রবিবার, ২৬ ডিসেম্বর, ২০২১

#শরৎ সাহিত্যে নারী -✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

শরৎচন্দ্রের সাহিত্যে নারী:-
 শরৎচন্দ্রের (১৮৭৬-১৯৩৮) সাহিত্য-জীবনের তিনটি পর্ব - 
  ১. প্রাক রেঙ্গুন পর্ব ২. রেঙ্গুন পর্ব (১৯০৩ - ১৯১২) ৩. রেঙ্গুনোত্তর পর্ব (১৯১২- ১৯৩৮)। 
  রেঙ্গুন পর্বকে বলা হয় প্রস্তুতি পর্ব। এখানে কোনো সাহিত্য রচনা করেননি। শুধু পাহাড় প্রমান অভিজ্ঞতা অর্জন ছিল। ১৯১৪ থেকে 'বড়দিদি' দিয়ে শুরু হলো কথা সাহিত্যের জয়যাত্রা। শুরু করলেন পুরাতনকে ঘিরে ঘুরে ফিরে দেখা। যত এগিয়েছেন তত চরিত্র চিত্রণে নানা রূপান্তর ঘটিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে দেখা যাক শরৎ- সাহিত্যে নারীর অবস্থান কেমন ছিল।
 সৃষ্টির প্রথম লগ্নে ভাগলপুরে বয়ঃসন্ধির কাল কেটেছে। এই সময় কোনো নারীকে ঘিরে দেহ-নিরপেক্ষ ভাবেই যৌনজীবন ও প্রেমজীবন গড়ে ওঠে। ১৭/১৮ যখন বয়স তখন ভাগলপুর,আর রেঙ্গুনে যখন তখন বয়স ২৬/২৭। 
 বালবিধবা নিরুপমা দেবীর বৈধব্য দুঃখ নিয়ে এলেন ১৮৯৭ এ ভাগলপুরে। আর তার সেই দুঃখ দেখে নারী চরিত্র পাঠের শরৎচন্দ্রের সূচনা হল। ভাগলপুরের জীবন থেকে একে একে উঠে এলো অনুপমার প্রেম, দেবদাস,কাশীনাথ, বড়দিদি,চন্দ্রনাথ,হরিচরণ,শুভদা প্রভৃতি।
 বিধবা নিরুপমার সঙ্গে ঘণিষ্ঠতা চেয়েও সংস্কারের বেড়াজালে শরৎ চন্দ্র থেকে নিরুপমা বিমুখ ছিলেন। এদের দুঃখ নিয়ে একে একে উঠে এলো 'বড়দিদি' মাধবী,'চন্দ্রনাথ'- এর গৃহত্যাগিনী সুলোচনা, অনুপমা সব একে একে বিধবার দু়ঃখ কথা। নারীর প্রেম যত খন্ডিত তত তাঁর হৃদয় হয়েছে মথিত, কেননা খন্ডিত প্রেমই জীবনকে ব্যথিত করে। তাই শরৎ সাহিত্যে নারীর পরিচয় অত্যন্ত সকরুণ। ১৯১২ থেকে ১৯৩৮ পর্যন্ত মেয়েদের নিয়ে তাই একটানা লিখে গেছেন। শরৎ- সাহিত্যের সকল নারী সাধারণ মেয়ে, মধ্যবিত্ত,নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। কেউ বা নিম্নবর্গের, কিংবা সমাজের দৃষ্টিতে ভ্রষ্টা। পতিতা,বিধবা,বৈষ্ণবী,সতী,অরক্ষনীয়া অথবা বিবাহ বহির্ভূত প্রেম - তা যেমনটাই হোক না কেন শরৎচন্দ্র তাদের প্রেমে অভিভূত হয়ে থাকতেন। তারই ফসল নারী চরিত্র অঙ্কনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিঁখুত।
   'বড়দিদি'(১৯১৪) থেকে 'শেষের পরিচয়'(১৯৩৮) - ২৩ খানা উপন্যাসে একের পর এক নারী চরিত্র নির্মানে তিনি ছিলেন অক্লান্ত এক কথা সাহিত্যিক। যেমন সহজ বিষয়, তেমনি কি সহজ ও সুন্দর ভাষা!
   'গৃহদাহ' র অচলা,, অন্যদিকে মৃণাল, 'চরিত্রহীন'এ একদিকে সাবিত্রী, অন্যদিকে কিরণময়ী,'বিন্দুর ছেলে'র বিন্দুবাসিনী,' 'পথের দাবী'র ভারতী, 'মেজদি'র হেমাঙ্গিনী,' 'নিষ্কৃতি'র শৈলজা,'দেবদাস' এর চন্দ্রমুখী,'শুভদা'র কাত্যায়নী' 'আঁধারে আলো'র বিজলীর মতো বারবণিতাকে নিয়ে আখ্যানের  সরলতা, তাদের হৃদয় সৌন্দর্য পাঠককে যুগ যুগ ধরে মুগ্ধ করে আসছে। 
 শরৎচন্দ্রের মতে 'পাপকে ঘৃণা করো পাপীকে নয়',তারই প্রমাণে বহু কুলত্যাগিনী বঙ্গ রমণী পেয়েছিল তাঁর লেখনীতে সহমর্মিতা। তিনি দেখেছিলেন শুধু বিধবারা কুলত্যাগ করেনি, অনেক সধবাও এই পথে এসেছে। অধিকাংশই এসেছে দারিদ্র্য অথবা স্বামীগৃহের অত্যাচার, উৎপীড়নের কারণে। পুরুষ শাসিত সমাজে কেবল নারীদের দোষ দেখানো হয়। তিনি 'নারীর মূল্য' প্রবন্ধে বলেছিলেন - "সমাজ নারীর ভুল ভ্রান্তি এক পাইও ক্ষমা করে না, কিন্তু পুরুষের ষোলো আনাই ক্ষমা করিবে।" প্রচলিত হিন্দু সমাজের রীতি নীতির প্রতি তীব্র অনাস্থা থেকে নারীর প্রতি সহানুভূতিতে তিনি অবিচল ছিলেন।
 পতিতারা তাদের প্রেম, প্রেমের একনিষ্ঠতা ও সেবাপরায়ণতার পরিচয় দিয়েছে। পিয়ারী বাঈ বাল্য প্রণয়ের টানে আজীবন শ্রীকান্তনিষ্ঠ থেকেছে। সাবিত্রী ও সতীশের মধ্যে চলে প্রেমের নানা খেলা,চন্দ্রমুখী অনুরক্ত হয়ে থাকে দেবদাসের প্রতি,বিজলি সত্যেন্দ্রের প্রেমে পড়ে পেশা ছেড়ে বলে - "যে রোগে আলো জ্বাললে আঁধার মরে,সূর্য উঠলে রাত্রি মরে - আজ সেই রোগেই তোমাদের বাঈজী চিরদিনের মতো মরে গেল।"
 বাস্তবে দেখা যায় এই বারবণিতারা ব্যক্তি বিশেষের কাছে আস্থাভাজন হয়, কিন্তু সামাজিক সম্মান অর্জন করেনি। প্রেমের সামাজিক স্বীকৃতি সম্ভব হয়নি বলেই শরৎচন্দ্র লিখলেন - "বড় প্রেম শুধু কাছে টানে না,ইহা দূরেও ঠেলিয়া দেয়।" 
 তাই দেখি সতীশ জীবনসঙ্গিনী হিসেবে সহধর্মিণী গ্রহন করার অধিকার পায়না,কারণ হিন্দুধর্মে বিধবা বিবাহ পাপ। তাই সাবিত্রী প্রত্যাখ্যাতা হয়। এই ভাবে রাজলক্ষ্মী,কমললতা,অন্নদা দিদি সমাজকে অস্বীকার করে ছিটকে আসতে চেয়েছে, কিন্তু সমাজের তুচ্ছ সংস্কারের মোহ ছাড়তে পারেনি। যেমন- 'গৃহদাহ' এর অচলাকে তিনি নৈতিক হিন্দু ধর্মে প্রতিষ্ঠা দিতে পারেননি,কারণ বিবাহোত্তর নারীর প্রেম সমাজ- বিরুদ্ধ কাজ। স্বামীর প্রতি হৃদয়ের একাগ্রতা হারানো অপরাধ। একনিষ্ঠতার অভাব পাপাচার। রুগ্ন মহিমকে একা গাড়িতে ফেলে সুরেশের একা অচলাকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া সমাজ বরদাস্ত করেনি, সমাজের চোখে সুরেশ ঘৃণিত। অচলাও স্বামীর প্রতি সেবাপরায়ণ মনোভাব দেখাতে পারেনি। পারেনি স্বামীর প্রতি দেহ মন প্রাণে পূর্ণাঙ্গরূপে সমর্পিত হতে। আর এর কারণে তার শেষ পরিণতি নিরাশ্রয়তা। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা।
 এইভাবে সমগ্র সাহিত্য জুড়ে নারীই যেন শরৎ-সাহিত্যের নানা গতিপ্রকৃতিতে মুখর হয়েছে। নারীর জন্যই যেন কলম ধরতে বাধ্য হয়েছিলেন। আর তারই ফলস্বরূপ দ্রুত নারী জাগরণ যে এসেছে এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
          #____#

শুক্রবার, ২৪ ডিসেম্বর, ২০২১

#কপিরাইট ও বৈষম্য -✍️ মৃদুল কুমার দাস।

# নাম- কপিরাইট ও বৈষম্য। 
      (২ফেব্রুয়ারী,২০২১)
    যে কোনও জাতির বুনিয়াদ গড়ায় ভাষা প্রধান হোতা। ভাষা আমরা যত বলি,তার চেয়ে কম লিখি,তারও চেয়ে কম পড়ি। কেউ কেউ আবার বই দিয়ে ড্রইং রুম সাজান। 
    গ্রন্থপাঠক,গ্রন্থগ্রাহক - দু'য়ের যোগফল হল বিশ্বের গ্রন্থগরীমা। আর এই দু'য়ের সংযোগ সেতু গ্রন্থ-কারবারী। এই তিনের গতিপ্রকৃতিতেই বিশ্বে গ্রন্থ-সাম্রাজ্য চালিত হয়। তবে এই সাম্রাজ্যে এই তিনের অভিমুখ তিন রকম। গ্রন্থ-কারবারীদের দ্বারা দেশের পুঁজিবাদী শক্তির একটা অংশ প্রভাবিত হয় নিঃসন্দেহে। প্রমাণ ইউরোপ। ইউরোপে গ্রন্থপাঠকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশী। আর ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়ে কপিরাইট যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের মূলে কীভাবে আছে তা জলের মতো পরিষ্কার।ভাষা,সাহিত্য,পাঠক,ক্রেতার চাহিদাকে গ্রন্থ প্রকাশক ও বিক্রেতা যেমন বুঝবেন,তেমনই দেশের অর্থনৈতিক বুনিয়াদের একটা অংশের সুরাহা হয়ে থাকে। প্রমাণ ইউরোপ। ইউরোপে গ্রন্থপাঠকের সংখ্যা সবচেয়ে বেশী। আর ঠিক এই জায়গায় দাঁড়িয়ে কপিরাইট যে অর্থনৈতিক বৈষম্যের মূলে কীভাবে আছে তা জলের মতো পরিষ্কার।
   আন্তর্জাতিক বাজারে কপিরাইটও অর্থনৈতিক বৈষম্যকে আরও দৃষ্টিকটু করেছে। ছোট ছোট দেশ,পিছিয়ে পড়া দেশে ভাষা ও সাহিত্য চর্চা প্রকাশক ও বিক্রেতার মত,বইয়ের কপিরাইট  উঠে গেলে মুনাফা বেশী হবে।
    বাংলা বইয়ের বাজারের এখানেই গন্ডগোল। বাজার সীমিত। ক্রেতার পকেটে টান। আর মুনাফাখোরদের মুনাফার লোভে গ্রন্থ পড়ে যে কোনো মুহূর্তে আসল নকল একাকার হয়ে যায়। একবার ঢাকায় বইমেলায় সুনীল গঙ্গোপাধ্যায় গেছেন আমন্ত্রিত অতিথি হয়ে। একটি স্টলে গিয়ে দেখলেন তাঁর রচিত 'রাধাকৃষ্ণ' বইটি ঝড়ের মতো বিক্রি হচ্ছে। দামে খুব সস্তা। পাঁচ ছ'কপি 'রধাকৃষ্ণ'-তে অটোগ্রাফ দিয়ে স্টল থেকে বেরিয়ে সঙ্গী বাদল বসুকে বললেন- "সব ক'টা বই জাল ছিল।"
   এখানেই দেশভেদে কপিরাইট উঠে যাওয়া আর উঠে না যাওয়া নিয়ে যৌক্তিকতা বিচার্য খুব সেনসিটিভ বিষয়। তার চেয়েও জরুরী এটাই ভাবা উচিত,কোনটা বেশী গুরুত্বপূর্ণ- বেশী মুনাফা,নাকি বেশী মানুষের কাছে বই পৌঁছে দেওয়া?
  ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 
  @ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

#বঙ্গ - পূর্ব ও পশ্চিম - ✍️ -মৃদুল কুমার দাস।

শুভ সান্ধ্য আলোচনা-বাসর।
   #বিষয় - বঙ্গ আমার জননী আমার। 
     # নাম- পূর্ব ও পশ্চিম- বঙ্গ।
      ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

       বঙ্গের আগে পূর্ব ও পশ্চিম নিয়ে বঙ্গের পরিচয় বঙ্গবাসীর এ এক দুর্ভাগ্যের কাহিনী। অখন্ড বঙ্গের একটি পৌরাণিক কাহিনী বলি তাহলে।
    পুরাণে মহর্ষি দীর্ঘতমস ছিলেন জন্মান্ধ। মহর্ষির স্ত্রীর নাম প্রদ্বেষী। কয়েক সন্তানের জননী। কিন্তু মহর্ষির সঙ্গে স্ত্রীর বনিবনা না হওয়ার জন্য দাম্পত্য সঙ্কটে তাদের সুখ দুরস্থ। 
  একদিন প্রদ্বেষী পুত্রদের নির্দেশ দিলেন তাদের বাবা দীর্ঘতমসকে গঙ্গায় ফেলে দিয়ে আসতে। ছেলেরা মায়ের আদেশ অক্ষরে অক্ষরে পালন করল। অন্ধ মহর্ষি ভাসতে ভাসতে দৈত্যরাজা বলির আশ্রয়ে এলেন। 
 এদিকে বলিরাজা ও তাঁর স্ত্রী সুদেষ্ণা নিঃসন্তান। মহর্ষির স্পর্শে সুদেষ্ণা পাঁচটি সন্তানের জন্ম দিলেন। এই পাঁচ পুত্র - অঙ্গ,বঙ্গ, কলিঙ্গ, পুন্ড্র ও সুহ্ম। এদের নামে এক একটি দেশ। দেশগুলি সব উত্তর-পূর্ব ভারতের।
   অঙ্গ হল রাজশাহী ও ভাগলপুর। উত্তরে ভাগীরথী থেকে দক্ষিণে গোদাবরী পর্যন্ত কলিঙ্গ,অধুনা উড়িষ্যাকে বলা হয়। অঙ্গ ও কলিঙ্গের  পূর্ব- প্রদেশের নাম বঙ্গ বলে অভিহিত হয়। রাজসাহী বিভাগের পশ্চিমাঞ্চল হলো পুন্ড্র। বর্ধমান ও মেদিনীপুরের পূর্বাংশ বঙ্গ,আর এই বঙ্গের পশ্চিমভাগে সমগ্র বর্ধমান সুহ্ম রাজ্যের অন্তর্ভুক্ত ছিল।  
 বায়ু,বিষ্ণু,মৎস,মার্কেন্ডেয় প্রভৃতি পুরাণে এই পাঁচটি নামের উল্লেখ পাই।
  বঙ্গ নামের নেপথ্যে এই পৌরাণিক কাহিনী বাঙালি এখন প্রায় ভুলতে বসেছে।
  নৃতাত্ত্বিক পরিচয়ে এই বঙ্গ থেকে বাঙালি জাতি অস্ট্রিক-দ্রাবিড়-মঙ্গোলয়েড- আর্যজাতির মিশ্রিত এক জাতি। আবার পরবর্তী সময়ে ইসলাম,বৌদ্ধ, জৈন,বিভিন্ন বহিরাগত রাজবংশ পাল,সেন মিশ্রনে এই মিশ্র জাতি থেকে এল জাতপাত, সম্প্রদায়,শ্রেনি ইত্যাদির বিভাজন। তার মূলে ভৌগলিক সীমা,পরিবেশও পরিচয়কে প্রভাবিত করল। ব্রিটিশ সরকারের সাম্রাজ্য বিস্তারের সুবিধার্থে বঙ্গ-বিভাজন ছিল একটি অসৎ উদ্দেশ্য চরিতার্থ করা।
 ভৌগলিক বিচারে গঙ্গা ও ভাগরথীকে মধ্যস্থ মেনে বঙ্গের আড়াআড়ি বিভাজন সাম্রাজ্যবাদীর অসৎ উদ্দেশ্যে বাঙালি হল প্রশাসনিকগত বলির পাঁঠা। গঙ্গা-ভাগীরথীর এপার ওপার। লোকসংস্কৃতি যার প্রাণের বন্ধন। ভৌগলিক সীমানায় বাহ্যিক পরিচয় বাঙালির দ্বৈত সত্তা- হিন্দু বাঙালি ও মুসলমান বাঙালি। গঙ্গা-ভাগীরথীর পূর্ব দিক পূর্ববঙ্গ। পশ্চিম 
দিক পশ্চিমবঙ্গ। 
 স্বাধীন ভারতের পূর্ব ও পশ্চিম মুছে দিয়ে অখন্ড বঙ্গদেশের তকমা নিয়ে গঙ্গা ভাগীরথীতে অনেক জল গড়িয়েছে। কিন্তু হিন্দু ও মুসলিম বাঙালির তকমায় মেরুকরণ দিয়ে হল পাঞ্জালড়াই। ইতিহাসে রক্তক্ষয়ী সংগ্রাম,উদ্বাস্তু সমস্যার কি না ঘটেনি। বাঙালি দুই স্বাধীন দেশের দ্বিধাবিভক্ত। গঙ্গা-ভাগীরথী পূর্ব ও পশ্চিম জাতিসত্তায় দ্বিধা বিভক্ত। কিন্তু সাংস্কৃতিক সত্তায় মেরুকরণ অসম্ভব। রাজনীতি তিস্তার জলে সীমাবদ্ধ,মেরুকরণ দুই দেশ। কিন্তু অন্তস্থলে সাংস্কৃতিক সমন্বয়ের ফল্গুস্রোত জাত্যাভিমান মুছে দেয়। এখানেই বাঙালি হিসেবে চির গৌরবের অঙ্গীকার হৃদয় থেকে হৃদয়ান্তরে।
 ধন্যবাদ।  নমস্কার। ❤❤🙏🙏
@ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

#গীতি সত্ত্বায় রবীন্দ্রনাথ ও নরেন্দ্রনাথ - ✍️ মৃদুল কুমার দাস


   # বিষয়- নিবন্ধ।
      # নাম- গায়ক নরেন ও জোড়াসাঁকো।
        ✍ - মৃদুল কুমার দাস। 

    
       নরেন্দ্রনাথের মধ্যেও যে গীতি-সত্তার অলৌকিকতা বিরাজ যে করছে তা রবীন্দ্রনাথের কাছে অল্প স্বল্প খবর ছিল। 
    রবীন্দ্রনাথের কিছু কিছু গান নরেন্দ্রনাথের ভালো লাগত। কন্ঠ্যস্থও ছিল। যেমন, 'তোমাকেই করিয়াছি জীবনের ধ্রুবতারা...' - গানটি বিভোর হয়ে প্রায় গাইতেন নরেন্দ্রনাথ। 
      এক ঐতিহাসিক ঘটনার সাক্ষী ১৮৮১। জুলাই মাস। মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথের ঘনিষ্ঠ বন্ধু ঋষি রাজনারায়ন বসুর চতুর্থ কন্যা লীলাবতীদেবীর বিয়ে। পাত্র কৃষ্ণ কুমার মিত্র। বিয়ে শ্রাবণের ১৫ তারিখে। অনুষ্ঠানটি হবে সাধারণ ব্রাহ্মসমাজের মন্দিরে। খুব ধুমধাম সহকারে। এই উপলক্ষে রবীন্দ্রনাথ তিনটি গান বাঁধেন। নিজেই সুর দিলেন। 
      প্রথমটি সাহানা ঝাঁপতালে- 'অবশেষে জীবনের মহাযাত্রা ফুরাইলে/তোমারি স্নেহের কোলে যেন গো আশ্রয় মিলে,/দুটি হৃদয়ের সুখ দুটি হৃদয়ের দুখ/দুটি হৃদয়ের আশা মিলায় তোমার পায়।' 
   দ্বিতীয়টি খাম্বাজ একতালে- 'জগতের পুরোহিত তুমি...', 
   তৃতীয়টি বেহাগ তেতালে- 'শুভ দিনে এসেছ দোঁহে...'। 
  সমস্যা হল কাকে দিয়ে গাওয়াবেন। হতে হল বৌঠান কাদম্বরী দেবীর দ্বারস্থ। বৌঠান কাদম্বরী দেবী নরেনকে দিয়ে গান গাওয়াতে বললেন। নতুন বৌঠান কাদম্বরী দেবী নরেনের অনেক পরিচয় দিলেন- 
   "নাম নরেন্দ্রনাথ দত্ত। প্রায়শই আসে বাবা মশায়ের কাছে। বাবা ম'শায়কে গানও শোনায়। বাবা ম'শায় ভারি স্নেহ করেন ওকে।আর বলেন,যেমন গান-বাজনায়, তেমনি লেখা-পড়ায়। তাছাড়া নানা আধ্যাত্মিক সংশয়ের মধ্যে রয়েছে ছেলেটি। কী যেন খুঁজছে সারাক্ষণ।কি ভরাট কন্ঠ্যস্বর! আর কি ব্যক্তিত্ব!" 
রবীন্দ্রনাথের মনে পড়ল নরেন্দ্রনাথের মুখ। প্রায়ই ব্রাহ্মসমাজের অনুষ্ঠানে গায় বটে! নরেনকে পেতে দ্বীপেন্দ্রকে বলা হল বাড়িতে নিয়ে আসতে।   গানের তালিম নিতে হবে যে।
    জোড়াসাঁকোর ঠাকুর বাড়িতে নরেন্দ্রনাথ হাজির। দক্ষিণের বারান্দায় মুখোমুখি রবীন্দ্রনাথ ও নরেন্দ্রনাথ। রবীন্দ্রনাথ অপূর্ব কন্ঠ্যস্বরে ও রসবাণীর সূক্ষ্ম জ্ঞানে প্রথম গানটি গাইছেন। আর নরেন্দ্রনাথকে নির্দেশ দিচ্ছেন। আশ্বস্থ করছেন দু'একবার প্র্যাকটিস করলেই গানটি উঠে যাবে।
         মুহূর্তে নরেন্দ্রনাথ বললেন তার আর দরকার নেই। শুনে শুনেই গানটি আয়ত্বে এসে গেল। নরেন্দ্রনাথ গানটিকে অপূর্ব কন্ঠ্যস্বরে রবীন্দ্রনাথকেও ছাপিয়ে গাইলেন। রবীন্দ্রনাথতো শুনে থ'। অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছেন এক বোদ্ধা আরেক বোদ্ধার দিকে।
        ঠাকুর বাড়ির দুটি গানে খুব শান্তি পেতেন নরেন্দ্রনাথ। একটি দ্বীজেন্দ্রনাথ ঠাকুরের লেখা- 
    'অনুপম মহিম পূর্ণ ব্রহ্ম কর ধ্যান।'
    আর অপরটি রবীন্দ্রনাথের। যেমন,
   'মহাসিংহাসনে বসি শুনিছ হে বিশ্ব পিতা/তোমার রচিত ছন্দে মহান বিশ্বের গীত।/মর্ত্যের মৃত্তিকা হয়ে ক্ষুদ্র এই কন্ঠ্য লয়ে।/আমিও দুয়ারে তব হয়েছি হে উপণীত।/কিছু নাহি চাহি দেব, কেবল দর্শন মাগি।/তোমারে শোনাব গীত, এসেছি তাহারি লাগি।...' - এই গান গাইতে গাইতে নরেন্দ্রনাথ খুব কেঁদে উঠতেন। গভীর ধ্যানের সঙ্গে এই গান মিশে যেত। এই গানেই নরেন্দ্রনাথ খুঁজে পেতেন, প্রাচীন ভারতের ঋষি-মন্ত্র। কি প্রত্যয়! কি ভক্তি, প্রেম,ও আত্ম সমর্পণের আকূতি! 
  ব্রাহ্মসমাজ থেকেই তিনি সঙ্গীতবোদ্ধা অচিরেই প্রমাণিত হল। ঠাকুর শ্রী রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবেরও ব্রাহ্মমমাজে যাতায়াত ছিল। ব্রাহ্মসমাজ মতবিরোধ থেকে ত্রিখন্ডিত হলেও নরেন্দ্রনাথের যাতায়াত ছিল সর্বত্রগামী। উপণিষদের উপাসনা মন্ত্র ছিল নরেন্দ্রনাথের ব্রহ্মোপাসনার একমাত্র উপায়। ব্রাহ্মসমাজ সেই সেঁতু। 
    সেই পথ ধরে নরেন্দ্রনাথ ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের কাছে পৌঁছে গেলেন।এরপর সঙ্গীতময় জীবন ঠাকুরে নিবেদন করে ঈশ্বর লাভের পথে তিনি ভারতীয় আধ্যাত্মিকতার পথিক হবেন।                               
                 ******
  @ কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

রবিবার, ১৯ ডিসেম্বর, ২০২১

# নাম - সতীত্ব ও সহমরণ। ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

শুভ আধ্যাত্মিক আলোচনা-বাসর।
#বিষয় - *আধ্যাত্মিক।*
  #নাম - *সতীত্ব ও সহমরণ।*
   ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

*"আত্তার্ত্তে মোদিতা হৃষ্টে প্রোষিতে মলিনা কৃশ।*
*ত চ ম্রিয়তে পত্যৌ সা স্ত্রী জ্ঞেয়া পতিব্রতা।।"*- যে রমণী স্বামীর দুঃখে দুঃখিতা,স্বামীর সুখে সুখিনী,স্বামী প্রবাসী হলে মলিনা ও কৃশাঙ্গী হন এবং যিনি স্বামীর মরণে সহমৃতা হন,শাস্ত্রে তাঁকে পতিব্রতা রমণী বলে। সতী,সীতা, সাবিত্রী,দময়ন্তী,অরুন্ধতী,বেহুলা সব আদর্শ সতীনারী যাঁরা ব্যবহারিক জীবনের নারীদের মডেল। নারীসমাজ কথাটিতে নারীই একম অদ্বিতীয়ম। সেখানে কেবলমাত্র মেয়েলি আদব কায়দা,লোকাচার, স্ত্রী আচার!  বিপরীতে পুরুষসমাজ,পুরুষের একাধিপত্য। 
 শঙ্করপত্নী *সতী* সতীত্বের পূর্ণপ্রতিভূ। তিনিই সতীত্বের উৎস।   বালিকা থেকে কুমারী হওয়ার জ্ঞাণোদয় হলে সতীর আদর্শে অনুগতা হয়ে অনুশীলনে ব্রতী হয় মেয়েরা। শিবপূজা তার সতীত্বের অনুসঙ্গ। তাই লোকাচার। এই দেবভক্তি থেকে পুণ্য,পবিত্রতা ও ভক্তিমতী ভাব আসে। বারব্রতধারিণী হয়। সংসারের পুণ্যার্থে এক অপূর্ব পবিত্রতার বলয়ে নিজের অবস্থানকে সুরক্ষিত করে। 
 বিবাহকালে সতীত্বের প্রধান বিচার্য বিষয় কতটা ভক্তিমতী। শিক্ষাসংস্কার,সংস্কৃতিমনস্ক,রুচিশীলতা,রন্ধনপটিয়সী,সেবাব্রতিনী একেবারে সবেতেই পরিপূর্ণা হতে হয়। আর হিন্দু সমাজে মেয়েদের মাতৃরূপের প্রাধান্য বলে গৃহবধূ হতে গেলে সতীত্বের সে কত বাছবিচার। মেয়ে হয়ে জন্মালে পরের ধন হয়ে বাপের কাছে,স্বামীগৃহে প্রবেশ কালে সতীত্বের পরীক্ষা একটা লোকাচারে পর্যবসিত হয়েছে।
 গৃহবধূ হলে রূপে লক্ষ্মী ও গুণে সরস্বতী হওয়া চাই। 
   এতসব বাছবিচারের পর ব্যবহারিক জীবনে নারীর স্থানের কথায় আসি এবার।
 কন্যাকে অপরূপা হতে হবে। নম্রা,রুচিশীল, চলনে ভীতা- শঙ্কিতা,কমলমতী,গৃহনিপুনা হতে হবে। তারপর পাকা দেখা। সেই সঙ্গে দানসামগ্রীতে মেয়ের মূল্য নির্ধারিত হয়। অর্থাৎ পণ-এ হল মেয়ের মূল্য নির্ধারিত হয়। 
  সতীত্বে সতী, সীতা, সাবিত্রী, দময়ন্তী চাই। আর পণের সময় সমাছকে নাককাটা নির্লজ্জ মনে হয়। এখন আবার বলে দাবী নেই *যা দেবেন* - যা দেবেনের হাঁ বেশী। বাবা তো খালি হাতে পাঠাতে পারেন না। মেয়ে শ্বশুরবাড়ীতে প্রবেশের পর বধূবরণ উৎসবে যৌতুক নিয়ে কানাকানি ফিসফিসানি দেখলে মনে হবে সতীত্বের সাথে এগুলো হল মেয়েটির ব্যবহারিক মূল্য, যা সতীত্বের মর্যাদা বাড়ায়। কি সমাজ! এই পণ নিয়ে টানাপোড়েন অনেক সময় সতীত্ব বৃথা হয় ,পাকা দেখা থেকে বিয়ে ভেঙে যায়। কখনো বা বিবাহস্থল থেকে বর তুলে নেওয়ার ঘটনা প্রায়শই ঘটত। এখনও। 
  একজন সতী নারীর গুণ নিয়ে শ্বশুরবাড়ীতে প্রবেশ কি লোকাচারের গুমোর! শ্বশুরবাড়ী বলা হয়,শাশুড়ী গৃহকর্তৃ। সংসারের অন্দরে আধিপত্য তাঁর।  আগেই বলেছি মাতৃপ্রধান সংসার,বধূর প্রাধান্য থাকেনা। পাশ্চাত্যে বধূর প্রাধান্য। মেয়ে ও পুরুষে স্বাধীকারের প্রাধান্য। সতীত্বের মাপকাঠি নেই। স্বামী দেবতা,সে দেবত্বগুণ থাকুক বা নাই থাকুক, স্বামীকে দেবতা বলতে হয়। পাশ্চাত্যে ওটি চলবে না। দেবত্বগুণ থাকলে তবেই তুমি স্বামীদেবতা। হিন্দু ধর্মে কেবল এই স্বামী দেবতার কথা আছে। বড়ই গন্ডগোলে ভাব  ছিল। এখনো তাই মনে হয়।
   সতীত্বের কিছু প্রমাণ বাকী থাকে বলে তাই মাতৃত্বের অ্যাসিস্ট্যান্ট হয়ে থাকতে হয়। সংসারের ট্রেনিং চলে শাশুড়ি ট্রেনার। এই শাশুড়ি নামক আইটেমটি আর্থসামাজিক অবস্থার উপর নির্ভর করে ভিন্ন ভিন্ন প্রকৃতির হন। একদিন শাশুড়ি যেদিন গৃহবধূ ছিলেন সেদিন তাকে তাঁর শাশুড়ি যে যে আচার ও নিয়ম মেনে আসতে বাধ্য করতেন ইনিও তাই করবেন। সংসারের ঐতিহ্য বলে একটা মডেল সামনে থাকবে। এখন আধুনিক শিক্ষা দীক্ষায় তার বদল কিছুটা এলেও পুরোপুরি বদলায়নি। চাকরিওয়ালা মাধ্যমে মেয়েদের ঘরে ও বাইরে সামাল দিয়ে খুব একটা স্বস্তি নেই, তবে রোজগারের দিক বলে সবাই মানানোর চেষ্টা করে। খটামটি হামেশাই লেগে থাকে সংসার যাঁতাকলে। এতো গেলো সমাজ সাংসারের ব্যবহারিক দিকের কথা। সতীত্ব অর্থনৈতিক তুল্যমূল্য বিচার্য।
 তারাই সতী নারী যাঁরা স্বামী ভিন্ন পরপুরুষের চিন্তাকে পাপ মনে করে। অসতী বলে চিহ্নিত হয় যদি অবৈধ সম্পর্কে জড়িয়ে পড়ে। এখন আইন পর্যন্ত এই পরকিয়া সম্পর্ককে বৈধতা দিতে বাধ্য হয়েছে। আধুনিকতার খাতিরে। জীবনের দাবীতে। এতদিন নারীর সতীত্ব নিয়ে যা ভেবে এসেছি তা ভেক। সতী,সীতা,সাবিত্রী হলে ব্যবহারিক ভোগ,ব্যবহারিক জীবনের আইনী বৈধতাকে অস্বীকার করা থেকে সরিয়ে রাখা মানে অনেককিছু থেকে বঞ্চিত করে রাখা। অর্থাৎ জীবন এখন খুব বৈজ্ঞানিক পথে হাঁটতে চায়। সেখানে সতীত্বের ফাঁকা বুলি অস্বীকার করলে কোনো যায় আসে না। সতীত্বেও এখন আপেক্ষিক গুণাগুণ এসেছে জুটেছে।
 সতীত্ব নিয়ে বিতর্ক এখন মেলা। আর সহমরণের দিন শেষ। সহমরণ কথাটা নিতান্তই ভেক। সহমরণের যুগকে অভিশপ্ত মানে আধুনিক সমাজ। সতীত্ব ও সহমরণ কথাটা নিতান্তই সেকেলে। সেকেলে ধরনে আটকে। বরং আধুনিক জীবনে নারী ও পুরুষের যৌথ সম্পর্কে ও সমানাধিকারে সমাজ কতটা উন্নত হবে তাই ভাবার দিন এখন। মাতৃত্ব ও বধূর মধ্যে যত দূরত্ব কমবে তত সাংসারিক অশান্তি কমবে। বধূনির্যাতন কমবে। নারী স্বাধীনতার নতুন সিলেবাসের অন্তর্ভুক্ত হয়ে আমাদের কাছে সতীত্ব ও সহমরণ নামক ভাববাদ থেকে ক্রমে সরে এসে সমসাময়িক প্রগতিশীল ভাবনার সঙ্গে যত সমবেত হব তত সমাজ ও সংসার নতুনভাবে সজ্জিত হবে।
                 *****
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...