঊনবিংশ শতাব্দীর রেনেসাঁর জনকের কাছে ব্যাপারটি নিতান্তই মামুলি লেগেছিল। পাছে উপাধির জন্য লালায়িত এই বদনামের বিজ্ঞাপন যাতে তাঁকে গ্রাস না করতে পারে সেজন্য এক উদার মানবতাবাদের পথ তাঁর সবসময়ই সহায়ক হত। এই ধারায় সংস্কার মুক্তির জনক ছিলেন আলোকদীপ্ত জ্ঞানবাদী যুগ পুরুষ রাজা রামমোহন রায়। বহুভাষা ও সঠিক জ্ঞান তাঁর মধ্যে লৌহমানবের দৃঢ় পৌরুষ এনেছিল। ব্রিটিশ কোম্পানির এদেশ শাসনের জন্য এদেশীয় ধর্মের ও কুসংস্কারের ধ্বজাধারীদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষে মদত দিয়ে এক সাম্রাজ্যবাদী শাসন কায়েম করতে চেয়েছিল। শিক্ষায় অর্থব্যায়ে এদেশীয়দিগকে ইংরেজী ভাষার হয়ে,পাশ্চাত্য জ্ঞান বিজ্ঞানের হয়ে জোর সওয়াল করেছিলেন। নাহলে জাতীয় জীবনের উন্নতি অসম্ভব। তাই নিয়ে এদেশে রাজণ্যবর্গ ও রাজপুরুষ বনাম বিত্তশালীরা দুটি দল হয়ে পড়েন। একদলের জোর সওয়াল যা কিছুই পুরনো তা ভাল, আরেকদলের জোর সওয়াল যা কিছু পুরনো ও প্রাচ্য ভাল নয়। প্রতীচ্চ অনেক ভাল। প্রাচীনের পক্ষে নেতৃত্বে রাধাকান্ত দেব। আর তাঁর বিরুদ্ধে রামমোহন। এই মতান্তরের আলোড়নে কলকাতার থরহরিকম্প অবস্থা হয়েছিল। সংস্কার মুক্তির জয় হয়েছিল। রামমোহনের সতীদাহ প্রথা নিবারণ সেই কুসংস্কার মুক্তির জয়সূচক ধ্বণি আজও রামমোহনের জন্য ধ্বণিত হয় - ঊনবিংশ শতাব্দীর নবজাগরণের অগ্রদূত,যুগ পুরুষ। আধুনিক অবতার বললেও অনেকে অন্ধ ভক্তির কথা বলতে পারেন। কিন্তু বিশ্বাস সম্মত বলতে পারি - বৈদিক যুগ থেকে নারী জাগরণের সময়ে সময়ে পালা রচিত হয়েছে যেভাবে,ঊনবিংশ শতাব্দীতে রামমোহন নারী জাগরণের অনুরূপ পথ প্রদর্শক। পথ নির্মাতা। একজন প্রোটেস্টান্ট পন্থী। বৈদিক যুগে মেয়েদের বেদ পাঠের অধিকার নিয়ে প্রোটেস্টান্টপন্থী দল সোচ্চার হয়েছিলেন বলে আদি ব্যাসদেব পঞ্চম বেদ মহাভারত রচনা করেছিলেন। আর সতীদাহ প্রথাও রামমোহন প্রোটেস্টান্ট পন্থী হয়ে সংস্কারের মনোবল যেভাবে দেখিয়েছিলেন কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের মতো আধুনিক কুরুক্ষেত্রে নারীসমাজের জন্য জীবন দিয়ে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করে গেছেন। হ্যাঁ,তাঁর সতীদাহ প্রথা নিবারণের জন্য সমাজে বিধবাদের সংখ্য দুর্বহ হয়ে পড়েছিল সত্য। তাই যদি না হতো তাহলে বিদ্যাসাগর আসতেন কি করে! তাই সংস্কারের ভিত্তিপ্রস্তর রাজা রামমোহন।
           *******
@ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

ভৌকাট্টা~অনিশা

# বিষয় - ছবি দেখে লেখা

#  নাম- ভৌকাট্টা

# কলমে - অনিশা




"কষ্ট পেলে কেষ্ট মেলে", মায়ের বলা কথাটা ঘুড়ির মাঞ্জার সুতোয় হাত কেটে যাওয়ার পরে পলি বুঝল।

 কলকাতায় মামার বাড়ি পড়তে এসে সে দেখল এখানে সবাই বিশ্বকর্মা পূজোর দিন ঘুড়ি ওড়ায়। পলির ছোটবেলাটা কেটেছে গ্রামের বাড়িতে। বেশ ভালো রকমের ডানপিটে অথচ মিষ্টি স্বভাবের মেয়ে সে। মিষ্টি স্বভাবের জন্য ডানপিটে হওয়া সত্বেও বকাবকি বেশী খেতে হয়নি কোনদিন। স্কুলে যেদিন অ্যানুয়াল পরীক্ষা শেষ হতো সেদিন থেকেই অঘোষিত ঘুড়ির লড়াই শুরু হয়ে যেত। সবার পরীক্ষা চলত, তাই কারুর ঘুড়ির সুতোই মাঞ্জা দেওয়া থাকত না। কয়েক দিনের মধ্যেই মাঞ্জা দেওয়া সুতো তৈরী। এরজন্য ও বন্ধুরা পলির দ্বারস্থ হতো। তখন সহজেই এত কাঁচের গুঁড়ো যোগাড় করা সহজ ছিল না। প্রয়োজনে পলি নিজের মেলা থেকে কিনে আনা কাঁচের চুড়ি গুলো ও ভেঙে ফেলত। কাটাকুটির খেলায় তাকে হারানো এত্ত সহজ নয়।

সেই পলি মামার বাড়িতে এসে এত তাড়াতাড়ি পাল্টে গেল? সবাই মিষ্টি স্বভাবটাই দেখতে পায়, ডানপিটে স্বভাব আর নেই। আসলে বেচারী কলেজ আর বাড়ির পড়াশোনা করতে করতেই হাঁফিয়ে ওঠে। বদ্ধ ফ্লাটে আর কি বা করবে!

কলেজে গিয়ে জানতে পারল এখানে বিশ্বকর্মা পূজোর দিন খুব ঘুড়ি ওড়ানো হয়। তাই বন্ধুরা কয়েক জন ঠিক করেছে অদ্বিতীর বাড়ি দুপুরে থাকবে। বিকেলে ওদের ছাদ থেকে পাড়ার সবার ঘুড়ি ওড়ানো দেখে সন্ধ্যার দিকে বাড়ি ফিরে আসবে। মামার কাছে পারমিশন নিয়ে পলি গেল অদ্বিতীর বাড়ি। সব বন্ধুরা এসে গেছে। পলিই সবার শেষে পৌঁছাল। ওদের বাড়িতে সবার সঙ্গে আলাপ পরিচয় হলো। অদ্বিতীর বাবার খুব ভালো লেগেছে পলিকে। বললেন, "মুখে কেমন সরলতার ছাপ। সদ্য গ্রাম থেকে এসেছে তো, তাই!" অদ্বিতী মজা করে হেসে বলল "হুম্, বলো গাঁইয়া।" অদ্বিতীর দাদা  অনিমেষ বলে উঠলো, "স্টপ দিস ননসেন্স! সি ইজ্ সো‌ ইনোসেন্ট!" একটু থমথমে হয়ে গেল পরিবেশটা। আসলে পলি জানে, বন্ধুরা পিছনে সবাই ওকে গাঁইয়া বলে। 

দুপুরের খাওয়া দাওয়া শেষ হলে সবাই একটু ঘরে বসে আড্ডা দিল। তারপর ছাদে। ছাদে অদ্বিতীর দাদার বন্ধুরাও হাজির ঘুড়ি, লাটাই নিয়ে। তারপর শুরু হলো ঘুড়ির লড়াই।

আশেপাশে অনেক বাড়ি থেকেই ঘুড়ি উড়ানো হচ্ছে। অনিমেষ নিজে ঘুড়ি ওড়াতে পারে না। বন্ধুদের ইচ্ছেতেই ঘুড়ির লাটাই হাতে। কিন্তু প্রতিবেশীরা ছাড়বে কেন! একটার পর একটা ঘুড়ি কাটা যাচ্ছে। আর পাশের বাড়ির ছেলে মেয়েরা আনন্দে চিৎকার করছে, হুইসেল বাজাচ্ছে। পলির হাত নিশপিশ করছে। ভাবছে একবার যদি হাতে সুতো পাই, তবে ওদের এক্ষুনি চুপ করিয়ে দেব। এই হেরে যাওয়া দেখতে দেখতে ওদের বন্ধুদের আড্ডাও আর জমছে না। হঠাৎ অদ্বিতী বলে বসল, "এই যে গ্রামের মেয়ে। নিশ্চয়ই ঘুড়ি ওড়াতে পারিস!" অনিমেষের বন্ধুরাও শুনতে পেয়ে পলিকে অনুরোধ করল একটু সাহায্য করার জন্য। পলিও এই হেরে যাওয়া সহ্য করতে পারছিল না। যেন শুধু এই অনুরোধটুকুর অপেক্ষায় ছিল। এরপর পলির হাতে সুতো, আর অনিমেষের হাতে লাটাই। তার মন ফিরে গেল সেই ছোটবেলায়। সদ্য কিশোরীর মতো তার হাত সুতো টানছে, ছাড়ছে, খুশীতে লাফাচ্ছে। আর অনিমেষ! মুগ্ধ হয়ে তা দেখছে। হঠাৎ ভৌকাট্টা! আবার একটু পরেই আবার ভৌকাট্টা! এবাড়ির ছাদে তখন আনন্দোৎসব। বাড়ির সবাই ছাদে এসে গেছে।  

কিন্তু পাশের বাড়ির পরাজিত সৈনিকরা এত সহজেই ছেড়ে দেবে? শুরু হলো সুর করে টিপ্পনী কাটা। "কে তুমি পল্লিবালিকা, বাঁচালে ওদের গ্রাম থেকে এসে!!" "কে তুমি নন্দিনী, আগে তো দেখিনি!" রাগে গর্জে উঠলো অনিমেষ। অনেক হয়েছে, দরকার নেই কারুর ঘুড়ি ওড়ানোর। পলির হাত থেকে কেড়ে নিতে গেল সুতো। আর মাঞ্জা দেওয়া সুতোয় পলির নরম হাত কেটে রক্ত বেরিয়ে গেল। ছুটে এসে ওর রক্তাক্ত হাতটা ধরে ফেলল অনিমেষ। পলি দেখল অনিমেষের চোখে জল। সেই চোখে অনুশোচনা, আবেগ ও ভালোবাসায় একাকার হয়ে গেছে।

তখনই মনে পড়লো মায়ের কথা। ভাবতেই মনে মনে লজ্জা পেল সে। ঈশ্, কে আমার কেষ্ট ঠাকুর রে!

ঘুড়ির চিঠি (অণুগল্প)-শুভ্রজিৎ চক্রবর্তী

 বিষয়:অণুগল্প 

কলমে: শুভ্রজিৎ চক্রবর্তী 

ঘুড়ির চিঠি

ঘুড়ি কেটে গেলে কেউ খুশি হয়, সেটা অজয় কে দেখেই প্রথম জানলো পারমিতা। "আন্টি, আজকে আবার আমার ভোঁ কাট্টা গেছে" বলে একটা নির্মল হাসি দেয় অজয়। বছর আটের অজয়কে এর আগে কোনদিন জিজ্ঞেস করা হয় নি পারমিতার যে এতে খুশির কি হয়েছে।

কিন্তু আজকে যখন কারণটা জানতে পারলো, পারমিতার হৃদয়টা মোচড় দিয়ে উঠলো। অজয়ের মা, সুনীতা পারমিতার ঘরে কাজ করে গত ৪ মাস ধরে। এক হাজার টাকা মাইনে বাড়াতে, ছ-শো টাকাতে ঘর মোছার কাজের লোক হিসেবে সুনীতাকে রেখেছে পারমিতা। বেসরকারি স্কুলে পড়িয়ে যৎসামান্য মাইনে পায় পারমিতা। অল্প বয়সে বিধবা হলেও, আর বিয়ে করতে পারেনি সে। স্বামী জয়দীপের জায়গায় কাউকে কল্পনা করতে পারেনি সে। জয়দীপের কেনা ফ্ল্যাটেই থাকে পারমিতা। অজয়কে দেখে কিরকম একটা মায়া জেগে উঠেছিলো তার মনে।

সুনীতার সাথে প্রায় দিনই অজয় আসে পারমিতার ফ্ল্যাটে। ওর চোখে মুখে একটা দ্যুতি আছে। একটা বুদ্ধিদীপ্ত চাউনি আছে। পারমিতা  জিজ্ঞেস করে, "ঘুড়ি ভোঁ কাট্টা গেলে কি হয়?" চোখ মুখ নাচিয়ে  অজয় উত্তর দেয়, "ও মা! তুমি জানোনা বুঝি? এত বড়ো হয়েছে আর এটাও জানোনা?" পারমিতার চোখে করুণা মাখা হাসির চমক দেখা যায়। মাথা নাড়িয়ে পারমিতা  না বলে। "আরে, ঘুড়ি যখন কেটে যায়, সেটা আকাশে মিলিয়ে যায়। আমার বাবা আকাশে চলে গেছে তো, তাই আমি ঘুড়িতে বাবাকে চিঠি লিখি। তাড়াতাড়ি আসার জন্য বলি আর আসার সময় খাসীর  মাংস নিয়ে আসতে বলি।" শুনে পারমিতা  চোখের জল ধরে রাখতে পারেনা। "তুই খাসীর  মাংস খেতে ভালোবাসিস?"- জিজ্ঞেস করে পারমিতা । "হ্যাঁ গো, খুব ভালবাসি " - বলে সম্মতি জানায় অজয়।

"আমি জানি, আমার জন্মদিনের আগে বাবা নিশ্চয়ই আসবে" যোগ করে অজয়। পারমিতা ঠিক করে, যে ভাবেই হোক, অজয়কে একদিন ও খাসীর মাংস খাওয়াবে।

কিন্তু ঢাকুরিয়ার দু কামরার ফ্ল্যাট বাড়ির সোসাইটির বিল দিতেই পরমিতা হিমশিম খাচ্ছে। তবুও ভাবে, "নিজের সন্তান হলে কি করতাম"? টাকা বাচিয়ে একদিন খাসীর মাংসের আয়োজন করতে হবে। তিনটে প্রাণী খাবে। পাছে  ভয় পায় পারমিতা, ছোট্টো  শিশুর মনে আবার করুণার ভিক্ষে ভেবে দুঃখ  না হয়। ছক কষে পারমিতা, বাবার পাঠানো মাংসই খাবে অজয়।

মাইনে  পেয়ে এক কেজি  খাসীর মাংস আর একটা ঘুড়ি কেনে পরমিতা। ঘুড়িতে লেখে "বাবা অজয়, আমি জরুরী কাজে আটকে আছি, আসতে দেরি হবে। তোমার জন্য মাংস পাঠিয়েছি, খেয়ে নিও। আমি এলে আবার আনবো মাংস।" কিন্তু সেদিন সুনীতা একা কাজে এলে পারমিতা  জানতে পারে যে অজয়ের জ্বর হয়েছে। পারমিতা  ঠিক করে যে মাংস বানিয়ে নিজেই নিয়ে যাবে অজয়ের কাছে।

বিকেল বিকেল মাংস নিজের হাতে রান্না করে ঘুড়ি হাতে নিয়ে পারমিতা  চলে যায় পাশের পঞ্চানন তলার বস্তিতে। খুজে পেয়ে যায় সুনীতার ঘর। ছোট্টো দশ  বাই দশের  ঘর, ঘরে আসবাব বলতে শুধু একটা খাট। খাটের তলায় রান্না - খাওয়ার জোগাড় । খাটের ওপর সুনীতা বসে আছে। কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে ছোট্টো অজয়। "অজয়, উঠে দেখ আমি কি এনেছি। তোর বাবা ঘুড়ি পাঠিয়েছে, কিন্তু ভুল করে সেটা আমার ঘরে চলে এসেছে। সাথে খাসীর মাংসও পাঠিয়েছে। তাড়াতাড়ি ওঠ । আজকে আমিও তোর সাথে খাবো ।" অজয় সাড়া  দেয় না। সুনীতার চোখে শীতল চাউনি। স্থির চক্ষু। কোলে শুয়ে আছে অজয়ের নিথর দেহ। জাপানিস এনকেফেলাইটিসের প্রকোপে দুদিনের জ্বর থেকে আর উঠতে পারেনি অজয়। চলে গেছে ওর বাবার কাছে, আকাশের দেশে, যেখানে যেতে পারে শুধু ঘুড়ির চিঠি। 

সমাপ্ত

All rights reserved for © Subhrajit Chakravorty

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...