বৃহস্পতিবার, ১০ জুন, ২০২১

De Ja Vu (ছোটোগল্প)

 Deja Vu
কলমে: শুভ্রজিৎ চক্রবর্তী
ম্যাগমা থেকে শীতলিকরণ ও পৃথকীকরণের মাধ্যমে আলাদা আলাদা পাথর সৃষ্টি  কিভাবে হয় সেটা পড়াতে পড়াতে আই আই টি খড়গপুর থেকে আসা অতিথি অধ্যাপক প্রোফ. মুখার্জী হঠাৎ খেয়াল করলেন জিৎ, মানে অরুনজিত চক্রবর্তী ফাঁকা দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে, তার চোখের ভাষা পড়ার ক্ষমতা, বিচক্ষণ মুখার্জী সাহেবের বাইরে। স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে জিতের মন এখন অন্য কোথাও। একটু বিরক্তি নিয়ে মুখার্জী সাহেব পড়া থামিয়ে জিতের কাছে গিয়ে দাড়ালেন । জিতের কোন হুঁশ নেই। ক্লাসের সবাই তাকিয়ে আছে আর ভাবছে আজকে জিতের কপালে দুঃখ আছে। জিতের সাথে সদ্য প্রেমে পড়া পিউ এর মাথায় চিন্তার রেখা। পিউ ভাবছে এতবার বোঝানো সত্বেও ছেলটার আক্কেল হলো না। মুখার্জী সাহেব খেয়াল করলেন, জিৎ বিড়বিড় করে কিছু বলছে। ভালো করে শোনার  চেষ্টা করলেন। “জানি, আমি চিনি, দেখেছি, সব, আগে.."। 

গুরু গম্ভীর গলা নিয়ে মুখার্জী সাহেব চিৎকার করে জিৎ কে ধরে ঝাঁকিয়ে দিলেন। হঠাৎ করা চিৎকার আর ঝাঁকুনিতে  জিতের প্রচন্ড মানসিক চাপ পড়ে । ও প্রায় অজ্ঞান হয়ে যায়। সবাই ব্যস্ত হয়ে পড়ে , পিউ চিৎকার করে উঠলো, মুখার্জী সাহেব কলেজের মেডিক্যাল রুমে খবর দেওয়ার জন্য বেয়ারাকে ডেকে  পাঠালেন।

ষ্ট্রেচারে করে জিৎ কে মেডিকেল রুমে নিয়ে যাওয়া হলো, সেখানে অল্প চিকিৎসার পর জিতের জ্ঞান ফিরলো, কিন্তু ও আর স্বাভাবিক অবস্থায় নেই। ও যেনো মানসিক বিকারগ্রস্থ হয়ে পড়েছে। সেখান থেকে ওকে মানসিক হাসপাতালে স্থানান্তরিত করা হলে, দু-তিন দিনের চিকিৎসায় সুস্থ হয়ে ওঠে। ডাক্তার ওকে পনেরো দিনের জন্য বেড  রেস্ট নিতে বলেন। সেই পনেরো দিন দুবেলা  পিউ ওর খবর নিতে জিতের মেস  বাড়িতে আসতো। 

জিতের কাছে পিউ জিতের ব্যাপারে নতুন কিছু তথ্য জানতে পারে। জিতের এরকম বরাবরই হয়ে থাকে। হঠাৎ করে যে কোন সময় ওর মনে হয় যে এই পরিস্থিততে ও আগেও ছিলো, এরকম ঘটনা ওর সাথে আগেও ঘটে গেছে। তখনই ওর মাথা গুলিয়ে যায়, নিজের ওপর নিজের নিয়ন্ত্রণ থাকে না। ডাক্তারী  ভাষায় এটাকে  temporal lobe seizures বলা হয়। এটা একটা neurological disorder বা খিঁচুনি। ফ্রেঞ্চ ভাষায় এটাকে Deja Vu বলা হয়। কম বেশি প্রায় সবার ক্ষেত্রেই এটা হয়ে থাকে। দুর্লভ ক্ষেত্রে এটা মানসিক সমস্যা সৃষ্টি করতে পারে আর এটাই হয়েছে জিতের সাথে। এই খিঁচুনি অনিয়ন্ত্রিত বৈদ্যুতিক ক্রিয়াকলাপের সাথে জড়িত যা আমাদের মস্তিষ্কের স্নায়ু কোষকে ভুলভাবে চালিত করতে পারে। টেম্পোরাল লোব খিঁচুনি অন্য ব্যক্তির সাথে যোগাযোগের ক্ষমতাকে প্রভাবিত করে। এগুলির বেশিরভাগ 30 সেকেন্ড থেকে কয়েক মিনিট পর্যন্ত স্থায়ী হয়। ব্যাক্তি চারপাশ সম্পর্কে সচেতনতা হারাতে পারেন । কিন্তু জিতের ক্ষেত্রে এই রোগ দীর্ঘায়ু হতে লাগলো। 
সেই পনেরো দিনে জিতের অসুস্থতা আরো বাড়তে থাকে। ধীরে ধীরে ও একটা মানসিক রুগীতে পরিণত হতে থাকে। সর্বক্ষণই ওর মনে হতে থাকে যে এই পরিবেশের সাথে ও আগেও সম্মুখীন হয়েছে। সাংঘাতিক প্রতিভাশালী জিৎ একজন পাগল ব্যক্তিতে পরিণত হতে লাগলো। সারাক্ষণ বিড়বিড় করে বলতে থাকে, “দেখেছি, জানি, সব আগেও ঘটেছে.. .. “ ইত্যাদি।  কোন একদিন ও নিজের মেস ছেড়ে বেরিয়ে যায়। 
পিউএর প্রথম আর সদ্য প্রেমের অবসান হয়। কিন্তু পিউ কোনভাবেই জিৎকে মন থেকে বের করতে পারেনি। হাজার হলেও প্রথম প্রেম। দেখতে দেখতে কলেজ জীবন শেষ হয়ে এলো । পিউ চাকরি পেয়ে অন্য শহরে স্থানান্তরিত হয়ে গেলো। দেখতে দেখতে অনেকগুলো বছর কেটে গেলো। 

এরই মধ্যে পরিবারের চাপে ও সময়ের দাবিতে পিউকে বিয়ে করে সংসার করতে হয়েছে। আজকে ওর একমাত্র সন্তান সৃজিতার দশম জন্মদিন। সৃজিতার প্রত্যেক জন্মদিনেই পিউ রাস্তার গরীব, ঘরছাড়া অসহায় লোকেদের ভালো খাবার দাবার ও কাপড় দান করে। এ বছরও তার অন্যথা নয়। স্বামী-সন্তানকে নিয়ে গাড়ি করে প্রচুর খাবার দাবারের প্যাকেট ও জামা কাপড় নিয়ে পিউরা রাস্তার মোড়ে মোড়ে দাঁড়াচ্ছে  আর এরকম অসহায় ব্যক্তিদের দান করছে। 

হঠাৎ করে এক পাগলকে দেখে পিউ থমকে উঠলো। খাবার আর জমাকাপড় হাত থেকে নিতে গিয়ে সেই পাগলটাও যেনো থমকে গেলো। বহুদিন ধরে না কাটা দাড়ি – গোঁফের মাঝখানে, ছেড়া-ফাঁটা কাপড় পরিহিত, প্রায় অর্ধনগ্ন অবস্থায় থাকা জিৎকে চিনতে পিউ এর বেশিক্ষণ লাগলো না। পিউ এর চোখের দিকে তাকিয়ে জিৎ ও যেনো চিনতে পারলো  পিউকে, কোথাও যেনো এরকম পরিবেশ ও আগেও দেখেছে, সব যেনো ওর চেনা ঠেকছে। ও যেনো আগেও এই পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছে। “দেখেছি, জানি, আগেও হয়েছে..” বিড়বিড় করতে করতে জিৎ ছুটতে থাকে, পেছন থেকে পিউ চিৎকার করে ডাকে, “দাঁড়াও, দাঁড়াও, শোনো”। পিউ এর মনে পড়ে যায়, প্রথম প্রেম নিবেদন করার পর পিউ এভাবেই প্রথম ভালোবাসার উপহার দিয়েছিল জিৎকে। উপহার গ্রহণ করার সময় জিতের সেই দৃষ্টি আর এই দৃষ্টির মধ্যে মিল খুজে পায় পিউ। পিউএর মনে উথাল পাতাল চলতে থাকে। প্রথম ভালোবাসা ওর মনে মোচড় দিয়ে জেগে ওঠে। পিউ অনুভব করে মায়া আর মুগ্ধতা মাকড়সার জালের মত, একবার জড়িয়ে গেলে তার থেকে বেরিয়ে আসা খুব কঠিন। দেখতে দেখতে জিৎ চোখের দৃষ্টির বাইরে মিলিয়ে যায়।দূর থেকে বহুদূরে.....
সমাপ্ত

(C) All rights reserved for Subhrajit Chakravorty
 

২টি মন্তব্য:

শিরোনাম - অপ্রকাশিত অনুভূতি✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - অপ্রকাশিত অনুভূতি ✍️ ডা: অরুণিমা দাস কিছু অনুভূতি মনের গভীরে থাকাই শ্রেয়। সেটা হয়তো প্রকাশ করলে সমস্যা হতে পারে,তাই প্রকাশ না কর...