#শিরোনাম ―
✍️― মৃদুল কুমার দাস।
হিন্দুধর্মের আঙিনায় বহুচর্চিত স্বনামধন্যগণের নামের তালিকায় ঊনবিংশ শতাব্দীর আটের-নয়ের দশকে একটি উল্লেখযোগ্য নামের সংযোজন ঘটেছিল,তিনি হলেন প্রতাপচন্দ্র মজুমদার(২অক্টোবর ১৮৪০- ২০ মে ১৯০৫)। পরিচয়― প্রেসিডেন্সী কলেজের প্রাক্তনী, 'ব্যাঙ্ক অফ বেঙ্গল'-এর কর্মী, ব্রহ্মানন্দ কেশবচন্দ্র সেনের উক্ত ব্যাঙ্কের সহকর্মী, 'নববিধান ব্রাহ্মসমাজ'- এর কেশবচন্দ্রের উৎসাহী সমর্থক, আমেরিকায় প্রথম পদার্পন(২৮ আগষ্ট,১৮৮৩, ম্যারাথন জাহাজ হতে বোস্টন বন্দরে),চিকাগো ধর্মসম্মেলনে (১৮৯৩) স্বামীজীর যোগদানের সময় নানা অপপ্রচারে যুক্ত হওয়া,এমনকি চিকাগো ধর্মসম্মেলনে 'অ্যাডভাইসরি কাউন্সিল'-এর মনোনীত সদস্য,'মেড ইন ইন্ডিয়া,লাভস ইন ইউ.এস.এ' শ্লোগানের উদ্গাতা। জন্ম বাঁশবড়িয়া গ্রামে, জেলা হুগলি।
কেন তাঁর হিন্দু ধর্মের প্রচারক হয়ে প্রথম আতলান্তিক পেরিয়ে আমেরিকায় যাওয়া! বলা হয় দূঃসাহস বটে! এর আগে হুগলীরই রাজা রামমোহন রায় কালপানি পাড়ি দিয়ে বিলেতে যাওয়ার দুঃসাহস দেখিয়েছিলেন। কিন্তু আমেরিকা যাওয়ার দুঃসাহস আর তাঁর হয়ে ওঠেনি। তাঁর ইংল্যান্ডেই অকালমৃত্যু ঘটেছিল। প্রতাপচন্দ্র আমেরিকা পাড়ি দেওয়া জরুরী মনে করেছিলেন কারণ দিনকেদিন মাইনে-করা ক্রিশ্চিয়ান মিশনারিগণ যেভাবে এই উপমহাদেশে এসে হিন্দুধর্মের নিরন্তর কুৎসা রটনা করে চলেছেন, এর একটা বিহিত না হলে নয়। শিক্ষিত মধ্যবিত্ত এ বঙ্গের যুবসমাজ যেভাবে খ্রিস্টধর্মের দ্বারা প্রভাবিত হচ্ছে, ধর্মান্তরিত হওয়ার একটা ট্রেন্ড তৈরী হতে চলেছে, এর বিহিত একটা নাহলে হিন্দুধর্মের বড়ই দুর্দিন আসতে চলেছে। ইংল্যান্ডে, আয়ারল্যান্ডে তবু বেশ কিছুটা হিন্দুধর্ম প্রচার পেলেও মহাশক্তিধর দেশ আমেরিকায় প্রচার বাকি থাকায় কোনো কাজের কাজ হচ্ছে না। ইদানিং পশ্চিমী দুনিয়ার পাশ্চাত্যের শিরোমণি মানে আমেরিকা,ঐ আরকি তেলা মাথায় তেল না দিলে প্রচার-মেলা জমে না। আমেরিকা জানলে, স্বীকৃতি দিলে আমরা তবেই স্বীকৃতি পাব। বিশ্বের ধনী দেশের থেকে প্রচার পাওয়া কার না সখ জাগে! আমেরিকা বললে তবেই আমরা নিজেদের চিনব,যেমন চিনেছিলাম স্বামী বিবেকানন্দকে। তাই আমেরিকায় যেকোনোভাবে হিন্দুধর্মকে পৌঁছে দিতেই হবে। সেখানে 'ভাগবদ্গীতা'র ইংরেজি অনুবাদ পৌঁছানো খুব জরুরী। কেননা সেখানে গীতার মর্ম বোঝার রালফ উড্রো এমারসনের মত অনেক পন্ডিত আছেন।
ইউটেরিয়ান চার্চের সহযোগিতায় ১৮৭৪ এ ইউরোপব্যাপী (ইংল্যান্ড, জার্মানি...) হিন্দুধর্মের প্রচার সেরেছিলেন। তারপরে ১৮৭৯ তে মাথায় আসে আমেরিকার কথা। তারই ক'বছর পরে ১৮৮৩-র জানুয়ারী মাসে কলকাতায় নববিধান ব্রাহ্মসমাজের উৎসবে আমেরিকায় হিন্দুধর্ম প্রচারের সর্বসম্মত প্রস্তাব গৃহীত হয়। দায়িত্বভার অর্পিত হয় প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের উপর। সেইমত প্রতাপচন্দ্র মজুমদার আতলান্তিক পেরিয়ে আমেরিকায় পৌঁছন ১৮৮৩-র ২৮ আগষ্ট। আর এই প্রচারের ব্যায়বাহূল্য নিরসনের জন্য একটি অর্থ সংগ্রহের কমিটি গঠিত হয়েছিল। এই ঘটনাকেই আমেরিকায় হিন্দুধর্ম প্রচারের প্রথম ভিত্তিপ্রস্তর বলে অভিহিত করা হয়। এর পর ১৯৬৫ পর্যন্ত চলল নিরন্তর প্রয়াস যা ছিল লক্ষ্যে পড়ার মত। এই কর্মযজ্ঞের প্রতিনিধিস্থানীয় ছিলেন এগারজন। তাঁরা হলেন ― প্রথম প্রতাপচন্দ্র মজুমদার(১৮৮৩)। এরপর ক্রমে ক্রমে ২.মোহিনীমোহন চট্টোপাধ্যায় (১৮৮৬), ৩.স্বামী বিবেকানন্দ (১৮৯৩), ৪.স্বামী সারদানন্দ (১৮৯৬), ৫.স্বামী অভেদানন্দ (১৮৯৭), ৬.স্বামী তুরীয়ানন্দ (১৮৯৯), ৭.স্বামী ত্রিগুণাতীতানন্দ (১৯০৩), ৮.পরমহংস যোগানন্দ(১৯২০), ৯.মহানাব্রত ব্রহ্মচারী(১৯৩৩), ১০. শ্রীচিন্ময়কুমার ঘোষ (১৯৪৬), ১১. আচার্য অভয়াচরণ ভক্তিবেদান্ত স্বামী প্রভুপাদ (১৯৬৫)।
আমেরিকায় হিন্দুধর্ম প্রচারের আদি পুরুষ হলেন প্রতাপচন্দ্র মজুমদার। তিনি ইয়োরোপে 'ব্রিটিশ অ্যান্ড ফরেন ইউনিটারিয়ান অ্যাসোসিয়েশন' -এর সম্পাদক রেভারেন্ড রবার্ট স্পিয়ার্সের সম্পাদিত পত্রিকা 'দ্য ক্রিশ্চান লাইফ'পত্রিকায় প্রথম লেখা শুরু করেছিলেন। পত্রিকার বিজ্ঞাপনে প্রতাপচন্দ্র মজুমদার সম্পর্কে এভাবে বলা হয়েছিল, ভারতে ইংরেজ শাসনের পক্ষে জনমত গড়ে তোলা প্রত্যেক ইংরেজের কর্তব্য,এই সংক্রান্ত মতামত নিয়ে প্রতাপচন্দ্র মজুমদারের বক্তব্যগুলি গ্রহণ করা জরুরী,যা এদেশের পক্ষে অত্যন্ত হিতকর হবে। রবার্ট স্পিয়ার্সের সহযোগিতায় মজুমদারের সভাগুলিতে যথেষ্ট লোক সমাগম হত বক্তব্য শুনতে। বার্মিংহাম টাউনহলে তো প্রায় তিন হাজারের মত শ্রোতা হাজির হয়েছিলেন। এর পর তিনি যান আমেরিকায়। আমেরিকায় যাওয়ার জন্য আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন ইউনিটারিয়ান সোসাইটির অনুষ্ঠানে আমন্ত্রিত অতিথি যাজক রেভারেন্ড পুটনামের কাছ থেকে।
আমেরিকায় প্রতাপচন্দ্রের দিনে দিনে ক্রমেই জনপ্রিয়তা বাড়তে লাগল দেখে আমেরিকার 'আমেরিকান ইউনিটারিয়ান অ্যাসোসিয়েশন' সমূহ দায়িত্বভার গ্রহণ করেছিল শ্রীমজুমদারের।
শ্রীমজুমদার সারাটোগা-য় যে বক্তৃতা করেন তাতে ভারতবর্ষের ধর্ম-সংস্কার সম্পর্কে যা বলেছিলেন আমেরিকাবাসীর সে মুগ্ধতার শেষ ছিল না। তা থেকে ভারতবর্ষ নিয়ে আমেরিকানরা প্রবল আগ্রহী হন। সবার দৃষ্টি পড়ে প্রাচ্যের এই পরিব্রাজক হিন্দু দার্শনিক, শিক্ষক ও ধর্মস্কারকের দিকে। তাতে কে ছিলেন না ― জাতীয় নেতা, ধরর্মযাজক থেকে অগণিত আলোকশিক্ষিত আমেরিকানবাসীগণ। তাঁর বক্তব্যে এও বার বার উঠে এসেছে, খ্রিস্টধর্মের প্রতি ভারতীয়গণ যথেষ্ট শ্রদ্ধাশীল।
আমেরিকায় বিভিন্ন সভায় যখন প্রতাপচন্দ্র বক্তৃতা শুরু করতেন তখন শুরুতে সংস্কৃত মন্ত্র তো কখনো কখনো নীরবতা পালন করতেন। আর বলতেন সারা বিশ্বে ধর্মীয় বৈচিত্র্যের কথা। আর সাহসের সঙ্গে বলতেন পাশ্চাত্যও এবার সনাতন ভারতবর্ষ থেকে কিছু ধর্মপ্রচারক নিজেদের দেশে আনুক,তাহলে ধর্মের মধ্যে বৈচিত্র্য ক্রমশ বোঝা যাবে,ধর্মীয় উদারতা আসবে। আর অকপটে যে কথা দিয়ে আমেরিকাকে মুগ্ধ করে ফেলেছিলেন তাহল ― "আমি নিজেও একজন হিন্দু প্রোটেস্টান্ট। ইতিহাস পড়ুন, বৈদিক চিন্তার বিরুদ্ধে ভারতে প্রতিবাদ-স্বরূপ সাংখ্য এসেছিল, বৌদ্ধ ধর্মও সনাতন ধর্মের বিরুদ্ধে এক প্রবল প্রতিবাদ, মধ্যযুগে শিখধর্ম ও বাংলার বৈষ্ণবধর্মও একধরনের প্রতিবাদ এবং ঊনিশ শতকের ব্রাহ্মধর্মও আর এক প্রতিবাদ।"
প্রতাপচন্দ্রের এও এক শ্রেষ্ঠ কীর্তি ইংরেজিতে রচিত 'দ্য ওরিয়েন্টাল ক্রাইস্ট' বইটির জন্য, যা তাঁকে লেখক ও চিন্তাবীদ হিসেবে আমেরিকানদের কাছে যথেষ্ট স্বীকৃতি এনে দিয়েছিল।
সুতরাং এটা নিঃসন্দেহে প্রমাণিত পাশ্চাত্যে প্রতাপচন্দ্র মজুমদার ভারতীয় সনাতন ধর্মের কথা প্রথম শুনিয়েছিলেন। এই ভারতচিন্তনের কথায় আমেরিকা সেদিন রুদ্ধদ্বার উদ্ঘাটন করেছিল। সেইজন্য যখন ১৮৯৩ এ চিকাগো মহাধর্মসম্মেলন হয়েছিল তখন সেই মহাধর্মসভার 'অ্যাডভাইসরি কাউন্সিল'-এর তিনি একজন মনোনীত সদস্য হয়েছিলেন।
****
#কপিরাইট রিজার্ভ ফর মৃদুল কুমার দাস।
মহান এই ব্যাক্তি সম্পর্কে আমার কিছুই জানা ছিলো না।আজ অনেক কিছু জানলাম।অসংখ্য ধন্যবাদ দাদা এমন ভাবে উপস্থাপনের জন্য।
উত্তরমুছুনঅনেক কিছু জানলাম।অনেক ধন্যবাদ দাদা।🙏🙏💐💐
উত্তরমুছুনঅনেক তথ্যে ভরা এই লেখাটি পড়ে অনেক কিছু জানতে পারলাম। অনেক ধন্যবাদ।🙏
উত্তরমুছুন