বিষয়:অণুগল্প
কলমে: শুভ্রজিৎ চক্রবর্তী
ঘুড়ির চিঠি
ঘুড়ি কেটে গেলে কেউ খুশি হয়, সেটা অজয় কে দেখেই প্রথম জানলো পারমিতা। "আন্টি, আজকে আবার আমার ভোঁ কাট্টা গেছে" বলে একটা নির্মল হাসি দেয় অজয়। বছর আটের অজয়কে এর আগে কোনদিন জিজ্ঞেস করা হয় নি পারমিতার যে এতে খুশির কি হয়েছে।
কিন্তু আজকে যখন কারণটা জানতে পারলো, পারমিতার হৃদয়টা মোচড় দিয়ে উঠলো। অজয়ের মা, সুনীতা পারমিতার ঘরে কাজ করে গত ৪ মাস ধরে। এক হাজার টাকা মাইনে বাড়াতে, ছ-শো টাকাতে ঘর মোছার কাজের লোক হিসেবে সুনীতাকে রেখেছে পারমিতা। বেসরকারি স্কুলে পড়িয়ে যৎসামান্য মাইনে পায় পারমিতা। অল্প বয়সে বিধবা হলেও, আর বিয়ে করতে পারেনি সে। স্বামী জয়দীপের জায়গায় কাউকে কল্পনা করতে পারেনি সে। জয়দীপের কেনা ফ্ল্যাটেই থাকে পারমিতা। অজয়কে দেখে কিরকম একটা মায়া জেগে উঠেছিলো তার মনে।
সুনীতার সাথে প্রায় দিনই অজয় আসে পারমিতার ফ্ল্যাটে। ওর চোখে মুখে একটা দ্যুতি আছে। একটা বুদ্ধিদীপ্ত চাউনি আছে। পারমিতা জিজ্ঞেস করে, "ঘুড়ি ভোঁ কাট্টা গেলে কি হয়?" চোখ মুখ নাচিয়ে অজয় উত্তর দেয়, "ও মা! তুমি জানোনা বুঝি? এত বড়ো হয়েছে আর এটাও জানোনা?" পারমিতার চোখে করুণা মাখা হাসির চমক দেখা যায়। মাথা নাড়িয়ে পারমিতা না বলে। "আরে, ঘুড়ি যখন কেটে যায়, সেটা আকাশে মিলিয়ে যায়। আমার বাবা আকাশে চলে গেছে তো, তাই আমি ঘুড়িতে বাবাকে চিঠি লিখি। তাড়াতাড়ি আসার জন্য বলি আর আসার সময় খাসীর মাংস নিয়ে আসতে বলি।" শুনে পারমিতা চোখের জল ধরে রাখতে পারেনা। "তুই খাসীর মাংস খেতে ভালোবাসিস?"- জিজ্ঞেস করে পারমিতা । "হ্যাঁ গো, খুব ভালবাসি " - বলে সম্মতি জানায় অজয়।
"আমি জানি, আমার জন্মদিনের আগে বাবা নিশ্চয়ই আসবে" যোগ করে অজয়। পারমিতা ঠিক করে, যে ভাবেই হোক, অজয়কে একদিন ও খাসীর মাংস খাওয়াবে।
কিন্তু ঢাকুরিয়ার দু কামরার ফ্ল্যাট বাড়ির সোসাইটির বিল দিতেই পরমিতা হিমশিম খাচ্ছে। তবুও ভাবে, "নিজের সন্তান হলে কি করতাম"? টাকা বাচিয়ে একদিন খাসীর মাংসের আয়োজন করতে হবে। তিনটে প্রাণী খাবে। পাছে ভয় পায় পারমিতা, ছোট্টো শিশুর মনে আবার করুণার ভিক্ষে ভেবে দুঃখ না হয়। ছক কষে পারমিতা, বাবার পাঠানো মাংসই খাবে অজয়।
মাইনে পেয়ে এক কেজি খাসীর মাংস আর একটা ঘুড়ি কেনে পরমিতা। ঘুড়িতে লেখে "বাবা অজয়, আমি জরুরী কাজে আটকে আছি, আসতে দেরি হবে। তোমার জন্য মাংস পাঠিয়েছি, খেয়ে নিও। আমি এলে আবার আনবো মাংস।" কিন্তু সেদিন সুনীতা একা কাজে এলে পারমিতা জানতে পারে যে অজয়ের জ্বর হয়েছে। পারমিতা ঠিক করে যে মাংস বানিয়ে নিজেই নিয়ে যাবে অজয়ের কাছে।
বিকেল বিকেল মাংস নিজের হাতে রান্না করে ঘুড়ি হাতে নিয়ে পারমিতা চলে যায় পাশের পঞ্চানন তলার বস্তিতে। খুজে পেয়ে যায় সুনীতার ঘর। ছোট্টো দশ বাই দশের ঘর, ঘরে আসবাব বলতে শুধু একটা খাট। খাটের তলায় রান্না - খাওয়ার জোগাড় । খাটের ওপর সুনীতা বসে আছে। কোলে মাথা রেখে শুয়ে আছে ছোট্টো অজয়। "অজয়, উঠে দেখ আমি কি এনেছি। তোর বাবা ঘুড়ি পাঠিয়েছে, কিন্তু ভুল করে সেটা আমার ঘরে চলে এসেছে। সাথে খাসীর মাংসও পাঠিয়েছে। তাড়াতাড়ি ওঠ । আজকে আমিও তোর সাথে খাবো ।" অজয় সাড়া দেয় না। সুনীতার চোখে শীতল চাউনি। স্থির চক্ষু। কোলে শুয়ে আছে অজয়ের নিথর দেহ। জাপানিস এনকেফেলাইটিসের প্রকোপে দুদিনের জ্বর থেকে আর উঠতে পারেনি অজয়। চলে গেছে ওর বাবার কাছে, আকাশের দেশে, যেখানে যেতে পারে শুধু ঘুড়ির চিঠি।
সমাপ্ত
All rights reserved for © Subhrajit Chakravorty
ভীষণ সুন্দর লেখা। কিন্তু বড্ড কষ্টকর 💔😭
উত্তরমুছুনকি সুন্দর একটা গল্প পড়লাম। কি করুণ! অসাধারণ! 👌👌❤❤⚘⚘
উত্তরমুছুনদারুন।
উত্তরমুছুনভীষণ ভালো লাগলো ♥️♥️♥️♥️
উত্তরমুছুনAsamvab sundar
উত্তরমুছুন