শনিবার, ২৯ মার্চ, ২০২৫

জন্মদিনে শরদিন্দু

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের জীবনী
✍️ ডা: অরুণিমা দাস

বাংলা সাহিত্যে যাদের অবদান অনস্বীকার্য তাদের মধ্যেই একজন স্মরণীয় ও বরণীয় বিশিষ্ট সাহিত্যিক হলেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। ইনি তিরিশে মার্চ ১৮৯৯ সালে উত্তর প্রদেশে জৌনপুর নামক শহরে জন্ম গ্রহণ করেন।আর কোলকাতায় এসে ওনার নিবাস হয় বরানগরের আদিকুঠি এলাকায়। 

 পড়াশোনা ও সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ:
মাত্র ষোলো বছর বয়সে শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায় ম্যাট্রিক পরীক্ষায় সসম্মানে উত্তীর্ণ হন। ছোটবেলা, স্কুল জীবন সবটাই মুঙ্গেরে কাটে তাঁর। আর খেলাধুলোতেও বেশ পারদর্শী ছিলেন তিনি। ছোট বেলা থেকেই সাহিত্যের প্রতি তাঁর একটা ভালোবাসা ছিল,কিন্তু তাঁর বাবা তারাভূষণ বন্দোপাধ্যায় চাইতেন ছেলে ব্যারিস্টার হোক। বাবার ইচ্ছে আর নিজের সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ এই দুই ভাবনার অন্তর্দ্বন্দ্বে ভুগতেন তিনি। বাবার ইচ্ছে রাখতে তিনি বি এ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হওয়ার পর পাটনায় আইন নিয়ে পড়তে যান। কিন্তু মনে যার সাহিত্য বাস করে সে কি করে অন্য কাজে নিজেকে নিয়োজিত করবে! পরে তাঁর বাবাও হয়তো বুঝেছিলেন ছেলের মন নেই ওকালতিতে, তাই ছেলে নিজের মনের কথা শুনে সাহিত্য চর্চায় নিজেকে নিয়োজিত করেছিলেন।

১৯ বছর বয়সে মুঙ্গেরের উকিল জীবন চক্রবর্তীর পৌত্রী পারুল দেবীর সাথে তার বিবাহ হয়। 
১৯২৬ সালে  পাটনা থেকে আইন পাস করে ওকালতি শুরু করেন তিনি। কিন্তু তাঁর ওকালতি জীবন দীর্ঘস্থায়ী হয়নি। ওকালতি শুরুর তিন বছরের মাথায় পাটনা ছেড়ে মুম্বাইয়ে পাড়ি দেন আর সেখানে মুভির জন্য স্ক্রিনপ্লে লেখা শুরু করেন। বেশিদিন মুম্বাই তে থাকেননি, ১৯৫২ সালে পুনে আসেন আর নিজের সাহিত্যের প্রতি অনুরাগ কে প্রাধান্য দিয়ে মনোনিবেশ করেন সাহিত্য চর্চায়।

সাহিত্য জীবন - পড়াশোনা চলা কালীন কুড়ি বছর বয়সে কলেজে পড়ার সময়ে প্রথম সাহিত্য হিসেবে একটি কবিতা সংকলন প্রকাশ পায় যার নাম ছিল "যৌবন স্মৃতি"।এই সংকলনে প্রায় একুশটা মত কবিতা ছিল এবং প্রতিটি লেখাই ছিল পাঠকের মনোগ্রাহী। ওকালতি জীবনেই 'বসুমতী' তে ছাপা হয়েছিল তাঁর প্রথম গল্প 'উড়ো মেঘ'।শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের লেখার মধ্যে সব চেয়ে জনপ্রিয় ছিল গোয়েন্দা কাহিনী। এছাড়াও সামাজিক, রোমান্টিক, ডিটেকটিভ কাহিনী, ইতিহাস আশ্রয়ী উপন্যাস রচনা করেছিলেন তিনি। তাঁর বর্ণনা রীতি ছিল অসাধারণ আর ভাষার বুনন থাকতো খুব মজবুত। অতি সহজেই তাঁর লেখা তাই পাঠকের মনে আনন্দ দান করেছিল। তিনি ছিলেন বহুমুখী প্রতিভার অধিকারী। উপন্যাসের পাশাপাশি লিখেছিলেন কবিতাও। তাঁর সাহিত্যে প্রেরণার কথা বলতে গিয়ে নিজের মা বিজলীপ্রভা দেবীর কথা বলেছেন যিনি কিশোর শরদিন্দুকে পড়ে শোনাতেন 'মেঘনাদবধ কাব্য'।সেই থেকেই তাঁর মনে সাহিত্য চর্চার উন্মেষ হয়।বম্বে টকিজ ছবির গল্প লেখক হিসেবে কাজ করার সুবাদে ভাবী,বচন, দুর্গা, কঙ্কন এগুলো তার গুরুত্বপূর্ণ কাজ। বাণিজ্যিক ফরমায়েশি পালন ছিল না তাঁর রক্তে, তাই পরিবারের আর্থিক সচ্ছলতা একটু ফিরতেই  আবার তিনি সাহিত্যচর্চায় মনোনিবেশ করেন। একটা কথা তিনি সবসময় বলতেন " জীবনকে এড়িয়ে কোনোদিন গোয়েন্দা গল্প লেখবার চেষ্টা করিনি "। কি, কেনো, কবে, কীভাবের উত্তর অন্বেষণ করতে করতে বাঙালি যে কখন গোয়েন্দা হয়ে ওঠে বোঝা মুশকিল। বাঙালির এই খানা তল্লাশি করার কাজে আজও তারা গোয়েন্দা গিরিতে চোখ বন্ধ করে ফলো করে ব্যোমকেশকে। শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের হাত ধরেই বাঙালি তার প্রথম প্রাইভেট ডিটেকটিভ  হিসেবে পেয়েছিল সত্যান্বেষী কে। শরদিন্দু তাঁর বলিষ্ঠ লেখনীর মাধ্যমে গোয়েন্দা কাহিনী গুলোকে এক অন্য রকম মাত্রা দিয়েছিলেন। এক সাক্ষাৎ কারে বলেছিলেন " ওগুলো (ব্যোমকেশের কাহিনী গুলো) নিছক গোয়েন্দা কাহিনী নয়। প্রতিটি কাহিনী আপনি শুধু সামাজিক কাহিনী হিসেবেও পড়তে পারেন"। তাই শুধু গোয়েন্দা গল্পই নয়, শরদিন্দুর যে কোনো লেখাতেই জীবন সম্পৃক্ততার পূর্ণ প্রকাশ লক্ষ্য করা যায়। শুধু সমসাময়িক বা জীবনের দৈনন্দিন ঘটনা কেই তিনি শুধু প্রাধান্য দেননি, ইতিহাসকেও চমৎকার ভাবে দেখতে পারতেন তিনি। নিজেই বলতেন " আমি বাঙালিকে তাহার প্রাচীনের সাথে পরিচয় করাইয়া দিবার চেষ্টা করিয়াছি। বাঙালি যতদিন না নিজের বংশ গরিমার কথা জানতে পারিবে,ততদিন তাহার চরিত্র গঠিত হইবে না..."। তাই বাঙালি পেয়েছে 'কালের মন্দিরা ', ' গৌড়মল্লার ', ' কুমারসম্ভবের কবি', ' শিবাজী ও সদাশিব ' এর মত ঐতিহাসিক উপন্যাসকে। ইতিহাসবিদ রমেশচন্দ্র মজুমদার শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়কে বলেছিলেন " লোকে ইতিহাস পড়িবে না,কিন্তু আপনার বই পড়িবে"।ছোট গল্পেও তার অবদান অনস্বীকার্য। 'ভল্লু সর্দার', 'কর্তার কীর্তি' এই রচনা গুলো বারবার পড়েও পুনরায় পড়ার সাধ থেকে যায় পাঠকের মনে। বই পড়া, রচনার পাশাপাশি ভাষা চর্চার প্রতি তাঁর আগ্রহ ছিল বেশ। নিজে সংস্কৃত শিখবেন বলে পণ্ডিতও নিয়োগ করেছিলেন তিনি। 

জীবনের শেষ উনিশ বছর নিজের তৈরী বাড়ি মিথিলা তে কাটিয়েছিলেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়।  তাঁর সর্বক্ষণের সঙ্গী ছিল শুধু বই আর বই। ভালো পাঠক না হলে ভালো লেখক হওয়া যায় না, শিক্ষিত পাঠক সৃষ্টি করে এক শিক্ষিত লেখকের। এর জলজ্যান্ত উদাহরণ ছিলেন শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়। 
বড়োদের গল্প উপন্যাসের পাশাপাশি শিশু কিশোরদের জন্য ও তাঁর লেখালিখির পরিমাণ কম নয়। শিশু সাহিত্যে তাঁর স্মরণীয় নায়ক চরিত্র ছিল 'সদা শিব '।  

শরদিন্দু বন্দ্যোপাধ্যায়ের পুরস্কার প্রাপ্তি :
শরৎ চন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার (১৯৬৭)
রবীন্দ্র পুরস্কার ( তুঙ্গভদ্রার তীরে)

তাঁর এই সাহিত্যময় জীবন ছেড়ে অবশেষে ১৯৭০ সালে
 ২২ সেপ্টেম্বর পুনেতে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বাংলা সাহিত্য তাঁর এই অবদানের জন্য তাঁর কাছে চিরঋণী।

©️ রিজার্ভ ফর অরুণিমা দাস

কোন মন্তব্য নেই:

একটি মন্তব্য পোস্ট করুন

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস

শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...