মঙ্গলবার, ১ ফেব্রুয়ারি, ২০২২

#নাম - সাবিত্রী চেতনায় রবীন্দ্রনাথ। ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

 বিষয় -নিবন্ধ।
নাম- 'সাবিত্রী চেতনায় বিশ্বকবি'
  ✍️ - মৃদুল কুমার দাস।

  

  বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের 'পূরবী' (১৯২৫) কাব্য ও তার 'সাবিত্রী' (১৯২৪ এর ২৬ সেপ্টেম্বর) কবিতা শ্রেষ্ঠ কবিতাগুলোর মধ্যে একটি অন্যতম। কবিতাটি চিরকালীন নিবিড় পাঠের অনুপ্রেরণা হিসেবে গণ্য। কবিতাটির মূল্যায়ণের গুরুত্ব পাঠকের কাছে কোথায়  দাঁড়িয়ে, তাহলে দেখা যাক।
  ১৯২৪ খ্রীস্টাব্দের প্রথম সপ্তাহে শান্তিনিকেতন থেকে এলেন কলকাতায় 'অরূপরতন' নাটকটি অভিনয়ের জন্য। ইনফ্লুয়েঞ্জা ভাইরাস কবির পিছু নিয়েছিল। কিন্তু ততটা সুস্থ না হওয়ার আগেই কবির দক্ষিণ আমেরিকার পেরুর শতবার্ষিক স্বাধীনতা উৎসবের আমন্ত্রণ রক্ষার জন্য পবিত্র কর্তব্যের কাছে শরীর যেন তুচ্ছ জ্ঞাণ হল। এমন ভাব ও শরীর থাকলে খারাপ হবে। তাবলে এমন সুযোগ হাত ছাড়া হলে অনেক ক্ষতি। অসুস্থ শরীর নিয়ে ১৯ সেপ্টেম্বর ১৯২৪ এ জাহাজে উঠলেন। ১১ অক্টোবর ১৯২৪ ফ্রান্সের ভার্সাই বন্দরে পৌঁছনোর এই মধ্যবর্তী সময়ে কবির মানসিকতায় 'সাবিত্রী' কবিতার জন্ম।কলম্বো থেকে কবির পিছু নিল বর্ষার প্রাকৃতিক দুর্যোগ। এই অভিজ্ঞতা থেকে শুরু করলেন 'পশ্চিম যাত্রীর ডায়রী' লেখা। ২৪ সেপ্টেম্বর কবি লিখছেন - "সকাল আটটা। আকাশে ঘন মেঘ। দিগন্ত বৃষ্টিতে ঝাপসা। বাদলার হাওয়া খুঁতখুঁতে ছেলের মতো কিছুতেই শান্ত হতে চাচ্ছে না। বন্দরের সান বাঁধানো বাঁধের ওপারে দুরন্ত সমুদ্র লাফিয়ে লাফিয়ে গর্জে উঠছে, কাকে যেন ঝুঁটি ধরে পেড়ে ফেলতে চায়। নাগাল পায় না।.... বাদলরাজের কালো উর্দিপরা মেঘগুলো দিকে দিকে টহল দিয়ে বেড়াচ্ছে। আচ্ছন্ন সূর্যের আলোয় আমার চৈতন্যের স্রোতোস্বিনীতে যেন ভাঁটা পড়ে গেছে। জোয়ার আসবে রৌদ্রের সঙ্গে সঙ্গে।" এই পরিবেশে কবি ২৬ সেপ্টেম্বরে লিখলেন 'সাবিত্রী' কবিতাটি। বন্ধু সম্বোধনে সূর্যকে আহ্বান করে লিখছেন -
"ঘন অশ্রুবাষ্পে ভরা মেঘের
       দুর্যোগে খড়্গ হানি  
          ফেলো,ফেলো টুটি।
হে সূর্য,হে মোর বন্ধু, জ্যোতির
             কনকপদ্মখানি 
            দেখা দিক ফুটি।"
  কবিতাটি সূর্যেকে নিয়ে অসামান্য আবাহণ সঙ্গীত। এই কথা 'পশ্চিম যাত্রীর ডায়রী'তে উল্লেখ করেছেন -
   "সূর্যের আলোর ধারা তো আমাদের নাড়ীতে নাড়ীতে বইছে। আমাদের প্রাণ-মন, আমাদের রূপ- রস সবই তো উৎসরূপে রয়েছে ঐ মহাজ্যোতিষ্কের মধ্যে। সৌরজগতের ভাবীকাল একদিন তো পরিকীর্ণ হয়েছিল ওরই বহ্নি বাষ্পের মধ্যে। আমার দেহের কোষে কোষে ঐ তেজই তো শরীরী, আমার ভাবনার তরঙ্গে তরঙ্গে ঐ আলোই তো প্রবহমান। বাহিরে ঐ আলোর বর্ণচ্ছটায় মেঘে মেঘে পত্রে,পুষ্পে পৃথিবীর রূপ বিচিত্র; অন্তরে ঐ তেজই মানসভাব ধারণ করে আমাদের চিন্তায় ভাবনায়,বেদনায় রাগে অনুরাগে রঞ্জিত।.... বনস্পতির শাখায় শাখায় স্তব্ধ ওঙ্কারধ্বনির মতো সংহত হয়ে আছে।... আমার পরিচয় তোমার আলোকে আলোকে উদ্ঘাটিত হোক।"
   কবির এই সাবিত্রী ভাবের উৎসটি কী? সূর্য আর সাবিত্রী ভাবের চেতনার অন্বয়সাধনটি হলো - 
    সাবিত্রী হলো সূর্য তথা সূর্যের রশ্মি। সাবিত্রীর অন্য অর্থ গায়ত্রী। বৃহদারণ্যক উপনিষদে বলা হয়েছে - "গায়ত্রীমেব সাবিত্রীমনুব্রুয়াৎ.."- সময়ভেদে এই গায়ত্রীর তিন রূপ - প্রাতঃকালে- গায়ত্রী,মধ্যাহ্নে - সাবিত্রী,সায়াহ্নে - সরস্বতী।
  রবীন্দ্রনাথের পিতৃদেব মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের কাছে গায়ত্রী মন্ত্র ছিল উপাসনার মন্ত্র। পিতৃদেবের কাছ থেকে এই অমূল্য রত্ন কবিরও অন্যতম প্রাপ্তি যোগ ঘটেছিল। এর সারমর্ম সম্পর্কে কবি বলতেন - "এই মন্ত্রটিকেই  ভারতবর্ষ তার সমস্ত পবিত্র শাস্ত্রের সারমর্ম বলে গ্রহণ করেছে। কেননা বিশ্বপ্রকৃতি ও মানবচিত্ত এই দুইকে এক করে মিলিয়ে আছেন যিনি তাঁকে এই দুয়েরই মধ্যে এক রূপে জানবার ধ্যানমন্ত্র হল গায়ত্রী।"
  তিনি আরো বলেছেন - "যিনি বিশাল বিশ্বের সমস্ত বৈচিত্রের মধ্যে রূপ-রস-গীত-গন্ধ এর নব নব রহস্যকে নিত্য নিত্য জাগিয়ে তুলে সমস্তকে আচ্ছন্ন করে রয়েছেন তাঁকেই আত্মার অন্তরতম নিভৃতে নিবিড়ভাবে উপলব্ধি করার কত আনন্দ! এই উপলব্ধি করার মন্ত্রই হচ্ছে গায়ত্রী। অন্তরকে এবং বাহিরকে ,বিশ্বকে এবং আত্মাকে একের মধ্যে যোগযুক্ত করে এই জানাই হচ্ছে এই মন্ত্রের সাধনা।"
    এখানে দু'টি কথা খুব স্মরণীয়। আমাদের ঋষি প্রার্থণা করেছেন - 'তমসোঃ মা জ্যোতির্গময়ঃ...', আবার ঈশোপণিষদ বলেছে - "হে পূষণ, তোমার ঢাকা খুলে ফেল,সত্যের মুখ দেখি; আমার মধ্যে যিনি সেই পুরুষ তোমার মধ্যেও..."।
  'পশ্চিম যাত্রীর ডায়রি'-তে সেই একই কথা বলেছেন - "এই বাদলার অন্ধকারে আজ আমার মধ্যে যে ছায়াচ্ছন্ন বিষাদ, সেই ব্যাকুলতারই একটি রূপ। সেও বলছে,হে পূষণ তোমার ঢাকা খুলে ফেলো, তোমার জ্যোতির মধ্যে আমার আত্মাকে উজ্জ্বল দেখি। অবসাদ দূর হোক। আমার চিত্তের বাঁশিতে তোমার আলোকের নিঃশ্বাস পূর্ণ করো - সমস্ত আকাশ আনন্দের গানে জাগ্রত হয়ে উঠুক। আমার প্রাণ যে তোমার আলোকেরই একটি প্রকাশ, আমার দেহও তাই। আমার চিত্তকে তোমার জ্যোতিরঙ্গুলি যখনই স্পর্শ করে তখনই তো 'ভূর্ভুবঃ সঃ' দীপ্যমান হয়ে ওঠে।"
     তাইতো বৈদিক মন্ত্রে সূর্য বন্দনার সাবিত্রী মন্ত্র - "ওম্ ভূর্ভুব স্বহাঃ/ তদসবিতুর বরেণ্যম/ ভর্গোদেবস্য ধিমহী/ ধিয়ো ইয়ো ন প্রচোদয়াৎ।।" 
  ২৬ সেপ্টেম্বরের ডায়রীতে কবি লিখেছেন - "কাল অপরাহ্নে আচ্ছন্ন সূর্যের উদ্দেশ্যে একটা কবিতা শুরু করেছি,আজ সকালে শেষ হল।"

 স্বয়ং কবির জবান বন্দি, তাঁর জন্মকালে প্রথম প্রত্যুষে , এই জাগরণ মন্ত্রেই তিনি দীক্ষিত হয়েছেন-  
     "মোর জন্মকালে/ প্রথম
প্রত্যুষে মম তাহারি চুম্বন দিলে আনি/ আমার কপালে।"- এখানে 'চুম্বন' শব্দটিতে কবি যেন দীক্ষিত,রবিরশ্মির প্রথম আলোর কবির কপালে স্নেহের চুম্বন যেন। এই "চুম্বন মন্ত্রে বক্ষে অজানা ক্রন্দন ওঠে জেগে/ ব্যথায় বিস্মিত।।" কবির সাবিত্রী কবিকে ক্ষণে ক্ষণে চেতনার মন্ত্র দিয়ে যেন জাগিয়ে তুলছে। আর আপনার মাঝে কবিমানস বিশ্বগত হয়ে উঠছে।

  কিন্তু মনে রাখতে হবে কবিতাটি ভক্ত-চিত্তের সাবিত্রী মন্ত্রোচ্চারণ নয়। সূর্য কবির কাছে 'আদি কবি'-
 ।"তমিস্রসুপ্তির কূ যে বংশী বাজাও,আদিকবি/ ধ্বংস করি তম/ সে বংশী আমারি চিত্ত;.... জীবনহিল্লোল।।"
  সৌরলোকে যে জ্যোতির প্রকাশ, আমাদের ধীশক্তিতে তারই প্রতিফলন ঘটে। আর কবি চিত্ত আদি কবির সেই বাঁশি। এই সুর জাগরণের। আর 'জীবনহিল্লোল' বংশীধ্বণিতে রন্ধ্রে রন্ধ্রে গুঞ্জরিত- 'মেঘে মেঘে বর্ণচ্ছটা', 'কুঞ্জে কুঞ্জে মাধবীমঞ্জরী', ' নির্ঝরে কল্লোল'। আর এই বাণী কবি চিত্তে যখন মর্মরিত হয় তখন কবি আদি কবির কাছে ঋণ স্বীকার করে বলে ওঠেন -
      "এ প্রাণ তোমারি এক ছিন্ন তান, সুরের তরণী - / আয়ুস্রোতমুখে/ হাসিয়া ভাসায়ে দিলে লীলাচ্ছলে,কৌতুকে ধরণী/ বেঁধে নিল বুকে।"

 শুরুতে মর্ত্যের কবি আদি কবি সূর্যকে সম্বোধন করেছিলেন  বন্ধু বলে। কবিতার শেষে বন্ধু হয়েছেন প্রিয়তম,অন্তরতম। কবিতার নবম স্তবকে কবির রাগিনী ছিল 'বিবাগিনি', 'একাকিনী', 'আলোর কাঙালি'। আর দশম স্তবকে কবি আদি কবির সঙ্গে মিলনের সঙ্গীত গাইলেন -
"দাও, খুলে দাও দ্বার,ওই তার বেলা হল শেষ- / বুকে লও তারে।/ শান্তি- অভিষেক হোক,ধৌত হোক সকল আবেশ/ অগ্নি- উৎসধারে।.... দিনান্তসঙ্গীতধ্বনি সুগম্ভীর বাজুক সিন্ধুর/ তরঙ্গের তালে।।" - এ যেন সেই 'গীতিমাল্য' কাব্যের একটি গানের সঙ্গে সমভাবাপন্ন - 
"তোমায় আমায় মিলন হবে বলে
     যুগে যুগে বিশ্বভুবনতলে 
পরাণ আমার বধূর বেশে চলে
            চির স্বয়ংবরা।"
 আদি কবি সূর্য বা সাবিত্রীর সঙ্গে পরাণসখা বন্ধু হে আমার, সেই বিরহের মাঝে অপূর্ব এক মিলনের সঙ্গীত। এখানেই সাবিত্রী কবির কাছে আদি কবির জন্য গায়ত্রী মন্ত্রোচ্চারণের মতো এক মহৎ সিদ্ধিতে কবি আদি কবির কাছে ঋণী হয়েছেন।

               ******
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর।মৃদুল কুমার দাস।


    

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...