ধরো হাল শক্ত হাতে
✍️ডা: অরুণিমা দাস
গল্প ১ :
প্রথম গল্প অরিনকে নিয়ে। আমাদের কলেজে শিশু বিভাগে ঠাই এখন ওর। বয়স ছয় বছর। যখন জন্মেছিল তখন থেকেই বোঝা গেছিলো নানান শারীরিক ত্রুটি আছে ওর। জন্মের ৭ দিন পর মা ওকে ছেড়ে পালিয়ে যায়। জীবন যুদ্ধে অসুস্থ ছেলে কে নিয়ে লড়াই করার শক্তি ছিল না ওর মায়ের, তাই পালিয়ে বেঁচেছিল। রেখে গেছিলো একটা চিঠি শুধু। কিন্তু হার মানেনি ওয়ার্ডের চিকিৎসক আর নার্স রা। নিয়মিত চিকিৎসা, প্রপার স্পিচ থেরাপি, ফিজিওথেরাপি আর অরিনের প্রতি তাদের ভালোবাসায় অরিন আজ পুরোপুরি হাঁটতে না পারলেও ক্রাচের সাহায্যে হেঁটে চলে নিজের কাজ টুকু করতে পারে। চোখের কিছু ত্রুটির কারণে দেখতে সমস্যা হলেও আগের চেয়ে অনেক কম। কদিন আগেই পায়ে কাঁচ ফুটিয়ে একটা বড়ো ঘা তৈরি করেছিল পায়ে। আমার কাছে প্রি আনেস্থেটিক চেক আপের জন্য যখন আসে, ওকে বলি ভয় পাস না। ওই টুকু বাচ্চা উত্তর দিল "এখন আর ভয় পাই না দিদি, আমি লোহাও হজম করে নিতে পারি।" জন্মের সাতদিন পর থেকে যার জীবন যুদ্ধে লড়াই চলছে তার কাছে এটা তো খুবই সামান্য ব্যাপার। এখন ওর ওটি হয়ে গেছে। সুস্থ আছে ও। ওটি ঢোকার আগে কোনদিন দেখা হলে গুড মর্নিং বলে ছোট্ট একটা হাসি দেয়। এই হাসি হার না মানার হাসি বুঝতে পারি। ওই ছোট্ট শিশু আমার কাছে বিরাট অনুপ্রেরণা।
গল্প ২: গতকালের নাইট ডিউটি নিয়ে একটা গল্প। আমার প্রতিটি নাইট ডিউটি তে কিছু না কিছু ঘাটা কেস হবেই। কাল ও তাই হয়েছে বলার অপেক্ষা রাখে না। মাঝরাতে একটা পেশেন্ট ভর্তি হলো বার্স্ট আবডোমেন নিয়ে। এরকম পেশেন্ট সাধারণত ইলেক্টিভ কেস হিসেবে ভর্তি হয়, ইমার্জেন্সী তে এসেছে মানে খারাপ অবস্থা। জিজ্ঞেস করলাম এতদিন কি করছিলে? বললো দিদি পেটে ব্যান্ডেজ জড়িয়ে থাকতাম, পরীক্ষা ছিল বলে ভর্তি হইনি। আজ বিকেলে পরীক্ষা দিয়ে ফেরার সময় বাকি স্টিচ গুলো খুলে যাওয়ায় এত যন্ত্রণা হচ্ছিলো যে আর থাকতে পারলাম না। তবে পরীক্ষা খুব ভালো দিয়েছি ম্যাম। সত্যিই সফলতা এভাবেই আসে, বুঝলাম। কমফোর্ট জোনের বাইরে বেরিয়ে চড়াই উতরাই পেরিয়ে বোধহয় সফলতাকে ছোঁয়া যায়।
পোস্ট অপ পিরিয়ডে সে এখন ভালোই আছে আশা করি।
গল্প ৩: এটা হলো অন্য এক লড়াইয়ের গল্প যে লড়াইতে না জিতলে হয়তো আজ প্রথম দুটো গল্প লেখার মত অবস্থায় আসতাম না। এমবিবিএস পাস করার পর ইন্টার্নশিপ তো মন দিয়েই করেছিলাম, পেরিফেরি কলেজ মানেই কাজের খুব চাপ। ওই এক বছরে বই থেকে অনেক দূরে চলে গেছিলাম। ফাইনাল ইয়ারের পড়ার চাপ থেকে মুক্তি পেয়েছিলাম বলে আর বই পত্র ছুঁয়েও দেখতাম না। ডবল ডিউটি, নার্সিং হোম, হাউস স্টাফ শিপ করছি। প্রচুর পয়সার মুখ দেখছি কিন্তু পরে বুঝলাম নামের পাশে স্পেশালিটি ডিগ্রী না থাকলে এসব উপার্জন বেকার। সব বন্ধুরা দেখতাম পোস্ট গ্রাজুয়েট এন্ট্রান্স এক্সামের জন্য পড়ছে। বই পত্র কিনলেও পড়তে ইচ্ছে করতো না। ডিউটি আর ঘুম এভাবেই চলছিল। হাউসস্টাফশিপ করে আরো এক বছর নষ্ট করলাম। তখন কিছু বন্ধুরা চান্স পেয়ে গেছে এম ডি তে। সেই বছরটা মন দিয়ে পড়ার চেষ্টা করলাম। পড়ার বইগুলোতে মনোনিবেশ করতে বেশ কষ্ট হচ্ছে, খালি ঘুম পেয়ে যাচ্ছে। চব্বিশ খানা সাবজেক্টের একদিনে এক্সাম আর তিনশোটা কোয়েশ্চন আর হলের সাড়ে তিন ঘণ্টা আমার ভাগ্য নির্ধারণ করবে ভেবেই আতঙ্কিত হতাম। যাইহোক এভাবে এক বছর গেলো, পরীক্ষা দিলাম। রেজাল্ট হলো না কিছুই, নো র্যাঙ্ক এলো। ভাবলাম আরেকটা বার ট্রাই নিয়ে দেখি। আরো একটা বছর কোনো রকম ইনকাম নেই সেই অবস্থায় পড়তে বসা। কোনো আত্মীয়দের সাথে কথা বলতাম না ভয়ে। কারণ কথা হলেই জিজ্ঞেস করতো " কি রে এমবিবিএস পাস করে করলি টা কি! পোস্ট গ্রাজুয়েট এন্ট্রান্স ক্র্যাক করতে না পারলে কি করবি?" এই কথা গুলো মনের ওপর এত প্রভাব ফেলতে লাগলো যে পড়ায় মন বসাতে পারতাম না। তারপর নিজেকে পুরোপুরি আলাদা করে নিলাম বাইরের জগৎ থেকে। বুঝলাম নিজের মোটিভেটার নিজেকেই হতে হবে। পড়তে সবসময় ভালো লাগতো না। মাঝে মাঝে ইউ টিউব সন্দীপ মাহেস্বরী র ভিডিও দেখতাম। যথাসময়ে পরীক্ষা এসে গেলো। এক বছর পড়ার পড়েও রেজাল্ট কোনো রকম হলো। যা স্কোর হলো তাতে বড়জোর এনাটমি, বায়োকেমিস্ট্রি আসবে। কিন্তু এই সাবজেক্ট গুলোর সাথে অতটা হৃদ্যতা ছিল না। সবাই বললো দুবার হলো এবার জি ডি এম ও শিপ জয়েন করে গ্রামে চলে যা। কিন্তু কোনোদিন নিজের মন ছাড়া কারোর কথা শুনিনি। বাড়িতে সবাইকে বুঝিয়ে নিজের কলেজ প্যাথলজিতে হাউস স্টাফ শিপ নিলাম কারণ ক্লাস করার আর বই কেনার খরচটা উঠে যাবে এতে। ছ মাস মত ডিউটি করলাম। কিছুটা টাকা জমিয়ে বাড়িতে বসলাম শেষ তিন মাস পরে পরীক্ষা দেবো বলে। সব বন্ধুরা পেয়ে গেছে ততদিনে চান্স। কেউ ফার্স্ট ইয়ার, কেউ বা সেকেন্ড ইয়ার। ওদের দেখলে কষ্ট হতো খুব, কিন্তু ভেঙে পড়লে চলবে না জানতাম। তাই শেষ তিনমাস আদা জল খেয়ে লাগলাম। এটাই শেষ চান্স। আর কোনো চান্স পাবো না আমি কারণ সিলেবাসে আমূল পরিবর্তন আসছে পরের বছর। রাতে তিন চার ঘণ্টা ঘুম আর বাকি সব সময় পড়া, রিভিশন দিতে লাগলাম। সোশ্যাল মিডিয়া থেকে নিজেকে দূরে সরিয়ে নিলাম। পরীক্ষা এসে গেলো জানুয়ারি তে। এক রাতের কালীপূজার মত একটা পরীক্ষা জীবনের পরবর্তী গন্তব্য নির্ধারণ করবে। পরীক্ষা দিলাম হলো আগের দুবারের চেয়ে ভালোই। রেজাল্ট যেদিন বেরোলো স্কোর দেখে বুঝলাম না আর গ্রামে যেতে হবে না। আমার লড়াই বিফলে যায়নি।
কাউন্সেলিংয়ের ধাপ উত্তীর্ণ হয়ে শেষে নিজের মনোমত কলেজে পছন্দমত সাবজেক্ট নিয়ে ভর্তি হলাম। দেখা যাক এর পর কি হয়! সুপার স্পেশালিটি নিয়ে পড়তে পারি কিনা!! একটা কথা সব সময় মাথায় রাখি, কঠোর পরিশ্রমের কোনো বিকল্প নেই। দেরিতে হলেও সাকসেস আসতে বাধ্য।
"এই জীবনের পথ সোজা নয় যেন,
বড়ো আঁকাবাঁকা বন্ধুর।।"
এই কথা গুলো মাথায় রেখে চলার চেষ্টা করি। স্বপ্ন দেখি হয়তো কোনো একদিন কোনো স্টেজ দাড়িয়ে আমিও কাউকে অনুপ্রেরণা মূলক কথা বলবো, লড়াইতে জেতার আদর্শ পথের দিশা হয়তো বা দেখাতে পারবো।
সত্য ঘটনা অবলম্বনে
©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন