মঙ্গলবার, ২৬ জুলাই, ২০২২

চিত্রালোচনা✍️ ডা: অরুণিমা দাস

চিত্রালোচনা
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

চিত্র ১

আরশি সমুখে বসে আজ ভাবি আমি একাকী
অতীতের দিনগুলো পড়ছে মনে,স্মৃতিরা তো দেয়নি ফাঁকি।

চিত্র ২
নিশ্চিন্তে মাথা রাখি তোমার কাঁধে,এ যে ঠিকানা আমার ভরসার
জনম জনমের সুখ দুঃখের সাথী যে তুমি আমার।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

রবিবার, ২৪ জুলাই, ২০২২

লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স✍️ ডা: অরুণিমা দাস

লাইফটাইম এক্সপেরিয়েন্স
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

আজ গাইনি ওটিতে বারোঘণ্টা ডিউটি । সকাল সকাল ফ্রেশ হয়ে ব্রেকফাস্ট করে হাজির হলাম ডিউটি রুমে। সাড়ে আটটা হবে হয়তো, ভাবলাম একটু রেস্ট নিয়ে নেই কখন ডাক আসবে কেস উঠছে বলে! ঘণ্টা খানেক শুয়েছি গাইনির আর এম ও স্যার এসে হাজির হলেন। বললেন একটা ঘাটা কেস উঠবে রে! বললাম হ্যা বলুন স্যার কি কেস? বললেন অ্যাবর্শন করাতে গিয়ে পেশেন্টের জরায়ু ফুটো হয়ে গেছে। সেখান দিয়ে ইন্টেস্টাইনাল পার্ট ঢুকে গিয়ে পেটে ইনফেকশন ছড়িয়ে গেছে। হাই ফিভার পেশেন্টের আর সেপসিস ডেভেলপ করেছে। বললাম ঠিক আছে, পেশেন্ট রেডী করুন,আমি হাই ডেফিনেশন এ গিয়ে পেশেন্ট দেখে নিচ্ছি আগে। এইচ ডি ইউ তে গেলাম, দেখি পেশেন্ট মাঝ বয়সী মহিলা, আগে দুটো সিজার হয়েছে। বললাম কেমন আছো এখন? বললে পেটে খুব ব্যথা। ইন্টার্ন কে বললাম জেলকো করেছিস? দু হাতে চ্যানেল করে রাখিস! বললো দিদি চ্যানেল করা যাচ্ছে না! রেগে বললাম আগে বলিসনি কেন? এখন পেশেন্ট কে ওটি তে তোলার আগে বলছিস? সিরিয়াস কবে হবি? প্রি লোড করার দরকার ছিল। চুপ করে রইলো। বললাম ওটি তে তোল, সেন্ট্রাল লাইন করবো। তারপর কেস আন্ডার করবো। পেশেন্ট টেবিলে উঠলো। সেন্ট্রাল লাইন করলাম সাবক্লাভিয়ান ভেইন এ। সেই লাইন পেটেন্ট হতে ড্রাগ আর ফ্লুইড দিয়ে পেশেন্ট আন্ডার করলাম। কেস শুরু হলো। ইনট্রা অপারেটিভ পিরিয়ডে পেশেন্ট ভালোই ছিল। ঠিক মতো করে এক্সটিউবেট করে পেশেন্ট রিভার্স করছি এমন সময় পাশের টেবিলে জুনিয়র স্পাইনাল দিয়ে পোস্ট সিজার পেশেন্ট কে আন্ডার করছিল। বললাম দেখে দিস ড্রাগ। পাশের টেবিলে পেশেন্ট আন্ডার হয়ে শুয়ে পড়েছে তখন, আমার টেবিলে পেশেন্ট রিভার্স হয়ে গেছে। হঠাৎ চোখ গেলো পাশের টেবিলের মনিটরে, রোগীর স্যাচুরেশন ৮৯%। জুনিয়রকে বললাম প্রোব লাগা ঠিক করে, প্রোব লাগানোর পরও স্যাচুরেশন বাড়লো না, বরং আরও কমতে লাগলো। আমার টেবিল ছেড়ে ছুটলাম আমি পাশের টেবিলে। গিয়ে পেশেন্টের মুখ থেকে অক্সিজেন মাস্ক সরিয়ে বেইন সার্কিট ধরে ব্যাগ মাস্ক কন্টিনিউ করা শুরু করলাম, তখন স্যাচুরেশন জিরো। পেশেন্টের তখন কোনো রেসপন্স নেই। পালস পাচ্ছি না, সি পি আর দিতে বললাম। ইন্টার্ন সি পি আর দেওয়া শুরু করলো। আর দেখি আমার জুনিয়র খেয়াল করেনি জেলকো এক্সট্রা হয়েছে। ফ্লুইড ঠিক মত না পাওয়ায় পেশেন্টের হাইপো টেনশন হয়েছে প্লাস টেবিলের মাথার দিক এতটা নীচু করেছে যে হাই স্পাইনাল হয়ে রেসপিরেটরি মাসল এফেক্ট হয়ে অ্যাপনিক হয়ে গেছে পেশেন্ট। কন্টিনিউয়াস সি পি আর এবং ব্যাগ মাস্ক করে পেশেন্টের স্যাচুরেশন ১০০ তে ওঠালাম। অ্যাট্রোপিন আর অ্যাড্রেনালিন দিলাম এক অ্যাম্পুল করে। হার্ট রেট বেশ খানিক বেড়েছিল। পেশেন্ট একটু স্টেবল হতেই গাইনি পি জি টি কে বললাম সিজার শুরু করো,নয়তো বাচ্চা খারাপ হবে। সিজার শুরু হলো,ঈশ্বরের কৃপায় বাচ্চা সুস্থ ভাবে পৃথিবীর আলো দেখলো। ততক্ষনে পেশেন্ট ও চোখ মেলে তাকিয়েছে, নাম জিজ্ঞেস করলাম! হেসে বললো বীথি। বললাম কেমন আছো? বললো ভালো আছি। গলার স্বর স্বাভাবিক হয়েছে দেখলাম। বললাম বাচ্চা ভালো আছে, তুমি চিন্তা করো না। জুনিয়রের দিকে তাকিয়ে বললাম সিরিয়াস হও। জেলকা এক্সট্রা এটা মেজর মিসটেক। সিনিয়র হও, বুঝবে কত চাপ! চুপ করে রইলো ও। পরে অবশ্য ওকে ভালো করে বুঝিয়েছিলাম কি ভুল থেকে কি কি ক্ষতি হতে পারে পেশেন্টের! বললো খেয়াল রাখবো। এরপর আর কি! ডিউটি থেকে ফেরার সময়ে এইচ ডি ইউ তে গিয়ে পেশেন্ট দুটোকে দেখে এলাম। দিব্যি আছে দেখলাম। মনে মনে ঈশ্বর কে ধন্যবাদ দিলাম। কোথা দিয়ে বারো ঘণ্টা কেটে গেছে খেয়ালই নেই। হোস্টেলের পথে পা বাড়ালাম, গিয়ে ঘুম দিতে হবে ভালো করে। 
                      I treat,he cures!
                  Thanks to almighty🙏

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ২১ জুলাই, ২০২২

শিরোনাম- অবিজিত ✍️ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম- অবিজিত
✍️ডা: অরুণিমা দাস



"অবজ্ঞা অবহেলা হাসিঠাট্টা তোমায় নিয়ে যে যতই করুক  
তোমায় কখনো যেনো থামাতে না পারে সেইসকল নিন্দুক।"

যারা কাজ করে ভুল তাদেরই হয়। আর যারা সেই ভুল নিয়ে হাসি তামাশা করে তাদের মত নীচু মানসিকতার লোকেরা এই দুনিয়ার কলঙ্ক। এসব হাসি মজা মাথায় রেখে সেগুলোকে পজিটিভ ওয়ে তে নিয়ে এগিয়ে যাওয়ার নাম ই চ্যালেঞ্জ। তাই লাইফ কে কখনোই বলা উচিত নয় "হোয়াই মি"! বলা উচিত "অলওয়েজ ট্রাই মি"!

আজ একজন এমন ব্যক্তির কথা বলতে চলেছি যার মস্তিষ্কের বিকাশ তার সমসাময়িক বাচ্চাদের মত ছিল না। কিছুটা ধীর গতিতে হচ্ছিলো। তার জন্য তাঁকে স্কুলে স্যার সহপাঠী দের উপহাসের পাত্র হতে হয়েছিলো। কিন্তু তাদের এই উপহাস তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি কোনো গণ্ডিতে। একদিন ঠিক তার প্রতিভার বিকাশ ঘটেছিল আর সেই প্রতিভার জোরেই তিনি একদিন বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানী হিসেবে পরিচিত হয়েছিলেন। 

অনেক বড় বিজ্ঞানী ছিলেন তিনি। জন্ম হয়েছিল ১৮৭৯ সালে জার্মানির মিউনিখ শহরে। অথচ এই বিজ্ঞানীর ছেলেবেলা ছিল একেবারেই সাদাসিধে এবং সম্ভাবনাহীন। কেউ তখন ভাবতেও পারেনি এই ছাপোষা ছেলেটিই বড় হয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক হবেন। এমনকি পৃথিবীর সবচেয়ে বড় যে পুরস্কার, নোবেল প্রাইজ সেটাও তিনি পাবেন বিজ্ঞানের একটি থিওরি আবিষ্কার করে। এই ব্যাক্তি সর্বপ্রথম আলোচনায় আসেন একটি নিবন্ধ লিখে। নিবন্ধের বিষয় আপেক্ষিকতাবাদ। অথচ ভেবে দেখলে বোঝা যায় আত্মভোলা,বেখেয়ালি এই বিজ্ঞানির বয়স তখন মাত্র কুড়ি। সেই জন্মের পর থেকেই কিন্তু তিনি আত্মমগ্ন থাকতে ভালোবাসতেন। অহেতুক কিছু বলা একেবারেই ছিল স্বভাববিরুদ্ধ। একটা ঘটনা বলা যাক - ওনার সম্পর্কে বলা হয়ে থাকে,তিনি কথা বলতে শুরু করেন দেরিতে, চার বছর বয়সে। পড়তে শেখেন আরও পরে,সাত বছর বয়সে। ডিলেড ডেভেলপমেন্টাল মাইলস্টোন ছিল তার। তিন পেরিয়ে চারে এসেও তিনি যখন কথা বলছিলেন না তখন বাবা-মা খুব চিন্তায় পড়ে গেলেন। এক রাতে তাদের দুশ্চিন্তার অবসান ঘটল। খাবার টেবিলে তিনি হঠাৎ বলে উঠলেন, স্যুপটা খুব গরম! তাঁর মুখে কথা শুনে সবাই খুব অবাক হয়ে জানতে চাইলেন, এতদিন তুমি কথা বলোনি কেন? তিনি উত্তর দিলেন,এতদিন তো সব ঠিকমতই চলছিল।সেই ছেলেবেলাতেই কতটা ভাবুক প্রকৃতির ছিলেন তিনি অথচ তার এই স্বভাবটিকেই মানুষ অন্য চোখে দেখত। একবার তো ক্লাসটিচার তার বিরুদ্ধে মন্তব্যই করে ফেললেন, এ বোকা ছেলেকে দিয়ে কিছু হবে না। আসলে ঘটনা হয়েছিল যে ছেলেবেলায় খুব শান্ত স্বভাবের ছিলেন। ক্লাসে স্যার কিছু জানতে চাইলে অনেক ভেবে উত্তর দিতেন। চট করে কিছু বলতে পারতেন না। ভাবতে গিয়ে দেরী তো হতোই,উপরন্তু তোতলামির কারণে কথা আটকে যেত। ফলে সহপাঠী, শিক্ষকদের কাছে তিনি প্রায়ই হাসির পাত্র হতেন। এসব কারণে ক্লাসটিচার একদিন বলেই ফেললেন,ছেলেটি আস্ত বোকা! ওকে দিয়ে কিচ্ছু হবে না।কিন্তু ছেলেটির মা এসব কথা মোটেই বিশ্বাস করতেন না। বরং সবাইকে শুনিয়ে বলতেন, তোমরা দেখে নিও ও বড় হলে অধ্যাপক হবে। অনেক নাম করবে। পরে মায়ের কথাই সত্য প্রমাণিত হয়েছিল। ছেলেটি বড় হয়ে অধ্যাপক তো বটেই, অনেক বড় বিজ্ঞানী হয়েছিলেন।  ভাগ্যিস মা তখন ছেলেটির পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। আসলে মায়েরা তো এমনই হয়, তাই না! ছেলে একটু ভাবুক তাতে কী! সে বন্ধুদের সঙ্গে মারামারি তো দূরের কথা দুষ্টুমি পর্যন্ত করত না। সে থাকত তার মতো। তাই দেখে সবাই তাকে অন্যরকম বোকা ভাবত। কিন্তু তিনি মোটেও বোকা ছিলেন না। তিনি ছেলেবেলা থেকেই ছিলেন কৌতূহলী।  হেরম্যান ছিলেন ছেলেটির বাবা। তিনি একবার ছেলেকে উপহার হিসেবে একটা কম্পাস কিনে দিলেন। কম্পাস পেয়ে ছেলেটি সারাক্ষণ শুধু সেটা নিয়েই মেতে থাকেন। হঠাৎ তিনি লক্ষ্য করলেন, আরে! কম্পাসের কাটা কেবল একদিকেই ঘুরে যাচ্ছে, কোনো অবস্থাতেই কাটা অন্যদিকে ফেরানো যাচ্ছে না কেন? তখন বাবার কাছে এর কারণ জানতে চাইলেন। বাবা ছেলের কৌতূহলী মনের পরিচয় পেয়ে খুব খুশি হলেন। তিনি ছেলেটিকে এর কারণ ব্যাখ্যা করে বুঝিয়ে বললেন। ছোটবেলার এই কৌতূহলই ছেলেটিকে বিজ্ঞানী করে গড়ে তুলেছিল। তাই তো হওয়ার কথা। তুমি যদি কোনো কিছু দেখে মনে প্রশ্ন না আসে সে তাহলে শিখবে কীভাবে? সে জন্যই তো বড়দের কাছে প্রশ্ন করে জেনে নিতে হয়। ছোটবেলায় ছেলেটির ইচ্ছা ছিল আলোর রথে চড়বেন। আলো নিয়ে তিনি সব সময় ভাবতেন। ক্লাসে বসে সূর্যের আলো, বাড়িতে বৈদ্যুতিক আলো নিয়ে ভাবতে গিয়ে অনেকবার বড়দের বকুনিও তাকে শুনতে হয়েছে। ১৪ বছর বয়সে আলোর রথে চড়ার বৈজ্ঞানিক পন্থা নিয়ে তিনি ভাবতে শুরু করেন। আপেক্ষিক তত্ত্ব তৈরির সময় এই ভাবনাই তাকে সবচেয়ে বেশি আলোড়িত করেছে। অনেক বড় হয়েও কিন্তু তার মাথা থেকে আলোর রথে চড়ার এই ভূত যায়নি। তো একদিন হয়েছে কী! ছেলেটির স্কুল একেবারেও ভালো লাগত না। কিন্তু কী আর করা! মায়ের আদেশ স্কুলে যেতেই হবে। তাই বাধ্য হয়ে স্কুলে যাওয়া। মা বলেছে, বড় হয়ে অধ্যাপক হতে হবে, তাই অনিচ্ছা সত্ত্বেও পড়াশোনা করা। কিন্তু করলে কী হবে, ক্লাসে গিয়ে শেষ বেঞ্চে দেয়ালের কোণে চুপচাপ বসে থাকতেন। একদিন সূর্যের আলো জানালার কাঁচ ভেদ করে কীভাবে ক্লাসের ভেতর আসছে একমনে এ নিয়ে ভাবছিলেন। হঠাৎ স্যার তাকে দাঁড় করিয়ে পড়া জিজ্ঞেস করলেন। অমনোযোগী থাকায় তিনি উত্তর দিতে পারলেন না। স্যার তাকে শাস্তিস্বরূপ হল রুমে পাঠিয়ে দিলেন। হল রুম ছিল বেশ বড় এবং ঠাণ্ডা। ছেলেটির কিন্তু জায়গাটা বেশ পছন্দ হলো। ক্লাস থেকে বের করে দেয়ায় তিনি বরং খুশিই হলেন। কারণ সেখানে বসে তিনি অন্তত নিরিবিলি নিজের মতো করে ভাবতে পারবেন।ক্লাস, স্যারের তিরস্কার, সহপাঠীদের বিদ্রুপ- সব ভুলে ছেলেটি সেই ঠাণ্ডা হল রুমে বসে সূর্যের আলো নিয়ে ভাবতে ভাবতেই ক্লাসের সময়টুকু পার করে দিলেন। এই ভাবনাটাই ছিল তার গবেষণা। আর এই গবেষণা করেই তিনি আবিষ্কার করেছিলেন আপেক্ষিক তত্ত্ব E=mc^2।বড় হয়ে আমরা এসব নিয়ে পড়াশোনা করেছি ফিজিক্স এ। তাই কথা কম,কাজ বেশী এই মনোভাব নিয়ে চললে লোকের কথা আর গায়ে এসে লাগে না। জীবনে সঠিক পথে এগিয়ে যাওয়ার দিশা দেখিয়ে দেয় লোকজনের এই হাসি,ঠাট্টা অবহেলা গুলো।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বুধবার, ১৩ জুলাই, ২০২২

নক আউট ✍️ ডা: অরুণিমা দাস

পরিত্রাণ
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

কুয়াশা ঘেরা পাহাড়টা নন্দিনীদের হোটেলের 
বারান্দা থেকেই দেখা যাচ্ছিল। চাদরটা গায়ে জড়িয়ে বারান্দায় এসে বসেছিল নন্দিনী। একদৃষ্টে তাকিয়েছিলো বাইরের দিকে। বাড়ীর কথা খুব মনে পড়ছিলো ওর। মায়ের ওষুধ, ভাইয়ের পড়াশোনা সব কিছু চালাতে ও মেনে নিয়েছিল জামাইবাবুর কথা। বিউটি পার্লারে কাজ জোগাড় করে দেওয়ার নাম করে জামাইবাবু ওকে নিজের এক ক্লায়েন্টের হাতে তুলে দিয়েছিল,সেই থেকে শুরু ওর এসকর্ট জীবনের। বাড়ীতে কেউ কিছু জানতে পারলোই না। ইদানিং কয়েকদিন হলো জামাইবাবু ওকে বেশ কিছু টাকা চেয়ে ব্ল্যাকমেল করা শুরু করেছে। হুমকি দিয়েছে টাকা না দিলে বাড়ীতে জানিয়ে দেবে সব, তখন কোথায় থাকবে ওর মা ভাইয়ের সম্মান? ভাই আর স্কুলেও যেতে পারবেনা, মুখ দেখাতে ও পারবে না। প্রথম প্রথম কিছু টাকা দিলেও পরের দিকে জামাইবাবুর ডিমান্ড খুব বেড়ে যাচ্ছিল, আর পারছিলো না নন্দিনী। অনেক প্ল্যান করে জামাইবাবুর সাথে দার্জিলিং আসে নন্দিনী। এসব ভাবছিল বসে বসে,পাশের চেয়ারে এসে বসলো অমিত,ওর জামাইবাবু। নন্দিনীর দিকে তাকিয়ে বললো এককাপ চা হলে মন্দ হয় না বলো! নন্দিনী বললো নিশ্চয়ই! খুব ভালো হবে। তুমি বসো, আসছি কিছুক্ষনের মধ্যে চা বানিয়ে নিয়ে। অমিত নন্দিনীর কোমরে হাত রেখে বলল তোমার এই উষ্ণতা মাথা স্পর্শ যে আরো বেশি রিফ্রেশিং। নন্দিনী বললো আমি আসছি একটু ভেতর থেকে। কিছুক্ষণের মধ্যেই চা নিয়ে এসে হাজির হলো নন্দিনী। 
এক কাপ চা তুলে মুখের সামনে ধরলো অমিতের।
অমিত চা নিয়ে খেতে শুরু করলো। খাওয়ার কিছুক্ষণের মধ্যেই মনে হলো কিছুই যেনো মনে পড়ছে না, চোখ গুলো বন্ধ হয়ে আসছে। পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছে। কেমন একটা অডিটরী আর ভিসুয়াল হ্যালুসিনেশন হচ্ছে, কেউ যেনো দাড়িয়ে আছে সামনের কুয়াশা ঘেরা পাহাড়টায়। সে যেনো হাত বাড়িয়ে ডাকছে ওকে। নন্দিনীর দিকে তাকিয়ে কিছু বলার চেষ্টা করে, পারে না! চেয়ার ছেড়ে দাড়িয়ে পড়ে অমিত, বারান্দা দিয়ে গিয়ে সামনের রাস্তায় নেমে পড়ে, এগোতে থাকে পাহাড়ি রাস্তার দিকে। নন্দিনী এগিয়ে যায় পেছন পেছন,একটা চাদর জড়িয়ে দেয় অমিতের গায়ে। হিস হিস করে বলে চলো জামাইবাবু, অনেকটা রাস্তা বাকি। হাঁটতে হাঁটতে খাদের কিনারায় পৌঁছে যায় অমিত। বুঝতেও পারে না কি অপেক্ষা করছে ওর জন্য! একটা ধাক্কা পেছন থেকে আর পাথরে পা পিছলে গিয়ে খাদের গভীরে হারিয়ে যায় অমিত। উফফ কি শান্তি! বুক ভরে মুক্তির স্বাদ নেয় নন্দিনী। ভাগ্যিস প্ল্যান করে চায়ের মধ্যে স্টুপিফায়িং এজেন্ট ধাতুরা স্ট্রামোমনিয়াম এর রুট ক্রাশ করে মিশিয়ে দিয়েছিলো। চা টা খাওয়ার পর আর নিজের মধ্যে ছিলো না অমিত। কনফিউশন আর হ্যালুসিনেশনের জন্য মনে হচ্ছিল কেউ ডাকছে ওকে আর সেই ডাক উপেক্ষা করতে না পেরে তলিয়ে গেলো অতল গহ্বরে। চুপচাপ হোটেলে ফিরে এলো নন্দিনী,সব কিছু গুছিয়ে নিলো। প্রমাণ সব লোপাট করে দিলো,এবার ফেরার পালা! আর কেউ ওকে ব্ল্যাকমেল করতে পারবে না। নিজের শহরে ফিরে আবার কাজগুলো শুরু করবে মা ভাইয়ের মুখের দিকে চেয়ে,কিন্তু কিছুতেই ওদের ওপর এই অন্ধকার জগতের ছায়া পড়তে দেবে না। যে ওকে টেনে নিয়ে এসেছিল অন্ধকার জগতে, তাকেই সে পাঠিয়ে দিলো অন্ধকারের ঠিকানায়। মন শান্ত করে স্টেশনের দিকে রওয়ানা দিলো নন্দিনী,নিজের শহর তিলোত্তমার জন্য মন যে তার টানছে খুব। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

মঙ্গলবার, ১২ জুলাই, ২০২২

রুবাই


 চিত্র ১
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

অস্তরাগের আলো,মন করে দিক ভালো
আসবে নতুন দিন!ঘুচুক সকল কালো।
অপেক্ষারত গাছেরা গোধূলি বেলায়
মৃদুমন্দ সমীরণে জলাশয়ের জল টলোমলো।


 চিত্র ২

অভিমানী মেঘ জমেছে মন মাঝারে যেথা
বুকের মাঝে যে অব্যক্ত কত ব্যথা।
দুঃখগুলো সব ঝরে পড়ে বারি বিন্দু হয়ে
অশ্রু সজল চোখ বলে কত কথা।


©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বৃহস্পতিবার, ৭ জুলাই, ২০২২

জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী ✍️ডা: অরুণিমা দাস

জীবনের প্রতি দৃষ্টিভঙ্গী
✍️ডা: অরুণিমা দাস

"যারা নতুন কিছু খোঁজে না,একদিন তাদেরও কেউ খুঁজবে না!" - উক্তিটি বিখ্যাত লেখক জে আর আর টলকিন এর। 
এই কয়েকটি কথা একজন মানুষের জীবনে আমূল পরিবর্তন এনে দিতে পারে। একঘেঁয়ে জীবনে সবাই সচেষ্ট থাকে নতুন কিছু করার,দরকার থাকে শুধু মোটিভেশনের। কিন্তু অনেকেই সমাজের ভয়ে, লোক কি বলবে! এসব ভেবে কুঁকড়ে থাকে। খোলস ছেড়ে বেরিয়ে এসে নতুনত্বের আস্বাদ গ্রহণ করতে হবে,জীবনের চেনা পরিচিত গন্ডী থেকে বেড়িয়ে এসে নিজেকে এক নতুন রূপে প্রকাশ করতে হবে। তবেই সমাজ যথাযথ করে তুলে ধরার চেষ্টা করে,ইনোভেটিভ ওয়ে অনুসরণ করেছেন। আর এসবের মধ্যে দিয়েই সবার মধ্যে জায়গা করে নিয়েছেন,পেয়েছেন বিখ্যাত মানুষের তকমা। 

কে এফ সি এর প্রতিষ্ঠাতা কলোনেল স্যান্ডলার কে এফ সি শুরু করার আগে তিনি আইনজীবী ছিলেন। কিন্তু মনে সব সময় চিন্তা থাকতো নতুন কিছু করার। তিনি অনেক ছোট ছোট ব্যাবসা ও চাকরি এবং বিভিন্ন জায়গাতে কাজ করেছেন। কিন্তু এগুলোতে তার প্যাশন ছিলো না, তাও এভাবেই কেটে যায় তার ৪০ টা বছর! ৪০ বছর পরে সে অনুভব করলেন তার মনের ইচ্ছে হলো মানুষকে খাবার খাওয়ানো। আর এই ইচ্ছে তার মধ্যে ছিলো যখন ৭ বছর বয়স থেকে সে তার ভাইবোনকে খাবার বানিয়ে খাওয়াতেন। তার নতুন প্যাশন খুজে পাওয়ার পরে তিনি সারাটা জীবন সেটাই করে গিয়েছেন। তিনি এমন সফলতা পেলেন তার মৃত্যুর পরেও সেটা কমেনি বরং সারা বিশ্ব জুড়ে তার নাম ছড়িয়ে রয়েছে। 


মার্ক জুকারবার্গ ফেসবুক এর প্রতিষ্ঠাতা তিনি ফেসবুক তৈরি করার আগে কখনই এটা নিয়ে ভাবেনি। প্রথমে সে কিছু ছোট ছোট টুলস তৈরি করেন এবং পরে সব গুলো একসাথে করে ফেসবুক বানিয়ে নেয়। এটা ছিল তার একটি কলেজ প্রোজেক্ট যখন ফেসবুক সফল হলো তখন মার্ক নতুনত্বের মাঝে খুঁজে পেলেন নিজেকে আর আমরা পেলাম বহুদিন আগে সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়া মানুষের সন্ধান,দূরে থেকেও মনে হয় তারা যেনো পাশেই আছে। 

আমাজন আজ পৃথিবীর সবথেকে বড় দোকান যা শুরু হয়েছিলো শুধু মাত্র বই বিক্রি দিয়ে। আমাজন  এর প্রতিষ্ঠাতা ভেবেছিলেন শুধু বই নয়, আরো অনেক কিছুই দরকার যা বাড়িতে বসেই মানুষ পেতে চাইবে। তার এই চিন্তা ভাবনা বাস্তবে রূপ দিতে হয়ে তিনি আজ সবথেকে বড় অনলাইন শপিং সাইটের প্রতিষ্ঠাতা। 

গুগল এর প্রতিষ্ঠাতা যে কোন দিন ভাবেওনি তাদের ছোট একটি কলেজ প্রোজেক্ট আজকে পৃথিবীর সবথেকে বড় কোম্পানিতে পরিনত হবে। কিন্তু নতুন কিছু করার স্বপ্ন নিয়েই প্রজেক্ট টা শুরু করেছিলেন তিনি। আজ গুগলের সাহায্য প্রতিপদে আমাদের দরকার হচ্ছে, তাঁর অভিনব চিন্তা আমাদের জীবনকে অনেকটা ধাপ এগিয়ে নিয়ে গেছে। 
তাই নিজের মধ্যে প্রচ্ছন্ন থাকা নতুন কিছু করার প্যাশনকে জাগিয়ে তুলতে হবে, সমাজও ঠিক চিনে নেবে একদিনের অনামী ব্যক্তিকে। নতুন চিন্তা ভাবনা,নতুন নতুন কাজ করার ইচ্ছেই অজানা অচেনার ভিড়ে অন্যরূপে নিজেকে প্রস্ফুটিত করে তুলবে। 

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

বুধবার, ৬ জুলাই, ২০২২

শিরোনাম - স্থায়ী ঠিকানা✍️ ডা: অরুণিমা দাস


শিরোনাম - স্থায়ী ঠিকানা
✍️ ডা: অরুণিমা দাস


যখন গাইনি ওয়ার্ডের পাশ দিয়ে ওটি রুমে যাই, একটা করিডোরের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। রোজ দেখি করিডোরের এক পাশে এক ভদ্রমহিলা জানলার পাশে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকেন। চোখে চোখ পড়লে বুঝতে পারি একরাশ শূন্যতা ওনার চোখে, হয়তো কারোর জন্য অপেক্ষা করতে করতে ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলেছেন। সমস্ত রোগীদের খাবার আমাদের হসপিটাল ক্যান্টিন থেকে আসে। যে দাদা খাবার দিতে আসে উনি দেখি এই ভদ্রমহিলাকেও খাবার দেন। একদিন কৌতুহল বশত ওয়ার্ডে সিস্টারকে জিজ্ঞাসা করলাম কে এই ভদ্রমহিলা? সিস্টার বললেন সে একটা ইতিহাস বলতে পারেন। আমি ছোট করেই বলছি। 
ভদ্রমহিলার নাম মিনতি। উনি জরায়ু ক্যান্সার নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন গাইনি ওয়ার্ডে। ওনার একটা পাস্ট কনভালসন এর হিস্ট্রি ছিলো। তো সমস্ত কিছু প্রি অপারেটিভ চেক আপ করিয়েই ওনাকে অ্যাডমিশন করানো হয় আর হিস্টেরেক্টমি করার প্ল্যান করা হয়। হিস্টেরেক্টমি করার সময় অন টেবিল দু বার খিচুনি হয়েছিল। অপারেশন সাকসেসফুল হলেও পোস্ট অপারেটিভ পিরিয়ড এ ওনার মেমোরি পাওয়ার ধীরে ধীরে কমতে থাকে। নিউরো মেডিসিন থেকে ডক্টর দেখে যান এসে ওনাকে। ফাইনালি ডায়াগনসিস হয় উনি আলজাইমার্স রোগে আক্রান্ত। বাড়ীর লোক দের চিনতেও পারেন না। ধীরে ধীরে বাড়ীর লোক ওনাকে দেখতে আসা কমিয়ে দেয়। একদিন তো ওনার বাড়ির একজন বলেই দেয় এসব বোঝা বাড়ীতে নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। পুলিশ দিয়ে পেশেন্ট পার্টি নট ফাউন্ড বলে কমপ্লেইন ও লজ করা হয়,কিন্তু কোনো লাভ হয় না। ব্যাপারটা আমাদের হসপিটাল সুপার জানার পর এই ওয়ার্ডের একটা বেড ওনার জন্য বরাদ্দ করে দেন, আর রেগুলার মিল ও ওনার জন্য ডায়েট প্ল্যানে রাখেন। তারপর বছর ছয়েক হয়ে গেলো উনি এখানেই থাকেন, বাড়ির ঠিকানা ভুলে গিয়ে এই ঠিকানাই এখন ওনার নিশ্চিত আশ্রয় হয়ে গেছে। নিজের মতো থাকেন, মাসীরা স্নান টান করিয়ে দেয় মাঝে মাঝে। আমাদের সাথে এসে মাঝে মাঝে ইশারায় কথা বলেন। কিন্তু কোনোদিন কোনো প্রবলেম করেননি আমাদের কোনো কাজে। এরম মানুষ যদি বাড়ীতেই থাকতো নিজের লোকেদের সাথে হয়তো সহানুভূতি, মায়া মমতা পেয়ে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতো কিন্তু যা বাড়ীর লোক ওনার কিছুই বলার নেই ওনাদের এই ব্যবহারে। 
সব শুনে খুব খারাপ লাগলো। বয়স হয়ে গেলে কি সত্যিই মানুষ বাড়ীর লোকের বোঝা হয়ে যায়? শেষ বয়সে কি স্থায়ী ঠিকানা ভুলে অস্থায়ী ঠিকানার খোঁজ করতে হবে সকলকে? এর উত্তর জানা নেই আমার। সত্যিই কি শিক্ষিত সমাজে বাস করার যোগ্য আমরা? কিছু মানুষের অদ্ভুত আচরণ আমাকে প্রশ্নচিহ্ন এর মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।। 
ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি মিনতি দেবী ভালো থাকুন, ওনার স্মৃতি শক্তি যেনো না ফেরে,নিষ্ঠুর দুনিয়ায় ওনার কেউ নেই সেটা যেনো উপলব্ধি করতে না হয় ওনাকে কোনোদিন। যেরকম আছেন এখানে,এরকম ভাবেই থাকুন আর সুস্থ থাকুন।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

মঙ্গলবার, ৫ জুলাই, ২০২২

বিষয় - আট লাইনে ছবি কথা


 শিরোনাম - তত্ত্ব কথা
✍️ডা: অরুণিমা দাস


তোড়জোড় চলছে বাড়িতে, বাজছে বিয়ের সানাই
তত্ত্বে এলো বাটা হলুদ,মাখবে যে কনে তাই।

হলুদে রাঙার বেলা এলো,তৈরী কনে হলুদ শাড়ি পরে
মেতে উঠেছে সকলে উলু আর শঙ্খধ্বনির সুরে।

মন দিয়ে দেখে সব,তত্ত্বে আসা মাছ দুইখানি
ভাবে খালি আজ নেই আর ম্যারিনেশনের হয়রানি। 
সেজেছে রুই দুখানি,শাড়ী আর পাঞ্জাবীতে লাগছে তারা অনন্য
শুভ অনুষ্ঠানের প্রতীক হিসেবে থাকতে পেরে  জীবন যে তাদের ধন্য।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...