# বিষয় - *বিজ্ঞান।*
# নাম-
*সন্তান উৎপাদনের বিবর্তন-কথা।*
সন্তান উৎপাদনের রহস্য নিয়ে লোক সংস্কারের জন্ম কবে থেকে শুরু সে খবর জানা নেই, তবে পিথাগোরাসের সময় তথা পিথাগোরাস সন্তান উৎপাদন নিয়ে কি বলেছিলেন তা থেকেই শুরু করি তাহলে।
পিথাগোরাস ছিলেন গ্রীক পন্ডিত ও ধর্মগুরু। তিনি জ্যামিতি শাস্ত্রের নিজের নামাঙ্কিত উপপাদ্য সমকোণী ত্রিভুজ ও তার ক্ষেত্রফলের স্রষ্টা। গীর্জার ধর্মগুরু ছিলেন বলে অনেক নতুন নতুন গির্জা বানাতে গিয়ে মাপজোক করতেন,আর তা থেকেই ক্ষেত্রফলের সূত্র বের করেছিলেন, তা থেকেই উপপাদ্যের জন্ম। তিনি আবার একটি সম্প্রদায়ও তৈরি করেছিলেন। তিনি ছিলেন একজন আচার সর্বস্ব ধর্মগুরু। আরণবিধি শিষ্যদের দিয়ে প্রচার করতেন। এই আচরণবিধিগুলির অন্যতম যেমন -
ছোলা জাতীয় দানা খাওয়া নিষিদ্ধ,পড়ে থাকা জিনিস কুড়নো যাবে না, সাদা মোরোগ ছোঁয়া বারণ, ফুলের মালা ছেঁড়া পাপ, উনুন থেকে হাঁড়ি সরালে যেন ছাইতে হাঁড়ির ছাপ না থাকে ইত্যাদি বিষয়ক।
শুধু ভাবতেন আচরণবিধির প্রচার করেই কি আর গুরুগিরিতে আটকে রাখা যায়! সন্তানের জন্ম ও তার মূলে নারী-পুরুষের ভূমিকা কী তা নিয়ে আদি থেকেই কৌতূহলের শেষ ছিল না। কেবল বিশ্বাসের ছড়াছড়ি। তিনি সেই বিশ্বাসের উপর পাঁচশ' খ্রীঃ পূঃ সন্তান উৎপাদনের একটি নিজস্ব তত্ত্বের প্রতিষ্ঠা করেছিলেন,যা শুনলে বর্তমানে আঁতকে উঠি।কী সেই তত্ত্ব? দেখা যাক।
তিনি বলছেন সন্তানের জন্ম দাতা কেবলমাত্র পিতা। পুরুষের শুক্রাণু হল ভ্রুণ। শুক্রাণু মানুষের ক্ষুদ্র সংস্করণ। তা রক্ত বাহিত হয়ে সারা শরীরে ঘুরে বেড়ায়। ঘুরে ঘুরে সারা শরীরের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গের খবর নেয়। তারপর গোটা মানুষের আদল নেওয়ার জন্য মাতৃজঠরে স্থান করে নেয়। পূর্ণাঙ্গ মানুষের রূপ নেয় মাতৃজঠরে। এক্ষেত্রে নারীর কাজ কেবল একটি আধার হওয়ার। নারীর কাজ হল কেবল আধার হওয়া। এছাড়া সন্তান উৎপাদনে নারীর কোনো ভূমিকা নেই।
এই তত্ত্বকে নিজের নামাঙ্কিত উপপাদ্যের সাথে জুড়ে দিয়েছিলেন পিথাগোরাস। তিনি বললেন,সমকোণী ত্রিভুজের অতিভুজ কেমন হবে,তা নির্ভর করে ভূমি ও লম্বের ওপর। অতিভুজ যেমন ওই দুটি বাহুর নির্যাস, তেমনি সন্তানও নারী-পুরুষের নির্যাস।
এই তত্ত্ব থেকে শিষ্য প্লেটো পৌঁছে যান একেবারে ফর্মুলায় তাঁর 'দ্য রিপাবলিক'গ্রন্থে। এই ভাবে ফর্মুলা দিলেন, উন্নত নর ও নারীর সন্তান উন্নত,আর নীচ নর-নারীর সন্তান অবশ্যই নিম্নমানের। তাই সুনাগরিক সৃষ্টি করতে রাষ্ট্রনায়কগণের উচিত প্রজননের এই ফর্মুলার সাহায্যে কে কার শয্যাসঙ্গী হবে তা ঠিক করে দেওয়া।
পিথাগোরাস ও প্লেটোর তত্ত্বকে একেবারে উড়িয়ে দিলেন অপর গ্রীক শিক্ষাগুরু অ্যারিস্টটল। প্রমাণ করে ছাড়লেন, পিথাগোরাসের তত্ত্ব পুরোপুরি মনগড়া। অ্যারিস্টটল বললেন, সন্তান যদি শুধু বাবার লক্ষণ নিয়ে জন্মায় তবে মা-দিদিমা-ঠাকুমার লক্ষণ পায় কীভাবে? আরো যুক্তি যে পুরুষ দাঁড়ি-গোঁফ গজানোর আগেই সন্তানের জন্ম দেয়, তার সন্তানের আবার দাঁড়ি-গোঁফ গজায় কেন। কিংবা মেয়ে সন্তান ও স্ত্রী জননাঙ্গের খবর পায় কোথা থেকে। অ্যারিস্টটলের যুক্তি খন্ডন করা ছিল অসম্ভব। অ্যারিস্টটলকে মানল সবাই। অ্যারিস্টটল বললেন সন্তান জন্ম দেওয়ার কৃতিত্ব একা পুরুষের নয়। নারী শুধু আধার নয়, অনেক গুরুদায়িত্বও পালন করে, সন্তান প্রসবের আগে পর্যন্ত।
কী সেই গুরুদায়িত্ব? পুরুষ শুক্রাণু দিলে নারী কী দেয়? এই নিয়ে চলল আরো শতাব্দীর পর শতাব্দী অনুসন্ধান। বিশ্বাস থেকে অন্ধবিশ্বাস কোনো ব্যাপার ছিল না। শধু ভাবলে অবাক হতে হয়, অন্ধবিশ্বাসগুলি তখনো দা ভিঞ্চি বা গালিলেও গালিলেই কিংবা নিউটনের যুগেও দিব্যি ঘুরে ফিরে বেড়াত। মহাকাশ বিষয়ে অনেক জানা হয়ে গেলেও নারী কীভাবে গর্ভবতী হচ্ছে তা তখনো মানুষ জানত না। জানত না অনেক প্রশ্নের উত্তর। যেমন অন্যতম জমজ বাচ্চা কেন জন্মায়? গর্ভবতী হওয়ার জন্য যৌন সংসর্গের প্রকৃষ্ট সময় পূর্ণিমা না অমাবস্যা। তাই নিয়ে জ্যোতিষীর বাজার ছিল খুব রমরমা। আরো কত শত বিশ্বাস। আরো বিশ্বাস জড় থেকেও নাকি জীবের সৃষ্টি।
অষ্টাদশ শতাব্দীর মাঝামাঝি ১৭৬০-এর দশকে এই বিতর্কের অবসানের জন্য পরীক্ষা দ্বারা প্রমাণ দিলেন স্প্যালানজানি। যিনি পরীক্ষার দ্বারা প্রমাণিত সত্যে উপনীত হন যে জীবের জন্ম আর এক জীব থেকে। তাঁর স্ত্রী ব্যাঙ ও পুরুষ ব্যাঙ নিয়ে জলের ট্যাঙ্কে পরীক্ষাই তারই প্রমাণ দিয়েছিলেন। তাঁর এই কৃতিত্বকে ইতালি চিরস্মরণীয় করে রাখতে স্কানডিয়ানোতে একটি মর্মরমূর্তিকে আজও মর্য্যাদার সঙ্গে রক্ষা করে চলছে।
সন্তান উৎপাদনের গবেষণায় ম্যান্ডেলা ও বংশগতি অনেক অগ্রগতির ফল এনেছে। বিজ্ঞানের গবেষণায় বর্তমানে সন্তান উৎপাদন কীভাবে হয় তা আর অজানা নয়। তবে
সন্তান উৎপাদন কীভাবে (How) হচ্ছে সে উত্তর জানা, কেবল জানা নেই যা 'হোয়াই'-এর উত্তর। অর্থাৎ কেন বিপরীত লিঙ্গ পরস্পরকে খোঁজে তা আজও অজানা। কই ব্যাকটেরিয়ার বেলায়তো লাগে না,তারা কিন্তু দিব্যি বংশবৃদ্ধি করতে পারে। পারে সত্য, কিন্তু আদি থেকেই তারা যে এক কোষী ছিল, তাই আছে। কিন্তু জীব বহুকোষী। কোষের ভিত্তি জীন। এই জীনেই লুকিয়ে আছে 'কেন'-এর রহস্য। জীনের কেরামতিতে জনন,সন্তান উৎপাদন,সন্তানে জিনের ট্রানসপারেশন,জীবদেহের কাঠামো জীববৈচিত্র্য,জীবানু (ভাইরাস,ব্যাকটেরিয়া) ও তাকে প্রতিরোধ করতে ইমিউনিটি ক্রমশ জীববিজ্ঞানের বিষয় ভিত্তিক জ্ঞানের অঙ্গ হয়েছে। বিশেষ করে জনন ক্রিয়া থেকে সন্তান উৎপাদন,আর সন্তান জন্মের পর জীবদেহের কোষ বিভাজন, বংশবৃদ্ধির মূলে জনন ক্রিয়া মূল ভিত্তি। আর তার অনেক রহস্য। এই রহস্যের 'কেন'-র উত্তর আজও নেই।
**গর্ভাবস্থায় ও প্রসবোত্তর যত্ন আত্তির কিছু কথা:-
১। গর্ভবতী মা গাইনো স্পেশালিস্টের আন্ডারে থাকবেন। দশ সপ্তাহের পর থেকে দশবার চেক আপ করাবেন।
২। গর্ভবতী মাকে গর্ভাবস্থায় দশ কেজি ওজন বাড়াতে হবে, তিন কেজি শিশুর তবে জন্ম হবে।
৩। গর্ভবতী মাকে দশ ঘন্টা ঘুমোতে হবে। দিনে দুই,রাতে আট।
৪। দশ মাস গর্ভাবস্থায় রক্তে শতকরা দশগ্রাম হিমোগ্লোবিন হতে হবে। প্রথম তিনমাস বাদে প্রতিদিন একটি করে ফালিক অ্যাসিড ভিটামিন ট্যাবলেট খেতে হবে,এবং তা চলবে প্রসবের পর চার মাস পর্যন্ত, যতদিন শিশু বুকের দুধ খাওয়া পর্যন্তও চলতে পারে।
৫। গর্ভের দশ মাসের মধ্যে দুটি টিফিনেস টকসয়েড ইঞ্জেকশন নিতে হবে। প্রথমটি পাঁচ মাসে,দ্বিতীয়টি ছ'মাসে। আর তৃতীয়টি নিতে হবে প্রসবের পর দ্বিতীয় মাসে।
@ আর প্রসবের সময় যত্ন -
১।প্রথম গর্ভবতীর প্রসবের জন্য সময় দশ থেকে বারো ঘন্টা। দ্বিতীয় বা তার বেশী হলে পাঁচ ছ' ঘন্টা।
২। দশ আপগারওয়ালা শিশুকে প্রসবের করাতে হবে। যাতে প্রসবকালে শিশু খুব ভাল কাঁদে। যত প্রবল কাঁদবে তত শিশু সুস্থতার লক্ষন। একে বলে দশ আপগার শিশু।
# ঋণ অস্বীকার -
১। পথিক গুহ ( 'দেশ' ১৭-জুন ২০১৭)
২। 'সুখী জীবন'- অধ্যাপক ডঃ সি.এস. দাঁ (গাইনো স্পেশালিস্ট),পৃঃ :- ১৬০
*********
# কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।
খুব সুন্দর লিখেছেন দাদা।
উত্তরমুছুনগুরুত্বপূর্ণ অসাধারণ লেখা
উত্তরমুছুন👍👍👍👍💐💐💐💐
উত্তরমুছুনদারুন।
উত্তরমুছুনতথ্য সমৃদ্ধ লেখা..💐👌
উত্তরমুছুন