শুভ আধ্যাত্মিক আলোচনা-বাসর।
# বিষয় - *কুরুক্ষেত্র।*
# নাম-
*ইতি-*
*কুরুক্ষেত্র।*
✍ - মৃদুল কুমার দাস।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধে কুরুসাম্রাজ্যের পতন আর ইতিহাসের মোগল সাম্রাজ্যের পতনে অনেক মিল কেউ যদি দেখেন তাহলে বড়ই উপকার হয়। রাজা অন্ধ ধৃতরাষ্ট্র ও দুর্যোধনে এবং সাজাহান ও ঔরঙ্গজেবে মিল পাওয়ার ইঙ্গিতটি ধরিয়ে দিলাম।
মানুষ যে মায়ার হাতের পুতুল,অহংকারের দাসত্বের পরিণাম ধ্বংস পুরাণ-ইতিহাস থেকে সেই শিক্ষা পাই। প্রসঙ্গ কুরুক্ষেত্র। কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের পেছনের ঘটনা দিয়ে শুরু করা যাক।
মাতা সত্যবতীকে পুত্র ব্যাসদেব বলছেন- " মা,কুরুবংশের গৌরব এবার অস্তমিত হওয়ার পথে। দিব্যদৃষ্টিতে দেখতে পাচ্ছি ধ্বংসের দিন গোনা শুরু। তা চোখে দেখার চেয়ে দু'জনে বনবাসে চলে যাই বরং। চলুন। তপোবনে যোগভ্যাসে দিন কাটাব।"
সত্যবতী সাংসারিক মায়ায় আচ্ছন্ন,বলছেন- "রাজসভা,রাজত্ব,বীর পুত্র ভীষ্ম ও অন্যান্য সবাই...এত প্রিয়জন ছেড়ে বনবাসে! এ কেমন কথা!"
বেদব্যাস তখন বললেন- "ধৃতরাষ্ট্র অভিশপ্ত আগের জন্মে।"
সত্যবতী কৌতূহল নিয়ে বললেন- "কী রকম?"
ব্যাসদেব বললেন- "ধৃতরাষ্ট্র আগের জন্মে একজন রাজা ছিলেন। একদিন মৃগয়ায় গেছেন। মৃগের পেছনে ধাওয়া করতে গিয়ে রাজা বনে পথ হারান। ক্লান্ত রাজা ক্ষুধায় ও তৃষ্ণায় কাতর। গাছের নীচে অন্ধকার দূর করতে আগুন জ্বেলে বসে আছেন। আর সেই গাছের উপরে এক পক্ষী তার স্ত্রীসহ শ'খানেক ছানাপোনা নিয়ে থাকত। রাজার সঙ্গীন দশা দেখে স্ত্রী পাখি রাজার জন্য আহারের ব্যবস্থা করতে বলে পুরুষ পাখিটিকে। তাই নিয়ে উভয়ের বচসা বাঁধে। বচসাকালীন অসতর্কতা বশতঃ স্ত্রী পাখি আগুনে পড়ে যায়। পাখিটিকে রাজা পুড়িয়ে খেয়েও খিদে আরো পায়। তখন বুঝতে পারলেন রাজা এই গাছে নিশ্চয় পাখির বাসা আছে। সত্যিই রাজা তাই দেখলেন। আর ঐ শতপাখির শাবকগুলিকে তীরের ডগায় একে একে নৃশংসভাবে মারলেন আর রাজা খাদ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন। ছানাদের বীভৎস মৃত্যু সহ্য করতে না পেরে পাখিটি রাজাকে অভিশাপ দিল- 'পরজন্মে তুমি অন্ধ হয়ে জন্মাবে। তোমার শতপুত্র হবে। তারা একে একে তোমার চোখের সামনে যুদ্ধে নিহত হবে। তখন তুমি বুঝবে সন্তানহারা পিতার দুঃখের কথা।' এই হলো সেই রাজা ধৃতরাষ্ট্র। আর তার শতপুত্র।"
সত্যবতীর মনে হল,তিনি ঠিক সামলে নেবেন,এমন অমঙ্গুলে ঘটনা ঘটতে দেবেন না। সংসারের বাইরে গিয়ে কি শান্তি পাবেন।
বেদব্যাস তার কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে পৌঁছতে পারলেন না।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধের ঘটনা যেভাবে সাজানো ছিল ঠিক সেভাবেই ঘটনি চলতে লাগল। প্রথমে যুদ্ধ না ঘটতে দেওয়ার অনেক বাদ প্রতিবাদ এসেছিল। কিন্তু পাপ ষোল কলায় পূর্ণ। যুদ্ধের নাম ধর্ম যুদ্ধ, তাই যুদ্ধের কারণ। দুর্যোধনের পাপের জন্য ধর্ম যুদ্ধ হল আসন্ন। এই যুদ্ধের প্রধান কারিগর বিষ্ণুর অষ্টম অবতার শ্রীকৃষ্ণ। আর তাঁর দোসর নরঋষি অবতার অর্জুন।
সত্যিই কি দুর্যোধন ও তার পক্ষে অংশগ্রহণকারী সব রাজণ্যবর্গ পাপী ও অধার্মিক ছিলেন। তাদেরও মৃত্যু ছিল অনিবার্য। কিন্তু তা তো হয়নি। পাপের স্বরূপ রাতের অন্ধকারে ঘুমন্ত পান্ডব শিবিরে হানা দিয়ে শিখন্ডী,ধৃষ্টদ্যুম্ন সহ দ্রৌপদীর পাঁচ সন্তানকে হত্যার ষড়যন্ত্রে লিপ্ত অশ্বথামা,কৃপাচার্য ও কৃতবর্মা বেঁচে থাকলেন কোন যুক্তিতে। আবার প্রশ্ন উঠেছিল দেবতারা পরোক্ষে পান্ডবদের সহায় হল কেন? দুর্যোধন যদি পাপী হয়,অহংকারী,অত্যাচারী অধর্মের বিরুদ্ধে ধর্ম যুদ্ধ হয়,তাহলে দেবতারা পান্ডবদের অন্যায় সহায়তা দিল কেন? যেমন-
সূর্যদেব পুত্র কর্ণের পক্ষ থেকে সরে এসে জয়দ্রথ হত্যায় ঐটুকু সাহায্যের পেছনে ছলনার আশ্রয় কেন নিলেন। অর্জুনের যুদ্ধের সময় মনে হচ্ছিল কেউ যেন প্রদীপ্ত পুরুষ শূল হস্তে তার আগে আগে যুদ্ধ করছেন। অর্জুন ব্যাসদেবের কাছে জানতে পারলেন ঐ প্রদীপ্ত পুরুষটি হলেন মহাদেব। শূল হস্তে তিনি মহাযোদ্ধা। এক ত্রিশূল থেকে লাখ লাখ ত্রিশূল প্রতিপক্ষের সেনা ধ্বংস করছে। আর জয়দ্রথের পাশুপত অস্ত্র ছাড়া মৃত্যু ছিল অসম্ভব। শিবের সেই অস্ত্র নিতে ও অস্ত্র প্রয়োগ শিখতে কৃষ্ণ অর্জুনকে শিবের কাছে নিয়ে গিয়েছিলেন।
কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ শেষ। এক নির্জন স্থানে বসে রথের উপর কৃষ্ণ ও অর্জুন। এমন সময় সেখানে উপস্থিত মহাবীর হনুমান। হনুমান কৃষ্ণকে বললেন- "আপনার নির্দেশমত প্রদীপের সাহায্য করেছি। এখন যুদ্ধ শেষ। অনুমতি দিলে ইন্দ্রলোকে যেতে পারি।" এই শুনে অর্জুন তখন কৃষ্ণের কাছে ব্যাপারটি জানতে চান। কৃষ্ণ তখন বললেন- "তোমার রথে সর্বসময় কপিধ্বজ হয়ে থাকতেন হনুমান। তাই কোনো বীর তোমার রথ ধ্বংস করতে পারেননি। শুধু কর্ণের হাত থেকে তোমার রথ হনুমান রক্ষা করতে পারেননি।"
অর্জুন বললেন- "আমার রথ এই তো অটুট। কখন বিনষ্ট হল?"
কৃষ্ণ হেঁসে বললেন- "সেই জন্য তো তোমাকে এই নির্জন স্থানে এনেছি।"
তারপর রথ থেকে দু'জনে নেমে আসতেই মুহূর্তেই রথটি ভস্মীভূত হয়ে যায়। অর্জুন হতবাক। কৃষ্ণ বললেন- "এটি ছিল মায়াবী রথ। তোমার রথ কর্ণের বাণে অনেক আগে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল। সবার চোখে আমি ও হনুমান মায়া দ্বারা কাউকে বুঝতে দিইনি। এমনকি কর্ণ নিজে মায়াবী হয়েও ধরতে পারেনি। তাই তো তবেই তাকে বধ করা সম্ভব হলো।
কৌরবদের পরাজয়ের কারণ-
কৌরবপক্ষের মহারথিদের অন্তর্দ্বন্দ্ব। যুদ্ধ জয়ের পুরো কৃতিত্ব নেওয়ার ইচ্ছে ছিল ভীষ্মের,কর্ণের, দ্রোণ ও শল্যের। এই মনোমালিন্য লেগেই থাকত। যুদ্ধের আগে ভীষ্ম কর্ণকে অর্ধরথ বলে ঘোষণা করায় কর্ণের খুব গোঁসা হয়। তিনি ভীষ্মের নেতৃত্বে যুদ্ধ না করার সিদ্ধান্ত ঘোষণা করেন। আর রণকৌশল ছিল পান্ডবদের হত্যা নয়,কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ জয় করে পান্ডবদের বেঁধে আনা দুর্যোধনের কাছে। দুর্যোধনের কাছে ভীষ্ম, কর্ণ ও দ্রোণ তিন বীর ছিলেন প্রধান। সকলে প্রতিশ্রুতিমতো কাজ করতে উপযুক্ত পরিবেশ পাচ্ছিল না। যদি তা পেত এই তিন বীরের সম্মিলিত শক্তিতে পাঁচ দিনেই যুদ্ধ শেষ হয়ে যেত। প্রথম দুদিন যে যার মতো করে আলাদা ছিল। ঐ অন্তর্কলহের জন্য।
এর পরে ভীষ্মের শরশয্যা যুদ্ধে সংঘবদ্ধ এলো বটে কিন্তু তখন সে শক্তি ও উদ্যম অনেকটাই থিতু।
সবই রণনীতির উপর দাঁড়িয়ে কুরুক্ষেত্র যুদ্ধ ধর্ম যুদ্ধ অপেক্ষা,যুদ্ধের রীতি নীতির সবটাই ছিল অধর্মের পথে। একাই কৃষ্ণ ছিলেন - নাট্যকার,প্রযোজক, পরিচালক। তাই ধরতে পেরেছিলেন,ঘটকের পুত্র বারবারিক। ব্যাসদেব তাঁকে জিজ্ঞেস করেছিলেন - "মহাবীর বারবারিক আপনি তো পুরো যুদ্ধ দেখেছেন। আপনার মতে এই মহাযুদ্ধে কে সবচেয়ে বড় বীর?"
তখন বারবারিক বলেছিলেন- "হে মহামুনি এই যুদ্ধে একজনই মহাবীর। তিনি স্বয়ং ভগবান শ্রীকৃষ্ণ। আপনারা যা দেখছেন সবই মায়া। একা বাসুদেব তার চক্র দিয়ে সকলকে বধ করেছেন। তা নাহলে কৌরব মহারথিদের বধ করা অসম্ভব ছিল।"
*********
তথ্য সমৃদ্ধ । খুব সুন্দর।👌👌👌👌
উত্তরমুছুনখুব সুন্দর বললেন দাদা👌👌👌💐💐💐
উত্তরমুছুনসুন্দর বর্ণনা 👌👌🌷
উত্তরমুছুনঅসাধারণ
উত্তরমুছুনখুব সুন্দর লিখেছেন দাদা।
উত্তরমুছুনসত্যি অসাধারণ...👌👌👌
উত্তরমুছুন