স্বর্গে করোনা (রম্য রচনা)
সুদেষ্ণা দত্ত
মহিষাসুরের পর এক নতুন অসুরের আবির্ভাব হয়েছে—করোনাসুর।স্বাভাবিকভাবেই দেবতাকুলের সঙ্গে তার মোটে সদ্ভাব নেই।তারপর আবার এই অসুর দেবতাদের ভক্ত মানে বেছে বেছে মানুষগুলোকেই ধরছে।দুর্গার বাহনকে ধরতে গিয়েছিল,কিন্তু তার কেশর ফোলানোয় ব্যাটা ভয় পেয়ে গিয়েছে। এদিকে কে তাকে আগে দমন করে সেরার শিরোপা পাবে,তা নিয়ে গোষ্ঠীদ্বন্দ্ব। অশ্বিনী কুমার আবার বলেছেন,মাস্ক না পড়লে,হাত না ধুলে, ভ্যাক্সিন না নিলে এবং সামাজিক দূরত্ব বজায় না রাখলে, এই অসুরকে দমন করা মুস্কিল হি নেহি,নামুমকিন।
দেবরাজ ইন্দ্রের এখন গুরুত্ব অনেক কমে গিয়েছে।মানবকুল আর বিশেষ ডাকাডাকি করে না।তাই মাঝে মাঝেই ইদানীং মানবকুলকে জব্দ করার জন্য বজ্রপাত ঘটাচ্ছেন।তবে ভিড় এড়িয়ে তিনি থাকতে পারেন।কিন্তু যেহেতু দেবরাজ,কিছু দায়িত্ব তো থেকেই যায়।তাই আজ অমরাবতীতে চলছে দেব—দেবীদের ভ্যাক্সিনেশন।সামাজিক দূরত্ব বিধির দিকে নজর রাখার দায়িত্ব পড়েছে মিত্রের উপর।তিনি সবাইকে নিয়ে চলতে পারেন।
প্রজাপতি ব্রহ্মা বয়োজ্যেষ্ঠ বলে তাঁকে অগ্রাধিকার দেওয়া হয়।হঠাৎ মিত্র শুনতে পান ‘নারায়ণ নারায়ণ’ ধ্বনি।চমকে ওঠেন আর ভাবেন ঝামেলা লাগল বলে!কারণ ইতিমধ্যে মা মনসা পুরোনো স্বভাব মত ফাঁকতালে লাইনে ঢোকার চেষ্টা করছিলেন।আবার ইন্দ্র বলে ওঠেন, “আমার বাড়ীতে ভ্যাকসিনেশনের ব্যবস্থা হয়েছে,আমার কিছু বাড়তি সুবিধা পাওয়া উচিত।আমাদের সাথে অপ্সরাদেরও ভ্যাকসিন হোক,নাহলে আমি নাচ দেখব কি করে!”মনসা মনে মনে ভাবেন, “পুরুষ মানুষ চিতাতেও সোজা হয় না বাপু।সবাই প্রাণ ভয়ে মরচে,আর ইনি একেবারে রসে টইটম্বুর—নাচ দেখবেন”!যথারীতি ঝামেলা লেগে গেল।মিত্র কুপন ধরিয়ে সবাইকে নির্দিষ্ট সময় বেধে দিলেন।তাতে ঝামেলা কিছুটা মিটল।কিন্তু এবার সমস্যা দেখা দিল অগ্নিদেব আর বরুণ দেবকে নিয়ে।অশ্বিনীকুমার অগ্নিদেবকে ভ্যাক্সিন দিতে নারাজ।তিনি অগ্নিদেবকে ভ্যাক্সিন দিতে গেলে জ্বলে—পুড়ে যাবেন।তখন রফা হল অগ্নিদেবকে ভ্যাক্সিন দেওয়ার সময় বরুণ দেব তাঁর কাজ করবেন,আবার বরুণ দেবের বেলায় ঠিক উল্টোটা—নাহলে ওনার ভ্যাক্সিন শরীরে প্রবেশের আগেই ধুয়ে যাবে।
এদিকে মহামায়াদের আসার সময় হয়ে গিয়েছে।কিন্তু তাঁদের দেখা নেই।গনু আগেই কুপন নিয়ে গিয়েছে।হঠাৎ একটা বুলেট এসে দাঁড়ায়।কেতোর বুলেট থেকে নামলেন মহামায়া।কিন্তু ভোলানাথ নামতে গিয়ে ছেঁড়া বাঘ ছাল সাইলেন্সারে আটকে সোজা পপাত চ,মমার চ !মহামায়া খেঁকিয়ে বললেন, “কতবার করে বললাম নতুন বাঘ ছালটা পর।কিন্তু বুড়ো শুনলে তো!বলে কিনা বাড়ী ফিরে ওটাকে বাতিল করবেন,তাই নতুন পরে আর কাচাকাচির ঝক্কিতে যাবেন না।এদিকে ধুলো,মাটিতে পড়ে ব্ল্যাক ফাঙ্গাস ধরে আর কি”!হঠাৎ নারদ বলে ওঠেন, “না মা ও ভয় আপনি করবেন না।বাবা তো সবসময় ওই ছাইভস্মই মেখে থাকেন।ব্ল্যাক ফাঙ্গাস ভয়ে পালাবে”।মহামায়া তৃণয়ন দিয়ে নারদকে ভস্ম করতে যাচ্ছিলেন,এদিকে বাবারে,জ্বলে গেল রে,বলে চেঁচিয়ে ওঠেন মহাদেব।সাইলেন্সারে বেশ খানিকটা পা পুড়ে গিয়েছে বাবার।সিলভার এক্স লাগিয়ে দিলেন জামাই নারায়ণ।
আজ কেতো বেশ কেত মেরে বাবরি চুলে জেল লাগিয়ে ডেনিমের প্যান্ট শার্ট পরে এসেছে।ময়ূরে চেপে এলে তিনজনে আসতে পারতেন না।এদিকে পেট্রোল,ডিজেলের যা দাম!কিন্তু মহামায়ার অনেক দিনের বাসনা কেতোর আইবুড়ো নাম ঘুচুক।আজ যেহেতু ১৮ বছর বয়স থেকে সকলেই ভ্যাক্সিন নিতে পারবে,তাই অমরাবতীতে নিশ্চয় সুন্দরী মেয়েদের বন্যা বয়ে যাবে!তাই অনিচ্ছাসত্ত্বেও কেতোকে কিছু বলেননি।এদিকে কেতোকে দেখে প্রমীলা বাহিনী খুব ঝাড়ি মারছে।যা ঝাক্কাস হয়ে এসেছে,তায় এলিজেবেল ব্যাচেলর।তাই আজ কেতোর টি.আর.পি একেবারে রাজ্যসরকারের দেনার মতোই চড়চড় করে বাড়ছে।মহামায়ার বাকি ছেলেমেয়েরাও নিজের নিজের বাহনে এসে গিয়েছেন।লক্ষ্মী—সরস্বতী চিন্তা করছেন কোন ভ্যাক্সিন নেবেন কোভিশিল্ড না কোভ্যাক্সিন।অনেকেই বলছেন কোভ্যাক্সিন বেশি ভাল।এদিকে পুজোয় মামা বাড়ী গেলে কোভিশিল্ড না নিলে যদি আবার স্বর্গে ফেরার উপর নিষেধাজ্ঞা জারি করে।অগত্যা কোভিশিল্ড নেওয়ার সিদ্ধান্ত।
ইদানীং গনু দুই বোনের বুদ্ধিতে মাস্ক,স্যানিটাইজারের দোকান দিয়েছে।কারণ কেতো ফুলবাবু, এদিকে বুলেটে পেট্রোল চাই ফুল ট্যাঙ্কি!স্বরস্বতীর শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান বন্ধ থাকায় অভিভাবকরাও তাঁকে বিশেষ গুরুত্ব না দেওয়ায় আয় কমেছে।লক্ষ্মী ইদানিং একটা কোম্পানির ফিন্যান্স এডভাইজার নিযুক্ত হয়েছিলেন।কিন্তু ওয়ার্ক ফ্রম হোমের চক্করে তাঁর বেতনেও কোপ পড়ছে।তাই এই ভাবনা!দেবদেবীদের একাধিক হাত হওয়ায় স্যানিটাইজারের বাজার খুব ভাল।সমস্যা দেখা দিচ্ছে মাস্ক নিয়ে। ব্রম্ভা,কালী ,এমনকি গনুর নিজের জন্যও বিশেষ কায়দায় মাস্ক বানাতে হয়।মা কালী ফলহারিণী অমাবস্যার জন্য মর্ত্যে গিয়েছেন তাই আজ ভ্যাক্সিন নিতে আসতে পারেননি।নাহলে গনু,মা কালীর বিশেষ অর্ডার দেওয়া মাস্ক এখানেই দিয়ে দিতেন।
মা কালী দিন দুই হল মর্ত্য থেকে ফিরেছেন।তিনি জানেন গনু খেতে খুব ভালোবাসে আর অর্ডারী মাস্কও নেওয়ার আছে।তিনি মর্ত্য থেকে প্রচুর ফল,মিষ্টি এনেছেন।গনু এসে বলে বাপরে মাসী তোমার ঘরে পচা ফলের গন্ধে তো টিকতে পারছি না।মা কালী হেসে বলেন,তোর লম্বা শুঁড় তো,তাই তুই বেশি গন্ধ পাচ্ছিস।আমি তো কোন গন্ধই পাচ্ছি না রে গনু।গনু বলে গন্ধ পাচ্ছ না মানে!তবে কি....! বলেই দে দৌড়!ফ্যালফ্যাল করে মা কালী গনুর গমন পথের দিকে চেয়ে থাকেন।
ভক্তের ভগবান কি ভক্তের ডাক উপেক্ষা করতে পারেন!এই মহামারীর সময় নিজেরা সুরক্ষিত থাকুন,আর আমাদের দেব-দেবীদেরও শান্তিতে থাকতে দিন।মনে মনেই তাঁদের স্মরণ করুন।অযথা তাঁদেরও বিপদ বাড়াবেন না।নাহলে আমাদের রক্ষা করার কেউ থাকবেন না।মাস্ক,স্যানিটাইজার আর সামাজিক দুরত্বই হোক আপনার সুস্থতার চাবিকাঠি।
নিছক মজার উদ্দেশ্যে এই লেখা।কারোর ধর্মীয় আবেগকে আঘাত করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়।
©কপিরাইট রিজার্ভড ফর সুদেষ্ণা দত্ত।
ছবি সৌজন্য:গুগুল

দারুণ! দারুণ লাগল! অসাধারণ!👍👍❤❤⚘⚘
উত্তরমুছুন