বুধবার, ২৭ এপ্রিল, ২০২২

এস্কিমোস লাভ টু লিভ ইন নর্থ পোল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

এস্কিমোস লাভ টু লিভ ইন নর্থপোল
✍️ ডা:অরুণিমা দাস

উত্তরমেরু এলাকা মানুষের কাছে এক রহস্যময় জগৎ। সেখানে আকাশে থাকে অদ্ভুত রঙের অরোরা,আর বছরের দীর্ঘ সময় ধরে চলে আলো আঁধারের খেলা। বরফের তৈরি ইগলুতে বাস করে সেখানকার এস্কিমোরা। কেন তারা বাস করে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা আর বরফের মধ্যে সে নিয়েও রয়েছে অনেক প্রশ্ন। এই ঠান্ডায় জমে বেঁচে থাকতে থাকতে তাদেরও তো ইচ্ছে করে নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে যেতে,কিন্তু যায় না তারা। আর কেনোই বা যায়না? সেই উত্তর খুঁজতে খুঁজতে হারিয়ে গেছিলাম ওদের দেশে,ওদের জীবনযাত্রা,খাদ্যাভ্যাস এসব পড়তে গিয়ে ওদের সাথে একাত্ম হয়ে পড়েছিলাম। ফিরে গেছিলাম স্কুল জীবনের দিন গুলোতে, ভূগোল ইতিহাসের সময়টাতে। যা জেনেছি সেটাই সংক্ষেপে লিখছি।

উত্তর মেরুর চারপাশে আলাস্কা,কানাডা,গ্রিনল্যান্ড ও রাশিয়া। উত্তর মেরু এক বিশাল এলাকা যার আয়তন প্রায় সম্পূর্ণ উত্তর আমেরিকার সমান। উত্তর মেরুতে বলতে গেলে সারা বছরই শীত থাকে ও শীতে তাপমাত্রা গড়ে মাইনাস ৪০ ডিগ্রিতে চলে আসে।উত্তর মেরু অঞ্চলে গ্রীষ্মকাল শুরু হয় জুলাই মাসের মাঝামাঝি এবং থাকে প্রায় আগস্টের শেষ পর্যন্ত। উত্তর মেরুতে গ্রীষ্মে জন্মে বিভিন্ন গাছপালা। উত্তর মেরু জোনের দক্ষিণাংশে আছে বরিল বনভূমি যা তাইগা বা স্নো ফরেস্ট নামেও পরিচিত।এতে ফার,লার্চ,মাউন্টেন অ্যাশ ও ফায়ারউইডের মতো বার্চ গাছ দেখা যায়। তবে আর্কটিক তুন্দ্রা এলাকায় বার্চ,উইলো,হিথ, লিঙ্গোনেবেরি,বাইবেরি,ব্লুবেরি,আর্কটিক পপি, কটনগ্রাস,লিঞ্চেন এবং মসেস নামের ঘাস দেখা যায়।

উত্তর মেরু এলাকার মানুষ কাঁচা বা খুব অল্প সেদ্ধ মাংস খেতে অভ্যস্ত। এভাবে মাংস খাওয়া হলে তাতে ভিটামিন সি পাওয়া যায়। পর্যাপ্ত শাক-সবজি পাওয়া না গেলেও এভাবে তারা ভিটামিন সি পেয়ে যায়। শীতকালে দীর্ঘদিন সূর্যের আলো পাওয়া না গেলেও গ্রীষ্মকালে এ এলাকায় সূর্যের আলো পাওয়া যায়। এ সময় পাওয়া সূর্যের আলোতে এবং বিভিন্ন খাবারের মাধ্যমে তাদের শরীরের ভিটামিন ডি এর চাহিদা মিটে যায়।

এস্কিমোরা কেন ঠান্ডা এলাকা ছেড়ে যায় না?এস্কিমোরা কেন প্রচণ্ড ঠাণ্ডা এলাকা ছেড়ে দক্ষিণের নাতিশীতোষ্ণ এলাকায় চলে আসে না?এটা একটা সাধারণ প্রশ্ন,উত্তর টাও বেশ অন্যরকমের।এস্কিমোদের দক্ষিণের নাতিশীতোষ্ণ এলাকায় চলে যাওয়ার কোনো কারণ নেই। তারা নিজের এলাকাতেই বেশ আরাম করেই বেঁচে আছে। অন্য এলাকায় গেলেই বরঞ্চ তাদের বিভিন্ন সমস্যা দেখা দেয়।১৯৮০ সালে দুজন ডেনিস চিকিৎসক বেঙ ও ডাইবার্জ গ্রীনল্যান্ডে কাজ করার সময় লক্ষ্য করেন এস্কিমোরা হার্ট ডিজিস ইমিউনড সত্যি কথা বলতে তারা কোন এস্কিমোকেই হার্ট ডিজিসে আক্রান্ত হতে দেখেননি তারা।ডেনিস অধিবাসীদের তুলনায় এস্কিমোদের রোগের বালাই অনেক কম। শুধু হার্ট ডিজিস ই নয়,স্কিন ডিজিস এছাড়াও রিউম্যাটিক ডিজিস বা জয়েন্ট সংক্রান্ত সমস্যা বহুলাংশে কম বা খুব কম শতাংশ লোকের হয় বললেই চলে।
এতো ভালো যখন থাকা যায় উত্তরে,খামোখা শুধু গরম পাবার জন্য নাতিশীতোষ্ণ অঞ্চলে গিয়ে লাভ টা কি! তাই তারা উত্তর মেরুতে জমে যাওয়া ঠান্ডায় অবস্থান করতেই সাচ্ছন্দ্যবোধ করে।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস


শুক্রবার, ২২ এপ্রিল, ২০২২

ভার্চুয়াল সম্পর্কের কথকথা ✍️ডা: অরুণিমা দাস


"দূরকে করেছে নিকট,আর পরিবার যে হয়েছে অনেক দূরের
মানুষ হয়েছে যান্ত্রিক,ভূমিকা যে রয়েছে এতে ভার্চুয়্যাল জগতের।"
     
যোগাযোগ প্রযুক্তির উন্নয়নের সুবাদে মানব সমাজ প্রবেশ করেছে নতুন এক জগতে। এর নাম ভার্চুয়াল জগত। বর্তমান প্রজন্মের ছেলে মেয়েরা ভার্চুয়াল জগতের মধ্যে প্রবেশ করে প্রতিনিয়ত নিজেরা শারীরিক কিংবা মানসিক ভাবে দুর্বল হয়ে পড়ছে এবং এই দুর্বলতা হওয়ার প্রধান কারণ হচ্ছে ভার্চুয়াল জগত তাদের চোখের ঘুম প্রতিনিয়ত কেড়ে নিচ্ছে! ভার্চুয়াল জগতে আমরা মানুষ থেকে মানুষ অনেক দূরে সরে যাচ্ছি। বিশ্বস্ততার জায়গা, আস্থার জায়গা,সম্পর্কের জায়গা এসব থেকে আমরা বহুদূরে। আমরা একটা ভার্চুয়াল জীবন আছি আছি,আবার নেই নেই!এরকম সম্পর্কের মধ্যে প্রতিদিন ধাবিত হচ্ছি। বর্তমানে বিশ্বে যে প্রবণতা লক্ষ্য করা যাচ্ছে তাহলো তরুন তরুণীরা পরিবারের সদস্যদের সঙ্গে সময় কাটানোর চেয়ে মোবাইলের মাধ্যমে ভার্চুয়াল জগতে সময় ব্যয় করাকে বেশি পছন্দ করে। এর ফলে পারিবারিক আড্ডায় বসার প্রবণতা কমে গেছে। শুধু তাই নয় এই ভার্চুয়াল জগত মানুষের ঘুম কেড়ে নিচ্ছে।
কন্টিনিউয়াস একই পশ্চার মেইনটেইন করে মোবাইল বা ল্যাপটপ ব্যবহার করে তাহলে নেক মাসল স্প্যাসম হয়ে ব্রেনে অক্সিজেন সরবরাহ কমে যায়,রক্ত সঞ্চালনেও ব্যাঘাত ঘটে যার ফলে খুব তাড়াতাড়ি ক্লান্তি আসে এবং এই জন্য কাজের প্রতি কনসেন্ট্রেশন কম হয়ে যায়। বসে বসে কাজ করার দরুন আর সেডেন্টারী লাইফ স্টাইলের দরুন শরীরে মেদ জমছে,স্থূলতা দেখা দিচ্ছে। ওভারওয়েট, ওবেসিটি থেকে শুরু করে স্ট্রেসের জন্য টাইপ টু ডায়াবেটিস হবার সম্ভাবনা বাড়ছে। চোখে মোবাইলের আলো, ল্যাপটপের আলো কন্টিনিউয়াস পড়ছে আর এর ফলে ইচিং,ওয়াটারিং, রেডনেস দেখা দিচ্ছে। রাতে ঘুম ঠিক মতো হয় না, স্লিপ অ্যাপনিয়া দেখা দিতে পারে। 

যদিও অনেকের মতে সোশ্যাল মিডিয়া সামাজিক বন্ধন তৈরি করে কিন্তু এই এই মিডিয়া আবার আমাদের অনেক দূরে সরিয়ে দিচ্ছে। ভার্চুয়াল এই জগতে আমাদের চাওয়া আর পাওয়ার মধ্যে জীবনটা আটকে গেছে।

এক গবেষণায় দেখা গেছে, ইন্টারনেটের নেশার কারণে ঘুম থেকে উঠতেও একেকজনের গড়ে দেরি হয় প্রায় ৯০ মিনিট। চিকিৎসকদের মতে, এভাবে দীর্ঘদিন ঘুমের সমস্যা চলতে থাকলে দেখা দিতে পারে হৃদরোগ এবং অ্যাংজাইটির সমস্যা। এর আগে ২০১৫ সালের এক গবেষণায় দেখা গেছে,যেসব কম বয়সী রোগী হার্ট অ্যাটাকের সমস্যা নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হয়, তাদের ৯০ শতাংশই পর্যাপ্ত পরিমাণে ঘুমাতে পারেন না। এর ফলে এটা স্পষ্ট যে,ভার্চুয়াল জগত আমাদের জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে প্রভাব ফেলছে। ভার্চুয়াল জগত আমাদের জন্য যেমন নানা সুযোগ ও সম্ভাবনা তৈরি করেছে ঠিক তেমনি বাড়িয়ে দিয়েছে বিপদের আশঙ্কা। একটু অসতর্কতা ও অসচেতনতা বড় ধরনের বিপদের কারণ হয়ে দাঁড়াতে পারে। ভার্চুয়াল জগত হচ্ছে এমন এক জগত যেখানে মানুষে মানুষে সংযোগ ঘটে কম্পিউটার,মোবাইল তথা যন্ত্রের সহযোগিতায়। ভার্চুয়াল ওয়ার্ল্ড বা ভার্চুয়াল জগত পরিভাষাটি প্রথমবার ব্যবহার করেন উইলিয়াম গিবসন। তিনি হচ্ছেন সায়েন্স ফিকশনের বিখ্যাত লেখক। মানুষে-মানুষে যে যোগাযোগ ও লেনদেন তা বাস্তব জগতের বিপরীতে বিশ্বজনীন এবং এখানে একজন ব্যক্তি পরিচয় গোপন রাখতে পারে। এই জগতের নির্দিষ্ট সীমা-পরিসীমা নেই। আমরা যে ইন্টারনেট ব্যবহার করি তা সম্পর্কে একটু চিন্তা করলেই এই বাস্তবতা উপলব্ধি করা সম্ভব। বিশ্বের নানা প্রান্ত থেকে কোটি কোটি মানুষ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম, ইমেইল ও চ্যাটরুমের মাধ্যমে ভার্চুয়াল জগতে তৎপরতা চালান।ইন্টারঅ্যাকশন  হচ্ছে ভার্চুয়াল জগতের অন্যতম প্রধান বৈশিষ্ট্য। যেখানে একসঙ্গে পরস্পরকে দেখা যায়,কথা বলা যায়,লিখে বা না লিখে মনের ভাব প্রকাশ করা যায়। রেডিও,টিভি ও পত্রপত্রিকার মতো গণমাধ্যমে যা সম্ভব নয়। বিশ্বায়নের যুগে এই জগতে প্রতিনিয়ত পরিবর্তন ঘটছে। তথ্য ও যোগাযোগ সংক্রান্ত প্রযুক্তির সহযোগিতায় এসব ঘটনা ঘটছে। ভার্চুয়াল জগত মানুষের সামনে এমন সব দিগন্ত খুলে দিয়েছে যা জ্ঞান-বিজ্ঞানের উন্নয়ন এবং সচেতনতা বৃদ্ধিতে কাজে লাগানো সম্ভব। ভার্চুয়াল জগতের নানা ইতিবাচক দিক থাকলেও এর বিপদের মাত্রাও কম নয়। এই জগতে তৎপর সব শ্রেণির মানুষেরই বিপদে পড়ার আশঙ্কা রয়েছে। কারণ বাস্তব জগতের মতো ভার্চুয়াল জগতেও তৎপর রয়েছে নানা পর্যায়ের অপরাধী। যারা ভালো মানুষের ছদ্মবেশে প্রতিনিয়ত মানুষের ক্ষতি করে যাচ্ছে। কখনো হাতিয়ে নিচ্ছে মানুষের সর্বস্ব। 

একটা সময় ছিল ঘুম থেকে উঠে আমরা ফ্রেশ হয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে বা বসে পত্রিকার পাতায় চোখ রাখতাম আর আজ ঘুম থেকে উঠে বিছানার মধ্যে বসে থেকে ফেসবুকে চোখ থাকে।
ভার্চুয়াল জগতের কারণে বাবা-মা এবং শিশুদের মধ্যে দূরত্ব বাড়ার ধরণটা এতটাই ভয়াবহ যে,ছুটির দিনে কোথাও বেড়াতে গিয়েও শিশুরা মোবাইল নিয়ে ব্যস্ত থাকে। আনন্দের মুহূর্তগুলো সঠিকভাবে উপভোগ করার অনুভূতিই যেন মরে যাচ্ছে ভেতর থেকে। এমত অবস্থায় বাবা-মা,শিক্ষক ও অভিভাবকদের উচিত বর্তমান প্রজন্মের তরুন তরুনীর ও শিশুদের ভার্চুয়াল জগতের নেতিবাচক প্রভাব থেকে নিজ নিজ সন্তানদের দূরে রাখার সর্বাত্মক চেষ্টা চালানো।

ভার্চুয়্যাল জগতের সাথে অবশ্যই সম্পর্ক রাখা দরকার কারণ কিছু পজিটিভ দিক অবশ্যই রয়েছে যেমন ভিডিও কল, অনলাইন ক্লাস রুম ইত্যাদি আরো অনেক কিছু। কিন্তু একটা ব্যালান্সড রিলেশন রাখা উচিত বলে আমার মনে হয়। লিমিটের বাইরে কোনো কিছু ব্যবহার করলে সেটাতো অবশ্যই মানসিক ও শারীরিক দুটো স্বাস্থ্যের পক্ষেই ক্ষতিকর।

পরিশেষে একটাই কথা বলার -
 "থাকো যে জগতেই,দিনের কিছু সময় নিজের সাথে কাটিও
 তবেই বুঝতে পারবে তুমিও যে অনন্য ও অদ্বিতীয়।"

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বুধবার, ২০ এপ্রিল, ২০২২

শিরোনাম - বাড়িয়ে দাও তোমার হাত ✍️ডা: অরুণিমা দাস


গল্প ১: সোমবারের নাইট ডিউটি, মোটামুটি সারারাত কাজ করে গল্প ঠিক তৈরি হয়েই যায়। রাত আটটায় হ্যান্ডওভার নিতে গিয়ে বুঝলাম আজও আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন নয়। সার্জারিতে আটটা কেস পেন্ডিং। বুঝলাম ঘুম আজ আর ভুল করেও আসবে না আমার চোখে। সার্জারি একটা কেস আন্ডার করেছি,নিউরোসার্জারির দিদি এসে বললো হাইড্রসেফালাস এর বাচ্চা এসেছে একটা।
বুঝলাম আজ সত্যিই সারা রাতের মামলা। সার্জারি কেস একটু স্টেবল হতে নিউরো ওটিতে দৌড়ালাম। গিয়ে দেখি একটা চার বছরের বাচ্চা ওটির দরজার দিকে হাত বাড়িয়ে কাঁদছে,বুঝলাম মাকে খুঁজছে। বাইরে গিয়ে বাচ্চার মাকে সব বুঝিয়ে হাই রিস্ক কনসেন্ট ফর্ম সাইন করালাম। বাচ্চার মা আমার হাত ধরে বললো এই নিয়ে চারবার ওটি হচ্ছে ওর, একটু দেখবেন। কী আর বলবো! ভাষা খুঁজে পেলাম না সান্তনা দেওয়ার। হাইড্রোসেফলাস যে পুরোপুরি সারার নয়,ভেনট্রিকুলো পেরিটোনিয়াল সান্ট করেই সারাজীবন চলতে হবে। খালি বললাম চিন্তা করবেন না। হাতটা মুক্ত করে চলে এলাম। ঘন্টাখানেক পর ওটি শেষ হলে বাইরে রিকভারিতে বাচ্চা টাকে রাখা হলো। অল্প অল্প চোখ খুলছে। মাথাটা এত বড় যে চোখ খুলতেও পারছেনা ঠিক করে। ওর সাথে গিয়ে কথা বলে এলাম। বাচ্চাটার মা বললো আপনাদের ভরসার হাত না থাকলে চারবার ওটির ধাক্কা ও কিভাবে সামলাতো জানি না। বললাম চিন্তা করো না,ওর মনে লড়াই করার জন্য একটা অদম্য ইচ্ছে আছে,সেটাই ওকে জিতিয়ে দেবে। বলে হেসে বেরিয়ে গেলাম, নেক্সট কেস ওয়েটিং যে।

 গল্প ২: এটাও গতরাতের গল্প, সার্জারির একটা কেস পেপটিক পারফোরেশন। গিয়ে দেখি ছত্রিশ বছরের একটা লোক পেট ব্যথায় কাতরাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম প্রতিদিন কতো পেগ চলে? কিছুক্ষন চুপ করে রইলো, তারপর বললো ওই একদিন ছাড়া ছাড়া খাই। বললাম পেট তো ফুটো করে ফেলেছ এই বয়সেই। বললো আমি ভালো হয়ে যাবো তো? বাড়িতে বউ,মেয়ে,বাবা,মা আছে। আর আমি একাই উপার্জন করি সংসারে। জ্ঞান তো ভালোই আছে দেখছি, তাহলে এসব খাও কেনো?
তোমার হাতে যখন সংসারের দায়িত্ব তাহলে সেই হাতকে পঙ্গু হতে দিওনা। ওরা তোমায় ভালোবাসে,ভরসা করে। ভরসার হাতটা সরিয়ে নিওনা। যাইহোক প্রপার কাউন্সেলিং করে কেস আন্ডার হলো। তিনঘণ্টা ধরে ওটি চলার পর ভগবানের আশীর্বাদে আর প্রপার ইন্ট্রাওপারেটিভ মনিটরিং এর জন্য ওকে রিভার্স করতে পারলাম। রোগী ওটি থেকে বেরোনোর আগে বললো আর ওসব ছোঁব না। শুনে হাসলাম,জানি এই ক্রেভিং এমন যে সহজে ও অ্যালকোহল ছাড়তে পারবেনা। বাড়ীর লোককে পোস্ট অপ রিহ্যাব এর অ্যাডভাইস দিয়ে রাত তিনটের দিকে রেস্ট রুমে চলে এলাম।

 গল্প ৩: রেস্টিং রুমে গিয়ে দেখি কেক সাজানো হয়ে গেছে, সিনিয়র আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আজ থার্ড য়ার দিদির লাস্ট দিন ডিউটির। একমাস পর ওর এমডি ফাইনাল এক্সাম। প্রথম যখন ডিউটি পড়েছিল দিদিকে খুব ভয় পেতাম। কোনো ড্রাগস, ডোজ,ডাইলিউশন কিছু জানতাম না। বই পড়েও কিছু বুঝতে পারতাম না। দিদির হাত ধরেই সব শেখা হলো আসতে আসতে। দিদি বললো আর একমাস পর তুই থার্ড ইয়ার,এতদিন হাতে ধরে যা শিখিয়েছি কিছু ভুলিস না যেনো। দিদির হাত ধরে বললাম তোমার সাথে কাজ করে কনফিডেন্স পেয়েছি অনেক,এখন একাই সব কাজ করি। গর্বের ছোঁয়া দেখতে পেলাম দিদির চোখে মুখে। চলো কেকটা কেটে ফেলো। আজকের দিনে আর ইমোশনাল হয়োনা। আরও একটা বছর আমাকে কাটাতে হবে, তোমার কথা খুব মনে পড়বে গো। দিদি ছুরি বসিয়ে ফেলেছে ততক্ষনে কেকের ওপরে, আমি আর আর এম ও ম্যাম অল দ্য বেস্ট উইশ করলাম দিদিকে। সত্যিই দিদি কাজ শেখার জন্য হাত না ধরলে অনেক কিছুই অজানা থেকে যেতো।
দিদি চলে গেলো, নেক্সট ইয়ার আমিও বেরিয়ে যাবো,আমার জুনিয়র কে কিছু শিখিয়ে যাবো আর শিখবো ও নতুন অনেক কিছু। সিনিয়রিটি পরম্পরায় এরকম ভরসার হাত  ধরে এগিয়ে চলুক জুনিয়ররা। আর দিদির হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাস দেওয়া কমপ্লিমেন্ট "উইথ মাই হার্ড ওয়ার্কিং অ্যান্ড বেস্ট জুনিয়র" এই কথাটাই পরম প্রাপ্তি পোস্ট গ্রাজুয়েশন পিরিয়ডে। অল দ্য বেস্ট দিদি ফর ইউর আপকামিং এক্সাম। সোমবার রাতের গল্প শেষ হলো। জানলা দিয়ে আলো আসছে, আর রাত কোথায়? সকাল আটটা বেজে গেছে। ডিউটি রুম থেকে বেরিয়ে হাঁটা দিলাম হস্টেলের পথে। আবার যে ডিউটি আছে সাড়ে নটা থেকে। এই রাত খুব স্মরণীয় হয়ে থাকবে আমার কাছে।

সত্য ঘটনা অবলম্বনে

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

ছবির সাথে কতটা গেলো জানি না। মন চাইলো, তাই লিখে ফেললাম।

সোমবার, ১১ এপ্রিল, ২০২২

#নাম ― 'বিদেহী আত্মা স্মরণে'। ✍🏼 মৃদুল কুমার দাস।

             ।। লতা মঙ্গেশকর।।
                 (১৯২৯ – ২০২২)
 শতবর্ষ থেকে একবছর দূরে 'মেরী আওয়াজ হি পেহচান হ্যায়' -এর কিন্নরকন্ঠী নাইটিঙ্গল, বহুকন্ঠের এককন্ঠী মেলডি লতাজীর জীবনাবসান ভারতীয় জীবনধারার কাছে মর্মান্তিক দুঃখের, কিন্তু সুখের বিষয় তিনি থেকে যাবেন প্রজন্মবিস্তারিত হয়ে। 
 সঙ্গীত জগতে প্রথম পদার্পণ মারাঠি ভাষায় গান দিয়ে। তারপর হিন্দি, বাংলা সহ ছত্রিশটি আঞ্চলিক ভাষায় তৎসহ পাশ্চাত্য সঙ্গীতে অবদান ভবি ভোলার নয়। তাঁর কন্ঠে ত্রিশ হাজার গান আছে,যা কোনো কন্ঠশিল্পীর নেই। বাঙালির প্রিয়জন। হেমন্ত-লতার যুগলবন্দী অনবদ্য ছিল। এমনকি হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে এমনই ঘণিষ্ঠ সম্পর্ক ছিল হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের মেয়ে রানুর জন্মের আগে স্ত্রী বেলা দেবীকে সাধ ভক্ষণ করিয়েছিলেন।
    এমন আত্মীয় পেয়ে দুর্লভ সৌভাগ্যের অধিকারী হয়েছে বাঙালি। বাংলার তাঁতের শাড়ী,বাংলা কথাসাহিত্যের বিশেষ করে শরৎচন্দ্রের উপন্যাসের অন্ধ ভক্ত ছিলেন। শরৎচন্দ্র মারাঠা অনুবাদে পড়তেন। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সঙ্গে ছিল ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক। হেমন্ত মুখোপাধ্যায়ের সুরে সবচেয়ে বেশী গান গয়েছিলেন। এছাড়াও সুধীন দাশগুপ্ত,রবীন চ্যাটার্জি, সলিল চৌধুরীর সুরে গান গেয়েছিলেন। বাঙালি কানে তাঁর কন্ঠে গাওয়া গান বাঙালির কানে যেন অমৃতসুধা। যেমন ―
  হেমন্ত মুখপাধ্যায়ের সুরে বন্দেমাতরম্ গান হয়ে গেছে কালজয়ী,কালজয়ী বাংলা গান –
 একবার বিদায় দে মা...,সাতভাই চম্পা..., বৃষ্টি বৃষ্টি এ কোন অপরূপ সৃষ্টি...,অন্তবিহীন কাটে না যে দিন..., আমি চিরদিন তোমারই থাকব...,ও মোর ময়না গো...,ঘুমঘুম নিঃঝুম রাতের মায়ায়...
  হিন্দিতে কালজয়ী গান ― সত্যম শিবম সুন্দরম...,আ গলে লাগ যা....
 তাঁর কাছে বাঙালি মাত্রেরই ঋণ অপরিশোধ্য। ঋণ অন্তহীন। তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধা।
               
             ।। সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় ।।
                 (১৯৩১ ― ২০২২)

   বাংলা সঙ্গীতের আকাশে সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় সন্ধ্যাতারা। বাবা নরেন্দ্র মুখোপাধ্যায়। মা হেমলতা দেবী। ছয় সন্তানের কনিষ্ঠ সন্ধ্যা। সঙ্গীত ঘরানায় মানুষ। মাও ভাল গান গাইতেন। তবে বাবার কাছে ভক্তিমূলক গান ― "প্রভু যে তুমি দাও দরশন" ― দিয়ে গানের ভূবনে যাত্রা শুরু করেন। মাত্র বারো বছরের সদ্য কিশোরী। এলেন কলকাতা বেতার ভবনে গল্পদাদুর আসরে। প্রথম গান গাইলেন গীতিকার অজয় ভট্টাচার্যের কথায় ও সুরে – "যদি না ফুরাল গান/ করিল দুয়ারে লতা/ নয়নে আছে গো জল।" পেলেন হাতে পাঁচটি টাকা। প্রথম রোজগার। সে কি আনন্দ! সেই যে শুরু সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় মানেই "এ শুধু গানের দিন...।" সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায় মানেই বাঙালির আবেগ,বাঙালির ভালবাসা।
  ১৯৪৬ এ গিরিন চক্রবর্তীর কথায় ও সুরে তের বছর দশ মাস বয়সে প্রথম রেকর্ড ― "তোমার আকাশে ঝিলমিল করে...।" ১৯৪৮ এ রাইচাঁদ বড়ালের সুরে 'অঞ্জনগড়' ও রবীন চট্টোপাধ্যায়ের সুরে 'সমাপিকা'য় প্রথম নেপথ্য গান গেয়ে সিনেমা জগতে উজ্জ্বল হয়ে উঠলেন। রবীন্দ্রসঙ্গীত,নজরুলগীতি, চলচ্চিত্রের আধুনিক গান একদিকে,অন্যদিকে উচ্চাঙ্গ সঙ্গীতের মধ্য দিয়ে অপ্রতিরোধ্য গতিতে ধেয়ে চললেন তিনি। 
  'অগ্নিপরীক্ষা', 'সবার উপরে','পথে হল দেরী' চলচ্চিত্রে নপথ্য কন্ঠে সুচিত্রা সেনের লিপে সে এক মণিকাঞ্চন যোগ যেন। ঠিক যেমন উত্তমকুমারের লিপে হেমন্ত মুখোপাধ্যায়। সলিল চৌধুরীর সুরে রকমারি সব গান ― "উজ্জ্বল এক ঝাঁক পায়রা..., ― কাটা কাটা  ছন্দে সলিল যেভাবে ধরেন,সন্ধ্যা সেভাবে ছবি আঁকেন। 'সপ্তপদী'-র  "এই পথ যদি না শেষ হয়..." কিংবা 'নায়িকা সংবাদ'–এ "কি মিষ্টি দেখো মিষ্টি..." কালজয়ী হয়ে আছে। তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখা – "মধুর মধুর বংশী বাজে..",বা যতীন্দ্রনাথ সেনগুপ্তের - "থই থই শাওন এল ওই...", 'মায়ামৃগ' ছবিতে – "ও বক বক বক বকম বকম পায়রা..", 'জয়জয়ন্তী ছবিতে – "আমাদের ছুটি ছুটি...", নচিকেতা ঘোষের সুরে ― "মায়াবতী মেঘে এল তন্দ্রা...", 'চিরদিনের' ছবিতে মান্না দে-র সঙ্গে দ্বৈত কন্ঠে– "আমি তোমার চিরদিনের..." আরো কত কত অজস্র গান বাঙালির শ্রুতিতে মুগ্ধতায় ভরিয়ে রেখেছিলেন। উস্তাদ বড়ে গোলামের কথায় ― "দেখো বেটা, এক ভাগ শিখনা হ্যায়,তিন ভাগ শুননা হ্যায়।"― এটাই তাঁর জীবনের মূলমন্ত্র ছিল। সারাদিন তিনি গান শুনতেন। রেওয়াজ করতেন। তিনি নশ্বর দেহে আর নেই, কিন্তু আছেন সুরের ঠিকানায় আম বাঙালির হৃদয়ে। তাঁর কাছে বাঙালি অন্তহীন ঋণী। তাঁকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা।
           *****
            ।। 'শাঁওলি মিত্র' ।।
                (১৯৪৮ ― ১৯২২)
   
বিখ্যাত বাবা ও মায়ের সন্তান বিখ্যাত হন,ব্যতিক্রম দু'একটি ছাড়া। বাবা শম্ভু মিত্র, মা তৃপ্তি মিত্রের একমাত্র সন্তান শা়ঁওলি মিত্র মাত্র চুয়াত্তর বছরে হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে শবদেহ হলেন। সিরিটি মহাশ্মশান যখন ত়াঁকে ধারণ করল তখন ত়াঁর পাশে ছিলেন একমাত্র মানসপুত্র সায়ক চক্রবর্তী ও মানসকন্যা অর্পিতা ঘোষ। তাঁর তাই নির্দেশ ছিল ইচ্ছাপত্রে - "তাঁর শবদেহকে যেন অযথা ফুলের মালার বোঝা বইতে না হয়। দাহ হওয়ার পর যেন সবাই জানতে পারে।" এমন ইচ্ছা পিতা শম্ভু মিত্রের মত,এও যেন পিতার কাছ থেকে  নির্দেশ পাওয়া। বাপের বেটি তো! এই নীরবে চলে যাওয়াটা আমাদের কাছে অনুভূত হল তিনি বড্ড অকালে চলে গেলেন। বারে বারে নিজস্ব পরিসরে বিশ্বাস নিয়ে গড়া সম্পর্কের ভাঙন শাঁওলি মিত্রকে একা করে দিত। শাঁওলি মিত্র আমাদের রিক্ত করে কোন পরপারে চলে গেলেন তাঁর স্পষ্টতম ও মিষ্টতম বাংলা বলাটিকে নিয়ে।
   ঋত্বিক ঘটকের 'যুক্তি তক্ক আর গপ্প' চলচ্চিত্রে বঙ্গবালা চরিত্র দিয়ে যাত্রা শুরু। মঞ্চে প্রথম পদার্পণ রবীন্দ্রনাথের 'ডাকঘর' নাটকের অমল চরিত্র রূপায়ণ দিয়ে। আর দেখতে দেখতে বাংলা নাট্যমোদি দর্শকের কাছে তিনি শাঁওলির চেয়ে 'নাথবতী অনাথবৎ' নামে বেশী আদরনীয় হয়ে গেলেন। জীবনের শ্রেষ্ঠ অভিনয় - 'নাথবতী অনাথবৎ'–এর শুরু তবলাতরঙ্গ বেজে ওঠা দিয়ে। বাজছে মন্দিরা, মৃদঙ্গ। মঞ্চে সার বেঁধে বসা জুড়ির দলের দিকে মুখটি ফিরে তিনি। একটা কালো কাঠের জলচৌকির ওপরে দুলছে একটা লম্বা বেণী। একটি আলতারাঙা পায়ের নূপুর তাল রাখছে ছন্দে। জুড়ির দল গান ধরেছে, গানের শেষে কথক ঠাকরুণ পেন্নাম করে বলে উঠলেন ‘‘এক অভাগিনী মেয়ের কথা! রানি, কিন্তু রানি নয়!
 'নাথবতী অনাথবৎ’ -এ এমন কুশলী অভিনয় দেখে নাট্য রসবেত্তা মাত্রেরই মনে বিস্ময়ের ঢেউ আছড়ে পড়ে। এই নাট্যবাংলার ইতিহাসে পেশাদার রঙ্গালয়ের বাইরে একমাত্র ‘নীলদর্পণ’ ছাড়া এত সাড়া-জাগানো অভিনয় আর হয়েছে কিনা সন্দেহ! একবার এক ঘটনা ঘটেছিল - মা তৃপ্তি মিত্র হঠাৎ অসুস্থ। তখন তিনি কলকাতার বাইরে নাথবতীর এক নাট্যশো শেষে সেই অবস্থায় মেকাপ না তুলে মাকে দেখতে ছুটে এলেন। মেক আপ তোলার সময়টুকু পর্যন্ত দিতে চাননা,কারণ পরের শো আছে বলে। 
   আর 'ডাকঘর' মঞ্চাভিনয় করার সময়ও ঘটনা যা ভোলার নয় - ছোটবেলা খুব অসুখে ভুগতেন। একবার তিনি জ্বরে শয্যাশায়ী। মা তৃপ্তি মিত্র 'ডাকঘর' নাটক বিছানায় দিয়ে বললেন- "তোকে অমলের অভিনয় করতে হবে।" সেদিন সেই নাটকটি পড়ে ছোট্ট শাঁওলি খুব কেঁদেছিলেন। অমলের অভিনয়ে খুব সাফল্য পেয়েছিলেন। নাটকে ডেডিকেটরাই এমন ইতিহাস গড়ার সুযোগের সদ্ব্যবহার করে থাকেন। মেয়ে শয্যাশায়ী,ওই পারবে অমলের ভেতরটা দেখতে, এটাই তো মোক্ষম সময়।
   তাঁর মঞ্চসফল অভিনয় যেমন - 'পুতুল খেলা', 'একটি রাজনৈতিক হত্যা', 'হযবরল', 'কথা অমৃতসমান', 'লঙ্কাদহন', 'পাগলা ঘোড়া', 'পাখি', 'গ্যালিলিওর জীবন', 'যদি আর একবার'।
      সংগীত নাটকের জন্য অ্যাকাদেমিক পুরস্কার পান ২০০৩ এ,২০০৯ এ পদ্মশ্রী,২০১২ তে পান বঙ্গবিভূষণ। রাজনীতি থেকে শত যোজন দূরে থাকতেন। কিন্তু সিঙ্গুর ও নন্দীগ্রাম আন্দোলনের আন্যতম মুখ হয়ে উঠেছিলেন। মহাশ্বেতা দেবী চলে যাওয়ার পর বাংলা অ্যাকাদেমির তিনি দায়িত্ব নিয়েছিলেন। আবার একসময় স্বেচ্ছায় দায়িত্ব ছেড়েও দেন। তাঁর সম্পর্কে সফল মঞ্চাভিনেত্রী ও জাতীয় পুরস্কারে ভূষিতা সুদীপ্তা চক্রবর্তী এই অকাল প্রয়াণকে ঘিরে স্মৃতিচারণা করতে গিয়ে বলেছেন - "অনেক আদর পেয়েছি। অনেক ভালবাসা। আদর করে কত কি খাইয়েছিলেন। আমি তাঁর বন্ধু বিপ্লবকেতন চক্রবর্তীর মেয়ে! অনেক কিছু শিখেছি। মঞ্চাভিনয়ের খুঁটিনাটি। অবাক চোখে তাকিয়ে দেখেছি ত়াঁর অভিনয় সেই ছোট্টবেলা থেকে। আমার নাটক দেখে ফোন করে খুব প্রশংসা করেছিলেন। আনন্দে কেঁদেই ফেলেছিলাম। বড় হয়ে একসঙ্গে সিনেমায় একটা কাজ করার আর্জি নিয়ে গিয়েছিলাম। রাজি হননি। তাই আর একসঙ্গে কাজ করার বা একদম সামনে থেকে অভিনয় দেখার সৌভাগ্য হল না।" আর সেই সাথে বাংলা নাট্যমোদি দর্শকও বাঁচবে শুধু 'নাথবতী আনাথবৎ'-এর স্মৃতি নিয়ে। বাংলার নাট্যমোদী দর্শকের হৃদয়ে চির অম্লান। চির ঋণী। তাঁকে বিনম্র শ্রদ্ধা।
                      *****

            ।। বাপি লাহিড়ী ।।
              (১৯৫২ ― ২০২২)

       সত্তরেই সঙ্গীত দুনিয়া হারাল তার ঝকঝকে তাজা তরুণ বাপি লাহিড়ীকে। তরুণই তো। সত্তর কোনো বয়স নাকি! গান শুনতে শুনতে যখন সকলে প্রবল উন্মাদনায় মত্ত, হঠাৎ জীবনের মঞ্চ ছেড়ে যাওয়া,আর গানের মঞ্চে সুর তাল থমকে গেলে দর্শককে যেমন বিমর্ষতা গ্রাস করে এও তাই― অকাল বিদায় কাশ্মীর থেকে কন্যাকুমারী বাপির জন্য সমান বিমর্ষ।
   বাবা অপরেশ লাহিড়ী ও মা বাঁশরী লাহিড়ী দুই গুনী শিল্পীর সন্তান বাপি লাহিড়ী। স্বনামধন্য হবেন এ আর বিচিত্র কি। কিন্তু স্বনামধন্য হতে কম কাঠ খড় পোড়াতে হয়নি। বাবার গলদঘর্ম পরিশ্রম ছিল। সে পরিশ্রম বৃথা যায়নি, কারণ পিতা বুঝতেন গুনের কদর। মাত্র চার বছরে ভাল তবলা বাজাতেন বাপি। গুরু সামতাপ্রসাদ। তারপর একে একে পিয়ানোসহ বেশ কিছু বাদ্যযন্ত্রে খুব দক্ষ হয়ে ওঠেন। ১৯৬৪ তে মাত্র তের বছর বয়সে বাবার গানে সুর করলেন বাপি। এর পর এল ১৯৬৮ তে 'দাদু' ছায়াছবিতে সঙ্গীত পরিচালনার সুযোগ। এই ছবিতে আরো অনেকে ছিলেন সঙ্গীত পরিচালক,যেমন কালীপদ সেন,অনিল দত্ত সুবোধ রায় প্রমুখ। এর পর ১৯৭২ এ 'জনতার আদালত' ছবিতে এককভাবে সঙ্গীত পরিচালনা করলেন,যাতে গান গাইলেন অপরেশ লাহিড়ী ও বাঁশরী লাহিড়ী,এস প্রসাদ ও অমর পাল। কিন্তু বাবার কাছে মনের মত প্রত্যাশিত খ্যাতি আসছিল না দেখে বোম্বাই নিয়ে গেলেন। শুরু হল নতুন পর্ব। বাবার ছেলের জন্য খুব পরিশ্রম করলেন। কেননা বাপির প্রতিভার প্রতি বাবার অগাধ আস্থা ছিল বলে। আর সেই সূত্রে অচিরে ফল এল গানের কম্পিজিশন ঝোঁক থেকে। ১৯৭৩ এ প্রথম 'নানহা শিকার' হিন্দি ছবিতে সুরারোপ করলেন। ১৯৭৪ এ 'এক লড়কি বদনাম সি' ছবিতে কিশোরকুমার ও লতার গলায় – "রহে না রহে চাহে হাম অওর তুম...", ১৯৭৬ এ 'দিল সে মিলা দিল' ছবিতে – "ইয়ে ন্যায়না ইয়ে কাজল...", ১৯৭৭ এ 'আপ কি খাতির' ছবিতে– রবীন্দ্রসঙ্গীত "ফুলে ফুলে ঢলে ঢলে.." গানটির আদলে লতার গলায় গাওয়ালেন ― "রাজা মেরে তেরে লিয়ে...", ১৯৭৮ তে 'কলেজ গার্ল' ছবিতে কিশোরকুমারের গলায় গাওয়ালেন ― "পেয়ার মাঙ্গা হ্যায় তুমহি সে...", ১৯৭৯ তে 'মনোকামনা' ছবিতে নিজেই গাইলেন ― "তুমহারা পেয়ার চাহিয়ে...", ১৯৮১ তে 'জোস' ছবিতে আশা ভোঁশলেকে দিয়ে গাওয়ালেন ― "সব কুছ তো হ্যায়..." ইত্যাদি। এ তো গেল সঙ্গীত পরিচালক হিসেবে বাপির জনপ্রিয়তার কথা। 
 এর পর বাপি লাহিড়ীর হাত ধরে এল ডিস্কো জমানা। ১৯৮২ তে 'ডিস্কো ড্যান্সার' দিয়ে শুরু। সে এক উন্মাদনা বলে উন্মাদনা! একই ঘরানার 'ড্যান্স ড্যান্স' ছবিটিও। ঊষা উত্থুপের গলায়― "হরি ওম হরি..",সালমা আগার গলায় – "ঝুম ঝুম ঝুম বাবা..." সঙ্গীত পরিচালনার সে এক নতুন যুগ। 'নমক হালাল' ছবির কিশোর কন্ঠে ― "পগ ঘুঙ্গরু..." - এতে কাওয়ালির বিচিত্র প্রয়োগ লক্ষনীয়। এই ছবিতে আশা ভোঁশলের গলায় ―"জওয়ানি জানেমন..." আবার অন্য আঙ্গিকে। 'শরাবি' ছবিতে – "দে দে পেয়ার ...",গুন্ডে' ছবির ― "তু নে মারি এন্ট্রিয়াঁ...", 'ডার্টি পিকচার'- এ "উলাল্লা উলাল্লা..." বাপি জনপ্রিয়তায় অপ্রতিদ্বন্দ্বী। ১৯৮১ তে বিভূতি মুখোপাধ্যায়ের কথায় নিজের সুরে যে গানটি ― "আমি বিশ্বাস করি সঙ্গীতে/ তাই বিশ্বাস করি ভগবান/আমি এই পৃথিবীতে জন্মে জেনেছি /সঙ্গীত জীবনের আরেক নাম..." এটাই তাঁর জীবনের যেন মূলমন্ত্র। সঙ্গীত সম্পর্কে আসল উপলব্ধি। তিনি সমগ্ৰ দেশের স্বনামধন্য, বাঙালির জন্যও। তাঁকে জানাই বিনম্র শ্রদ্ধা। বিদেহী আত্মার  রইল শান্তি কামনা।
            *******

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...