গল্প ১: সোমবারের নাইট ডিউটি, মোটামুটি সারারাত কাজ করে গল্প ঠিক তৈরি হয়েই যায়। রাত আটটায় হ্যান্ডওভার নিতে গিয়ে বুঝলাম আজও আমার ভাগ্য সুপ্রসন্ন নয়। সার্জারিতে আটটা কেস পেন্ডিং। বুঝলাম ঘুম আজ আর ভুল করেও আসবে না আমার চোখে। সার্জারি একটা কেস আন্ডার করেছি,নিউরোসার্জারির দিদি এসে বললো হাইড্রসেফালাস এর বাচ্চা এসেছে একটা।
বুঝলাম আজ সত্যিই সারা রাতের মামলা। সার্জারি কেস একটু স্টেবল হতে নিউরো ওটিতে দৌড়ালাম। গিয়ে দেখি একটা চার বছরের বাচ্চা ওটির দরজার দিকে হাত বাড়িয়ে কাঁদছে,বুঝলাম মাকে খুঁজছে। বাইরে গিয়ে বাচ্চার মাকে সব বুঝিয়ে হাই রিস্ক কনসেন্ট ফর্ম সাইন করালাম। বাচ্চার মা আমার হাত ধরে বললো এই নিয়ে চারবার ওটি হচ্ছে ওর, একটু দেখবেন। কী আর বলবো! ভাষা খুঁজে পেলাম না সান্তনা দেওয়ার। হাইড্রোসেফলাস যে পুরোপুরি সারার নয়,ভেনট্রিকুলো পেরিটোনিয়াল সান্ট করেই সারাজীবন চলতে হবে। খালি বললাম চিন্তা করবেন না। হাতটা মুক্ত করে চলে এলাম। ঘন্টাখানেক পর ওটি শেষ হলে বাইরে রিকভারিতে বাচ্চা টাকে রাখা হলো। অল্প অল্প চোখ খুলছে। মাথাটা এত বড় যে চোখ খুলতেও পারছেনা ঠিক করে। ওর সাথে গিয়ে কথা বলে এলাম। বাচ্চাটার মা বললো আপনাদের ভরসার হাত না থাকলে চারবার ওটির ধাক্কা ও কিভাবে সামলাতো জানি না। বললাম চিন্তা করো না,ওর মনে লড়াই করার জন্য একটা অদম্য ইচ্ছে আছে,সেটাই ওকে জিতিয়ে দেবে। বলে হেসে বেরিয়ে গেলাম, নেক্সট কেস ওয়েটিং যে।
গল্প ২: এটাও গতরাতের গল্প, সার্জারির একটা কেস পেপটিক পারফোরেশন। গিয়ে দেখি ছত্রিশ বছরের একটা লোক পেট ব্যথায় কাতরাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম প্রতিদিন কতো পেগ চলে? কিছুক্ষন চুপ করে রইলো, তারপর বললো ওই একদিন ছাড়া ছাড়া খাই। বললাম পেট তো ফুটো করে ফেলেছ এই বয়সেই। বললো আমি ভালো হয়ে যাবো তো? বাড়িতে বউ,মেয়ে,বাবা,মা আছে। আর আমি একাই উপার্জন করি সংসারে। জ্ঞান তো ভালোই আছে দেখছি, তাহলে এসব খাও কেনো?
তোমার হাতে যখন সংসারের দায়িত্ব তাহলে সেই হাতকে পঙ্গু হতে দিওনা। ওরা তোমায় ভালোবাসে,ভরসা করে। ভরসার হাতটা সরিয়ে নিওনা। যাইহোক প্রপার কাউন্সেলিং করে কেস আন্ডার হলো। তিনঘণ্টা ধরে ওটি চলার পর ভগবানের আশীর্বাদে আর প্রপার ইন্ট্রাওপারেটিভ মনিটরিং এর জন্য ওকে রিভার্স করতে পারলাম। রোগী ওটি থেকে বেরোনোর আগে বললো আর ওসব ছোঁব না। শুনে হাসলাম,জানি এই ক্রেভিং এমন যে সহজে ও অ্যালকোহল ছাড়তে পারবেনা। বাড়ীর লোককে পোস্ট অপ রিহ্যাব এর অ্যাডভাইস দিয়ে রাত তিনটের দিকে রেস্ট রুমে চলে এলাম।
গল্প ৩: রেস্টিং রুমে গিয়ে দেখি কেক সাজানো হয়ে গেছে, সিনিয়র আমার জন্য অপেক্ষা করছে। আজ থার্ড য়ার দিদির লাস্ট দিন ডিউটির। একমাস পর ওর এমডি ফাইনাল এক্সাম। প্রথম যখন ডিউটি পড়েছিল দিদিকে খুব ভয় পেতাম। কোনো ড্রাগস, ডোজ,ডাইলিউশন কিছু জানতাম না। বই পড়েও কিছু বুঝতে পারতাম না। দিদির হাত ধরেই সব শেখা হলো আসতে আসতে। দিদি বললো আর একমাস পর তুই থার্ড ইয়ার,এতদিন হাতে ধরে যা শিখিয়েছি কিছু ভুলিস না যেনো। দিদির হাত ধরে বললাম তোমার সাথে কাজ করে কনফিডেন্স পেয়েছি অনেক,এখন একাই সব কাজ করি। গর্বের ছোঁয়া দেখতে পেলাম দিদির চোখে মুখে। চলো কেকটা কেটে ফেলো। আজকের দিনে আর ইমোশনাল হয়োনা। আরও একটা বছর আমাকে কাটাতে হবে, তোমার কথা খুব মনে পড়বে গো। দিদি ছুরি বসিয়ে ফেলেছে ততক্ষনে কেকের ওপরে, আমি আর আর এম ও ম্যাম অল দ্য বেস্ট উইশ করলাম দিদিকে। সত্যিই দিদি কাজ শেখার জন্য হাত না ধরলে অনেক কিছুই অজানা থেকে যেতো।
দিদি চলে গেলো, নেক্সট ইয়ার আমিও বেরিয়ে যাবো,আমার জুনিয়র কে কিছু শিখিয়ে যাবো আর শিখবো ও নতুন অনেক কিছু। সিনিয়রিটি পরম্পরায় এরকম ভরসার হাত ধরে এগিয়ে চলুক জুনিয়ররা। আর দিদির হোয়াটসঅ্যাপ স্ট্যাটাস দেওয়া কমপ্লিমেন্ট "উইথ মাই হার্ড ওয়ার্কিং অ্যান্ড বেস্ট জুনিয়র" এই কথাটাই পরম প্রাপ্তি পোস্ট গ্রাজুয়েশন পিরিয়ডে। অল দ্য বেস্ট দিদি ফর ইউর আপকামিং এক্সাম। সোমবার রাতের গল্প শেষ হলো। জানলা দিয়ে আলো আসছে, আর রাত কোথায়? সকাল আটটা বেজে গেছে। ডিউটি রুম থেকে বেরিয়ে হাঁটা দিলাম হস্টেলের পথে। আবার যে ডিউটি আছে সাড়ে নটা থেকে। এই রাত খুব স্মরণীয় হয়ে থাকবে আমার কাছে।
সত্য ঘটনা অবলম্বনে
©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন