বন্ধ ঘরের জানালা
✍️ ডা: অরুণিমা দাস
ফাইনাল পরীক্ষার শেষে তিন্নি আর ওর ভাই টুবাই এসেছে মামাবাড়িতে। এসে দাদু দিদা মামা মামীদের আদর যত্নে ওরা বেশ আনন্দেই আছে। সাথে আছে মামাতো ভাই তমাল,ভালোই দিন কাটছে তিনজনের। এদিকে ওদের যা অ্যাডভেঞ্চার প্রিয় মন,তাই ওদের মা বার বার বলে দিয়েছে কোনো দুঃসাহসিক কাজ যেনো না করে ওরা। এর আগে এক রহস্য সমাধান করতে গিয়ে নিজেরা ভালোই বিপদে পড়েছিল। ওরা দু ভাই বোন প্রথম কদিন শুনেছিল মায়ের কথা। তারপর যেই করে সেই। একদিন ঘটলো এক ঘটনা। মামাতো ভাইয়ের সাথে এক ফাঁকা জায়গায় ক্রিকেট খেলতে গিয়ে বেচারা তিনজন আটকে গেলো প্রবল বৃষ্টির কারণে। কোনোরকমে গাছের তলায় দাঁড়ালেও যা ঝড় আর বৃষ্টির বেগ ওরা তিনজন এক নিরাপদ আশ্রয় খুঁজতে লাগলো। হঠাৎ করেই খুঁজে পেলো এক বাড়ী যদিও সেটা তালাবন্ধ বাইরে থেকে, তাও বাড়ীর কাছে গিয়ে দাঁড়ালো। শেডের তলায় দাঁড়িয়ে যদি একটু ঝড় বৃষ্টি থেকে বাঁচা যায়। তমাল বললো ভুল হলো রে, তোদের এদিকে না আনলেই হতো। এই বাড়িটা তো আরোই ফাঁকা, কি জানি কখন যে বৃষ্টি কমবে! আরে দাড়া না তমাল দা, বৃষ্টি কমে গেলেই তো বেরিয়ে পড়বো আমরা। এত ভয় দেখাস না, তিন্নি বললো। তিনজন প্রায় কাকভেজা হয়ে দাঁড়িয়ে ছিলো, টুবাই প্রায় চেঁচিয়ে বলে উঠলো ওই দেখ দিদি আলো জ্বলছে মনে হচ্ছে,এই বাড়ী থেকেই আসছে মনে হচ্ছে। তমাল বললো ভুল দেখেছিস তুই, ওদিকে আর তাকাসনা। তুমি কি ভূতের ভয় পাচ্ছো তমাল দা? বলেই তিন্নি ফিক করে হেসে ফেললো। তিনজন অনেকক্ষণ ধরেই দেখলো একটা আলো জ্বলছে, সম্ভবত বাড়ীর পেছন দিক থেকে আসছে আলোটা। বৃষ্টি একটু ধরতে ওরা এগোলো আলোর উৎস সন্ধানে। অস্ত্র বলতে দুটো ব্যাট আর একটা বল ওদের কাছে রয়েছে। বাড়ীর পেছনে গিয়ে দেখলো একটা জানলা দিয়ে আলো আসছে। জানলা টা হালকা খোলা ছিলো, তিন্নি ঠেলা মারতেই খুলে গেলো জানলাটা। যা দেখলো তিনজন চমকে উঠলো। প্রায় গোটা পাঁচ ছয়েক কম্পিউটার চলছে। এক কোণায় অনেকগুলো অস্ত্রশস্ত্র পড়ে আছে। তিন্নি তমালকে ইশারায় একটা ভিডিও করতে বললো। কিন্তু তমাল বোঝার আগেই তিন্নি আর টুবাইয়ের মুখ যেনো কেউ চেপে ধরলো। তারপর আর কিছু মনে নেই ওদের। যখন সম্বিত ফিরলো ওদের দেখলো একটা ঘরে দু ভাইবোন হাত পা বাঁধা অবস্থায় পড়ে রয়েছে। তমাল দা? কোথায় তুমি? টুবাই তিন্নিকে বললো দাদা মনে হয় আমাদেরকে উদ্ধার করতে সবকথা বলতে গেছে মামাবাড়িতে। তিন্নি ঘষটে ঘষটে দরজার কাছে গিয়ে দেখলো বাইরে দুজন বন্দুকধারী পাহারা দিচ্ছে। এদিকে ওদের মামাবাড়িতে হুলস্থূল পড়ে গেছে, কোথায় গেলো তিনজন! রাতের দিকে তমাল ফিরলো বিধ্বস্ত অবস্থায়। ওকে দেখে সবাই চেঁচিয়ে উঠলো তিন্নি আর টুবাই কোথায়? তমাল কোনোরকমে সব বললো। মামা আর দাদু সব শুনে কেমন হতভম্ব হয়ে গেলো। কি করবে না করবে বুঝতে পারছিল না কেউ। মামী বললেন পুলিশে জানানো দরকার। দিদা বললেন এতে যদি ওদের ক্ষতি করে ওই দুষ্কৃতী গুলো!
এদিকে রাত গভীর হতেই তিন্নি অনেক চেষ্টা করে ভাইয়ের বাঁধন আলগা করে দিলো। তারপর টুবাই ওকে বাঁধন মুক্ত করলো। একপাশে খাবার রাখা ছিলো। ওরা কিছু খেলো না। কি ভাবে বেরোবে এই প্ল্যান করতে লাগলো। ঘরে যে জানলা ছিলো তার শিক গুলো কিছুটা কমজোরী ছিলো। তিন্নি চেষ্টা করতে লাগলো যদি খোলা যায় একটা শিক অন্তত। কিন্তু লাভ হলোনা,আওয়াজ পেয়ে বাইরের পাহারাদার গুলো এসে ওদের বন্দুক দেখিয়ে আবার হাত পা বেঁধে ফেলে রেখে গেলো। দরজা খোলা থাকার জন্য তিন্নি শুনতে পেলো কাল কিছু অস্ত্র এরা পাচার করবে আর ওই কম্পিউটারগুলো হলো সাইবারক্রাইমের উৎস। কিন্তু কী করবে ভেবে পায়না!
পরের দিন সকালে,
তিন্নি আর টুবাই শুনতে পেলো একটা হেলিকপ্টারের শব্দ, বাড়িটার ওপর যেনো চক্কর দিচ্ছে। কিছুক্ষণ পর পুলিশের আনাউন্সমেন্ট, পুরো বাড়ী ঘিরে ফেলা হয়েছে। কেউ কোথাও পালানোর চেষ্টা করবেন না। ওদের ঘরের জানালার শিক ভেঙে তমালদা ঢুকে এলো। ওদের বাঁধন মুক্ত করলো। বললো তিন্নি তোর ক্লিপ বাইরে পড়ে থাকতে দেখে বুঝেছি তোরা এখানেই আছিস। কিন্তু তমাল দা তুই কি করে কাল পালাতে পারলি? যখন দেখলাম তোদের ওরা মুখ চেপে ধরেছে আমি একটু দূরে গাছের আড়ালে চলে যাই। অন্ধকার হওয়ায় ওরা দেখতে পায়নি আমায়। কিন্তু মেন গেট দিয়ে বেরোতে গিয়ে ওদের একজন আটকাতে আসে আমায়। তাকে ব্যাট দিয়ে দু তিনবার মারতেই সে নিজেকে সামলাতে আমাকে ছেড়ে দেয়। তারপর কোনোরকমে পালাতে পারি আমি। বাড়ী গিয়ে সব বলতেই দাদু আর বাবা পুলিশে খবর দেয়। এত তাড়াতাড়ি সব হয়েছে যে দুষ্কৃতী গুলো পালাতে পারেনি। আজ ওরা পালানোর প্ল্যান করছিল কিন্তু তার আগেই পুলিশ নিয়ে আমরা চলে এসেছি। চল চল দেখ গুলি গালার আওয়াজ পাচ্ছিস! সবকটা ধরা পড়লো বোধহয়। ওরা তিনজন বাইরে বেরোলো। দাদু ওদের দেখে জড়িয়ে ধরলো। পুলিশ অফিসার এসে বললেন আজ এই তিনজন বাচ্চার জন্য আমরা একটা বড় গ্যাংকে ধরতে পারলাম। আমরা বাচ্চা নই,টুবাই বললো। হেসে উঠলো সবাই। পুলিশ অফিসার বললেন সরি তোমরা বাচ্চা নও,তোমরা সব সাহসী যোদ্ধা। আমাদের আগামী অনুষ্ঠানে তোমাদের পুরস্কৃত করা হবে। এত বড় একটা গ্যাং তোমরা ধরিয়ে দিয়ে দেশকে রক্ষা করলে। ওদের মামা বললো চল বাড়ী,দেখ ওখানে কি পুরস্কার অপেক্ষা করছে তোদের জন্য? পুলিশের জিপ ওদের সবাইকে নামিয়ে দিয়ে গেলো। মামাবাড়ি পৌঁছে দেখে গ্রামের সবাই দাঁড়িয়ে আছে ওদের মিষ্টিমুখ করাবে বলে,সাথে নিউজ চ্যানেলের রিপোর্টার রাও। আর পাশে মামী,দিদা আর তিন্নি
টুবাইয়ের মা বাবাও। মাকে দেখে তিন্নি একটু ভয় পেলেও দাদু বললো চল আমি আছি। যেখানেই তোদের পাঠাই রহস্য তোদের পেছন ছাড়েনা, তিন্নির মা বললেন। এবারে কিন্তু তমাল দা আমাদের নিয়ে গেছিলো খেলতে ওখানে, আমাদের কোনো দোষ নেই,বললো টুবাই। ওর কথা শুনে সকলে হেসে উঠলো। আমি কিছু করিনি পিসি, সব দোষ বৃষ্টির কিন্তু। চল চল মিষ্টি খাবি, তিন্নির বাবা বলে উঠলেন। ওদের সকলকে নিয়ে বাড়ী ঢুকলেন দাদু আর মামা। দাদু বললেন এরম দুঃসাহস ওরা দেখাবেনা তো কারা দেখাবে? ওদের কেউ বকবেনা। থ্যাঙ্ক ইউ দাদু! তিন্নি টুবাই আর তমাল একসাথে বলে উঠলো। দাদু ওদের কানে কানে বললেন নেক্সট টাইম ওয়েটিং ফর এনাদার অ্যাডভেঞ্চার। সিওর! তিন্নি বললো।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন