শুভ শব্দ আলোচনা-বাসর।
# বিষয় - *শব্দ বিশ্লেষণ।*
# নাম- *'ক্ষান্তবাদী'*
✍ - মৃদুল কুমার দাস।
জীবনের সহিষ্ণুতা একটি বিশিষ্ট গুণ, সহিষ্ণুতা,নীরবতা,স্থিতধী,উদারতা মন ও উষ্ণ তথা উগ্র মেজাজের বিপরীত গুণাবলী। এই গুণগুলি দিয়ে বিপরীতগামী পরম শত্রুকে জয়ের পন্থা। সর্বাবস্থায় মনে সাম্য ও শান্তভাব বজায় রাখার নাম ক্ষান্তবাদ। একটি পুরাকালের কাহিনি বললে বিষয়টি যথার্থ বোধগম্য হবে।
পুরাকালে বারাণসীতে কলাবু নামে এক বদমেজাজি রাজা ছিলেন। তাঁর রাজ্যে কুন্ডলকুমার নামে এক বৈভবশালী ব্রাহ্মণ ছিলেন। হঠাৎ একদিন সমূহ বিত্ত বৈভব বিলিয়ে দিয়ে সন্ন্যাসী হয়ে হিমালয়ে চলে যান। কিছুদিন পরে পুনরায় স্বস্থানে ফিরে এলেন এক বৈরাগ্য সন্ন্যাসীর বেশে। প্রথম দিন রাজা কলাবুর আতিথ্য গ্রহণ করলেন। পরদিন নগরে ভিক্ষান্ন সংগ্রহের জন্য সেনাপতির গৃহে গেলেন। সেনাপতি সন্ন্যাসীর নানা প্রকার মিষ্ট বাক্যে বড়ই খুশি। খুশি হয়ে রাজার উদ্যানবাটীতে থাকার ব্যবস্থা করে দেন সেনাপতি।
একদিনের ঘটনা। রাজা কলাবু সুরাপানে মত্ত হয়ে রাজনর্তকীদের সঙ্গে নিয়ে সেই সন্ন্যাসী যেখানে থাকেন সেই উদ্যানবাটীতে এলেন। সেখানেই নৃত্যগীতের আসর বসানোর জন্য রাজা শয্যা পাতার নির্দেশ দিলেন। এক সময় রাজা কলাবু প্রধান নর্তকীর কোলে মাথা রেখে ঘুমিয়ে পড়লেন। এদিকে নর্তকীরা দেখলেন রাজা যখন নিদ্রায় গেছেন, এই সুযোগে উদ্যানের ফলমূল আহরণ করতে উদ্যানে ঘুরে বেড়ানো যাক। সেই মত গেলেন রাজনর্তকীরা। তাঁরা তখন দেখলেন এক শালবৃক্ষের নীচে বসে এক সন্ন্যাসী ধ্যান করছেন। খুব মজা হবে সন্ন্যাসীর ধ্যান ভঙ্গ করে। সন্ন্যাসীর কাছে যেতেই,তাঁরা অবাক। ইনিই তো সেই কুন্ডলকুমার। এখন সন্ন্যাসী! তাঁর কাছে নানা উপদেশ শুনতে লাগলেন নর্তকীরা। সবাই উপদেশের যাদুতে একেবারে মন্ত্র-মুগ্ধ। এমন সুন্দর অনেকটা সময় কাটাতে পেরে ধন্য হলেন সবাই।
এদিকে রাজা ঘুম ভেঙে দেখলেন প্রধান নর্তকী ছাড়া কেউ নেই। রাজাকে নর্তকীদের খোঁজ দিলেন এক অনুচর। সেই মত রাজা দেখলেন গাছের তলায় সন্ন্যাসীকে ঘিরে সবাই উপদেশ শুনছে।
তাই দেখে রাজা কলাবু তো রেগে অস্থির। রাগতঃ স্বরে বলতে লাগলেন এই ভন্ড সন্ন্যাসীকে শিক্ষা দেওয়া জরুরি। রাগে অগ্নিশর্মা রাজা কলাবু সন্ন্যাসীকে উগ্র মেজাজে বললেন-"আপনি কোন মতাবলম্বী?"
তখন সন্ন্যাসী শান্তভাবে উত্তর দিলেন- "আমি একজন ক্ষান্তবাদী। সকল অবস্থায় আমি ক্রোধ সম্বরণ করে মনকে শান্ত রাখি। তাই আমার ক্ষান্তি।
তখন রাজা আরো ক্রুদ্ধ হলেন। কাঁটার চাবুকে সন্ন্যাসীকে ক্ষতবিক্ষত করতে জহ্লাদকে নির্দেশ দিলেন। তাতে সন্ন্যাসীকে নির্বিকার দেখে ক্রমে ক্রোধের বশবর্তী হয়ে হাত পা কাটতে বললেন রাজা। শুধু সন্ন্যাসী বললেন ক্ষান্ত আমার হাত পায়ে থাকে না। এর পর চোখ,কান, নাক সব কাটার নির্দেশ দিলেন। তাতেও সন্ন্যাসী ক্ষান্ত। সন্ন্যাসী বললেন ক্ষান্ত তাঁর হাতে পায়ে নয়। আরো গভীরে। সন্ন্যাসী একইভাবে ক্ষান্তমনে তেমনি নির্বিকার। শেষে প্রাণ গেলেও আমাকে এমনিভাবেই ক্ষান্ত হয়ে দেখতে পাবেন রাজন। প্রবল রোষ দিয়ে যখন কিছুই হলো না,রাজা রুষ্ট মনেই স্থান ত্যাগ করলেন। আর সন্ন্যাসী সেই একইভাবে বলতে লাগলেন- "কোন অবস্থাতেই আমি আমার ক্ষান্তধর্ম বিসর্জন দিতে পারব না রাজন।" কথাগুলো রুষ্ট মনের উপর যেন ঘৃতাহূতি লাগল রাজার কাছে। ক্ষান্তবাদ সন্ন্যাসীকে স্বধর্মচ্যূত করার অক্ষমতা ও ব্যর্থতা থেকে হতাশাগ্রস্থ রাজা স্থান ত্যাগ করলেন। এদিকে জহ্লাদ বেচারা সন্ন্যাসীর কাছে করজোড়ে বিনীত স্বরে বললেন - "আমি আজ্ঞার দাস। এটাই আমার পেশা। তাই হে বোধিসত্ত্ব যে এই কাজ করিয়েছেন তাকে ছাড়া অন্যকাউকে ও আমাকে দোষের ভাগীদার করবেন না।"
সন্ন্যাসীর মুখে সেই একই কথা। তিনি বললেন- "আমার পক্ষে কারো প্রতি ক্রুদ্ধ হওয়া অসম্ভব।" এই বলে সন্ন্যাসী তৎক্ষণাৎ প্রাণ ত্যাগ করলেন। আর রাজা কিছুটা দূর গেছেন, এমন সময় ধরণী দ্বিধা হল,আর রাজাকে তৎক্ষণাৎ ধরণীর অগ্নিশিখা গ্রাস করল। রাজার উদ্যানের থেকে বেরনো আর হল না।
ক্রোধ মানুষকে বিপন্ন করে। শান্ত,স্থিতধী,নির্বিকার মন যথার্থ সত্যের সন্ধান দেয়। অশান্ত হৃদয়,উগ্র মেজাজ মানসিক বিকৃতির লক্ষণ। জাগতিক জীবন সংসারের নানা কর্মকান্ড থেকে কেউ অস্থির,চঞ্চল,ক্রোধী হয়। রক্ত মাংসের শরীর বলে সাফাই গাই। আসলে এগুলি মনের বিকাশের অন্তরায়। ক্রোধ,কামনা,বাসনা,ভোগ,লালসাপ্রিয়তা মানুষকে অভিশপ্ত করে,আর শান্ত,সৌম্য,ক্ষান্ত,নির্লিপ্ত জীবন-দর্শন জীবনকে দেয় পুণ্য,লোভী,ক্রোধী,হিংসা,ঈর্ষাভাব থেকে শত্রুতা আসে। ক্ষুদ্রতা তুচ্ছতার বোধ আসে।
সংসার সুখ ও দুঃখের, তার কারণ লোভ লালসা ভোগাকাঙ্খা। এ সবের মধ্যে যত জড়াবে তত আমার আমার অহংকার আসে। আর হৃদয়কে যত সত্য সুন্দরের মুক্ততীর্থগামী করবে তত জীবনের আনন্দ। সন্ন্যাসীর এই উপদেশ ছিল হয়তো এতক্ষণ ধরে,তাই শুনে রাজনর্তকীদের মোহিত করেছিল। কারণ রাজার ভোগ্যপন্যের বাইরে তাদের কোনো মুক্ত জীবনের উল্লাস-আনন্দ ছিল না। রাজা নিজের অহংকারের কাছে অশান্ত,শুধু রোষ পোষণ করতে শিখেছে,তা থেকে নিজের ধ্বংসের কারণ হয়েছে। আর ক্ষান্তবাদ জীবনের সেই শুভচেতনার উন্মেষ ঘটিয়ে আমাদের জীবনকে করেছে মনোগ্রাহী। তাই রাজা কলাবু যতটাই ঘৃণার উদ্রেগ করলেন, সন্ন্যাসী ততটাই মনকে শুভ চেতনায় উদ্বুদ্ধ করলেন। ক্ষান্তবাদ একটি হৃদয়ের সেই অনুকরণীয় সৌন্দর্য।
ধন্যবাদ। শুভেচ্ছা।
******
অসাধারণ 💐💐💐💐
উত্তরমুছুনDarun
উত্তরমুছুনএটা বুদ্ধের এক জাতকে পড়েছি।
উত্তরমুছুনঅসাধারণ লেখা দাদা...💐💐💐
খুব সুন্দর লিখেছেন দাদা।
উত্তরমুছুনঅসাধারণ লেখা
উত্তরমুছুনঅনবদ্য লেখা।
উত্তরমুছুন