শিরোনাম - নিঃসঙ্গতা ও একটা বাড়ী
✍️ ডা: অরুণিমা দাস
বাড়ীর সামনের বাগানে বসেছিলেন মিনতি দেবী। ওনাকে বাগানে ছেড়ে দিয়ে গেছে কাজের মেয়ে সুমনা। ছেলে প্রথম কয়েকদিন বিদেশে নিয়ে গিয়ে রাখলেও মন থেকে মানিয়ে নিতে পারেননি মিনতি দেবী। গাঁয়ের বাড়ির প্রতি টান আবার তাকে ফিরিয়ে নিয়ে এসেছে দেশে। নিঃসঙ্গ হলেও তাঁর বুকের ভিতর একটা পুরনো দিনের বাড়ির ছবি গাঁথা হয়ে আছে। যে বাড়িতে একসময় অনেক ঠাকুর চাকর ছিলো, নায়েব গোমস্তা ছিল। গমগম করতো সারাদিন। তারপর একসময় জমিদারী উঠে গেলো, ছেলে গাঁয়ের মায়া ত্যাগ করে বিদেশে পাড়ি জমালো। কত কি মনে পড়ছে আজ মিনতি দেবীর! হঠাৎ পায়ের কাছে কিছু একটা এসে পড়লো। ঝুঁকে পড়ে দেখলেন একটা ক্রিকেট বল পড়ে আছে। দাও না গো বল টা! একটা বাচ্চা সামনে এসে বললো। বল টা তুলে দিলেন বাচ্চাটার হাতে। নাম জিজ্ঞেস করায় বললো টুটুল আমার নাম।
-তা টুটুল বাবু রোজ খেলা হয় নাকি?
-হ্যা খেলি তো! রোজ বিকেলে খেলতে আসি।
-তাহলে আমার কাছেও এসো মাঝে মধ্যে। তোমার মত আমার একটা নাতি আছে। কিন্তু আমার কাছে থাকে না,খুব মনে পড়ে ওর কথা বুঝলে!
- আমারো ঠাম্মা আছে জানো! কিন্তু আমাদের সাথে থাকে না। মা বলে ঠাম্মা বন্ধুদের সাথে আশ্রমে থাকে।
- মিনতি দেবী মনে মনে বললেন ও বৃদ্ধাশ্রম! বুঝেছি।
- কি বুঝলে?
- কিছু না কিছু না! যাও তুমি খেলতে যাও।
টুটুল চলে গেলো।
মিনতি দেবীর চারপাশের নিঃসঙ্গতা বলে উঠলো এই তো একটা কথা বলার লোক পেলে! ওর মধ্যে তুমি নাতি আর তোমার মধ্যে ও ঠাম্মাকে খুঁজে পেয়েছে।
কদিনে বেশ ভালো বন্ধুত্ব হয়ে গেছে মিনতি দেবী আর টুটুলের মধ্যে। টুটুল একদিন পুরো বাড়ীটা ঘুরে ঘুরে দেখছিল। ফ্ল্যাট বাড়ীতে থাকতে থাকতে দম বন্ধ হয়ে আসে ওর। খুব ছোট জায়গা,এই শুরু হতে না হতেই শেষ হয়ে যায়। নিজের ঠাম্মা র কাছে দেশ বাড়ীর গল্প শুনেছে, এরকম একটা বাড়ীর ছবিই মনে মনে একেছিল কিন্তু যাওয়া হয়নি কোনোদিনই। আজ সেই গল্প গুলো একটু একটু করে সত্যি মনে হতে লাগলো।
ধীরে ধীরে টুটুল বড়ো হয়, মিনতি দেবীরও বয়স হতে থাকে। টুটুল কলেজে পড়তে যায় আর সেভাবে আসা হয়না মিনতি দেবীর কাছে। তবে রবিবার গুলো নিয়ম করে আসে টুটুল। ছেলের দেশে ফেরার সম্ভাবনা নেই জেনে তার সম্মতি নিয়ে টুটুলকে বাড়ীটা দান করেন মিনতি দেবী। বেশ কয়েক বছর পর সুপ্রতিষ্ঠিত টুটুল বাড়িটায় বানিয়েছে অনাথ আশ্রম। ওর ধারণা অনাথ শিশুদের বুকের মাঝেও নিশ্চয় এরকম একটা বাড়ীর স্বপ্ন ঘুমিয়ে আছে। আজ আর মিনতি দেবী নিঃসঙ্গ নন। বয়সের ভার তার শরীরকে ন্যুব্জ করলেও মনকে নাড়া দিতে পারেনি। অনাথ বাচ্চারা সেটা হতে দেয়নি। তাদের সাথে খুব আনন্দ করে দিন কাটান মিনতিদেবী। আজ আর বাড়ীটাও নিঃসঙ্গ নয়,একদল কচিকাঁচাদের সাথে সেও মেতে উঠেছে আনন্দে। টুটুলকে প্রাণ ভরে আশীর্বাদ করেন ওর মহৎ কাজের জন্য।
©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস