শিরোনাম - স্থায়ী ঠিকানা
✍️ ডা: অরুণিমা দাস
যখন গাইনি ওয়ার্ডের পাশ দিয়ে ওটি রুমে যাই, একটা করিডোরের মধ্যে দিয়ে যেতে হয়। রোজ দেখি করিডোরের এক পাশে এক ভদ্রমহিলা জানলার পাশে বসে বাইরের দিকে তাকিয়ে থাকেন। চোখে চোখ পড়লে বুঝতে পারি একরাশ শূন্যতা ওনার চোখে, হয়তো কারোর জন্য অপেক্ষা করতে করতে ধৈর্য্য হারিয়ে ফেলেছেন। সমস্ত রোগীদের খাবার আমাদের হসপিটাল ক্যান্টিন থেকে আসে। যে দাদা খাবার দিতে আসে উনি দেখি এই ভদ্রমহিলাকেও খাবার দেন। একদিন কৌতুহল বশত ওয়ার্ডে সিস্টারকে জিজ্ঞাসা করলাম কে এই ভদ্রমহিলা? সিস্টার বললেন সে একটা ইতিহাস বলতে পারেন। আমি ছোট করেই বলছি।
ভদ্রমহিলার নাম মিনতি। উনি জরায়ু ক্যান্সার নিয়ে ভর্তি হয়েছিলেন গাইনি ওয়ার্ডে। ওনার একটা পাস্ট কনভালসন এর হিস্ট্রি ছিলো। তো সমস্ত কিছু প্রি অপারেটিভ চেক আপ করিয়েই ওনাকে অ্যাডমিশন করানো হয় আর হিস্টেরেক্টমি করার প্ল্যান করা হয়। হিস্টেরেক্টমি করার সময় অন টেবিল দু বার খিচুনি হয়েছিল। অপারেশন সাকসেসফুল হলেও পোস্ট অপারেটিভ পিরিয়ড এ ওনার মেমোরি পাওয়ার ধীরে ধীরে কমতে থাকে। নিউরো মেডিসিন থেকে ডক্টর দেখে যান এসে ওনাকে। ফাইনালি ডায়াগনসিস হয় উনি আলজাইমার্স রোগে আক্রান্ত। বাড়ীর লোক দের চিনতেও পারেন না। ধীরে ধীরে বাড়ীর লোক ওনাকে দেখতে আসা কমিয়ে দেয়। একদিন তো ওনার বাড়ির একজন বলেই দেয় এসব বোঝা বাড়ীতে নিয়ে যাওয়ার দরকার নেই। পুলিশ দিয়ে পেশেন্ট পার্টি নট ফাউন্ড বলে কমপ্লেইন ও লজ করা হয়,কিন্তু কোনো লাভ হয় না। ব্যাপারটা আমাদের হসপিটাল সুপার জানার পর এই ওয়ার্ডের একটা বেড ওনার জন্য বরাদ্দ করে দেন, আর রেগুলার মিল ও ওনার জন্য ডায়েট প্ল্যানে রাখেন। তারপর বছর ছয়েক হয়ে গেলো উনি এখানেই থাকেন, বাড়ির ঠিকানা ভুলে গিয়ে এই ঠিকানাই এখন ওনার নিশ্চিত আশ্রয় হয়ে গেছে। নিজের মতো থাকেন, মাসীরা স্নান টান করিয়ে দেয় মাঝে মাঝে। আমাদের সাথে এসে মাঝে মাঝে ইশারায় কথা বলেন। কিন্তু কোনোদিন কোনো প্রবলেম করেননি আমাদের কোনো কাজে। এরম মানুষ যদি বাড়ীতেই থাকতো নিজের লোকেদের সাথে হয়তো সহানুভূতি, মায়া মমতা পেয়ে ধীরে ধীরে সুস্থ হয়ে উঠতো কিন্তু যা বাড়ীর লোক ওনার কিছুই বলার নেই ওনাদের এই ব্যবহারে।
সব শুনে খুব খারাপ লাগলো। বয়স হয়ে গেলে কি সত্যিই মানুষ বাড়ীর লোকের বোঝা হয়ে যায়? শেষ বয়সে কি স্থায়ী ঠিকানা ভুলে অস্থায়ী ঠিকানার খোঁজ করতে হবে সকলকে? এর উত্তর জানা নেই আমার। সত্যিই কি শিক্ষিত সমাজে বাস করার যোগ্য আমরা? কিছু মানুষের অদ্ভুত আচরণ আমাকে প্রশ্নচিহ্ন এর মুখে দাঁড় করিয়ে দেয়।।
ঈশ্বরের কাছে প্রার্থনা করি মিনতি দেবী ভালো থাকুন, ওনার স্মৃতি শক্তি যেনো না ফেরে,নিষ্ঠুর দুনিয়ায় ওনার কেউ নেই সেটা যেনো উপলব্ধি করতে না হয় ওনাকে কোনোদিন। যেরকম আছেন এখানে,এরকম ভাবেই থাকুন আর সুস্থ থাকুন।
©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন