সন্ধ্যার আলোচনা-বাসর।
#বিষয় - *দর্শন ও জ্ঞানের মধ্যে কি কোনো বিরোধ আছে?*
# নাম - *বিজ্ঞান ও দর্শন।*
✍ - মৃদুল কুমার দাস।
জ্ঞানের দুই জমজ- দর্শন ও বিজ্ঞান। বিশেষরূপে জ্ঞাণ বিজ্ঞান। আর দর্শন বা ফিলসফি শব্দের অর্থ হল কোনো স্থিরতা নেই। কখনো অর্থ আধ্যাত্মিক তত্ত্ব, কখনো প্রাকৃতিক জ্ঞাণতত্ত্ব, কখনও অর্থনীতি,ধর্মনীতি,কখনও বা বিচারবিদ্যা। ফিলসফির উদ্দেশ্য হল জ্ঞাণ। এই জ্ঞানের উদ্দেশ্য আলাদা। এর উদ্দেশ্য নির্মাণ, মুক্তি, পারলৌকিক অবস্থা। দর্শন জ্ঞান হল সাধনার জ্ঞাণ। সে সাধনার গতি বিচিত্রগামী। আদি দৈবিক,আদি ভৌতিক, কখনও নৈতিক বা সামাজিক জ্ঞান। এসবই সংসারের সুখ, দুঃখ,আনন্দ থেকে আসে। জীবনের নানা বৈচিত্র্যপূর্ণ গতির মূল্যায়নের নাম দর্শন। তাই সে নানা মতবাদভিত্তিক - হিন্দু,ইসলাম, খ্রিস্টান ধর্মীয় মতবাদের পরিচয় হল দর্শন। দর্শনের নানা মত - *যত মত তত পথ।* জন্মান্তরবাদ একটি দার্শনিক মতবাদ। সাংখ্যদর্শণ,বেদ,বেদান্তের পরিচয় দর্শনে - হিন্দুদর্শণ। মার্কসীয় দর্শন যেখানে তত্ত্ব সেখানে দর্শন, আর যেখানে দ্বন্দ্বমূলক বস্তুবাদ সেখানে জ্ঞানের বিশেষরূপ তখন বিজ্ঞান। জ্ঞান কখনো দর্শন, আবার কখনো বিজ্ঞান। জ্ঞানের বিশেষ রূপ বিজ্ঞান।
তাহলে জ্ঞান হল নিজেকে জানার সোপান। যদি বলি *আকাশ কুসুম* তাহলে মুহূর্তে বুঝতে পারি আকাশ কী আর কুসুম কী। এই অর্থও শেষ কথা হল না। অর্থের আরেক উদ্ঘাটন আছে - অলীক কল্পনা। যদি বলি *অরণ্যে রোদন* অরণ্যে গিয়ে কোনো কান্না নয়,প্রান্তিক অর্থ হল- নিষ্ফল আবেদন। *দেশের লজ্জা* বললে দেশের মানুষগুলোর লজ্জা। আবার যদি বলি গাছেরও খাব তলারও কুড়াব - এ হল ব্যবহারিক জীবনের দর্শন। আর গাছটি কেন এক্ষেত্রে এলো তাই জানাটাই হলো জ্ঞাণ।এইভাবেই জীবনদর্শণ জ্ঞানের সীমায় ধরা দেয়। জীবনদর্শণ মানেই জীবনের যথার্থ সত্যের সন্ধানে থাকা। সেই সন্ধান মানেই যতদিন বাঁচি ততদিন শিখি। যত ভুল তত শিক্ষা। জীবনের যেমন দর্শন আছে,মৃত্যুরও তেমনি দর্শন আছে। কী সেই দর্শন-মৃত্যুর পাত্র থেকে জীবন উঠে আসে। জীবন সরিয়ে নিলে মৃত্যু পড়ে থাকে। জীবন রক্ষা করে চলতে হয়,মৃত্যুকে রক্ষা করতে হয় না। এই রক্ষার জন্যই মৃত্যুকে এতো ভয় হয়। ভয় কারা করে? না অন্নপায়ী থেকে জীবন রক্ষা করতে হয় বলে,তা থেকে বাঁচার আনন্দ আসে বলে তাই মৃত্যুকে সবাই ভয় পায়। ভয় তখন হয় না যখন মৃত্যুকে জয় করতে পারা যায়। রবীন্দ্রনাথ সেই মৃত্যুকে জয়ের কথা দিয়ে রবীন্দ্রনাথ মৃত্যুদর্শণের কথা বলেছেন। তাই একপ্রকার জ্ঞানের কথা।
উপদেশ একপ্রকার জ্ঞাণ। উপদেশ দিলে বলে বেশী জ্ঞাণ দিও না।
আর জ্ঞাণের আরেক দিক বিজ্ঞান। আপেল নীচের দিকে পড়া থেকে মাধ্যাকর্ষণ বল এলো। নিউটন যা বললেন বিশ্ব তাই মানল। জগদীশ চন্দ্র বসু উদ্ভিদের প্রাণ আছে প্রমাণ দিলেন। এখন নিউটন যা বললেন তা যদি জগদীশ চন্দ্র বসু বলেছিলেন বলি,আর জগদীশ চন্দ্র বসু যা বলেছিলেন তা যদি বলি নিউটন বলেছিলেন, তাহলে জ্ঞাণ লাভ ভুল হয়ে গেল। এই বিশেষ জ্ঞাণ লাভটাই হল বিজ্ঞান। দুই বিজ্ঞানীর গবেষণার বিষয় নিয়ে জানাই হলো বিশেষ জ্ঞাণ তথা বিজ্ঞান।
এই জ্ঞাণ থেকে উদ্ভূত বিজ্ঞানের জন্য পাশ্চাত্যকে প্রাচ্য খুব সমীহ করে,আর প্রাচ্যের জ্ঞান থেকে উদ্ভূত দর্শণের জন্য পাশ্চাত্য প্রাচ্যকে খুব সমীহ করল। জ্ঞাণের বস্তুতান্ত্রিকতায় পাশ্চাত্য ভরকেন্দ্র,আর প্রাচ্যের ভরকেন্দ্র ভাববাদী দর্শণে।
সুতরাং বিরোধ কথাটি একদম আসেনা। দর্শণ ও জ্ঞাণ বিরোধ ভাবা নিরর্থক। জ্ঞাণই জগত ও জগতের সার। তার দুই অপত্য দর্শন ও বিজ্ঞান।
********
অপূর্ব লেখা
উত্তরমুছুনদুটোর বিরোধ নিয়ে খুব সুন্দর লেখা।
উত্তরমুছুনখুব সুন্দর লিখেছেন দাদা।
উত্তরমুছুন