রঙ্গন আর ঈশিকা ঠিক করেছে এইরকম ফাঁকা শুনশান জনবসতিহীন দুইপাশে গাছেদের সারির গা বেয়ে সহজ সুন্দর পথ ধরে দুজনে কোন এক নাম না-জানা ভালবাসার শহরে হারিয়ে যাবে।
রঙ্গন বাইক নিয়ে পথ চলা শুরু করলো। আর পিছনে ইশিকার দুই হাত মেলে পাখির ডানার মতো নিজেকে ভাসিয়ে দিতে ইচ্ছে করছে এই প্রকৃতির মুক্ত বাতাসে। তারপর খানিক বাদে রঙ্গন কে দুই হাত দিয়ে জড়িয়ে ধরে বলল এই পথ যদি না শেষ হয় তবে কেমন হতো তুমি বলতো। রঙ্গন একটু হালকা ইয়ার্কি মেজাজে বললো ভালোই হতো যদি বাইকের তেলের দামটা তোমার বাবা দিত। ঈশিকা একটু রেগে গিয়ে বলল তোমার সবসময় ইয়ার্কি না? আর কথায় কথায় বাবাকে টেনে আন কেন বলতো! প্রেম করবে তুমি আর তেলের দাম দেবে আমার বাবা? শয়তান পাজি কোথাকার। রংগন অল্প হাসতে হাসতে হাই স্পিডে গাড়ি চালিয়ে যাচ্ছে।
রাত্রি তখন সাড়ে নটা ঈশিকা বলে উঠলো কিগো কোথাও তো কোন ধাবা বা রেস্টুরেন্ট কিছুই দেখতে পাচ্ছি না আমার কিন্তু প্রচন্ড জোরে খিদে পেয়ে গেছে। রঙ্গন হঠাৎ কিছু একটা দেখে জোরে ব্রেক কষে বসলো। ঈশিকা একেবারেই হুমড়ি খেয়ে পড়ার উপক্রম। রঙ্গন স্পষ্ট দেখল রাস্তা দিয়ে কেউ একটা মেয়ে হেঁটে চলে গেল কিন্তু কোথায় যে মিলিয়ে গেল আর একবারও দেখতে পাওয়া গেলোনা তাকে। ওর গা টা কেমন যেন একটা ছম ছম করে উঠলো। কিন্তু একথা ইশিকাকে কিছুতেই জানানো চলবে না ও ভয় পেয়ে যাবে। রঙ্গনের আস্তে আস্তে মনে পড়ছে এই রাস্তার কাহিনী।
বছর পাঁচেক আগে তার এই এক বন্ধু নিলয় পামেলা কে নিয়ে এই রাস্তা দিয়ে পালিয়ে বিয়ে করার উদ্যোগ নিয়েছিল। সাথে ছিল রঙ্গন সহ আরও কয়েকজন বন্ধুর বাইক। কিন্তু হঠাৎ এই নিলয় কার গাড়ির ব্রেক ফেল করে জোরে গিয়ে ধাক্কা মারে একটা গাছে। সঙ্গে সঙ্গে পামেলার দেহটা ছিটকে পড়ে জঙ্গলের দিকে। তারপর সকলে পামেলা দেহটা খোঁজাখুঁজি করতে করতে দেখে নিমেষের মধ্যে কে যেন পামেলা রক্তমাখা শরীরটা টানতে টানতে জঙ্গলের ভেতর দিকে নিয়ে যাচ্ছে। আর পামেলা ক্ষীণকণ্ঠে চিৎকার করছে নিলয়! নিলয়! বাঁচাও আমায়। নিলয় ছুটে গিয়েছিল কিন্তু নিলয়ের মাথায় কে যেন সজোরে আঘাত করে অজ্ঞান করে দিল। অবস্থা বেগতিক দেখে বন্ধুরা সকলে এমনকি রঙ্গন ভয় পেয়ে পামেলা কে বাঁচানোর পরিবর্তে পালিয়ে গিয়েছিল। তারপর পামেলা দেহটা আস্তে আস্তে জঙ্গলের মাঝে থেকে কেমন যেন একটা ফাঁদ পাতা সুড়ঙ্গের মধ্যে ঢুকে গেল। তারপর থেকেই ওর এই অতৃপ্ত আত্মা এখানে নাকি ঘোরাঘুরি করে। লোকমুখে তাই প্রচলিত হয়ে গেছে। প্রেমিক-প্রেমিকা জুটি দেখলে ভীষণ রাগ হয়। এক্সিডেন্ট করিয়ে দেয় মাঝে মাঝে।
সব কথা মনে পড়ে রঙ্গনের সারা শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। এমনসময় রঙ্গন আবার দেখতে পেল সেই মুখটা। এবার আর অস্পষ্ট নয় স্পষ্ট সামনে থেকে। একি! এত পামেলা। হঠাৎ পামেলার অট্টহাস্য চিৎকারে রঙ্গন এর বাইকটা থেমে গেল। কিছুতেই আর স্টার্ট নিচ্ছে না। ঈশিকার কিন্তু কোন ভয় হয় নি। কিগো থেমে গেলে কেন ওই দেখো দূরে মনে হচ্ছে ওখানে একটা হোটেল আছে চলো ওখানে গিয়ে উঠি। পামেলা ততক্ষণে রঙ্গনের কলার ধরে মেরে ফেলতে যাবে এমন সময় সে বলে ওঠে প্লিজ পামেলা ছেড়ে দে আমায় প্লিজ বাঁচতে দে। পামেলা জোরে জোরে হেসে বলে যাক তাহলে চিনতে পেরেছিস? খুব বাঁচতে ইচ্ছে করে না রে তোর প্রেমিকার সঙ্গে? জানিস আমার আর নিলয়ের খুব ইচ্ছে করত এক সাথে ঘর বাধার। সেদিন আমরাও বাঁচতে চেয়েছিলাম কিন্তু তোরা কেউ এগিয়ে এলিনা সাহায্য করতে। আসলে জীবন মানে অনিশ্চিত এক যাত্রা পথ । আমিও চেয়েছিলাম নিলয় কে নিয়ে জীবনের যাত্রাপথ টা এইরকম এই রাস্তাটার মতো সহজ সুন্দর আর মসৃন ভাবে কাটাব। কিন্তু তা আর হলো না তাই আমি আর কাউকে একসাথে ঘর ভাঙতে দেখতে পারি না। এমনকি তোকেউ না। পিছনে তাকিয়ে দেখ। রঙ্গন পিছন ঘুরে দেখে ঈশিকা তার বাইকে নেই। রঙ্গন আরো ভয় পেয়ে যায়। এদিক-ওদিক পাগলের মতো ছুটতে থাকে।
হঠাৎ একজন বয়স্ক বৃদ্ধ লোক এগিয়ে এসে বলে এত রাত্রে এখানে এসেছ কেন? যদিও লোকটির মুখ দেখা যায়নি। সে বলে এই রাস্তা মোটেও ভালো না। এই 5 বছরে এই রাস্তা এক অভিশপ্ত রাস্তায় পরিণত হয়েছে। চলো আমার ওই ভগ্ন ঘরটাতে আজকের রাতটা কাটিয়ে দাও। তোমার প্রেমিকা আমায় ডাকতে পাঠালো। ওই ওখানে বসে খাওয়া দাওয়া করছে। হঠাৎ রাস্তার ল্যাম্পপোস্টে চুরমার করে ভেঙে গেল। লোকটি বললো চলো তাড়াতাড়ি চলো এখান থেকে। রঙ্গন ঈশিকা কে ফোন করল। ওর কন্ঠস্বর কেমন যেন কেঁপে কেঁপে উঠছে। রঙ্গন সঙ্গে সঙ্গে ছুটে গেল সেখানে। গিয়ে দেখে ঈশিকা নিশ্চিন্ত মনে খাবার খেয়ে যাচ্ছে মোমবাতির আলোয়। হঠাৎ রঙ্গন লক্ষ্য করলো অন্ধকারে যাকে বয়স্ক বৃদ্ধ ভেবে ভুল করেছিল সে আসলে মৃত নিলয়। সে এক গ্লাস জল দেওয়ার অনুরোধ জানিয়ে ঈশিকা কে নিয়ে প্রানপনে দৌড়ে পালালো সেখান থেকে। রঙ্গনের সারা শরীর ঘামে ভিজে যাচ্ছে। জোরে জোরে শ্বাস বইছে। ঈশিকা বলল কি হয়েছে বলোতো তোমার? আমায় খেতে দিচ্ছ না কেন? রঙ্গন হাঁপাতে হাঁপাতে বলল সব পরে বলব। এখন এখান থেকে তাড়াতাড়ি পালাতে হবে নইলে বিপদ।
এমন সময় পুলিশ এসে নিলয় কে ধরে ফেলেন। আর বলেন এবার তোমার খেলা বন্ধ। নিজেকে মৃত ঘোষণা করে বেশ মানুষের জীবন নিয়ে খেলা চালিয়ে যাচ্ছিলে না! ওই দেখো ওখানে তাকিয়ে দেখো তোমার সাজানো পামেলা। ও ধরা পড়েছে। মানুষকে ভয় দেখিয়ে তাদেরকে বিপদে ফেলে তাদের শরীরের অঙ্গ বৃদ্ধি করার প্ল্যান এবার থেকে জেলে বসে করবে। এমনকি আমরা কেউ জানতে পেরেছি আমি নাকি তুমি মেরে ফেলেছ। প্লান মাফিক। তার নামে সমস্ত টাকা-পয়সা হাসিল করার জন্য।
এবার রঙ্গন শব্দ শোনার পর ধিক্কার দিয়ে বলে ওঠে ছি নিলয়। তুই এই ধরনের মানসিকতার ছেলে? আমি তো ভাবতেই পারছিনা। তুই এই ধরনের নোংরা কাজ করতে পারিস। তুই জানিস একজন লোক তার প্রিয়তমার মৃত্যুর শোক ভুলতে একটা আসতো পাহাড় কেটে জীবনের চলার পথকে কত সহজ ও মসৃণ করে দিয়েছিল আর তুই এই সহজ-সরল রাস্তাটা কে কাজে লাগিয়ে রোমান্টিক সুন্দর মুহূর্তের সুর করে নিয়ে এম্বুলেন্স এর আওয়াজ শুনতে মজা হয়, জীবনের একেবারে শেষ গন্তব্যস্থলে পৌঁছে দিয়ে তৈরি শান্তি পাস! ছি নিলয় ছি।
তারপর পুলিশ অফিসার রংগনের সাথে হ্যান্ডশেক করে বলে থ্যাঙ্ক ইউ স্যার। আপনার অনুমানের উপর বিশ্বাস আর ভরসা না করে যদি এখানে আজ না আসতাম তাহলে সত্যিই অনেক বড় ভুল হয়েছে তো স্যার। আর আপনার এমন অভিনয় না হলে বোধহয় আমরা আজও নিলয় কে ধরতে পারতাম না। ঈশিকা অবাক হয়ে নিলয়ের মুখের দিকে তাকিয়ে অবাক হয়ে বলে তবে যে তুমি বলতে তুমি একজন বেকার ছেলে! আগে বলনি তো কখনো তুমি এসব করো। রঙ্গন বলল সময় হলে ঠিক বলতাম। আর টাকাপয়সা ছাড়াও তুমি আমায় ভালবাসতে পারো কিনা সেটা একবার বাজে দেখতে হবে না বলেই রঙ্গন হালকা হাসি দিয়ে ইশিকার হাত ধরে বেরিয়ে আসতে আসতে বলল চলো ওইখানে ধাবাতে বসে এক কাপ চা খাওয়া খাই। তারপর ঈশিকা ওখানে পৌঁছে দেখে ভ্যালেন্টাইন্স ডের স্পেশাল আয়োজনে সে মুগ্ধ হয়ে যায় আর রঙ্গন কে জড়িয়ে ধরে বলে তুমি এত সব করেছ অথচ আমায় কিছু জানাওনি? রঙ্গন বলে জানো তো ঈশিকা আমাদের জীবনের পথটা ও এই রকম কত জানা অজানা রাস্তার মধ্য দিয়ে যে হাঁটতে হয় তার কোন ঠিক ঠিকানা নেই। কিন্তু জীবনের যাত্রাপথের জন্য সর্বদা প্রস্তুত থাকতে হয়। তবে সেদিন পামেলা কে সত্যি সত্যি বাঁচাতে পারিনি বলে আজও এক অপরাধবোধ আমায় কুরে কুরে খায়।
*****--****
অপূর্ব সুন্দর
উত্তরমুছুনবাহ্, খুব সুন্দর লিখেছো। 🌷❤️
উত্তরমুছুন