শিরোনাম - নীল পূর্বরাগ
✍️ ডা: অরুণিমা দাস
ছেলেকে নিয়ে গ্যাংটক বেড়াতে এসেছে রিনিতা। ছেলেই ওর সব।আজ ছবছর হলো স্বামী প্রতীকের সাথে ডিভোর্স হয়ে গেছে ওর।দিন রাত সংসারে অশান্তি লেগে থাকত রিনিতার চাকরি করা নিয়ে। প্রতীক বলতো," আমার এত ইনকাম,এর পরও তুমি কেনো চাকরি করবে?"না এরপর আর কোনো ঝামেলায় জড়াতে চায়নি রিনিতা।রোজকার অশান্তিতে ছেলেটা ভয়ে কুঁকড়ে থাকতো।ছেলের শৈশবকে নষ্ট হতে দিতে চায়নি রিনি।প্রতীককে মুক্তি দিয়েছিল।এখন তার জীবনের একটাই লক্ষ্য,ছেলে শুভমকে মানুষ করা।
"মা মা,খুব পেট ব্যথা করছে,বমি বমি লাগছে।",শুভম বললো রিনিতাকে।অতীতের পাতা থেকে চোখ সরিয়ে রিনি চোখ রাখলো ছেলের মুখের দিকে,শুকিয়ে গেছে শুভর চোখ মুখ।গাইড কে জিজ্ঞাসা করলো কাছাকাছি যদি কোনো ওষুধের দোকান পাওয়া যায়।গাইড বললো," না ম্যাডাম,তবে মন্তেসরি আছে,ওখানে আপনি ওকে নিয়ে একটু বসতে পারেন। এই পাহাড়ি রাস্তায় এতটা জার্নি করে এসে ওর শরীরটা খারাপ লাগছে হয়তো।" গাইডের সাথে রিনিতা শুভমকে নিয়ে পৌঁছলো মন্তেসরিতে।রিনিতাকে আসতে দেখে কিছু সন্ন্যাসীরা এগিয়ে এলেন।রিনিতা ছেলের অসুস্থতার কথা বললো।ওনারা ওদের দুজনকে নিয়ে মঠের অধ্যক্ষের ঘরে নিয়ে গিয়ে বসালেন।
শুভমকে দেখে এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন উনি। অবিকল নিজের ছোটবেলা যে!রিনিতা অধ্যক্ষের দিকে তাকিয়ে চমকে উঠলো!বলে উঠলো,"শুভ তুমি এখানে?" সেই সন্ন্যাসী বললেন,
" আপনার ভুল হচ্ছে ম্যাডাম, আমি এখানকার প্রধান বেদানন্দ মহারাজ।"
"তুমি এখানে কি করে শুভ?","কে শুভ ম্যাডাম? আমি চিনি না এই নামের কাউকে।" রিনিতা বললো," আমি সেদিন খুব বড়ো ভুল করেছিলাম তোমায় ছেড়ে চলে এসে।"
" কিসের ভুল ম্যাডাম? তখন যে এই বেদানন্দ ওরফে শুভ বেকার ছিল,আপনি টাকার মাপকাঠি তে বিচার করেছিলেন ভালোবাসাকে,চলে গেছিলেন নিজের বাবা মায়ের পছন্দের ধনী ছেলেকে বিয়ে করে।সেদিন থেকে শুভ নামটা আমি ঘেন্না করি।আর এই মঠে এসে আমি খুব শান্তিতে আছি।" রিনিতা বললো,"জানো শুভ,শুভম তোমারি সন্তান।প্রতীকের সাথে বিয়ের আগেই আমি বুঝতে পেরেছিলাম সন্তান আসার কথা,কিন্তু বাবার ভয়ে কিছু বলতে পারিনি কাউকে।প্রতীক বিয়ের পর থেকে নিজের ব্যাবসা,পার্টি নিয়ে ব্যস্ত থাকতো।ও তাই বুঝতে পারেনি যে শুভম ওর সন্তান নয়। একসময় আমার সব স্বাধীনতা কেড়ে আমায় ঘরে বসিয়ে দিতে চেয়েছিল প্রতীক।তারপর অশান্তি চরমে ওঠে।আমরা এখন আলাদা থাকি ডিভোর্সের পর।" সব শুনে বেদানন্দের খুব ইচ্ছে হলো শুভমকে একবার জড়িয়ে ধরতে।কিন্তু না,সন্ন্যাসীদের পূর্বরাগের কোনো কথা মনে রাখতে নেই।নিজের ফার্স্ট এইড বক্স থেকে বমি কমানোর ওষুধ আর জল এগিয়ে দিলেন শুভমের দিকে।রিনিতাকে বললেন,"এটা খেয়ে ছেলে সুস্থ হলে,ওকে নিয়ে চলে যাবেন এখান থেকে।" বলেই রুম থেকে বেরিয়ে গেলেন খুব তাড়াতাড়ি,হয়তো চোখের জল লুকোতে চাইছিলেন।রিনিতা অপরাধীর মত মুখ করে বেরিয়ে গেলো ছেলেকে নিয়ে।গাড়িতে উঠে বসলো। গাইড কিছুক্ষন পর এসে বললো," ম্যাডাম এই ওষুধটা আপনার জন্য বেদানন্দজী পাঠিয়েছেন,আর সাথে একটা চিরকুট।" চিরকুটটা খুলে দেখলো লেখা আছে,"গাড়ীর ঝাঁকুনিতে তোমারও তো বমি হয় রিনি,খেয়ে নিও ওষুধটা।"
রিনিতা দুহাতে মুখ চেপে কাঁদতে লাগলো,শুভম জড়িয়ে ধরলো মাকে।আর গাড়িটা চোখের আড়াল না হওয়া পর্যন্ত এক দৃষ্টে তাকিয়ে রইলেন বেদানন্দজী।
©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন