শিরোনাম_তবু মনে রেখো
কলমে_ডা: অরুণিমা দাস
বেশ অনেকদিন পর একটা বইমেলা শুরু হচ্ছে নীলু দের ছোট্ট শহরে। শহর বললেও ভুল হবে, আধা শহর আর আধা গ্রাম আর কি। তো এরকম জায়গায় মেলা খুব একটা হয় না, কিন্তু হলে সেখানে মানুষের ভিড় উপচে পড়ে। সে বই পড়ার জন্যই হোক বা খাওয়ার জন্যই হোক। নীলু শুনে ঠিক করলো মেলা যাবেই যেমন করে হোক,তাই পছন্দের বই সব লিস্টে রাখতে শুরু করলো। বন্ধু সোহমের সাথে প্ল্যান করলো যে কবে কখন যাবে এসব। বাড়িতে যখন জানালো মা বাবা বললেন যাও বন্ধুর সাথে ঘুরে এসো কিন্তু বেশি রাত কোরো না। প্ল্যান মত নীলু আর সোহম বেরিয়ে পড়লো মেলার উদ্দেশ্যে। প্রথমে বাস আর তারপর অটো করে পৌঁছলো মেলা প্রাঙ্গণে। বেশ ভালোই সাজিয়েছে মেলাটা, অনেক গুলো বইয়ের স্টল আর সাথে কিছু লিটল ম্যাগাজিনের স্টলও রয়েছে। সোহম হঠাৎ বলে উঠলো তিয়াস যদি থাকতো আজ খুব মজা করতো ও এখানে। নীলু শুনে বললো ওসব ভেবে কি করবি বল তো! ওর মায়াভরা চোখ টা মনে পড়লেই চোখের পাতা ভিজে আসে, মন ভার হয় রে খুব। লিখত তো বেশ ভালোই, কিন্তু কেউ যথার্থ মূল্যায়ন করলো না ওর লেখার। সেই অভিমানেই হয়তো চলে গেলো ও। এসব কথা বলতে বলতেই ওরা হাজির হলো একটা বইয়ের স্টলে। নিজের লিস্ট করা বইয়ের থেকে দুটো বই পেয়ে গেলো ওখানে নীলু। বই গুলো কিনে নিলো আর সোহম কে বললো আজ কিন্তু আমরা সব ম্যাগাজিনের দোকান গুলোতে যাবো। ওখানে শুনেছি নবীনদের লেখাকেও প্রাধান্য দেওয়া হয়। সোহম বললো হ্যাঁ যাবো তো নিশ্চয়ই রে। তিয়াস থাকলে ওর লেখাও আজ ছাপা হতো, আমি হান্ড্রেড পার্সেন্ট শিওর রে এই ব্যাপারে। নীলু বললো আমিও কনফিডেন্ট এই ব্যাপারে কিন্তু পাগল টা আর বুঝলো কই! আমাদের কে ছেড়ে চলেই তো গেলো। সোহম বললো আর ওর কথা মনে করিস না রে, কষ্ট বাড়বে বই কমবে না। ওর ডাইরি টাও যদি পেতাম রে খুব ভালো হতো। কিছু লেখা ছাপানো যেতো। কী বলিস রে নীলু? নীলু ঘাড় নাড়লো। তারপর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললো ছাড় ভাই, এসব ভেবে লাভ নেই কিছু। সময় যা নিয়ে গেছে সেসব চাইলেও ফিরে পাওয়া যায় না রে। চল আমরা মেলা ঘুরে দেখি আর কোথায় কি বই এসেছে! হ্যাঁ চল, সোহম বললো।
খানিক এগোনোর পর একটা ম্যাগাজিন স্টল চোখে পড়লো ওদের। স্টলের নামটা বেশ অন্যরকম।
"অপ্রকাশিত পাণ্ডুলিপি"। দোকানে গিয়ে ওরা দুজন বিভিন্ন রকম ম্যাগাজিন ঘাটতে লাগলো। দোকানের একজন এগিয়ে এসে বললো দু একটা লেখা পড়ে দেখতে পারেন কিন্তু। নীলু বললো এরকম নাম কেনো আপনাদের স্টলের?? উনি বললেন দেখুন অনেকেই আছেন যারা লেখেন ভালো, কিন্তু কদর পায় না তাদের লেখা। আমাদের টিম সেই সব লেখা সন্ধান করে আনে আর আমরা সেই লেখা গুলোকে প্রকাশ করে রূপ দিয়ে থাকি। নীলু বললো বাহ বেশ ভালো উদ্যোগ তো। "যদি সময় মত খোঁজ পেতাম আপনাদের! তাহলে হয় তো"... বিড়বিড় করলো নীলু। কিছু বলছেন? দোকানদার বললো। না না কিছু না, কিছু বলিনি। ও আচ্ছা, তাহলে দেখুন লেখা গুলো। খুব মন দিয়ে ম্যাগাজিনের লেখা গুলো দেখছিলো নীলু আর সোহম।
নীলু...অ্যাই নীলু!! কেউ যেনো ডাকলো মনে হলো, নীলু একবার ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলো পেছনে। কোই কেউ তো নেই! সোহম বললো কি রে? কী হলো? নীলু বললো কেউ যেনো আমার নাম ধরে ডাকলো। সোহম বললো কই কেউ নেই তো রে! তুই ভুল শুনেছিস হয়তো! হ্যাঁ রে, হতে পারে আমি ভুল শুনেছি। দেখ এই লেখাটা দেখ, একদম অন্য স্বাদের লেখা, সোহম বললো। কই কি লেখা দেখি! নীলু বললো। সোহমের হাত থেকে নিয়ে দেখলো লেখাটা। লেখা রয়েছে "মন খারাপের সময়ে লেখা যদি আসে ভেতর থেকে, বুঝবে তুমি সব দুঃখ জয় করে নিতে সক্ষম"। নীলু বললো এটা নিশ্চয় কোনো লেখকের লেখা প্রকাশ পাওয়ার অপেক্ষার জন্য লেখা। সোহম বললো হতেই পারে। নীলু আবার কিছুক্ষন পর একটা ডাক শুনতে পেলো, কানের কাছে কেউ ফিসফিস করে যেনো বললো অ্যাই নীলু... যা না আরেকটু ভেতরের দিকে, দেখ ঐ তাকে সবুজ যে বইটা ওর বারো নম্বর পেজে যা, দেখ লেখাটা পড়ে। নীলু সম্মোহিতের মত এগিয়ে গেলো সবুজ মলাটে বাঁধানো বইটা নিতে। বই খুলে বারো নম্বর পেজে চলে গেলো সোজা, দেখলো উপরে লেখা অধরা স্বপ্ন,নিচে লেখকের নাম তিয়াস। নীলু চমকে উঠলো,ডাকলো সোহম কে। সোহম ছুটে গেল নীলুর ডাকে। নীলু ওর দিকে বাড়িয়ে দিল লেখাটা। সোহম পুরোটা পড়লো, শেষ দুটো লাইন খুব মন ছোঁয়া, "অধরা স্বপ্নেরা দিচ্ছিল ধরা, আশায় ছিলাম লেখক হব কিন্তু ছোঁয়ার আগেই স্বপ্নগুলো,উপহাসের পাত্র হলাম। দুনিয়া থেকে তাই ছুটি নিলাম"। সোহম পড়ে বললো এটা তো আমাদের তিয়াসের লেখা। চল তো বিক্রেতা কে জিজ্ঞেস করি এই লেখা কোথায় পেলেন উনি? দুজনের প্রশ্নের উত্তরে বিক্রেতা জানালেন একজন ভদ্রলোকের সাথে ওনার ট্রেনে দেখা হয়েছিল, উনি কথায় কথায় জানতে পারেন যে আমরা লেখা সংগ্রহ করে ম্যাগাজিনে প্রকাশ করি। তাই উনি পরে আমার সাথে কন্টাক্ট করে একটা ছোট ডায়েরী তুলে দেন। আর বলেছিলেন ছেলে বেঁচে থাকতে তো তার লেখা পড়েও দেখিনি, সবসময় দুর ছাই করেছি। হয়তো সেই দুঃখেই সে আমাদের ছেড়ে চলে গেলো। ওর যাওয়ার পর যখন লেখা গুলো পড়লাম তখন বুঝতে পারলাম কি বড়ো ভুল করেছি? শুধু পড়াশোনা করেই যে বড়ো হওয়া যায় না, আরো অন্য ভাবেও যে নাম করা যায় সেটা যখন বুঝলাম অনেক দেরি হয়ে গেছে। নীলু সব শুনে বললো উনি তাহলে তিয়াসের বাবা হবেন।
আরে এই তো উনি এসে গেছেন দেখুন, বিক্রেতা ভদ্রলোক বললেন। নীলু আর সোহম পেছন ফিরে দেখলো ধুতি পাঞ্জাবি পরা এক ভদ্রলোক দাঁড়িয়ে। ওদের দেখে বললেন খুব চেনা লাগছে তোমাদের। নীলু আর সোহম নিজের পরিচয় দিল, জানালো তিয়াসের সাথে এক ক্লাসে পড়তো। এখন ওরা ক্লাস টুয়েলভ পাস করে কলেজে ভর্তির জন্য অপেক্ষা করছে। তিয়াস বেঁচে থাকলে আজ তোমাদের মত... আর শেষ করতে পারলেন না কথা গুলো, ঝর ঝর করে কেঁদে ফেললেন তিয়াসের বাবা। নীলু বললো এখন অনেকটা দেরী হয়ে গেছে কাকু, আগে যদি বুঝতেন এতো বড়ো ক্ষতি হতো না আর আমরা তিয়াস কে হারাতামও না। ও সত্যি খুব ভালো লিখত। অনেক কিছু দিতে পারতো লেখক সমাজকে,কিন্তু সেটা হতে দেওয়া হলো না। তিয়াসের বাবা মাথা নিচু করে দাঁড়িয়ে রইলেন।
ওই সবুজ মলাটে বাঁধানো বইটা কিনলো নীলু। এতে যে ওর বন্ধু তিয়াসের ছোঁয়া রয়েছে। বইটা নিয়ে নীলু আর সোহম বেরিয়ে পড়লো দোকান থেকে। কিছুটা এগিয়ে গিয়ে একটা বেঞ্চ দেখে ওখানে বসলো দুজন। সোহম বললো একটু জিরিয়ে নিই এখানে। অনেকটা হেঁটেছি রে। নীলুর হাতে ধরা সবুজ বইটা। হঠাৎ একটা পাতা উড়ে এসে পড়ল। বাতাস নেই তো সেরকম, পাতা এলো কোথা থেকে? সোহম বললো। দাঁড়া দেখছি, বলে নীলু পাতাটা তুলে ফেলতে যাবে এমন সময় পাতার ওপর একটা লেখা পড়লো ওর চোখে," আছি তোদের পাশে সবসময়, আমার লেখাকে যে তোরা দিয়েছিস সম্মান, ঋণী আমি তোদের কাছে চিরকাল" নিচে লেখা তিয়াস। সোহমকে লেখাটা দেখালো নীলু। সোহম পড়ে বললো কেনো যে চলে গেলো পাগলটা আমাদের ছেড়ে?? লোকের কথায় কেউ নিজের জীবন শেষ করে? নীলু বললো একটু যদি বাড়ির লোক ওকে বুঝতো, অকালে ওকে ঝরে যেতে হতো না রে। একটা দমকা হাওয়া বয়ে গেলো নীলু কে ছুঁয়ে, কানে যেনো কেউ বলে গেলো "মৃত্যুর পরে যে পেলো আমার লেখা স্বীকৃতি, এতেই খুশি আমি, আত্মার যে নেই কোনো ইতি" খুব ভালো থাকিস তোরা, আসি এখন আমি। নীলু যা শুনলো বললো সোহম কে। সোহম বললো কিছু ঘটনা সত্যিই আমাদের ব্যাখ্যার বাইরে। তিয়াস আজও আমাদের মধ্যেই আছে, বইমেলায় সশরীরে থাকতে না পারলেও ওর কায়াহীন ছায়া এসে দেখা করে গেলো আমাদের সাথে। যেখানেই থাক ও খুব ভালো থাকুক। চল বাকি মেলাটা ঘুরে নিই। হাঁটা লাগলো ওরা দুজন। নীলু বললো এই বইমেলা আমার জীবনের শ্রেষ্ঠ স্মৃতি হয়ে থাকবে রে। চল এগোই।
©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস