যে চিঠি কখনো হয়নি পাঠানো
✍️ ডা: অরুণিমা দাস
সারাদিনের কাজের পরে একটু লেখালিখি করা অভ্যেস অরিনের। মাঝে মাঝে বস যা কাজের টার্গেট দেয় নিজেকে পাগল পাগল লাগে অরিনের।ক্লায়েন্ট কল অফিস যাওয়া খাওয়া দাওয়া সব সামলে রাতে ঘুমোনোর আগে একটু লেখালিখি না করলে মনে হয় যে কিছু একটা হলো না যেনো। আজ মনে হলো একটু অন্য কিছু লিখবে। বইয়ের তাক থেকে ডায়েরীটা বের করলো। হঠাৎ কী মনে হলো বইগুলো খুলে দেখতে লাগলো অরিন। কত গল্পবই পড়েছে একসময় আর এখন স্ক্রিন টাইম এত বেশী হয়ে গেছে যে বই পড়ার ইচ্ছে থাকলেও হয়ে ওঠেনা। নিজের সংগ্রহের বইগুলো খুলে দেখতে লাগলো। দেখতে দেখতে একটা বই হাতে তুলে নিলো,পথের দাবী। বইটা খুলে কয়েক পাতা উল্টিয়ে দেখতে দেখতে হাতে এলো একটা চিঠি। চিঠি খুললো অরিন,পড়ে হারিয়ে যেতে লাগলো ছোটবেলার সেই দিনগুলোতে। স্কুল জীবনে খুব লেখালিখি করত, হয়তো ভালোই লিখত। বন্ধুরা সেই নিয়ে খুব হাসাহাসি করত তাই নিজেকে অতটা মেলে ধরতে পারতোনা। এই চিরকুটে একটা কবিতা লেখা আছে আর সেটা লেখা হয়েছিলো প্রকাশককে পাঠানোর উদ্দেশ্যে। কিন্তু চিঠি পৌঁছোয়নি তার গন্তব্যে। তখন ক্লাস নাইন,পড়াশোনাতে মনোযোগ দেওয়া ছাড়া অন্য কোনো দিকে নজর দেওয়া বারণ ছিলো অরিনের বাড়ী থেকে। অরিন ভাবে এই চিঠি যদি প্রকাশকের দপ্তরে পাঠানো হতো কি হতে পারতো! হয়তো ছাপা হতো বা ছিড়ে ফেলে দেওয়া হতো। দুটোর কোনো একটা হতো। হলদেটে হয়ে যাওয়া চিঠি টা অরিনকে বড় আবেগপ্রবণ করে তুললো।
- কি ভাবছো? হুম! স্ত্রী জয়িতা কখন এসে দাঁড়িয়েছে খেয়াল করেনি অরিন।
- আবার কি পাঠাবে নাকি চিঠিটা?
- না না, প্রকাশক এখনো এই পত্রিকা চালান কিনা জানিনা। তবে অনেক পুরোনো কথা মনে পড়ে গেলো,বুঝলে?
- হ্যা বুঝলাম। তোমাকে তো অনেকবার বলেছি লেখালিখি করো যখন দু একটা জায়গায় পাঠিয়ে দেখো। তুমি তো শুনতে চাওনা।
- না থাক। একসময় যখন পাঠাতে চেয়েছিলাম অনেক আপত্তি এসেছিল। শুধু পড়াশোনা করেই বড় হওয়া যায় এটাই বলা হয়েছিলো। তার চেয়ে বরং লেখাগুলো ডায়েরিতে থাক। আর নিয়মিত পাঠিকা তো আছেই আমার। তোমার জন্যই তো রোজ লেখালিখিটা করতে পারি। অপেক্ষায় থাকি তোমার কেমন লাগলো লেখা সেটা জানার।
- আমি একাই কেনো পাঠক হবো? আরও অন্যদেরও সুযোগ করে দাও তোমার লেখা পড়ার।
- সে পরে দেখা যাবে।
- এই চিঠিটা গুছিয়ে রেখে দিও। এগুলোই তোমার জন্য শ্রেষ্ঠ সম্পদ।
- হ্যা। তুমি যে এত ভালো বোঝো আমায় এটাই আমার জীবনের পাওনা।
- আর আমার আক্ষেপ একটাও প্রেমপত্র না পাওয়া তোমার থেকে,যে কিনা এত সুন্দর লেখে।
- কি যে বলো! অরিন হেসে ফেললো।
আসলে সব কথা তুমি বুঝেই যাও তাই আর আলাদা করে পত্র দিতে হয়না।
- অনেক হয়েছে। এবার বইগুলো গুছিয়ে রেখে দাও।
আবার কাল তো অফিস। পরে না হয় কোনোদিন দেখো আবার কোনো চিঠি খুঁজে পাও কিনা! এরম চিঠি কখনো পেলে আর নিজে নয় সবার আগে তোমাকেই পড়তে দেবো জয়িতা। তোমার তাহলে প্রেমপত্রের জন্য আক্ষেপটা থাকবেনা। হেসে ফেললো জয়িতা আর হয়তো হেসে উঠলো বইয়ের ভাঁজে থাকা চিঠিটা যে এতদিনের অপেক্ষায় ছিলো কেউ তো তাকে পড়বে,ফিরে যাবে পুরোনো দিনগুলোতে আর তাতেই চিঠিটা লেখা সার্থক হবে।
কোন মন্তব্য নেই:
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন