শিরোনাম - আত্মহননের নেপথ্যে
✍️ ডা: অরুণিমা দাস
আত্মহনন কি তা হয়তো সহজ বাংলায় প্রায় সবাই বলতে পারবো। আত্মহনন হল স্বেচ্ছায় নিজের প্রাণ বিসর্জন দেওয়া।
অনেক আগে থেকেই আত্মহননকে নেতিবাচক দৃষ্টিতে দেখে সকলে। কিন্তু নেতিবাচক দৃষ্টিকোণ থেকে দেখার পরও আত্মহনন এখনো মানুষের মৃত্যুর অন্যতম প্রধান কারণ। এমন কি আমাদের দেশেও আশঙ্কা জনক হারে আত্মহত্যার হার বাড়ছে।
আজকের শব্দ দিনের বিষয় যখন আত্মহনন তখন বিষয়টিকে অন্য নিরিখে মানে মেডিক্যাল সায়েন্সের দৃষ্টিকোণ থেকে তুলে ধরার একটা প্রচেষ্টা করছি মাত্র।
এক গবেষণার রিপোর্ট অনুসারে, আত্মহনন করা মানুষের মধ্যে ৯০ শতাংশ মানুষ মানসিক স্বাস্থ্য সমস্যায় ভুগতে থাকে। এদিক থেকে বলতে গেলে আত্মহত্যার প্রধান কারণ হিসাবে এটাকে দেখা যায়। আর এ ব্যপারে আমাদের সচেতনতা প্রায় নেই বলতে গেলেই চলে।
শরীর খারাপ হলে যেমন নানা রকম লক্ষণ প্রকাশ পায় তেমনি মানসিক স্বাস্থ্য ভেঙে পড়লে বা মনের অসুখ হলে তারও নানা লক্ষণ দেখা যায় কিন্তু অজ্ঞানতার অভাবে আমরা সেদিকে দৃষ্টিপাত করি না। এটাই হচ্ছে সমস্যা। যদি সবাই নিজের নিজের মানসিক কাঠিন্য বজায় রেখে সব রকম পরিস্থিতির মোকাবিলা করে তাহলে ডিপ্রেশনের মত পরিস্থিতি এড়ানো যায়। কিন্তু মুখে বলা যতটা সহজ ততটা সহজ নয় কাজে করে দেখানো। এটাও মানতে হবে।
মেজর ডিপ্রেসিভ ডিসঅর্ডারের রুগীদের মাঝে সুইসাইডের প্রবণতা অনেকটা বেশী। এমনকি বাইপোলার ডিসঅর্ডার থাকলে অনেক ক্ষেত্রে সুইসাইডের প্রবণতা বাড়ে প্রায় ২০ শতাংশ। এছাড়া স্ক্রিজোফ্রেনিয়া,পারসোনালিটি ডিসঅর্ডার, অবসেসিভ কম্পালসিভ ডিসঅর্ডার(ওসিডি), পোষ্ট-ট্রমাটিক স্ট্রেস ডিসঅর্ডার (পিটিএসডি) সহ বেশ কিছু মানুষিক রোগে আত্মহত্যার প্রবনতা বাড়ে।
এছাড়া যাদের ফ্যামিলিতে আগে কেউ আত্মহত্যা করেছে,ড্রাগসহ বিভিন্ন নেশা জাতীয় দ্রব্যে আসক্ত, যদি কেও কোন ধরনের ড্রাগ অ্যাবইউজের শিকার হয়ে থাকে তাদের আত্মহত্যার ঝুঁকি বেশী থাকে। আত্মহননের প্রবণতা ঠেকাতে সামাজিক সচেতনতার পাশাপাশি বিপর্যস্ত ব্যক্তিকে মানসিক সহায়তা ও চিকিৎসা জরুরী। এজন্য প্রয়োজনে মানুষিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া জরুরী।আমাদের সবারই চোখ-কান খোলা রাখা জরুরী। হয়তো খুব নিকটজনের মনের ভেতর ভাঙনের ঢেউ ঢুকতে শুরু হয়েছে খালি একটু সচেতনতার অভাবে তা চোখে পড়ছেনা।
এবার দেখা যাক কিভাবে নিউরোট্রান্সমিটার আর হরমোনের তারতম্য মানসিক স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব ফেলে! কিছু কিছু হরমোন আছে যা মানসিক স্বাস্থ্য কে নিয়ন্ত্রণ করে। এগুলো হলো সেরেটোনিন, ডোপামিন আর নর এপিনেফ্রিন। এসব নিউরো ট্রান্সমিটার খুব সুক্ষ্য ভাবে কাজ করে মস্তিষ্কের ওপরে কিন্তু প্রভাব দীর্ঘমেয়াদি। তাই এগুলো সম্পর্কে একটু জেনে নেওয়া দরকার। ডোপামিন কে পজিটিভ আর সেরোটোনিনকে নেগেটিভ হরমোন বলা হয়ে থাকে। সেই হিসেবে যখন অবসাদ গ্রাস করে,কোনো কাজ করতে ইচ্ছে করে না তখন বলা হয় ডোপামিনের মাত্রা কম হয়েছে আর সেরোটোনিনের মাত্রা বেড়ে গিয়েছে। শুধু অবসাদই নয় স্লিপ সাইকেল ডিস্টার্ব হয় ইমোশনাল স্ট্যাবিলিটিও বিঘ্নিত হয়। নরএপিনেফ্রিন এর প্রভাব আবার মনের থেকে শরীরে বেশি পড়ে। শারীরিক দুর্বলতা, শরীরে জ্বালা ভাব এসব দেখা যায়।
এই অবসাদ গ্রস্ততা বা কাজে অনীহা এগুলো যদি সপ্তাহ দুয়েকের বেশি স্থায়ী হয় তাহলে ধরে নেওয়া হয় সেই ব্যক্তি মানসিক অসুখে আক্রান্ত।
টিনএজার দের মধ্যে আবেগ প্রবণতা বেশি দেখা যায়। ভূত ভবিষ্যত না ভেবে সিদ্ধান্ত নেয় তারা। ডোপামিন এই জন্যও দায়ী। আবার বয়:সন্ধি অতিক্রম করে নিলে তখন চিন্তা শক্তির বিকাশ ঘটে কিন্তু রিস্ক নেওয়ার প্রবণতা কমে। অনেকে আবার নিকোটিন, কেউ আবার নার্ভ স্টিমুলেটিং ড্রাগ ব্যবহার করে মস্তিষ্ক কে চাঙ্গা রাখতে। ইউফোরিক স্টেটে আসতে অনেকে এসব ব্যবহার করতে করতে এসবের প্রতি আসক্ত হয়ে পড়ে। আর ড্রাগ ডিপেন্ডেন্সি আত্মহননের অন্যতম একটি কারণ।
বয়স কালে আবার একাকীত্ব গ্রাস করে অনেকক্ষেত্রে। তখন নিঃসঙ্গ জীবন থেকে মুক্তি পেতে অনেকেই আত্মহননের পথ বেছে নেন। কিন্তু এটাও সঠিক পথ নয়।
এগুলোকে চেপে রাখার কোনো দরকার দেখি না। শরীর খারাপ হলে যেমন ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া হয় সেরকম মনের হাল খারাপ হলেও অবশ্যই মানসিক স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞের সাহায্য নেওয়া উচিত।
'এক হাত বাড়িয়ে সাহায্য চাও, দশ পা এগিয়ে আসবো সাহায্য করার জন্য।'
সাইকিয়াট্রিস্টরা বলছেন কোনো রকম উদ্বেগ, অ্যাংজাইটি,অবসাদ দেখা গেলে আর সেটা ক্ষণস্থায়ী না হলে আসুন আমাদের কাছে। আমরা খেয়াল রাখবো আপনার।
রোগ যখন আছে,দাওয়াইও আছে তার। প্রাথমিক ভাবে লাইফ স্টাইল চেঞ্জ, খাদ্যাভ্যাস পরিবর্তন এগুলো অনেক ক্ষেত্রে ইতিবাচক প্রভাব ফেলে। ডোপামিন লেভেল বাড়ানোর জন্য কাজুবাদাম, আমন্ড খাওয়া যেতে পারে। এছাড়া প্রাণিজ প্রোটিন, সবুজ শাকসবজি,ফল,ডার্ক চকোলেট, কফি এগুলোতে টাইরোসিন নামক অ্যামিনো অ্যাসিড থাকে যা ডোপামিন প্রোডাকশনে সাহায্য করে।
এটা গেলো প্রাথমিক চিকিৎসা। এতে যদি কাজ না হয় তাহলে এবার মেডিসিনের সাহায্য নেওয়ার দরকার পড়ে। মেডিসিন দেওয়ার আগে কিছু পরীক্ষার দরকার হয়ে থাকে।
এখন অনেক উন্নত মানের ইমেজিং টেকনিক এসে গেছে। ব্রেন ম্যাপিং করে ব্রেনের মধ্যে কি চলছে জানা যায়। নিউরো ইমেজিং টেকনিক এর সাহায্যে মস্তিষ্কের বিভিন্ন লোবের অবস্থা সম্পর্কে ওয়াকিবহাল হওয়া যায়। আর রক্তে ডোপামিন সেরেটোনিন নর এপিনেফ্রাইন এর লেভেল ও চেক করা যায়।
রোগের লক্ষণ দেখে প্রথম সারির মেডিসিন হিসেবে
সিলেকটিভ সেরোটোনিন রিসেপটর ইনহিবিটর চালু করা যেতে পারে যা অ্যান্টি ডিপ্রেসেন্ট হিসেবে কাজ করে। এছাড়া অ্যান্টি অ্যাংজাইটি ড্রাগ ও লাইট সিডেটিভ ড্রাগ ব্যবহার করা যেতে পারে।
ওষুধ খেয়ে কোনো সাইড এফেক্ট হলেও ডাক্তারের পরামর্শ নেওয়া উচিত।
মানসিক স্বাস্থ্য সম্পর্কে সচেতনতা বাড়াতে ওয়ার্ল্ড হেলথ অর্গানাইজেশন (WHO) ১০ ই সেপ্টেম্বর দিনটিকে বিশ্ব মানসিক স্বাস্থ্য সুরক্ষা দিবস হিসেবে অভিহিত করেছে।
সবাই যখন সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেওয়ার জন্য তৈরি আছেন তখন মনখারাপ হলে তাদের সাহায্য নিন। মনের জটিলতা বাড়তে দেবেন না। আত্মহনন করে ঈশ্বর প্রদত্ত জীবনকে স্বেচ্ছায় নষ্ট করবেন না এটুকুই অনুরোধ সর্বসাধারণের কাছে।
"সুস্থ মনের চাবিকাঠি রয়েছে যে হরমোনে
প্রকাশ করো মনের কথা,রেখোনা কিছু মনের কোণে।"
©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস