সোমবার, ৮ মার্চ, ২০২১
চেনো কি আমায়? (ডাইরি) শর্মিষ্ঠা ভট্ট
# বিষয় - ডাইরি
# নাম - চেনো কি আমায়?
# লেখায় - শর্মিষ্ঠা ভট্ট
৮ই মার্চ ২০২১
কে জানে তুমি আমায় কতটা চেনো, আমি তোমার বাড়ীর কয়েকটি বাড়ী পরে থাকি, এক সামান্য সাস্থ্য কর্মী। তুমি যখন রোজ হেঁটে যাও আমার পাশ দিয়ে, অপূর্ব একটা গন্ধ ছড়িয়ে যাও। আমি হয়ত তখন কাজে চলেছি, নয়ত বাজার। দেখা হয়ে গেলে শুধু চোখাচোখি। তোমায় আমি দেখেছি বারান্দার গ্রীলের ওপাশ থেকে তুমি আমার সাথে কথা বলো। বড়ো মধুর তোমার আওয়াজ। আমার ঘর্মাক্ত কলেবরে বার বার তোমার সামনে চলে আসা বড়ো বেমানান। অগোছালো পোশাকে সংসার সামলে শুধু ছোটাছুটি। আর এখন তো কাজ বেড়ে সাংঘাতিক চাপ। সন্ধ্যায় যখন ধুকতে ধুকতে ফিরি, দেখি তুমি লনে বসে চা খাচ্ছো । দূরত্ব, ঘরে থাকা এসব তো আমাদের জন্য নয়, লোকের মাঝে কাজ।
জানি না তুমি আমায় কতটা চেনো তোমার বাড়ীর কাছেই আটান্ন নম্বর আমার নম্বর, বি আটান্ন ! ভাড়া থাকি, সর্ব সাকুল্যে আমার ঘরে লোক পাঁচ। এখানকার ভোটার আইডি নয়। কাজের খাতিরে বসত। বর রেলের গান ম্যান , চলে যায় বেশ। লোকে বলে সরকারি কাজ। কতটা রোজগার, কেমন করে মাসের শেষে চেপে খরচ করি সে আমার লোকানো অধ্যায়। প্রতি দিন লোক দেখে চান খাওয়া করে মেয়েটা হাতে পাঁচ বছরের বাচ্ছা নিয়ে ছুটছে। ওকে সরকারি স্কুলে রেখে অটো তারপর মোড়ের মাথায় বাস। ঘরটার ভাড়া একেবারে কম তাই গুঁজে গেছি। শাশুড়ি সংসার সামলায় আর আমায় গালি দেয়, উপায় নেই দুজনের চাকরি ছাড়া সংসার চালানো বড়ো সমস্যা। তোমার পরীর মতো মেয়েকে দেখেছি, স্কুলে যেতে, কালো কাঁচের ওপারে। একবার ওকে কোন কারনে ইঞ্জেকশন দিতে গিয়েছিলাম। মাখনের মতো নরম গায়ে আমার আঙুল লাগছিল হয়তো। একটু নড়ছিল, মুখে কিছু বলেনি। এই আঙুল এখন অসংখ্য মানুষের কাজে লাগে। আমার কলিগ মীরাদি যখন কাশতে কাশতে লাল হয়ে যেতো কিংবা প্রচন্ড জ্বরে হারিয়ে যাওয়া বরের জন্য চেঁচিয়ে উঠতো! ছুটে যেতাম, রইল না মানুষটা। বন্ধু হারানো হয়ত কখনও বড়ো লাগে। যাক তুমি বেশ প্রটেকশন নাও দেখি। আমার এখন রাতেও বাড়ী ফেরা হয় না। বুড়ি শাশুড়ি পঙ্গু মেয়ে আর আমার ছোট ছেলে সারা দিন সামলে নাটাপাটা । হঠাৎ ফোন এলো পাড়ার মানুষ ঠিক করেছে, সাস্থ্যকর্মী ঘরে ফিরতে পারবে না। যতক্ষণ এসব না শেষ হবে। মাথায় হাত। বর ওদিকে ট্রেনের কাজে। বন্ধ তো সব হয় না। কিছু কাজ তো অন্ত সলীলা হয়ে বয়ে চলে, তাই তুমি বা তোমরা ঠিক থাকো। এত যে আমি তুমির দ্বন্দ্ব, জানো কি কত জনের লাশের ওপর তোমার ঘর? তবে কিসের এত স্বভিমান! কিসের অহংকার!
তুমি আমায় কতটুকু চেনো? পাড়ার সবচেয়ে রঙ চটা ঘরের আমি ভাড়াটে। যেতে আসতে চোখাচোখি। কুশল বিনিময় হয়নি কখনও। তবে তুমি জানো ইঞ্জেকশন দিতে আমি আছি। কে জানে আমার ছোটো ছেলে কি করছে। মায়ের মন বড়ো টন টন করে। ওরা আমি গেলেই সপরিবারে পাড়া ছাড়া করবে বলেছে। মনে মেরে রোগীতে মন দিয়েছি। কত রকমের মানুষ আসে। অর্থনৈতিক কম জোর চিকিৎসা পাচ্ছে গ্যাদাগেদি করে হাসপাতালে। অনেকে পয়সা খরচে ছুটছে বড়ো নার্সিং হোমে। কিন্তু মৃত্যু! কে যে কখন কোথায় থাবা মারে। তোমার বর পা হড়কেছে । বাড়ীর কাছের এই খানে এনেছো। আমায় দেখতে পেলে, বিহবল তখন তুমি। ওমা, চিনতেও পারলে ! একটি রাতের কেবিন, আমি তোমার পাড়ার। প্রতিবেশী! করতে হল একটু ম্যানেজ, বৃদ্ধ রঙ্গলাল বাবু অনেক দিন আছেন। বাড়ী থেকে পয়সা আসে কাজের লোকের মার্ফত, বেশ এখানে বাসা বেঁধেছেন। কেউ আসে না নিতে, কর্তৃপক্ষ পয়সা খায়। আজকের মতো তাঁকে একটু সিফ্ট করিয়ে দিলাম আমার পাড়াতুতো নতুন পাতানো বৌদিকে যায়গা করে দিতে। রাতের বেলা কত কথা হল । বড়ো ডাক্তারের সাথে ফোনে ব্যবস্থা করছে চকচকে কোথাও সরিয়ে নিয়ে যাবার। ভেসে আসছে কথা - এখানে মানুষ থাকে! কিন্তু রোগী ও আমরা যারা প্রতি নিয়ত এই জায়গা আর অপরিছন্নদের ঘাঁটি! সত্যি কি মানুষ নোই? ওনার তো গা বমি করছে। রাতে শুনলেন মন দিয়ে আমার দুখঃ। মমতার সাথে মিলে মিশে এক হয়ে গেলেন। তারপর আজ চারদিন হল আমি এখানে ,ঘরে যাইনি। ভিডিও কলে দেখি ওর বাবা ছেলে কোলে। ছেলে কদিনে শিখেছে 'ছিঃ মা' বলতে। হয়ত লোক বলে নোংরা ঘাঁটি আমরা কিংবা ওকে সামাল দিতে ওর ঠাকুমা নয়ত... ওর বাবাই.....
আমায় তুমি কি চেনো? পুলিশ এসে এসব ঠিক করেছে সংবাদ মধ্যম সোচ্চার হয়েছে, যেমন কোন ঘটনা ঘটলেই হয়। তাতে এবার কাজ হয়েছে। আমি আজ ঘরে ফিরছি। তুমি বারান্দা থেকে হাত নাড়লে । জানো মন ভরে গেলো। আমার ওটুকুই পাওনা।
তুমি চিনেছো আমায়
সেই মেয়ে, রাত জাগা পাখি
ফিনিক্স আমি,
আমি বিপন্ন ঢেউ,
বুকে চাপা আলো
আমি তোমার প্রতি দিনের সাথী স্বাস্থ্য।
স্বাস্থ্য কর্মী,
নারী আমি।।
©শর্মিষ্ঠা ভট্ট।
এতে সদস্যতা:
মন্তব্যগুলি পোস্ট করুন (Atom)
শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল✍️ ডা: অরুণিমা দাস
শিরোনাম - সোশ্যালি আনসোশ্যাল ✍️ ডা: অরুণিমা দাস বর্তমানে অতিরিক্ত কর্মব্যস্ততার কারণে একটু বেশি সময় কাজে দেওয়ার জন্য হয়তো একের প্রতি অন্য...
-
ঘোষ বুড়ী ©সুদেষ্ণা দত্ত গ্রামের নাম সুন্দরগ্রাম--বাংলা মায়ের কোল ঘেঁষা সুজলা,সুফলা,শান্তির নীড় ঘেরা এক গ্রাম।গ্রামের অধিকাংশ লোকই কৃষি...
-
আমার অকাজের লিস্টি ✍️ ডা: অরুণিমা দাস ২০২৫ এ পড়ে ফেলা বইগুলোর তালিকা তৈরী করেই ফেললাম। ভিন্ন স্বাদের সব বইগুলো। মন ভালো করে দেয়। তালিকা...
-
অণু গল্প ----সাথী হারা। কলমে-- পারমিতা মন্ডল। দীঘার সমুদ্রে একা একা হেঁটে চলেছে সৈকত । এই বালুকাবেলায় , রামধনু রং আকাশের দিকে তাকিয়ে মনটা বড়...

বাহ্! বেশ সুন্দর লাগল। 👌👌👍👍❤❤
উত্তরমুছুনঅনেক ধন্যবাদ🙏💕🙏💕🙏💕🙏💕
মুছুনদারুণ ।💐💐
উত্তরমুছুন