শুভ আধ্যাত্মিক আলোচনা-বাসর।
#বিষয় - *আধ্যাত্মিক।*
#নাম - *চৈতন্যময় শ্রীরামকৃষ্ণ।*
✍️ - মৃদুল কুমার দাস।
ঠাকুর শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণের চৈতন্যময় লীলার স্বরূপের *কল্পতরু* মূর্তি ধারণ ছিল এক মাহেন্দ্রক্ষণ।
তিনি জগৎবাসীকে প্রথম দেখিয়েছিলেন বহুসাধনার একটাই মনস্কামনা মাতৃরূপ স্বচক্ষে দেখা চাই চাই। মা তো কোনোমতেই কর্নপাত করছেনই না। ঠাকুরের মনে হল এ জীবন বৃথা। তখন ঠাকুর বেপরোয়া হয়ে মায়ের সামনে আত্মাহূতিই শ্রেয় মনে করলেন। যেমনভাবে শ্রীরামচন্দ্র আত্মাহূতি দান করতে উদ্যত হয়েছিলেন, ঠাকুরও উত্তর দিকের দেওয়ালে ঝোলানো খাঁড়ায় এক হ্যাচকা টান দিলেন। স্বহস্তে মুন্ডচ্ছেদই ভবিতব্য জ্ঞাণ করলেন। মায়ের সামনেই হোক আত্মাহূতি - *কি লাভ এত সাধনার। মা তুই এত পাষাণী!* তৎক্ষণাৎ মা ভবতারিণী, মা জগদম্বা মানবী বেশে খাঁড়া নিলেন কেড়ে। ঠাকুর দেখছেন এক বিমূর্ত মূর্তি এক অসীম দয়ালু অনন্ত চেতনার জ্যোতিঃসমুদ্র,তার উজ্জ্বল উর্মিমালা ঠাকুরকে গ্রাস করতে উদ্যত। তাতে ঠাকুরের হাবুডুবু খেয়ে প্রাণে হাঁফধরা অবস্থায় ত্রাহি ত্রাহি অবস্থা। সেই অনন্তময়ীকে সেদিন ঠাকুর ধারন করলেন। তাই হল প্রথম কালজয়ী ঘটনা।
ঠাকুরের সিদ্ধি লাভ হল। ঠাকুর মাকে নিয়ে চললেন,মাও ঠাকুরে পড়লেন বাঁধা। ১৮৮৬, ১ জানুয়ারিতে ঠাকুরের লীলা অন্তে ঘটল দ্বিতীয় ঘটনা। স্থান কাশীপুর উদ্যানবাটী। ঠাকুর গুরুতর অসুস্থ। শয্যাশায়ী। ইতিমধ্যে ঠাকুরকে ঘিরে একটি ১২ জনের শিষ্যসংঘ গড়ে উঠেছে। সকলে পালা করে ঠাকুরের সেবায় উৎসর্গ করেছেন। নরেন্দ্রনাথ দলের পরিচালক। দিন রাত এক করে ঠাকুরের সেবা চলছে। ঠাকুর শয্যা ছেড়ে উঠবেন এমন আশা সবার মনে দূরস্থ।
হঠাৎ একদিন ঠাকুর ভ্রাতুষ্পুত্র রামলালকে কাছে ডাকলেন। ঠাকুর বললেন - *"দেখ রামলাল,আজ ভাল আছি মনে হচ্ছে। চল,নীচে একটু বেড়িয়ে আসি।"* রামলাল এক কথায় রাজী। ঠাকুর একটা কান ঢেকেছেন সবুজ রঙের বনাতের টুপি দিয়ে। হাতে একটা ছড়ি। রামলাল তাড়াতাড়ি ঠাকুরের গায়ে একটা রেশমের গরম চাদর জড়িয়ে দিয়ে হাতটি ধরে আস্তে আস্তে সিঁড়ি বেয়ে নামাচ্ছেন। নীচে নেমে সদর দিয়ে বেরনোর সময় ঠাকুর হলঘরে উঁকি মেরে দেখলেন তাঁর সেবক সন্তানেরা ঘোর ঘুমে আচ্ছন্ন। ঠাকুর বললেন - *"ঘুমোক ওরা,ওরা যে সারারাত আমার সেবা করে করে ক্লান্ত। দিনে একটু না ঘুমিয়ে নিলে চলে।"*
ঠাকুর বাগানের পশ্চিম দিকের গেটের দিকে ধীর পায়ে এগোতে থাকলেন। বাগানে তখন গিরিশ ঘোষ,অতুল চন্দ্র ঘোষ,রামচন্দ্র দত্ত, নবগোপাল ঘোষ, হরমোহন, বৈকুন্ঠ্যনাথ সান্যাল,কিশোরী রায়,হারানচন্দ্র দাস,অক্ষয়কুমার সেন ঠাকুরকে নিয়ে আলোচনায় মশগুল। হঠাৎ তাঁরা দেখলেন ঠাকুর ধীর পায়ে হাঁটছেন। তাঁরা সকলে আনন্দে আত্মহারা। ঠাকুর বিছানা ছেড়ে উঠে এমন হাঁটবেন এমন ছিল কল্পনাতীত! সঙ্গে সঙ্গে সকলে ছুটে এসে ঠাকুরের পায়ে প্রণাম করতে লাগলেন একে একে। তাঁদের মধ্যে গিরিশ ঘোষকে দেখে ঠাকুর বললেন - *"তুমি যে আমার সম্পর্কে এত কথা বলে বেড়াও,তুমি আমার সম্বন্ধে কি দেখেছ ও কি বুঝেছ?"*
গিরিষ ঘোষ তৎক্ষণাৎ ঠাকুরের সামনে নতজানু হয়ে জোড় হাতে বললেন - *"ব্যাস,বাল্মীকি যাঁর ইয়ত্ত্বা করতে পারেন নাই,আমি তাঁহার সম্বন্ধে অধিক কি বলিতে পারি।"* -এই কথা গিরিশ ঘোষ যখন বলছেন তখন তাঁর শরীরে এক অপূর্ব রোমাঞ্চ ভাবের শিহরণ খেলে যাচ্ছে। তখন ঠাকুর সেই কথার জের ধরে উপস্থিত সবাইকে বল উঠলেন - *"তোমাদের আর কি বলব,আশীর্বাদ করি তোমাদের চৈতন্য হোক।"* ঠাকুর এই ক'টি কথা বলেই গভীর সমাধিস্থ হয়ে পড়লেন। আর ভক্তরা প্রাণে এক অনির্বচনীয় আনন্দে ভাসমান হতে লাগলেন। এতদিন সকলের প্রতিজ্ঞা ছিল ঠাকুর সুস্থ হয়ে না ওঠা পর্যন্ত কেউ ঠাকুরের দেহ স্পর্শ করবেন না। সে প্রতিজ্ঞা মুহূর্তে ভেসে গেল। চতুর্দিকে শুধু *'জয় রামকৃষ্ণ,জয় রামকৃষ্ণ'* রব। ঠাকুরের পরশমণি ছোঁয়ায় সকলে বাহ্যজ্ঞাণ দশা রহিত হল। সকলের ভাবের সে কি বিচিত্র অবস্থা - কেউ হাসছেন,কেউ মাত্রাতিরিক্ত আনন্দ সহ্য করতে না পেরে কাঁদছেন, কেউ ধ্যানস্থ হয়ে পড়ছেন,কেউ উন্মাদের মত হাসছেন,কেউ আনন্দে নাচছেন। ঠাকুরের মুখে তখন এক অপার্থিব ও অপরূপ হাসি। তিনি সকলকে স্পর্শ করে যেতে লাগলেন। ঠাকুর সবাইকে চৈতন্য সাগরে অবগাহন করিয়ে দিচ্ছেন। তখন গোটা বাগানময় তল্লাসি হতে লাগল আর কে কে ঠাকুরের কৃপা থেকে বঞ্চিত থাকল। দেখা গেল বাগানের র়াধুনি গাঙ্গুলি বাদ পড়েছেন কারন রান্নাঘরে আটা মাখছেন তিনি। তাঁকে সেই অবস্থায় ধরে আনলেন গিরিশ।ঘোষ। ঠাকুরের স্পর্শে গাঙ্গুলির ভাবান্তর হল। অক্ষয়কুমারের কানে মন্ত্র দিতেই অক্ষয়কুমারের চোখ বিস্ফারিত হল। একই দশা নবগোপাল বাবুর। উপেন্দ্র মজুমদারের মনে হল এতদিনের স্থূল দেহ ঠাকুরের স্পর্শে সোনায় পরিণত হল। হারানচন্দ্র গেলেন অসীমের মাঝে হারিয়ে। ঠাকুরের সঙ্গী রামলালের গতি হল। সেদিন উদ্যানবাটীতে যাঁরা যাঁরা ছিলেন সবার কোনো না কোনো গতি হল। এদিকে রামকৃষ্ণ পার্ষদগণের এই হট্টগোলে ঘুম ভেঙে গেল। তাঁর পুত্ররা কৃপা পাবেন না সে কি হয়! এটাই হল একশত পঁয়ত্রিশ বছর আগে ঠাকুরের এই ভাবসমাধির নাম - *'কল্পতরু।'*
আজ পূর্ণ চৈতন্যের স্বরূপ নিয়ে বাহ্যিক আড়ম্বর সহকারে পালিত *'কল্পতরু'* উৎসব নিয়ে কত আধ্যাত্মিক ভাবের চর্চায় আমরা ডুবে যাই। এই একটি দিনের(১জানুয়ারি ১৮৮৬) গুরুত্ব নিয়ে স্বামী শ্রদ্ধানন্দজি মহারাজ বলছেন -
"কেবলমাত্র আজকের দিনে কল্পতরু হয়েছিলেন - তা কেন? তিনি তো সদাই কল্পতরু। জীবকে কৃপা করাই তাঁর একমাত্র কাজ ছিল। আমরা তো চোখের সামনে দেখছি,তিনি নিত্যই কত জীবকে কতভাবে কৃপা করতেন। হ্যাঁ,কাশীপুরের বাগানে এই দিনে তিনি একসঙ্গে অনেক ভক্তকে কৃপা করেছিলেন। সে হিসেবে আজকের দিনের একটা বিশেষত্ব আছে। তি যে কৃপাসিন্ধু ছিলেন, তা সেদিনকার ঘটনায় ভক্তরা বিশেষ করে বুঝতে পেরেছিলেন।"
এর থেকে চৈতন্যের স্বরূপ নিয়ে শ্রদ্ধানন্দজি মহারাজ এক পরম অনুভূতি থেকে যে অমৃতবাণী বিতরণ করেছিলেন তা স্মরণ করে আমরা চিরসমৃদ্ধ হই। তিনি বলছেন -
"আমরা যে যেখানে দাঁড়িয়ে আছি,সেখান হইতেই আমাদের সংস্কার, শক্তি ও প্রবণতা অনুযায়ী যেন অন্তরে চৈতন্যকে ধারণ করিতে পারি,বুঝিতে পারি। কাহারও পথ ভক্তির, কাহারও কর্মের বা তত্ত্ববিচারের,কাহারও যোগের - সকল পথের সিদ্ধিই এক দ্বার দিয়া আসিবে - তাই চৈতন্যের দীপ্তি। যে যত চৈতন্য লোকে নিজেকে প্রবুদ্ধ করিতে পারিবে,সে তত ঐহিকতা, সংকীর্ণতা, ভোগলোলুপতা হইতে মুক্ত হইবে - সত্য, প্রেম, পবিত্রতা ততই তার চরিত্রকে করিবে উজ্জ্বল। নরদেহ সে হইবে দেবতা। ইহাই মানুষের ইপ্সিততম সম্ভাবনা। শ্রীরামকৃষ্ণ চাহিয়াছিলেন আমরা যেন দেবতা হই,আমাদের সুপ্ত সম্ভাবনা যেন পরিপূর্ণভাবে বাস্তব হইয়া উঠে।
আমাদের চৈতন্য হউক। বর্ণ, জাতি,চরিত্র, অবস্থা, সংস্কার,ধর্ম - এই সকল বিভেদ সত্ত্বেও সকল মানুষ সেখানে এক - যাহা লইয়া এক - সেই মানবাত্মার সত্য যেন আমরা আবিস্কার করিতে পারি। এই আবিষ্কারের দ্বারাই আসিবে মানুষে মানুষে,জাতিতে জাতিতে মিলন,পারস্পারিক শান্তি ও সামঞ্জস্য। শ্রীরামকৃষ্ণের আশীর্বাদ সমগ্র বিশ্বকে এক করিতে চাহিতেছে।"
তাই সকল হৃদয়ে চৈতন্য জরুরী। এক অমৃতলোকের সন্ধানের উৎস। সেই সূত্র ধরে জগতের কল্যাণকামী ও শিক্ষাদাত্রী শ্রীমা বলেছেন - "হে ঠাকুর, ওদের চৈতন্য দাও, মুক্তি দাও। এই সংসারে বড় দুঃখকষ্ট। আর যেন তাদের না আসতে হয়।"
*******
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন