বুধবার, ২ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

ব্যারাম কি নৌটাঙ্কি


 ব্যারাম কি নৌটাঙ্কি
✍️ডা: অরুণিমা দাস 

অনিতা দেবীর জীবনের অনেক পুরনো সমস্যাটা আবার নতুন করে দেখা দিয়েছে। মাঝ বয়স পার হবার পর মাথার চুল গুলো পত্র পাঠ বিদায় নিতে পারলেই বাঁচে,এরম অবস্থা হয়েছিল। একমাত্র ছেলে তার কষ্টটা বুঝেছিল। নেট সার্চ করে,বান্ধবী অর্ঘমার  সাথে কনসালট করে দোকান থেকে দামী অ্যান্টি হেয়ার ফল শ্যাম্পু কিনে দিয়েছিল মাকে। সেটা ব্যবহার করে প্রথম তিন চার মাস ভালোই ফল পেয়েছিলেন অনিতা দেবী। স্বামী সমীর বাবুর কানটাও আরামে ছিল কদিন, গিন্নীর ঘ্যান ঘ্যানানি শুনতে হয়নি কটা দিন। 
কিন্তু দিন কতক হলো রোজ অনিতা দেবী কাদো কাঁদো মুখ করে আয়নার সামনে দাঁড়াচ্ছেন আর নিজের চুল পড়া নিয়ে স্বামীর মাথা খাচ্ছেন। সমীর বাবু বললেন বয়স হচ্ছে, দু একটা চুল না হয় উঠেই গেছে। এতে কি আর এমন সমস্যা হলো!! অনিতা দেবী ঝাঁঝিয়ে উঠে বললেন নিজের তো মাথা পরিষ্কার, তাই খুব করে চাও যাতে আমার চুল গুলো উঠে যাক, তাই না!! বুঝি সব বুঝি, হিংসুটে লোক একটা। আর দু একটা চুল নয়, রোজ পঞ্চাশ টা করে চুল উঠছে। ওয়েটিং ফর সেঞ্চুরী, বললেন সমীর বাবু। কি বললে?? চেঁচিয়ে উঠলেন অনিতা দেবী। না কিছু না, এই ক্রিকেট দেখছি, কোহলির সেঞ্চুরি র কথা বলছিলাম আর কি!! তা ছেলেকে বল, হবু বৌমা অর্ঘমার সাথে কনসাল্ট করে আবার যদি কিছু সাজেস্ট করে। হ্যা আমার ছেলে আর হবু বৌমাই বোঝে আমার কষ্টটা। ওর দেওয়া শাম্পু ইউস করেই অনেকটা চুল পড়া কমেছিল। আবার যে কি হলো!! দেখি আজ মেয়েটাকে কল করবো, যদি নতুন কিছু আইডিয়া দেয়। দেখো ওরা ব্যস্ত মানুষ, সামনে আবার বিয়ে, ওদের এসব নিয়ে এখন বিরক্ত কোরো না গিন্নী। তুমি চাও ছেলের বিয়েতে আমি ফাঁকা মাথায় ঘুরে বেড়াই, তাই তো?? তোমার যা মন চায় করো, এই চুল পড়া ব্যমোর জন্য কিছুদিন পর তোমার ছেলে বৌমাও তোমাকে টা টা বলবে। এসব শুনে কিছুক্ষন ফ্যাচ ফ্যাচ করলেন অনিতা দেবী। 
 দুপুর বেলা লাঞ্চ করে যখন সমীর বাবু ঘুমিয়ে পড়েছেন, সেই সুযোগে হবু বৌমা অর্ঘমা কে ফোন লাগলেন অনিতা দেবী। ওপাশ থেকে মিষ্টি গলা ভেসে এলো, বলো উড বি মাদার ইন ল!! শোনো না তুমি কি ব্যস্ত!! না না এই ডিউটি সেরে বাড়ী ফিরছি, বল না তুমি। নিজের দুঃখের কথা সবিস্তারে বললেন অনিতা দেবী। অর্ঘমা শুনে বললো আমায় তো অভি বললো তোমার চুল এখন অনেক কম পড়ছে। অনিতা দেবী বললেন তোমার দেওয়া শ্যাম্পু আর সেরাম না কি সব! ব্যবহার করে অনেক কমেছিল চুল পড়া, কিন্তু জানো দিন ছয়েক হলো আবার সমস্যাটা বেড়েছে। ওই শ্যাম্পু ইউস করেও কিছু হচ্ছেনা আর। আর অভির বাবা কান দিচ্ছে না আমার কথায়। তুমি আর অভি ছাড়া কেউ বোঝে না আমার কষ্ট। আচ্ছা কেঁদো না তুমি, আমি একটু ফ্রেন্ডস দের সাথে কথা বলে নিই তারপর তোমায় জানাচ্ছি। আচ্ছা, বলে ফোন রেখে দিলেন অনিতা দেবী। যাক আসল জায়গায় সমস্যা বলে দিয়েছি, এবার সমাধান নিশ্চই দেবে অর্ঘমা। 
এদিকে অর্ঘমা বন্ধুদের সাথে কথা বলে জানতে পারলো যে প্রথম প্রথম শ্যাম্পু ভালো কাজ করলেও কিছুদিন পর রেজিস্ট্যানসের জন্য আবার পুরোনো অসুখ ফিরে আসে। ওর বন্ধু এবার ওকে দামী হারবাল শ্যাম্পু আর স্পেশাল হেয়ার কন্ডিশনার সাজেস্ট করে। অর্ঘমা সব নোট করে নেয় আর ফোন লাগায় হবু মাদার ইন ল কে। অনিতা দেবী ফোন ধরতেই অর্ঘমা বলে রেডী হয়ে নাও, আমি আধঘন্টার মধ্যে আসছি, তোমায় নিয়ে শপিং যাবো। আর তোমার সমস্যার জন্য নিউ সলিউশন পেয়েছি, রাস্তায় যেতে যেতে সব বলবো। আধ ঘন্টার মধ্যে গাড়ি নিয়ে হাজির অর্ঘমা। সমীর বাবুকে না জানিয়ে বেরিয়ে পড়লেন অনিতা দেবী। ডাইনিং টেবিলে রেখে গেলেন একটি চিরকুট। রাস্তায় যেতে যেতে অর্ঘমা অনেক সান্তনা দিল হবু স্বামীর মাকে। তারপর শপিং মলে গিয়ে দেদার কেনা কাটা। স্পেশাল শ্যাম্পু কন্ডিশনার সব কেনা হলো। সাথে নিজের কিছু সাজগোজের জিনিস, হেয়ার কেয়ার প্রোডাক্ট কিনলো অর্ঘমা। তারপর সোজা অনিতা দেবীকে বাড়িতে নামিয়ে দিয়ে জিনিস পত্র পৌঁছে দিয়ে অর্ঘমা চলে গেলো নিজের বাড়ী। বাড়ি ঢুকতেই সমীর বাবুর একগাদা প্রশ্নের সম্মুখীন হলেন অনিতা দেবী। সব খুলে বলার পর সমীর বাবু বললেন সেই মেয়েটাকে বিরক্ত করলে তুমি!! আহা মেয়েটা খুব ভালো গো, আমার কষ্টটা বুঝেছে, এবারে সব অন্য জিনিস কিনে দিয়েছে। বললো এগুলো ইউস করো, চুল পড়ার সমস্যা কমে যাবে। রাতে অভি বাড়ি ফিরতেই অনিতা দেবী সব বললেন। শুনে অভি বললো, বেশ তো!! এবার তোমার বৌমা কে নিয়েই বেরিয়ে পড়তে পারো মাঝে মাঝে।রাতে অভি অর্ঘমাকে মেসেজ করলো আমার মায়ের এত টা খেয়াল করার জন্য অনেক ধন্যবাদ তোমাকে। 
পরদিন সকালে অনিতা দেবী চুলে শ্যাম্পু করে যখন আয়নার সামনে দাঁড়ালেন চুল আঁচড়াতে, চিরুনি বসাতেই গুচ্ছ গুচ্ছ চুল হাতে উঠে এলো। আস্তে আস্তে সব চুল গুলোই ঝড়ে গেলো। ঠিক তখনি তাঁর ফোনে অর্ঘমার নাম্বার ভেসে উঠলো, ফোন ধরে অনিতা দেবী কিছু বলার আগেই অর্ঘমা বললো শোন না মাম্মা,কাল ভুল করে আমার আর তোমার কসমেটিকস আর শ্যাম্পুর ব্যাগ এক্সচেঞ্জ হয়ে গেছিলো। তুমি কিন্তু ওই ব্যাগের কিছু ইউস করো না। অনিতা দেবী চেঁচিয়ে বললেন আগে বলবে তো??শ্যাম্পু করে চুল আঁচড়ানোর সময় আমার বাকি চুলগুলোও পড়ে গেছে সব। অর্ঘমা বললো কি বলছো!! তুমি এত সকালে শ্যাম্পু করেও নিলে!! ওহ গড।পাশ থেকে সমীর বাবু ফোনে বললেন শোনো অর্ঘমা,তোমার মাম্মা উচ্ছাসের সাথে হেয়ার রিমুভাল ক্রিমকে মাথায় লাগিয়েছেন নিউ ব্র্যান্ডেড শ্যাম্পু ভেবে।সব শুনে অর্ঘমা হাসবে না কাঁদবে বুঝতে পারলোনা। সমীর বাবু মুচকি হাসি দিয়ে অনিতা দেবীকে বললেন যে কটা চুল ছিলো,খোয়ালে তো!!এই জন্য বলতাম চুল উঠছে,চুল ঝরছে এই বাতিক গুলো ছাড়ো। যাইহোক এরপরের অবস্থা আরও করুন ছিল। অনিতা দেবী চুলের শোকে নাওয়া খাওয়া ত্যাগ করলেন। অভি অফিস থেকে ফিরে সব জানার পর বললো আচ্ছা আমি অর্ঘমার সাথে কথা বলছি, যতদিন না তোমার চুল গজাচ্ছে....আমাদের বিয়ে টা না হয় মার্চে না হয়ে নভেম্বরেই হবে।রাতে অর্ঘমা ফোন করলো অনিতা দেবীকে,বললো চিন্তা করো না মাম্মা,তোমার চুল গজানো অবদি আমরা অপেক্ষা করবো,অভি বলেছে আমায়। অনিতা দেবী এখন অপেক্ষা করছেন কবে তার মাথায় চুল গুলো গজাবে আর নভেম্বর মাসের জন্য, যখন তার বাড়ির লক্ষী হয়ে চিরদিনের মতো আসবে অর্ঘমা।
 
--- ©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস 🌞🌞🌞

1 টি মন্তব্য:

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...