#নাম_মান্ডবী
#কলমে_অনিশা কুমার
আমি মান্ডবী। হ্যাঁ, ঠিক এই নামেই একটি নদী আছে দক্ষিণ ভারতে। কিন্তু আমি নদী না। ভালোবাসলে নারীরা হয়ে যায় নরম, নদীর মতো। কিন্তু আমি ভালোবাসা পেলাম কোথায়? জন্ম থেকে না পারলাম কাউকে ভালোবাসতে, না পেলাম কারুর ভালোবাসা। রামায়নে আমি উপেক্ষিতা এক নারী।
মিথিলার রাজা জনকের প্রকৃত নাম সীরধ্বজ। তাঁর ভাই কুশধ্বজ। জনক রাজা, তাই তাঁর নাম সর্বজন বিদিত।রাজা জনক একদিন যজ্ঞভূমি কর্ষণ কালে লাঙলের রেখায় এক সুন্দরী শিশু কন্যা পান। লাঙলের রেখার অন্য নাম সীতা তাই তিনি সেই কন্যার নাম সীতা রাখেন। এরপর আমাদের দুই বোনের জন্ম। কিন্তু কোথাও আমাদের উল্লেখ নেই, কারণ আমরা অনাদৃতা। তারপর মিথিলার জনকপুরের রাজা জনক ও এবং তার স্ত্রী সুনয়নার একমাত্র কন্যাসন্তানের জন্ম হয়। এবং তিনি সীতার কনিষ্ঠ বোন। তিনি উর্মিলা, রাজকন্যা হিসাবে সমাদৃতা ও হিন্দু মহাকাব্য রামায়নের একটি বিশেষ চরিত্র। শুধু শিশুকাল হতেই আমি অবহেলিতা।
যখন কৈশোরে পদার্পণ করলাম, শুনলাম আমাদের চারবোনেরই স্বয়ম্বর সভা হবে। সীতা, ঊর্মিলা, মাণ্ডবী আর শ্রুতকীর্তি । আমরা চার বোনের প্রত্যেকেই বধূ বেশে সজ্জিতা। বরমাল্য হাতে নিয়ে নিজের নিজের ভাগ্য বেছে নেওয়ার অপেক্ষায় রয়েছি। হরধনু ভঙ্গ করেছেন শ্রীরামচন্দ্র, সীতা তাঁর গলাতেই মাল্যদান করবেন। এরপর আমার পালা। কিন্তু তার আগেই লক্ষণকে উর্মিলার স্বামী হিসেবে নির্বাচিত করা হয়ে গেছে। আমাদের আর আর পছন্দের কোন মূল্য নেই। বাকি দুই কন্যা মাণ্ডবী ও শ্রুতকীর্তির সাথে যথাক্রমে ভরত ও শত্রুঘ্নের বিবাহ সুসম্পন্ন হল। তাহলে কেন এই স্বয়ম্বর সভার প্রহসন? আমি কি এক নির্জীব জড় পদার্থ? সীতা তো কুড়িয়ে পাওয়া এক মেয়ে। আমার রাজবংশে জন্ম, রাজকন্যা আমি। শুধু রাজার খেয়াল খুশী আচরনে আজ আমি অবহেলিতা।
অবশেষে মেনে নিতে বাধ্য হলাম ভরতকে স্বামী হিসাবে। স্বামীকেই ভালোবেসে সুখী হওয়ার চেষ্টা করবো। কিন্তু সেখানে ও বাদ সাধলেন বিধাতা। প্রথম থেকেই শ্বাশুড়ী মায়ের ইচ্ছানুযায়ী তিনি মাতুলালয়ে বাস করেন। সুতরাং স্বামী সোহাগ কোনদিনই পাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়নি। অবশেষে রামচন্দ্র বনবাসে গেলেন। এখানে খলনায়িকা হয়ে গেলেন আমার শ্বাশুড়ি মা। আরে, "দশচক্রে তো ভগবান ও ভূত হন।" ক্রমাগত বাপের বাড়ির লোক যদি তাঁকে লোভ দেখাতে থাকেন, তবে তিনি ও তো মানুষ। ইচ্ছে তো হতেই পারে রাজমাতা হবার। আমারও কি আনন্দে হৃদয় আকুল হয়নি! দুচোখ কি স্বপ্নে বিভোর হয়ে ওঠে নি রাজরানী হওয়ার খুশীতে!
কিন্তু ভরত? সে কি পাথর দিয়ে তৈরী? নববিবাহিতা স্ত্রীকে রেখে দিনের পর দিন মাতুলালয়ে। আবার সিংহাসন পেয়ে ও তাতে অবহেলা! কি প্রমান করতে চান ভরত! তাঁর মহানুভবতা! মহাকাব্যে তিনি তাঁর ত্যাগ দিয়ে মহাপুরুষ হয়ে থাকবেন? তিনি চোদ্দ বছর রামচন্দ্রের খড়ম না রেখে যদি নিজেই রাজত্ব করতেন আর রামচন্দ্র ফিরে এলে তা ফেরত দিয়ে দিতেন তবে রামায়নের কোন অংশেই কি তার প্রভাব পড়ত? কিন্তু তিনি বৈরাগী হয়েই রইলেন। আমাদের চারবোনের মধ্যে সীতা রামচন্দ্রের অনুগামী হয়েছিলেন, তাই তিনি মহিয়সী। উর্মিলাকে লক্ষণ ফেলে রেখে দাদার অনুগামী হয়ে বনে চলে গিয়েছিলেন, তাই তার প্রতি সবাই সহানুভূতিশীল। শ্রুতকীর্তির কথা না লেখা হলেও সে শত্রুঘ্নর সঙ্গে সুখেই ছিল। কিন্তু আমি বিবাহিতা হয়েও স্বামী সুখে বঞ্চিতা, রাজকন্যা হয়েও রাজরানী হওয়ার সৌভাগ্য থেকে বঞ্চিতা, মহাকাব্যে উপেক্ষিতা জনমদুখী, এক অভাগী।
বেশ সাবলীল সুন্দর লেখা।
উত্তরমুছুন👍🏽
উত্তরমুছুন