শরৎচন্দ্রের সাহিত্যে নারী:-
শরৎচন্দ্রের (১৮৭৬-১৯৩৮) সাহিত্য-জীবনের তিনটি পর্ব -
১. প্রাক রেঙ্গুন পর্ব ২. রেঙ্গুন পর্ব (১৯০৩ - ১৯১২) ৩. রেঙ্গুনোত্তর পর্ব (১৯১২- ১৯৩৮)।
রেঙ্গুন পর্বকে বলা হয় প্রস্তুতি পর্ব। এখানে কোনো সাহিত্য রচনা করেননি। শুধু পাহাড় প্রমান অভিজ্ঞতা অর্জন ছিল। ১৯১৪ থেকে 'বড়দিদি' দিয়ে শুরু হলো কথা সাহিত্যের জয়যাত্রা। শুরু করলেন পুরাতনকে ঘিরে ঘুরে ফিরে দেখা। যত এগিয়েছেন তত চরিত্র চিত্রণে নানা রূপান্তর ঘটিয়েছেন। এই প্রেক্ষাপটে দেখা যাক শরৎ- সাহিত্যে নারীর অবস্থান কেমন ছিল।
সৃষ্টির প্রথম লগ্নে ভাগলপুরে বয়ঃসন্ধির কাল কেটেছে। এই সময় কোনো নারীকে ঘিরে দেহ-নিরপেক্ষ ভাবেই যৌনজীবন ও প্রেমজীবন গড়ে ওঠে। ১৭/১৮ যখন বয়স তখন ভাগলপুর,আর রেঙ্গুনে যখন তখন বয়স ২৬/২৭।
বালবিধবা নিরুপমা দেবীর বৈধব্য দুঃখ নিয়ে এলেন ১৮৯৭ এ ভাগলপুরে। আর তার সেই দুঃখ দেখে নারী চরিত্র পাঠের শরৎচন্দ্রের সূচনা হল। ভাগলপুরের জীবন থেকে একে একে উঠে এলো অনুপমার প্রেম, দেবদাস,কাশীনাথ, বড়দিদি,চন্দ্রনাথ,হরিচরণ,শুভদা প্রভৃতি।
বিধবা নিরুপমার সঙ্গে ঘণিষ্ঠতা চেয়েও সংস্কারের বেড়াজালে শরৎ চন্দ্র থেকে নিরুপমা বিমুখ ছিলেন। এদের দুঃখ নিয়ে একে একে উঠে এলো 'বড়দিদি' মাধবী,'চন্দ্রনাথ'- এর গৃহত্যাগিনী সুলোচনা, অনুপমা সব একে একে বিধবার দু়ঃখ কথা। নারীর প্রেম যত খন্ডিত তত তাঁর হৃদয় হয়েছে মথিত, কেননা খন্ডিত প্রেমই জীবনকে ব্যথিত করে। তাই শরৎ সাহিত্যে নারীর পরিচয় অত্যন্ত সকরুণ। ১৯১২ থেকে ১৯৩৮ পর্যন্ত মেয়েদের নিয়ে তাই একটানা লিখে গেছেন। শরৎ- সাহিত্যের সকল নারী সাধারণ মেয়ে, মধ্যবিত্ত,নিম্নমধ্যবিত্ত ঘরের সন্তান। কেউ বা নিম্নবর্গের, কিংবা সমাজের দৃষ্টিতে ভ্রষ্টা। পতিতা,বিধবা,বৈষ্ণবী,সতী,অরক্ষনীয়া অথবা বিবাহ বহির্ভূত প্রেম - তা যেমনটাই হোক না কেন শরৎচন্দ্র তাদের প্রেমে অভিভূত হয়ে থাকতেন। তারই ফসল নারী চরিত্র অঙ্কনে তিনি ছিলেন অত্যন্ত নিঁখুত।
'বড়দিদি'(১৯১৪) থেকে 'শেষের পরিচয়'(১৯৩৮) - ২৩ খানা উপন্যাসে একের পর এক নারী চরিত্র নির্মানে তিনি ছিলেন অক্লান্ত এক কথা সাহিত্যিক। যেমন সহজ বিষয়, তেমনি কি সহজ ও সুন্দর ভাষা!
'গৃহদাহ' র অচলা,, অন্যদিকে মৃণাল, 'চরিত্রহীন'এ একদিকে সাবিত্রী, অন্যদিকে কিরণময়ী,'বিন্দুর ছেলে'র বিন্দুবাসিনী,' 'পথের দাবী'র ভারতী, 'মেজদি'র হেমাঙ্গিনী,' 'নিষ্কৃতি'র শৈলজা,'দেবদাস' এর চন্দ্রমুখী,'শুভদা'র কাত্যায়নী' 'আঁধারে আলো'র বিজলীর মতো বারবণিতাকে নিয়ে আখ্যানের সরলতা, তাদের হৃদয় সৌন্দর্য পাঠককে যুগ যুগ ধরে মুগ্ধ করে আসছে।
শরৎচন্দ্রের মতে 'পাপকে ঘৃণা করো পাপীকে নয়',তারই প্রমাণে বহু কুলত্যাগিনী বঙ্গ রমণী পেয়েছিল তাঁর লেখনীতে সহমর্মিতা। তিনি দেখেছিলেন শুধু বিধবারা কুলত্যাগ করেনি, অনেক সধবাও এই পথে এসেছে। অধিকাংশই এসেছে দারিদ্র্য অথবা স্বামীগৃহের অত্যাচার, উৎপীড়নের কারণে। পুরুষ শাসিত সমাজে কেবল নারীদের দোষ দেখানো হয়। তিনি 'নারীর মূল্য' প্রবন্ধে বলেছিলেন - "সমাজ নারীর ভুল ভ্রান্তি এক পাইও ক্ষমা করে না, কিন্তু পুরুষের ষোলো আনাই ক্ষমা করিবে।" প্রচলিত হিন্দু সমাজের রীতি নীতির প্রতি তীব্র অনাস্থা থেকে নারীর প্রতি সহানুভূতিতে তিনি অবিচল ছিলেন।
পতিতারা তাদের প্রেম, প্রেমের একনিষ্ঠতা ও সেবাপরায়ণতার পরিচয় দিয়েছে। পিয়ারী বাঈ বাল্য প্রণয়ের টানে আজীবন শ্রীকান্তনিষ্ঠ থেকেছে। সাবিত্রী ও সতীশের মধ্যে চলে প্রেমের নানা খেলা,চন্দ্রমুখী অনুরক্ত হয়ে থাকে দেবদাসের প্রতি,বিজলি সত্যেন্দ্রের প্রেমে পড়ে পেশা ছেড়ে বলে - "যে রোগে আলো জ্বাললে আঁধার মরে,সূর্য উঠলে রাত্রি মরে - আজ সেই রোগেই তোমাদের বাঈজী চিরদিনের মতো মরে গেল।"
বাস্তবে দেখা যায় এই বারবণিতারা ব্যক্তি বিশেষের কাছে আস্থাভাজন হয়, কিন্তু সামাজিক সম্মান অর্জন করেনি। প্রেমের সামাজিক স্বীকৃতি সম্ভব হয়নি বলেই শরৎচন্দ্র লিখলেন - "বড় প্রেম শুধু কাছে টানে না,ইহা দূরেও ঠেলিয়া দেয়।"
তাই দেখি সতীশ জীবনসঙ্গিনী হিসেবে সহধর্মিণী গ্রহন করার অধিকার পায়না,কারণ হিন্দুধর্মে বিধবা বিবাহ পাপ। তাই সাবিত্রী প্রত্যাখ্যাতা হয়। এই ভাবে রাজলক্ষ্মী,কমললতা,অন্নদা দিদি সমাজকে অস্বীকার করে ছিটকে আসতে চেয়েছে, কিন্তু সমাজের তুচ্ছ সংস্কারের মোহ ছাড়তে পারেনি। যেমন- 'গৃহদাহ' এর অচলাকে তিনি নৈতিক হিন্দু ধর্মে প্রতিষ্ঠা দিতে পারেননি,কারণ বিবাহোত্তর নারীর প্রেম সমাজ- বিরুদ্ধ কাজ। স্বামীর প্রতি হৃদয়ের একাগ্রতা হারানো অপরাধ। একনিষ্ঠতার অভাব পাপাচার। রুগ্ন মহিমকে একা গাড়িতে ফেলে সুরেশের একা অচলাকে নিয়ে পালিয়ে যাওয়া সমাজ বরদাস্ত করেনি, সমাজের চোখে সুরেশ ঘৃণিত। অচলাও স্বামীর প্রতি সেবাপরায়ণ মনোভাব দেখাতে পারেনি। পারেনি স্বামীর প্রতি দেহ মন প্রাণে পূর্ণাঙ্গরূপে সমর্পিত হতে। আর এর কারণে তার শেষ পরিণতি নিরাশ্রয়তা। সমাজ থেকে বিচ্ছিন্নতা।
এইভাবে সমগ্র সাহিত্য জুড়ে নারীই যেন শরৎ-সাহিত্যের নানা গতিপ্রকৃতিতে মুখর হয়েছে। নারীর জন্যই যেন কলম ধরতে বাধ্য হয়েছিলেন। আর তারই ফলস্বরূপ দ্রুত নারী জাগরণ যে এসেছে এ আর বলার অপেক্ষা রাখে না।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন