হোক কষ্ট- আছি পাশে
✍️ডা: অরুণিমা দাস
গল্প ১:পার্কের বেঞ্চে বাবার সাথে বসে আছে একটা ছোট্ট ছেলে। আপন মনে বল নিয়ে খেলা করছে। সামনে দিয়ে একটা আইস ক্রিম গাড়ী যাচ্ছিল। ছেলেটা এক দৃষ্টে তাকিয়ে আছে ওই দিকে। বাবা মনের কথা বুঝতে পেরে একটা আইস ক্রিম কিনে এনে দিলেন ছেলেটিকে। যতটা না খেলো তার চেয়ে বেশি ফেলে নষ্ট করলো। জামা কাপড়ের অবস্থাও খারাপ হলো। দুর থেকে একজন ভদ্রমহিলা জিনিসটা লক্ষ্য করছিলেন। কাছে এসে বললেন কি অভদ্র ছেলে রে বাবা! কোনো ম্যা শেখায় নি মা বাবা। শুনে ছেলেটির বাবা বেঞ্চ থেকে উঠে গিয়ে বললেন ম্যানার্স! হোয়াটস দ্যাট? ওসব ম্যানার্স আপনার কাছে রাখুন। আমার ছেলে অটিজমে আক্রান্ত। আমার কাছে খুব স্পেশাল ও। যখন ওর মা জানতে পারে ও অটিস্টিক চাইল্ড, ছেড়ে চলে যায় ওকে। আমিই ছেড়ে যেতে পারিনি ওকে। ওর মনের ভাষা বুঝতে রেগুলার নেটে পড়াশোনা করি। এখন আর কোনো অসুবিধে হয় না। ও নিজের মতো করে একটা জগৎ বানিয়ে নিয়েছে যেখানে শুধু আমি ছাড়া কেউ নেই। রোজ দৌড়ে ছুটে অফিস করি, ওকে নিয়েই অফিস যাই, যতই কষ্টে জর্জরিত থাকি ওকে আমি ঠিক মানুষ করবোই। পাশে আছি ওর সবসময়। ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি শক্তি দিন আমায়। ছেলেটি বাবার কোলের কাছে এসে বললো বাব..বা। চলো বাবা আমরা বাড়ি যাই, বললেন ছেলের বাবা। ছেলেকে নিয়ে পার্ক থেকে চলে গেলেন। ভদ্রমহিলা সরি বললেন,কিন্তু শোনার মত কেউ ছিলো না সেখানে। মনে মনে এক অসহায় বাবার লড়াইকে কুর্নিশ জানালেন।
গল্প ২ : আন্ডার গ্রাজুয়েট করছি যখন মেডিসিন ক্লাসে দেখতাম এক স্যার সবসময় মেয়েকে নিয়ে ডিউটি তে আসতেন। মেয়েটিকে ডক্টরস রুমে বসিয়ে আমাদের ক্লাস নিতেন। ক্লাস শেষ হয়ে গেলে মেয়েকে গিয়ে পড়াতেন, অঙ্ক করাতেন। একদিন কথা প্রসঙ্গে আমাদের মেডিসিন ওয়ার্ডের গ্রুপ ডি দাদা কে জিজ্ঞেস করলাম স্যার মেয়েকে নিয়ে এরকম সব জায়গায় যান? দাদা বললো হ্যা ম্যাডাম, স্যারের স্ত্রী তো সিজোফ্রেনিয়াতে আক্রান্ত। নিজের বাপের বাড়ীতে থাকেন। স্যার প্রথমে খুব ভেঙে পড়েছিলেন। পরে নিজেকে সামলে নেন মেয়ের কথা ভেবে। এখন মেয়েকে এক মুহুর্ত কাছছাড়া করেন না। আপনাদের ক্লাস নেবেন, রাউন্ড দেবেন তারপর ঠিক সময় মতো মেয়েকে কোচিং ক্লাসে নিয়ে ছুটবেন। সব শুনে মনে মনে
স্যারের প্রতি শ্রদ্ধা আরও বেড়ে গেলো। পরে স্যারের মেয়ের সাথে ভালো সম্পর্ক হয়ে গেছিলো আমাদের। স্যার বলতেন আমাদের, জীবনে যতই কষ্ট আসুক, হার মানবিনা। লড়াই করে যাবি শেষ পর্যন্ত। ঈশ্বরও তোদের পাশে এসে দাঁড়াবেন। স্যারের কথা গুলো মেনে চলার চেষ্টা করি আজও।
গল্প ৩ : সোমবারের রাত, নাইট ডিউটি। কিছু ঘটবেনা এটা হতেই পারে না। অর্থোপেডিক বন্ধু এসে বললো একটা বয়স্ক মহিলা এসেছে, হিপ ডিসলোকেশন নিয়ে। ওর হিপ প্রপার পজিশনে এনে প্লাস্টার করবো। বললাম আচ্ছা কর, আই ভি ড্রাগস দিয়ে সিডেট করে রাখবো। টেবিলে গিয়ে দেখি এক আশি বছরের বয়স্কা মহিলা। অসহ্য যন্ত্রণায় কাতরাচ্ছে। জিজ্ঞেস করলাম কতদিন আগে হয়েছে? বললো দিন পনেরো হবে। এতদিন আসোনি কেনো গো? বললো নাতনীর পরীক্ষা ছিল, ওকে কে রান্না করে দেবে? ওর তো নিজের কেউ নেই। আজ আর পারছিলাম না যন্ত্রণা সহ্য করতে, তাই ও নিয়ে এলো। বাইরে হাই রিস্ক কনসেন্ট নিতে গিয়ে দেখলাম নাতনি কাঁদছে। বললাম এই বয়সে অনেক সমস্যা হতে পারে, তাই বন্ড সাইন করতে হবে তোমায়। হাতে ধরে বললো আমার কেউ নেই ম্যাডাম উনি ছাড়া। এতদিন কোমর যন্ত্রণা নিয়ে দাঁতে দাঁত চেপে ছিল শুধু আমার জন্য, আজ আর লুকোতে পারেনি আমার থেকে। আজ একপ্রকার জোর করে নিয়ে এলাম। সব শুনে সাইন করিয়ে নিয়ে ভেতরে এলাম। মহিলা বললেন ওর আরও দুটো পরীক্ষা বাকি গো। বললাম এতো ভেবো না সব ঠিক হয়ে যাবে। যখন এক্স রে প্লেট দেখলাম, দেখি একটা ফেমোরাল হেড ইমপ্ল্যান্ট বসানো আছে সেটাই ডিসলোকেট হয়েছে। এটা একদিনের ঘটনা নয়। একমাস ধরে ধরে এটা নিজের জায়গা থেকে সরে গেছে ক্রমশ। আর বুঝতে পেরেও শুধু নাতনীর কথা ভেবে বৃদ্ধা অসহ্য যন্ত্রণা নিয়েও সহ্য করে গেছে কষ্টটা।তারপর শুরু হলো ম্যানিপুলেশন, টানা ৪৫ মিনিটের চেষ্টায় কিছুটা মোবিলাইজ হলো ফেমোরাল হেড। ফাইব্রোসিস হয়ে হেড আর্টিকুলেশনের জায়গাটা ছোট হয়ে যাওয়ার জন্য পুরোটা ঠিক হলো না। বলা হলো অপারেশন লাগবে। সেটা শুনেও বৃদ্ধা বললো যা হবে আমার নাতনীর পরীক্ষার পর। আমায় এখন বাড়ি ছেড়ে দাও। ব্রেস পড়িয়ে প্লাস্টার করে ছেড়ে দেওয়া হলো ওনাকে।
সত্যিই এই মানুষের লড়াই গুলো কি অদ্ভুত রকমের। কেউ নিজের জন্য ভাবছে না। প্রাণপাত করছে নিজের ছেলে, মেয়ে বা নাতি নাতনীর জন্য।
ছবির সাথে লেখাটা গেলো কিনা জানিনা, তবে ছবি দেখে যেটা বুঝলাম, সবাই নিজের ভেতরে যন্ত্রণা নিয়েও ঈশ্বরের কাছে লড়াইয়ের শক্তির জন্য প্রার্থনা করে যাচ্ছে অবিরত নিজেদের আপনজনদের রক্ষা করার জন্য। লড়াই চলছে প্রতিনিয়ত,বেঁচে থাকার আর বাঁচিয়ে রাখার লড়াই।
©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস
বেশ সুন্দর। চমৎকার!👍👍❤️❤️🌻🌻
উত্তরমুছুন