শনিবার, ২ অক্টোবর, ২০২১

#নাম - লালবাহাদুর শাস্ত্রী। ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

# বিষয় - *ভারতপথিক লালবাহাদুর শাস্ত্রীর জন্মদিন স্মরণে শ্রদ্ধাঞ্জলি*
  #নাম - *লালবাহাদুর শাস্ত্রী।*
✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

 ২-অক্টোবর ফিবছর জাতির জনক মহাত্মা গাঁধীর জন্মদিন পালনের এত ঘটা আরেক ভারতমাতার সন্তানের একই দিনে জন্মের কথা প্রায় একপ্রকার উপেক্ষাই থেকে যায়। আড়ালে থেকে যান লালবাহাদুর শাস্ত্রী( ১৯০৪,২-অক্টোবর -১৯৬৬,১১- জানুয়ারি)। জন্ম উত্তরপ্রদেশের মোগলসরাইতে। সক্রিয়তাবাদের অধ্যাপক ছিলেন। স্বাধীন ভারতের দ্বিতীয় প্রধানমন্ত্রীর জীবদ্দশা মাত্র বাষট্টি বছর। ১৯৬৪ এর ৯জুন প্রধানমন্ত্রী হন। জওহর নেহেরুর কন্যা ইন্দিরা গাঁধী প্রধানমন্ত্রী হতে না চাওয়ার জন্য অগত্যা তিনিই প্রধানমন্ত্রী হন। রাষ্ট্রপতি সর্বপল্লী রাধাকৃষ্ণন,আর তিনি প্রধানমন্ত্রী। জওহরলালের শূন্য আসনে তিনি বসে খুব স্বস্তিতে ছিলেন না। চীনের কাছে জওহরলালের ১৯৬২-র যুদ্ধে শোচনীয় পরাজয় ভারতকে লজ্জার মুখে পড়তে হয়েছিল। আর সেই সুযোগে শত্রু দেশ পাকিস্তান উদ্বুদ্ধ হয়েছিল সাম্প্রদায়িকতার জিগির দিয়ে ভারতকে হারিয়ে কাশ্মীর দখল নেবে। সেদিন বাবুজি লালবাহাদুর(বাবুজি নামেই সকলে ডাকতে খুব পছন্দ করতেন) কিভাবে দেশকে যোগ্য নেতৃত্ব দিয়েছিলেন তা ইতিহাসের পাতা তাঁর কৃতিত্বকে স্বর্ণাক্ষরে মুদ্রিত করতে কোনো কার্পণ্য করেনি। শুধু আফশোস বাপুজি মহাত্মার জন্মদিনের আড়ালে বাবুজি লালবাহাদুর থেকে যান। এ জন্য দোষটা আমাদের,কেননা ত়াঁর জন্মদিন নিয়ে আলোচনা আমাদের কোথাও না কোথাও সদিচ্ছার বড়ই অভাব।
  কেমন ছিলেন বাবুজি লালবাহাদুর! 
  মহাত্মা গাঁধীর দুই বিশ্বস্ত সেনাপতি জওহরলাল ও লালবাহাদুর। তবে বাবুজি জওহরলালের মত অত লাইমলাইটে থাকতে পছন্দ করতেন না। আন্তর্জাতিক নেতৃত্ব হওয়ার কোনো উচ্চাশা পোষন করতেন না। ছিলেন অত্যন্ত সাদামাঠা। ভেতরে সবসময় একটা স্বচ্ছতা বিরাজ করত। আর একনিষ্ঠ দেশভক্ত ছিলেন। এই বলে সকলের খুব বিশ্বাসভাজন ছিলেন। কিন্তু ভেতরে ভেতরে যে কতখানি লৌহমানবের কাঠিন্য ছিল তা অচীরে প্রমাণ পেয়েছিলেন পাকিস্তান-জেনারেল আয়ুব খান। বাইরে থেকে বাবুজিকে দেখে আয়ুব খানের ধারণা হল বড়ই দুর্বল প্রকৃতির। আর আয়ুব খানের ধারণা যে কতখানি ভুল ১৯৬৫ র যুদ্ধে আয়ুব খানকে হাড়ে হাড়ে টের পাইয়ে দিয়েছিলেন। ১৯৬২ র ভারত আর ১৯৬৫ র ভারত প্রতিরক্ষায় যে আকাশ পাতাল পার্থক্য সে খবর আয়ুব খানের কাছে ছিল না। আয়ুব খান ভেবেছিলেন সাম্প্রদায়িকতার জিগির দিয়ে কাশ্মীরের মানুষের মন পাবেন, আর চীন পরোক্ষে সাহায্য করবে - আয়ুব খানের এই ভাবনাকে শাস্ত্রীজী হাড়ে হাড়ে ভুল যে সেই সবক শিখিয়ে দিয়েছিলেন। আয়ুব খানের দেশ যুদ্ধে ল্যাজে গোবরে অবস্থা। না চীনকে পাশে পেল,আর না কাশ্মীরের মানুষকে। আয়ুব খান অচীরে বুঝতে পারলেন - শাস্ত্রী লোকটি মোটেই সহজ নয়। নরম মনের তো নয়ই। দেখতে ওরকম। রুটি সবজি আর একগ্লাস দুধ যাঁর প্রিয় খাদ্য, ধুতি পাঞ্জাবী পরিধানের সারল্যের বাইরে যে মানুষটি এমনভাবে কাজেই বুঝিয়ে দিতে পারেন কীভাবে তা জেনারেল আয়ুব খান অচিরে বুঝতে পেরেছিলেন।
  পাকিস্তান জানত না চীন যুদ্ধ থেকে শিক্ষা নিয়ে প্রতিরক্ষামন্ত্রী ওয়াই ভি চ্যবন কয়েকবছর ধরে লাগাতার ইউরোপ-রাশিয়া সফর করে অসংখ্য আধুনিক ট্যাঙ্ক,আগ্নেয়াস্ত্র, সাবমেরিন, ফাইটার জেট কিনে ফেলেছেন। সোভিয়েত তো পুরোপুরি বিপুল সমর্থন দিয়ে পাশে ছিল। আর এই অন্য ভারতের খবর আয়ুব খানকে ইন্টেলিজেন্স ব্যূরো দিতে ব্যর্থ।
  একটা যুদ্ধ লোকক্ষয় শুধু কি!অর্থনৈতিক অবস্থাও খুব সঙ্গীন হয়ে পড়ে। পাকিস্তানের অবস্থা তাই হয়েছিল। *জয় জোয়ান জয় কিশান* শ্লোগানের স্রষ্টা বাবু শাস্ত্রীজি পাকিস্তানকে একেবারে ভরাডুবি করে ছেড়ে দিলেন। উভয়পক্ষের ক্ষয়ক্ষতি নেহাত মন্দ ছিল না - পাকিস্তানের ২৫০ ট্যাঙ্ক,৫০ এয়ার ক্র্যাফট,৫০০০ হাজার সৈন্য। ভারতের তার থেকে বেশী ৬০০০ হাজার সৈন্য,৩০০ ট্যাঙ্ক,৫০ এয়ারক্রাফট। তবে ভারত বেশি ক্ষতি দিয়ে পাকিস্তান ভূখণ্ডের ৭০০ বর্গমাইল কব্জা করে ফেলে।  তখন রাষ্ট্র সংঘ নড়ে চড়ে বসে। নিরাপত্তা পরিষদের সেক্রেটারি ইউ থন্ট দিল্লী ও করাচীতে এসে দুপক্ষের মধ্য দৌত করেন। ২২ সেপ্টেম্বর ১৯৬৫  উভয়পক্ষকে যুদ্ধে বিরত হয়েছিল। আর উভয় দেশের মধ্য চুক্তি সাক্ষরের জন্য ক্ষতিপূরণ ও পরস্পরের দখলীকৃত স্থান প্রত্যর্পণ নিয়ে তাসখন্দে সভা অনুষ্ঠিত হয়। সেই  সভায় আয়ুব খান বাবু লালবাহাদূরকে বলেছিলেন -"প্রধানমন্ত্রীজি কাশ্মীরকে মামলে মে কুছ অ্যায়সা কর দিজিয়ে কী ম্যায়ভি আপনে মুলুক মে মুহ দিখানে কাবিল রহু...।" তখন মুচকি হেসে বাবুজি বলেছিলেন -"সাহাব! ম্যায় বহোত মুয়াফি চাহতা হুঁ কী ইস মামলে মে ম্যায় কোই খিদমত নেহি কর সকতা...।"
   ১৯৬৬ সালের ১০জানুয়ারি বিকেলে সেই ঐতিহাসিক চুক্তি স্বাক্ষর হওয়ার পর সাড়ে ৯টা নাগাদ ফিরে এলেন নিজের ঘরে। খাওয়ার রেডি। খাওয়ার বলতে রাতে রুটি,ডাল,সবজি আর এক গ্লাস দুধ। খাবার এলো সাড়ে দশটায়। খাওয়ার দিয়ে গেলেন জান মহম্মদ। স্পিনাক,আলুভাজা আর সবজি ঝোল। খাওয়ার পর হাঁটার অভ্যাস চিরকাল। তবে সেদিন আর হাঁটার শক্তিই যেন হারিয়ে ফেললেন। তখন বাজে এগারোটা। বললেন - "আমি ঘুমাব এবার।" রামনাথ তাই শুনেই কিচেন থেকে এক গ্লাস দুধ দিয়ে গেলেন। রাত ১১টা ১৫ নাগাদ দুধ খেলেন। পরদিন কাবুল যাওয়ার কথা। তাড়াতাড়ি উঠতে হবে। সেই রাত আর সকাল হয়নি। রাত আড়াইটায় একের পর এক দরজায় ধাক্কা - "জেন্টলম্যান প্লিজ ওপেন দ্য ডোর... জেন্টলম্যান ইটস আর্জেন্ট... জেন্টলম্যান ইওর প্রাইম মিনিস্টার ইজ ডাইং...।" পরিবারের পক্ষে এটাই বিশ্বাস, স্ত্রী ললিতা শাস্ত্রী জোরের সঙ্গেই বলেছিলেন দুধের সঙ্গে বিষ মিশিয়ে হত্যা করা হয়েছিল। কেউ বলেন হার্ট অ্যাটাক। আসলে তাঁর মৃত্যু যে কী কারণে হয়েছিল আজও কৌতুহল নিরসন হয়নি। অদূর ভবিষ্যতে নিরসন হতে পারে এমন সম্ভাবনাও নেই।
                ******
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

শিরোনাম - অপ্রকাশিত অনুভূতি✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - অপ্রকাশিত অনুভূতি ✍️ ডা: অরুণিমা দাস কিছু অনুভূতি মনের গভীরে থাকাই শ্রেয়। সেটা হয়তো প্রকাশ করলে সমস্যা হতে পারে,তাই প্রকাশ না কর...